অন্ধকার যন্ত্রঘর থেকে একটা হাল্কা হাসির শব্দ ভেসে এল । - তুমি ভাবছো ছোট-বড়-মাঝারি এতগুলো দাঁতালো চাকা দিবারাত্র ঠিকঠাক ঘুরে যাবো এম্নি এম্নি ? কোনরকম নজরদারি-হুকুমদারি ছাড়াই ? অ্যাঁ ?
- না না, তা বলছি না স্যার । তবে এক কাজ ক'রে ক'রে আপনারও তো একটু একঘেয়ে লাগতেই পারে কখনো-সখনো ...
- তুমি একটা হাঁদারাম । নিজের চরকায় তেল দাও না বাপু ।
- এটা কী বলছেন স্যার ? এই কাজটাই তো এতগুলো দিন নিষ্ঠাভ'রে ক'রে গেলুম । তবুও কি আপনি ছাড়ান দিলেন ? আমার মেশিনটা যেই থামলো অমনি আবার নতুন একটায় বেমক্কা বসিয়ে দিলেন । এক্কেবারে বিনা ফুরসতে । কী যুক্তি ? না খালি নিজের কাজটাই প্রাণপণে করে গেছো । বাকিদেরটা নিয়ে ভাবোনি ! আরে, ভাবাভাবির মওকা কি দিয়ে রেখেছিলেন আপনি ? আজকাল মাঝে মাঝেই মনে হয় আপনার কথার কোন ছিরিছাঁদ নেই ।
বলেই আমি জিভ কাটলুম একহাত-- এ: হে, না বললেই ভালো হত যেন । শুধুমুদু খচিয়ে কী লাভ হল ? নিজের কপাল তো আর বদলাতে পারবো না । খামোখা কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ফেলছি ।
- রাগ করলেন, স্যার ?
- ...
- স্যার, রাগ করলেন ? গলায় আরেকটু মধু-মাখন ঢালতে হল ।
- না ।
- তাহলে ?
- কী তাহলে ?
- মানে আর কথাবার্তা বিশেষ বলছেন না তো । তাই ভাবলুম ...
- রাগ করেছি ? রাগ করিনি মোটেই । আরে এত বড় কর্মকাণ্ড চালাতে গেলে কি আর তোমার মত একটা গর্ভদাসের কথায় আনমনা হয়ে পড়লে চলে ? এমনটা লোকে কতই বলছে ! শুধু কি লোক ? নজর করলে বুঝবে কুকুর-বেড়াল-মশা-মাছি মায় ঘাস-আগাছা অব্দি এক কীর্তন গাইছে । হ্যা-হ্যা-হ্যা ।
- তা তো বটেই । তা তো বটেই । আমি বিনয়ে বিগলিত হয়ে বললুম । স্যারের হাসি, থুড়ি অট্টহাসি ব'লে কথা । কজনই বা শুনতে পায় ?
- তোমার কাজের হিসেবের খাতাটা আনো তো দেখি ।
- ইয়ে স্যার, ওটা তো আমার কাছে থাকে না । চাইতে হবে; তবে আমি আগেও চেষ্টা করে দেখেছি । দ্যায় না, স্যার । উপবীত-ফীত পোঁছে না । বয়স-কৌলীন্যের ধারই ধারে না কেউ । দপ্তরটা খুবই কড়া কিনা ...
-সে তো হবেই । হতেই হবে । স্যার নির্বিকার ভাবে বললেন । - না হলে কোন কালে সব কাজ-কর্ম লাটে উঠে যেত ।
ঘর্ঘর ঘড়ঘড় শব্দে এন্তার চাকা ঘুরছে । কিছু শব্দে কানে তালা ধরার জোগাড়, আবার কিছু শব্দ এতই মিহি যে কানে আসে না সবসময় । এলেই বা কী আর না এলেই বা কী ! হুকুমবরদাররা সব মাথামোটা হলে কারখানার মালিকের তাতে সদাসর্বদা মাথাব্যথার হেতু নেই কিছু । তিনি থাকুন পরম রঙ্গে ।
- স্যার
- ...
