• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫৯ | এপ্রিল ২০১৫ | প্রবন্ধ
    Share
  • প্রতিভা বসু, আপনাকে আমরা চিনিনি : গোপা দত্তভৌমিক


    || ১ ||

    মাদের ছোটোবেলায় বাড়িতে বড়োদের আড্ডায় প্রথিতযশা সব দম্পতিদের গল্প হত। জগদীশচন্দ্র ও লেডি অবলা বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও নেলী সেনগুপ্ত, গান্ধী-কস্তুরবা তো বটেই আর সাহিত্যিক দম্পতিদের মধ্যে প্রমথ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী এবং তখনো পর্যন্ত দারুণভাবে খ্যাত বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসু। 'দেশ' পত্রিকায় বেরোচ্ছে বুদ্ধদেবের আত্মজৈবনিক লেখাগুলি এবং প্রতিভা বসুর স্মৃতিচারণিক গদ্য। ওঁদের সম্পর্কে একটা সম্ভ্রম-মিশ্রিত ভালোবাসা ছিল বাঙালির মনে। কিন্তু স্পষ্টভাবেই সাহিত্যিক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুকেই অনেক ওপরে স্থান দেওয়া হত। বিখ্যাত পণ্ডিত উনি, অসাধারণ অধ্যাপক—আর কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার হিসেবে কিংবদন্তী। প্রতিভা বসু বোধহয় কিছুটা বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে বাস করতেন। যদিও তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন—ওঁর অসংখ্য গল্প, উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে এবং নায়িকা হয়েছেন সুচিত্রা সেন। বাঙালির স্বপ্নের নারী—সেই অসামান্য মুখের ডৌল, দীর্ঘ পঙ্খ চোখ, আর রহস্যময় হাসি, কখন পর্দায় তিনি আসবেন দর্শক অপেক্ষা করে থাকত। দর্শক সিনেমা হলে ভেঙে পড়ত, কিন্তু সাহিত্যপাঠক বাঙালি হয়তো এই কারণেই প্রতিভা বসুকে সিরিয়াস লেখিকা হিসেবে মেনে নিতনা। অনেককেই বলতে শুনেছি, 'বেশ মিষ্টি গল্প লেখেন মহিলা'। আজ তাঁর শতবার্ষিকীর প্রহরে মনে হচ্ছে কী অন্যায়ই না করা হয়েছে। সত্যিই কি এমন একটা চিনিমাখা গল্পের খোপে প্রতিভা বসুকে আঁটানো যায়?

    || ২ ||

    হাতের কাছে আছে দে'জ থেকে প্রকাশিত তাঁর গল্পসমগ্র দু'টি খণ্ড আর তাঁর সুযোগ্যা কন্যা দময়ন্তী বসু সিং-এর বিকল্প প্রকাশনীর একটি গল্প সংগ্রহ। উপকরণ সামান্য—তবু ফিরে দেখা যাক।

    প্রতিভা বসুর লেখায় মেয়েরা কেন্দ্রে থাকে, কিন্তু তিনি নাকি শেষ পর্যন্ত বিপন্ন মেয়েদের ত্রাণকর্তারূপে কোনো দয়ালু পুরুষকে হাজির করেন এবং প্রায়শ বিয়ের সাতপাকে সুখসমাপ্তি ঘটাতে ভালোবাসেন, এমনি একটা লোকপ্রচল বিশ্বাস আছে। 'গর্ভধারিণী' নামে গল্পটি ফিরে পড়তে গিয়ে মনে হল কল্লোলের বস্তুতন্ত্রের জয়ধ্বনিতে তিনি ছিলেন না কিন্তু এই গল্পটির বাস্তবে যেন কোথাও কোনো আপোসরফা নেই। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একটি মেয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করে ও কীভাবে অসম্মানের চূড়ান্ত স্তরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, এই গল্প তার মর্মান্তিক ছবি।

