• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫৯ | এপ্রিল ২০১৫ | গল্প
    Share
  • পাঁচপক্ষ : সংহিতা মুখোপাধ্যায়



    প্রথমপক্ষ

    এখানে সন্ধে নামে ক্রমে। প্রথমে ঘাসে, তারপর উপাসনা কেন্দ্রের ছাদে, সব শেষে ক্রিপ্টোমেরিয়ার চূড়ায়। স্তরে স্তরে অন্ধকার জমা হয় তলা থেকে ওপরে। জলের মতো। নিজের কোয়ার্টাস্-এর বাগানে দুসারি মাছি গোলাপের মধ্যে বসে একটু একটু করে এভাবে অন্ধকারে ডুবে যেতে ভালো লাগে সুরচিতার। এসময় কিচ্ছুটি না করে গুটিসুটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকতে ভালো লাগে তার।

    তারপর তারারা আকাশে জাগে একে একে। কিংবা জাগে না। আকাশ মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। তারাশুদ্ধু আকাশটা জাগলে ঝাঁপ দেয় সামনের খাদে। নানা রঙের তারার আলোয় সন্ধেটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় ওরা সবাই হাসছে, খেলছে। আর আকাশ ঘুমোলে খাদের কোলের উপত্যকাও কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানে প্রাণ আছে কিনা বোঝার জো থাকে না। এই অনিশ্চিত মেঘ-কুয়াশার খেলায় কিন্তু নিশ্চিত ঘটনা হলো সুরচিতার মায়ের ফোন। সেটা রোজই আসে, সন্ধে নামার পরে।

    আজও এলো। মা জানতে চাইলেন, “আজ রান্না করলি না আছে?” আছে কি নেই জানে না সুরচিতা। কিন্তু বলল, “কালকের ভাত আছে। আজ ডাল করব আর মাছ ভাজব।” এরপর প্রত্যাশিত দুখি দুখি সুরে মা বলবেন, “কেন, একটা ঢেঁড়সের ছেঁচকি কেন করলি না?” সুরচিতা বলবে, “ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো দেখতে হবে মা। এতো হাঙ্গাম করে রান্না করার সময় কই?” মা দুঃখ করবেন, “তোদের ইস্কুলে তো আবার দিদিমণিরও কাজের লোক রাখার নিয়ম নেই। কী দরকার অমন চাকরিতে? অন্য আর ইস্কুল নেই দুনিয়াতে? তারপর আছে যতো বাউণ্ডুলে মেয়েমানুষের মাথায় অঙ্ক ঢোকাবার পাগলামি--” এইখানে সুরচিতা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “এখন রাখছি।” তারপর পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। চালে-ডালে খিচুড়ি চাপিয়ে দেয় বা খাবার কী আছে কী নেই দেখে যা খুশি তাই রেঁধে নেয়। তারপর ক্লাসটেস্টের বা যে কোনো খাতা নিয়ে বসে যায় দেখতে বা কোনো বই পড়তে।

    সুরচিতা একটা মিশনারি ইস্কুলে অঙ্ক শেখায়। মিশনের অনুশাসন অনুযায়ী তাকে মিশনের দেওয়া কোয়ার্টাস্-এ থাকতে হয় এবং গেরস্থালির কাজ নিজে হাতেই করতে হয়। মিশনের আশ্রিতা বা সন্ন্যাসিনী হলে অবশ্য আশ্রমের আবাসনে থাকতে হতো। বদলে মাস-মাইনের পুরোটা মিশনকে দান করে দিতে হতো। মিশনই অথর্বকালের আর পরকালের দায়িত্ব নিত। এখন শুধু ঘরভাড়াটুকু দিতে হয়, আর স্ব-সহায়তার নজির হতে হয় ছাত্রদের এবং সমাজের সামনে। সুরচিতার মা সারা জীবন জেনে এসেছেন যে ঘরের কাজ যদি পয়সার বিনিময়ে লোক দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় তাহলে তিনি যেমন স্বাছন্দ্য পান তেমনই একটা অদক্ষ শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হয়। তিনি আজও মনে করেন যে বাড়িতে কাজের লোক রাখাটাও সমাজসেবা হিসেবে খুব খাটো নয়। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর মেয়ের স্পষ্ট কোনো মনোভাবই তিনি কখনও টের পান নি। সুরচিতা নিজেও কখনও বোঝার চেষ্টা করে নি মিশনের মত বা মায়ের মেনে চলা আদর্শের মধ্যে কোনটা ঠিক। আগে তার মনে হতো যে মায়ের নিজস্ব বলে কোনো ধারণা নেই, তাঁর সব মতামতই একটা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বৃহত্তর অভিসন্ধি প্রসূত এবং মা যা কিছু বলেন বা করেন সে সবই সেই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বশীভূত ব্যক্তিত্বে ও সত্তায় তাদের অভিসন্ধি সিদ্ধির যন্ত্র হিসেবে করেন বা বলেন। মিশনে কাজ নেওয়ার পর থেকে তার ধারণা সামান্য বদলেছে। সে এখন মনে করে যে দুর্বল মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করে সমাজের একেকটা অংশে দখল কায়েম রাখতে একেকটা গোষ্ঠী একেক রকম ফিকির করে। তার একটা উদাহরণ একটা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে মায়ের বশ্যতা, আরেকটা উদাহরণ মিশনের বিধি ও ক্রিয়াকলাপ যার একটা মিশনের গ্রামসেবা কর্মসূচি।

    মিশনে কাজ নেওয়ার আগে সুরচিতা বাবা-মায়ের সাথে থাকত। ছাত্র হিসেবে তার সুনাম ছিল। তাই তার কলেজজীবন থেকেই তার কাছে প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়তে আসত। সে যখন বৃত্তি হিসেবে শিক্ষকতাই বেছে নিয়েছিল তখন তার বাবা-মা ভেবেছিলেন যে মেয়ের প্রাইভেট টিউশন কিছু বাড়বে। মেয়ের রোজগারও বাড়বে। কিন্তু তাঁদের সেসব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে সুরচিতা নিজের উদ্বৃত্ত সময় লাগিয়েছিল অভাবী ছেলেমেয়েদের নিখরচায় পড়ানোর কাজে। তবে শুরুতেই পয়সা নিয়ে বাড়িতে পড়ানোটা এক্কেবারে ছেড়ে দেয় নি সে। মিশনের ইস্কুলে চাকরি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে তার প্রাইভেট টিউশন বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ মিশনের অনুশাসন আর তার ভৌগোলিক স্থানান্তরণ। কিন্তু মিশনের গ্রামসেবা কর্মসূচিতে সে নাম লিখিয়েছে চাকরি নেওয়ার বেশ কয়েক বছর পরে।

    মিশনের ইস্কুলে একদল মেয়ে আসে অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে আদব, কায়দা, আচরণ, মনন, চিন্তনে সমাজে নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব হওয়ার জন্য। আরেকদল মেয়ে মূলতঃ মিশনের কুড়িয়ে আনা বা মিশনকে দান করে দেওয়া কপর্দকহীন আশ্রিত, কেউ কেউ অজ্ঞাতকুলশীলও বটে। এই দুদলের মেয়েদের কাছেই পূর্ণবয়সে মিশনের সন্ন্যাসিনী হওয়ার বা মিশনের বেতনভুক কর্মী হওয়ার বা মিশন ছেড়ে যাওয়ার রাস্তা খোলা। বলাবাহুল্য প্রথম দলের মেয়েদের জন্য মিশনের শিক্ষা একটা কেনার মতো পরিষেবা, এবং, দ্বিতীয় দলের জন্য জীবনের চরমতম সৌভাগ্য। অন্তত তাদের সেরকম বোঝাতে মিশনের অনেক রকম চেষ্টা ও ব্যবস্থা আছে। অত্যন্ত অভিপ্রেতভাবেই প্রথম দলের মেয়েরা অবলীলায় মিশন ছেড়ে যায়, যখন খুশি তখন, অপূর্ণবয়সেও, শিক্ষান্তে বা তার আগেই এবং দ্বিতীয় দলের মেয়েরা মিশনের বাইরে বেরোতে সাহস করে না যতক্ষণ না কেউ তাদের হাত ধরে আশ্বস্ত করে যে মিশনের থেকেও বেশি নিরাপত্তা সেই হাতের মুঠোয়, পূর্ণ বা অপূর্ণ বয়সে, শিক্ষান্তে বা তার আগেই। তবে সেই হাতের মুঠো আলগা হলে মেয়েরা যে সবাই আবার মিশনে ফিরে আসে তা নয়। অধিকাংশই নিজের খাত খুঁড়ে চলতে থাকে নিজের মতো। কেউ কেউ ফিরেও আসে। তাদের বশ্যতা হয়ে যায় গভীরতর।

    এই দুদল মেয়ের কেউ কেউ যে হঠাৎ করে মিশন ছেড়ে পালায় সেই পালানোর ঘটনাগুলোকে মিশন এবং স্থানীয় মানুষ কখনও ভাবেন অনভিপ্রেত অধ্যায়, কখনও মেনে নেন দূর্ঘটনা বলে। তবে মিশনের বাইরে ঘটলে যে ঘটনা নেহাৎ স্থানীয় লৌকিক জীবনের যাপনের অংশ বলে ধরা হয় বা তার অবক্ষয় বলে মনে করা হয়, কখনও কখনও সেই ঘটনাই ত্যাগের আদর্শে মহান, নিয়ম শৃঙ্খলায় আঁটসাঁট এবং অনন্য সংস্কৃতির ধারক বাহক বলে নিজেদের দাবি করে যে-মিশন সেখানে ঘটলে, পরম লজ্জার ঘটনা বলেই দেখা হয়, মিশনের মধ্যেও, মিশনের বাইরেও। স্থানীয় মানুষের বুদ্ধিকে যেমন প্রয়োজন তেমন প্রভাবিত করার জন্য উপযুক্ত সময়ে এসব ঘটনাকে মিশনের অজুহাতে এলাকার বাইরে থেকে আসা ভিনদেশি, ভিনভাষী মেয়েমানুষগুলোর বয়ে আনা অপসংস্কৃতি বলে চালানোর চেষ্টাও বিরল নয়। এদিকে মিশনেরও লক্ষ্য স্থানীয় সমাজটাতে প্রতিপত্তি পাওয়া। সেখানকার মানুষগুলোর মনের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া। আবাসিক পালানোটা তাই তাদের কাছে ভয়ঙ্কর দুর্যোগের সামিল, না হলে দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব। তাই এসব দুর্যোগের মোকাবিলা করার জন্য, বিশেষ করে, স্থানীয় মানুষের মনে মিশনের অস্তিত্ব আর কাজ নিয়ে সন্দেহ, অসন্তোষ, ক্ষোভ বা সেসব তৈরি হওয়ার মূল নিড়িয়ে ফেলার চেষ্টায় নিয়মিত আশেপাশের গ্রামগুলোতে যান মিশনের সন্ন্যাসিনীরা। তাঁরা চেষ্টা করেন স্থানীয় ভাষাটা রপ্ত করে আশেপাশের গ্রামের লোকেদের দৈনন্দিন যাপনের সুখাসুখের খবরাখবর রাখার। তাঁরা মনে করেন যে এভাবে তাঁরা মিশনের প্রতিবেশিদের অবিশ্বাস জিতে বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে পারবেন, আশা ভরসার আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন, আর তার ফলে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যাও বাড়াতে পারবেন।

    গ্রামে নানা ধরনের কাজ করে মিশন। তার মধ্যে যেমন আছে রুগীর আর আহতের শুশ্রূষা, ধাত্রীর সেবা, ভূত তাড়ানো, ভূত ছাড়ানো তেমনই আছে আচার বানানোর, সেলাই করার, গরম কাপড় বোনার বা জৈব চাষ করার কৌশল শেখানো, আরও আছে শিশুকিশোরদের পড়াশোনা শেখানোর কাজ আর চরিত্রবিকাশের উদ্যোগ। সুরচিতা যোগ দিয়েছে পড়াশোনা শেখানোর কাজে। শুরুতে চরিত্রবিকাশ ব্যাপারটা কী-কেন এসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু তার ছাত্রদের মতিগতি বুঝতে গিয়ে সে ক্রমে সামিল হয়ে গেছে চরিত্র রূপায়নের উদ্যোগে।

    তার বেশ হাসিই পেত প্রথম প্রথম নামগান শুনিয়ে, জপমালা ধরিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ধার্মিক করে তোলার নামে ধর্মভীরু করে তোলার চেষ্টা দেখে। কিন্তু যত দিন কেটেছে তার কাছে স্পষ্ট হয়েছে এই চেষ্টার মূলে আছে নিতান্ত জান্তব জৈবিক জীবনকে অতিক্রম করে মনুষ্যত্ব অর্জনের এক অধ্যবসায়। কিন্তু জৈবিক প্রক্রিয়ার অমোঘতার সাথে সংঘাতে বেশিরভাগ সময়েই সে অধ্যবসায়ের হার হতে দেখেছে। বার বার অনুশীলন, অধ্যবসায়ের শৃঙ্খলা কাটিয়ে বয়ঃসন্ধির নতুন যৌনাকর্ষণ টেনে নিয়ে গেছে ছেলেমেয়েগুলোকে অকালে প্রাপ্তবয়স্ক দায়িত্বের দিকে, নেহাৎ প্রাকৃতিক খেয়ালে। অপরিণত যৌবন আর অনুদ্‌যাপিত কৈশোরের যুদ্ধে শেষ হয়ে গেছে কিছু জীবন নেহাৎ অল্প বয়সে। কিছু জীবন নড়বড়ে দুর্বল অস্তিত্ব নিয়ে গড়িয়ে গেছে প্রথম ভ্রান্তি থেকে পরবর্তী ভুলে, তার থেকে বৃহত্তর অপরাধের কবলে। কিছু জীবন নড়বড়ে অস্তিত্বে টিঁকে থাকার লড়াইকে করে ফেলেছে ভয়ানক জটিল। কিছু জীবন বঞ্চিত হয়েছে সুস্থ পারিবারিক জীবন থেকে। কিছু জীবন আত্মঘাতী হয়েছে, কিছু হয়েছে সন্তানঘাতী। কিছু সদ্যজাত প্রাণ নিভে গেছে অবহেলায়, পরিত্যাগে।

    একবার কৈশোর যৌবনের এই দ্বন্দ্বে প্রবৃত্তির কাছে বোধের হারটা সুরচিতার কাছে ব্যক্তিগত আঘাত হয়ে উঠেছিল। এই হার তার থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার এক মেধাবী ছাত্রীকে। তার স্বভাবগত প্রতিশোধস্পৃহা থেকে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বোধ আর প্রবৃত্তির লড়াইতে বোধকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সে ছল আর কৌশলের হাত ধরবে। হয়তো ভাবতো না এমন করে। কিন্তু ঘটনার পারম্পর্যে তার মনে পড়ে গিয়েছিল তার নিজের কৈশোরের অসহায়তার কথা, মরিয়া হয়ে প্রতিকার খোঁজার কথা। তার প্রথম যৌবনের ইচ্ছে আর আবেগ অবদমনের কথা। তার জীবনে পাওয়া যাবতীয় যৌনাঘাতের কথা, সেসব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার কথা। তার প্রেমের কথা। সেসব কথার নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণে সে বুঝেছিল যে নিজের আবেগ আর বুদ্ধি দিয়ে যে জগৎ সে বানিয়েছে, সেদিন থেকে তার বর্তমান অবধি, সেটাই তার আর তার সাথে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা নিকটতম মানুষগুলোর জীবনের বর্ম, সামাজিক আক্রমণের প্রতিরোধে, সামাজিক আগ্রাসন থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যও। এর থেকে তার বিশ্বাসও জন্মেছে যে দুর্বুদ্ধি যদি মানুষের আবেগকে উস্কে মানুষের মধ্যে দলাদলি আর দাঙ্গা বাধাতে পারে, তাহলে বুদ্ধি দিয়েই মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বিবেচক আর সংযতও করে তোলা যায়। এই কৌশলের নাম চরিত্র গঠন বা চরিত্রে গিঁট পাকানো--যাই হোক না কেন। সুরচিতা জীবনকে আরও বোধ, আরও বিবেচনা, আরও স্বস্তি, আরও সন্তোষ দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে সেই থেকে। প্রকাশ্যে অঙ্ক শেখালেও, ভেতরে ভেতরে তার কারখানা যুক্তি বোনে ছাত্রদের ভাবনায়, যথাযথ প্রশ্ন করতে আর যুক্তিভিত্তিক উত্তর উপলব্ধি করতে শেখায়, সামাজিক আগ্রাসনের থেকে ব্যক্তি হয়ে টিঁকে থাকতে শেখায়। শুধু তাই নয়। টিঁকে থাকার এই লড়াইতে কী করে হাতের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্র চিনে নিতে হয়, কী করেই বা তা ব্যবহার করতে হয় সে সম্বন্ধেও কাজে লাগার মতো তথ্য ছড়ায়।

