• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫৯ | এপ্রিল ২০১৫ | গল্প
    Share
  • পাঁচপক্ষ : সংহিতা মুখোপাধ্যায়





    আত্মপক্ষ

    তারপর প্রায় বছর ঘুরে গেছে। ধৃতিকান্তকে দেখে সুরচিতা খুব হতাশ হয়েছিল। ওর হিসেব মতো ও সেই সময়ে অভিকে প্রত্যাশা করেছিল। যাই হোক আজ অভি আসছে। সুরচিতা ইস্কুলে ছুটি নিয়েছে পাঁচদিন। একদিন গেল প্রস্তুতিতে, তিনদিন যাবে আপ্যায়নে। একদিন যাবে শ্রান্তি কাটাতে। হ্যাঁ, শ্রান্তি, আনন্দের শ্রান্তি।

    আজ সারা ঘরময় হাইড্রেনজিয়া ফুল, ধূপ আর মোমবাতি। বসার ঘরের ছোটো গোল টেবিলে ফল, মিষ্টি, কফি রাখা আছে। সুরচিতার পরনের ঢাকাই শাড়িটা কেনা অনেকদিন আগে, কিন্তু গায়ে উঠল আজ। তিনপাহাড়ি এসে প্রথম বসন্তে রডোডেনড্রন দেখে রং মিলিয়ে কেনা। আজ খোঁপাতেও রডোডেনড্রন। হাতের বইটায় মন নেই তার। থেকে থেকে মুখ তুলে দেখছে খুলে রাখা দরজার দিকে। তারপর একসময় পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলো বাগানে। এতো সেজে বাগানে দাঁড়াতে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু অ্যাজেলিয়ার ঝোপের পেছনে ছোট্ট বাঁশের তাকে নজর যেতে মন ভালো হয়ে গেল। বেগুনি আর সাদা ভ্যান্ডা(??) তো ফুটেইছে, তার মধ্যে এই প্রথম ফুটেছে লেডিস স্লিপার। প্রাণমনে আনন্দের আবহ ছেয়ে গেল। অনেক খেটে ফল পাওয়ার আনন্দ।

    পিছন ফিরতেই দেখল ফুলন্ত রডোডেনড্রন গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে অভি দাঁড়িয়ে। প্রাথমিক চমক কাটিয়ে সুরচিতা বলল, “আয়, ভেতরে আয়।” ঘরের ভেতর পা রেখেই অভি বলল, “এ বাব্বা! আমি তো ভাবলাম তোমাকে কিচ্ছু লিখি নি বলে তুমি খুব রাগ করেছ। তা না তুমি দেখছি জানতে যে আমি আসব!” সুরচিতা বলল, “জানতাম। তুই আসবি।” একটু থেমে বলল, “ভেবেছিলাম আরও আগে আসবি।” অভি পিঠের ব্যাগটা মাটিতে ধপ করে ফেলে সুরচিতাকে জড়িয়ে ধরল। দুজনের আবেগ কিছু থিতু হতে, সুরচিতার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অভি বলল, “অভিমান হয়েছে?” তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বলল, “সে তো হবারই কথা। আমিই চাকরির চক্কর ঠিকমতো বুঝতে পারি নি। তাই আসতে দেরি করে ফেললাম।” সুরচিতা ওকে এবার ঠেলে সরিয়ে দিল একটু। ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “কিন্তু সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেলি?” সুরচিতার কপালে, গালে, গলায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল অভি; বলল, “তোমাকে এতো সুন্দর করে সাজতে কখনও দেখি নি। ভীষণ ভালো লাগছে।” সুরচিতাও অভির গলায় একটা গভীর চুমু দিয়ে বলল, “আজ কত বছর পরে আমার সাথে আমার প্রেমিকের দেখা হলো! সাজব না?”

    তারপর সুরচিতা প্রেমিকটির আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পরল। মাফিন আর কফি খেতে খেতে দুজনের অনেক হাসি ঠাট্টা হলো। এখন অনিশ্চয়তাগুলো অনেকটাই ওদের দুজনের নিয়ন্ত্রণে; আত্মবিশ্বাসও অনেক বেশি, দুজনেরই। শেষ যখন ওরা মুখোমুখি হয়েছিল তখনও এমন হাসিঠাট্টার অবকাশ ছিল না। এমন একান্ত যাপনের সুযোগও ছিল না তখন। সন্ধের মুখে সুরচিতার মায়ের ফোন এলো। মা জানতে চাইলেন, “কী করে কী খাওয়ালি অভিকে?” সুরচিতা বলল, “সেটা তুমি অভির মুখ থেকেই শোনো।” অভি উচ্ছসিত হয়ে বলতে লাগল এসে থেকে ও কী কী খেয়েছে। তারপর খুশি খুশি গলায় “গুড নাইট” বলে মা ফোনটা রেখে দিলেন।