    গল্পটি লেখার টেকনিক বেশ নতুন ধরনের, আস্তে আস্তে ভাঁজ খুলে খুলে ভয়ংকর সত্যটিকে অনাবৃত করা হয়েছে। উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনীয়ার নিরঞ্জন, সুখী গৃহস্থও বটে; হঠাৎ কর্মস্থানের কাছাকাছি একটি খুনের খবর পেল। মৃত ব্যক্তি একটা ঘোর ক্রিমিন্যাল। 'সারাটা জীবন কেবল পাপ করে বেড়ালো'। গোয়েন্দা বিভাগের বন্ধু নিরঞ্জনকে এই ক্রিমিন্যালের ইতিহাস জানায়। এই পাপিষ্ঠ প্রথম জীবনে ফাঁকি দিয়ে একটি সুন্দরী, গুণবতী মেয়েকে সম্ভবত চাকরীর লোভে বিয়ে করেছিল। শুধু ফাঁকি নয়, আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে কাণ্ডটি ঘটিয়েছিল সে। মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়েছিল দাদার বন্ধু একটি উপযুক্ত পাত্রের সঙ্গে। ঘটনাচক্রে সবই পালটে গেল। তিনটি সন্তান জন্মের পর সেই পাপিষ্ঠের স্বরূপ প্রকাশ পেল, বাড়ির দাসী থেকে কর্মক্ষেত্রে অন্য মহিলাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে খুন করতে গিয়েছিল স্ত্রীকে। পুরো আটচল্লিশ ঘন্টা অজ্ঞান ছিলেন মহিলা। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর পূর্ব পরিচিত দাদার বন্ধু সেই সময়ে হাজির হন ও মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে বাঁচান। আদালতে মেয়েটি স্বামীকে কোনো দোষ দেননি। তারপর তিন সন্তান নিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। লোকটির স্বভাব শুধরায়নি, এরপর খুন করে এক জমিদার গিন্নিকে। এতদিনে সে খুন হয়েছে নিজেরই কোনো কৃতকর্মের ফলে। লোকটির নাম শুনে চমকে উঠল নিরঞ্জন—সুখরঞ্জন রায়। কিন্তু কেন চমকাল লেখিকা তা বিস্তৃত করেননি। বরং ফ্ল্যাশব্যাকে পাঠককে নিয়ে গেছেন নিরঞ্জনের ছেলেবেলায়। স্বামী নিরুদ্দেশ হবার পর তিন সন্তান নিয়ে তার মা নার্সের কাজ করে সংসার চালাতেন। অপরূপ সুন্দরী এক বিষাদ-প্রতিমার মতো ছিলেন ওর মা। বাড়ির অভিভাবক ছিলেন অবিবাহিত নিশীথ মিত্র—ওরা নিশীথমামা বলে ডাকত। নিরঞ্জনের দিদি আর দাদার দুর্ভাগ্যক্রমে অকালমৃত্যু হয়। এই দুটো ধাক্কা মাকে যেমন, নিরঞ্জনকেও তেমন বড়ো আঘাত দিয়েছিল। নিরঞ্জন একটু পাল্টেও গেল। তার মনে নানা সন্দেহ দেখা দিল, বিনা স্বার্থে নিশীথমামা এত করেন কেন? কোথায় গেলেন ওদের বাবা? মা কেন বাবার প্রসঙ্গে এত নীরব—এসব প্রশ্ন পোকার মতো তাকে কুরে কুরে খায়। তার মনে হয় সব গণ্ডগোল আর অনর্থের মূলে এই নিশীথ মিত্র। যদিও তাঁরই সস্নেহ সাহায্যে ওদের পড়াশোনা, বড়ো হওয়া। গোপনে একটা প্রতিহিংসা লালন করত সে নিশীথমামা সম্পর্কে। মনে হত মা আর নিশীথমামা অবৈধ সম্পর্কে যুক্ত। তারপর একদিন সে কান পেতে শুনল মাকে নিশীথমামা বলছেন—'আর কদ্দিন তুমি এভাবে আত্মগোপন করে থাকবে ... কীভাবে আমি তোমাকে সেদিন তোমাদের বাড়ি থেকে বার করে নিয়ে এসেছিলাম...।' আগুন জ্বলে উঠল নিরঞ্জনের মাথায়। এই লোকটাই তবে তার মাকে বার করে এনেছিল, বাবাকে বঞ্চিত করে। দুর্দান্ত রাগে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিশীথ মিত্রের ওপর। মা প্রাণপণ শক্তিতে প্রতিরোধ করতে গিয়ে বলেছিলেন, 'যত ভালোভাবেই মানুষ করো নিশীথ, সুখরঞ্জন রায়ের রক্ত যাবে কোথায়!' পাঠক এই বাক্যটিতে এসে গল্পের জিগ্‌স' পাজলগুলো জুড়ে নিতে পারে, ছেঁড়া ছেঁড়া সুতোগুলো মিলে যায়। সেদিনের নিরঞ্জন মাকে অকথ্য গালাগাল দিয়েছিল। বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে চিরকালের মতো গৃহত্যাগ করেছিল। বহু জায়গায় তারপর খুঁজেছে নিরুদ্দিষ্ট বাবাকে। আজ এতদিন পর খুঁজে পেল তার ঘৃণ্য পিতৃপরিচয়, সবটাই স্পষ্ট হয়ে উঠল তার কাছে। অনুশোচনা, পরাজয়, অপমান তাকে প্রবল আত্মধিক্কারে জর্জরিত করল, গল্পের শেষ বাক্য নিরঞ্জনের আত্মবিলাপ, 'হায়রে আমার হতভাগ্য গর্ভধারিণী'।

    গল্পের শেষটি 'হুইপ ক্র্যাক এণ্ডিং' বলা যায়, একটা প্রবল চমক-চাবুক যেন বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠে। সেই সঙ্গে অনেক না-বলা ব্যথা পুঞ্জিত হয়ে ওঠে। অবিশ্বাস, সন্দেহ, অনাস্থার অন্ধকারে একটি সামাজিক সত্য উঠে আসে, 'বিধবা' মার সঙ্গে অপর পুরুষের বন্ধুত্ব সহ্য করতে পারেনি যুবক পুত্র—পিতৃতান্ত্রিক ঈর্ষা ও অধিকারবোধের একটা আগ্রাসী চেহারা প্রকট হয়ে ওঠে। মেয়েরা সতীত্ব রক্ষা করছে কিনা সেদিকে নজর রাখার জন্য সামাজিক পুলিশের দায়িত্ব নিতে এই ব্যবস্থায় সবাই প্রস্তুত। যে মা বুকে করে পাখির ছানার মতো বড়ো করেছেন তাকে সন্দেহবশে মর্মান্তিক কুবাক্য বলতে ছেলের বাধেনি। তবে প্রতিভা বসু গল্পটিকে একমাত্রিক করেননি। নিরুদ্দিষ্ট অচেনা বাবার জন্য যেমন, মা ও নিশীথমামার জন্য বেদনা আর ভালোবাসাও নিরঞ্জনের হৃদয়ের অতলে বাসা বেঁধেছিল। বেদনা ও ক্রোধ, প্রেম, প্রতিহিংসা ও অনুশোচনা গল্পটিকে অসামান্য করেছে।