    সুরচিতার মা শুধু বাইরের খোলসটার কথাই জানেন। তাঁর মনে হয় যে পড়াশুনায় অনুৎসাহী একদল ছেলেমেয়েকে লেখাপড়ায় তুখোড় করার চেষ্টা করে বাজে সময় নষ্ট করছে তাঁর মেয়ে। তাঁর ধারণা যে সুরচিতা হাজার চেষ্টা করলেও অমনোযোগী ছাত্রদের কিছুতেই কিছু শেখাতে পারবে না। তাঁর মতে এই ভস্মে ঘি-ঢালা পরিশ্রমে সুরচিতা মিশনের উদ্দেশ্যসিদ্ধির একটা যন্ত্র হয়ে উঠেছে মাত্র। বরং ঝকঝকে দু-চারজন ছাত্রকে প্রাইভেট টিউশন দিলে তার সংসার-খরচ আর বাড়িভাড়া উঠে আসত, মাইনেতে হাতই পড়ত না, সেটা জমত ভবিষ্যতের জন্য। কিছু সুনামও বাড়ত তাঁর মেয়ের। তাই তিনি সুরচিতার সপ্তাহান্তের কাজ নিয়ে তাঁর অপছন্দ আর বিরক্তি মাঝে মাঝে ব্যক্ত করে থাকেন। আজ কিন্তু তিনি ভীষণ উত্তেজিত, আহ্লাদিত। এমনটা হয় তখনই যখন তিনি ভাবেন যে তিনি সুরচিতার নিস্তরঙ্গ জীবনে এক ঝলক খুশির তুফান তুলে দিতে চলেছেন। তাই সুরচিতার রান্নার পদাবলী শুনেও তিনি বললেন, “ভালো। কাল বাদ পরশু একটু ভালো করে বাজার করে রাখিস। ভালো করে রান্নাও করিস।” সুরচিতা কৌতুক করে বলল, “তুমি আসবে বুঝি?” মা বললেন, “রক্ষে করো। তোমার অমন হাঁটুভাঙা পাহাড়ের মাথায় আমি আবার যাব? তাও এই চৈত মাসের বৃষ্টির পরে, শীতশীত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায়? তারওপর তোমার আবার আদরের ইস্কুলের কোয়ার্টারখানা পাথুরে গোমড়ামুখো বাড়ি। কতো বছরের শ্যাওলা আর হাঁপানির ব্যামো বাসা করে আছে যেন!” মা থামলেন। হয় কথা হারিয়েছেন, না হলে খেই। না হলে দম, না হলে সাহস। এই বুঝি সমালোচনা অসহ্য হলো বলে মেয়ে তাঁর ফোন কেটে দিল। কিন্তু মেয়ের এসব কথা গায়ে লাগে না। যেদিন সময় থাকে না সেদিন ফোন কেটে দেয়; বা ইচ্ছে করে না পুরোনো রেকর্ড শুনতে সেদিন ফোন কেটে দেয়। কিন্তু আজ মায়ের কথায় ভণিতা আছে। মানে তার পেছনে একটা চমকপ্রদ খবর আছে। বা আপাত চমকপ্রদ খবর আছে। তাই সে বলল, “কিন্ত পরশু দিনটা হঠাৎ বিশেষ রান্নার দিন হতে যাবে কেন?” মা বললেন, “সে তুমি জানবে কী করে? কাউকে তো ফোন নম্বর দাও না। অমন ছায়ার মতো ছাত্র তোমার, তাকেও দাও নি।” সুচরিতার সব রক্ত যেন দুগালে এসে জমা হলো, বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটতে লাগল। গলাটা শুকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু গলা জুড়ে আনন্দ খেলিয়ে বলল, “অভি আসছে, মা?” মা বললেন, “হ্যাঁ। সে ছেলে যে আবার একটা নতুন চাকরি জুটিয়েছে তা তো তোকে বলেইছিলাম। এবার একটু লম্বা ছুটিতে এসেছে। তোর কাছে যাবে কদিনের জন্য। ভালোমন্দ খাওয়াস। আর কোনো সুকর্ম তো তোকে দিয়ে হবে না।” সুরচিতা বলল, “কেন? অভিকে গোরা সাহেবের গরমের রাজধানী দেখাতে পারি।” মা বললেন, “তোর ঢং তুই রাখ। নিজে তো ধিঙ্গি শিরোমণি, ছাত্রকে যে সকাল সকাল সংসারে মন দিতে বলবে তেমন দুরাশা আমি করি না। এবার রাখো।” মা ফোন কখনও রাখেন না। কথা বলতে না ইচ্ছে করলে, সুরচিতাকেই বলেন লাইন ছেড়ে দিতে। মিশনে আসার আগে থেকেই মা-বাবা চাইছিলেন সুরচিতা সংসারী হওয়ার কথা ভাবুক। কিন্তু সুরচিতার যথেষ্ট কারণ ছিল সেসব এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ানোর। সেই হেতু সে ধিঙ্গি শিরোমণি ও মা-বাবার শিরঃপীড়ার কারণ। আজ কিন্তু মায়ের কথায় সুরচিতা মোটেই আহত হলো না। বরং এতদিন পরে অভির দেখা পাবে ভেবে কেমন একটা নতুন অনুভূতিতে একসাথে উদ্দীপিত আর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল যেন।

    আজ পূর্ণিমা নয়। পরশু পূর্ণিমা। তাই তারারা সব অস্পষ্ট। কোনো একটা ক্রিপ্টোমেরিয়ার ডালপাতার ঘেরাটোপ থেকে একটা ইন্ডিয়ান ব্রেনফিভার একটানা ডেকে চলেছে “চো-ও-খ গেলো-ও”, “চো-ও-খ গেলো-ও”, “চো-ও-খ গেলো-ও”- - -। সুরচিতা বাগান থেকে ঘরে এসে টান টান শুয়ে পড়ল খাটে। আজ রাঁধবেও না; খাতাও দেখবে না; বইও পড়বে না। খিদে পেলে? দুধ বিস্কুট খাবে। কিন্তু আজ আর কিচ্ছু না। এতো দিনের অপেক্ষা তার সত্যি হতে চলেছে। যে কিশোরকে সে ছেড়ে এসেছিল তার যৌবনের ফটকে, সে আজ পূর্ণ পৌরুষে প্রেমের দাবি নিয়ে এলো বলে সুরচিতার দরজায়। অবাক সুরচিতা ফিরে দেখতে চাইছিল ফেলে আসা বছর মাস দিন ক্ষণ।

    আর শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল আসন্ন ঝড়-ঝঞ্ঝার জন্য। তবুও মন জুড়ে সেই প্রথম যৌবনের গোধূলির রক্তরাগ; “সে আসছে, সে আসছে--”। মগজ জুড়ে কঠিন পরীক্ষার উত্তেজনা, আর হৃদয় দ্রবীভূত প্রেমের ম্যাগমা স্রোতে। আর মন? তার জন্যই তো এতো জটিলতা--এতো পেয়েও নিঃস্ব থাকার সাধনা, সর্বস্ব সঁপে দিয়ে স্বার্থপরের তকমা নেওয়া; সব দান, সব উপহার গ্রহণ করতে না পারার অক্ষমতায় অহঙ্কারীর পরিচয়ে বাঁচা; লাভ-ক্ষতির হিসেব না করে, জীবনটা যাপন করে যাওয়া; সত্তাকে ভাগ-যোগ-বিয়োগ না করে, তার কয়েকগুণে প্রকাশ করা; যা গেল তার দুঃখ না পেয়ে যা আছে তার আনন্দে মত্ত থাকা।



    প্রত্নপক্ষ

    বাবা যেদিন বলেছিলেন, “মামন, দিলীপের ছেলেটাকে একটু পড়াস তো।” সেদিন সুরচিতা মায়ের কাছে গজগজ করেছিল, “কেন পড়াবো? একটা টিউশনও কি বাবা দেখে দিয়েছে? কলেজের সিনিয়ররা দিয়েছে না হলে মাস্টারমশাইরা; কিংবা আমার রেজাল্ট ভালো, আমি পড়াই ভালো শুনে বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা নিজেরাই এসেছেন। তাঁরা মাস গেলে পয়সা দেন। তাই তুমি আমার ট্রেনের কোয়ার্টার্লি টিকিটের ভাড়া দাও না। আর বাবা ইলেকট্রিক বিলের প্রত্যেক মাসের পয়সা নিয়ে নেয় যেহেতু বাবার বাড়ির ইলেকট্রিসিটি আর বারান্দা ব্যবহার করি টিউশন পড়ানোর জন্য। দিলীপ মানে তো কাগজওয়ালা?” মা তেড়ে এসেছিলেন, “ফের অমন করে কথা বলছিস ঝগড়াটে মেয়ে? বাপ-মা লেখাপড়া না শেখালে এতো হিসেব দেখাতিস কী করে? দিলীপকে বলে কিনা খবরের কাগজওয়ালা! কেন? না ও রবিবারগুলোতে পার্টির কাগজটা বিলি করে। অসভ্য মেয়ে কোথাকার। এই ব্যবহার হবে বলে পেটে ধরেছিলাম তোকে!” সুরচিতাও ফুঁসে উঠেছিল, “সে পার্টির হোক আর ভাটির, সপ্তায় সাতদিন হোক আর একদিন, খবরের কাগজ বিলি করলে তাকে কাগজওয়ালাই বলে। শেখার কথা কী বলছ? কতটা বাস্তব চিন্তা করেছ আমার শিক্ষা নিয়ে? পার্টির শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে তোমরা আমাকে না পড়িয়েছ ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়তে দিয়েছ ইঞ্জিনিয়ারিং, পাছে তোমাদের পার্টির লোকে তোমাদের অপছন্দ করে, আত্মীয়রা মিথ্যুক বলে বা পাড়াপড়শিরা তোমাদের দ্বিচারণ দেখে মুখ বেঁকিয়ে হাসে, গুছিয়ে তোমাদের নিন্দে করে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আমার স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে। আরও বেশি করে ভয়ে; যদি আমি তোমাদের লাগামছাড়া হয়ে যাই আর তাতে তোমাদের এই সব আত্মীয়-বন্ধু-পার্টি-পরিজন যাদের আপনজন বলার ভান করে সাজানো আনন্দে বেঁচে আছো তারাও তোমাদের ত্যাগ করে তোমরা ভণ্ড বলে--”। মা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, “তুই কী চান্স পেয়েছিলি এন্ট্রাসে?” সুরচিতা বলে, “থাকো মফস্বলে; যেখান থেকে হাতখরচের টাকায় রেজাল্ট দেখতে যাওয়ার পথখরচ ছিল না আমার সেদিন। তার ওপর পথখরচের ব্যবস্থা করলাম তো বিপদ-আপদের আশঙ্কায় আমাকে একা যেতে না দেওয়ার ড্রামাবাজি করে সময় মতো রেজাল্ট দেখতে যেতে দাও নি, নিজেরাও দেখে আসো নি। অন্য লোকে নিজের ছেলের রেজাল্ট দেখতে গিয়েছিল, সে তোমাদের অনুরোধ রাখতে আমার রেজাল্টও দেখে আসবে বলেছিল; সে এসে যা বলেছিল সেটাই বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলে; এই অন্য লোকটা কে? না যে তোমার মেয়ের স্কলারশিপের দরখাস্ত জমা দেবে বলে দেয় নি এমন সন্দেহ তোমাদেরও হয়েছিল। বলিহারি তোমাদের মানুষে বিশ্বাস!” মা তখন সুর বদলেছিলেন, “তোর সব ব্যাপারে পুরোনো কথা টেনে আনা--” সুরচিতা বলেছিল, “ঘটনাগুলো ভুলে গেলে দুঃখ লাঘব হয়, কিন্তু তার থেকে পাওয়া শিক্ষাটা ভুলে গেলে আবার একই ঘটনার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তোমাদের চোখে ঠুলি, তোমরা বুদ্ধিকে অস্বীকার করে নির্বোধ আর নির্বিবাদী আদর্শবাদ দেখিয়ে যাও। বাস্তব বুদ্ধিতে যারা বাচ্চা মানুষ করল তাদের নিন্দে করো; তাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর বলো। তোমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে, নিজেদের বিচারে, ভালোমানুষটি থাকো। আমাকে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা কোরো না খবর্দার। তোমার বাচ্চার দায়িত্ব তুমি না নিতে পারলে কে নেবে? সমাজ? পার্টি? আমাকে বঞ্চিত করে পার্টি আর সমাজ পোষণ করে চলেছ আমি কিচ্ছু বলি নি, এবার যে সমাজের আর পার্টির হাবিজাবি লোককে পুষতে আমাকে শোষণ করতে চাইছ! দেব সব ভেঙে, পুড়িয়ে তোমাদের মতো, তোমাদের প্রিয় বিপ্লবী কায়দায়?” মায়ের ধৈর্যের বাধ ভেঙেছিল। হাতের কাছে ডিকশনারিটা ছিল, শব্দজব্দ করছিলেন, সেটা দিয়ে সুরচিতার পিঠে এক ঘা দিয়ে বলেছিলেন, “কী করবি তুই? কী করতে পারিস?” সুরচিতা বলেছিল, “তোমার শাড়িটা দিয়ে তোমার ঘরের পাখা থেকে ঝুলব, হাতের মুঠোয় চিঠিতে লেখা থাকবে তোমাদের গুণপনা।” তারপর মায়ের হাত থেকে খবরের কাগজটা কেড়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে দিয়েছিল। তাকে যে বাবা-মা লাগাম পরিয়ে রাখতে পারেন নি সেটা প্রমাণ করার জন্য তক্ষুনি কিছু একটা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল যে।

    সেদিন রাতে খেতে বসে বাবা বলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ওর ছেলেটার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার দাখিল। পার্টি যদি এসব দেখত তাহলে কি আর তোকে বলতাম পড়াতে?” সুরচিতা কোনো উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছিল বাবার চোখের মধ্যে সরাসরি। বাবা তখন বলেছিলেন, “পার্টি তো ফ্রি স্কুল দেখিয়ে দিয়েছে, সেখানে পড়তে তো পয়সা লাগে না। কিন্তু আঁকার মাস্টারের কাছে টিউশন না নিলে ছেলেরা সব আঁকাতেও ফেল করে। যে-ছেলের বাবা আর্ট কলেজের মাস্টার তার ছেলেও ফেল করে। মাস্টারও পার্টির লোক, মাস গেলে সে সংগঠনকে, দলকে চাঁদা দেয়; দিলীপের থেকে বেশিই দেয় হয়তো। কী করবে দিলীপ? ছেলেটার ক্লাস নাইন। তুই যদি দেখিয়ে দিলে ওর মাধ্যমিকটা উতরে যায়।” সুরচিতা বলেছিল, “আমি দেখালে ও পাশ করবে? জানলে কী করে?” বাবা বলেছিলেন, “ছেলেটা ক্লাসে র‍্যাঙ্ক করে। এতকাল ইস্কুলের মাস্টারের কাছেই পড়তো। তাঁদের কেউ কেউ ওকে এখন বিনাপয়সায় পড়াতেও রাজি; কিন্তু ছেলে পড়বে না।” সুরচিতা একটু অবাক হলো। তারপর ভাবলো সেও তো বাবা-মায়ের অবাধ্য, মত ও পথের বিরোধী। আরেকটা ছেলে তেমন হতেই পারে। কিন্তু বাবা-মায়ের সাথে দরাদরিটা সে ছাড়তে পারবে না। এতো অবিচার, অন্যায়ের শোধ তোলার একটা সুযোগ তার এসেছে; সে ছাড়বে না। তখন বলল, “বেশ ওকে ফ্রি-তে পড়াতে পারি। কিন্তু তোমাকে ফ্রি-তে মহান হতে দেব না।” বাবা বললেন, “বেশ আসছে মাস থেকে ইলেক্ট্রিকের বিল তোমাকে দিতে হবে না।”

    তারপর একদিন সকালে অভি এসেছিলো। সেদিন নাইনের অঙ্কের ক্লাস। ক্লাসের সাথে অভি তাল মেলাতে পারবে কিনা দেখার জন্য সেদিন ওর পরীক্ষা নিয়েছিল সুরচিতা। ছেলেটা একশোয় পঁচানব্বই পেয়েছিল। বিনেপয়সায় বেশি খাটতে হবে না দেখে সুরচিতা খুশি হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন অভি আসে নি। তারপরের দিনও না। এদিকে ইলেক্ট্রিকের বিল এসে গিয়েছিল। সুরচিতা কেঁচে যাওয়া যুদ্ধটার জন্য বেশ খেপে গিয়েছিল। তবু বিলটা দেখে ও একমাসের টাকাটা বাবার টেবিলে রেখে দিয়েছিল।

