ISSN 1563-8685




কোথাও জীবন আছে

।। ১২ ।।

কাল সকাল শিলাদিত্যকে ফেসবুক-এ পাবে, মৃণালিনী ভাবতেই পারেনি! এমনিতে তো প্রত্যেক রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা তীর্থের কাকের মতো কম্পিউটারের সামনে বসে থেকেও ফল হয় না। লাভের মধ্যে মা এসে গুচ্ছের চেঁচামেচি করে যান। একেই তো আজকাল বাড়ির লোকেদের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না একদম, উপরন্তু এই কারণেও নিত্যদিন অশান্তি, আর মৃণালিনীর রাতের ঘুম মাটি হচ্ছিল। আজ সকালে কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে! বেলা দশটার সময় উঠে কোনোমতে একটু জলখাবার গিলেই কম্পিউটার নিয়ে পড়েছিল সে; শিল্‌দার কারণে নয় অবশ্য, নতুন একটা ইংরেজি সিনেমা ডাউনলোড করবার আশায়। ফেসবুকটা অভ্যাসবশতঃ খোলা ছিল। এমন সময় চ্যাটবক্স খুলে গেল!

“কি খবর, আছো নাকি?”

উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছিল মৃণালিনীর। দশবার টাইপ করে, দশবার মুছে, অবশেষে জবাব দিল, “হুঁ।”

“যাক বাবা! আমি তো ভাবলাম তুমি শুধু শুধুই একখানা প্রোফাইল খুলে রেখেছো। কোনোদিন তোমার টিকির দেখাও পাওয়া যায় না।”

ভীষণ রাগ হল মৃণালিনীর। প্রত্যেকদিন হাঁ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর আজ ছোঁড়া বলে কিনা —! ঝড়ের বেগে টাইপ করতে গিয়ে কি-বোর্ডটা প্রায় ভেঙেই ফেলছিল আর কি।

“আমার টিকির দেখা পাওয়া যায় না, নাকি উলটোটা? তোমার প্রোফাইল তুমি ক’দিন খোলো সে তো তোমার আপডেট্‌স দেখলেই বোঝা যায়। ভাঁট বকার জায়গা পাওনি?” “হেঃ হেঃ, চটে গেলে দেখছি। জাস্ট ইয়ার্কি মারছিলাম তো। যাই হোক, কিন্তু সেই যে একবার মাসকয়েক আগে বাড়িতে একবার মুখ দেখিয়ে গেলে, তারপর একেবারে নো-পাত্তা কেন? পুজো-টুজো পেরিয়ে গেল, এদিকে তোমার যে আদৌ জন্ম হয়েছে তারই তো কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না। অন্যান্যবার তো একসঙ্গে পুজো দেখতে বেরোবারও একটা গল্প থাকে। সেদিন যেন মনে হল আমাকে দূর থেকে দেখতে পেয়েও সুট করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলে। কেসটা কি বলো তো?”

কি উত্তর দেবে মৃণালিনী? অনেক ভেবে-চিন্তে লিখল, “আসলে ক’দিন একদম বেরোতে পারিনি। পরীক্ষা চলছিল তো।”

“তাই? নাকি নতুন-নতুন বন্ধু জুটিয়ে পুরোনো দাদাটাকে বেমালুম মেমরি থেকে ডিলীট?”

মৃণালিনী দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, “সেই চেষ্টাতেই তো ছিলাম, কিন্তু পারলাম কই!”

চ্যাটে অবশ্য লিখল, “সেন্টি মারবে না।”

“আচ্ছা বাবা, অন্যায় হয়েছে। এখন বলো দেখি খবর কি?”

“কিছুই না। পরীক্ষা শেষ, ক্লাস চলছে, জানুয়ারী মাসে প্রি-বোর্ড। আপাততঃ বোরিং জীবন।”

“বটে? আজকের মতো জীবনটা একটু ইন্টারেস্টিং বানাতে চাও?”

মৃণালিনী কৌতুহলী হয়ে লিখল, “কিভাবে?”

“একটু কষ্ট করে বাড়ি থেকে বেরোও। তারপর হাজরা মেট্রো স্টেশনের কাছে এসে দাঁড়াও। আর হ্যাঁ, বাড়িতে বলে দিও যে দুপুরে বাইরে খাবে।”

মৃণালিনী আঁতকে উঠে লিখল, “সেকী! মা ঠ্যাঙাবে ধরে।”

“কিচ্ছু ঠ্যাঙাবে না। বলবে, আমি খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছি। যাবে তো?”

মৃণালিনীর বুকের মধ্যে ঘোড়দৌড় শুরু হয়ে গেছে। শিল্‌দা তাকে নিজে থেকে বেড়াতে নিয়ে যাবে বলল! সঙ্গে আবার লাঞ্চ! চার হাত-পা তুলে নাচতে ইচ্ছে করছিল তার। তিন-চারবার নানা সুরে গেয়েও ফেলল, “আই অ্যাম গোয়িং অন আ ডেট, আই অ্যাম গোয়িং অন আ ডেট!”

চ্যাটে অবশ্য উচ্ছ্বাসের ছিঁটেফোটাও প্রকাশ করল না; ‘ওকে’ লিখে কম্পিউটার বন্ধ করে দিল। আজকের দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে, সত্যি!

ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, বাবা খাওয়ার টেবিলে দিস্তা-দিস্তা খাতা দেখতে বসেছেন। গলা-খাঁকারি দিয়ে বলল, “ইয়ে, একটু বেরোব।”

বাবা কথাটাকে ভাল করে না শুনেই নিবিষ্টমনে খাতা দেখতে দেখতে বললেন, “হুঁ, যা না।”

মা রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে বেরিয়ে এসে বললেন, “কোন চুলোয় আবার বেরোচ্ছিস? কখন ফিরবি?”

“ইয়ে... মানে... আসলে শিল্‌দা কোথায় একটা খাওয়াতে নিয়ে যাবে বলছিল...”

মৃণালিনী ভেবেছিল, মা বুঝি চটবেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড, মা একগাল হেসে বললেন, “ওঃ, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক কথাই তো! আজ তো ছেলের জন্মদিন। তা, বেশি সন্ধ্যেবেলা করিসনা, কেমন? আর শোন্‌, খালি হাতে গিয়ে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলিস না, কিছু একটা গিফ্‌ট নিয়ে যাস। দরকার হলে আলমারি থেকে টাকা বার করে নে।”

মা খোশমেজাজে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। মৃণালিনী তাজ্জব মেরে গেল। শিল্‌দার জন্মদিন আজকে, মায়ের মনে আছে, অথচ তার নিজের মাথা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে গেছে? হাত কামড়াতে ইচ্ছে করল তার। খুব ভাল কিছু একটা উপহার দিয়ে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। ... কিন্তু কী দেওয়া যায়? ঘরের মধ্যে চরকিপাকের মতো খানিকটা পায়চারি করে নিল মৃণালিনী। উপলা হলে নিশ্চয়ই বই দিত। তিলোত্তমা দিত স্টেশানারী জাতীয় জিনিস। নীরা বোধহয় গানের সিডি দিত। আর শরণ্যা... ঠিক! শরণ্যাকেই ধরতে হবে। লোক বুঝে কাকে কী দিতে হয়, সেটা শরণ্যার সবচেয়ে ভাল রপ্ত আছে। তাড়াতাড়ি নম্বর ঘোরাল। খানিক পরে কিছুটা যেন ব্যাজার গলায় আওয়াজ এল, “হুঁ, কি হয়েছে?”

মৃণালিনীর তখন কুশল প্রশ্ন করার সময় নেই। এক নিঃশ্বাসে বলে গেল, “শিল্‌দার জন্মদিন — ডেট — ভুলে গেস্‌লাম — কী গিফ্‌ট দেব?”

“হ্যাঁ-অ্যাঁ?” শরণ্যা হতভম্বের মতো বলে, “কি বলছিসটা কী? ধীরে-সুস্থে গুছিয়ে বল। শিল্‌দার কী হয়েছে?”

খুব একটা ধীরে-সুস্থে না হলেও, যতটা সম্ভব সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল মৃণালিনী।

“ওঃ, এই ব্যাপার!” শরণ্যা হা হা করে হেসে উঠল, “আরে, তোর তো জ্যাকপট লেগে গেল রে!”