    সুরচিতা অভিকে জিজ্ঞেস করল, “বাড়িতে খবর দিয়েছিস?” অভি বলল, “না। দিচ্ছি।” দীপ্তি অনেক ধন্যবাদ দিলেন সুরচিতাকে এই জন্য যে অভিকে মানুষ করায় সে ওঁদের সাহায্য করেছে বলে। ফোনটা স্পিকার মোডে ছিল। অভি হাসছিল। দীপ্তির সাথে কথাবার্তা সারা হতে সুরচিতা বলল, “তোর মামার বাড়ির দিকে গিয়েছিলি?” অভি বলল, “জন্মে থেকে মা কোনোদিন নিয়ে যায় নি মায়ের নিজের বাড়িতে, সেখানে আমি হঠাৎ যেতে যাব কেন?” সুরচিতা বলল, “মা কেন নিয়ে যাননি জানিস?” অভি বলল, “ওখানে গেলেই নাকি বাবাকে সবাই মেরে ফেলবে আর মাকে আর আমাকে আটকে রাখবে।” সুরচিতা বলল, “কিংবা তোদেরও মেরে ফেলবে। এখন ভাবতে হবে লাভটা কিসে--মেরে ফেলায় না আটকে রাখায়?” অভি কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না, বলল, “মানে?” সুরচিতা বলল, “তোর বাবার চার ভাই, সকলেই বাবার বড়ো তাই তো?” অভি বলল, “তাই-ই তো শুনেছি।” সুরচিতা বলল, “সবাই-ই সরকারি-আধাসরকারি চাকুরে আর বাড়ির জমিজমার অংশীদার। তোর বাবা ইস্কুলে পড়ার সময়ই ঠাকুর্দা মারা গিয়েছিলেন। বাবা বড়ো হয়েছিলেন মূলতঃ দাদাদের আশ্রয়ে। ফলে তিনি সবার ছোটো হলেও খুব আদরের ছিলেন না। এখন তিনি অবিবাহিত বা নিঃসন্তান মারা গেলে তাঁর অংশীদারিটুকু এঁরা পেয়ে যেতেন। আর তাঁকে সপরিবারে নিকেশ করতে পারলেও তাই।” বিরক্ত মুখে ভ্রূ কুঁচকে অভি বলল, “ধুর কী সব শুরু করলে? তোমার সাথে অনেক জরুরি কথা আছে--” ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে সুরচিতা বলল, “সে তো আছিস কদিন, বলবি না হয়।” তারপর আবার শুরু করল, “হ্যাঁ, যা বলছিলাম; তোর মামাবাড়িতে দাদু আর মামা। দাদু এখনও বেঁচে থাকলে তোকে আর তোর মাকে আটকে রাখতে পারেন। মামা লোক দেখানে দেখভাল করতে পারেন আর তোর বাবার বাড়ির লোকেদের ভিলেন বানাতে পারেন--তোর বাবাকে ওঁদের হাতে তুলে দিয়ে বা নিজেরাই তোর বাবাকে মেরে ফেলে দোষটা তোর জ্যাঠাদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে। আর দাদু না থাকলে তোদের মেরে ফেলতে তোর মামার কোনো বাধা নেই। তারপর বাবার বাড়ির লোকেরা মামার বাড়ির লোকেদের আর মামার বাড়ির লোকেরা বাবার বাড়ির লোকের দোষারোপ করে সমাজের সুপুত্তুর হবেন না হয়।” তারপর একটু থেমে বলল, “যদিও বিয়ের যুগ্যি সুচাকুরে একটা ছেলেকে নিয়ে মা-বাবা তাঁদের সাফল্যটা দেখাতে গেলে মারপিট, গুম করে রাখা বা গুমখুনের সম্ভাবনা কম। তবে তোকে দেখলে তোর কথা জানলে ওঁদের খুব হিংসে হবে। রাগও আরও বেড়ে যাবে। দেশে ঘরের ব্যাপার। কী হতে কী হয়ে যায় আর ওখানকার টুকুন রায়রা কেমন পাকিয়ে তোলে কে জানে। তাহলে ওদিকে গিয়ে কাজ নেই। আমি ভাবছিলাম এসব লোকেদের মুখে ঝামা ঘষা উচিৎ নাকি এড়িয়ে যাওয়া--” অভি বলে উঠল, “তাহলে রেজাল্ট পেলে কস্ট-বেনেফিট অ্যানালিসিসের?” মুচকি হাসল সুরচিতা। তারপর বলল, “আসলে তোর টাস্ক লিস্টে এরপর একটা বাড়ির ব্যবস্থা করা জরুরি। আমি সাইট সিলেকশনের চেষ্টা করছিলাম।” অভি প্রশ্ন করল, “আগে বাড়ি?” তারপর বলল, “বেশ তোমার যখন ওটাই প্রায়োরিটি তবে তাই হবে।” সুরচিতা বলল, “আমার প্রায়োরিটির কথা নয়। এটা তোর প্রয়োজন। বাবা-মাকে রাখবি কোথায়? ঐ বাসাবাড়িতেই?” অভি বলল, “এখনও ভাবি নি। তবে ভাবাচ্ছ যখন, তখন বলতে পারি, না বাসাবাড়িতে রাখব না। কিন্তু এই বাজারে বাড়ি কোথায় পাব? যেখানে জমি কিনে বাড়ি বানানো যাবে, বাবা-মা কী সেখানে গিয়ে থাকবে? মানে ঐ দেশে ঘরে বা সেরকম কোথাও। নাকি সেখানে ভাগের জমি এতদিন পরে চাইতে গেলে উজিয়ে থাকা হাতগুলো না মারধর করে হ্যান্ডশেক করবে? আর যেখানে এতকাল কাটাল সেখানে আমি একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারি বড়ো জোর।” সুরচিতা বলল, “ভালো হয় যদি তোর কাছে নিয়ে গিয়ে ওঁদের রাখতে পারিস।” অভি বলল, “তাহলে তো মেসে থাকতে পারব না, অনেক বেশি বাড়িভাড়া দিতে হবে। নিজের বাড়ি বানাতে বা নিদেনপক্ষে একটা ফ্ল্যাট কিনতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারওপর আমার কবে কোথায় ট্রান্সফার হবে তার ঠিক নেই।” সুরচিতা বলল, “তোর বাবা-মাকে এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি। বয়সের কারণে ওঁরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এদিকে তুই স্বাধীন হয়েছিস, সুরোজগেরে হয়েছিস। আর তোর ওপর টুকুন রায় এণ্ড কোম্পানির কোনো খবরদারি চলে না। এতে তোদের ওপর টুকুন রায়ের হিংসে আরও বেড়েছে। এরপর তোর বাবা-মাকে উৎপীড়ন করে তোকে শোষার একটা রাস্তা খুঁজবে। তুই ওখানে ফ্ল্যাট কিনলে সেটাই ওরা একটা ছুতো করবে হয়তো। তাই ভাবছিলাম একটু শান্তিতে থাকার জন্য না-হয় দুপয়সা বেশিই খরচ করলি বাড়ি ভাড়াতে; না হয় কদিন দেরিই হলো অ্যাসেট বানাতে, নিজেদের বাড়ি হতে, গাড়ি হতে। তোর মামার বাড়ির প্রসঙ্গ সেই জন্যই তুললাম যে যদি এখানকার বাস উঠিয়ে দিলীপকাকুরা ওখানে যেতে পারেন। কিন্তু সে-পথ যখন বন্ধ তখন না হয় তোর ওখানেই নিয়ে যা। ভাষায় অসুবিধে হবে কদিন। তবে সিয়াপুরা এখন বেশ কসমোপলিটান শুনেছি। অসুবিধে নাও হতে পারে। তাছাড়া তোর বাবা-মা ইন্টেলিজেন্ট। ভাষা শিখে নেবেন জলদি। একটু উৎসাহ দিবি, হেল্প করবি না-হয়।” অভি বলল, “থ্যাঙ্কস, তুমি আমার বাবা-মার নির্বুদ্ধিতাটার, অল্পবয়সের খেয়ালটারই শুধু সমালোচনা করেছ বরাবর। কিন্তু তাঁদের চটপট টিঁকে থাকার উপায় শিখে ফেলার ক্ষমতা, চরম দুর্গতিতেও আত্মীয়পরিজনের কাছে গিয়ে না দাঁড়ানোর জেদ এবং নিজেদের পরিস্থিতি নিঃশব্দে সহ্য করে যাওয়ার ক্ষমতা, নিজেদের মধ্যে কোনো ফাটল না জাগিয়ে তোলা এসব নজর করেছ বলে মনে হয় নি আমার। কিন্তু আজ যখন মানলে যে তাঁরাও বুদ্ধিধর তখন ভালো লাগল।” সুরচিতা বলল, “তুই তো আকাশ থেকে পড়িস নি। তোর বাবা-মার মেধাটাই তোর মধ্যে বর্তেছে। হয়তো আত্মসম্মানবোধটাও। কিন্তু মেধার সঙ্গে লাগে ঠিকঠাক করে ভাবতে পারার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা; আবগকে বশ করার ক্ষমতা, আবেগের সংতুলন। সেসব তৈরি হয় পারিপার্শ্বিকের সাথে মেলামেশা থেকে, কোনো একটা উদাহরণ থেকে। ইস্কুলে টিচাররা আর বাড়িতে আপনজনেরা পড়ুয়াদের মধ্যে এইসব ক্ষমতা তৈরি করার চেষ্টা করলে তবে হয়। তোর বাবা-মায়ের বুদ্ধি থাকলেও ওঁদের বিবেচনাটা গড়ে তোলার জন্য কেউ হয়তো ছিলেন না। সেটা তো ওঁদের দোষ নয়। ওঁরা কোথায় জন্মাবেন বা কোন পরিবেশে বেড়ে উঠবেন সেটা ওঁরা ঠিক করেন নি। তবু তোর ব্যাপারে ওঁরা খুবই যত্নবান ছিলেন। এতটা আমি বুঝতাম না যদি না এখানে আসতাম।” অভি বলল, “মানে? এখানে তোমার সেই বুদ্ধিমতী ছাত্রীর ইলোপ করার পরে বুঝেছ?” সুরচিতা বলল, “হ্যাঁ তার আগে তো সবার মতো ভেবে নিয়েছিলাম এরা এরকমই, মাথায় বুদ্ধি নাকি পোস্তদানার মতো আর রগচটা। আমার একজন কলিগ, ভুপেনজা আর ব্যাঙ্ক ম্যানেজার মিস্টার দাসাং বা টেলিফোন কেন্দ্রের কর্মী ফুংহোজা ব্যতিক্রম বলেই জানতাম। অঞ্জনাকেও সেই ব্যতিক্রমের দলেই রেখেছিলাম। ফের সে মেয়ে ইলোপ করতে আমার মনে হলো ব্যাপারটা এতো সহজ নয়। অঞ্জনা মিশনের ছাত্রী। বাবার হোটেল আছে দু-তিনটে। তাহলে আর্থসামাজিক পরিবেশ নয়, বয়ঃসন্ধির অচেনা উত্তেজনা, শরীর, মনই কী কারণ? কিন্তু যে অঙ্কে একশো পায়, ক্লাসে প্রথম তিনে থাকে, তারও এমন দুর্মতি, চঞ্চলতা বা প্রবৃত্তির কাছে সমর্পণ কেন? খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম যে ওর কম্পিটিটরদের বাবা-মায়েরা বিবেচক। কিন্তু ওর বাবা-মা বেশ অবিবেচক। দুজনেরই স্খলন অনেক। তিনপাহাড়ি অরফ্যানেজ বা আমাদের মিশনের গুহামন্দিরে ওঁদের দুজনেরই একটি দুটি সন্তান জায়গা পেয়েছিল ওঁদের সেই বয়সে যে বয়সে ওঁরা নিজেরাই নিজেদের জীবনযাপনের দায়িত্ব নেওয়ার উপযুক্ত ছিলেন না। বলাবাহুল্য, অঞ্জনার মায়ের সেই সব সন্তানের বাবা আর অঞ্জনার বাবা একলোক নন, আর অঞ্জনার বাবার সেই সব সন্তানদের মা-ও অঞ্জনার মা নন। অঞ্জনার ঠাকুর্দা আর দাদামশায় দুজনেই ব্যবসাদার আর খাতায় কলমে এক সন্তানের পিতা। তাঁদের একমাত্র উত্তরসূরী যে সন্তান সেই সন্তানকে তাঁরা কখনও তাড়িয়ে দেন নি। তাছাড়া এঁদের সামাজিক রীতিই হলো পাত্র-পাত্রীকে ইলোপ করতে হবে, তারপর পারিবারিক সমঝোতা হবে, তারপর দুজনে ফিরে আসবে পরিবারে ধুমধাম করে। পারিবারিক সমঝোতা না হলে বা ইস্কুল পেরোবার আগে বাড়ি ছাড়লে, যা হয়, প্রথম মোহটুকু কেটে গেলে পেটের টান বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। রোজগারের চেষ্টা দেখতে হয়। ততোদিনে হয়তো সংসার বাড়ার সম্ভাবনাও দেখা দেয়। অমনি দুজনের সহ্যশক্তির টানাপোড়েন তৈরি হয়। তারপর একদিন সব ঝামেলা ঝঞ্ঝাট এড়াতে ছেলেটা মেয়েটাকে ফেলে চলে যায়। আর মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে আসে।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু চুপ করে গেল সুরচিতা। তারপর আবার শুরু করল, “মেয়েটার বাচ্চাটাকে প্রথমে মায়ের পেটেই মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তাহলে মেয়েটা আবার পুনর্বিবাহযোগ্য হয়, না হলে বাড়ির লোকের গলার কাঁটা হয়ে যাবে। সে উপায় না থাকলে তিনপাহাড়ির আশ্রম বা গুহামন্দির তো আছেই। তবে অঞ্জনার এত ঝঞ্ঝাট হয় নি বলেই জানি। মেয়েটার না ছিল কাঁচা পয়সা যোগানের অভাব, না ছিল ভাগীদার কোনো ভাইবোন। পারিবারিক সাচ্ছল্য, দায়িত্ববোধের অভাব, অবিবেচনা, সামাজিক রীতি সবের প্রভাবে মেয়েটা পালিয়ে গেল প্রথম প্রেমিকের সাথে। মিশনে ফিরল তিনবছর পর।” অভি গলায় দ্বিধা নিয়ে বলল, “এই যে এদের পড়াশোনার খেয়াল রাখার নামে এদের কন্ট্রাসেপটিভে অভ্যস্ত করছ, সেটা এদের বাড়ির লোক জানতে পারলে--” সুরচিতা কথা কেড়ে নিল, “মিশনের ছাত্রীদের আমি কনট্রাসেপ্টিভ যোগাই না। ওদের জ্ঞান দিয়ে ছেড়ে দি। প্রেম ভালোবাসা প্রাকৃতিক ঘটনা। তার পরিণামের দায়িত্বভাগ পুরুষ নিতে না চাইলে নারীর একার ঘাড়ে এসে পড়ে। সন্তান জন্মের আগে থেকেই মা শরীরের অংশ হিসেবে সন্তানকে বহন করেন। সন্তানের মায়ের পরিচয় সন্তানের জন্মের আগে থেকেই সমাজ জেনে যায়। অপরদিকে পুরুষের শরীরই পুরুষকে সুযোগ করে দিয়েছে সন্তানের দায় অস্বীকার করার। তাহলে নারী নিজে স্বাধীন ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার আগে যদি সন্তানের মতো দুরূহ দায়িত্বের ঝুঁকি না নেয়, তাতে নারীরই লাভ। এই যুক্তিটা গ্রহণ করতে পারলে, মিশনের মেয়েদের দরকার পড়লে ওরা পকেটমানি থেকে কিনে নেয় কন্ট্রাসেপ্টিভ, আমার থেকে বা মিশনের ডাক্তারের থেকে অকপটে ব্র্যান্ড জেনে নেয়। আর পঞ্চায়েত স্কুলের মেয়েরা হেলথ সেন্টারে যায়। না পেলে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাই দোকানে, ও কেনে আমি ফান্ড করি। এসবের জন্যে প্রেসক্রিপশন যোগান মিশনের ডাক্তারবাবু বা বাজারের রোমা ডাক্তারনি। ওঁদের সাপোর্ট না পেলে ইস্কুলপড়ুয়া মেয়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতার ওয়ার্কশপের নামে অনভিপ্রেত সন্তানসম্ভাবনা এড়ানোর উপায় বাতলানোর কাজটা আমি করতেই পারতাম না।” একটু থেমে কী যেন ভাবল সুরচিতা, ফের বলল, “তাও ঝামেলা আছে। কারণ ইলোপ করার পর তারা না পায় প্রেসক্রিপশন, না পায় ডাক্তার। ভরসা শুধু সঙ্গে থাকা টাকাপয়সা, থাকলে ব্যবস্থা করতে পারে মেয়েগুলো, আর ফুরোলে ফিরে আসে। তবে অপেক্ষাকৃত গরীব মেয়েগুলোর সমস্যাই এটা যে ওরা প্রেগনেন্সি নিয়ে ফেরে। আপাতত কাজ চলছে ওরা যাতে অন্তত আমাদের জানায় ওদের রিলেশনশিপ তৈরি হলে আর রোমা ওদেরকে পিলের বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে পারেন তখনই। তারপর গায়েব হোক আর না হোক। ওদের আর্থিক ক্ষমতা না এলে...।”