- স্যার
- বলো
- আমার ফাইলটা আনাবেন বললেন না ?
- আনিয়েছি তো ।
- কই দেখলুম না তো ?
- তুমি কি সব কিছু দেখতে পাও বলে ভাবো না কি ?
- ছি: ছি:, কী-ই যে বলেন । আমি আবার একহাত জিভ কাটলুম । - ও কী, ও কী, স্যার - ধপ করে আমার ফাইলটা ফেলে দিলেন মেঝেতে ?
- সরি, ছুটির নো চান্স বেটা ।
- স্যার প্লিজ । আমি তুরন্ত নিচু হ'য়ে ওঁর পা, আই মিন চরণপদ্ম দু'খান জড়িয়ে ধরতে গেলুম । অন্ধকারে মাথাটা একটা মস্ত বড় ভারি চাকায় দুম ক'রে ঠুকে গেল ।
- শালা হারামজাদা । আমি স্যারকে গালি পাড়তে গিয়েও সেটা কোঁৎ ক'রে গিলে ফেললুম । কারণটা আর কিছুই না । বাবা হঠাৎ এসে পড়েছেন আর সযত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আমার ।
মেজাজ খারাপ থাকলে আমি সবসময় স্যারকেও রেয়াত করি না । কাপুরুষ কাঁহিকা । চিরটাকাল তো কন্ট্রোলরুমের আবছায়াতেই সেঁধিয়ে থাকিস । আরে আমি যতই ফালতু দুবলা একটা লোক হই না কেন কোনোদিন চোখে চোখ রেখে কথা বলতে তো পারিসনি । আর আমাদের মতো বিস্তর কাজের লোক আছে বলেই না তুমি শালা ফোকটে মাতব্বরি ক'রে যাচ্ছো । পেতুম ছুটি - জানতে তোমারও খেল খতম ।
যাক গে, এখন আমার মেজাজ বড়ই ফুরফুরে । স্যারের সুবাদে এত তাড়াতাড়ি আবার বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল । থ্যাঙ্ক ইউ স্যার । আমাকে আর যাই হোক নেমকহারাম বলা যাবে না । কাজে ফাঁকি দেবার একটা টেম্পোরারি রাস্তা আমার জানা আছে । আমার পিতৃদেব ট্রাই করেছিলেন; সাকসেসফুল হয়েও ছিলেন । তবে আমার এক্ষুনি ওপথে হাঁটার তেমন জোরদার ইচ্ছে নেই । স্যারের অর্ডারি কাজটা সময়মতন শেষ করেই ছাড়বো ।
- ফাদার
- ইয়েস মাই সন । আয়্যাম প্রাউড অফ ইউ ।
- হোয়াই ফাদার ?
- বিকজ তুমি তোমার রাস্তা বেছে নিয়েছো । সবাইকে একই পথে হাঁটতে হবে এমন কথা নেই ।
- সে তো বটেই । তুমিও তো আমার পিতামহের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনি বাবা । করলে আমার একটু সুবিধেই হ'তো ।
- হ্যাঁ তা হ'তো বটে । কিন্তু ভেবে দ্যাখো, তোমার ঠাকুর্দার থেকেও কিন্তু আমি তেমন কোন হেল্প পাইনি ।
- আহা, সেটা তো ঠাকুর্দার মর্জিমাফিক হয়নি । স্যার ওঁকে সাত তাড়াতাড়ি বদলি ক'রে দিলে আর কী বলার আছে । তা-ও আমি কি এ ব্যাপারে ওঁকে একবার জিগ্যেস করবো ?
- তোমার ছেলেমানুষী এখনো পুরো যায়নি দেখছি । এখন আর ওঁকে জিগ্যেস ক'রে করবে কী ?
- হাঁ, তা বটে । ছাড়ো ওসব পুরোনো কাসুন্দি । তোমার কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলো-টলো বরং ...