“ভাঁট না বকে কাজের কথাটা বল্‌ না রে!” লিনী দাঁত কিড়মিড় করল।

“আমি কী বলব? শিল্‌দাকে কে চেনে, তুই না আমি? শিল্‌দার কী পছন্দ-অপছন্দ সেটা তো তোর জানার কথা।”

“আশ্চর্য তো!” মৃণালিনী অধৈর্য্য, “জানবই যদি, তাহলে তোকে ফোন করতে যাব কেন? বল্‌ বলছি, নইলে জাস্ট কুপিয়ে দেব ক্লাসে গিয়ে।”

“কী কাণ্ড! আচ্ছা দাঁড়া,” শরণ্যা খানিকক্ষণ ভেবেচিন্তে বলে, “হ্যাঁ, ভাল কথা, শিল্‌দা না বেড়াতে ভালবাসে?”

“হ্যাঁ বাসে তো।”

“তাহলে ওটার সঙ্গে রিলেটেড কিছু দিয়ে দে।”

“ওটার সঙ্গে রিলেটেড?” মৃণালিনী হতভম্ব।

“ওঃ, লিনী, এর পরেরটুকু বার করতে একটু মাথা ঘামাতে হলে কি ক্ষয়ে যাবি তুই?”

শরণ্যা বিরক্ত হয়ে বলে, “শিল্‌দাকে তো আর আমি হাতাতে চাইছি না, চাইছিস তুই। তাহলে কষ্ট করে তোকেই ভাবতে হবে।”

“আরে এই রিকু — মানে অত্রিকে দেখ না!” মৃণালিনী বিপন্নভাবে বলল, “বন্ধুর আইডিয়া নিয়ে ক্যায়সা —”

“আমিও তো আইডিয়া দিলাম। কিন্তু ফাইনাল চয়েসটা তোমাকেই করতে হবে বন্ধু। নইলে সেটা চীটিং কেস। ওকে, রাখলাম এখন, কী হল-টল কাল ইস্কুলে গিয়ে বলবি শালা। বাই!”

মনের মধ্যে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে পাড়ার স্টেশানারী দোকানটায় ঢুকল মৃণালিনী। মাথাটা একেবারেই কাজ করছে না। বেড়াতে যাওয়া নিয়ে আবার কাকে কী দেওয়া যায় রে বাবা! দোকানে ঢুকে এমনিই এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিল সে। আর কিছু না হোক, একখানা বার্থডে কার্ড দিলেও মুখ-রক্ষা হয়। হঠাৎ করে খাতাপত্র সাজানো কাচের আলমারিটার দিকে চোখ যেতেই লাফিয়ে উঠল।

“এই এই, কাকু! ওই খাতাটা বার করো তো শিগগির! না, না, পাশেরটা, পাশেরটা! হ্যাঁ — জলদি।”

মৃণালিনী যতীন দাস পার্ক স্টেশনের কাছে যতক্ষণে পৌঁছাল, ততক্ষণে শিলাদিত্য ঘন-ঘন ঘড়ি দেখছে। আজ একটা নীল-চেক ফুলশার্ট হাতা গুটিয়ে পরেছে, সঙ্গে জিন্‌স, কাঁধে বেশ কেতার এক স্লিং ব্যাগ। তাকে দেখতে পেয়েই মাথা নাড়ল, “সত্যি, লেট-এর তো একটা মা-বাপ থাকে, নাকি?”

মৃণালিনী গম্ভীরভাবে ব্রাউন পেপারে মোড়া প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নাও।”

শিলাদিত্য অবাক হয়ে প্যাকেটের মধ্যে উঁকি মেরে বলল, “কী এটা?”

“ট্র্যাভেল স্ক্র্যাপ্‌বুক। যেখানে যেখানে বেড়াতে যাও, সেখানকার অভিজ্ঞতা রেকর্ড করে রাখার, আর সেখানকার ছবি, টিকিট, বা অন্য কিছু স্যুভেনির স্টিক করে রাখার জন্য খাতা।”

শিলাদিত্য ততক্ষণে খাতাটা উলটে-পালটে দেখছিল। এবার বিস্মিতভাবে বলে উঠল, “কি আশ্চর্য! ঠিক এরকম একটা জিনিস আমার বহুদিন ধরে দরকার ছিল, কিন্তু আমিই জানতাম না! কিন্তু... এটা হঠাৎ কেন... ?”

“গিফ্‌ট। আজ তোমার জন্মদিন না?”


*

মৃণালিনীর ফোন আসবার পর থেকেই শরণ্যার মনের ভিতরটা অস্থির লাগছিল। একাধারে লিনীর জন্য খুব আনন্দ হচ্ছিল তার। সত্যি, কতদিন পরে মেয়েটা ওর পছন্দের মানুষের কাছে ঠিকঠাক পাত্তা পেল। নিজে মুখে না বললেও, শরণ্যার বুঝতে কোনো অসুবিধে হয়নি যে গত কয়েক মাস ধরে মৃণালিনী মনে মনে গুমরে গেছে। এমনকি, পাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ পায়, সেই ভয়ে তাদের চারজনের সঙ্গে বিষয়টা খোলাখুলিভাবে আলোচনাও করেনি। আজকের এই আউটিংটা তো ওর প্রাপ্য! কিন্তু শরণ্যার মন আজ বিষন্ন। সকাল থেকেই মম্‌-ড্যাডের মুখ অন্ধকার। রবিবার বলে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেই টের পেয়েছিল যে বাড়ির আবহাওয়া থম্‌থম্‌ করছে। আবার নতুন কী বাধল, কে জানে! এমনিতেই তো ওরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছে আজকাল। সানাকে এখন ফোন করা যাবে না; য়ু.কে-তে এখন সবে ভোর। অনেকবার দোনামোনা করে রঙ্গীতদার নম্বর ঘুরিয়েছিল। রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। এই সময়গুলোতে ভীষণ একা লাগে শরণ্যার। আসলে বাকি চারজনের তো যাবতীয় সমস্যার কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো একজন বিশেষ বন্ধু আছে। শরণ্যার এমন জ্বালা, তার অনেকে থেকেও কেউ নেই! আগে হলে নির্দ্বিধায় ছোটমাসিকে সব গড়গড় করে বলে দিত। কিন্তু এমন অনেক কথা আছে, যেগুলো কাগজে কলমে লিখতে বাধা পায় শরণ্যা। কবিতা লেখা তো সে কারণেই শুরু করেছিল — তাতে যে অনেকখানি হেঁয়ালী থাকে। এদিকে ছোটমাসির আবার ফোন করা পছন্দ নয়। সানার সঙ্গে তো গত এক বছরে এমনিতেই একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আর রঙ্গীতদা? শরণ্যা নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। রঙ্গীতদার জগতে তার জায়গা কোথায়? বছরে তিন-চারবার দেখা হয় মানুষটার সঙ্গে; ফোনও আসে গোনা-গুন্‌তি। নিজে থেকে বেশি ফোন করতে নিতান্তই সাহসের অভাব তার। আর ছেলেটা তো অরকুট-ফেসবুকে অবধি নেই, যে পরোক্ষভাবে খবর নিতে পারবে! নীরা-উপলা-মৃণালিনী-তিলোত্তমা তাদের নিজেদের জগতে মাঝে মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়লে শরণ্যার মনে হয়, যেন মহাসমুদ্রের মাঝখানে এক জনমানুষহীন দ্বীপে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। আচ্ছা, ড্যাড-এরও কি এরকম অনুভূতি হয়?

মনখারাপ কাটাতেই কিছুক্ষণ ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ালো শরণ্যা। ফেসবুকে সেরকম কেউই নেই। রণ্‌ধীরজীর ই-মেল এসেছে একটা। ওঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী হলেও, শরণ্যাকে কেন জানি একটু বেশি স্নেহ করতেন, তাই এখনও যোগাযোগ রেখেছেন। নিজের মেয়ের ছবি অ্যাটাচ করে পাঠিয়েছেন, গানবাজনা কেমন চলছে খোঁজ নিয়েছেন, মম্‌-ড্যাড-সানা-ছোটমাসি, সকলের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। মেলটা পড়ে সত্যিই ভাল লাগল। কম্পিউটার বন্ধ করে একবার নীচের ঘরে উঁকি দিল শরণ্যা। পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে মনে হল। দুজনেই এক টেবিলে বসে চা খাচ্ছে যখন। শরণ্যা নেমে এসে কাগজটা নিয়ে সোফায় বসে পড়ল।

লিটারারি সাপ্লিমেন্টের পাতাগুলো অন্যমনষ্কভাবে ওলটাতে ওলটাতে হঠাৎ কবিতার পাতায় চোখ আটকে গেল। কবির নাম পূজন মিত্র। শরণ্যা অবাক হয়ে ভাবল, এ কি রঙ্গীতদার সাহিত্য-সভার সেই বন্ধু পূজন? তার কবিতা আবার কাগজে ছাপাও হয়! কই, রঙ্গীতদার বাড়িতে তো একটা দিনের জন্যেও মুখ খোলে না? নিজের লেখা পড়ে শোনানো তো দূরেই থাক। অবশ্য এরা দুজন একই লোক কিনা তাই বা কে জানে। শরণ্যা কৌতুহলী হয়ে কবিতাটা পড়তে লাগলঃ

The moon has hatched its monster
That lurks about the chasms in time
Between sleep and awakening,
When you let out a stream of silent screams.
The moon is a hollow laugh of darkness;
The guardian of one-eyed beasts
That have crept out of their holes
To feed on every dream breath
That rise from all these corpses
In our secret necropolis.
পড়তে গিয়ে যেন একটা অন্য জগতে চলে গিয়েছিল শরণ্যা। সে জগতটা অন্ধকার, ভয়ানক, কিন্তু কি এক চুম্বকশক্তি লুকিয়ে আছে তার ভিতরে!