    অভি বলল, “তুমি এখান থেকে চলে গেলে তখন?” সুরচিতা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়েই বলল, “সে কথা কাল হবে। আজ এখন খাব আর ঘুমোব। কাল ভোর চারটের সময় উপাসনাকেন্দ্রের পাড়াজাগানিয়ে ঘন্টা বাজবে। উঠে পড়ব। ছটার সময় রুবিনজা ওমনি নিয়ে আসবে। বেরিয়ে পড়ব।” অভি বলল, “এই রাত নটার সময় খেয়ে ঘুমোতে যেতে হবে?” সুরচিতা মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করতে দিল। অভি আবার বলল, “কাল যাচ্ছি কোথায়?” সুরচিতা বলল, “সে অনেক দূর। ক্যামেরা এনেছিস?” অভি সাড়া দিল না। সুরচিতা বলল আবার, “তাহলে চার্জ দিয়ে নিস।”

    খাওয়ার পরে অভিকে একটা স্নোজ্যাকেট আর মোজা, গ্লাভস এসব পরে দেখে নিতে দিল সুরচিতা। অভি বলল, “এগুলো বেশ কাজের জিনিস, সু।” সুরচিতা বলল, “হুঁ। গ্লাভস, মোজা সব তোর ব্যাগে পুরে নিস।” ওগুলো ব্যাগে রেখে অভি একটা পারফিউমের বোতল বার করে সুরচিতাকে দিল। সুরচিতা বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ-উ। আজকালে তার মানে শপিং মলে যাচ্ছিস।” অভি বলল, “ছাত্রাবস্থাতেও গেছি। তবে কিনিনি কিছু। সব দেখতে হয়, না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়।” সুরচিতা বলল, “বটে! বেশ বোধোদয় হয়েছে দেখছি।”

    সুরচিতা শোওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এলো। পেছন পেছন অভিও এলো। সুরচিতা বলল, “যা-আ ঘুমিয়ে পড়।” অভি বলল, “তুমি এখানে ঘুমোবে?” সুরচিতা বলল, “বটে।”

    সকালে রুবিনজার ওমনি ওদের বেসক্যাম্প জংলাবসতিতে ছেড়ে দিল। ওরা চড়তে শুরু করল শৃঙ্গের দিকে। সারা দিন ধরে যেতে যেতে অভির একটাই কথা, “এতো উঁচু পাহাড়ের মাথায় এরকম পুকুর আর মিডো কক্ষণো দেখি নি!” কতো ছবি যে তুলল তার ঠিক নেই। সুরচিতা বুঝিয়ে পারে না ফেরা পর্যন্ত ইলেক্ট্রিসিটির সাথে মোলাকাত হবে না। অতএব যখন তখন ছবি আর ভিডিও তুলে ব্যাটারি খরচ করা চলবে না। দুয়েক জায়গায় ওরা দাঁড়িয়ে চা, কোলড্রিঙ্ক খেল। এটা সেটা কিনল। দুপুরের আগে হিংরু নামে গ্রামটায় পৌঁছতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু অভিকে সে কথা বোঝায় কে।

    ঘুরেফিরে সেই প্রশ্ন এলো, “তুমি মিশন ছেড়ে গেলে প্রজেক্টের কী হবে?” সুরচিতা অভিকে বলল, “আমি মিশন ছেড়ে যাব কেন?” অভি দম নিতে নিতে বলল, “আমরা কী কখনও একসাথে থাকব না?” সুরচিতা বলল, “না”। অভি থমকে গেল। কিন্তু সুরচিতা তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। রংপুকুর দেখে অবশ্য কথারা আবার পুকুর, খাদ, পাহাড় আর উপত্যকায় ফিরে গেল। আন্তর্জাতিক সীমা এড়িয়ে সরকারি নার্সারির মধ্যে দিয়ে কখনও জঙ্গলের বুনো গন্ধের মধ্যে দিয়ে, কখনও ন্যাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে চলা মেঠো রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে দেখা হতে লাগল নানা অভিযাত্রীদলের সাথে। অসংখ্য চূড়াওয়ালা বেঁটে মন্দির হাঁটু মুড়ে বসে যেন প্রার্থনা করছে নৈঃশব্দ আর নির্জনতা। সেই মন্দিরগুলোকে ঘিরে রেখেছে জাগরুক পাহারাদারের মতো মন্ত্রমাখা পতাকার ঝাঁক। কোথাও সে পতাকার রং উজ্জ্বল নীল হলুদ, কোথাও ঘোলাটে সাদা। তারপর মেঘেরা যখন কুয়াশার মতো ঘিরে ধরতে লাগল, জ্যাকেটের গায়ে বিন্দু বিন্দু জমে ওঠা জলের কণা মুহূর্ত পরেই সপসপে করে গেল জ্যাকেট তখন বোঝা গেল হিংরু এসে গেছে। এই সময় হঠাৎ মেঘ সব জল হয়ে ঝরে গেল বা জোরালো হাওয়ায় উড়ে গেল। রাস্তার ধার বরাবর খাড়া নেমে যাওয়া উপত্যকায় ফুলন্ত রডোডেনড্রন বন যেন সবে স্নান সেরে দাঁড়িয়েছে রোদে। তার গা থেকে ঝরে পড়া জলে, গায়ে লেগে থাকা জলে ঠিকরে পড়া রোদ পুরো উপত্যকাকে রূপসী করে তুলেছে। তাদের ফুলপাতার ঠাসাঠাসি বুনোট দেখে মনে হয় যেন কেউ ধানগমের মতো রডোডেনড্রন চাষ করেছে উপত্যকাময়। মুগ্ধতা কাটিয়ে জ্যাকেটের গভীর থেকে ক্যামেরা বার করে ছবি তোলার প্রস্তুতি নিতে নিতে উপত্যকার আধখানা ঢেকে গেল নিচে থেকে হু হু করে ছুটে আসা মেঘের লেপের নিচে। ক্যামেরার লেন্স বন্ধ করা মাত্র হয়ে গেল আরেক প্রস্থ ধারাস্নান।