    সন্ধে পেরিয়ে প্রায় রাত তখন। সুরচিতা খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ছিল। বাবা এসেছিলেন ওর কাছে, ইলেক্ট্রিক বিল বাবদ যে টাকাটা ও বাবার টেবিলে রেখে এসেছিল সেই টাকাটা ওকে ফেরত দেবেন বলে। সুরচিতা বলেছিল, “সে ছোকরা তো আসছে না। অতএব আমাকেও ফোকটে খাটতে হচ্ছে না।” বাবা বলেছিলেন, “সে ছেলের আত্মসম্মান বোধ তীব্র। সে তোর বাকি ছাত্রদের থেকে জেনে গেছে তারা মাইনে দিয়েই পড়ে। তাই ও দিলীপকে বলে দিয়েছে যে ও নিজেই যা পারে তার জন্য টিউটরের দরকার নেই ওর।” সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে আর টাকাটা ফেরত দিচ্ছ কেন?” বাবা বলেছিলেন, “তুই যখন পছন্দ করছিস না এই টাকাটার ব্যাপারটা--” সুরচিতা দুম করে বলেছিল, “দিলীপকাকুর প্রেসটা চলছে না কেন? ফাল্গুনীর সামনের পুরোনো প্রেস তো এখনও ঘটাং ঘটাং করে চলছে?” বাবা খুব দ্বিধা করে বলেছিলেন, “সে অনেক কথা। ফাল্গুনীর প্রেস তো শুধু প্রেস নয়, ওদের মুদিখানা আছে, সিনেমা হলটা আছে, আরও আছে কাপড়ের দোকান। অনেক বড়ো পুঁজি। ওঁরা একটা ব্যবসার টাকা অন্যটায় এনে লাগাতে পারেন। সে কারণেই ওঁরা চটপট ম্যানুয়াল কম্পোজ ছেড়ে কম্পিউটারে কম্পোজ করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ফাল্গুনীর বুড়ো মালিক-–কী যেন নাম--বল না?” সুরচিতা মনে করিয়ে দিয়েছিল বাবাকে, “মণিভূষণ গুঁই।” বাবা আবার ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর আত্মগত কথোপকথনে। সুরচিতাও যেন এক বোয়া কন্সট্রিকটরের গল্প শুনছিল গোগ্রাসে।

    “হ্যাঁ। ওঁর সাথে ওঁর ছেলেরা তো ছিলই এখন আবার মেজছেলের বড়োছেলেটাও কাজকম্ম করছে। ও তো কম্পিউটার শিখেছে, একটা ইন্টারনেট কাফে খুলেছে। ও-ই সব কম্পোজের কাজগুলো করে এখন।” সুরচিতা বোঝার চেষ্টা করছিল যে দিলীপের প্রেস বন্ধ হওয়ার পিছনে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পুরোনো প্রযুক্তির পাঞ্জা লড়াই নাকি সিআইএ বা গুঁই কোম্পানির কোনো ষড়যন্ত্র আছে। তাই ফস্‌ করে বলল, “তো ওরাই কী দিলীপকাকুর প্রেস বন্ধ করার জন্য কিছু করেছে?” বাবা মুচকি হেসে বলেছিলেন, “ওঁদের কিচ্ছু যায় আসে না দিলীপের মতো দু তিনটে লোকের ছাপাখানাতে। মণিবাবুই তো দিলীপের প্রেসটা কিনলেন, কোনো দরাদরি ছাড়াই। দিলীপ তো ওঁদের ওখানেই কাজ শিখেছে। তারপর উনিই গ্যারেন্টার হয়ে দিলীপের লোনের ব্যবস্থা করে ওর প্রেসটা খুলে দিয়েছিলেন। শুরুর দিকে কাজও দিতেন। বিয়ের কার্ড ছাপা, ক্যালেন্ডার, ডাইরি, পরে পরে পাঁজি, শারদীয়ার স্যুভেনির, বই।” সুরচিতার বেশ জটিল লাগছিল এবার। তাই বলে ফেলেছিল, “তাহলে, দিলীপকাকু প্রেসটা চালাতে পারল না কেন?”

    বাবা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর চৌকি থেকে ঝুলে থাকা পা দুটোকে খানিকক্ষণ মন দিয়ে দেখেছিলেন। তারপর পায়ের একটা পাতা অন্য পাতাটায় ঘষতে ঘষতে বলি-কী-না-বলি করে বলে ফেলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসের ঘরটার ব্যবস্থা করার জন্য ওকে কাউন্সিলর টুকুন রায়ের কাছে যাতায়াত করতে হয়েছিল। দিলীপের তখন বছর পঁচিশেক বয়স, টগবগে ছেলে। টুকুনের মনে ধরেছিল ওকে। তারপর ওর চ্যালারাও দিলীপের ওখানে আড্ডা দিতে শুরু করে। সবার মতো দিলীপও নিজের প্রেসে টুকুনদের পার্টির কাগজ রাখতে শুরু করে। তারপর ঘরটা পাইয়ে দিয়েছে বলে টুকুন দিলীপকে বলে ওদের লিফলেট ছাপিয়ে দিতে, ব্যানার বানিয়ে দিতে। তারপর বলে ওদের হয়ে কাগজ বিক্রি করতে।” সুরচিতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রশ্ন তুলেছিল, “করল কেন? না করলে কী হতো?” বাবা নিরুপায় স্বরে বলেছিলেন, “তুই বুঝবি না সে কথা।”

    বুঝবি না বললে তখন বেশ গায়ে লাগত সুরচিতার। ফলে তৎক্ষণাৎ বলেছিল, “বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝব।” বাবা বলেছিলেন, “কারুর কথা--এমন সব কথা--আলোচনা করা ঠিক নয়।” সুরচিতা তর্ক করেছিল, “বেঠিক তখন যখন তুমি পরচর্চায় সুখ পাবে--ধরো কিনা পাড়ার লোকের কাছে এসব কথা বলে নিজের বুদ্ধির বড়াই করবে আর অহঙ্কারে ঝলমলাবে। আমাকে বললে ব্যাপারটা শিক্ষামূলক জীবনীপাঠ হবে।” বাবা একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করেছিলেন, “দিলীপের অল্প বয়স তখন। সংসার করে ফেলেছে ... সংস্থান তো করতে হবে। ঘরটার জন্য টুকুন রায় মধ্যস্ততা করেছিল, না-হলে যে-দরে ও পেয়েছিল ঘরটা সেই দরে পাওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া ঘরটার মালিকানা নিয়েও অস্পষ্টতা ছিল। সব শরিক বা দাবিদারকে চেনাই দায় ছিল, তায় তুষ্ট করা তো দুরূহ কল্পনা। একজনের সাথে রফা হলে আরেকজন এসে বলে ‘আমিও শরিক। সুতরাং আমাকেও সমান টাকা দিতে হবে ঘরটা পেতে হলে।’ স্টেশন রোডের ওপর, বাজারের মধ্যে ব্যবসার জন্য একটা ঘর--বুঝতেই পারছিস অনেক লোকেরই নজর ছিল।” খিক খিক করে হেসে সুরচিতা বলেছিল, “বোঝো, একে বলে দালালির দাম চোকাতে দাসত্ব! এঁরা আবার সমাজের বঞ্চনা বেচে রাজনীতি করেন!” প্রত্যাশিত বিরক্তি প্রকাশ করে বাবা বলেছিলেন, “লেখাপড়া শিখে ভাষার এ কী অবস্থা! কাদের সঙ্গে মেশো আজকাল?”

    সুরচিতা তখন উদ্ধত ছিল, তাই বলেছিল, “যাদের সঙ্গে মিশলে টুকুন রায়কে এড়িয়ে চলা যায় তাদের সাথে। এখনও তো ঝুড়ি থেকে বেড়াল বেরোল না। সেই ঘর ভাড়ার দালালি চোকাতে দিলীপকাকুর ব্যবসা বিকিয়ে গেল নাকি?” বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “একরকম তাই-ই। ওকে কোনোদিনই টুকুন বা পার্টি—কেউই--ছাপার কাজগুলোর পয়সা দেয় নি, টুকুনের জনসেবায় বা পার্টির জনপ্রিয়তা-বর্ধনের কাজে উদ্যোগী স্বনিযুক্ত সফল যুবকের চাঁদা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেসব। তারওপর গত পাঁচবছরে কাগজের বিক্রি বাবদ যা দাম হয়, সবই ওকে একসাথে চোকাতে হলো, নিজের পকেট থেকে।”

    আবার প্রশ্ন করেছিল সুরচিতা, “যেসব লোকে কাগজের দাম দেয় না তাদের কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিলেই তো হতো, তাই না?” বাবা একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “দিয়েছিল। কিন্তু ওর কোটার কাগজ ওকে তুলতে হতো। পার্টির শিক্ষা হচ্ছে যে লোকে দাম না দিলেও কাগজটা লোককে দিতে হবে, তাদেরকে না হলে আদর্শ বোঝানো যাবে কী করে? কী করে তাদের ঠিক-ভুল বাছতে শেখানো যাবে? পার্টির আদর্শ কর্মীকে তাই লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ পৌঁছে দিয়ে জনসেবা করতে হয়, পার্টিকে জনপ্রিয় করার কাজ করতে হয়, পার্টির আদর্শ প্রচার করতে হয়। কিন্তু পার্টির কাগজ আর কেউ পড়তে চাইছে না। যাদের জোর করে কাগজ দিচ্ছে দিলীপ, তারা দাম দিতে চাইছে না। তবুও কিছু কাগজ বিলোচ্ছে ছেলেটা; কিন্তু বেশিরভাগ কাগজই ও আর বিলোচ্ছে না। সেই জন্যই ও বিষ-নজরে পড়েছে। ওকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে যে ও নিয়ম মানছে না বলে ওর ওপরে নেতৃত্ব বিরক্ত। তার মাশুল হিসেবেই পার্টির প্রতি দিলীপের নিষ্ঠার প্রমাণ চাওয়া হলো। ওকে একসাথে পাঁচ বছরের কাগজের দাম চুকিয়ে দিতে বলা হলো। তাই প্রেসটা বেচতে হলো।”

    সুরচিতা বেশ অবাক হলো। রোজগারের একমাত্র উপায় বলতে যে প্রেসটা সেটা বেচে দিলে এতো বড়ো খরচের ধাক্কা দিলীপ চোকাবে কী করে? প্রেসটা থাকলে যা হোক রোজগার হতো। কাগজের দাম বাবদ যদি ধারও করতে হতো সেটাও শোধ করতে পারত সেই রোজগার থেকে। কিন্তু এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না সুরচিতা। সেই কথা সে বাবাকে বলেও ফেলেছিল। বাবা বললেন, “দলের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানে এবার ওকে ভাতে মারার আরও অনেক চেষ্টা হবে, যাতে ও আরও বেশি করে দলের ওপর নির্ভরশীল আর তার ফলে দলের আরও বাধ্য হয়ে পড়ে। সুরোজগারের আত্মবিশ্বাস আর তার ফলে জেগে ওঠা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যাতে ভেঙে পড়ে তার ব্যবস্থা করা হবে--” সুরচিতা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, “মানে?” বাবা একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বললেন, “মানে এরপর কাগজ না তুললে প্রেসে হয়তো ডাকাতি করাবে বা আগুন ধরিয়ে দেবে।” বাবার গলা বুজে এসেছিল ক্ষোভে, দুঃখে।

    সুরচিতা ঝলসে উঠেছিল, “তারপরেও এদের তুমি চাঁদা দাও? তোমার লজ্জা করে না? নিজের রোজগারে ক্রিমিনাল পোষো আর আর নিজের মেয়েকে--” থেমে গিয়েছিল বাবার দুই ভ্রূর মাঝে জমে ওঠা যন্ত্রণা দেখে। তখন বাবা বলেছিলেন, “করে। তাই তো তোর টাকাটা ফেরত দিতে এসেছি। ওদের আমি ছেড়ে দিয়েছি তা বেশ কয়েক বছর হলো। তবু দিলীপের মতো কটা ছেলেকে ছাড়তে পারছি না। হয়তো এই দুর্বল ছেলেগুলোকে দিয়েই ওরা আমাকেও একদিন দুর্বল করতে চাইবে, যদিও আমি ওদের সহমর্মিতা, মধ্যস্থতা, সহৃদয়তার ফাঁদে কখনও পড়ি নি। কিন্তু অনেকেরই দুর্বলতার হদিশ রাখি তো।”

    সুচরিতার সন্দেহ ছিল আরও অনেক, “মণিবাবু আর টুকুন রায়ের কোনো--” বাবা ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “মণিবাবু এ শহরে বনেদী আর টুকুন বেনো জল, ভুঁইফোঁড়। মণিবাবু ছাড়া দিলীপের প্রেস কেনার হিম্মত এ শহরে কোনো লোকের নেই এখনও।” ধাঁধায় পড়ে গেল সুরচিতা, বলল, “তাহলে?” বাবা বললেন, “দিলীপ কাগজ বেচতে পারুক না পারুক, তোলা কাগজের দাম ওকে চুকিয়ে দিতে হবেই। সে জন্য ধার করলেও ওকে শুধতে হোতো। আবার প্রেসটা থাকলে নামে হলেও ওর রোজগার থাকবে, ফলে ওকে চাঁদাও দিতে হবে, দালালিও দিতে হবে, কৃতজ্ঞতার কর্জের মহাজনি সুদ বাবদ কাগজ তুলতেও হবে; বেচা না গেলে বিলোতেও হবে। তার ওপর নেতৃত্বের কুনজরে পড়েছে বলে, ব্যাপার এমন দেখানো হচ্ছে যেন লোকে যে কাগজ নিতে চাইছে না সেটাও দিলীপেরই দোষে বা ওরই উস্কানিতে, যেন ও যথেষ্ট উদ্যম নিয়ে কাগজটার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারছে না। তার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে যেন ও নিজের ব্যবসাটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই মাশুল হিসেবে ধরা হচ্ছে ওর ব্যবসা থেকে করা রোজগারটা। যতোদিন প্রেস থাকবে, ততোদিন পরিবার প্রতিপালনের জন্য আর প্রেসটাকে রাখার জন্য ওকে সময় বা শ্রম দিতেই হবে। তাছাড়া ও ভাবছিল যে এবারে প্রেসের খোলনলচে বদলে সমসাময়িক করে তুলবে ছাপাখানাটা। তাহলে হয়তো ও আর ছোটোখাটো ব্যবসাদার থাকতো না অদূর ভবিষ্যতে। ওর বাড়বৃদ্ধি বা স্বাবলম্বী হওয়ার মূলে যে প্রেসটা! তাই দিলীপের প্রেসের রোজগারটাই নিংড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, হবেও পরে, ওকে দুর্বল করে নিজেদের তাঁবেতে রাখার জন্য। পাঁচ বছরের কাগজের দাম ধার করে চোকালে ওর প্রেসটার খোলনলচে বদলের কাজটা হতোও না; প্রেসটা ধুঁকত, মার খেত ব্যবসা। এখনই প্রযুক্তি বদলেছে; এখনই তার সাথে তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে পিছিয়ে পড়তেই হবে। খদ্দেরের ডিমান্ড আপ-টু-ডেট টেকনোলজি দিয়ে মেটাতে না পারলে খদ্দের অন্য ব্যবসাদারের কাছে চলে যাবে। প্রেসে প্রযুক্তিগত অদলবদলগুলো এখনই না করতে পারলে পরে পারার সম্ভাবনা কম, সংস্থান জোটানোই যে দুঃসাধ্য হয়ে যাবে। তারপরেও যদি বা সুযোগ আসে তখনও যে একইভাবে ও বাধা পাবে না তার নিশ্চয়তা কী? ক্রমশঃ শেষের দিকে এগিয়ে, যুদ্ধটাকে আরও বিধ্বংসী করে তুলে তারপর আত্মসমর্পণ করে নাকাল হওয়ার থেকে ও ভেবেছে আত্মহত্যাই শ্রেয়। তাই প্রেসটা বেচেই দিল ও।”

    বুদ্ধি দিয়ে সুরচিতা বোঝার চেষ্টা করছিল সত্যি নিস্তার কিছু আছে নাকি। ও বেশ দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খেতে খেতে জানতে চাইল, “বাবা, এই বয়সে দিলীপকাকু তো চাকরিও পাবে না, তাহলে এখন ওদের চলবে কী করে?” বাবা ভাঙা গলায় বললেন, “দীপ্তির কাজ আছে। তবে সেটা তেমন জোরালো কিছু নয়। দিলীপের কিছু বাঁধা খদ্দের তো ছিল। সেই কাজগুলো ও ধরবে; মণিবাবুর ওখানে বা অন্য কোথাও, মানে যেখানে সবচেয়ে সস্তায় হবে, সেখানে কাজগুলো করিয়ে তুলে দেবে--” দারুণ ষড়যন্ত্র টের পেয়ে গেছে যেন এমন করে সুরচিতা বলল, “মানে দালালি করবে। চেনা ছকে আরেকটা স্বাধীন ছোট ব্যবসাদারকে দালাল বানানো হলো। রোজগারের পরিমাণের কথা ভাবলে স্পষ্ট দেখা যায় যে ব্যবসাদার থেকে দালাল হয়ে যাওয়া লোকগুলো বেশ গরীব আর দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যবসায় লোকগুলোর আয়ের পরিমাণ অনিশ্চিত ছিল, কিন্তু আয়টা নিয়মিত ছিল। এখন আয়টা যেহেতু অন্য দুটো লোক বা সংস্থা পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা করবে কিনা তার উপর নির্ভরশীল, তাই সেটা অনিয়মিত হয়ে গেল। লোকগুলো বেশ মাজা ভেঙে হাঁটু মুড়ে বসল। এতো তামাম জনসাধারণকে চেটে-চুষে-চিবিয়ে খাওয়ার দুর্ধর্ষ বন্দোবস্ত গো বাবা!” মেয়েকে ছদ্ম মুগ্ধতায় অকপট নিন্দে করতে দেখে হেসে ফেললেন সুরচিতার বাবা, “তবে এই মাজাভাঙা অশক্ত লোকগুলোর ঘাড়ে সমাজ বল আর রাজ্যপাটই বল, সে তো আর শতক ধরে নেত্য করতে পারবে না। দুর্বল লোকগুলো সে বোঝা বইতে পারবে না। খুব শিগগির মুখ থুবড়ে পড়বে। এটাই নিশ্চিন্তির কথা।”