ড্যাড বোধহয় তার বিহ্বল অবস্থাটা লক্ষ্য করেছিল। জিজ্ঞেস করল, “কী এত মন দিয়ে পড়ছিস, রাকা?”

শরণ্যা অন্যমনষ্কভাবে জবাব দিল, “কবিতা।”

“কার কবিতা বেরিয়েছে আজকে?” মম্‌ চায়ের কাপ খালি করে বলে।

“পূজন মিত্র।”

“ও। ওই ভদ্রলোকের কবিতা মাঝে মাঝেই বেরোয়।”

শরণ্যা অবাক হয়ে বলল, “তাই নাকি? জানতাম না তো!”

“রেগুলারলি কাগজই পড়িসনা, কি করে জানবি।”

“ভাল লেখে কিন্তু।”

“নতুন রকম। ভাল-খারাপ বলতে পারব না; আজকালকার কবিতা আমি এমনই একটু কম বুঝি।”

“পূজন যে আদৌ কবিতা লেখে আমি তাই জানতাম না!”

“তুই চিনিস নাকি লোকটাকে?” এবার মমের অবাক হবার পালা।

শরণ্যা কিছুটা আত্মগতভাবে বলল, “বোধহয়।”

কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে কবিতাটা তারই চেনা পূজনের লেখা। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে ড্যাড বলল, “কবিতাটা দিয়ে যা তো, পড়ে দেখি।”

নিজের ঘরে এসে আরেকবার রঙ্গীতদার নম্বর ঘোরাল। যথারীতি, উত্তর নেই। কী করা যায়? কৌতুহলটা চেপে বসেছে তাকে। রঙ্গীতদাকে না পাওয়া গেলে অগত্যা ঋদ্ধিমানদাকেই ফোন করতে হয়। ও যে কলকাতার বাড়ির আড্ডার নিয়মিত সদস্য তাই নয়, রঙ্গীতদার অনেককালের বন্ধুও বটে। আগে হস্টেলে থেকে রঙ্গীতদার সঙ্গেই শান্তিনিকেতনের স্কুলে পড়ত; পরে অবশ্য কলকাতার স্কুলে ফিরে এসেছিল। এ বিষয়ে কিছু জানবার থাকলে ওই ভাল বলতে পারবে।

ফোন করার খানিক পরেই হাসি-হাসি গলা পাওয়া গেল, “আরে, ঈদের চাঁদ যে! সাতসকালে কী ব্যাপার?”

শরণ্যা হেসে ফেলল। কালেভদ্রে দেখা হয় বলে ঋদ্ধিমানদা তাকে এই নামে ডাকে।

“কেমন আছো ঋদ্ধিমানদা?”

“দিব্যি! কলেজ যাচ্ছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি, প্রেম করছি, দাদাকে জ্বালাতন — তা তোর খবর কি শুনি? লেখালেখি চলছে?”

“ওই আর কী। এখন পর পর পরীক্ষা চলছে... আর বাংলায় এমনিও ভাল লিখতে পারিনা।”

“বাংলায় না হয়, ইংরেজিতে লেখ। ভাষাটা ফ্যাক্টর নয়।”

“তা ঠিক। ভাল কথা, তোমার কাছে একটা দরকার ছিল।”

“সে আর জানিনা! দরকার না হলে কি আর ফোন করতিস তুই? যাক, বল কি ব্যাপার?”

“এই, এভাবে বোলোনা —”

“আরে না রে বাবা, জোক্‌ ছিল। বল্‌।”

“বলছি তোমার কাছে পূজনের নম্বর আছে?”

“পূজন!” ঋদ্ধিমানদা একটু অবাক হয়ে বলল, “মানে পূজন মিত্র? রঙ্গীতের সেই আঁতেল কবি?”

শরণ্যা আগ্রহী হয়ে বলে, “সে কবিতা লেখে তুমি জানো?”

“হ্যাঁ, জানব না কেন? ওই সূত্রেই তো রঙ্গীতের সঙ্গে আলাপ। একবার তার কবিতা পড়ে রঙ্গীত আধ মাইল লম্বা এক চিঠি লিখে কাগজে পাঠিয়েছিল। তো সেই চিঠি পড়ে পূজন আবার ওর সঙ্গে কন্‌ট্যাক্ট করেছিল। তারপর যা হয় আর কি। কিন্তু তিনি আবার এতই উঁচুদরের কবি, যে আমাদের মতো অ্যামেচারদের সাহিত্য সভায় মুখ খোলাটাকে তাঁর সম্মানের অযোগ্য মনে করেন।”

শরণ্যা হেসে বলল, “পূজনকে একেবারে দেখতে পারো না মনে হচ্ছে?”

“সত্যি রে। তুই তো জানিস আমি এমনিতে ফ্রেণ্ডলি, খুব কম লোক আছে যাদের আমি অন্তর থেকে অপছন্দ করি। কিন্তু এই লোকটার চোখের দৃষ্টিটাই আমার ভাল লাগেনা। হি ইজ নট দ্য রাইট সর্ট। সে যাক, কিন্তু তার সঙ্গে কি দরকার?”

“নিতান্তই কেজো দরকার।”

“দেখিস বাপু, ওরকম লোকের সঙ্গে বেশি জড়াসনি।”

“আরে না রে বাবা,” শরণ্যা আশ্বাস দেয়, “জাস্ট্‌ একবার ফোন করব, একটা কথা জানব, ফোন রেখে দেব। জড়ানোর কোনো প্রশ্নই নেই।”

“বেশ, লেখ্‌ নম্বরটা।”

পূজনকে ফোন করতে একটু ইতস্ততঃ করছিল শরণ্যা। ঋদ্ধিমানদা যা বলল, তাতে তো মনে হয় লোকটা অহংকারী গোছের। যদি কথাই না বলতে চায়? কিন্তু শরণ্যার কৌতুহল বেড়েই চলেছে। কথা না বললে আর কীই বা হবে; ফোনটা নামিয়ে রেখে দেবে। সাত-পাঁচ ভেবে নম্বরটা ঘুরিয়েই ফেলল।

“হ্যালো,” ওপার থেকে খুব হালকা মিষ্টি গলা ভেসে এল। শরণ্যা একটু থতমত খেয়ে গেল। পূজনের গলার স্বর সে কোনোদিন শোনেনি, কিন্তু এই আওয়াজটা শুনে মনে হল যেন তার চেহারার সঙ্গে বেশ বেমানান।

“কে বলছেন?” কোনো সাড়া না পেয়ে স্বরটা আবার প্রশ্ন করে।

শরণ্যা আমতা আমতা করে বলে, “ইয়ে — এটা — মানে আর য়ু পূজন?”

“ইয়েস... মে আই নো হু ইজ স্পিকিং প্লিজ?”

“আমি শরণ্যা বলছি।”

“শরণ্যা?” আওয়াজটা খানিকক্ষণ থেমে বলে, “রঙ্গীতের শরণ্যা?”

কথাটা শুনে ভীষণ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। পূজন নিশ্চয়ই গভীর কোনও ইঙ্গিত করে কথাটা বলেনি। তবু মনে হল যেন লোকটা কোনো অদৃশ্য চোখ দিয়ে তার চেতনার অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা প্রত্যেকটা ভাবনা দেখে নিচ্ছে। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল শরণ্যার; ইচ্ছে হল ফোনটা নামিয়ে রাখতে।

“হ্যাঁ, রঙ্গীতদার বন্ধু শরণ্যা,” ‘বন্ধু’ শব্দটার উপর না চাইতেই বেশি ঝোঁক দিয়ে ফেলে সে।

“আই সী,” ওপারের স্বরে কৌতুকের আভাস পাওয়া যায় এবার, “সো হাউ মে আই হেল্প ‘রঙ্গীতদার বন্ধু’?”