    অবশেষে হিংরুতে ভাত ডাল বাঁধাকপি দিয়ে লাঞ্চ। তারপর তিন প্রস্থ কম্বলের নিচে ডরমিটরিতে। সুরচিতা পিট্‌ঠু থেকে পত্রিকা বের করে পড়তে লাগল। দিনের আলো থাকতে ঘুমোতে পারবে না সে। আর করতে লাগল পায়ের পাতার ব্যায়াম। অভি ঘুমিয়ে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই। বিকেলের চা এলো। অভিকে জাগালো সুরচিতা। খিদে মিটল মাংসে পুর দিয়ে বানানো পুলি পিঠে আর নুডলের সুপ খেয়ে। সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে একটা জলন্ত বাতি দিয়ে গেলেন ডর্মিটরির মালকিন এক দিদি। সঙ্গে আরেকটা মোমবাতি। সুরচিতার বালিশের পাশে একটা সার্চলাইট রাখা ছিল। সুরচিতা বাতিটা নিভিয়ে দিল ফুঁ দিয়ে। অভি বলল, “এখন কী অন্ধকারে থাকব নাকি?” সুরচিতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল, “তোর ভয় করছে নাকি? স্থানীয় লোকেরা অবশ্য কেবল ভূত দেখে সন্ধে হলেই।” অভি বলল, “যাহ্‌, অন্ধকারে বিরক্ত লাগে। তোমার কাছে লাইটার আছে?” সুরচিতা বলল, “আছে। টয়লেট গেলে সার্চলাইট নিয়ে যাবি। বাতি জ্বালাবো ঘরে খেতে দিলে। কারণ এখন বাতি জ্বেলে ফুরিয়ে ফেললে তখন যদি বলে ওদের আর বাতি নেই? তাছাড়া ঘরে কার্বন মনোক্সাইড জমা হবে। তাই আলো নিভিয়ে রাখাই রেওয়াজ এখানে।” অভি বলল, “বলিহারি, অ্যাডভেঞ্চার। দামটাও সস্তা। সার্ভিসটাও ঘাটিয়া।” সুরচিতা বলল, “সেই জন্যই এখানে মেয়েরা আসে দল বেধে, অন্তাক্ষরী খেলে। আর ছেলেরা নেশা করে পড়ে থাকে বা টর্চের আলোয় তাস খেলে।” অভি বলল, “আমাদের তো অনেক কথা আছে। আমরা নাহয় সেগুলোই বলি।” সুরচিতা বলল, “বলো।” তারপর ঢক ঢক করে কিছু আওয়াজ হলো। সুরচিতার হাঁটুর ওপর হাতড়াতে লাগল অভির হাত। সুরচিতা অভির হাত ধরে ফেলল। অভি গলা সাফ করে বলল, “প্রিয়ে আমাকে বিয়ে করবে?” সুরচিতা বলল, “না।” অভি বলল, “ঠাট্টা হচ্ছে?” সুরচিতা সুর করে বলল, “না-আ।” অভি বলল, “কেন?” সুরচিতা বলল, “বলেছিস কাউকে তুই আমাকে বিয়ে করতে চাস?” অভি বলল, “না। তুমি রাজি না হলে অন্য কাউকে কী করে বলব? তাছাড়া আমার কোনো সন্দেহই ছিল না মনে আমাদের প্রেম নিয়ে। যাদের সন্দেহ থাকে তারা অন্যলোকের সাথে আলোচনা করে। আমি ভাবলাম তুমি আমার অপেক্ষায় এতো দিন আছো, তাই বাড়ি নয় আমার প্রায়োরিটির টপে ছিল আমাদের বিয়ে।” সুরচিতা বলল, “আস্তে কথা বল। এখানে সবাই বাংলা বোঝে।” তারপর অভি আর কিছু বলছে না দেখে সুরচিতা বলল, “আমাদের প্রেম তো অনেক দিনের। সন্দেহ ছিল না প্রেমের সততা নিয়ে তাও মানি। কিন্তু আমরা তো আগে কথাই বলি নি বিয়ে করব কিনা তাই নিয়ে। তাই না?” অভি বলল, “বলে যাও।” সুরচিতা বলল, “আজ কথা উঠল। আমি আমার মত জানালাম। আমরা পরস্পরের প্রেম সশ্রদ্ধভাবে গ্রহণ আর রক্ষণ করেছি। গোপনীয়তা রেখেছি যথাসম্ভব। বাস্তবে তুই আর আমি ছাড়া একথা কেউ জানেও না। তার ভিত্তিতেই আমি আশা করছি তুই আমার সিদ্ধান্তকে মর্যাদা দিবি।” অভি গম্ভীর গলায় বলল, “যেদিন বুঝেছিলাম তুমি আমার প্রেমে পড়েছ আর লুকোতে চাইছ কিন্তু পারছ না, সেদিন কিন্তু আমি জানতে চাই নি কেন লুকোতে চাইছ। তোমার সাথে দিনের পর দিন মিশে আমি বুঝে গিয়েছিলাম ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেটার ফ্রিতে তোমার টিউশন না নেওয়ার সিদ্ধান্তটা তুমি সম্মান করেছ। তারপর বুঝেছিলাম যে আমার সাথে মিশে আমাকে তোমার ভালো লেগেছিল শুধু আমার স্বভাব, মেধা, ব্যক্তিত্ব নিয়ে সব মিলিয়ে আমি যা ছিলাম সেই জন্যই। আরও মনে হয়েছিল যে তোমার প্রেমটা লুকোতে চাইছিলে যদি আমি তার থেকে তোমাকে ধান্দাবাজ, অপ্রকৃতিস্থ, বদ বা অসুস্থ এসব ভাবি সেইজন্য; কিংবা এই ভেবে যে যদি আমি মনে করি আমার পারিবারিক আর্থিক দৈন্যের সুযোগে তুমি আমাকে ব্যবহার করছ নিজের কোনো ব্যর্থতা থেকে, শূন্যতা পূরণের সাময়িক তাৎক্ষণিক অভিলাষে। কিন্তু ভাবতে পারিনি কারণ তুমি আমাকে কখনও ফ্রি টিউশন দিয়ে উদ্ধার করে দিতে চাও নি। আমরা বন্ধুর মতো মিশেছি। দুজনের যাবতীয় জ্ঞানগম্যি আর অজ্ঞানতা ভাগাভাগি করেছি। ঋদ্ধ হয়েছি সু। আর তুমি যে আমাকে উদ্ধার করে না দিয়ে আমার বন্ধু হয়েছিলে তাই হয়তো একসময় আমিও ভেসে গেছি তোমার প্রেমে। তখন আর নিজের কাছেই কোনো বাধা কোনো আড়াল জরুরি মনে হয় নি। তুমিও কোনো ভান ছাড়াই স্বীকার করেছিলে আমাকে। তাহলে আজ কেন এমন করছ?” সুরচিতা বলল, “আমাদের এসব কথার কোনোটাই আমার অজানা বা অবোধ্য নয় অভি। আমি যখন এখানে এসেছিলাম, তখন বাড়ি থেকে পালানো জরুরি হয়ে উঠেছিল। সকাল বিকেল মায়ের কেবল আমার বিয়ের পরিকল্পনা। দরজাতেও সুপাত্রদের ভার্চুয়াল লাইন দেখাতে লাগল আমাকে মা। অমুকের বোনপো, তমুকের মেজ ছেলে, কার ভাগনা, কার ভাইপো নিজবাটি হলেই হলো; যেমন তেমন চাকুরে হলেই হলো; বাপমায়ের একমাত্র ছেলে হলে তো কোনো কথাই নেই সে রাজপুত্র। শুধু আমি স্বয়ংবরা হলেই হয়। আমি বলতে পারি নি মাকে যে আমার বর পছন্দ করা হয়ে গেছে। তোর সামনে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে পিচ্ছিল ধাপগুলো। আমি তখন তোকে বিয়ে করলে তোর ভবিষ্যৎ চুরমার হয়ে যাতে পারত; তার সাথে সাথে তোর স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন, আমার স্বপ্ন তোকে সম্মানিত হতে দেখার--সে সব ভেঙে যেত। তোর বাবা-মায়ের দুজনকার জীবনের স্বপ্ন আর সম্ভ্রম ফিরে পাওয়ার লড়াই জুড়ে আছে তোর জীবনের ঐ সময়টায়। নিজেদের ঐ বয়সেই ওঁরা সর্বস্ব খুইয়েছিলেন, ধন, মান আপনজন।” একটু থেমে এক ঢোক জল খেল সুরচিতা। তারপর আবার বলতে লাগল, “মাকে যদি সত্যি কথা বলতাম তাহলে পাড়াতুতো বান্ধবীদের কাছে, দিদার বাড়িতে, জেঠুর বাড়িতে গিয়ে ‘তোমাকে ছাড়া কাকেই বা বলি আমার মেয়ের অপকম্মের কথা’ বলে কেঁদে বুক ভাসাতো। সেসব কথা চালাচালি হয়ে তোর বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছতে সময় লাগত না। তারপর ধাড়ি মেয়ের সাথে কচি ছেলের প্রেমের রসালো গল্প বলে কথা। আর যে কী কী হতো তার ঠিক নেই। তোর বাবা-মাকে হয় তো টুকুন রায়রা ধরত, তারপর ধরত আমার বাবা-মাকে, গায়ে পড়ে সালিশি করতে আসত। তারপর আমার একটা ভালো বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগত যাতে তোর সুন্দর ভবিষ্যতের কাঁটাটা ওপড়ানো যায়। না হলে আমাদের সাচ্ছল্যকে শাস্তি দিত তোদের দারিদ্র্যকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার। পুরো সম্পর্কটা তোর আমার ভালো লাগা, বেঁচে থাকা, আনন্দ, উপলব্ধির বলয় থেকে গিয়ে পড়ত সমাজ আর রাজনীতির পাঁকে। ওদের মধ্যস্থতার ওস্তাদিতে আমার বাবা এবং মা-ও মাৎ হয়ে যেত। তোর বাবা-মাকে আরেক প্রস্থ গ্লানিতে নাকানি চোবানি খাওয়ানো হতো। তাই কোনো ঝামেলা না করে আমি পালিয়ে এলাম তিনপাহাড়িতে। শ্যামশরণদার কাছে শুনেছিলাম এখানকার মেয়েদের আর ইস্কুলগুলোর কথা। তাই শ্যামশরণদার সাথে এসে মিশন দেখে ইন্টারভিউ দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে বাড়ি ফিরে যাই। সানসাইন অ্যাকাডেমিতে বলি আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বিদেশে তাই আমাকে যেন ওরা তক্ষুণি ছেড়ে দেয়, দিল্লীতে মাসির বাড়ি যেতে হবে বিয়ের বাজার আর বিয়ে করার জন্য। অন্য চাকরি নিয়ে যাচ্ছি সে কথা ওদের বলি নি কারণ বললে ওরা কম্পেন্সেশন চাইত। তবে শেষ মাসের মাইনেও দেয় নি। বলেছিলাম দিল্লী থেকে ওঁদের নেমতন্নর চিঠি পাঠিয়ে দেব।”

    অভি বলল, “পারোও বটে। কিন্তু এখন কেন বলছ আমাকে বিয়ে করবে না? অন্য কেউ এসেছে তোমার জীবনে?” সুরচিতা হাসল, “ধৃতিকান্ত এসে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, সে প্রস্তাবে আপত্তি জানালাম যেই, সেও একই প্রশ্ন করেছিল।” অভি জানতে চাইল রুদ্ধশ্বাসে, “তাকে কী বলেছিলে?” সুরচিতা, “বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, অন্যকেউ আছে’। অভি ফের প্রশ্ন করল, “তারপর?” সুরচিতা বলল, “তারপর আর কী? সেই অন্য জনটা কে, তার ঠিকুজি কুলুজি চাইতে লাগল। আমি মুখে কুলুপ আঁটলাম। তখন জানতে চাইল বিয়েতে ওকে ডাকব কিনা। আমি বললাম, ‘বিয়েই করব না তো ডাকার কথা আসছে কী করে?’ ধৃতিকান্ত বিরক্তি নিয়ে চলে গেল। যেন আমার গ্রে ম্যাটার পচে দুর্গন্ধ ছাড়ছে...” হাহা করে হাসতে লাগল সুরচিতা। অভিও।

    রাতের খাবার এসে গেল। সে রাতের মতো সব কথা তুলে রেখে দুজনে ঘুমিয়ে পড়ল। দুজনের আশা, কথা যখন শুরু হয়েছে তখন সহমত হওয়ার রাস্তাও বেরোবে। একজন ভাবছিল বিয়েটা হবে। অন্যজন জানত বিয়েটা হবে না।

    পরদিন সকালে পথে বেরিয়ে সূর্যোদয় দেখা গেল। তারপর চলতে চলতে রোদ মাখা শুকনো একটা দিন পাওয়া গেল ক্রমশঃ। সুরচিতাই কথাটা তুলল, “তাহলে বুঝতে পারছিস দুই পরিবারের কাছে ব্যাপারটা কতো বড়ো আঘাত। অন্য কেউ করলে হয়তো ‘বেশ করেছে’ বলার উদারতা আমাদের বাবা-মায়েদের আছে। কিন্তু নিজের সন্তান করলে চুরমার হয়ে যাবে ভেঙে।” “এটা তুমি কখন বুঝলে?”, জানতে চাইল অভি। সুরচিতা বলল, “তিনপাহাড়ি এসে। অঞ্জনা যাওয়ার পর ওর বাবা-মাকে দেখে। ওঁদের কাউন্সেলিং দিতে দিতে। মঠের সন্ন্যাসিনীদের চোখের জল দেখে। তাঁদের প্রার্থনা দেখে।” অভি বলল, “অঞ্জনা যদি বাচ্চা নিয়ে ওঁদের মিশনে আশ্রয় নিত তাহলে তো ওঁদেরই লাভ। ক্রেডিট পেতেন ওঁদের হায়ারার্কিতে, এখানকার কমিউনিটিতেও।” দুদিকে মাথা নেড়ে বলল সুরচিতা, “না। আজকাল মিশনগুলোকে খেটে খেতে হয়। উপরি কিছু হলে দান করতে হয় নবীন মিশনে, বা প্রশাসনের উর্দ্ধমাগে কোনো নির্ধারিত সংস্থায়। আর এখানকার কমিউনিটি ব্যাপারটা ভালো মনে মেনে নিত, না বিষ নজরে দেখত সেটা বলা সহজ নয়। সোশ্যাল মিডিয়া এসে ইস্তক গত দুতিন বছরে মতামত জাহির করার মানে, অন্যকে শোনানোর সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় সব্বাই বেশ স্বমতাবলম্বী স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছে এই পাহাড়েও। তার সাথে আছে ট্র্যাডিশনাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তে নানান মতবাদের পণ্যায়ন। ফলে যথাযথ প্যাকেজিং পেলে যে-কোনো মতবাদ জনমনকে পোট্যাটো চিপস্‌-এর মতোই মুগ্ধ করতে পারে যুক্তিবুদ্ধিকে ছুটি দিয়ে। সাধারণের মানুষের তাই যে-কোনো মতের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যে-কোনো মতের জোরেই দুনিয়া দখল করার সুযোগ এখন অনেক, অনেক বেশি। ফলে মঠের মোকাবিলা আর শুধু একটা সুযোগসন্ধানী রাজনীতিক বা ক্ষমতা দখলের লড়াইতে নামা দুয়েকটা দলের সাথে নেই। সুতরাং শুধু অঞ্জনা নয় যে কোনো মেয়েকেই তার বাচ্চাশুদ্ধু থাকতে দেওয়ার আগে মঠ অনেকগুলো বিষয় তুল্যমূল্য করে।” একটা খাড়া চড়াই শুরু হয়ে যাওয়ায় দুজনেই কথা থামিয়ে দিল।