    তখন সুরচিতা যেন হাঁফ ছেঁড়ে বেঁচেছিল নটে গাছ মুড়োতে। আজ জানে যে এরকম নটে গাছের মুড়ো হয় না, সবটাই ধড়; তো মুড়োবে কী! সেদিন অবশ্য বেশ নাটুকে কায়দায় বলেছিল, “তা হলে তো এবার টুকুন রায়দের খপ্পর থেকে মুক্তি আসন্ন, যাক বাঁচা গেল।” বাবা ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি মেখে বলেছিলেন, “দারিদ্র্য বড়ো কঠিন অভিশাপ। তার সাথে যদি অবিমৃষ্যকারিতা যোগ হয় তাহলে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে যায়। দিলীপ যদি ওর ছাত্রী দীপ্তিকে নিয়ে এখানে পালিয়ে না আসত, অন্তত লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি করা অবধি অপেক্ষা করত--তা না, দীপ্তির বাবা নাকি ওকে অন্য লোকের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। এখন দীপ্তির হেল্‌থ সেন্টারের কাজটাও তো ধামা ধরে। নিজেরা জোরালো হওয়ার আগেই জমকালো হয়ে গেল--যাক বাদ দে। আমি আমার মতো করে ভাবছিলাম যদি ওদের ছেলেটাকে ওদের ভুলের মাশুল দেওয়ার জোয়াল থেকে বাঁচানো যায়।”

    সুরচিতার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। এরকম হতো মাঝে মাঝে, যখন বাবাকে ওর বেশ ভিনগ্রহের লাগত। কিন্তু ও তখনও জানত যে অভিকে বাবা ভালোবাসেন কিনা বা অভির জন্য খামকা বাবা কেন ভাবছেন এসব কথা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা উত্তর দিতে পারতেন না। এটাও সত্যি সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিন তার নিজেরও জানা ছিল না। সেই উত্তর সে আজ জানে যে শুধু নিজের ভালো লাগবে বলে, কখনও নিজেকে নিজের খুব খারাপ লাগবে না বলে, বা নিজেই নিজের চোখে হীন হয়ে পড়লে নিজেকে অন্তত একটু ভালো লাগার মতো একটা কীর্তি খুঁজে পাবেন বলেই বাবা অভিকে সহজতর একটা জীবন দিতে চেয়েছিলেন।

    সেদিন অবশ্য সুরচিতা বাবার থেকে টাকাটা ফেরত নেয় নি। বলেছিল, “টাকাটা আমাকে দিতে হবে না। আমার রোজগার বাড়লে পুরো বিলটাই আমি দেব। তোমার এই ব্যবস্থাটা আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। অন্তত আমি বুঝে গেছি যে খেয়ে পরে বাঁচার, এমনকি রোজগার করারও কিছু খরচ আছে।” সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে বাবার মুখে ফুটে উঠেছিল শান্তির হাসি।

    আর সারা রাত সুরচিতা কেঁদে ভাসিয়েছিল। কেন? অভির জন্য। তার নিজের জন্য। কিছুটা দিলীপের জন্য, কিছুটা মণিবাবুর জন্য। দিলীপের শুধু উদ্যমটুকুই ছিল। কিন্তু মণিবাবুর পয়সা আর বনেদীয়ানাও আছে। তবু যে ছকে সক্কলে বাধা পড়েছে তাতে মণিবাবুর ব্যবসাটা চেটে চুষে চিবিয়ে খেতে টুকুনদের বেশি দিন লাগার কথা নয়। প্রত্যেকটা নতুনরকম ব্যবসা যেই শুরু করতে যাবে মণিবাবুর নাতি-নাতনিরা অমনি তাদের জালে ফেলা হবে দিলীপের মতো করে। এইসব ছেলেমেয়েরা নিজেদের পছন্দের দোসর খুঁজে নিলে যদি পারিবারিক অসন্তোষের কারণ দেখা দেয়, তখন টুকুন রায়রা তার মধ্যে নিজেদের জড়াবে। যতগুলো পক্ষ থাকবে এই বিবাদে সব পক্ষকেই মাজা ভেঙে বসাবার জন্য মিথ্যের পর মিথ্যে বলবে। মিষ্টি কথায় কাজ না হলে ভয় দেখাবে। যে মিষ্টি কথায় ভুলে যাবে বা ভয় পাবে তাকেই নিজেদের তাঁবেতে নিয়ে বাকিদের শাসানি আর হুমকি দিতে থাকবে তাদের অপকর্ম খুঁজে বার করে বা নিছক অপকর্মের গুজব ছড়িয়ে।

    সে রাতে সুরচিতার মতো রুক্ষ, উদ্ধত মেয়ে নিজের কাছে নিজেই দূর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল। ভীষণ লজ্জা করছিল সেদিন ওর, নিজের অক্ষমতা দেখে। যত লজ্জা করছিল তাকে ছাপিয়ে উঠেছিল নিয়তির পরিহাসে পাওয়া দুঃখ। নিয়তি মানে মৃত্যু নয়, জন্ম। না হলে অমন তীক্ষ্ণ মেধার ছেলে কেন এমন করে এক অর্বাচীনের ঔরসে আরেক নির্বোধের গর্ভে জন্মাবে আর তার তুচ্ছ জীবনের একান্ত যাপনটা কিছু লোকের জীবনধারণের প্রকোপে অনন্ত নরকযন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে? নিজের শৈশব, কৈশোর উপভোগ করতে পারবে না? কেন? কেন? কেন? ইচ্ছে করছিল টুকুন রায়কে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলতে; নিদেনপক্ষে ওদের কাগজগুলো।

    সেই থেকে নিয়তির সাথে যুদ্ধ শুরু সুরচিতার। জীবন যেমন করে আসে তাকে সেইভাবে না মেনে নিয়ে, তার সাথে পাঞ্জা কষে লড়াই করার শুরু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। আক্ষেপ আর হাহাকার করা ছেড়ে দিয়ে প্রতিকারের খোঁজ শুরু। প্রথমবার, নিজের ইচ্ছেয়।



    প্রাক্‌পক্ষ

    এখন আর সুরচিতার মনে পড়ে না বাবার সাথে কথা বলার কতোদিন পরে কাণ্ডটা সে করেছিল। কিন্তু তারিখটা তার ডাইরির পাতায় নকশা করা আছে। সেদিন কিছু একটা কারণে হঠাৎ ক্লাস বাতিল হয়ে গিয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। ওরকম প্রায়ই হতো, দুদল ইউনিয়নবাজ ছেলেমেয়ের মারপিটে, বা মারকুটেদের শাস্তির প্রতিবাদে বা ওদের কোনো দূ-সম্পর্কীয় বুড়ো নেতা মারা গেলেও। তাই কারণটা খুব বিশেষ ছিল না সুরচিতার কাছে। সেদিন বাড়ি ফিরে সে বোঝা-বোঁচকা সব নামিয়ে প্রায় উড়ে গিয়েছিল সাইকেল নিয়ে। সঙ্গে শুধু ছিল অভির পরীক্ষার খাতাটা।

    ঠিকানা জানা ছিল। কিন্তু বাড়িটা দেখে ভুলভুলাইয়া মনে হয়েছিলো। বাইরে থেকে কড়া ঘুরিয়ে খোলা যায় এরকম একটা জীর্ণ কিন্তু সেগুনের পাল্লা ছিল সদর দরজায়। দরজাটা পনের ইঞ্চি পাঁচিলের গাঁথনিতে ফোটানো, রাস্তা থেকে একধাপ উঁচু সিঁড়ির মাথায়। সেটা পেরিয়ে তিনদিক পনের ইঞ্চি পাঁচিলে ঘেরা উঠোন। উঠোনের মাঝামাঝি তুলসী মঞ্চ; তাতে একটা শুকনো মরো মরো তুলসী গাছ পুরো বাড়িটার জীর্ণ আবহাওয়াটার মুখড়া গাইছে। উঠোনের তিনদিকে উঁচু রক। রক বরাবর অনেকগুলো দরজা জানলা। এখানে ওখানে ছেঁড়া ফাটা পর্দারা ঝুলছে। কোনোটা তার পিছন থেকে আসা পাখার হাওয়ায় দুলছে। আবার কোনোটা টানটান স্থির ঢেকে রাখছে আপ্রাণ তালার ভার। সবচেয়ে সরু দরজাটায় কোনো পর্দা ছিল না, তাই দেখা গেল সেখানে অন্ধকারে উঠে গেছে একটা সিঁড়ি। তার সামনেও রক থেকে দু ধাপ সিঁড়ি নেমেছে উঠোনে। দরজাগুলোতে না ছিল কোনো নম্বর, না কোনো নেমপ্লেট। কী করলে অভিকে খুঁজে পাবে বুঝতে পারছিল না সুরচিতা। হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, আর মাঝে মাঝে পিছন ফিরে দেখছিল রাস্তায় রাখা সাইকেলটাকে।

    সেই সময় একটা পর্দা দুলিয়ে মাঝবয়সী এক মহিলা বেরিয়ে এসেছিলেন। আর তখনই পিছনে একটা পুরুষকন্ঠ গজগজিয়ে উঠেছিল, “কী সব বিবেচনা! দরজার মুখটা জাম করে সাইকেল রাখে......” সুরচিতা পিছন ফিরে দেখেছিল যে সত্যিই পুরুষটি নিজের সাইকেলটা বাড়িটার দরজা পার করে ভেতরে ঢোকাতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছেন। কিন্তু তার থেকেও বেশি জরুরি ছিল মহিলাটির থেকে অভির ঠিকানা জানা। তাই বলেছিল, “শুনছেন?” মহিলা ফিরে তাকিয়ে বলেছিলেন, “আমাকে বলছ?” সুরচিতা বলেছিল, “হ্যাঁ, আপনাকেই। অভিরা মানে দিলীপকাকু কোন ঘরে থাকেন?” মহিলা ঠোঁট উল্টিয়ে বলেছিলেন, “এমনি খাওয়া-শোওয়ার সময় সব দোতলার ঐ কোণের ঘরটাতে থাকে। তা বাদে কত্তা-গিন্নী তো থাকেন না। ছেলেকে তিনতলার চিলেকোঠায় পেতে পারো।” সুরচিতার আর কিছু জানার ছিল না। সদর দিয়ে বেঁকে চুরে ভিতরে আসা পুরুষটিকে কাটিয়ে রাস্তায় নেমে সে তালা খুলে সাইকেলটা তুলেছিল উঠোনে। সেটাকে সদরের একপাশে দেওয়ালে ঠেকিয়ে চাবি দিয়ে রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছিল অন্ধকারে।

    চারপাক খেয়ে যখন ছাদে পৌঁছেছিল তখন হৃদপিণ্ড দবদবিয়ে প্রায় গলায় উঠে এসেছিল। তাও দৌড়ে গিয়ে চিলেকোঠার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল দুমদুম করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে নি। কয়েক মুহূর্ত নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল সুরচিতা। তারপর যেই ভাবছিল যে ফিরে যাওয়াই ভালো, তখনই দরজা খুলে অবাক গলায় অভি জানতে চেয়েছিল, “কাকে চাই?” সুরচিতা খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? আচ্ছা পরীক্ষাটা দিয়ে এলি তার কী হলো জানতেও গেলি না?” অভি কোনো উত্তর দেয় নি। দুই হাতে দরজার দুই পাল্লা ধরে সোজাসুজি তাকিয়ে ছিল সুরচিতার চোখের ভিতরে। সুরচিতার বলেছিল, “আমি সুরচিতা। তুই আমার কাছে অঙ্ক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলি। মনে আছে?” অভি অস্ফুটে বলেছিল, “হুঁ।” সুরচিতাই আবার বলেছিল, “চল ঘরের ভেতরে যাই।” তখন অভি ইতস্তত করে বলেছিল, “ভেতরে খুব গরম।” তবে দরজা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়েছিল। সুরচিতা ঘরের ভেতরে পা রাখতে রাখতে বলেছিল, “গরম তো তুই ছিলিস কী করে ভেতরে?” অভি খুব জোরের সঙ্গে বলেছিল, “আমার অভ্যেস আছে।” সুরচিতা হেসে বলেছিল, “আমার যে অভ্যেস নেই সে কথা তোকে কে বলল?” অভি উত্তর দেয় নি কোনো।

    ঘরের মধ্যে প্লাই দিয়ে বানানো একটা বইয়ের তাক ছাড়া কোনো আসবাব ছিল না। একটা পুরোনো রঙচটা কিন্তু পরিষ্কার মাদুরে একটা নীল ওয়াড় লাগানো বালিশ আর অনেক খাতাবই ছড়ানো ছিল। সুরচিতা মাটিতেই বসে পড়েছিল। অভিও বসতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর দুজনে অনেক কথা হয়েছিল। কেন পঁচানব্বই হলো, কেনই বা একশো হলো না; অভির অঙ্ক ছাড়া আর কী পড়তে ভালো লাগে। প্রিয় লেখক কে; প্রিয় খেলা কী; কোন সাবজেক্টে অভি দুর্বল এবং আরো অনেক কিছু। কথায় কথায় সন্ধের অন্ধকার যখন ঘরের আনাচে-কানাচে জমতে শুরু করেছে, তখন অভি একটা কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বালিয়েছিল। বলেছিল, “মা ফিরলে এক কাপ চা আপনাকে খাওয়াতে পারতাম, কিন্তু--” সুরচিতা বলেছিল, “চা পরে খাবো একদিন, যেদিন তোর বইটা ফেরত দিতে আসব সেদিন। তোর দরকার পড়লে বইটা তুই আনতে পারিস আমার থেকে। রবিবার দুপুরে গেলে আমাকে পাবিই বাড়িতে; বাকি কোনো সময়ের ভরসা নেই।”

    অভি আসে নি সুরচিতাকেই আবার যেতে হয়েছিল। সুরচিতা ওর জন্য একটা বই নিয়ে গিয়েছিল। বইটা নেড়ে চেড়ে অভি ফিরিয়ে দিতে পারে নি। বলেছিল, “এর বদলে তুমি কী চাও?” সুরচিতা বলেছিল, “তোর বইগুলো পড়তে দিস একে একে।” অভি বলেছিল, “এই বইগুলো তুমি পড়ো নি?” সুরচিতার হেসে বলেছিল, “কতো বই, কতো লেখা! সব কী পড়া যায়? তার ওপর ক্লাসিকগুলো একেক বয়সে একেক রকম লাগে। তাছাড়া তোর বয়সী কোনো মেয়ে এইসব বই পড়ে না। কার হাতে কোন বই দেওয়া হবে তা নিয়ে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের বেশ ছেলেদের-বই, মেয়েদের-বই দুই-দুই ভাবনা আছে বলেই মনে হয়েছে আমার। তাই তোর পড়া বা তাকে রাখা সব বই আমার পড়া নয়।” তারপর কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। সুরচিতাকেই আবার মুখ খুলতে হয়েছিল, “বদলে তুইও আমার বই পড়তে পারিস। নাহলে একতরফা বই নিতে নিতে আমার ধার বেড়ে যাবে। তার জন্য তোকে আমার বাড়িতে যেতে হবে, নিজেকে বই বেছে নিতে হবে। তোকে হাতে করে বই এনে দিলে তোর পছন্দের সাথে অবিচার করা হবে। তাই সেটা আমি করতে পারব না। এখন তুই সুযোগ নেওয়ার মতো সাহসী হবি না মুখ্যু থাকবি সেটা তোর ব্যাপার”। আবার সব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। বাইরে একটা ঘুঘু বার দুয়েক ডেকে উঠেছিল। কয়েকটা ছাতারে খ্যাচর খ্যাচর করে উঠেছিল। অভি বলল, “উপকারে আমার দম বেরিয়ে আসে। তোমার মতলবটা কী?” সুরচিতা বলেছিল, “যদি তুই আমার আত্মতুষ্টির উপলক্ষই হোস, তাতে তোর কী কোনো ক্ষতি দেখছিস? যদি না দেখিস, তাহলে আমার সাথে ফুচকা খেতে যাস, গঙ্গার ধারে।”