- কী আর বলবো ? ফাঁকি মেরে আল্টিমেটলি কিছু লাভ হয়নি, বুঝলে ? চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে নাজেহাল হয়ে ভাবলুম চাকার দাঁতের তলায় মাথাটা টপ ক'রে একবার গলিয়ে দেখলেই তো পারি । গর্দানটা যাবে ঠিকই কিন্তু চাকার বিরক্তিকর ঘরঘরানিটাতো থামবে ! শান্তি পাওয়া যাবে দুদণ্ড !
- শান্তি পেল কি ?
- আরে সেটাই তো ট্র্যাজেডি । নিমেষে ঘাড় ধরে অন্য আরেকটা চাকায় যুতে দিলেন তোমার স্যার । এখন সামলাও হ্যাপা ।
বাবা ছিক শব্দে থুতু ফেললেন । - বাড়ির কিছু পুরনো বইপত্তরে অবিশ্যি এসম্পর্কে আগাম সতর্কবাণী ছিল । কিন্তু সব কথা তো সবসময় মাথায় রাখা যায় না । মনখারাপেরওতো একটা ইচ্ছে-অনিচ্ছের ব্যাপার আছে, না কি ? সে যাই হোক, তুমি দেখছি আপাতত স্যারকে বেশ বশ করেছো ।
- কেন ?
- এই যে, ওনার বদান্যতায় তোমার-আমার দুম ক'রে দেখা হয়ে গেল । অভিজ্ঞতা বিনিময় করাটা খুব ভাইটাল, বুঝলে ? তোমার বয়সে যদি আমার বাবার, মানে তোমার ঠাকুর্দার সঙ্গে একবার দেখা হয়ে যেত তাহলে আমি হয়তো প্ল্যানটা বদলে ফেলতুম । এ নিয়ে এখন যদিও আর ভেবে-টেবে লাভ নেই ...
- হুঁ । আমি মনমরা হয়ে চিন্তিত মুখে বললুম ।
- অত চিন্তা ক'রো না । বাবা পিঠে আলতো চাপড় মারলেন । - ফাদার না হোক, ফাদার-ফিগার এক-আধখানা পেয়ে যাবে আজ না হোক কাল ...
- হ্যাঁ । কিন্তু সময়ের একটা দাম আছে - এটা তো মানবে ? পাঁচ দিনের কাজ চুকিয়ে দিতে যদি পাঁচমাস লেগে যায় - সেটা আর কাঁহাতক সহ্য হয় বলো ?
- হুঁ-হুঁ-হুঁ । বাবা বিজ্ঞের মতো একখানা হাসি হাসলেন । - ও সব ঘন্টা-দিন-মাস-সনের ফাঁপা হিসেব বেশিদিন খাটবে না সোনা । সময়ের মাপ অত সহজ জিনিস নয় । বুঝলে ? সায়েন্সে টি ফর টাইম দিয়ে একটা-দুটো লাগসই ইক্যুয়েশন ফাঁদলে কিংবা পদ্যমতে একটা মোক্ষম ছন্দের দুলুনি দিয়ে কেয়াবৎ বলে ফেল্লেই কিন্তু কেল্লাফতে হবে না ।
- কী ক'রে হবে শুনি ? আমি একটু রাগত ভাবেই বললুম ।
- আরে বাবা, সবটা জানলে কি আর আমি তোমার কাছে লুকোই ? শুধু তোমায় কেন আরো দশটা লোককে সাধ্যমতো ডেকে জানান দিয়ে যেতুম । তুমিই একবার স্যারকে শুধিয়ে দ্যাখো না । শুনছি তুমি এখন ওনার খুবই পেয়ারের লোক ? যখন-তখন স্বপ্নাদ্য পাচ্ছো ...
- ধুস, কীই যে বলো । এসব কুচক্রীদের রটনা । আমি হতাশ ভাবে বললুম । -বড়র পিরীতি বালির বাঁধ । দেখছো না, চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই বয়সেই দু'হাতে কেমন বিচ্ছিরি রকমের কড়া পড়ে গিয়েছে !