    বেশ কিছুটা পথ পার হয়ে রাস্তা আবার হালকা চড়াইতে উঠতে শুরু করায় আবার বলতে শুরু করল সুরচিতা, “অঞ্জনা প্রথমে নিজের বাড়িতেই ফিরেছিল। সেখান থেকে চিঠি লিখেছিল আমাকে। কয়েকটা শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল ওর। সেগুলোর চিকিৎসা এগোলে ও একটু সুস্থ হলে মিশনে ফিরতে চেয়েছিল। আমি মহাধ্যক্ষার সাথে কথা বলি। মেয়ে নিজের ইচ্ছেয় ফিরলে এঁদের ক্ষমাধর্মে সহিষ্ণুতাব্রতে তো আটকায় না। তাই অঞ্জনা অনায়াসে ফিরে এসেছিল। তাছাড়া অঞ্জনা বা যে-কোনো মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর টানা একমাস করে সন্ন্যাসিনীরা সবাই মিলে প্রার্থনায় বসতেন। সেসব প্রার্থনায় তাঁরা শুধু চাইতেন মতিচ্ছন্ন মেয়েগুলো যেন ভালো থাকে, যেন সুস্থ থাকে, আনন্দে থাকে, তাদের যেন কোনো বিপদ না হয়। এঁদেরকে শুরুর থেকেই আমি দেখছি বিশ্লেষকের দৃষ্টিভঙ্গীতে, মিশেছি দ্বিধা আর সন্দেহ নিয়ে। এঁদেরকে বোঝার চেষ্টার থেকে অবিশ্বাস করেছি বেশি। কিন্তু সেসব জেনেও ওঁরা আমাকে ডেকে নিয়ে যেতেন অঞ্জনার জন্য প্রার্থনার সময়। কারণ সে আমার বড়ো আদরের ছিল। তাই আমি সে-সময়ে এঁদের কাছে বসে নিজের হতাশা, দুঃখ ভাগ করে নিয়েছি। তখন বুঝেছি যে তাঁদের প্রার্থনাটা বাইরে থেকে দেখলে একটা আচরণমাত্র, কিন্তু আন্তরিক পর্যায়ে সেটা যে মনকে স্থির করার, সহিষ্ণু করার অধ্যবসায়, অনুশীলন, তা চিনে ফেলা যায়।” অভি এসব শুনে যে একসাথে অবাক আর বিরক্ত হচ্ছে সেটা টের পেয়ে চুপ করে গেল সুরচিতা।

    কিন্তু বাকিটা শোনার জন্য অভি উদগ্রীবও হয়ে পড়েছিল। তাই সুরচিতা আবার বলতে লাগল, “অঞ্জনা ফেরার পর তাকে এক্কেবারে একটা নতুন মেয়ের মতো করে গ্রহণ করা হলো। অঞ্জনার পরিবর্তনের জন্য তার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এই নির্মলভাবে গ্রহণ করায় তার অনুতাপের জ্বালাটা চলে গেল। মননে ঋদ্ধ হলো, চরিত্রে সহিষ্ণু হলো, স্বভাবে স্নিগ্ধ হলো, আচরণে শান্ত হলো। বিবেচক হয়ে উঠল। তার মধ্যের তিন বছরে আমি শনিবারের গ্রামসেবা দলে যোগ দিয়েছিলাম। গ্রামে গিয়ে দেখতাম কত কত অঞ্জনা, তাদের না আছে পয়সাওয়ালা মা-বাবা, না আছে মঠের সন্ন্যাসিনীদের মতো সহিষ্ণু সংবেদনশীল পরিজন। তাদের দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে যে আত্মবিশ্বাস লাগবে, যে বিবেচনা লাগবে সে অব্দি পৌঁছোনোর কোনো উপায়ই তাদের নেই। ফলে তাদের ভাঙা মন কিছুতেই বল পায় না। তারা ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকে এক অসীম নরকযন্ত্রণায়। ভরণপোষণের ভরসাটুকু লোপ পেলে নিরক্ষর বা নামমাত্র সাক্ষর মেয়েগুলোর কেউ কেউ কাজ নেয় সমতল শহরের পতিতাপল্লীতে। কেউ কেউ বিদেশ-বিভুঁইতে। পড়াশোনার অভাবটা সুস্থ সমাজজীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র প্রতিবন্ধক নয়। মূল অভাবটা বিকল্প খুঁজে নিতে না পারার অক্ষমতা। জপ-তপে অধ্যবসায় অনুশীলন থাকলেও সেগুলো অস্থিরতা কাটানোর খুব জোরালো কোনো উপায় নয়। নীতিকথা বুঝতে যে বোধ লাগে বা বোঝানোর জন্য অনুশাসনের গণ্ডি ছাপিয়ে যে প্রাঞ্জলতা লাগে তাও নেই দেখলাম। ফলে এসব নীতিকথা গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোকে বিবেচনাও দেয় না; বিকল্প খুঁজতে যে আত্মবিশ্বাস লাগে তাও দেয় না। সব দেখে কেবল মনে হতে লাগল যে প্রার্থনা আসলে নিজেকে ঠকানো, নিজেদের অক্ষমতাকে নিজের ক্রোধ থেকে আড়াল করার কান্না। আমি কোমর বেধে লাগলাম একটা পরিকল্পনা করতে। তার থেকে জন্মালো প্রকল্প। মিশনের ডাক্তার গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার রোমা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। টৌলিং থেকে আর মাঠপুর থেকে দুজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টও আসেন মাসে দুবার করে, বদলা-বদলি সপ্তাহে। এসবের আয়োজনে এক সময় টের পেলাম যে এখানে করার মতো অনেক কাজ আছে। সারাজীবনে আমার শেষ হবে না। কিন্তু এই ব্যস্ততা এই ডুবে থাকা আমাকে মজিয়ে দিয়েছে। এসব ছেড়ে এক্ষুনি যেতে পারব না। গেলে ভীষণ একঘেয়েমি আর মনখারাপ পেয়ে বসবে। তোর তো উপায়ই নেই সব ছেড়ে এক্ষুনি আমার কাছে আসার। আর এসেই বা কী করবি? আমি তো মত্ত আছি আমার খেয়ালে, এখান থেকে পাততাড়ি গুটোতে বাধ্য হলেও আমি যেখানে যাব সেখানে এরকম সর্বগ্রাসী কাজই খুঁজব। চব্বিশ ঘন্টা মেতে থাকার একটা উপলক্ষ খুঁজব। এ একটা ভয়ানক তীব্র নেশা। সত্যি বলতে কী এই নেশার চোটে তোর-আমার বিয়ের কথা, যে সংসারকে মনে মনে সর্বক্ষণ সাজাতাম সেসবের কথা কখন যে ভেসে গেছে টেরও পায় নি। কিছুতেই চার দেওয়াল আর একটা চাকরির মধ্যে নিজের সংসার সাজিয়ে আর মন বসাতে পারব না। তাতে হাঁপিয়ে উঠব, কষ্ট পাব। তখন এতো ভালোবাসার মানুষটাকে সংসারে বেধে নিজের হাঁসফাঁস আর তারও তাই করে ছাড়ব। তাই ভাবলাম তোকে বুঝিয়ে বলি সব। তুই বুঝবি।”

    অভি বলল, “বুঝিয়ে বললে তাই বুঝলাম। কারণটা শুধু আমার মা বা তোমার মায়ের আমাদের বিয়েটা মানতে না পারা নয়, তুমিও আর বিয়ের বাঁধন যে চাও না সেটাই সব থেকে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ।” তারপর যেন খানিকটা নিজের সাথেই কথা বলতে লাগল, “আমার বয়সী ছেলেরা সব্বাই তাদের প্রেমিকাদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে বলে বিয়ে করে ফেলছে চটপট। আর আমি শুধু ভাবছি, তাহলে তোমার বিয়ের বয়স তো কবেই পার হয়ে গেছে। রোজ ভাবি তোমাকে বলি সব ফেলে আমার কাছে চলে এসো। কিন্তু সমস্ত ধার দেনা না-চুকিয়ে কীকরে তোমাকে বলি রোজগারপাতি বন্ধ করে চলে আসতে আমার কাছে! তোমার কাছে আমার দৈন্যের কোনো লজ্জা নেই। কিন্তু তোমাকে অনাদরে রাখতে পারতাম না। তাই আমিও তাড়াহুড়ো করি নি। কিন্তু এইটা সত্যিই বোধ হয় তোমার বয়স পেরিয়ে গেছে। তাই সাংসারিক বাঁধনও বেড়ি লাগছে তোমার। ভালো লাগল এবারও তুমি সোজাসুজি বললে সহজ সত্যিটা। এবার আমি কী করব?” সুরচিতা তখন রাস্তার বাঁপাশে একটা খাদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। সেদিকে তাকিয়ে অভি দেখল ঘাসে ঢাকা একটা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে সাদা কালো মেঘেরা নেমে চলেছে। যেন একটা র‍্যালি, সাজগোজ করে সুরে, ছন্দে, তালে মেঘেদের চলন। রাস্তার দিকে ফিরে সে দেখল ডান দিকের খাড়া ঢালের গায়ে ধসের দাগ। তবু সেই দেওয়ালে ঝুলছে একটা ফুলন্ত ম্যাগনোলিয়া। সে সুরচিতাকে ম্যাগনোলিয়া দেখাবে বলে সুরচিতার কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে দিল। সুরচিতা খুশিতে ঝলমল করে উঠল। তারপর রাস্তার ঢাল বেয়ে নামতে নামতে বলল, “আপাতত সাতাশিমাইল বস্তি এসে গেছে। তুই কী করবি সে কথা আমরা সারা সন্ধে ধরে বসে ঠিক করব।”