    অভির সাথে ফুচকা খেতে যাওয়ার আগে চার-পাঁচবার বই দেওয়া-নেওয়া করতে হয়েছিল সুরচিতাকে। সে যে ছেলেটার সাথে মিশছে শুধুই একটা আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধায় তা ছেলেটা তখন স্পষ্ট করে বুঝেছে কী বোঝেনি তা সুরচিতাও বোঝেনি। সে এটাও বোঝে নি যে শান্ত কিশোরের মধ্যে মূর্ত ব্যক্তিত্ব তাকে শুধু অবাক নয় মুগ্ধও করেছে। বিশেষতঃ নিজের বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, অপ্রতুল আত্মসম্মানবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সমঝোতা দেখতে দেখতে সুরচিতার মন যখন ভীষণ ক্লান্ত আর বিষাক্ত তখন ওর থেকে অনেক কম বয়সী একটা ছেলের মধ্যে সে সবের তীব্রতা টের পেয়ে ও অভির সাথে মিশছিল স্বতোৎসারিত শ্রদ্ধায়, অদম্য আকর্ষণে, নির্দ্বিধায়। হয়তো বোঝে নি কারণ অভির সাথে মেশার মূলে সুরচিতার একটা সচেতন উদ্দেশ্য ছিল। সুরচিতা ভেবেছিল যে অভি যদি সত্যিই তার মা-বাবার মতো দুর্বল না হয় বা যদি তার নিজের মতে আর নিজের মতো বাঁচার ইচ্ছে আর উৎসাহ থাকে তাহলে সুরচিতা অভিকে সসম্মানে বন্ধু করে নেবে, যতটুকু ভরসা ছেলেটার লাগবে বা সে নিতে চাইবে সবটুকু নিঃশর্তে দেবে, আর আগলে রাখবে টুকুন রায়দের থাবা থেকে, ছলে আর কৌশলে। তাই সে অভিকে জানতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল। আবার সেই জানা বোঝার হাত ধরে টুকুন রায়দের সাথে অঘোষিত নিশঃব্দ অলক্ষ্য যুদ্ধটার কারণ, উদ্দেশ্য সবই ক্রমে বদলে গিয়েছিল, সুরচিতার সচেতনতা আর আর তার নিয়ন্ত্রণরেখাকে ফাঁকি দিয়ে।

    সুরচিতার মুগ্ধতার কথা হয়তো অভি বুঝেছিল বা তার অস্পষ্ট ধারণা হয়েছিল সুরচিতার অনুভূতি সম্পর্কে। সুরচিতা তার কোনো ক্ষতি করবে মানে সুরচিতা তাকে কোনো ভাবে অপমান করবে সে সম্ভাবনাটা সে আমল দেয় নি। তার প্রতিনিয়তের দুর্গতির পাশে অমন অপমানের একটা মনোবেদনা তার কাছে হালকা ঝুঁকি বই কিছু মনে হয় নি বোধ হয়। সে কিছু না করেও অপরাধীর জীবন কাটাচ্ছিল যে। তার বয়সী ছেলেদের মা-বাবারা নিজেদের ছেলেকে সাবধান করতেন অভির সাথে মিশে দুর্মতি হতে পারে বলে। আর মেয়েদের, মানে যে সব মেয়েদের বাবাদের দোতলা বাড়ি ছিল তারা কেবলই অভির স্বভাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেন তার মা-বাবার কথা টেনে এনে। ফলে সুরচিতা তার মন নিয়ে, অনু্ভূতি নিয়ে কিছুদিন খেলে আনন্দ নেবে আর তারপর তাকে ফেলে দিয়ে চলে যাবে এরকম ভয় অভি মোটেও পায় নি। শারীরিক কোনো উৎপীড়নের আশঙ্কাও তার অযৌক্তিক মনে হয়েছিল হয়তো। কারণ হয়তো তার প্রত্যেকটা দিন একটা একটা নতুন লড়াই ছিল মা-বাবার অল্প বয়সের খেয়ালের মাশুল দিতে দিতে নতুন করে নিজের জন্য বাঁচার কারণ খুঁজে পাওয়ার মধ্যে, নতুন করে বাঁচার লড়াই জেতার কৌশল শেখার মধ্যে। সুরচিতার আসা যাওয়া নিয়ে সে সতর্ক থাকলেও আক্রমণাত্মক ছিল না। তাই বোধ হয় একসময় সেও টের পেয়েছিল সুরচিতা তার বন্ধুর অভাব পূরণ করতে পারে। তারপর একসময় নিয়মিত সোম-বুধ-শুক্র সন্ধেবেলা সুরচিতা কিছুক্ষণ কাটাতো অভির সাথে। কোনো কোনো সন্ধেবেলা চা, মুড়ি, চানাচুর খেতে খেতে গল্পে মুখর হতো দীপ্তির সাময়িক যোগদানে। কোনো কোনো দিন হয়তো যাবতীয় ল্যাম্পপোস্টরা ভেঙে পড়ত দুজনের ঘাড়ে সাইন-কোসাইনের অনুপাতে। কখনও নিওলিথিক কুমোরেরা মৃৎপাত্রে কী করে নকশা ফোটাত সে কথাটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। কখনও তুমুল তর্ক হতো স্টিলির মধ্যে সংসক্তি আসঞ্জন নিয়ে; কখনও সালকাস জাইরাসে উন্মাদনা ছড়াতো ভারী জল। এবং এসবের মধ্যে দিয়ে সব শৈত্য পেরিয়ে কখন যেন উষ্ণ গালফ স্ট্রিম হয়ে যাতায়াত শুরু হয়েছিল গোলাপি খামে রাখা ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার, বুনো ফুলের আর চকোলেটের।

    কিন্তু তার আগে বয়ে গিয়েছিল অনেক হিমশীতল মুহূর্ত। অভির জীবনে না ছিল দোল, না দিওয়ালি; না দূর্গাপুজো, না সরস্বতী পুজো। সে-জীবনে যতোটা পাথরের রুক্ষ কাঠিন্য ছিল, ততোটা ছিল না কৈশোরের উচ্ছ্বাস বা কৌতূহলের বিস্ফোরণ। ততোটাই দুরূহ ছিল সে পাথরের বুকে কোনো আঁচড় কাটা বা তার নিজের ফাটল বরাবর সম্ভাব্য ভাঙনগুলো আটকে কোনো নকশা কুঁদে তোলা। বইয়ের কোণে আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেলে সুরচিতার হৃদপিণ্ডের দেওয়ালে রক্তের ঢেউ আছড়ে পড়ত অনেকক্ষণ। কিন্তু সেই ঢেউয়ের ঝাপটা অভির চোখেও ছলকে উঠতে দেখেছিল সুরচিতা, বছর ঘুরে যেতে।

    এরকম কিছু যে হতে পারে সেটা সুরচিতার আজন্মের সামাজিক বোধের সীমায় ছিল না। নিজের কাছে সত্যিটা স্বীকার করতে তার প্রবল যন্ত্রণা হয়েছিল। অভির সাথে একটা সহজ সম্পর্কের আবর্তে আসা অনেক ধৈর্যের সিঁড়ি ভাঙা। সেই সম্পর্কটা সুরচিতা কিছুতেই তার একতরফা প্রেমের দাবিতে ভেঙে দিতে চাইত না। সে অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে ভেবে ভেবে যে অভির যদি সন্দেহ হয় সুরচিতার উদ্দেশ্য কী তাই নিয়ে বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য আছে বলে। তার সারাক্ষণ আশঙ্কা হতো যে তার মনোভাবের ব্যাখ্যায় অভি যদি ব্যর্থের কামনা চরিতার্থতার চেষ্টা দেখে তাহলে জগৎ, জীবন সব কিছু নিয়ে ছেলেটার মনে তিক্ততার বিস্ফোরণ হতে পারে। বিশেষত অভির বাবা-মায়ের সমস্ত কথা শুনে সুরচিতা টের পেয়েছিল তার অভিমানের গভীরতা। সেই অভিমানই মাত্র চোদ্দ বছরের ছেলেটার সহ্য, দার্ঢ্য, বিবেচনার মূলে। অথচ সারা পৃথিবী হয় ওকে দয়া দেখাতো, নয়তো তাচ্ছিল্য। দুয়েরই কারণ ওর বাবা-মায়ের বেছে নেওয়া জীবনযাপন। দুজনের সিদ্ধান্তের, কর্মের ফল মর্মে মর্মে অভি ভোগ করত। সেই জন্যই ওর ফ্রি টিউশনে আপত্তি ছিল। ওর আপত্তি ছিল বাবা-মায়ের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আর অক্ষমতার দায় দয়াশীল পৃথিবীর কাঁধে তুলে দিতে। বিকল্প হিসেবে সে নিজের কাঁধটা অনেক শক্তিশালী করে তুলছিল। কোনটা দাক্ষিণ্য আর কোনটা শুধুই ভালো ব্যবহার সেটা বোঝার বয়স হয় নি বলে ও এড়িয়ে চলত সমবয়স্কদেরও। তাই শ্রদ্ধাটুকু সুরচিতা গোপন করে নি, প্রেমটাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছিল অনেকদিন।

    লম্বা ছুটির সময়ে সুরচিতা অভিকে নিয়ে যেত মিউজিয়ামে, তারামণ্ডলে, সায়েন্স সিটিতে, চিড়িয়াখানায়, বটানিকাল গার্ডেনে। কখনও বা ঐতিহাসিক মনুমেন্টগুলোতে। তাতে যেমন ডালহৌসি স্কোয়ার থেকে বিবাদী বাগের গল্প থাকত, তেমনই থাকত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা ফোর্ট উইলিয়াম। বাদ পড়ত না অক্টারলোনি মনুমেন্ট বা ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ছিল নন্দন, রবীন্দ্রসদন, এশিয়াটিক সোসাইটি, টাউন হল, মহাজতি সদন। তারপর বইমেলাও। একবার দুজনে চক্ররেলে চড়ে বেরিয়েছিল গঙ্গার ধার ধরে শহরের সীমানা দেখতে। দুজনে ছাড়া কেউ জানতও না এসব টইটইয়ের কথা। অভির তো বলার কেউ ছিল না। সুরচিতা নিজেকে কয়েক ভাগে আলাদা করে নিয়েছিল। এক ভাগে ছিল তার বাবা-মায়ের মেয়ে, আরেক ভাগে তার ইউনিভার্সিটির জীবন। আরেক ভাগে তার টোল। অন্য আরেকভাগে অভি।

    ধীরে ধীরে অভি অনেক সহজ হয়ে উঠেছিল। কখন অভির মনে সুরচিতার জন্য একটু একটু করে ভালো লাগা জমতে জমতে তা প্রেমের পাহাড় হয়ে উঠেছে তা ওরা নিজেরাই টের পায় নি। একদিন কোনো একটা মুশকিল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে সুরচিতার চোখমুখ উপচে উঠেছিল মুগ্ধ প্রশংসায়; হয়তো প্রেমেও। তার উত্তরে একটা জটিলতর প্রশ্ন রেখেছিল অভি, আর উত্তর পেয়ে ওর চেহারায় ঝকঝকিয়ে উঠেছিল সেই মুগ্ধতা যা শিরার রক্ত হৃদয়ে পদ্ম না ফোটালে দেখাই যায় না। ভেঙে পড়েছিল সুরচিতার সমস্ত আড়াল। অভিও লুকোনোর চেষ্টা করে নি তার একমাত্র বন্ধুর কাছে তার প্রেমের কথা। তারপর ওদের চোখে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিমার মানে বদলে গিয়েছিল। বসন্তের হাওয়া আর গ্রীষ্মের দুপুর ভীষণ সহনীয় হয়ে উঠেছিল। বর্ষার জলে ভাসা রাস্তায় ঘেন্নার আবর্জনারা অবজ্ঞা পেয়েছিল, আর সফেন ঢেউগুলোতে ভীষণ ভালোলাগা আছড়ে পড়েছিল। শরতের নীলিমা গাঢ়তর হয়েছিল। হেমন্তের মানে দাঁড়িয়েছিল দুঃসময়ের প্রস্তুতিতে গোণা কয়েক প্রহর; আর শীত মানে বসন্তের অপেক্ষা, পায়ের শব্দ গোণা।

    মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোতে অনেকেই অভির চিলেকোঠার ঘরে দেখা করতে আসতে চাইত। কেউ বলত তার বাচ্চাকে পড়াতে। অভিকে এক পাহাড় নম্বর পেতে দেখে সারা জগৎ সংসার বোধহয় ভুলে গিয়েছিল যে কিছুদন আগেই তারা অভিকে দেখত শুধুমাত্র বখে যাওয়া দুটো ছেলেমেয়ের সন্তান বলে। কারও ছিল বিস্ময়, কারও হিংসে। কেউ বলত, তার ছেলের সাথে অভি যদি মেশে তাহলে তার ছেলের কিছু উন্নতি হতে পারে। কেউ কেউ এসে বসে থাকত সারাদিন, অভি কী করে এত অভাবেও এত ভালো করল সেই রহস্য জেনে নিতে নিজের নম্বর বাড়াবে বলে। খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেল অবশ্য প্রথম সপ্তাহ ছাড়া আসে নি। এদিকে সে যে দিনের বেলাটা ইস্কুলে থাকবে তার জো ছিল না। কারণ ইস্কুলে ক্লাস হতো না, পড়াও হতো না। সারাদিন ফুটবল মাঠে থাকলে সন্ধের পড়াশোনাও ঘুমিয়ে পড়ে। দিনে আর রাতের অধিকাংশ সময়টাই বাড়িতে ছেলেটার মা থাকতেন না, যে যত আপদ দোরগোড়াতে ঠেকিয়ে দেবেন। পড়শিরা ওদের বন্ধু ছিল না। নিম্নবিত্তের কারণে বাসাটা শুধু স্বল্পবিত্ত মানুষদের এলাকায় নিতে হয়েছিল দিলীপকে তা তো নয়। শিক্ষা, রুচি, সামাজিক পরিবেশ এবং আরও অনেক কিছুর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়েছিল। কিছু মাস্তান আর তোলাবাজও দুপুরে টোকা দিতে আরম্ভ করল অভির চিলেকোঠার ঘরে।

    এই সময়ে একটা রবিবার দুপুরে অভি গিয়েছিল সুরচিতার বাড়ি। উদ্‌ভ্রান্ত গলায় বলেছিল, “সু তোমার কাছে কিছু চাইতে আমার ভীষণ লজ্জা করে। কিন্তু আমি পাগল হয়ে যাব এত লোক সামলাতে। আমি খুব অমিশুক। লোকজনের সাথে কথা বলতে জানি না; এসব ব্যাপারে ঠিক কী ভুল কী জানি না--” অভিকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে সুরচিতা বলেছিল, “আমাকে কী তোর পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার করবি নাকি?” তারপর হিহি করে হেসেছিল। অভি একটু বিব্রত হয়েছিল। কিন্তু বলেছিল, “সু, বাবা-মা আমার শক্তি নয় দুর্বলতা। ওঁদের কারণে আমার কোনো কীর্তিরই গৌরব নেই। কিন্তু তুমিই শুধু আমাকে একটা আলাদা মানুষ হিসেবে দেখেছ।” তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা অভির চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলেছিল, “তোকে আমার অদেয় কিছুই নেই। বল, ঠিক কীভাবে এই পরিস্থিতির থেকে নিস্তার পেতে চাস। ভেবে উপায় তোকেই বার করতে হবে। সেটা কাজে পরিণত করতে আমাকে যা করতে বলবি সেটা আমি করব।” অভি সুরচিতার ডান হাতের তালুটা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আমি ভাবছিলাম তোমাকে বলব আমাকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে।”

    তখন সুরচিতা ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে একটা আদ্যপ্রান্ত বাণিজ্যিক ইস্কুলে চাকরি নিয়েছে। তাতে না ছিল অযথা পোষণের ভরসা, না ছিল পেনশনের অঙ্গীকার। বাবা-মা দুজনেই বিরক্ত ছিলেন। তারওপর আবার ইস্কুলের কয়েকজন মাস্টারের সাথে মিলে সুরচিতা একটা সংস্থায় কাজ করত যেখানে ইস্কুল ছেড়ে দেওয়া বাচ্চাদের পড়ানো হতো। তাতে কোনো উপরি রোজগার ছিল না; উল্টে নিজের পকেট থেকে খরচ দিতে হতো। সকালের টিউশনি বন্ধ করে সন্ধের কয়েকটা টিউশন রেখেছিল সপ্তায় দুদিন আর শনিবার দুবেলা। আর সোম-বুধ-শুক্র সন্ধেবেলা ছিল অভির সাথে ঘন্টা দুয়েক কাটানো। রুটিন অভি ঠিক করত। দরকার পড়লে সুরচিতা অভির পড়াশোনায় অংশ নিত। না হলে নিজের বই পড়ত বা রিসার্চের কাজ এগোত।