“আজকের স্টেট্‌স্‌ম্যান-এ একটা কবিতা বেরিয়েছে, নাম ‘দ্য মুন’। ওটা কি তোমার লেখা?”

“হ্যাং অন্‌ আ মিনিট,” বলে পূজন খানিকক্ষণের জন্য চুপ করে যায়; ফোনের ওপার থেকে কাগজের পাতা ওল্টানোর শব্দ শোনা গেল।

“ওঃ, হ্যাঁ, আমারই তো। এটা জানতেই ফোন করেছিলে?”

“হ্যাঁ। আসলে কবিতাটা খুব... ”

“খুব কি?”

“ইন্টারেস্টিং। অন্যরকম।”

“তাই? আই অ্যাম ফ্ল্যাটার্ড। তুমিও লেখো; রঙ্গীতের বাড়িতে আমি শুনেছি।”

একটু থেমে পূজন যেন বিচারের রায় দেবার মতো বলে উঠল, “য়ু হ্যাভ ইট।”

এ কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারল না শরণ্যা। এর কী উত্তর দেওয়া উচিৎ সেকথা ভাবতে ভাবতেই শুনল পূজন জিজ্ঞেস করছে, “তোমার ডাকনাম রাকা না?”

শরণ্যা বেশ অবাক হয়ে গিয়ে বলল, “তুমি কি করে জানলে?”

“আই থিংক আই হার্ড রঙ্গীত কল্‌ য়ু বাই দ্যাট নেম,” এই বলে স্বরটা যেন আত্মগতভাবে হাসল, “ফানি; রাকা মানেও চাঁদ। ফুল মুন সেটিং ইন দ্য আওয়ার অফ ডন।”

আরেকবার কবিতার কথাগুলো মনে পড়ে গিয়ে শরণ্যার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঋদ্ধিমানদা এর ব্যাপারে যা বলেছিল তা সত্যি কিনা কে জানে, কিন্তু লোকটা যে বেশ অদ্ভুত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে সাবধানী গলায় বলল, “তাহলে রাখি? কথা হবে আবার।”

“শিওর। বাই।”


*

“এমন আবহাওয়ায় আমার এইসব রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে যে কী ভাল লাগে, কি বলব!” শিলাদিত্য খুশি-খুশি গলায় বলে।

একটু আগেই ‘হাটারি’-তে চাইনিজ খেয়ে বেরিয়েছিল ওরা। হাঁটতে হাঁটতে গোলপার্কের কাছাকাছি চলে এসেছিল প্রায়। এতক্ষণ ভিতরের গাছে-ঢাকা রাস্তাগুলো ধরে ঘুরছিল। মৃণালিনী অবশ্য বেশি কথা বলছিল না। মাঝে মাঝে দু-একটা হুঁ-হাঁ দিচ্ছিল শুধু।

“ব্যাপার কি! আমাকে তখন থেকে সাইলেন্ট ট্রীটমেন্ট দিচ্ছ যে? লাঞ্চ পছন্দ হয়নি নাকি?”

“না না, তা নয়,” মৃণালিনী তাড়াতাড়ি বলে, “হাটারি তো আমার ফেভারিট জায়গা। আমি অন্য কথা ভাবছিলাম।”

“কি ভাবছিলে?”

“ভাবছিলাম, বার্থডেতে আর কাউকে ডাকলে না কেন?”

শিলাদিত্য ফাজিলভাবে বলল, “তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে, যে ডাকব!”

মৃণালিনীর হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠলেও, বাইরে বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলল, “ধুর শালা, আবার শুরু হল ন্যাকামি! সিরিয়াস একটা প্রশ্ন করছি —”

শিলাদিত্য হো-হো করে হেসে উঠে বলল, “সত্যি, তুমি না একটা জিনিস বটে! চার বছর ধরে দেখে আসছি, সেই বেরসিক স্বভাব আর গেল না। বেশ, তবে সিরিয়াসলিই বলি, বাকিদের আগেই খাওয়ানো হয়ে গেছে। আজকে শুধু তোমার সঙ্গে বেরোব বলে ঠিক করেছিলাম।”

একরাশ বুক-ঢিপঢিপ নিয়ে মৃণালিনী জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

শিলাদিত্য মৃণালিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ তুমি স্পেশাল,” তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে হাসল, “স্পেশাল না হলে এরকম একটা মনের মতো গিফট দিতে পারতে?”

মৃণালিনী চুপচাপ হাঁটতে থাকে। মনে হয় যেন একটা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে চলেছে সে। এতদিন নিজে যা মনে মনে ভেবে এসেছে শুধু, শিল্‌দা ঠিক সেই কথাগুলোই নিজের মুখে বলছে! শিল্‌দা বলছে, মৃণালিনী আলাদা, স্পেশাল!

“আমি একটা কথা বুঝতে পারছি আজকাল,” শিলাদিত্য বলেই চলে, “তোমার বাইরেটা এরকম কাঠখোট্টা হলে কি হবে, আসলে তুমি খুব সেন্‌সিটিভ। যাতে তোমাকে কখনও হার্ট না হতে হয়, তাই বাইরে থেকে স্ট্রং সেজে থাকো।”

মৃণালিনী আস্তে আস্তে বলে, “তুমি থাকো না?”

শিলাদিত্য অবাক হয়ে বলে, “আমি?”

“হ্যাঁ। তুমি সব সময় হাসো, সবার সঙ্গে ইয়ার্কি মারো। আজ পর্যন্ত তোমাকে কারুর সঙ্গে ঝগড়া করতে বা কারুর উপর রেগে যেতে দেখিনি। কিন্তু কেন জানিনা, আমার মনে হয় যে এটাই তোমার আসল চেহারা না। বরং মাঝে মাঝে যখন তুমি মন দিয়ে বই পড়ো, তখন এক এক সময় আড়ালটা সরে যায়। এই যে দশটা-পাঁচটার একটা চাকরি থাকা সত্ত্বেও হুট্‌হাট করে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যাও, সেটাও বোধহয় এক ধরণের এস্‌কেপ। আমাদের আশপাশের সাধারণ জগতটা যেন ভাল লাগে না তোমার।”

শিলাদিত্য এক দৃষ্টে মৃণালিনীর দিকে তাকিয়েছিল এতক্ষণ। এবারে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “তুমি আমাকে এত ভাল চিনলে কি করে ফুল্‌কি?”

মৃণালিনী একটু অপ্রস্তুত হয়। আসলে আবেগের বশে অনেকগুলো বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে সে। কে জানে, শিল্‌দা কি ভাববে? সে সাবধানীভাবে বলল, “আসলে... আমি আমার আশেপাশের লোকজনদের অবজার্ভ করি সব সময়।”

শিলাদিত্য হাসে, “আশ্চর্য, জানো। লোকজনকে অবজার্ভ করতে, তারা কী ভাবছে সেটা আন্দাজ করতে আমারও খুব ভাল লাগে। এই যে আমি মাঝে মাঝে বেরিয়ে যাই? সেটার একটা বড় কারণ হল নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হওয়া। তবে, তুমি যা বললে সেটাও খাঁটি সত্যি। আমি মাঝে মাঝে আমার জীবনটা ফেলে রেখে কিছুদিনের জন্য পালিয়ে যাই।”

মৃণালিনী কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন বলো তো?”

ততক্ষণে রামকৃষ্ণ মিশনের কাছে চলে এসেছিল ওরা। পাঁচিলের উপর এক চিলতে জায়গার দিকে দেখিয়ে শিলাদিত্য ঠেস দিয়ে দাঁড়াল, দেখাদেখি মৃণালিনীও। কথা বলতে বলতে অনেকটা পথ চলে এসেছে দুজনে।

একটু জিরিয়ে নিয়ে শিলাদিত্য বলল, “তোমাকে বলাই যায়। আসলে কি জানো, মা-বাবার জীবনযাত্রার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে বেশ অসুবিধে হয় আমার। ওঁরা দুজনেই খুব অ্যামবিশাস। শুধুমাত্র একে অপরের সাহায্যে কন্‌স্ট্রাকশনের বিজনেসটা দাঁড় করিয়েছেন। এদিকে আমি ছোটবেলা থেকে দাদু-ঠাকুমার হাতে মানুষ। তাঁদের ভ্যালুজ আমার মধ্যে ঢুকে গেছে। ওঁরা একে একে মারা যাবার পর হঠাৎ করেই আমি দেখলাম, আমার সঙ্গে বাবা-মায়ের কিছুই মেলে না। ইতিমধ্যে আবার একটা নতুন পাড়ায় এসে নতুন লোকেদের সঙ্গে থাকতে লাগলাম। অনেক পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ আলগা হয়ে গেল। কলেজে পছন্দমতো সাবজেক্ট পড়তে পারলাম না। আমার খুব ইচ্ছে ছিল বাংলা সাহিত্য পড়ি। মা বাবা কিছুতেই রাজি হলেন না। বাধ্য হয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লাম। তবে পড়ার শেষে খানিকটা জেদ করেই ব্যাঙ্কের চাকরিতে ঢুকলাম। বাবা-মা অবভিয়াসলি চেয়েছিলেন আমি বিজনেসের কাজ বুঝে নেওয়া শুরু করি।”

“তুমি বিজনেস জয়েন করবে না?”