    'ভালোবাসার জন্ম' গল্পটিকে "মিষ্টি প্রেমের গল্প" লেবেল দেওয়া অসম্ভব। অপ্রেম, ঘৃণা, রিরংসা থেকে কীভাবে একটি মেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল, কর্দমাক্ত দাম্পত্য প্রত্যাখ্যান করে চলে গেল অজানার অভিসারে এটি সেই সাহসের গল্প। এই গল্পে পুষ্প আর ব্রজেশের সূত্রে যে জীবনযাত্রাকে প্রতিভা বসু এঁকেছেন তা নিখুঁত, বাস্তব। কয়েকটি উদাহরণ তুলে নেওয়া যাক, পুষ্প ও ব্রজেশের বর্ণনা যেমন,

    'একটি যুবতী মেয়ে, পরনে টিয়ারংয়ের শস্তা শাড়ি, গায়ে আঁটো ছিটের ব্লাউস, হাত ভর্তি কাচের লাল সবুজ চুড়ি, বাঁ হাতে চুড়ির পিছনে সাধব্যের চিহ্ন স্বরূপ সরু মোটা চার-পাঁচটা লোহা, (একটা বাপের বাড়ির, একটা শ্বশুরবাড়ির, একটা মানতের, একটা কালীবাড়ির, একটা তারকেশ্বরের), উপর হাতে সুতোয় বাঁধা বড়ো ছোটো তিনটে মাদুলি, গলায় চিকচিকে সোনার হার। গায়ের রঙ মাজা-মাজা, নরম কোমল শ্যামল। মুখশ্রী বেশ সুন্দর। ...

    'পুষ্পর তুলনায় পুষ্পর স্বামীর বয়েস অনেকটা বেশি, রঙ কালো এবং মোটা। বুকে জঙ্গলের মতো লোম, হাতে পায়েও খুব লোম। অনেক সময়েই বনমানুষের মতো দেখায়। মাথার চুল শক্ত এবং ঘন, ভুরু এক আঙুল চওড়া, প্রায় চোখের পাতায় ঝুঁকে পড়েছে। চোখ ছোটো করমচার মতো লাল।

    বিদ্যা না থাক বুদ্ধি আছে, পরিশ্রমী খুব, দেশ পাকিস্তানের গর্ভে চলে যাবার পরে সর্বস্বান্ত হয়ে এসেও ভেঙে পড়েনি, কলকাতার উপকণ্ঠে রাস্তার ধারে জবর দখল জমিতে ছাউনি তুলে শুরু করেছিলো, এখন সেখানে পাকাঘর, বড়ো দোকান।'

    সংক্ষেপে, পুষ্প আর ব্রজেশের শ্রেণী চরিত্র, এবং একই অর্থনৈতিক শ্রেণীর অন্তর্গত হয়েও রুচি ও সংস্কৃতির তফাৎ অনায়াসে ফুটিয়ে তোলেন লেখিকা। ব্রজেশের মুখের ভাষা পঙ্কিল, তার মনেরই মতো। পুষ্প ছ'বৎসরে সন্তানবতী হতে পারেনি তাই সে বিশ্বাস করে তার স্ত্রী বাঁজা এবং স্ত্রী নয়, স্ত্রীলোক হিসেবেই ব্যবহার করে তাকে। খোলা কলতলায় স্নানের সময় অঙ্গমার্জনা করায় পুষ্পকে দিয়ে, অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করে অশ্লীল ভঙ্গিতে, 'শালীর হাত চইলছে দেখ না, স্বামী না যেন পরপুরুষ, আলগা আলগা, শুতেও আলগা ধুতেও আলগা।'

    প্রতিভা বসুর কলম সবরকম বিষয়েই অনায়সা, সাবলীল, গল্পের প্রয়োজনে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি নিঃসংকোচ। ব্রজেশ স্ত্রীকে মনে করে, 'একটা নিষ্ফলা গাছ', এবং 'একটা ডেমনি'। সমাজবিহিত প্রাত্যহিক বলাৎকার থেকে পালায় মেয়েটি—গল্পের শেষে তাকে দেখি যে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, তার রূপ ও স্বভাবে মুগ্ধ সেই ডাক্তারের দরজায়। এই পরিণতি কি রোমান্টিক স্বপ্নাভিসার? মেয়েটির চারদিকে যে অসহ্য কদর্য প্রতিবেশ তা ভাবলে এমন মনে হয়না। সে আশ্রয় পেয়েছিল কি পায়নি তা লেখিকা স্পষ্ট বলেননি। তাঁর সংযমই গল্পটিকে ভিন্ন মর্যাদা দিয়েছে।

    প্রতিভা বসু যে সময় বড়ো হয়েছিলেন তখন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে অগ্নিযুগ। সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতায় কয়েকটি পঙ্‌ক্তি কৈশোরে আমাদের শিহরিত করত। 'ওরা বীর ওরা আকাশে জাগাত ঝড়/ ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে/ গুলি বন্দুক বোমার আগুনে আজো রোমাঞ্চকর।' সেই ঝড় তোলা মানুষরা এসেছেন কয়েকটি গল্পে। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের যেসব মেয়ে দীর্ঘকালের বিধিনিষেধের বেড়া ভেঙে সন্ত্রাসবাদের আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তাঁদের প্রতিভা বসু এঁকে রেখেছেন। তখন তরুণ তরুণীদের মনে স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্য উন্মুখ আগ্রহ এমন তীব্র যে নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করে তাঁরা নানা দুঃসাহসিক কার্যক্রমে ঝাঁপ দিচ্ছেন। প্রতিভা বসু এইসব গল্পে দুটি সময়কে কৌশলে এনেছেন। 'ফ্রেম' গল্পটি স্বাধীনতা পরবর্তী কালের, যখন বিগতমহিমা এই বিপ্লবীরা দারিদ্রক্লিষ্ট নামহীনতার অবজ্ঞায় ডুবে রয়েছেন। মূল গল্পটি ফিরে যায় অগ্নিযুগের উত্তেজনাময় প্রহরগুলিতে। গল্পের শেষে আবার ফিরে আসে ফ্রেমটি—স্বাধীন ভারতবর্ষের কোনো অবজ্ঞাত কোণে বিপ্লবীদের জীবনযাপন। গল্পগুলির কেন্দ্রে আছে রাজনীতির পাশাপাশি প্রেম। সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আবেগের স্থান নেই, ভিন্নমতেরও জায়গা নেই। তাই বিপ্লবীদের আত্মদানকে শ্রদ্ধা জানিয়েও রবীন্দ্রনাথ এই রাজনীতিকে 'বিভীষিকা পন্থা' 'অতিশয় পন্থা' বলতে কুণ্ঠিত হননি। প্রতিভা বসুর চিন্তনে আছে রবীন্দ্রভাবনার ছাপ।

    দুটি গল্প আমরা বেছে নিচ্ছি। দুটি গল্পেই এ যুগের একালের, যাদের অগ্নিযুগ সম্বন্ধে কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই, তেমন সাংবাদিক বা পূর্বপাকিস্তানের ছেলেমেয়েদের সাক্ষাৎকারের সূত্রে গল্পের জমিন মেলে ধরা হয়েছে। 'স্বপ্ন ভেঙে যায়' গল্পে আছে এলালতা আর কৃষ্ণ রায়—বোন ও দাদার কথা। একদা বিপ্লবী দলের মক্ষীরাণী এলালতা পঞ্চান্ন বছর বয়সে 'কলকাতা শহরের এক গরিব পাড়ার গরিব বাড়ির অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে যিনি নিঃশব্দে মারা গেলেন।' খবর নিতে এসেছেন সাংবাদিক দুজন। সেই সূত্রে এলার ডায়ারির পাতা খুলে গেছে। শোকাভিভূত কৃষ্ণ রায় যিনি ঢাকার অনুশীলন সংঘের একচ্ছত্র নায়ক ছিলেন, যার ইঙ্গিতে শত শত ছেলেমেয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে পেরেছে, জলে ডুবতে দ্বিধা করেনি। সেই কৃষ্ণরায় শোকাভিভূত শুধু নন অনুশোচনায় ডুবে আছেন। এলার ডায়ারি প্রকাশ করে সেইসব ভয়ংকর দিন রাত—

    'ঘা খেয়ে খেয়ে ইংরেজ সরকার তখন ক্ষিপ্ত বাঘের মতো হয়ে উঠেছে, ব্যবহার নিষ্ঠুরতার চরমে পৌঁছেছে। গুলি লাথি লাঠি ব্যাটারি বেয়নেট দোহাত্তা চালাচ্ছে দিগ্বিদিকে। যাকে পাচ্ছে ধরছে, মারছে, মেরে ফেলছে। গিসগিস করছে চারদিক পুলিশে, ঘরে ঘরে গোয়েন্দা লেলিয়েছে।'
    এই সময়ের গর্ভে ছিল ছোট্ট একটি চাপা প্রেমের গল্প। এলাকে ভালোবাসত সুব্রত সেন নামে মেধাবী একটি যুবক। পরে ঘটনাচক্রে বিপ্লবী নেত্রী এলার সঙ্গে আই. সি. এস সুব্রতর দেখা হল। চাকরি ছাড়ার সংকল্প ছিল সুব্রতর, দুজনেই তারা গান্ধীজীর অহিংসার আদর্শে যোগ দেবে ঠিক করেছিল। বিয়ে হয়েছিল ওদের, দাম্পত্যের পরমায়ু দশদিন। এলা যে পথে পা দিয়েছে তাতে ঢোকার পথ আছে, বেরোবার নেই। এলাকে ক্ষমা করা হয়নি। এলার ডায়ারি—
    'বিয়ের ঠিক দশদিনের মাথায় সুব্রতকে গুলি করে মেরে ফেলেছিলো আমার দলের লোকেরা।'
    যে স্বাধীনতার জন্য তাঁদের জীবনযাপন তা এল একদিন, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কৃষ্ণ রায় দেখলেন তার বিষাদপ্রতিমা বোনকে আর এমন এক দেশকে যেখানে অন্যকে ঠেলে এগিয়ে না গেলে জায়গা হয়না কোথাও। ভাইবোন একটা বাচ্চাদের স্কুল খুলে ভাঙা ঘরে আধপেটা খেয়ে থাকার জীবন বেছে নিলেন।

    সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টা 'স্টোরি' মাত্র, তাদের ফেরার পথের কথা বলাবলিতে রইল স্টোরিটা প্রথম বাগাবার ফূর্তি আর সর্বত্যাগী মানুষগুলির প্রতি অবজ্ঞা,

    'উঃ দিনের বেলাতেও ঘরটা কী অন্ধকার। এই থিকথিকে বর্ষায় এই জঘন্য পাড়াটার মধ্যে কে আর আসবে কষ্ট করতে? এমন কিছু ইমপটেন্ট খবর নয়।'
    গল্পের এই শেষটুকু প্রতিভা বসুর শক্তি চিনিয়ে দেয়।

    'ঘাস মাটি' গল্পটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ। এই গল্প যখন লেখা হয়েছে তখনো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, বর্তমানে লুপ্ত পূর্বপাকিস্তানে বাঙালির সত্তা কীভাবে নতুন পরিচয় নিয়ে জেগে উঠেছিল তার চিহ্ন এঁকেছেন লেখিকা। ফ্রেমে এখানে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা একদল উদ্দীপ্ত ছেলেমেয়ে—কলকাতায় তারা খুঁজছে মাধবী মিত্রকে। এক সময় পূর্ববঙ্গে বিখ্যাত বিপ্লবী ছিলেন, 'এখন তিনি নগণ্যা। কোথায় এক অন্ধ গলিতে থাকেন, কোনো এক ছোটো স্কুলে শিক্ষয়িত্রী-গিরি করেন; আর বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে হিন্দুমুসলমানের মিলনের সেতু তৈরির ব্যর্থ চেষ্টায় গলদঘর্ম হন।' ছেলেমেয়েদের হাত দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন ইয়ুসুফ। স্মৃতি বিস্মৃতির ওপার থেকে ভেসে আসে রক্ত আর অশ্রুভেজা একটি প্রেমের গল্প। ইয়ুসুফ আজ জীবনের প্রান্তে এসে কলকাতায় তাঁর সম্পত্তি মাধবীর হাতে তুলে দিতে চান,

    'ইচ্ছা একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করে, যেখানে সব ধর্মের সব মানুষ সেবা পাবার অধিকারী হবে। এবং একটি অবৈতনিক স্কুল যেখানে সব ধর্মের সব শিশুরা বিশ্বমানবতায় দীক্ষিত হবে।'

    ইয়ুসুফ ছিল মাধবীর অধ্যাপক পিতার প্রিয় ছাত্র রাজসাহী কলেজে এবং সে প্রথম যৌবন থেকে মাধবীকে ভালোবেসেছে। মাধবীর তরফেও ছিল গাঢ় অনুরাগ। মাধবীর যোগ্য হয়ে ওঠার জন্যই সে বিলেত থেকে আই. সি. এস হয়ে এসেছে। মতামতে সে গান্ধীবাদী। কিন্তু মাধবী তখন বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত। দুজনের মধ্যে আদর্শগত ব্যবধান প্রেমকে ছাপিয়ে উঠেছে। ইয়ুসুফ বারবার ফেরাতে চেষ্টা করেছে প্রেমিকাকে আর বিপ্লবী দলের নির্দেশ এই সংসর্গ ত্যাগ করতে হবে মাধবীকে। এই সূত্রে লেখিকা গীতা আর বৌদ্ধদর্শনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। দলের নেতা প্রভাসদা গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন দ্বিধাগ্রস্ত মেয়েটিকে, শহরের নতুন ম্যাজিস্ট্রেট ইয়ুসুফ নাকি সাম্প্রদায়িক, তাই তাকে মারতে হবে, সরাসরি গুলি করে।

    'প্রাণীদিগের দেহে অবস্থিত আত্মা সদা অবধ্য, প্রাণীর দেহনাশে তোমার শোক করা উচিত নয়।'—গীতার এই শ্লোক মাথায় নিয়ে মাধবী তার দলের অন্যদের নিয়ে ইয়ুসুফকে গোপনে হত্যা করতে গেছে। ইয়ুসুফের কাছে খবর ছিল। তবু সে পালায়নি, মাধবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে নির্ভয়ে। মাধবীর ইঙ্গিতে ঝোপের আড়াল থেকে ছুটে এসেছে গুলি। তারপরই অনুশোচনায় উন্মাদ মাধবী ঝাঁপ দিয়েছে প্রেমিকের রক্তাক্ত দেহের ওপর। ইয়ুসুফ তাকে বলত, হিংসার দ্বারা হিংসাকে জয় করা যায়না। সে ছিল সর্বতোভাবে অহিংসার পূজারী। তার পরিচয় সে রেখেছে গুলিতে আহত হয়ে বেঁচে যাবার পরে আদালতে। কারো ওপর দোষ চাপায়নি, সবটাই নিজের অসাবধানতার জন্য—এমনি জানিয়েছে।

    গল্পটিতে পূর্বপাকিস্তানে ইয়ুসুফের আদর্শে উদ্বুদ্ধ তরুণতরুণীরা ইতিহাসের সরণিতে আজ সত্য। প্রতিভা বসু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগেই তার ইঙ্গিত রেখেছেন। লেখিকার সামাজিক, রাজনৈতিক চৈতন্যের দিগন্ত এই গল্পে পাঠককে মুগ্ধ করে।

    'সকালবেলা' গল্পটি নানা কারণে আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে। অনাথা মেয়ের ওপর পারিবারিক অত্যাচারের গল্প বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়, শরৎচন্দ্র তাঁর 'অরক্ষণীয়া' তে এবং রবীন্দ্রনাথ 'স্ত্রীর পত্র' গল্পের বিন্দুর মধ্যে অসাধারণ দলিলীকরণ করেছেন। কিন্তু 'সকালবেলা' হল মাতৃহারা কন্যাকে বাবা এবং সৎমার যৌনপণ্য রূপে ব্যবহারের গল্প। এমনটা ভারতবর্ষে এবং অন্যত্রও হয়ে থাকে—সৎমা কেন, নিজের মাও অনেক সময় পিছিয়ে থাকে না এই পথে অর্থ উপার্জনে। কিন্তু গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে এমন একটি সমাজে আদ্যন্ত গোপন করে রাখা ব্যাপার তুলে এনে লেখিকা সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। অনুরাধা নামে ভিকটিম মেয়েটির মুখেই শোনা যেতে পারে গল্পটা—

    'পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত পিতৃগৃহের ক্রীতদাসী ছিলাম। বিমাতার সন্তান-সন্ততি পালন করা থেকে সংসারের অনুকোটি চৌষট্টি সমস্ত কাজই আমাকে করতে হতো। হঠাৎ কোথা থেকে কে এক ধনী ব্যক্তি এসে হাজির হলেন বাড়িতে। কী সুবাদে এসেছিলেন, কেন তাঁকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল আমি কিছুই জানিনা। বাড়িতে কয়েকদিন মায়ের সঙ্গে বাবার প্রচণ্ড ঝগড়া চললো, মনে হলো কোনো বিষয়ে মা যা বলছেন বাবা তাতে কোনো মতেই রাজি হচ্ছেন না। তারপর কোনো সন্ধ্যায় কোনো আত্মীয়ের বাড়ি নিয়ে যাবার কথা বলে বাবাই ঐ লোকটির বাগান বাড়িতে রেখে এলেন আমাকে। ... ছ'মাস বাদে ফেরত এলাম আমি। সবাইকে বলা হলো মামাবাড়ি গিয়েছিলাম। কয়েকদিন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করলাম, যে দিকে দু'চোখ যায় চলে যাবো ভাবলাম, আত্মহত্যার চেষ্টা করলাম, কিছুই পারলাম না। আবার জুড়ে গেলাম সংসারের ঘানিতে। বিমাতার একটি কন্যার ভালো ভাবে বিয়ে হলো। কিন্তু কন্যা তো আরো দুটি আছে। দ্বিতীয়বার দালাল লাগিয়ে আবার কার সন্ধান পেলো, এবার বাড়িতে কোনো বচসা শোনা গেলনা। চাকরির ইন্টারভিউর নাম করে নিয়ে গিয়ে আবার এক গুহায় ঢুকিয়ে দিয়ে এলেন। ফিরেছিলাম তিনমাস বাদে।'

    তৃতীয়বার আরেক লম্পটের কাছে ভাড়া দেবার সময় মেয়েটি ভান করে সে অন্তঃসত্ত্বা, বাঁচবার জন্য। সৎমা ওকে ছেড়ে আসতে বলেছিলেন নবদ্বীপের রাস্তায়। বাবা কারো গলায় ঝুলিয়ে দায়মোচন করতে ইচ্ছুক। মেয়েটি যখন টের পায় তার বিয়ের চেষ্টা হচ্ছে, পাপবোধে সে জর্জরিত হয়। কোনোমতে দেখা করে হবু বরের সঙ্গে এবং সব খুলে বলে। ছোটোবেলা থেকে ভয় ছাড়া আর কোনো অনুভূতি নেই অনুরাধার, এই একবারই সে সাহস দেখিয়েছিল। গল্পের পরবর্তী অংশে মিলনান্ত পরিণতি দেখি বটে কিন্তু তা যে খুব অতিমাত্রায় রোমান্টিক এমন মনে হয়না। দুনিয়ায় অনুরাধার পৈশাচিক প্রকৃতির বাবা ও সৎমার মতো মানুষ যেমন আছে, পূর্ণেন্দুর মতো উদারহৃদয় মানুষও নেই তা নয়। মূল কথা হচ্ছে সমস্যাটি নিয়ে লেখিকার নাড়াচাড়া করার ধরন। একটি লাইন নেই যেখানে তিনি কোনোরকম শ্লীলতা লঙ্ঘন করেছেন অথচ এই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কীভাবে মেয়েরা পরিবারের হাড়িকাঠে বলি হয় তার বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য করে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনুরাধারা সাধারণত সোনাগাছির মতো কোনো পল্লীতে স্থান পায়। মনে পড়ছে তৃতীয়বার বিক্রি হবার সময় মেয়েটি যখন জানিয়েছিল সে অন্তঃসত্ত্বা তখন বাবা, মা মিলে যে তাকে প্রচণ্ড মারধোর করেছিল একটি বাক্যে তার অসামান্য বিবৃতি আছে। সবমিলিয়ে গল্পটি প্রতিভা বসুর অসাধারণ শক্তি ও অননুকরণীয় শৈলীর অভিজ্ঞান। কণ্ঠস্বর মৃদু ও নম্র রেখে আপাত নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে আখ্যানটি বিবৃত করেন বলেই গল্পগুলি এমন অবিস্মরণীয়।

    'মিসেস পালিতের গার্ডেন পার্টি' গল্পটি ঠিক কবে লেখা হয়েছিল জানিনা, তবে গল্পটি পড়ে মনে হয় ষাটের দশকের কোনো এক সময় হবে। দেশভাগের পরে উদ্বাস্তুসমস্যা যখন প্রবল আকার ধারণ করেছে। পঞ্চাশের দাঙ্গা এবং পঁয়ষট্টির ভারত-পাক যুদ্ধের পর কাতারে কাতারে পূর্বপাকিস্তান ছেড়ে চলে আসছেন হিন্দুরা। তাঁদের সম্বন্ধে পশ্চিমবঙ্গে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সহানুভূতি নেই তা নয়, কিন্তু 'রিফিউজি' নামটির মধ্যে একটা নাক সিঁটকানো অবজ্ঞা সর্বদাই লেগে থাকত। ওদের উপভাষায় কথাবার্তা, সব ছেড়েছুড়ে আসার ফলে কোথাও একটা মাথা গুঁজে দীন জীবনযাপন, বাঁচার তাগিদে ওদের প্রাণপণ সংগ্রাম এসবই অভিজাত পশ্চিমবঙ্গীয়দের মনে একটা অস্বস্তি জাগাত। কালের নিয়মে আজ তা অনেকখানি অপসৃত। কিন্তু সেই দূরত্ব, বিরোধ এবং সংঘাত আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছে। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের 'অসবর্ণা' গল্পটি সাহিত্যপাঠকের মনে গাঁথা রয়েছে। কিন্তু 'মিসেস পালিতের গার্ডেন পার্টি' গল্পটি যেন চাপা পড়া। এটিকেও 'মিষ্টি প্রেমের গল্প' বলে ভুল করতে দেখেছি।

    গল্পের কেন্দ্রে আছেন অভিজাত মহিলা মিসেস পালিত, ছেলে নয়নেন্দু বিলেত থেকে লম্বা ডিগ্রি নিয়ে কৃতী হয়ে এসেছে তাই বাড়ির বাগানে পার্টি দিচ্ছেন তিনি। ভিতরের উদ্দেশ্য শহরের ধনী সম্ভ্রান্ত বাড়ি থেকে তিনটি অবিবাহিত মেয়ের জন্য পাত্র জোগাড় করা এবং পুত্রের জন্য তাঁর মনে মনে ঠিক করে রাখা কয়েকটি পাত্রীকে নয়নেন্দুর সামনে হাজির করা। মিসেস পালিতের বিশাল বাড়ির পিছনে একটি অব্যবহৃত গ্যারাজে মাসিক পয়ঁত্রিশ টাকা ভাড়ায় থাকে একটি উদ্বাস্তু পরিবার। মা আর মেয়ে, 'একটি একপাল্লার ভাঁজ-করা কব্জির দরজা, পাশে প্রায় পাখির খাঁচার মতো সরু শিকের সরু জানালা। এই একটিমাত্র, ঘর। আলাদা রান্নাঘর নেই, কল নেই, বাথরুম পর্যন্ত নেই।' চাকরদের জন্য বাথরুমে পরিবারটির জন্য ব্যবস্থা।

    'তা রেফিউজি হয়ে অত সুখ আর কোথায় পাবে? এই যে পাচ্ছে এই যথেষ্ট। কত লোক তো ফুটপাতে।'

    অবশ্য এই গ্যারেজটিই ভারি সুন্দর করে রেখেছে 'রেফিউজিরা'। দেয়ালে অপরাজিতার লতা, সামনে ফুল গাছ, পিছনের জমির ফালিতে লাউ কুমড়ো টোমাটো। ঘরটিও ভারি পরিপাটি—তক্তপোষে সুজনি ঢাকা বিছানা, গোছানো বইপত্র—টুকিটাকি সাজানো ছিমছাম ভাবে আর উনুনে ডাল ফুটছে, পিঁড়িতে সামনে বসে বই পড়ছে মালতী। এই গুছিয়ে সংসার করাটা তারিফযোগ্য মনে হয়েছে মিসেস পালিতের,
         'বাঙালদেশের মেয়েগুলো রোগা হ'লে কী হবে, কাজের খুব।' মালতী আর তার মাকে পার্টির কথা জানিয়ে মালতীকে নিমন্ত্রণও করেছেন তিনি। যদিও গ্যারেজের ঘরটি যাতে অতিথিদের নজরে না পড়ে তাই জাপানি ছবি আঁকা লাল টুকটুকে পার্টিশন দিয়ে ওদিকটা ঢেকে দিতে ভোলেননি।

    মালতী সন্ধেবেলা স্কুলে পড়ানো শেষে টিউশনি সেরে বাড়ি ফেরে। মার মনকেমন করে, 'ঢাকা ছাড়ার পরে ফূর্তি কী, আনন্দ কী, হাসি কী, বিশ্রাম কী, কিছুরই আর চিহ্ন নেই জীবনে। উনিশ বছরের মেয়ে খাওয়া পরার ধান্ধাতেই সারাদিন অস্থির। আজ পাঁচদিনের মধ্যে তাঁর স্বামীরও কোনো চিঠি নেই। বাড়ির ব্যবস্থার জন্য এখনো ঢাকাতেই প'ড়ে আছেন তিনি।'

    এই নেহাত নগণ্য মালতী আর তার মার সঙ্গে অকস্মাৎ পরিচয় হয়ে গেল নয়নেন্দুর। মিসেস পালিতের বিলেত ফেরত বহুমূল্য ছেলে একটু অ-সামাজিক, সে পুস্তকপ্রিয় ঘরকুনো। তাই মার দেওয়া পার্টির কৃত্রিম আলাপে, সুখবিলাসের স্রোতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে তার অসুবিধা হচ্ছিল। পার্টিশনের আড়ালে এসে সিগারেট খেতে গিয়ে মালতীর সঙ্গে আলাপ—ক্রমে সেদিনই সেটা বন্ধুত্বে গড়িয়ে গেল। দুজনের মধ্যে সংযোগ তৈরি করল পুস্তকপ্রীতি আর চায়ের নেশা। পার্টিতে পরিবেশন করা ফারপোর স্যাণ্ডউইচ আর ফেরাজিনির প্যাটির বদলে তক্তপোশে থালায় আলুভাজা, চিঁড়েভাজা, ডিমের কুচি, নারকোল সন্দেশ আর চা—অন্য একটু আসর বসল গ্যারেজে।

    'দুটো সন্দেশ নিয়ে প্রায় একটি ছোটোখাটো বিপ্লব হয়ে গেল, রবীন্দ্রনাথ কোন সালে প্রথম ইওরোপে যান সে-বিষয়ে, একটা মতভেদ হ'লো মস্ত; ছাই জমে উঠলো হেজলিনের শিশিতে।'

    এদিকে মিসেস নস্করের মেয়ের সঙ্গে ছেলের সম্বন্ধ বেশ খানিকটা এগিয়ে নিয়েছিলেন মিসেস পালিত। সমাজের চূড়োয় আছে নস্কর পরিবার—রাজার ঘরের মতো অর্থবিত্ত। বিয়ের সম্বন্ধের সূত্রপাতে প্রসন্ন মনে বাড়তি খাবার বিতরণ করলেন দারোয়ান, ড্রাইভার, মালি, দাসদাসী—আর মালতীদেরও। 'আহা। রেফিউজি। এলে যা-হোক একটু ভালোমন্দ খেতে পারতো। যা ওদের কষ্ট।' সেই সময়ই দৃশ্যটা তাঁর চোখে পড়ল—গ্যারেজের ভেতরে মুখোমুখি বসে চা খাচ্ছে নয়নেন্দু আর মালতী। 'অপলক তাকিয়ে রইলেন তিনি ছেলের সুশ্রী সুখী আনন্দে উজ্জ্বল মুখখানার দিকে।' নিজেকে চূড়ান্ত ব্যর্থ, পরাভূত মনে হল মিসেস পালিতের। সন্ধ্যার সব আয়োজন অর্থহীন হৈ হুল্লোড় মনে হল।

    গল্পটিতে নয়নেন্দু আর মালতীর বন্ধুত্বটুকুই দেখানো হয়েছে। প্রেম নয়, বিয়ে নয়—তার সম্ভাবনাও তেমন নেই। শুধু কোনো কোনো উদ্বাস্তু পরিবারে শিক্ষা, মেধা, মনন, আতিথ্যে অনেক সময় যে কৃষ্টির দুর্লভ ছাপ শত গ্লানিময় জীবনেও জ্বলজ্বল করত, নয়নেন্দুর চোখে সেটি উদ্ভাসিত করেছেন প্রতিভা বসু। কঠিন জীবনসংগ্রামে যে সাহস আর আত্মমর্যাদা সম্বল করে লড়ত উদ্বাস্তু মানুষগুলো তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ঐ সময়ই অন্তঃপুরের নিষেধের গণ্ডি ভেঙে বাঙালি মেয়েদের কাছে বাইরের কর্মজগৎ উন্মুক্ত হল। দারিদ্র্য আর না-পাওয়ার মধ্যেই ডানায় রৌদ্রের গন্ধ পেল মেয়েরা—মালতী তাদের প্রতিনিধি। তার পাশাপাশি তিনপুরুষের ধনীবাড়ির মেয়ে, নয়নেন্দুর তিনবোন— যারা শাড়ি ব্লাউজের গবেষণায় সময় কাটায়, বিউটিস্লিপ যাদের কাছে অত্যাবশ্যক, রংকরা গালে লজ্জার আভা ছড়িয়ে যারা প্রজাপতির মতো ফুরফুর করে উপযুক্ত পাত্র ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত তাদের প্রতি পাঠকদের অবজ্ঞা জাগে। একটি নতুন জীবনধারণায় পাঠককে পৌঁছে দেন প্রতিভা বসু—নারীর এক নতুন সম্মান-সংজ্ঞায়।

    তাঁর উপন্যাস আলোচনার বাইরে রয়ে গেল। বহু অসাধারণ গল্পও বাকি থাকল। জন্মশতবর্ষে আজ তাঁকে পুনরাবিষ্কার করার দায় বাঙালি পাঠকের। একটি সামান্য চেষ্টা রইল এই আলোচনায়।



    অলংকরণ (Artwork) : ছবিঃ জীবনের জলছবি বই থেকে
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)