    উপায়ান্তর পাওয়া অবধি অভির সমস্যার একটা চলনসই সমাধান হয়েছিল। রোজ সকালে ও চলে আসত সুরচিতার কাছে। তারপর হয় ইস্কুল যেত নয়তো যেদিন ইস্কুল থাকত না সেদিন ট্রেনে চেপে চলে যেত সুরচিতাদের সংস্থায়। দুপুরে কয়েকজন বাচ্চার পড়াশোনা দেখত; নিজের পড়া পড়ত। বিকেলে বাড়ি ফিরত। তারপর হয় সুরচিতা আসত না হলে ও যেত সুরচিতার কাছে। বসত বাকি ছাত্রদের সাথে। তাতে দু চারজন সমবয়সীর সাথে ওর চেনাশোনা হতো; ওপর ওপর মেলামেশা, হাসি ঠাট্টার একটা অভ্যেস হতো; বাকি ছেলেমেয়েরা কি পড়ে; কতক্ষণ পড়ে; কখন পড়ে, এসবও জানতে পারত। যতো সম্বর্ধনা আর বক্তৃতার নেমন্তন্ন পেত তার সবেতে অভি যেতো না। পরে কেউ জবাবদিহি চাইলে ও খুব নম্রভাবে জানাত যে বাবা বা মা কেউই সময় বার করতে পারেন নি ওকে সভায় নিয়ে যাওয়ার। কথাটার সত্যতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু এটাও সত্যি যে বাবা-মা জানতেনও না ছেলের কোথায় কোন আসরে নেমন্তন্ন। ছেলেটা একটা পরীক্ষা পাশ করেছে মাত্র। হতে পারে প্রতিযোগিতায় সে সামনের সারিতে থেকে সবার নজর কেড়েছে। কিন্তু সেই পরীক্ষা পাশের স্বাভাবিক আর সাধারণ ঘটনাটাকে উদ্‌যাপনের হিড়িকে কৃত্রিম অভিকর্ষে ফাঁপিয়ে তোলা হচ্ছিল। ছেলেটার সামনে আরও অনেক পরীক্ষা বাকি তখনও; তার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল। তাই উচ্ছ্বাসের উড়ান নয়, দরকার ছিল বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ানোর। সেই তাগিদে অভি কিছু ছল আর কৌশল শিখে গিয়েছিল।

    এর মধ্যে একদিন সন্ধেবেলা ফন্টে এসেছিল চিলেকোঠায়। তখন ফন্টে পাড়ার মাস্তান থেকে শহরের নেতা হওয়ার পথে; সে অভির কাছে পড়তে চেয়েছিল রবীন্দ্র মুক্ত বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করতে চায় বলে। সুরচিতা বলেছিল, “ফন্টে, মাথার ঘা-টা শুকিয়ে গেছে বুঝি?” ফন্টে যখন মাস্তানও হয় নি তখন ইস্কুল ফেরতা মেয়েদের টোন টিটকিরি করত, সুযোগ পেলে গায়েও হাত দিত। ওর বিশ্বাস হয় নি যে ওর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর লোকেরা ইস্কুলের মেয়েদের হাতেই মার খেয়ে হাড় ভেঙেছে।(??) একদিন ওর এলাকায় সুরচিতা অ্যাণ্ড কোম্পানি হাজির হয়েছিল। ও স্বভাব মতো টোন, টিটকিরি করে যখন বুঝে নিয়েছিল যে দুটো মেয়েই ভীতু তখন মেয়ে দুটোর কাছে গিয়েছিল রাস্তার ধারের মেয়েটার থুতনি নেড়ে বুকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাবার মতলবে। কিন্তু থুতনিতে হাত দিতেই মেয়েটা ওর হাত ধরে এমন প্যাঁচ দিয়েছিল যে ও সাইকেল সুদ্ধ পড়েছিল মাটিতে। তারপর রে রে করে আরও কিছু মেয়ে ছুটে এসে মেরে ওর হাত ভেঙে দিয়েছিল, সাইকেলের দুটো চাকার রিম ভেঙে দিয়েছিল, সিট খুলে নিয়ে গিয়েছিল; সব শেষে নালার জলে মুখ গুঁজে দিয়ে নাকানি চোবানি খাইয়ে বলিয়েছিল আর কোনোদিন যদি ও কোনো মেয়েকে জ্বালিয়েছে তো মেয়েগুলো নাকি ওর এমন হাল করবে যে ও নিজের বউকে ছুঁতেও ভয় পাবে। তারপর ফন্টেকে ওরা নাকে খত দিতে দিতে থানায় জমা করে দিয়েছিল। সে বাবদে ফন্টের মাথায় যে ঘা-টা হয়েছিল সেটা শুকোতে বছর ঘুরে গিয়েছিল। এখন ওর ভাগনেটা সেই ঘায়ের গর্তে হাতের আঙুল ঢুকিয়ে আঙুলটা পাকাতে পাকাতে জিজ্ঞেস করে, “তোমার পিস্তলের গুলি কি এখানেই লাগাবো?” শুনলেই ফন্টের পায়খানা পেয়ে যায়। যাই হোক ফন্টে আর আসে নি অভির কাছে কখনও।

    কিন্তু সেই জখম তৈরি হওয়ার পরেই ফন্টে ক্রমশঃ এলাকার ত্রাস হয়ে ওঠে। কারণ সেদিন ফন্টের নামে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয় নি। শুধু ফন্টের বেলাই এমন হয়েছিল তাতো নয় তার আগে বা পরেও যাদেরকে সুরচিতারা থানায় নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারুর বিরুদ্ধে কখনও অভিযোগ নেওয়া হয় নি। ফন্টেরা ক্রমে জেনে গিয়েছিল যে তারা অবধ্য। তাদেরকে থানায় দাখিল করা হলেও তাদের কোনো ক্ষতি নেই। বরং যতো বেশিবার যেতে পারবে ততো লাভ, কোনো না কোনো ভাবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে, ক্ষতিপূরণে। ফলে ফন্টেরা ক্রমশঃ খুচরো অন্যায় থেকে বড়ো অপরাধে হাত পাকাতে থাকে নির্ভয়ে। হয়তো সেই মেয়ের দলকে নিয়ে ব্যক্তিগত অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল কারুর কারুর মনে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই স্বভাব বদলায় নি, তারা শুধু মেয়েদের আক্রমণের এলাকা বদলে ছিল।

    কিন্তু এক বিপদের মোকাবিলা করতে গিয়ে মেয়েদের অন্য বিপদ ঘনিয়ে ঊঠেছিল। প্রথম যেবার ফন্টের মতো কাউকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল সুরচিতারা সেবার তো ওদের বলা হয়েছিল, “ছিছি, ছিছি, ছিছি! তোমরা ইস্কুলে যাও, লেখা পড়া শেখো আর এটুকু জানো না যে মারপিট করে আইন হাতে তুলে নিতে নেই?” কিন্তু তাতে লজ্জা পাওয়ার উপায় ছিল না সুরচিতাদের। উপদ্রব এতো বেড়েছিল, বিশেষতঃ বাড়ি থেকে ইস্কুল যাওয়ার সময় আর ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়। সময়দুটো নির্দিষ্ট হওয়ায় সেই সময়দুটোতে উপদ্রব হতো নিয়মিত। কখনও একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি নিয়ে একটা লোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ত প্যান্টের চেন খুলে। কখনও তার সাথে চীৎকার করে মেয়েদের শরীর নিয়ে ছড়া কাটত। কখনও শরীরের নানা অংশে খিমচে দিয়ে, খাবলে দিয়ে চলে যেত সাইকেল চেপে সাঁ করে। মেয়েরা একেক দিন দলে দলে ওঁত পেতে থেকে মোকাবিলা করত এসব আক্রমণের। কখনও নিয়মিত আক্রমণকারীকে দেখা মাত্র উলু দিয়ে রাস্তার সকলকে সচকিত করে দেওয়া হতো। আক্রমণ হলে “বাঁচাও” “বাঁচাও” চীৎকারে জানান দিত আক্রান্ত। আর তার আগে পিছের মেয়েরা গুলতিতে ঢিল নিয়ে তৈরি হয়ে যেত। আক্রমণকারীকে দেখা মাত্র ঢিল মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিত। ধরাশায়ী করা গেলে হাত-পা কিছু একটা ভেঙে দেওয়া হতো। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হতো থানায়।

    এরকম আরেকবার হতে যে মেয়েরা থানায় গিয়েছিল তাদেরকে দায়িত্বে থাকা পুলিশরা বলেছিল, “বাঁদর মেয়ের দল, ফের যদি এমন করবি তো তোদের জেলে ভরে দেব।” বলাবাহুল্য আলাদা করে ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না সুরচিতার বা তার সতীর্থদের। তারপর একবার তো থানায় আটকেও রাখা হয় কিছু মেয়েকে। কিছু মেয়ে পালিয়ে ইস্কুলে খবর দিয়েছিল। কারণ সেসময়টা ইস্কুল বসার সময় ছিল। বড়দি নিজে থানায় এসে ডিস্ট্রিক্‌ট ম্যাজিস্ট্রেটের চিঠি দেখিয়ে বলেছিলেন, “এই অর্ডার পাওয়ার পরেও আপনারা মেয়েদের ইস্কুল যাতায়াতের পথে টহলের ব্যবস্থা নেন নি।” জবাবে থানার বড়োবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হতাশ, ক্লান্ত বড়দি হাত তুলে বলেছিলেন, “থাক আর বলতে হবে না; আমি জানি, আপনাদের নাকি সব মেয়েকে বাড়ির থেকে ইস্কুলে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও আরও বেশি জরুরি কাজ আছে। তা আমার মেয়েরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য যদি একটা লোফারকে দুঘা দিয়ে ফেলে সেটা আইনভঙ্গ হলো, আর সাক্ষী সমেত দশ-বারোটা মেয়ে আপনাকে আসামী এনে দিলে আপনি মেয়েগুলোকেই জেলে ভরেন? আপনি নিশ্চয়ই মেয়ের বাবা নন। বোধ হয় মায়ের পেটেও জন্মান নি।” তারপর পুলিশ অফিসার গলা তুলে হুঙ্কার দিতেই, বড়দি তার ওপরে গলা তুলে বলেছিলেন, “আমার নির্দেশ মেনেই মেয়েরা থানায় এসে এসব বজ্জাতকে জমা দেয় তাই আপনি কেরামতি দেখানোর সুযোগ পান। তা না করে যদি এগুলোকে রাস্তায় ফেলে দিত পারতেন আমার মেয়েদের ওপর দারোগাগিরি ফলাতে? আমার মেয়েদের না ছাড়লে পুরো ইস্কুল আমি এখানে বসাব। আপনাকে, আপনার নেতাকে, তার বাবাকে, তার বিরোধী নেতাকে সক্কলকে বসিয়ে ক্লাস করাবো আর বেয়াদবি দেখলেই--” কথাটা আর শেষ হয় নি, তার আগেই মিনমিন করে অফিসারটি বলেছিলেন, “যান, যান আপনার মেয়েদের নিয়ে যান।”

    আজ এসব কথা ভাবলে সুরচিতার মনে হয় যে বড়দি না থাকলে, তাঁর একটা বিশিষ্ট পরিচিতি না থাকলে, সেদিন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের খপ্পরে গিয়ে পড়ত থানায় আটকে পড়া মেয়েগুলো। তারপর তাদের নিত্য নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে, বা পুলিশের অসহযোগ ও বিরোধিতায় তাদের অবুঝ অভিমানী কিশোর মনে সমাজ আর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ নিশ্চয়ই জমা হতো। আর সেই অভিযোগ থেকে ক্ষোভ তৈরি করে, সেটা ব্যবহার করে হয়তো নিতান্ত আঞ্চলিক বা আরো বড়ো কিছু একটা রাজনৈতিক গণ্ডগোল বাধিয়ে তোলা হতো। মেয়েগুলোকেও হয়তো ব্যবস্থা অমান্য করতে আর অপরাধে অভ্যস্ত করে তোলা হতো। নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক জীবনপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো।

    সামনে থেকে আসা আঘাত ঠেকানোর জন্য হাত ওঠে নিতান্ত স্নায়বিক কারণে। তবু মানুষ সহ্য করে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবধি, বিশেষত সামাজিক যাপনের সবটুকুই যখন দূষিত হয়ে যায় রাজনীতির জবরদখলে। এরকম একটা অবস্থায় অব্যবস্থার যাঁতাকলে কোন কাজের যে কী কী পরিণতি হতে পারে তা আঁচ করা গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা তো যায় না। তাই হয়তো অব্যবস্থা রেখে দেওয়া হয়, তার থেকে ঘোলাজলে মাছও ধরা হয়। ব্যবস্থাপকদের নিশ্চয়ই মুনাফা হয় এতে। আর বার বার কৈশোর সে যাঁতাকলে বলি হয়ে যায়, কিছুটা অসংযমে, কিছুটা অনভিজ্ঞতায়, কিছুটা আবেগে, কিছুটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে, কিছুটা প্রতিবর্তগত আত্মরক্ষার চেষ্টায়।

    শীতের ছুটিতে সুরচিতা একদিন লাইব্রেরি গিয়েছিল। দেখেছিল ওখানে স্টাডিরুম খোলা হয়েছে। ব্যবহার করতে পারে যে কেউ সোম থেকে শুক্র দুপুর থেকে রাতে লাইব্রেরি বন্ধ হওয়া অবধি। লাইব্রেরির বইয়ের দেখাশোনা করতেন রুনুদি, সেবাদি আর পুবের পাহাড় থেকে আসা শ্যামশরণদা। তাদের সাথে সুরচিতার খুব ভাব ছিল। ওঁরা সুরচিতাকে পুরো লাইব্রেরির যত্রতত্র যেতে দিতেন, বই সাজাতে গোছাতে দিতেন, ধুলো ঝাড়তে দিতেন, আর যে বইটাই তার চাই সেটা খুঁজে রাখতেন; অনেক সময়ে বইয়ের বদলে দিতেন শুধু খবর যে কবে নাগাদ কাঙ্ক্ষিত বইটা বা বইগুলো সুরচিতা হাতে পাবে। অতএব দিদিদের বুঝিয়ে অভির ট্রেন যাত্রার উপায়ান্তর পাওয়া গেলো। সে এসে দিদিদের সাহায্যে দুপুরের অনেক আগে থেকে স্টাডিরুমে ঢুকে পড়ত। আর বিকেলে হল্লা শুরু হলে বা তার আগেই নিজের গন্তব্যে রওনা হতো। কর্তৃদের কেউ যদি জানতে চাইতেন যে অসময়ে স্টাডিরুমের পাঠক কে, শ্যামশরণদা কিংবা দিদিরা জানাতেন যে অভি রুনুদির বোনপো; বাড়িতে পড়াশোনার অসুবিধে থাকায় ও লাইব্রেরিতে বসে পড়ে।

    অভি লাইব্রেরিতে বসে পড়তে শুরু করার আগে রুনুদি বা অভি কেউ কাউকে চিনতও না। সরকারি মহকুমা লাইব্রেরিতে গ্রুপ ডি গ্রন্থাগার সেবিকার চাকরিটা পেতে রুনুদির ক্লাস এইট পাশের সার্টিফিকেট লেগেছিল একটা; আসতেনও মহকুমা শহরের বাইরে, দূরের একটা গ্রাম থেকে, বাসে করে। শাড়ি-জামাতে অনটনের ছাপটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু মনে কোনো কার্পণ্য ছিল না। সে-কথা বলতে গেলে বলতেন, “ওরে মেয়ে আমার কী এতে কোনো খরচা আছে? ছেলেটা তো আলোপাখাও জ্বালায় না যে ইলেকট্রিক পুড়বে সরকারের; উল্টে আমাদের সুবিধে হয়, ও যেখানে বসে সে জায়গাটার ধুলো ঝাড়তে হয় না।” তারপর খুব যেন রসিকতা হয়েছে এমন করে তিনমূর্তি হেসে উঠত। সুরচিতা চাকরি পেয়ে রুনুদি আর শ্যামশরণদাকে পান খাইয়েছিল; সেবাদি চা-পান খান না; তাই তাঁর জন্য ছিল টফি।

    তারপর কখন যে দুটো বছর কেটে গিয়েছিল টের পাওয়া যায় নি। অভির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আর হোস্টেলের ফি মকুব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খাতা পেন পেন্সিল, অল্প হলেও ইন্সট্রুমেন্টস, দিন গেলে অসুখ-বিসুখ, জামাকাপড় বাবদ খরচ এসবের ব্যবস্থা করার জন্য মাসে মাসে ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ভরার দায়িত্ব সুরচিতা নিয়েছিল। যদিও ওর বাবা-মা জানতেন ওঁদেরই খরচটা চালাতে হবে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছিল ওর কলেজের ব্রাঞ্চে। তারপর ক্রমে অভি টিউশন জুটিয়ে নেবে কয়েকটা এমনটাই ঠিক হয়েছিল।

    অভির প্রথম ক্লাসের দিন সুরচিতা ওর সাথে দেখা করেছিল, ইস্কুলে ছুটি নিয়ে। দুজনে সন্ধে অবধি এখানে সেখানে আড্ডা দিয়েছিল। বাড়ি ফেরার সময় তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল সুরচিতা। মনসাতলার মুখে এতো জল হয়েছিল যে ওর পা থেকে চটি খুলে ভেসে গিয়েছিল। তবু সেদিন কোনো দুঃখ তো দূর বিরক্তিও হয় নি। অসম্ভব আনন্দ হয়েছিল জীবন কানায় কানায় ভরে যাওয়ায়, অনেক দুঃস্বপ্নের পরে একটা স্বপ্নকে সত্যি হয়ে উঠতে দেখে। এতো আনন্দ যে চোখ ভরে উঠছিল উচ্ছাসে। গালে গড়িয়ে আসা অশ্রু ধুয়ে যাচ্ছিল বৃষ্টির জলে। পুরো রাস্তা খালি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল মেয়েটা। কপালে, চিবুকে, দুহাতের দশ আঙুলে, কনুই জুড়ে একশ কুড়ি ডিগ্রি জ্বর ছিল তার, বৃষ্টি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল সেই জ্বর আর তার ঘোর। অভি তাকে ছুঁয়েছিল কপালে, চিবুকে, আঙুলে, কনুইতে, স্তনসন্ধিতে, চেনা রেস্তোরাঁর অচেনা কেবিনের পর্দাঘেরা আবছায়াতে।