শিলাদিত্য খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “শেষ পর্যন্ত হয়তো করতেই হবে; এড়াতে পারব না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নিজের স্বাধীনতা খোয়াতে চাইনি। অবশ্য এই চাকরিতেও অনেকটা রেস্ট্রিক্‌টেড হয়ে গেছি — প্রাইভেট ব্যাঙ্ক, বুঝতেই পারছ — কিন্তু বিজনেস ঘাড়ে নেওয়া একটা অন্য লেভেল-এর মাথাব্যাথা।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। মৃণালিনী মনের ভাবনাগুলোকে ঠিকঠাক গুছিয়ে নিতে পারেনা কিছুতেই। আসলে চার-বছরব্যাপী একই জায়গায় থেমে থাকা একটা সম্পর্ক একটা বেলার মধ্যে এতদূর গড়িয়ে যাবে, এটা মৃণালিনীর ধারণার বাইরে ছিল। কী এমন হল শিল্‌দার, যে তার জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত কথাগুলো অবলীলায় উজাড় করে দিল তার কাছে? সত্যিই সে তাকে কাছের মানুষ বলে গণ্য করা শুরু করেছে?

“দেখেছ, বাগে পেয়ে কি রকম বকে গেলাম এতক্ষণ ধরে!” শিলাদিত্য অপ্রতিভ হাসল, “তুমি ঘুমিয়ে পড়োনি এই ঢের। কি জানো, এই এক চাকরি করতে গিয়ে আমি সব দিক থেকে একা হয়ে গিয়েছি। আমার কাজের জায়গায় কোনো বন্ধু তৈরি হয়নি। আবার যারা আমার য়ুনিভার্সিটির পুরোনো বন্ধু, তারা সকলে অন্যান্য ফিল্ড্‌-এ সরে গেছে। ফলে তাদের সঙ্গেও অনেকদিন সাক্ষাৎ নেই... ” অন্যমনষ্ক হয়ে কি যেন ভাবে শিলাদিত্য।

“ইট্‌স ওকে। যদি ইচ্ছে হয়, য়ু ক্যান শেয়ার উইথ মী।”

শিলাদিত্য হাসিমুখে বলল, “থ্যাংক্‌স।”

মৃণালিনীও হাসল, “নেক্সট আবার কবে পালাবে? স্ক্র্যাপ্‌বুকটা ভর্তি করতে হবে তো।”

“হাঃ হাঃ, ঠিক! এবারে একটানা কতদিন বেরোতে পারিনি। এই ক্রিস্টমাস-এর ছুটিতে দিন দশেকের একটা লম্বা ট্যুরে যাব। একাই।”

“ইস্‌! ক্রিস্টমাস ছুটির পরেই আমাদের প্রি-বোর্ড।”

“আহা রে! তবে এটাও ভাবো, আই.এস.সী পরীক্ষা হয়ে যাবার পর একেবারে দু-তিন মাস ঝাড়া হাত-পা।”

“ওই আশায় দিন গুনছি। কোথায় যাবে এবারের ট্যুরে?”

“আসাম। ওদিকটা কিছু দেখা হয়নি। ওখান থেকে টুক করে একবার অরুণাচলেও ঢুঁ মারার ইচ্ছে আছে। তাওয়াং নাকি ভীষণ সুন্দর। তবে ভালুকপং-এ যাওয়া তো মাস্ট। জিয়াভরলী নদী বইছে ওখান দিয়ে, সে না দেখলে ট্যুর-ই সম্পূর্ণ হবে না!”


*

বাসে কী ভিড়! এই দেড় বছরেও ব্যাপারটা ঠিক অভ্যাস হয়নি শরণ্যার, যদিও সয়ে গেছে অনেকটাই। আজকাল বেশ মজাই লাগে বাসে চড়তে। কত ধরণের লোক যে ওঠে! শরণ্যা খেয়াল করেছে, এদেশের লোকেরা রাস্তাঘাটে নিজের ব্যক্তিগত কথাবার্তাগুলো তারস্বরে আলোচনা করতে খুব পছন্দ করে। এই যেমন আজকে তার ঠিক পাশের সীটে বসে এক ভদ্রলোক মোবাইল ফোনে কাকে যেন উদ্দেশ্য করে চেঁচাচ্ছিলেন, “ওকে বলে দেবে, ওর আর বড় ভাই বলে কেউ নেই, সে মরে গেছে! ... না না, আমি আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চাই না ওর সঙ্গে, যতসব কুলাঙ্গারের দল... ”

“গোলপার্ক এগিয়ে আসুন, গোলপার্ক!”

শরণ্যা হাঁফ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বাস কন্‌ডাক্টারদেরও বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয় তার। য়ু.কে তে আবার বাস কন্‌ডাক্টার দেখেনি সে। ওখানে ড্রাইভারের বক্স-এর কাছেই টিকিট পাওয়া যেত। কিন্তু এখানকার কন্‌ডাক্টারদের দেখে মনে হয়, ওরা যেন বিশেষ কোনো এক গোষ্টীভুক্ত। সকলের দাঁড়ানোর ভঙ্গি, আঙুলের ফাঁকে টাকা গুঁজে রাখার কায়দা, কথা বলবার ধরণ, হুবহু এক। এমনকি, কাঁধের খুচরো পয়সা রাখার ব্যাগটা পর্যন্ত এক।

“আস্তেলেড়িস্‌!” কন্‌ডাক্টার হাঁক পাড়ল।

এই কথাটা শুনলেও শরণ্যার বেজায় হাসি পায়। প্রথম প্রথম তো বুঝতেই পারত না, লোকগুলো বলে কী! মম্‌কে জিজ্ঞেস করতে সে হেসেই বাঁচেনা।

“ধুর, ‘আস্তেলেড়িস’ আবার একটা শব্দ নাকি? আসলে ওটা হচ্ছে, ‘আস্তে, লেডিজ’। অর্থাৎ, যেহেতু মহিলা নামবেন, সেইজন্য বাসটাকে পুরোপুরি থামিয়ে দাঁড়াতে হবে। বুঝলি?”

মেয়েদের জন্য কেন এই বিশেষ ব্যবস্থা, এবং পুরুষ যাত্রীদের জন্য বাসটা কেন পুরোপুরি না থামালেও চলে, এসব প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আজ অবধি পায়নি শরণ্যা; তবে ইদানীং ‘আস্তেলেড়িস’ ডাকটায় বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন নামবার সময় কথাটা কেউ না উচ্চারণ করলেই মনে হয়, কী একটা যেন বাদ পড়ে গেল!

বাস থেকে নেমেই দেখতে পেল উপলা দাঁড়িয়ে আছে। শরণ্যা নামতেই হাত-পা ছুঁড়ে বলল, “এত দেরি যে?”

“আরে, বলিস না। মম্‌কে বোঝাতেই তো ঘন্টাখানেক লেগে গেল। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, রাতে থাকবার কী দরকার, সকালে তো কই কিছু জানাইনি, এক্সেট্রা ... যাক, ফাইনালি বুঝিয়ে আসতে পেরেছি এটাই অনেক। কিন্তু একটা কথা বল্‌ আমাকে, সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এর বদলে এখানে নামতে বললি কেন?”

“তার কারণ আমরা এক্ষুণি বাড়ি ঢুকব না। সবে পাঁচটা বাজছে। রাস্তার ওপারের ফুটপাথে পুরোনো বইয়ের দোকান দেয়, কখনও ঘেঁটে দেখেছিস? পুরো খনি! ওখানে খানিক খোঁড়াখুঁড়ি করে তারপর চ’ কোথাও একটা বসে গ্যাজাই কিছুক্ষণ। বাড়িতে পা দিলেই তো আবার লোকজন তোকে পেড়ে ফেলবে।”

“বেশ, তাই চ’। যে পোয়েমটা লিখেছিলি, এনেছিস?”