    সন্ধেবেলার চা খাওয়া মিটতে অভিই বলল, “বলো আমি কী করব?” সুরচিতা বলল, “প্রেমিকা ছেড়ে গেলে ছেলেরা একগলা মদ খেয়ে বন্ধুদের কাছে ছেড়ে যাওয়া মেয়েটার নামে খুব গালিগালাজ করে শুনেছি। তোর সেরকম কোনো বন্ধু কী নেই?” অভি বলল, “নিশ্চয়ই আছে এমন বলতে পারব না। আমি ক্লাসের সেরা ছাত্র। তাই আমার চারপাশে সহপাঠী বা জুনিয়র ছিল অনেক। কিন্তু ঘনিষ্ঠ কেউ হয় নি। তারা জানে আমি খুবই গভীর জলের মাছ। আমি প্রেমে পড়ি না। মদের আসরে যাই না নিজের গরিবীর অজুহাতে। আর মাতালদের উদ্ধার করি মানবতার ভানে। তারা আমার সাথে মদ কেউ খাবে না। তাছাড়া কেউ বুঝবে না আমাদের ব্যাপারটা বা ভুল বুঝবে ভেবে আমি কখনই কাউকে আমাদের সম্পর্কের কথা বলি নি।” সুরচিতা বলল, “মেয়েরাও জানতে চায় নি?” অভি বলল, “বললাম তো আমি সেরা ছাত্র। পরিচ্ছন্ন। উজ্জ্বল চরিত্র। দরিদ্র ও মেধাবী। সুতরাং ভক্তা নারীর অভাব হয় নি। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা আমি এড়িয়ে গেছি তুমি আছো বলে। আর মেয়েরা ভেবেছে আমি ভালো ছেলে। কিংবা গরিব বলে প্রেম করি না, বা আমার প্রেম করা উচিৎ নয়।” সুরচিতা বলল, “আচ্ছা! তুই ভালো ছেলে। তুই ব্রিলিয়ান্টও। স্টেপজাম্প করতেই পারিস।” অভি বলল, “তার মানে? তুমি পড়াবার সময় স্টেপজাম্প করলে ছাত্র বুঝবে কী করে?” সুরচিতা বলল, “না, স্টেপজাম্প করছি না। মাতলামি, খোয়ারি এসব মিটলে প্রেমিকা ছেড়ে যাওয়া ছেলেটা সাধারণত একটা মেয়ের কাছে যায়। যে মেয়েটার বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না। যে মেয়েটা ছেলেটাকে ভালোবাসে কিন্তু জানলেও ছেলেটা আমল দেয় না কারণ তার অন্য প্রেমিকা আছে। এখন তোর প্রেমিকা ছেড়ে গেছে যখন তখন তোকে এই মেয়েটার কাছে যেতে হবে।” অভি বলল, “যাব। সময় লাগবে। তার আগে সিয়াপুরাতে গিয়ে বাবা-মায়ের থাকার জায়গা ঠিক করতে হবে। বাবা-মাকে একটা ফ্ল্যাট কিনে দিতে হবে। তারপর যাব তার কাছে। তুমি কী মিশনে সন্ন্যাসিনী হবে?”

    সুরচিতা বলল, “নারে, সেও তো বেড়ি। তাছাড়া তেমন সন্ন্যাসিনী এখানে কেউ নেই। এদের উপার্জন সবটা মিশনকে দিয়ে দিতে হয় মিশনে আমৃত্যু ঠাঁই পাওয়ার জন্য। আমার মতো যারা কোয়ালিফায়েড টিচিং স্টাফ তারা পুরো মাইনের টাকা, রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট সব দিয়ে দেবে। যে বাগানে মালির কাজ করে সেও। বদলে দুজনেই একই কাপড় পড়বে। একই রকম খাবে। একই রকম কম্বল পাবে। এই আর কি। যখন গ্রামের কাজটা শুরু করলাম, তখন আমাকে ডেকে মাদার সুপিরিয়র মুচলেখা চেয়েছিল যে আমার কার্যকলাপে মিশন কোনো ভাবে যুক্ত নয় বা আমার কার্যকলাপে মিশন কোনো ভাবে ব্যবহৃত হবে না। সন্ন্যাসিনীরা সব্বাই যেমন স্বেচ্ছায় গ্রামে গিয়ে কাজ করে না, তেমনই স্বেচ্ছায় গ্রামে কাজ করার অধিকারও সন্ন্যাসিনীদের নেই। তখনই বুঝেছিলাম এই সন্ন্যাসটা এদের কেমন চাকরি। চাকরি করে রোজগারের টাকা এমপ্লয়ারকে দান করার লোক আমি নই। তার থেকেও সব্বনেশে কথা হলো নিজের ভাবার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিজে হাতে গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে মিশনে ঢুকতে হলে। ওরকম মরে মরে বাঁচতে আমি রাজি নই।” অভি বলল, “মুচলেখা দিয়েছিলে নাকি?” সুরচিতা বলল, “পাগল! মুচলেখা নিয়ে ও আমাকে মিশনের পাক্কা কনটেনডর ইনস্টিটিউশন বানাতে পারত, পিছনে পলিটিশিয়ান লেলিয়ে প্রজেক্টের বারোটা পাঁচ করতে পারত। সব থেকে বাজে ব্যাপার গ্রামের মেয়েগুলো যে আমার স্পেশাল ক্লাসে দু-পাতা পড়তে শিখছে, দু-ধাপ সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক শিখছে সেটাও বন্ধ হয়ে যেত। তাই আমি মাদারকে বলেছিলাম যে ‘প্রমাণ করুন যে আমি গ্রামে কন্ট্রাসেপটিভ বিলোনোর প্রজেক্ট করছি আপনার এই সন্দেহ সত্যি’।” অভি রহস্য গল্পের পাতা উল্টোবার মতো রুদ্ধশ্বাসে বলল, “তারপর? প্রজেক্টটা চালাচ্ছ কী করে?” সুরচিতা বলল, “গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা একটা রেজিস্টার্ড অ্যাসোসিয়েশন করেছে। আমাকে রেখেছে মেন্টর হিসেবে। রেখেছে ডাক্তারদের আর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের অ্যাডভাইসর হিসেবে। সবই অনারারি পদ।” অভি ফুট কাটল, “তা ভিন্ন উপায় কী? স্পনসরকে তো আর মাইনে দিয়ে পোষা দিয়ে যায় না।” সুরচিতা বলল, “এসএমই বলা যেত। কিন্তু পয়সা কড়ির ব্যাপারটা স্পষ্ট করার জন্যই এমন ব্যবস্থা। না হলে আমরা সবাই ট্যাক্স নিয়ে ঝঞ্ঝাটে পড়তাম।”

    সে রাত কেটে যেতে একটা ভয়ঙ্কর চড়াই ভেঙে দুজনে পৌঁছল একটা চ্যাটালো জায়গায়। যেখান থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় নিচের রাস্তাটা। কিন্তু বোঝা যায় না সেটাতে দুটো রাস্তা এসে মিলেছে না কি সেটা দুভাগ হয়ে গেছে। একটা ল্যান্ড-রোভার গেল রাস্তাটা দিয়ে। দেখে বোঝা গেল একদিক থেকে দেখলে দুটো রাস্তা এসে মিলেছে একটা রাস্তায়; তার উল্টোদিক থেকে দেখলে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে। তারপর রাস্তা বেশ চড়াই। কিন্তু কংক্রিট বাধানো সিঁড়ি করা আছে তার মধ্যে। সে সব সিঁড়ি চড়ার সময় গালে, মাথায়, ঘাড়ে কানে আদর দিয়ে যেতে লাগলো থোকা থোকা রডোডেনড্রন।

    অভি বলল, “তাহলে তুমি আপাতত মাশরুম চাষ করছ?” সুরচিতা বলল, “আমি করছি না। আমি উস্কানি দিচ্ছি। অনুপমা, মিনু, নীলিমা আর তাদের বন্ধুরা করছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সিলভিকালচার ডিভিসন ওদের ট্রেনিং দিচ্ছে আপাতত অ্যাগ্রোনেটে নাইলন আর সুতি বদলে কেমন করে নার্সারি শেডের উষ্ণতা আর আর্দ্রতা বদলাতে হয় তার। সেটা হলে হবে গ্রীন হাউসে অ্যাটোমাইজার আর স্প্রিঙ্কলার দিয়ে আর্দ্রতা মাপার আর জল ছিটিয়ে সেচের কাজ শেখার পর্ব। তারপর ওঁদের লেটার অফ রেকমেন্ডশনের জন্য তদ্বির করতে হবে যেহেতু আধুনিক নার্সারির তরতরিকার ওপর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে কোনো সার্টিফিকেট কোর্স নেই।” অভি প্রশ্ন করল, “তাহলে মিনুরা শিখছে কীকরে এসব ওদের নার্সারিতে?” সুরচিতা দম নিতে দাঁড়িয়ে গেল। বড়ো শ্বাস নিয়ে খানিকক্ষণ বুকে ধরে রেখে ধীরে ধীরে ছাড়ল; শ্বাস নেওয়া আর ছাড়ার প্রক্রিয়া চালাল বার দুই-তিন। তারপর জবাব দিল, “সেও চিঠি লিখে লিখে তদ্বির করে করে তবে হয়েছে। তার জন্য অবশ্য সরকারের অন্য অন্য ডিপার্টমেন্টেও চিঠি লিখতে হয়েছিল। মেয়েদের দেখভালের ডিপার্টমেন্টে তদ্বির করতে হলো এই বলে যে এখানে মেয়েরা পুঁজি চায় না শুধু টেকনিকাল কাজটুকু শিখতে চায় স্বনির্ভর হওয়ার জন্য, দরকার পড়লে ফি দিতেও রাজি তারা। তারপর তো রাজ্যপালের দ্বারস্থ হতে হলো। তাঁর আদেশে তবে ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা হলো। কারণ এরকম ট্রেনিং-এর কোনো নিয়ম ছিল না। তাইতেই ধর কিনা প্রথম পাঁচটা বছর কেটে গেল। এরপর আবার ব্যাঙ্ক থেকে ধার করতে হবে, তার আগে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে।” অভি বলল, “এসব কাজ জলদি হলে আমার কপাল পুড়ত না।” সুরচিতা চমকে বলল, “মানে?” অভি বলল, “তোমার বুড়ো হওয়ার জন্য যতোটা কাজ হলে যথেষ্ট হয় তার থেকে অনেক বেশি কাজ এখানে। তোমার বুড়ো হতে যতো সময় লাগবে তার থেকে অনেক বেশি সময় লাগবে সে সব কাজ হতে। তুমি আটকে গেলে কাজে। আরও অনেকদিন আটকে থাকবে। আর আমার কপাল পুড়ল। ভাবছিলাম বউ তো আমার আছেই, শুধু বিয়েটা করতে বাকি। এখন দেখছি তার কাছে আমার সাথে ঘর করার থেকেও বেশি আকর্ষণীয়, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অনেক অনেক বেশি নেশা ধরানো কিছু আছে।” সুরচিতা মনমরা হয়ে বলল, “আমি জানতাম। তুই দুঃখ পাবি। তোর আর এসব কাজের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। তুই যেখানে ছিলি, তার থেকেও বেশি গভীরে আছিস আজ। আমার বিয়ের প্রয়োজনও নেই, ইচ্ছেও নেই।” তারপর মরা মনকে জাগিয়ে উদাস গলাকে উৎসাহে চুবিয়ে বলল, “কিন্তু বিয়ের ইচ্ছে যখন তোর হয়েছে সেই ইচ্ছেটা মরার আগে একজন বউ খুঁজে বার কর। দেখবি তখন আমাকে বউ হিসেবে না পাওয়ার দুঃখটা আর ততো বাজবে না।” অভি বলল, “সেই; তুমি মাশরুম কোম্পানির পার্টনারশিপ ব্যবসা করো। তাই আমাকে নতুন পার্টনার দেখে নিতে হবে। কিন্তু এতো কিছু থাকতে হঠাৎ মাশরুম ভাবলে কেন?” সুরচিতা অবাক হলো, “তোকে বলিনি, কেন?” অভি দুদিকে মাথা নেড়ে না বলল। সুরচিতা বলল, “আসলে এত ব্যস্ত থাকি আজকাল এসব নিয়ে কতটা বলছি আর কতটা বলছি না মনে রাখতে পারি না।” একটু থেমে আবার বলল, “এখানে যে বিদেশি সন্ন্যাসিনীরা আছেন, এখানে মানে আমাদের মিশনে আর অন্যান্য মিশনে, তারা খুব মাশরুম ভক্ত। ওঁরাই মাশরুম খেতে আর রাঁধতে শিখিয়েছেন আমাকে। ওঁরাই বলেছিলেন যে ওঁদের দেশ শীতপ্রধান হলেও ওঁরা সারা বছর মাশরুম ফলান। এদিকে এদেশের পশ্চিম থেকে এখানে আসা সন্ন্যাসিনী যাঁরা তাঁরাও বিদেশিনীদের মতোই অধিকাংশ চাষির ঘরের মেয়ে। চাষি মানে আমাদের এখানকার মতো নয় যে নিজের আধছটাক জমিতে ধান বোনে কি বোনে না বড়ো চাষির জমিতে জন খাটতে যায়। এরা চাষ বলতে বোঝে আদিগন্ত বাদাম কী তিসি ক্ষেতের বুকে কোকো গাছের স্পটেড প্লান্টেশন। এঁদের সাথেই গালগল্প করে বুঝলাম মাশরুম দিয়েই শুরু করা যায়। তারপর আমার আর পার্টনারদের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করছে কী হবে।” অভি বলল, “তুমি যে এই সব চাপিয়ে না দিয়ে পার্টনারের বিবেচনার ওপর আস্থা রাখছ, ভালো হলে তাতেই হবে, খারাপ হলেও তাতেই হবে। হয় একটা বুদ্ধিমান বিবেচক লিডার তৈরি হবে যে পুরো দলটার মাঝিগিরি করতে পারবে; নয়তো একটা কুচুটে লোকের আখের চিন্তায় তোমাকে তাড়ানোর ষড়যন্ত্র হবে আর পুরো দলটার কাজের দফা-রফা” সুরচিতা হাসল, বলল, “সে তো সব প্রজেক্টের ক্ষেত্রেই সত্যি। তবে এই দলের লোকগুলোর আর্থিক পুঁজিটা ছিনিয়ে নেওয়া গেলেও ওদের অভিজ্ঞতা আর যেটুকু জ্ঞানগম্যি হোলো সেটা কাড়তে পারবে না। তবে যদি আরও বড়ো দুর্যোগ আসে, এই লোকগুলোর জ্ঞানটা, অভিজ্ঞতাটা অন্য কেউ এদের থেকে শিখে নেওয়ার আগেই এদের মরে যেতে হয়... তাহলেই কেবল সবটা জলে যাবে। আমার থাকা না-থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি একটা প্রচেষ্টার অনুঘটক মাত্র।” দম নিয়ে সে আবার বলল, “মেয়েদের মধ্যে কন্ট্রাসেপ্টিভের ব্যবহার শুরু করানো বা বাড়ানোর প্রজেক্টেও একই ব্যাপার। পৃথিবীতে জন্মনিরোধক পাওয়া যায়, কী কী রকম, তাতে শরীরের কী ক্ষতি হয় কী হয় না এসব জ্ঞান আর কোথায় পাওয়া যায় সেই ঠিকানা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া। তারপর কে ব্যবহার করবে আর কে করবে না, কিংবা কে তাতে ষড়যন্ত্রের অভিসন্ধি দেখবে সেটা যার যার ব্যাপার। দুটোর মধ্যে যোগাযোগ একটাই। মাশরুম চাষের প্রজেক্টের ছায়ায় জন্মনিরোধকের প্রজেক্টটা হয়। তাই মাশরুমের প্রজেক্টটা বেঁচে থাকার ওপর নির্ভর করছে অন্য প্রজেক্টটার বাঁচা-মরা। জন্মনিরোধক ব্যবস্থাটা জীবনযাপনের অঙ্গ করে তুলতে গেলে মেয়েগুলোকে পড়াশোনা করে বা না করে রোজগেরে যে হওয়া যায় সেই কথাটা জানাতে হবে এবং রোজগেরে হওয়াটা যে জরুরি সে কথাটাও বোঝাতে হবে। তাই মাশরুম কিংবা সুপুরির চাষ কিংবা দর্জির কাজ বা জারদৌসির আড়ি-সিপ্পি শেখার ব্যবস্থা করা। তাই নতুন কিছু শিখে বা আগে থেকে শেখা কোনো কাজ থেকে রোজগারের ব্যবস্থা যে করা যায় সেটা জানানো, বোঝানো। আর কী শিখলে রোজগারের উপায় হবে সেটা ভাবতে, সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে তোলার চেষ্টা।”