    শীতকালে সুরচিতা শ্যামশরণের সাথে তিনপাহাড়ি এসেছিল প্রথম বার। সরকারি সাহায্যে চলা একটা মিশনারি স্কুলে চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিল। শ্যামশরণ ফিরে গিয়েছিল সুরচিতার শহরে; আর সুরচিতা ফিরে এসেছিল শ্যামশরণের শহরে। তারপর ক্রমশঃ মত্ত হয়েছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণে। অভির সাথে যোগাযোগ মানে মাসান্তে কটা টাকা পাঠানো আর একটা পোস্টবক্স নম্বর। কখনও যে মনপ্রাণ দুজনের কারুরই ক্ষেপে ওঠে নি দেখা করার জন্য তা নয়। কিন্তু জগতের নজর আর কৌতূহল এড়াতে দুজনেই স্বীকার করে নিয়েছিল স্বেচ্ছা বিরহ। দোল-দূর্গোৎসবে অভির শহরে ফেরাটা অনিবার্য ছিল। তাই সুরচিতা সেসব সময়ে মিশনে উৎসব উদযাপনে সামিল হওয়ার অছিলায় বাড়ি ফিরত না। কিংবা বেড়াতে চলে যেত কোনো সমুদ্রের তীরে বা জঙ্গলের গভীরে। মা-বাবা কখনও সঙ্গী হতেন, কখনও হতেন না। চার ছ বছর থেকে কিছু বেশি বছর কিংবা অনির্দিষ্টকাল, বিরহের দীর্ঘ অভ্যেসে তারা দুজনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।



    প্রতিপক্ষ

    সুরচিতা তিনপাহাড়ি আসার পর থেকেই মা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তার বিয়ে দেওয়ার জন্য। সুরচিতা মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে নি যে বিয়েটা মা দেবেন না, দরকার পড়লে সে নিজেই করবে; বরং সোজাসুজি বলে দিয়েছে অনেকবার। ততোবার, যতোবার মা প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন।

    তারমধ্যে একটা শুক্রবার সন্ধের মুখে ধৃতিকান্ত এসে পৌঁছেছিল। এতোদিন পর এসে ছিল যে ধৃতিকান্তকে চিনতে সুরচিতার কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল। তারপর খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে সাল কটা গাঁটে গুনে সে বলেছিল, “তের বছর! আমি তো ধরেই নিয়ে ছিলাম যে তুই আমাকে ভুলে গেছিস।” ধৃতিকান্ত গোলাপ বাগান, পাথরের দেওয়াল, বাগানের কোণে রডোডেনড্রন দেখতে দেখতে বলেছিল, “ভুলে যে যাই নি তোকে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি বল?” সুরচিতা খুশিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল, “পয়েন্ট। তর্কের সুযোগ নেই।” তারপর বলেছিল, “ভিতরে চল, এখন আর এখানে বসে কিছু দেখা যাবে না।” ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেন? না হয় অন্ধকারটাই দেখব!” সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে একলা বসে দেখ। আমি চা নিয়ে আসি। আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।” ধৃতিকান্ত বসে পড়েছিল খালি চেয়ারটাতে।

    একটু পরে একটা বাটিতে করে কুচো পেঁয়াজ আর চানাচুর দিয়ে মাখা চিঁড়েভাজা আর ধোঁয়াওঠা চায়ের দুটো কাপ একটা তেপায়া টুলে বয়ে নিয়ে এসেছিল সুরচিতা। তারপর আবার ভেতর থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে এসে বসেছিল ধৃতিকান্তর পাশে। চুপ করে দুজনে চা আর চিঁড়েভাজা খাচ্ছিল। ধৃতিকান্তই বেশিটা খেয়েছিল। মাঝে মাঝে একটু একটু নিচ্ছিল সুরচিতা।

    ধৃতিকান্তই বলেছিল, “আমরা যেন প্রৌঢ় দম্পতি। বাগানে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছি।” সুরচিতা বলেছিল, “আর অন্ধকার দেখছি, দুচোখে।” বলে ধৃতিকান্তর দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখটা টিপতে গিয়ে কী যেন একটা দেখে ফেলেছিল ধৃতিকান্তর চোখে, সেই আধো অন্ধকারে।

    ধৃতিকান্ত লুকোনোর চেষ্টা করেনি। চেয়ারের হাতলে আলতো রাখা সুরচিতার বাঁ হাতের তালুটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল, “যেন এটা সত্যি হয়।” সুরচিতা শিউরে উঠেছিল যদিও, তবুও অকম্পিত গলায় বলেছিল, “বলিহারি তোর শখ, দু চোখে অন্ধকার দেখব বুড়ো বয়সে? কেন? চাওয়ার মতো আর কিছু ছিল না?” ধৃতিকান্ত কিন্তু মুঠো আলগা করে নি। জবাবে বলেছিল, “তুই ভালো করেই বুঝেছিস আমি প্রৌঢ় দম্পতি হতে চেয়েছি তোর সাথে। কিন্তু...ভুলটা আমারই। এতোদিন পরে সব আবার নতুন করে শুরু করতে হতো।” থেমে ছিল ধৃতিকান্ত। সুরচিতা চুপ করে শুনছিল, বলতে দিচ্ছিল ধৃতিকান্তকে।

    একটু পরে আবার বলেছিল ধৃতিকান্ত, “তের বছর আগে তুই ছিলি আমার প্রিয় বন্ধু। সেদিন আমি তোকে যেমনটা ছেড়ে রেখে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম তুই এখনও তাই আছিস। আমার প্রিয় বন্ধু। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা পরস্পরের কাছে প্রায় ভিনগ্রহী।” তারপরের নৈঃশব্দ দীর্ঘতর হয়েছিলো। একসময় বাস্তব বিবেচনা করে সুরচিতাকে বলতে হয়েছিলো, “বস, তুমি শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে, পাঁচশো ফুট উঁচুতে পাহাড়ের মাথায় বসে রোমান্টিক হতে পারো, কিন্তু তোমার পেট তো তাতে সায় দেবে না; এই গণ্ডগ্রামে তালি বাজালে ভূতের রাজার প্যান্ট্রিওয়ালাও আসবে না। আমি গেলাম খিচুড়ি, ডিম ভাজা রাঁধতে। এখন তুমি বসে অন্ধকার দেখবে, না আকাশের তারা গুণবে, নাকি খিচুড়ি ডিম ভাজার গন্ধে খিদে চাগাবে সেটা তোমার ব্যাপার।”

    খিচুড়িটা হয়ে যেতে, সুরচিতা ডিম ভাজতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনই ছুট্টে ঘরে ঢুকে পড়েছিল ধৃতিকান্ত। রান্না ঘরের দরজায় একটা টুল পেতে বসে বলেছিল, “আমাকে একটা অমলেট এমনি দিবি তো?” সুরচিতা হেসে ফেলেছিল, “বর্ষা কালে এলে এতে বেশ মাশরুম ঠেসে খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু এখন পেঁয়াজ, লঙ্কা দিয়েই খেতে হবে। কাল থাকবি তো?” পাল্টা প্রশ্ন করেছিল ধৃতিকান্ত, “কেন, না হলে কী তোদের মুর্গিরা কাল স্ট্রাইক করবে?” সুরচিতা বলল, “না, কাল আমরা টৌলিং শহরে যাব এমুলুকের নুডুলের সেরা স্বাদ নিতে।” ধৃতিকান্ত তখন প্রায় অন্য যুগে; কলেজবেলার বাচালতায় মত্ত। বলেছিল, “না তুই বর্ষাকালের কথা কী বলছিলি? তখন এলে কী ভালো হতো? মাশরুম?” সুরচিতা বলল, “বটে। তার সাথে আরও অনেক কিছু।” ধৃতিকান্ত বলেছিল, “যেমন?” সুরচিতার দুচোখ যেন অনেক দূরের কিছু দেখছিল, “কোনো কোনো বাগানে জিঙ্গোবাইলোবার ডালে ঝোলা আনারসের মতো হলুদ অর্কিডের গোছা, হাসন্তমুখ ঘাস ফুল, আর ক্যালেন্ডুলার মতো অজস্র সাদা হলুদ ম্যাজেন্টা তারাফুলের গোছা।” ধৃতিকান্ত চোখ নাচিয়ে বলল, “এই ভ্যাপসা ভেজা এলাকাটাও সুন্দর হয়ে ওঠে বর্ষাতে? বসন্তকালে না হয় সব জায়গাতেই ফুল ফোটে। কিন্তু এখানে বর্ষাকাল সুন্দর বলছিস কী করে? সারাক্ষণ সবটা মেঘে ঢাকা থাকে না? ঘরের মেঝে থেকে জল ওঠে না বিন্দু বিন্দু!” সুরচিতা আবার যেন ফিরে গেল অন্য এক দৃশ্যে, “ক্রিপ্টোমেরিয়ার কালচে ভেজা গায়ে রমণীর খোঁপায় লাগান জুঁইয়ের মালার মতো ঝুলে থাকা সাদা সাদা অর্কিডের গোছা, গোধূলির পীতাভায় দিন শেষের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থাকে অতল খাদে, যেন কার অপেক্ষায় ছিল, সে বুঝি আসে নি; আর ভোরের রক্তিমায় লজ্জারুণ হয়ে জেগে ওঠে নতুন অপেক্ষায়, অক্লান্ত চেয়ে থাকে সারাদিন পথের দিকে, যদি সে আসে, যদি সে আসে।” ধৃতিক্লান্ত অবাক গলায় বলল, “বাব্বা পাহাড়ে যাদু আছে দেখছি! তোর মতো ঝগড়ুটে, মুখরা মেয়েকেও কবি বানিয়ে ফেলল।” বাস্তব আর বর্তমানে ফিরতে ফিরতে সুরচিতা বলল, “না, কাব্য আর হলো কই--। তবে তখন এমন তারাভরা আকাশ দেখতে পেতিস না। গাছভরা রডোডেনড্রন আর গোলাপ দেখতে পেতিস না।” গ্লাসের গায়ে চামচ বাজিয়ে প্রিয় বন্ধুর খোঁজে অনেকগুলো বছর উজিয়ে আসা ছেলেটা গাইতে শুরু করেছিল, “মাশরুমের বদলে তারা পেলুম তাই রে নাই রে না...”

    সুরচিতা আঁতকে উঠেছিল, “করছিস কী? থাম থাম। এখানে চারপাশে চিরকুমারীরা থাকেন। তোর পৌরুষের গন্ধে তাদের এমনিই ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে আজ রাতে; তার ওপর তুই এমন মেটিং কল দিলে ওঁদের যে নরকেও জায়গা হবে না?” গল্পের গন্ধে থেমে গিয়েছিল ধৃতিকান্ত। তারপর একটা অমলেট একটা প্লেটে সাজিয়ে আরেকটা বোল দিয়ে ঢেকে রেখেছিল টেবিলের একধারে। তারপর একমুখ গরম খিচুড়ি জিভে লোফালুফি করতে করতে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কী সন্ন্যাস নিবি নাকি? দুবেলা মালা নিয়ে জপা প্র্যাকটিস করছিস? নাকি এরা অন্য কিছু নিয়ে জপে? কিন্তু খেতে বসে প্রেয়ার করলি কই?” সুরচিতা চামচ দিয়ে নেড়ে নেড়ে পাতের খিচুড়িটা ঠাণ্ডা করতে করতে জবাব দিয়েছিল, “আমি এদের মাইনে করা অঙ্কের মাস্টার। ধম্মকম্ম করলেই এরা শত্রুতা শুরু করবে। ভাববে আমিও বুঝি হেডমাস্টারনি হতে চাই, ক্ষমতার দখল নিতে চাই।” এই খানে ফস করে ধৃতিকান্ত বলে বসে ছিল, “এই ধ্যাধ্‌ধ্যাড়া পাহাড় চুড়োয় আবার ক্ষমতা কী রে? অগুণতি মেঘলা দিন, আর পাগলা করা মনখারাপ, এখানে ক্ষমতার লোভ তাও আবার...কেউ থাকে!” বাকি কথাগুলো অট্টহাসিতে ঢেকে গিয়েছিল। আবার সুরচিতা, “শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌...” করে উঠেছিল। তারপর বলেছিল, “যেখানে পাইয়ের সাইজ যেমন, খেয়ে হজম করার লোকের পাকস্থলীর মাপ আর স্বাস্থ্য তো তেমনই হবে। কাল খুব ভোরে উঠে শহরে যাবো আর রাত করে ফিরব। না হলে তোর মতো ডবকা ছোকরার আওয়াজ পেয়ে কুমারীরা সারা দিন ভ্যান ভ্যান করবে এখানে।” ধৃতিকান্ত খেই ফিরে পেয়েছিল, “তাতে তোর হিংসে হবে?” সুরচিতা বলেছিল, “এতো দিন পরে তোর সাথে আড্ডা, তাতে হাড্ডিগুলো জড়ো হলে আমি সহ্য করব না।” ধৃতিকান্ত সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিল, “আমাকে মিস করেছিস এতোদিন তো যোগাযোগ করিস নি কেন?” সুরচিতার জবাব যেন শানানো ছিল, “তুইই তো চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলি, চেন্নাই ছাড়ার পর।” ধৃতিকান্ত নাছোড়, “ই-মেল ছিল, গ্রুপ মেল ছিল...” সুরচিতার কারণ জোরালো, “ডিজিটাল ডিভাইড। তোর হস্টেলের ঘরে ইন্টারনেটের প্লাগ ইন ছিল; আমি মাসে একবার সাইবার কাফে গিয়ে যখন লগ ইন করতাম তখন গাদা গাদা বিজনেস মেল মুছে আঙুলে ব্যথা হয়ে যেত, সময় আর পয়সা দুই-ই নষ্ট হতো, তার থেকেও বেশি খারাপ হতো মেজাজ। তার ওপর গুঁইবাবুর নাতি সারাক্ষণ নজরদারির অছিলায় আমার স্ক্রিন পড়তো, গায়েও পড়তো। মফস্বলের গায়েপড়ামি তো আর জীবনে বুঝতে হলো না, হলে বুঝতিস প্রাইভেসির অ্যাইসি কী ত্যাইসি কাকে বলে।”

    ধৃতিকান্তর ‘এমনি’ অমলেটও খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা বলেছিল, “কী খাবি-–আইসক্রিম না চিলড রসগোল্লা?” ধৃতিকান্তর পছন্দ ছিল অন্য, বলেছিল, “গরম পান্তুয়া পেলে ভালো হতো।” ফ্রিজ থেকে পান্তুয়া বার করে সুরচিতা মাইক্রোওয়েভে দিয়ে তাতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ধৃতিকান্ত পান্তুয়া রেখে বাসন মেজেছিল। আর গুম হয়ে গিয়েছিল।

    ছেলেটা জামাকাপড় বদলে যখন বসার ঘরে ফিরে এসেছিল, ততক্ষণে ডিভান দখল করে বিছানা পাতা হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা একটা মোড়ায় বসে বই পড়ছিল। ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেটে যাওয়া দিন আর ফিরবে না। আস্ত আমি তো এসেছি, তোর অভিমান কী করে জিতি বল?” সুরচিতার গলা বুজে এসেছিল। বলেছিল, “তুই আমার আকৈশোরের একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দিলি!” উৎসাহ পেয়ে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “তাহলে তুই আমাকে বিয়ে করবি?” সুরচিতা এবার খুব স্নেহে ধৃতিকান্তর হাতের তালুতে নিজের হাত বুলিয়ে বলেছিল, “না, করব না। জানি তুই কষ্ট পাবি। কিন্তু তবু--করব না। করতে পারব না। করলে আমি কষ্ট পাব।” ধৃতিকান্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “কষ্ট পাবি কেন? তুই কি অন্য কাউকে--” থেমে গিয়েছিল তার প্রশ্নে সুরচিতার ইতিবাচক ঘাড় নাড়া দেখে।

    ধৃতিকান্ত ডিভানে ধপ করে বসে পড়তে সুরচিতা নীরবতা ভেঙেছিল, “অন্য কাউকে ভালোবাসি বলে তোকে বিয়ে করব না এমন নয়। জানি একদিন তোর মতোই সে উদয় হবে তার ভালোবাসার দাবি নিয়ে...” ধৃতিকান্ত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল, “তবে কী? তুই সন্ন্যাসিনীদের নিয়ে খোরাক করবি, যাকে ভালোবাসিস তাকে বিয়ে করবি না...কী ন্যাকামি এসব?” সুরচিতা ধাঁধার সমাধান করে দিয়েছিল, “দেখ ধৃতি, যখন কলেজে পড়তাম তখন একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের একটু মেশামিশি হলে যদি একজনের অন্যজনকে ভালো লাগত তাহলে সে কথা জানাজানিও হয়ে যেত। জানার পর কিছুদিন কী করি কি না করি করে অন্যজন একটা সম্পর্কে রাজিও হয়ে যেত বেশিরভাগ সময়েই। তারপরে সেসব সম্পর্ক টিঁকে গেছে বা ভেঙে গেছে, বা ভেঙে জোড়াও লেগেছে। সেরকম সময়ে যদি বলতিস, তাহলে হয়তো আমিও ধানাইপানাই করে রাজি হয়ে যেতাম। কিন্তু--” ধৃতিকান্ত গর্জে উঠেছিল, “আমি সেদিন বলি নি বলে--” সুরচিতাও বাধা দিয়েছিল, “আমি মোটেও বলছি না যে সেদিন না বলে এতোদিনে বলছিস বলে আমি রাজি নই।” ধৃতিকান্ত হতাশ গলায় বলেছিল, “আমি জানি, তৈরি হয়ে কোমর বেঁধে আসতে গিয়ে আমি দেরি করে ফেলেছি। আমার আগে কেউ তোকে--। ছাড়। কলেজে তুই সারাক্ষণ খিঁচিয়ে থাকতিস। কিচ্ছু পছন্দ নয় তোর। শুধু নম্বর পেতে হবে। ফার্স্টক্লাস পেতে হবে। ফার্স্টক্লাস পেয়ে কী করবি? কোথায় মাস্টার্স করবি? কোথায় পিএইচডি করবি? কিচ্ছু দিশা নেই। শুধু ছুটছে দম দেওয়া পুতুলের মতো। কাউকে বিশ্বাস করতিস না। আমি তোকে তাই বলতে পারিনি, যদি আমার বন্ধুত্বও বাতিল করিস! তারপর আমরা সবাই শহর ছেড়ে চলে গেলাম। তোকে দিয়ে কোনো ইন্‌স্টিটিউশনের ফর্ম পর্যন্ত তোলানো যায় নি। তোকে নাকি তোর বাবা-মা যেতে দেবেন না। এতোদিন পরে যখন দ্বিধার বয়স পেরিয়ে আমরা ধৈর্য ধরতে শিখেছি মনে করলাম তখন দেখি--। তোর বিয়েতেও কি বাবা-মায়ের আপত্তি?”

    প্রশ্নটা না পেলে সুরচিতার জবাব দেওয়ার কিছু ছিল না। সবটাই সে বুঝেছিল। খুব শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল, “তোর পুরো ভাবনার ওপর আমি শ্রদ্ধাশীল। যা করেছিস তার থেকে ভালো কিছু হয় না আমার বিবেচনায়। তোর প্রশ্নের উত্তর হলো যাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করব শুনলে বাবা-মার সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস হবে। তবে বিয়ে না করার সেটা কারণ নয়। সেটা কাল বলব। তোকে বিয়ে করলে বাবা-মার আপত্তি হয়তো হতো না। অন্তত তোকে ঠিকানা দিয়েছেন; আজ তুই আসতে পারিস মনে করে মা আজ ফোনও করল না। এসব দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তুই কী আমার বাড়িতে জানিয়েছিস যে তুই কোথায় থাকিস এখন, কী কাজ করিস আর আমার কাছে কেন আসছিস?” ধৃতিকান্তর উত্তর সুরচিতার অজানা ছিল না। সে বলেছিল, “না, তোর বাবা ফোন ধরেছিলেন। তোর মোবাইল নাম্বার দিলেন, ঠিকানা দিলেন। আজ এলে তোকে পাব কিনা সেটা আমিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি যদিও তিনটে হাওয়াই আড্ডা পার হয়ে তবে তোর এখানে এলাম, কিন্তু তোর বাবাকে ফোন করেছিলাম ইউসিএলএ থেকেই।” সুরচিতা পুরোনো দিনের মতো উচ্ছসিত হয়ে বলেছিল, “বস! তুমি তো হলিউডের কোলের ছেলে এখন।” ধৃতিকান্ত হেসেছিল মুচকি। সুরচিতা আবার বলেছিল, “বাবা কী জানেন যে তুই আইএসডি করছিলি?” ধৃতিকান্ত নেতিবাচক মাথা নেড়েছিল। তারপর বলেছিল, “চিতা, তুই সত্যিই ডিজিট্যাল পৃথিবীর বাইরে। এখন আইএসডি করার দরকার পড়ে না। ভিওআইপি দিয়েই সস্তায় কথা বলা যায়।” শ্রোতার গোল গোল চোখ দেখে আবার বলতে শুরু করেছিল, “ভিওআইপি মানে--” তাকে মাঝপথে থামিয়ে সুরচিতা বলেছিল, “নে এবার ঘুমো। আমার পড়শিরা আবার চারটে থেকে উঠে ঘন্টা বাজাতে শুরু করবে।”

    সকাল বেলা দুকাপ চা হাতে বসার ঘরে এসেছিলো সুরচিতা। ধৃতিকান্ত তখনও ঘুমোচ্ছিল। সুরচিতা ওকে ডেকে তুলতে ও উঠে বসল ধড়মড়িয়ে। তারপর হাই তুলতে তুলতে বলল, “ওরে বাবা চারটের সময় অতো ঘন্টা বাজল কেন? তারপর গুনগুন করতে করতে লোকজন যায় আর আসে, যায় আর আসে। ঘুমের দফারফা।” সুরচিতা ‘আগেই-তো-বলেছিলাম’ জাতীয় একটা ভঙ্গিমায় জবাব দিয়েছিল, “সন্ন্যাসিনীরা ছটায় ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়েন। অন্ধকার থাকতে উঠে ধম্মকম্মে লাগেন। ঊষালগ্নে গুহার মধ্যে রাখা জাগ্রত দেবতার মূর্তিতে অর্ঘ্য অর্পণ করে জপতপ সারেন। তারপর উপাসনাকেন্দ্রে গিয়ে ভগবানের অবতারদের গানটান শোনান। ফের পুরুত শান্তির জল ছেটান আর সবাই মাথা পেতে নেন; তারপর “নবজন্মের আরক” বা “এলিক্সির অফ রিজুভেনেশন” নামে ভগবানের প্রথম অবতারের আঙুলের ডগা ছোঁয়া চিনির জল খেয়ে নিজেদের হেঁসেলে ঢোকেন। বরাদ্দ মতো দুধ বা চা, পাঁউরুটি, কলা, ডিম, আপেল যে যা খান তাই খেয়ে যার যা কাজ তাতে লেগে পড়েন। মানে কেউ রান্না করেন, তো কেউ করেন মশলা, কেউ বাসন মেজে ধুয়ে মুছে তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখেন, কেউ কেউ কাপড় জামা চাদর লেপ বালিশের ওয়াড় পিছনের বাগানের উনুনে সাবান দিয়ে সেদ্ধ করে কেচে ধুয়ে শুকোতে দেন, কেউ বা আবার ঘর বারান্দা উঠোন সব ঝাড়ু দিয়ে মুছে সাফ করেন। মানে সন্ন্যাসিনীরা সব কাজ সারেন, একা একা বা দলে দলে। এতক্ষণে তাঁরা কাজ শেষ করে ফেলে নিজের নিজের জপমালা বা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বসে গেছেন বাগানে বা বারান্দায় বা বসার ঘরে। বারোটার ঘন্টা বাজলে আবার হেঁসেলে যাবেন, ডাল-ভাত-তরকারি খাবেন, বাসন-কোসন মাজবেন ফের দিবানিদ্রা দেবেন, বা আচার শুকোবেন কী লেস বুনবেন, কিংবা সোয়েটার। কেউ কেউ পাড়াও বেড়াতে বেরোন। বিকেলে উপাসনাকেন্দ্রে গিয়ে পিয়ানো বাজিয়ে গান-টান গাইবেন। তারপর রাতের খাওয়া সেরে নেবেন। তাহলে বুঝেছ? এখানে তুমি চাও বা না–চাও ভোররাতে ঘুম ভাঙবেই। তবে দিনের কাজে কেউ কেউ আবার আপোশও করবেন। সরেজমিনে দেখতে আসবেন আপ হামারে হ্যাঁয় কৌন?” ব্যাজার মুখে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “আমি তোর ভেতরের ঘরে ঘুমোতে যাচ্ছি।” ঝটিতি জবাব দিয়েছিল সুরচিতা, “বাব্বা শুধু পুরুষবন্ধু নয়, এক্কেবারে বেডরুমে! কী মশলা গো সন্ন্যাসিনীদের পানসে জীবনে! ওঁরা বচ্ছরভরের খোরাক পাবেন রে, আমাদের দুহাত তুলে আশির্বাদ করবেন।” ধৃতিকান্ত ঘরের ভেতর থেকে গজগজ করে কী বলেছিল শুনতে পায় নি সুরচিতা।

    স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছিল সুরচিতা। তারপর আবার চা নিয়ে বসে ও খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতেই ধৃতিকান্ত স্নান সেরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। খাওয়া সেরে বেরোনোর মুখে দেখা হয়ে গিয়েছিল একদল সন্ন্যাসিনীর সাথে। ওঁরা গুহামন্দিরের বাগানের পরিচর্যা সেরে ফিরছিলেন বাসায়। ওঁদের অনেকেই আবার সুরচিতার সহকর্মী। ওঁদের সাথে ধৃতিকান্তের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সে। সন্ন্যাসিনীরা পরামর্শ দিয়েছিলেন জেলাশহর টৌলিং দেখতে যাওয়ার। কারণ সেটা পুরোনো দিনের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হওয়ায় ঐতিহাসিক শহর। তারওপর স্থানীয় মানুষের উৎসাহে ইতিহাস সেখানে এখনও জেগে আছে গলিঘুঁজি থেকে রাজপথে। ফলে বেশ আকর্ষণীয় গম্ভীর জায়গা। আবার পুরোনো রঙে রাঙা হলেও বেশ ঊজ্বল। তারপর ওঁরা ঘুরে ঘুরে ধৃতিকান্তকে দেখিয়ে ছিলেন গুহামন্দির, উপাসনাকেন্দ্র, আর আবাসিক অংশ বাদে মঠের আনাচকানাচ। সিঁড়ি দিয়ে হাইওয়েতে নেমে সুরচিতারা ট্রেকার পেয়ে গিয়েছিল টৌলিং-এ যাওয়ার। চকে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বকবক করতে করতে বাছাই করা রেস্তোরাঁতে পৌঁছে ওরা খাওয়া-দাওয়াও সেরেছিল। মধ্যে মধ্যে চলছিল টুকটাক কথাবার্তা আর তর্কাতর্কি। সুরচিতা খুব খোলামনেই তার মনের অবাক চেহারাটা মেলে ধরেছিল যে তেরটা বসন্ত ধৃতিকান্ত একলা কাটিয়েছে। ধৃতিকান্ত হেসে বলেছিল, “তুইও তো প্রেমিককে ছেড়ে অনির্দিষ্টকাল নির্বাসন নিয়েছিস। কী করে আছিস?” সুরচিতা বলেছিল, “কাজ নিয়ে।” ধৃতিকান্ত জবাবে বলেছিল, “আমি কী শুয়ে বসে খেলে কাটিয়েছি এতোগুলো বছর?” তারপর প্রায় বুজে যাওয়া স্বরে গলার কাঁপন লুকিয়ে বলেছিল, “একটা জলজ্যান্ত স্বপ্ন থাকলে, সেটা সত্যি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকলে, বছরগুলো চোখের নিমেষে পার হয়ে যায়। যেখানে যা কিছু সুন্দর দেখেছি সব জায়গায় তোকে আমার পাশে টের পেয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি সেসব নেহাতই কাঁচা মনের কল্পনা।” তারপর মুহূর্তেই গলার উদাসভাবে ঝেড়ে বলেছিল, “পড়ানোর কাজে আর কত সময় যায় তোর? বাকি সময় কিসে যায় তোর?” সুরচিতা গলায় দুষ্টুমি জড়িয়ে বলেছিল, “ছক কষে। কীসের ব্যবসায় মূলধন কতো লাগে, লোক কতো লাগে, টেকনোলজি কী লাগে, কতগুলো লোকের কত সময়ের এমপ্লয়মেন্ট হয় এইসব। বাচ্চাদের মনস্তত্ত্বের বই পড়ে। ধেড়েদের মুখে খুড়োর কল ঝোলাবার ফিকির খুঁজে। খুড়োর কল কাস্টমাইজ করার প্ল্যানে। ধেড়েদের মনস্তত্ত্ব আর মন প্রভাবিত করার উপায় খুঁজে।”

    ধৃতিকান্তর ফেরার ফ্লাইট ছিল পরদিন ভোরে। তাই খাওয়ার পরেই ওরা ন্যারোগেজ ট্রেনে চেপে বসেছিল। এটা সেটা বকবক করতে করতেই ধৃতিকান্ত বলে ফেলেছিল, “এখানে কী রাজনীতি নেই? ঝগড়া নেই? আমাকে বোঝাতে আসিস না যে প্রতিষ্ঠান আছে আর তাতে ক্ষমতা দখলের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটা এই সব মহিলারা ছেড়ে দিয়েছেন।” সুরচিতা অস্বীকার করেনি, “আছে সবই। কালই বললাম তো। কিন্তু আমার সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সরকারি গ্রান্ট পায় মিশন, ইস্কুল চালাবার জন্য। তার শর্ত পালনের জন্য আমার মতো দুচারজন অধার্মিককে মাইনে দিয়ে, পেনশনের ভরসা দেখিয়ে ওদের পুষতে হয়। তার সাথে লোভ আছে আমাদের ধর্ম দীক্ষা দিয়ে ইন্সেন্টিভ কামানোর। সিম্বায়োসিস, বন্ধু। আমরা একসাথে আছি।” ধৃতিকান্ত জানতে চেয়েছিল, “সারা জীবন এমনই কাটাবি তাহলে?” সুরচিতা দুদিকে মাথা নেড়ে বলেছিল, “বলতে পারব না। গত কয়েক বছরে জীবনের যে দিশা দেখেছি, যা করে চলেছি, যা করতে চাই আজ সবই এখানে আসার পরে ঠিক করা। যা ভেবে এখানে এসেছিলাম তার সাথে সে সবের কোনো মিলই নেই। আগামী কয়েক বছর কী করব জানি আজ। কিন্তু সেই ‘কয়েক’ বছরের মধ্যে ঠিক কটা বছর, বা মাস, বলতে পারব না। তারপর জীবন যেরকম ভাবাবে সেরকম চলব।” ধৃতিকান্ত অধৈর্য হয়ে বলেছিল, “কোনো মানে হয়? দশ বছর পর তোর যদি মনে হয় ‘আমাজনের জঙ্গল দেখি’, পারবি না। তখন শরীরের জোরও থাকবে না। হতাশ হয়ে যাবি--।” সুরচিতা সামলে নিয়েছিল তর্কের সেই উত্তপ্ত উন্মত্ততা, “যখন ইচ্ছে হবে তখন চেষ্টা করব এই মিশনের আমাজন শাখায় বদলি নেওয়ার। না হলে যে দেশের কারেন্সি তখন স্ট্রঙ্গেস্ট থাকবে সে দেশে পোস্ট ডক করতে চলে যাব। কয়েক বছরে আমাজন দেখার পয়সা উঠে আসবে।” তখন ধৃতিকান্ত শান্ত হয়ে বলেছিল, “তাহলে পিএইচডি করে ফেলেছিস?” সুরচিতার চেহারায় ফুটে ওঠা সম্মতি দেখে আবার বলেছিল, “সে অবশ্য পোস্ট ডক করতে তো যখন তখন যাওয়াই যায়--কিন্তু কতদিন করেছিস পিএইচডি? তারপর কী আর অ্যাকটিভলি রিসার্চ করছিস? না হলে--” কথা কেড়ে নিয়েছিল সুরচিতা, “পিএইচডি পেলাম তাও বছর পাঁচেক হলো। তারপর থেকে যা কাজ করছি তা নিয়ে গোটা তিনেক পেপারও বেরিয়েছে রে, তবে সেগুলো সবই সোশ্যাল সায়েন্স জার্নালে।” ট্রেন তখন তিনপাহাড়ি ঢুকছিল। সুরচিতা সিট থেকে উঠে দরজার দিকে যাচ্ছিল। ধৃতিকান্ত সমাহিত গলায় বলেছিল, “তোর সাথে আবার কবে দেখা হবে?” সুরচিতা হেসে বলেছিল, “হবে হয়তো। এত ভাবিস না।” তারপর টুক করে নেমে পড়েছিল। ওকে বেশ খানিকটা উজিয়ে গিয়ে চড়াই ভাঙতে হতো। ধৃতিকান্ত এগিয়ে গিয়েছিল জাংশনের দিকে, সেখান থেকে এয়ারপোর্টে গিয়ে ওর রাত্রিযাপন ও উড়ানের পরিকল্পনা ছিল।

    এর পরেঃ আত্মপক্ষ

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)