“কি আশ্চর্য, আনতে যাব কেন? বাড়ি গিয়েই দেখবি।”

কথা বলতে বলতে ক্রসিং-এর সামনে চলে এসেছিল ওরা।

“ভাগ্যিস তুই ফোন করে আসতে বললি, নাহলে দিনটা যা যাচ্ছিল না আমার —” বলতে বলতে হঠাৎ থমকে গেল শরণ্যা। উলটোদিকের রাস্তায় ওরা কারা যাচ্ছে? শরণ্যার দৃষ্টি অনুসরণ করে উপলাও তাকাল, কিন্তু ব্যাপারটা ঠাওর করে উঠতে পারল না।

“কী হয়েছে রে?”

শরণ্যা অবাকভাবে বলল, “দেখতে পাচ্ছিস না? ওটা তো লিনী! আরে, ওই যে পূর্ণদাস রোডের দিকে এগোচ্ছে, সঙ্গে — অ্যাই, সঙ্গে শিল্‌দা রে!”

“অ্যাঁ-অ্যাঁ! সেকীঈঈঈঈ!” উপলা উত্তেজনায় তিনহাত লাফিয়ে উঠল, “আরে তুই ডাকছিস না কেন মালটাকে —”

“এই এই, তুই কি পাগল হলি?” শরণ্যা খপ্‌ করে উপলার হাত চেপে ধরল, “দেখছিস ওরা ডেট-এ বেরিয়েছে, আর তুই মাঝখানে গিয়ে ব্যাগড়া দিতে চাইছিস?”

উপলা চোখ গোলগোল করে বলল, “ডেট-এ বেরিয়েছে? তুই সার্টেন?”

“হ্যাঁ। লিনী সকালে ফোন করেছিল। হাঁটতে থাক, ঘটনাটা বলছি।”


*


দোরগোড়ায় এসে মৃণালিনী ডাকল, “ভিতরে আসবে না শিল্‌দা?”

শিলাদিত্য হাসল, “না, আজ থাক। অনেক ঘোরাফেরা হল।”

“চা খেয়ে যাও। সন্ধ্যে হয়ে গেছে তো।”

“না গো। অন্য আরেকদিন আসব। বাবা-মায়ের আজ তাড়াতাড়ি ফেরার কথা। ওদের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করবার আছে একটা।”

মৃণালিনী একটু উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞেস করল, “কিসের ব্যাপারে? বিজনেস নাকি?”

“না, না। অন্য বিষয়ে। পারিবারিক নানারকম থাকে তো।”

একটু থেমে শিলাদিত্য বলল, “আমি জানি এ কথাটা না বললেও চলে। তাও বলছি, আজ তোমার সঙ্গে যা যা কথা হল, সেসব তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা কোরো না।”

মৃণালিনী হাসে, “তার কোনো সীন নেই। আমার ব্যাপারটাও তোমার মতোই তো অনেকটা, তাই এসব নিয়ে ওদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করার মতো সম্পর্ক নয় আমাদের।”

শিলাদিত্য অবাক হয়ে বলে, “তোমার ব্যাপার আমার মতো মানে? কিভাবে?”

“ওই যে। আমারও নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে মেলে না। অবশ্য আমার সমস্যাটা উলটো। আমার মা-বাবার অ্যামবিশান বলে জাস্ট কোনো পদার্থ নেই। মানে, আমি বলছি না যে ওদের প্রচুর টাকা রোজগার করে, বিশাল হাই-ফাই জীবনযাপন করা উচিৎ ছিল, কি ওইরকম কিছু। কিন্তু আমাকে নিয়েও ওদের কোনোরকম এক্সপেক্টেশান নেই! আমার তো ইচ্ছে করে, আমি বড় হয়ে প্রেসটিজিয়াস কোনো চাকরি করব, দেশ-বিদেশ ঘুরব, নতুন-নতুন জিনিস শিখব, জীবনটা একটু অন্যরকমভাবে বাঁচব। আমার মা-বাবার লাইফে কী আছে বলো, অফিস আর সংসার ছাড়া? এই দুটো জিনিসের বাইরে পুরো পৃথিবীতে কি আর কিছুই নেই! কিন্তু মা-বাবা চায়, আমিও ওদের মতো গতে বাঁধা জীবন কাটাই। ভেবেছিলাম, কলকাতার বাইরের কলেজগুলোতে অ্যাপ্লাই করব। সেকথা বলতেই মা-বাবা এমন হাঁ হাঁ করে উঠল, যেন পাঁচখানা লাশ নামানোর কথা বলেছি। কলকাতায় এত কলেজ আছে, বাইরে যাওয়ার কি দরকার! কবে যেন একবার বলেছিলাম, কলেজে ওঠার পর একা একা কোথাও ঘুরতে যাব, এই দার্জিলিং-টার্জিলিং। তো মা-বাবার মুখ দেখে মনে হল যেন হার্ট-ফেল করবে। যখন তোমার একজ্যাম্পল দিলাম, তখন বলে কিনা, ‘ওর কথা আলাদা। ছেলেরা অনেক কিছু পারে।’ এসবের কোনো মানে আছে! বিশ্ব-সংসারকে কুপিয়ে দিতে ইচ্ছে করে!”

শিলাদিত্য মৃণালিনীদের বাড়ির বারান্দায় বসে পড়েছিল ততক্ষণে। এবার দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “সত্যি, বড় হওয়ার অনেক জ্বালা। পদে পদে হাজারটা বাধা এসে দাঁড়ায়। মেয়েদের তো আরো মুশকিল। যত হাবিজাবি নিয়মের পাল্লায় পড়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার জোগাড়। তবু তার মধ্যেই এগোতে হয় আর কি।”

যাবার আগে শিলাদিত্য মৃণালিনীর দিকে তাকিয়ে হাসল, “যে যাই বলুক না কেন, তোমাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তুমি যে আগুনের ফুল্‌কি! তুমি স্ফুলিঙ্গ। আজ আসি।”


*


দারুণ মজা হল উপলাদের বাড়িতে। দেড় বছরে এই প্রথমবার ওদের বাড়ি এল শরণ্যা — এবং এসেই চমৎকৃত হয়ে গেল। একটা বাড়িতে এত লোকজন; একেবারে জমজমাট! এক একটা পরিবার এক এক তলায় থাকে বটে, কিন্তু সবার সর্বত্র অবাধ যাতায়াত, খাওয়াদাওয়াও একসঙ্গে। শরণ্যা কখনো যৌথ পরিবার দেখেনি। তাদের তো আত্মীয় বলতে ওই এক ছোটমাসি। বাবার তরফে তেমন কেউই নেই, আর যাঁরা আছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয় না। উপলার বাড়ির এই হইহই, মজলিশি মেজাজ শরণ্যার কাছে বেশ নতুন আর উপভোগ্য। উপলার অবশ্য চিন্তার শেষ ছিল না।

“এই অপ্রকৃতিস্থগুলো তোকে পাগল করে ছাড়ছে না তো? বড়জেঠির রান্না ঠিকঠাক তো? এই পুলু, দিদিকে জ্বালাবি না একদম...”

সন্ধ্যেটা মোটামুটি এইভাবে কাটল। রাতের খাওয়াদাওয়ার পাট উঠলে কোল্ড্‌ড্রিংক্‌সের বোতল আর চিপ্‌স-এর প্যাকেট নিয়ে উপলার ঘরে সবেমাত্র গুছিয়ে বসা গেছে, এমন সময় ফোন। রঙ্গীতদা!

“ফোন করেছিলে নাকি সকালবেলা?”

শরণ্যা হেসে ফেলল। রঙ্গীতদা আজব ব্যক্তি। ওকে যদি কেউ কোনো কারণে ফোন করে, তখন তাকে পাবে কি না পাবে সবটাই ভাগ্যের উপর নির্ভর। তার যদি কখনো মিস্‌ড কল-এর কথা খেয়াল পড়ল, তো কথা হল, না হলে নয়। এদিকে নিজে ফোন করে উত্তর না পেলে সাংঘাতিক চটে যায়!

“হাসছিস যে?” রঙ্গীতদা একটু বিরক্ত।

“এক সেকেণ্ড,” শরণ্যা মোবাইলে হাত চাপা দিয়ে ফিস্‌ফিস্‌ করে উপলাকে বলল, “রঙ্গীতদার গলার আওয়াজ শুনবি?”