    অভি তার প্রশ্নের পুরো উত্তর এখনও পায় নি। তাই বলল, “কিন্তু জনতা ক্ষমতা পাবে সেটা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো টের পেলে? বা তাদের মুঠোর লোক ধরে রাখার ছকের উল্টো পুরাণ পড়াচ্ছ টের পেলে তারা তো প্রজেক্ট ভেস্তে দেওয়ার সব চেষ্টা করবে। সেগুলো সামলাবার কথা ভেবেছ কিছু?” অভির দূরদর্শিতায় নতুন করে মুগ্ধ হওয়ার কিছু ছিল না সুরচিতার। কিন্তু নিশ্চিন্ত বোধ করল আরেকবার। অভির জন্য, তার নিজের জন্যও, তার নিজের কর্মকুশলতার প্রতি, বুদ্ধির প্রতি তার আস্থা আরেকটু দৃঢ় হলো। উত্তরে সে বলল, “এই রিস্কগুলো ম্যানেজ করতে পারার ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে প্রজেক্টের সাকসেস। ধর কিনা, মেয়েরা যাতে জন্মনিরোধক ব্যবহার করে তার জন্য জিনিসটার উপকারিতার দিকটাকে যত্ন করে তুলে ধরতে হয়, আর অপকার যে কিছু নেই আজকের দিনে সে কথাটা নানা ভাবে প্রচার করে বা এঁদের সাথে তর্ক করে বোঝাতে হয়। এই সব কথা বোঝানোর চেষ্টাটা আমাদের ষড়যন্ত্র কিংবা কোনো আখের গুছোনোর অভিসন্ধি কিনা সেটা বোঝাতে মাদার সুপিরিয়রকে যেভাবে কায়দা করেছি সেটা একটা উপায়। এই উপায়ে যারা প্রজেক্টের সাথে সরাসরি জড়িয়ে নেই কিন্তু প্রজেক্ট সফল হলে তাদের ক্ষমতা কমে যাবে বা চলে যাবে বলে ভয় পাচ্ছে তাদের প্রতিহত করা যায়। আরেকটা উপায় যারা পদ্ধতিটা গ্রহণ করছে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা যাতে সেই সংক্রান্ত সব খবর তাদের পৌঁছে দেওয়া যায়। যাতে তাদের সাথে কোনো আড়াল আবডালের সুযোগ না তৈরি হয়। দু পক্ষ যাতে পরস্পরকে স্পষ্ট আর সোজাসুজি দেখতে পায়। একে অপরকে সোজাসুজি বুঝতে পারে। প্রজেক্টে কোনো কথাবার্তা, তথ্য দেওয়া নেওয়া প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্যকে আহত করছে কিনা সে ব্যাপারে সজাগ থাকা, সেরকম কিছু হলে ক্ষতিকর সব প্রসেসকে বন্ধ করে দিয়ে ক্ষতি নিরূপণ আর নিরাময় করা। কখনও কখনও প্রজেক্টের কর্মীদের পিঠ চাপড়ে স্বার্থে ঘা লাগা গোষ্ঠীগুলো প্রজেক্ট নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে নিজেদের স্বার্থ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করে। সেসব থেকেও প্রজেক্ট বাঁচাতে হয়, ছলে, কৌশলে, প্রচার এড়িয়ে গিয়ে। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে, মাশরুম দিয়ে কন্ট্রাসেপটিভ ঢেকে।”

    অভি জানতে চাইল, “মাশরুম চাষটা কী তোমরা অর্গানিক ফার্মিং হিসেবে দেখাবে?” সুরচিতা একটু ভাবল। তারপর বলল, “আমরা তা ভাবছি না। বলছিও না। তারওপর সারাবছর মাশরুম ফলানোর জন্য যে ভ্যাপসা গুমটানি গরম দরকার তা এখানে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না। আমাদের তো সেটা বানাতে হবে। তো সেই বিচারে আমরা অর্গানিক মাশরুম চাষ করতে পারব না।”

    এবার অভি দাঁড়ালো দম নিতে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “সারা পৃথিবীতে এখন অর্গানিকটাই ফ্যাশন?” সুরচিতা ঝলমলিয়ে উঠল, “ঠিক বলেছিস। ফ্যাশনেবল, বুটিকের কাপড়জামার মতো। তাই দামীও। যে দেশটা জনসংখ্যায় পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর ভূভাগের ক্ষেত্রে সপ্তম, সে দেশের লোককে যথেষ্ট পুষ্টি দিতে উচ্চফলনশীল শস্য, ডাল, সব্জি ছাড়া উপায় নেই রে। ‘পোকা মারা বিষে মরব নাকি সব্জি খেয়ে’ এরকমটা সেই ভাবতে পারে, যে দুবেলা পেট পুরে খেতে পায়। যে পায় না এখনও তার জন্য এখনও অল্প জমিতে বেশি খাবার ফলানোটা জরুরি। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা পেস্টিসাইড দিয়ে ফলানো হাই-ইল্ডিং শস্যের বা সব্জির দাম এখনও খাদক বা ক্রেতার কাছে তুলনামূলক ভাবে কম। চাষের খরচ বেশি, কিন্তু রিটার্নের সম্ভাবনাও বেশি। কিন্তু অর্গানিক চাষ মানে এখানে ফ্রস্টিং-এ, আর সমতলে বন্যায়, সর্বত্র খরায় আর পোকায়, আগাছায় ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফলে অল্প পুঁজিতে করলেও ক্রেতার কাছে ফলনটা যে দরে পৌঁছোয় সেটা এখনও বেশি। বিশ্বাস না হলে যে দেশের দোকানে থরে থরে সব্জি সাজিয়ে খদ্দেরকে বেছে নিতে বলে পছন্দের সব্জি সেখানে গিয়ে পাশাপাশি তাকে রাখা অর্গানিক আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল সব্জির দাম যাচাই করে নে।” অভি তর্ক জারি রাখল, “কিন্তু সস্তা হওয়াটাই যে সব নয়। পেস্টিসাইড আর সারের জন্য যে ক্যান্সার হচ্ছে!” সুরচিতাও নাছোড়, “এমন তর্ক করে ডজনখানেক রাসায়নিককে খলনায়ক বানিয়েছে বটে একদল লোক, তাতে আবার রাষ্ট্রসঙ্ঘের ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অরগ্যানাইজেশনের সিলমোহরও লাগিয়েছে। তাও বছর দশক হলো। কিন্তু এখন যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের অন্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগ্যানাইজেশন জানাচ্ছে যে পৃথিবী জুড়ে ডিডিটির উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার পরের এক দশকে পৃথিবীতে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব কমেছে এমন প্রমাণ সে সংস্থা পায় নি; কিন্তু সেই গত এক দশকেই ম্যালেরিয়ার বা ডেঙ্গির প্রকোপ বেড়েছে উন্নয়নশীল দেশে সে কথাটা সত্যি। তাহলে? আর এসব যুক্তিহীন তর্ক গ্রাহ্য করলে তো মোবাইল ফোনের ব্যবহারও বন্ধ করে দিতে হয়। কারণ সরাসরি কার্যকারণগত যোগাযোগ না বোঝা গেলেও দেখা গেছে যে মোবাইলের ব্যবহার বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ম্যালিগন্যান্ট ব্রেন টিউমারের প্রকোপ।”

    খাড়াই রাস্তার একপাশে কংক্রিটের বাধানো বসার জায়গা পেয়ে দুজনেই বসে পড়ল। হাঁপাতেও লাগল। তখন মাথার ওপর ঘেউ ঘেউ করে একটা কুকুর ডাকতে শুরু করল। ডেকে চলল একটানা। অভি বলল, “তার মানে পৌঁছে গেছি প্রায়, বলো?” সুরচিতা বলল, “মনে হয়। মানুষের বসতি ছাড়া কোথায়ই বা এমন করে পালতু কুকুর ডেকে সাবধান করে বল?” অভি বলল, “কিন্তু তর্কটা এখনও বাকি।” সুরচিতা হাসল, ভঙ্গিটাই যেন বলল, “বেশ তো, তর্ক হোক।” অভি বলল, “বিষ তো বিষই; পোকার জন্য বিষ যা তাতো মানুষের জন্যও বিষ। মানুষের খাবারটা যদি মানুষকেই বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়--” খিলখিল করে হেসে উঠল সুরচিতা। হাসির দমক একটু কমলে বলল, “এতো আবেগে তর্ক দাঁড়ায় নাকি? তুই না বিজ্ঞান পড়েছিস! পার্টস পার মিলিয়নের মতো মাপজোপ ভুলে গেছিস? মানুষের শরীরের রক্তের পরিমাণ আর পোকার দেহরস মানে পোকাদের শরীরের রাসায়নিক বওয়ার জন্য ব্যবস্থায় যে তরল থাকে তার পরিমাণ এই দুইয়ের অনুপাত কতো? একটা রাসায়নিক পরিমাণে যতটা হলে পোকার শরীরে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে মানুষের জন্য বিষক্রিয়া ঘটাতে সেই একই রাসায়নিক অনেক বেশি পরিমাণে লাগে কিনা? ভেবে দেখ আমাদের রক্তে যে কার্বন মনোক্সাইড থাকে সাধারণত তার জন্য আমরা বিষক্রিয়ায় মরি না, কিন্তু বদ্ধ ঘরে সারারাত কেরোসিনের লন্ঠন জ্বললে যতটা কার্বন মনোক্সাইড শরীরে মেশে তাতে ঘরের লোকজন মরে যায়। তাছাড়া সব্জি ধুলে আর খোসা ছাড়ালেই অধিকাংশ পেস্টিসাইড চলে যায়।” এবার অভি হেসে উঠল, “তাহলে শেষ কথাটা কী?” সুরচিতা হাওয়াতে হাতুড়ি ঠুকে ঘোষণা করল, “সুস্বাস্থ্যের মূলে পুষ্টি। অপুষ্টি মানে অস্বাস্থ্য। তাই আগে মানুষ পুষ্ট হোক তবেই তাকে সুস্থ রাখার চেষ্টা সফল হবে।” তারপর মাটির দিকে চোখ নামিয়ে উদাস গলায় বলল, “এখন এখানে আর অন্য উপায় নেই রে।”

    তারপর আবার ছুটে আসা মেঘেদের বুক চিরে গায়ে জলের দানা মাখতে মাখতে দুজনে পৌঁছল চূড়ান্ত লক্ষ্য হিমেল শীর্ষে। সেই একই মেনু লাঞ্চে। তবে এখানে পরিবেশিকা বেশ অল্প বয়স্ক এবং ফ্যাশন সচেতন। তাই তাঁর সাথে ব্যবস্থা করা গেল রাতে রুটি আর ডিম তড়কার। সূর্য থেকে বন্দি করা ইলেক্ট্রিসিটিও পাওয়া গেল। ক্যামেরা চার্জ করার জন্য যথেষ্ট। দুদিন পরে নিয়ন লাইট দেখে মনে হতে লাগল যেন গোপনীয়তার চাদরে বুঝি টান পড়েছে। সেগুলো নিভিয়ে দিয়ে বিকেলের আলোতে জানলার পাশে চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসে দুজনে আবার গল্প জুড়ল।

    অভি বলল, “তোমার আমাজনে যাওয়ার কী হবে?”

    সুরচিতা বলল, “একসময় পাগলের মতো বলতাম না, ‘আমি সব দেখব’, আমাজন, আন্দিজ, রকি, আল্পস, জমাট নর্থ সি আর অরোরা বোরিয়ালিস, দক্ষিণ গঙ্গোত্রী আর অরোরা অস্ট্রেলিস। দেখব হয়তো। জীবন মানে অনন্ত সম্ভাবনা। বাঁধা গতে না ফেলে বহতা নদীর মতো চলতে দিলে হয়তো ঘাটা-আঘাটায় ঠেকতে ঠেকতে পৌঁছে যাব তীর্থে।”

    অভি বলল, “পরে ইচ্ছে হলে সংসার পাতবে?”

    সুরচিতা বলল, “ইচ্ছে হলে নিশ্চয়ই পাতব। কিন্তু ইচ্ছে হলে, তবেই; অনিচ্ছায় নয়।”

    অভি বলল, “আমাকে জানাবে না। তাই না?”

    সুরচিতা বলল, “নিশ্চয়ই না। তুই আমার সবটা অধিকার করে আছিস। তাই ভেবেছিস আমার সাথে চব্বিশ ঘন্টাটা ভাগ করে নিবি। আমি তোর সবটা অধিকার করে আছি। আমি কাউকে এটা ছেড়ে দিতে রাজি নই। অথচ সংসারে আমার রুচি, মতি কিছুই নেই আর এখন। কিন্তু জীবনের নিয়মে ইচ্ছে হলে তুই সংসার করবি যখন, তখন সে সংসারে তোর অংশীদার যে থাকবে সেই তো তার চব্বিশ ঘন্টার ভাগ দেবে তোকে, তোকে পূর্ণ অধিকার করবে। আমার অস্তিত্বের কথা জানলে সে যে দিতেই পারবে না। তাই তো আমাদের ভালোবাসাগুলোকে, প্রেমগুলোকে যথার্থ সম্মান দিয়েই নিজেদেরকে আমরা বিচ্ছিন্ন করে নেব পরস্পরের থেকে। না হলে যে আমরা শান্তি পাব না, স্বস্তি পাব না।”

    অভি স্থির হয়ে বসে শুনল। মানল কিনা বোঝা গেল না। তারপর জানলা দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল বিকেলের আলোয় আলসেমি মাখা মাঠটার দিকে। হয়তো মাঠটা নয়। অন্য কিছু দেখছিল। দূরে, ভূগোলে নয়, সময়ে। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দে বার বার ধরা পড়ছিল ডরমিটরির চালা কাঁপিয়ে দেওয়া ঝড়টা। তারপর একসময় ঝড় মিলিয়ে গেল। আলোটা মরে গিয়ে একটা ছাইরঙা কুয়াশার মতো সন্ধে নামতে লাগল। একটা একটা করে তারা ফুটতে লাগল আকাশে। পরিবেশিকা চা আর চানাচুর নিয়ে এলো। ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল। অভি প্রথম মুখ খুলল, “আর কখনও আমাদের দেখা হবে না, তাই তো?” সুরচিতা একটু সময় নিয়ে উত্তর দিল, “বলতে পারব না। আমি চাই যে তুই আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন কর। ঘর সংসার কর। সেটা হতে গেলে দেখা না হওয়াই ভালো। কোনোরকম যোগাযোগ না রাখাই ভালো। কিন্তু, আমি জানি না, এখান থেকে কাজ বন্ধ করে যদি আমাকে চলে যেতে হয় তাহলে যেখানে গিয়ে পৌঁছোব সেখানে তুই আছিস কিনা। একদম যোগাযোগ না রাখলে তো সেটা জানা সম্ভব নয়। কিন্তু এক্ষুনি সেসব কথা ভাবতে ইচ্ছে করছে না। তুইও এখনও কিছুদিন ব্যস্ত থাকবি বৈষয়িক কারণে। মা-বাবাকে নিয়ে। নেহাৎ দরকার না হলে যোগাযোগ নাই বা করলি। এতদিনে কত ঝামেলা তো আমাকে ছাড়াই সামলে নিয়েছিস, তাই না?” শান্তস্বরে অভি বলল, “তোমার ইচ্ছে মতো তুমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছ। তাতে আমার কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু আমি এরপরের জীবনটা যেভাবে ভেবেছিলাম তাতে তুমি ছিলে। এবার তোমার সিদ্ধান্তের নিরিখে আমাকে ভবিষ্যৎ ভাবতে হবে। আমি তোমাকে কোনো কথা এক্ষুনি দিতে পারব না। কিছু সময় আমারও লাগবে। কিন্তু তৈরি থেকো, সবকিছুর পরে আমি আবারও এসে তোমার সাথে থাকতে চাইতে পারি। বিয়ে কিংবা সংসার না চেয়ে, শুধু তোমার সাথে থাকার জন্য। তৈরি থেকো আবার করে নতুন কিছু ভাবার জন্য।” সুরচিতা অভির দুই হাতের তালু নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “আমি তো নতুনের জন্য সব সময় তৈরি। কিন্তু সেদিন কী করব সে কথা আমিও আজ দিতে পারব না। তুইও সেদিন আবার ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি থাকিস।”

    পরদিন ভোরে ল্যান্ড রোভার ধরে ওরা নেমে এলো হলদুঝোরাতে। তারপর সেখান থেকে চলল ওমনিতে, টৌলিং হয়ে মাঠপুরের রেল জংশনের পথে। সেখান থেকে বিকেলে মা-বাবার কাছে যাওয়ার ট্রেন ধরবে অভি। এবারও সুরচিতা তিনপাহাড়িতে নেমে গেল। তার সামনে এখনও অনেকটা চড়াই পথ। অভির প্রেমে মজে গিয়ে সে যে জগৎ সংসারকে ভালোবেসে ফেলেছে। আপন করে ফেলেছে। অগুণতি সন্ততি সেখানে মূঢ়, ম্লান, মূক জন্মাচ্ছে, বেড়ে উঠছে দিশেহারা। তাদের যতজনকে সম্ভব ততজনকে যে অভির মতো আত্মমর্যাদায় স্বনির্ভরতায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সুরচিতার যে তাদের সেই অধ্যবসায়ের সঙ্গী না হয়ে উপায় নেই।

    (শেষ)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)