- আরে ও কিছু না । বৌমাকে অবরে-সবরে একটু তেলমালিশ করে দিতে বোলো । এবারে একটা ভারি চাকা পেয়েছো ব'লে অত আফসোস ক'রো না তো । পরের বারে একটা হাল্কা গোছের কিছু পাবে । আমি নিজেকে দিয়েই বেশ বুঝেছি । আসলে স্যারের পরিমিতিবোধটা বেশ প্রখর । তোমার ঠাকুর্দা দু'দিনের রোগ ভোগে হঠাৎ চলে যাওয়ায় ছোটবেলায় আমরা সবাই একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছিলুম তো । তাই তখন বুঝতে পারিনি । তোমার বয়স আরেকটু বাড়লে ঠিক বুঝতে পারবে ।
- বয়স আর বেড়ে কাজ নেই । একী ? চল্লে কোথায় ?
- শুনতে পাচ্ছো না ? তোমার স্যারের কাজের ঘন্টির আওয়াজ ? আসলে ঘন্টিটা সবসময় সুরে বেজেই চলেছে । তোমার কানে কখন ধরা পড়বে - সেটা স্যারের মর্জি । আর তোমার চাকা কখন ভারি কখন হাল্কা, কখন সেটা জোরে ঘুরবে, কখন আস্তে - সে-ও ওই স্যারেরই খেয়াল । থেমে থাকার একঘেয়েমির বেড়া টপকে কাজের আনন্দ খুঁজে নাও । পারবে । পারবে । তুমি পারবে । জেনো বিশ্রাম বলে কিছু নেই । ম'রে ফুরসত পাবার কিচ্ছু নেই । পুরোটাই নিখুঁত কর্মযজ্ঞ । অনাহত অব্যাহত জীবনচক্র ।
বাবার গলার স্বর দূরে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে ।
- হ্যাঁ, শুরুতেও ঘুরন্ত চাকা । শেষেও ঘূর্ণায়মান অলাতচক্র । চক্র আদি । চক্র মধ্য । চক্র অন্ত । আর অকারণে সেটাই তোমাদের বিরুদ্ধে আমার সানন্দ চক্রান্ত । ত্বরিতে একগরাস গালভারি ব্যাখ্যান গিলিয়ে স্যার পুনর্বার অট্টহাস্যে আটখান হলেন ।
আমি অবশ্য মোটেই পুলকিত হলুম না । এটা কি আদৌ হাসির ব্যাপার ? অনাদি অনন্তকাল পরের গোলামী ক'রে যেতে হবে ? এতো মহা গেরো । এর সমাধানও নেই কারো কাছে !
- স্যার ... আমি আকুল কন্ঠে ডাকলুম ।
যা ভেবেছি তাই । স্যারের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না ।
এখন কী করা উচিত ? চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে আমি হাসবো না কাঁদবো ? রাগ করবো না গোমড়ামুখো হবো ? আমি কখন কী হবো, কখন কী করবো, ভাববো - সেটাও কি স্যার আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন ?
আমি প্রায় হাল ছেড়ে দেবার গলায় ভারি স্বরে আরেকবার ডাকলুম - বাবা ... শুনতে পাচ্ছো, বাবা ?
পবনপদবীর কোন কোণে ধাক্কা খেয়ে মিষ্টি রিনরিনে প্রতিধ্বনি তখুনি ফিরে এলো - বাবা ... শুনতে পাচ্ছো, বাবা ?
আমি সবিস্ময়ে দেখলুম আমার এবড়ো-খেবড়ো ধ্যাবড়া চাকাটার খাঁজে খাঁজে কোথ্থেকে একটা ছোট্ট চাকা এসে দিব্যি জুড়ে গিয়ে সোত্সাহে প্রবল পরাক্রমে ঘুরতে শুরু করেছে !
(পরবাস-৪১, মে, ২০০৮)