“কীঃ?” উপলা খাবি খেল।

“আঃ, আস্তে! শুনবি কিনা বল্।”

উপলা এত জোরে ঘাড় নাড়ল যে মনে হল মাথাটাই ছিট্‌কে বেরিয়ে যাবে। শরণ্যা লাউডস্পিকারটা অন্‌ করে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, এবার বলো।”

“হাসির কারণটা জানতে পারি?”

“কিছু না ... আসলে ঘন্টা-দশেক পরে কল্‌-ব্যাক করলে তো, তাই।”

“দ্যাট্‌স নট্‌ ইভেন ফানি। যাইহোক, ফোন করেছিলি কেন?”

“সেরকম কিছু না। একটা ফোন নাম্বার জানার ছিল; তবে কাজ হয়ে গেছে।”

“তাই? কি করে হল?”

“ঋদ্ধিমানদাকে ফোন করেছিলাম, ওই দিয়ে দিল।”

“আই সী। ঋদ্ধিমানের কি খবর? ওকে ক’দিন ফোন করা হয় না।”

“বলল তো ভালই আছে। আমারও তো সেই যে তোমার বাড়িতে দেখা হয়েছিল, তারপর আর কথাবার্তা বলে উঠতে পারিনি।”

“আচ্ছা। বল্‌, কেমন আছিস?”

“ওই আর কি। সামনে পরীক্ষা লাইন্‌ড আপ, একগাদা বই পড়ে উদ্ধার করা।”

“য়ু রীড্‌ টুউ মাচ।”

“দ্যাট্‌স নট্‌ ট্রু!”

“সেটাই সত্যি, তর্ক কোরোনা — ওঃ বাই দ্য ওয়ে, একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলার ছিল।”

“কি কথা?”

“তোর ছোটমাসি ‘হাই’ বলেছে। বলেছে একদম পড়াশোনা না করতে, আর সাহানাদি ওকে ফোন করেছিল সেটা জানাতে।”

“ওঃ, দ্যাট্‌স গ্রেট। ছোটমাসিকে বোলো, চিন্তার কিছু নেই; একদম পড়াশোনা করছি না।”

“বিদিশাদি অসাধারণ মহিলা।”

“জানি। ও না থাকলে যে কি করতাম!”

“আমরাও কি করতাম কে জানে! এনিওয়ে, আপাততঃ টাটা।”

“বাই।”

উপলা এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিল। এবার মুখ দিয়ে ফস্‌ করে একরাশ হাওয়া ছেড়ে বলল, “বাপ্‌স!”

শরণ্যা হেসে বলল, “কি মনে হয়?”

“মনে হবে মানে? গলা শুনলেই বোঝা যায়।”

“কী বোঝা যায়?” শরণ্যা একটু অবাক।

“কী আবার! পুরো প্রিন্স চার্মিং।”

“ও! হেঃ, শুধু গলাটাই ওরকম, এমনিতে তো... ”

“বকিস না তো! আচ্ছা, ঋদ্ধিমান না কার একটা কথা বলছিলি, সেটা কে?”

“রঙ্গীতদার চাইল্ড্‌হুড ফ্রেণ্ড। ক্লাস সেভেন-এইট অবধি রঙ্গীতদার সঙ্গে শান্তিনিকেতনের স্কুলে পড়ত; তারপর অবশ্য কলকাতায় ফিরে এসেছিল। এখন সেন্ট্‌-জেভিয়ার্স্‌-এ সোশিওলজি পড়ে। তবে রঙ্গীতদার সঙ্গে এখনও গলায় গলায়।”

“ওঃ, তাই বল্‌। ছোটমাসি রঙ্গীতদাকে কিভাবে চেনেন?”

“বাঃ রে, রঙ্গীতদার টিচার তো। আর ওদের বাড়ি একই পাড়ায়। ইন্‌ ফ্যাক্ট, ছোটমাসির বাড়িতেই তো রঙ্গীতদার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল।”

উপলা হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, “সেকি!”

“হ্যাঁ, মানে মম্‌-ড্যাড আর সানার সঙ্গে ওর আগেই আলাপ ছিল, কারণ ওর বাবা আমার বাবার বন্ধু। আমিও নাকি ওকে দেখেছিলাম, কিন্তু তখন আমি এত ছোট, আমার কিছু মনে নেই।”

“শালা, এই কথাটা এতদিনে বলার সময় হল?”

“আরে অত খেয়াল থাকে নাকি!”

“বেশ, খেয়াল যখন হয়েইছে, তখন বলে ফেল্‌ ঝটপট, নইলে —”

“না না, বলছি!”

ক্রিস্টমাসের ছুটি। শরণ্যার তখনও ক্লাস নাইন শেষ হয়নি। দেশে ফিরে আসবার আগে সেই শেষবার ছোটমাসির বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, তারপর এই আজ অবধি আর যাওয়া হয়নি। শরণ্যা প্রথমবার একা একাই ভারতে এসেছিল। তখন তো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসটুকুও পায়নি! প্রথমবার বড়দের মতো একা একা বিদেশযাত্রার উত্তেজনাতেই মেতে ছিল, তার উপর আবার কতদিন পর ছোটমাসির সঙ্গে দেখা!

ক্রিস্টমাস ইভ-এর দিন ছোটমাসির সঙ্গে ঘর সাজাচ্ছিল সে। ডিসেম্বরের সকালবেলায় বাড়িটা যেন কোনো রূপকথার বাড়ির মতো মনে হচ্ছিল। লাগোয়া বাগানটাতে হাজারো ফুলের মেলা, আর সারি সারি অর্জুন, শিরীষ, চাঁপা, মেহগনি, দেবদারু গাছের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে নীল-সাদা রঙের ছোট্ট দোতলা বাড়িটা। সেদিন সকালে সবকিছু একরাশ কুয়াশার কম্বলে ঢাকা পড়েছিল। দৃশ্যটা উপভোগ করবার জন্য শরণ্যা বারান্দায় এসেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

দেখল, সেই কুয়াশার জাল ভেদ করে এক আগন্তুক এগিয়ে আসছে তার দিকে। কাছে আসতেই শরণ্যা অবাক হয়ে দেখল, এ তো প্রায় তারই বয়সী একটি ছেলে। লম্বা, রোগাটে গড়ন, এই শীতেও মাথা খালি, শুধু একরাশ ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল উত্তুরে হাওয়ায় উড়ছে। ছেলেটার গায়ে একটা ময়ুরকণ্ঠী রঙের পাঞ্জাবি, তার উপর সাদা রঙের গাবদা জ্যাকেট, পরনে ছাই-রঙা গরম কাপড়ের প্যান্ট, পায়ে হাইকিং বুট। এরকম সৃষ্টিছাড়া পোষাকেও কেমন করে যেন মানিয়ে গিয়েছে তাকে, যদিও সে এমনিতে মোটেও সুন্দর নয়... তবু যেন আশ্চর্য সুন্দর; যেন এই প্রথম সুন্দরকে উপলব্ধি করল শরণ্যা!

বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে এক লহমায় এত কিছু ভেবে ফেলেছিল সে। ঘটনাটা যেন একটা কবিতার লাইন; তার চিত্রকল্পটা শরণ্যার মনে গভীর দাগ ফেলে গেল। ছেলেটা অবশ্য তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে গট্‌গটিয়ে ঘরে ঢুকে গেছে ততক্ষণে। কি করবে ভেবে না পেয়ে খানিকক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর সেও ঘরে ঢুকল। ড্রয়িংরুমের পাশের ঘরটা ছোটমাসির স্টাডি। শরণ্যা শুনতে পেল, সেখান থেকে গম্‌গমে গলার আওয়াজ ভেসে আসছে, “আমি এত সকালে লেপের তলা থেকে বেরিয়ে পৌষ মেলায় পর্যন্ত না ঢুকে তোমার কাছে এসেছি, আর তুমি কিনা এইসব হলি-বন্‌বন্‌স নিয়ে পড়েছ! আন্‌বিলীভেব্‌ল! নামো বলছি —”

শরণ্যা দরজার কাছে এসে দেখল, ছোটমাসি টুলের উপর বেশ বিব্রত মুখে দাঁড়িয়ে আছে, হাতের ঘর সাজাবার সরঞ্জামগুলো ছেলেটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে।

“আরে, কি মুশকিল!” ছোটমাসি বিপন্নভাবে বলে, “আগে নামতে দিবি তো, নাকি!”

ছেলেটা জিনিসগুলো কেড়ে নিতে নিতেই বলল, “নামার আগে এগুলো বাজেয়াপ্ত করলাম, নাও! হ্যাঁ, এবার নামতে পারো।”

ছোটমাসি হাসতে হাসতে নেমেই শরণ্যাকে দেখতে পেল।

“ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস রাকা? রঙ্গীতের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে?”

রঙ্গীত? কি সুন্দর নাম! সেই পাহাড়ি নদী, যার পান্নার মতো জল, চলার সুরে জলতরঙ্গ!

“তুই তো ওকে চিনিস না,” ছোটমাসি বলেই চলল, “মানে, এত ছোটবেলায় দেখেছিস যে কারুরই কাউকে মনে নেই। ও হচ্ছে রাকা — ভাল নাম শরণ্যা।”

“শরণ্যা? মানে জয়ন্তকাকু আর শ্রাবস্তীকাকির —”

“ছোট মেয়ে, হ্যাঁ,” ছোটমাসি হাসল, “তোদের একবার মোলাকাত হয়েছিল বটে, তখন তোর বয়স পাঁচ, রাকার দুই, সানার সাত! রাকা, তোর অরিন্দমকাকুকে মনে আছে তো? কলকাতায় থাকেন? রঙ্গীত হল ওঁর ছেলে।”

শরণ্যার তখন মনে পড়ল; কলকাতায় একজন অরিন্দমকাকু থাকেন বটে। এত কম দেখা হয় ওঁর সাথে! এমনিতেও ভারতে আসলেই আগেভাগে শান্তিনিকেতনে চলে আসা হয়। রঙ্গীতদা সেই কাকুর ছেলে? এখানে কী করছে তাহলে?

ছোটমাসি যেন শরণ্যার মনের প্রশ্নটা বুঝতে পেরেই বলল, “রঙ্গীত ওর দাদু-দিদার কাছে থাকে — এখানকার স্কুলেই পড়ে। পরের বছর কলেজে উঠবে। আমাদের বাড়ির খুব কাছেই ওদের বাড়ি! ছেলের মাথায় বুদ্ধি আছে অনেক, কিন্তু ফাঁকিবাজ হলে যা হয় আর কি —”

“হুঁ,” রঙ্গীতদা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “আমি ডেলিবারেটলি ফাঁকি মারি না, অলরাইট? আই জাস্ট থিংক স্কুল ইজ আ ওয়েস্ট অফ টাইম।”

“তাই নাকি?” ছোটমাসি হাসতে লাগল, “তা তোর কাছে কোনো অল্টারনেটিভ সিস্টেম আছে নাকি রে?”

“আই অ্যাম ওয়ার্কিং অন ইট,” রঙ্গীতদা মহোৎসাহে বলতে আরম্ভ করল, “এই ব্যাপারে আমি যে থিওরিটা বার করব, তার জন্যে আমি তো নোবেল প্রাইজটা পাচ্ছিই...”

ব্যস্‌, ছুটল কথার ফোয়ারা! একটা মানুষ যে এত কথা বলতে পারে কে জানত! কিন্তু যাই বলুক, সবই জীবন্ত, সবই যেন রঙ্গীত নদীর অশান্ত জলতরঙ্গের মতো সুন্দর। শরণ্যার মনটা আশ্চর্য ভাললাগায় ক্রমেই ভরে উঠছিল। রঙ্গীতদা অনেকক্ষণ ছিল, অনর্গল ছোটমাসির সঙ্গে বকে গেল। শরণ্যার দিকে তার বিশেষ নজর ছিল না। তাতে অবশ্য শরণ্যার কিছু আসে যায়নি, সে শুধু দুজনের কথাই শুনছিল বসে বসে। রঙ্গীতদা চলে যাওয়ার পর ছোটমাসি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কি রে, রঙ্গীতের সঙ্গে তো কথাই বললি না তুই!”

“না, আসলে...”

“অবশ্য সে কাউকে কথা বলতে দিলে তো! তবে ছেলের মনটা ভাল।”

রঙ্গীতদা সেদিন চলে গেল ঠিকই, কিন্তু শরণ্যার মন থেকে নয়। বরং সময়ের সাথে সাথে মনের মধ্যে আরও দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেল ছবিটা; কুয়াশার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা কোনো রূপকথার মতো সেই ছেলে...

শুনতে শুনতে উপলা কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। শরণ্যা এক ঠেলা মেরে বলল, “হলটা কি শুনি?”

উপলা ঢুলু-ঢুলু চোখে হেসে বলল, “কি দারুণ, তাই না?”

শরণ্যা হেসে ফেলল, “দারুণ তো বটেই।”

“আচ্ছা ঋদ্ধিমানদার সঙ্গে কি করে আলাপ হল তোর?”

“ঠিক তার পরের দিন। ছোটমাসির সঙ্গে পৌষমেলায় ঘুরতে গিয়ে রঙ্গীতদাদের সঙ্গে দেখা। ঋদ্ধিমানদা তখন শীতের ছুটিতে রঙ্গীতদার বাড়িতে ছিল।”

“ওঃ! আচ্ছা, রঙ্গীতদা ওর দাদু-দিদার কাছে কেন থাকে?”

“ও বাবা, সে এক সাংঘাতিক ট্র্যাজেডি। রঙ্গীতদার যখন বছর ছয়-সাত বয়স, তখন ওর মা সুইসাইড করেন।”

“সেকি! কি কাণ্ড! কেন?”

“তা আমি ঠিক জানিনা, কিন্তু শুনেছি নাকি ক্লিনিকাল ডিপ্রেশানে ভুগতেন। এদিকে ওরকম হওয়ার পর কাকিমার বাড়ির লোকেরা কাকুর নামে কেস করে দিয়েছিল। সে নাকি যাচ্ছেতাই ব্যাপার। আই থিংক ওই সময় একবার মম্‌-ড্যাড এসে ঘুরেও গিয়েছিল কাকুর কাছে। তখন ওঁকে একরকম বাধ্য হয়েই রঙ্গীতদাকে শান্তিনিকেতনে নিজের প্যারেন্টস্‌দের কাছে পাঠিয়ে দিতে হয়েছিল।”

“মাই গড! তারপর কি হল?”

“তারপর আর কি! কেস চলল বহুদিন। তবে কাকুর পক্ষে যে উকিল ছিলেন, তিনিই প্র্যাক্‌টিক্যালি কাকুকে বাঁচিয়ে দেন। আসলে কাকুও তো লইয়ার, সেই সূত্রে চেনা ছিল। খুব নামকরা লইয়ার ছিলেন উনি; নামটা... আই থিংক সামথিং দত্ত। এনিওয়ে, কাকু কেস জিতলেন ঠিকই, কিন্তু তারপরে কেমন একটা যেন হয়ে গেলেন। সবই করেন, তবে কোনো কিছুতেই কোনো গা নেই। কিন্তু রঙ্গীতদাকে অসম্ভব ভালবাসেন।”

“ইস্‌।”

খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটল। হঠাৎ শরণ্যার আজ সকালে ঘটে যাওয়া ব্যাপারটার কথা মনে পড়ে গেল।

“এই, একটা মজার কথা জানিস?”

“কী?”

“পূজন মিত্র দূর্ধর্ষ কবিতা লেখে।”

“সে আবার কে?”

“সেকি, তোকে বলেছিলাম তো, রঙ্গীতদার সাহিত্য-সভায় আসে —”

“ওঃ, হ্যাঁ হ্যাঁ, ভুলে গেছিলাম। কিন্তু তার নাকি সাহিত্যে ইন্টারেস্ট নেই?”

“আরে, আমিও তো তাই জানতাম! আজ সকালে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে দেখি তার কবিতা ছাপা হয়েছে।”

“তাই নাকি? ভাল লেখা?”

“পুরো একঘর। কবিতাটা পড়ে আমি আবার ফোন করলাম —”

“ফোন করলি? নাম্বার কে দিলে?”

“আরে ওইজন্যেই তো রঙ্গীতদাকে ফোন করেছিলাম সকালে। তারপর না পেয়ে ঋদ্ধিমানদাকে করলাম।”

“আচ্ছা আচ্ছা। তো কী বলে সে?”

সকালের কথোপকথনটা মনে করতে গিয়ে একটু থমকে গেল শরণ্যা।

“... সেরকম কিছুই না। আমি জিজ্ঞেস করলাম কবিতাটা ওরই লেখা কিনা; হি কন্‌ফার্মড।”

“ব্যস্‌? ওইটুকুই?”

“হুঁ... ” অন্যমনষ্কভাবে জবাব দিল শরণ্যা।




(ক্রমশ)

(পরবাস-৭৬, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯)