Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines



পরবাসে প্রকাশিত উপন্যাসঃ

লোকে বলে অলৌকিক
- ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত


ভিক্টর কুজুর
- কমল চক্রবর্তী


নিওলিথ স্বপ্ন
- দীপেন ভট্টাচার্য


রাতবিরেতের গজল
- ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত


মেঘের নিচে কাকতাড়ুয়া
- বাসুদেব দেব


বর্ণবাসী
- সুভাষ ঘোষাল


ধ্বংসাবশেষ
- শৈলেন সরকার


যাত্রী
- দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


সন্ধ্যাবেলা
- সাবর্নি চক্রবর্তী


অরণ্যকথা
- আইভি চট্টোপাধ্যায়


অন্য কোনখানে
- দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


আয়নার ভিতরে
- কৌশিক সেন


ফরিয়াদ
- সাবর্নি চক্রবর্তী


রাহুলের ডায়েরি থেকে
- ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত


কোথাও জীবন আছে
- শাম্ভবী ঘোষ


হারাধন টোটোওয়ালা
- সাবর্ণি চক্রবর্তী





পরবাসে সাবর্ণি চক্রবর্তী-র
লেখা

বই


ISSN 1563-8685




হারাধন টোটোওয়ালা

পরের ত্রিপলটা এক জায়গায় অল্প একটু ছেঁড়া। মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে সেখান দিয়ে এক চিলতে নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছে হারা। একেবারে মাটিতে শুয়ে আছে তা অবশ্য ঠিক বলা যাবে না। বাড়িটার সামনে এক টুকরো ঘাসে ঢাকা জমি। সেই জমিতে ত্রিপলের ম্যারাপ বাঁধা আর নিচে পুরো ঘাসজমিটা ঢেকে ফরাস পাতা। ফরাসের ওপরে এক পাশে পরিষ্কার সতরঞ্চি, সেই সতরঞ্চিতে হারা শুয়েছে। খালি ফরাসের ওপর শোয়া যায় না, মানুষের পায়ে পায়ে নোংরা হয়ে গিয়েছে। ঐ ফরাসের বাইরে ওর টোটো রাখা আছে। এ বাড়ির বাবুরা দু দিনের জন্যে ওর টোটো ভাড়া নিয়েছে। বাড়ির লোকেরা, জড়ো হওয়া সব আত্মীয়-স্বজন আরও সব হরেক রকমের লোকেদের মধ্যে অনেকেই এমন এমন জায়গায় যাতায়াত করছে যেখানে গাড়ি যায় না। কাজেই টোটোর ব্যবস্থা।

বাড়ির বুড়ো বাবু মারা গেছে পরশু, মাঝ রাতে। কাল সকাল থেকে বাড়িতে চলেছে ধুন্ধুমার কাণ্ড। একটা কীর্তনের দল ডাকা হয়েছে, দুপুর থেকে চলেছে অখণ্ড কীর্তন। হরে রাম-ও, হরে কিষ্ণ, কিষ্ণ, কিষ্ণ, হরে হরে। দলের কয়েকজন গেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্য কজন ধরেছে, মাঝখানে কোন থামাথামি নেই। টানা চব্বিশ ঘন্টা ধরে কীর্তন হলে তবেই না বুড়ো বাবুর আত্মার শান্তি হবে। বুড়ো বাবুর আত্মা কতদূরে চলে গিয়েছে তা তো জানা নেই। তাই তার কানে এই গানের আওয়াজ পৌঁছে দেবার জন্যে বেশ জোরে মাইক চালানো হয়েছে। অবশ্যি মাইকের আওয়াজ সবচেয়ে বেশি কত জোরে হতে পারবে তা নিয়ে নাকি হাইকোর্টের একটা আদেশ আছে। কিন্তু কোর্টকাছারি তো খাস কলকাতায় — খালের ওপারে। আর এ জায়গাটা খালের এপারে। এখানে সেই আদেশ লাগু হবে কি? উত্তরটা হারার জানা নেই।

কাল রাতে হারা এখানেই শুয়েছে। রাতেও তো খেপ মারবার দরকার হতে পারত। ঘুমিয়েছে একেবারে শেষ রাতে। তখন মাইক বন্ধ হয়েছিল, কীর্তনের আওয়াজও মিনমিনে হয়ে গিয়েছিল। এখনও কীর্তন চলছে, তবে সেই মিনমিন করেই। ঘুমটা ভেঙেছে সকালের আলো জোরালো হবার পর। তবে ঘুম একটু কম হলেও ক্ষতি নেই — এ বাড়ির লোকেরা টোটো ভাড়া করে টাকা দিয়েছে ভালই। খাওয়াদাওয়াও ভাল। সকালে লুচি-আলুর দম, বিকেলে চা-বিস্কুট, দুপুরে আর রাতে ভাত, ডাল, বেগুনভাজা, আর খুব ঝাল তেল দিয়ে রান্না আলুপটোলের ডালনা। তবে লুচি ময়দার নয়। আটার, আর একটু সস্তার দালদায় ভাজা। ভাতটাও একটু মোটা চালের। তা হোক। কজন এরকম ভরপেট খাওয়ায়? এ বাড়ির ছোটবাবুর বৌ — ছোটগিন্নী, খুব করিৎকর্মা কাজের মহিলা। সব দিকে তার নজর আছে। ঠিক সময়মত কানাউঁচু শালপাতার থালায় খাবার এসে যাচ্ছে। মহিলা নিজে এসে দেখে যাচ্ছে সবাই ঠিকমত খাবার পেল কিনা। কাজের লোকজনেরা যে একটু ঢিলে দেবে তার উপায় নেই। ত্রিপলের ম্যারাপের নিচে পাত পেড়ে বসে খেয়ে যাচ্ছে অনেক লোক। হারা আর কীর্তনের দল তো আছেই — তা ছাড়াও অনেক লোক, হারা তাদের চেনে জানে না। কীর্তনের লোকদের একদল খেতে বসলে আর একদল ‘হরে কিষ্ণ’ শুরু করে, তাদের সবার খাওয়া শেষ হতে তাই দেরী হয়। হাত মুখ ধোবার, জল তেষ্টা পেলে জল খাওয়ারও অসুবিধে নেই। বাড়ির ঠিক পাশেই একটা টিউকল, তার জলটাও মিষ্টি। বেশি খেয়ে যদি পেট ধরে বেগ পায় তার ব্যবস্থাও আছে। বাড়ির বাইরের দিকে একটা চাকরদের বাথরুম — সঙ্গে গামছা-টামছা থাকলে সেখানে চানও করা যেতে পারে। হারা নিজেই তো কাল ওখানে চান করেছে। সঙ্গে গামছা তো ছিল না, টোটোর ধুলো ঝাড়বার কাপড়টা দিয়ে গা মাথা মুছে নিয়েছে। তারপর সেটা টোটোর ছাদে মেলে দিয়েছে — রোদের তাতে চট করে শুকিয়ে গিয়েছে। ওরকম একটা বাথরুম বানিয়ে রাখার জন্যে হারা মনে মনে বুড়োবাবুর তারিফ করে — লোকটা মরে গেছে, মাথায় কিন্তু বুদ্ধি ছিল।

তবে এখন এখানে যত না বড়োবাবুর ছেরাদ্দের ব্যাপার চলছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে টাকার ছেরাদ্দ। বুড়োবাবুর দুই ছেলে বাপ মরেছে বলে দেদার খরচা করছে। আসল ছেরাদ্দের দিন, যেদিন পুরুত এসে পুজো করবে, সেদিনও নাকি ঢেলে খরচা করবে। হারাকেও বলে রেখেছে সেদিন এসে খেয়ে যেতে। দুই ছেলে আসলে বাপের ওপর একটু রেগেই ছিল। বুড়োটা মরে না কেন? বাপ মরাতে ছেলেরা নাকি খুশিই হয়েছে। বুড়োর অনেক টাকাপয়সা জমি-জিরেত ছিল। এতদিনে ছেলেরা পেল।

টোটোর গায়ে হারার পুরো নাম লেখা রয়েছে। হারাধন দাস। কিন্তু হারাধন নামটা অনেক বড় আর বাবু গোছের। সেজন্যে সবাই হারা নামেই ডাকে। একেবারে ছোট বয়েসে হারার অন্য একটা নাম ছিল। বাপ নাম রেখেছিল মিলন। হারাধন নামটা পেয়েছিল আর একটু বড় হয়ে। ওর চেয়ে বড় দুই ভাই ছিল। বাপের পকেট থেকে টাকা চুরি করে কোথায় একটা রাস্তার পাশে বিক্রী করা তেলেভাজা দুজনে মিলে খেয়েছিল। পেটের শক্ত অসুখ করে দুজনেই পটাপট একের পর এক মরে গেল। খবর পেয়ে নিজের গাঁয়ের বাড়ি থেকে চলে এসেছিল ঠাক্‌মা, মেনকা। দুদিন ধরে নাতিদের নাম ধরে ডেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদল বুড়ি — ওরে আমার বুকের ধনেরা, কোথায় গেলিরে তোরা? নাতিদের শোকে কাঁদলেও বুড়ির চান, খাওয়া, শোয়া, কোনটাই বন্ধ থাকে নি। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সে সবও করে নিয়েছে ঠিকই। তিনদিনের দিন বুড়ির চোখের জল শুকোল। নিজের ছেলেকে, অর্থাৎ হারার বাপ ভীমকে ডেকে বলল ছোট নাতির মিলন নামটা আর চলবে না। ও এখন বুড়ির হারিয়ে গিয়ে ফেরৎ পাওয়া ধন — ওর নাম হবে হারাধন। হারার মা সুলোচনা শাউড়ির কথা শুনে কটকট করে বুড়ির দিকে তাকাল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। বুড়ির অনেক টাকা-পয়সা সম্পত্তি আছে। ঝগড়া করলে যদি বুড়ি রাগ করে — ছেলে, ছেলের বৌকে সেই সম্পত্তি না দিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দেয়? বুড়ির একটা গুরুদেব রয়েছে — বুড়ির গাঁয়েই সেই গুরুটার আশ্রম। যদি বুড়ি মরার আগে সব কিছু ঐ গুরুর পায়ে ঢেলে দেয়?

গোঁফ বেরোন পর্যন্ত হারা মায়ের সঙ্গে থেকেছে। খালি মায়ের সঙ্গেই, কারণ ওর দাদারা মারা যাবার কিছুদিন পরেই ওর বাপ হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। আর একটু বড় হয়ে এদিক ওদিক থেকে জানতে পেরেছিল ওর বাপ একা নিরুদ্দেশ হয় নি। ওই তল্লাটেরই আর একটা মেয়েমানুষকে নিয়ে ওর বাপ ভেগে পড়েছিল। অবশ্যি ভেগে যাওয়ার জন্যে ওর বাপকে খুব একটা যে দোষ দেওয়া যায় তা নয়। ওর মা ওর বাপকে মাঝে মাঝেই বেধড়ক মার দিত। হাত পা তো চালাতোই, সেই সঙ্গে রান্নাঘরের হাতা, খুন্তি, ডালের কাঁটা। হারার পরিষ্কার মনে আছে, কতদিন ওর বাপ বৌ-এর হাতে মার খেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে। এই মারপিটে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সোয়ামি-ইস্তিরি, দুজনেই তো মানুষ, একসঙ্গে বড্ড বেশি কাছাকাছি থাকে, এক বিছানায় শোয় — ঝগড়া তো লাগবেই। আর ঝগড়া লাগলে যার গায়ে জোর বেশি সে কমজোরিটাকে ঠ্যাঙাবে, তাই তো স্বাভাবিক। সুলোচনা ছিল ইয়া দশাসই চেহারার দজ্জাল মেয়েমানুষ — রাগলে তার লোচন-দুটি ভাঁটা হয়ে গিয়ে লাল হয়ে উঠত, আর যা ঘুরত তা দেখে ভয় লাগত। আর হারার বাপ নামে ভীম হলেও আসলে ছিল রোগা-পটকা। অনেক বছর পরে, যখন হারার মেয়েমানুষ সম্বন্ধে সব কিছু জানা হয়ে গিয়েছে, তখন মাঝে মাঝে ওর একটা কথা মনে হয়েছে। ওর বাপ বিছানায় ওর মাকে সামাল দিতে পারত কি? না পারলে সেই রাগেই কি ওর মা পিটত ওর বাপকে? ওর বাপ যার সঙ্গে পালিয়েছিল সেই মেয়েমানুষটা ছিল ছোটখাট রোগা পাতলা চেহারার। ওদের ঘরের কাছাকাছিই একটা ঘরে থাকত। হারা ওকে দেখেছে — যদিও অনেক ছোট বয়েসে। মেয়েমানুষটার মুখ ভুলে গিয়েছে, চেহারার আদলটা এখনও মনে আছে।

ঠাক্‌মা বুড়ি ওর বাপের গায়েব হয়ে যাওয়ার খবরটা কোথা থেকে পেয়েছিল তা হারার জানা নেই। তবে এসব খবর তো কাকের মুখে ছড়ায়। হারাদের পাড়ার কোন লোকই হয়তো মেনকার কানে খবরটা পৌঁছে দিয়েছিল — খবরটা পেয়ে বুড়ির কিরকম জ্বলন হয় সেটা দেখবার-জানবার জন্যে। হঠাৎ একদিন মেনকা এসে উপস্থিত, সঙ্গে তার গাঁয়ের দুটো লোক। নাতিকে মেনকা নিজের কাছে নিয়ে যাবে — দজ্জাল, শয়তান বদমাশ মাগিটা, যার জন্যে নিজের ছেলে বিবাগি নিউদ্দিশ হয়ে গেল তার কাছে নাতিকে আর রাখবে না। আরে বাপরে বাপ্‌, সে কি ঝগড়া। তবে গলার জোর সুলোচনারই বেশি, হাতে আবার বেড়াল তাড়ানোর ছোট কাঠের লাঠিটাও তুলে নিয়েছিল। হয়তো শাউড়িকে কয়েক ঘা বসিয়েও দিত, সাহস করে নি বুড়ির সঙ্গের ষণ্ডা চেহারার লোক দুটোর জন্যে। মেনকা বুদ্ধি করে নিজের সাথে লোক নিয়ে এসেছিল, ছেলের বৌটা কিরকম মারকুটে সেটা তো বুড়ি জানত। কিন্তু সেদিন মেনকা বিশেষ সুবিধে করতে পারে নি। নিজের গাঁয়ে ফিরে চলে গিয়েছিল, নাতিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে নি। কিন্তু শাসিয়ে গিয়েছিল, সব সম্পত্তি, জমি জায়গা গুরুদেবের আশ্রমে দান করে দেবে। বুড়ি মরলেই যে সব সম্পত্তি নাতির হয়ে যাবে আর ঐ দজ্জাল ছেলেখাকি, ভাতার তাড়ানি মাগী নাবালক ছেলের জমি-জিরেত দেখাশোনা করার নামে সে সব ভোগদখল করতে তা হবে না।

ওদের ঘরের চারপাশের সব ঘরের থেকে মেয়েরা বেরিয়ে এসে হাসি হাসি মুখে দুই মায়েমানুষের তুড়ে ঝগড়া দেখছিল। এসব ঝগড়া দেখতে ভারি মজা — টিভিতে দুপুরের সিরিয়াল দেখার চাইতেও বেশি। সেজন্যে শাউড়ি বৌ-এর ঝগড়া থামাতে কেউ এগিয়ে আসে নি। আরও ভাল হত যদি বৌটা শাউড়িকে হাতের লাঠিটা দিয়ে বেশ কয়েক ঘা দমাদম বসিয়ে দিতে পারত। বুড়ি হেরে গিয়ে চলে যাবার পর পড়শি মেয়েরা অনেকেই একটু মনখারাপ করেছিল। তামাশাটা বুঝি শেষ হয়ে গেল। হয়নি। মেনকা চলে যাবার পর প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে চেঁচিয়েছিল সুলোচনা। শাপশাপান্ত, বুড়ির চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে গালাগাল। হারা নিজেদের ঘরের খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে নিজের মাকে দেখছিল। শেষ পর্যন্ত সুলোচনার রাগ এসে পড়ল নিজের ছেলের ওপর। যে হারামজাদা অন্য একটা মেয়েমানুষ নিয়ে পালিয়েছে হারা কেন তার ছেলে। মাথায় পিঠে দমাদ্দম চড় আর কিল। এবার সুলোচনার চেঁচানির সঙ্গে জুড়ল হারার চিৎকার। জোরসে চেঁচালে মা বেশিক্ষণ মারবে না। কিন্তু পড়শি মেয়েদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এবার এগিয়ে এল, তাদের সবার আগে পাশের ঘরের লতিকামাসি। সবাই মিলে চেপে ধরল সুলোচনার দু হাত। বাচ্চা মানুষ, ওকে মারছ কেন? ও কি করেছে? ওর বাপ যাই হোক, পেটে তো তুমিই ধরেছ।

এবার থামল সুলোচনা। এতক্ষণ চেঁচিয়ে দমও অবশ্যি ফুরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন অন্য নাটক। হারাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কান্না। ওরে হারা, তোর বাপ আমাকে ছেড়ে গেছে, তোর ভাইরা আমাকে ছেড়ে স্বগ্‌গে গেছে — তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই — তুই আমায় ছেড়ে যাস নে বাপ আমার।

কাঁদতে কাঁদতেই হারাকে নিয়ে ঘরে ঢুকল সুলোচনা। পড়শি মেয়েরা তখনো নিজেদের ঘরে যায় নি। মেয়েমানুষটার যা মেজাজ, আবার যদি ছেলেটাকে ধরে পিটতে থাকে? বলা তো যায় না।

তবে সেদিন হারাকে ওর মা আর মারে নি। সে রাতটা ছিল চাঁদনি রাত আর গুমোটের জন্যে রাতে ওদের ঘরের জানালাটা খোলা ছিল — বেশ খানিকটা জোছনা এসে পড়েছিল ওদের ঘরের ভেতর। মায়ের পাশে শুয়ে হারা জেগে ছিল। ওর মা ঘুমিয়ে পড়েছে — সারাদিনের ঝগড়াঝাঁটির ধকল গেছে তো। ঘুমন্ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হারার বড় মায়া হয়েছিল। মায়ের মুখটা শান্ত, ঠান্ডা, বড় নিরীহ। মায়ের কাছে ঘেঁষে এসে শুয়েছিল হারা, ঘুমের মধ্যেই মা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল।

কিন্তু চাঁদের আলোয় ঘুমন্ত মা আর দিনের আলোয় জেগে থাকা, ঘরের কাজ করা মা-তে অনেক তফাৎ। সকালে সুলোচনা হারাকে খানিকটা শুকনো মুড়ি খেতে দিয়েছিল। একেবারে শুকনো মুড়ি, তাতে কি আর স্বাদ লাগে? মুড়ি হবে ঝাঁঝালো তেল দিয়ে মাখা, তাতে মেশানো থাকবে পেঁয়াজ আর ঝাল কাঁচালঙ্কার কুচি, মুড়িও হবে আধ বাটির বদলে পুরো বাটি ভর্তি, তবে না মুড়ি খাওয়ার মজা? সেরকম মুড়ি খাবে — সেই আবদার ধরেছিল হারা। গালে চটাস করে পড়ল একটা জোরালো চড়, কালো রঙের গালে লালচে ছোপ পড়ে গেল। শুয়োরের বাচ্চা নবাবের ব্যাটা, তোকে এখন আমি তেলমাখা মুড়ি খাওয়াতে বসি আর কি। যা দিয়েছি তা খাবি তো খা, না হলে ছাই খা। খেয়ে বইখাতা নিয়ে চটপট বেরিয়ে ইশকুলে যা। আমি দরজায় তালা লাগিয়ে বেরোব। কাজের বাড়ি যেতে হবে না? রোজগার করে এলে তোর জন্যে ভাত রাঁধতে হবে না?

ওরকম একটা চড় খেয়েও হারা ভয়ে কাঁদতে সাহস করে নি। কাঁদলে যদি মা আরও বেশি মার দেয়? ঐ মুড়ি কটা কোনরকমে গিলে নিয়ে ইশকুলে চলে গিয়েছিল। সরকারি ইশকুল, মাইনে তো লাগে না, বইপত্তরও দেয় ওরাই। কিন্তু বই দিলেই কি আর পড়া হয়? কোন বইতে কি আছে হারা এখন পর্যন্ত সেটাই জানে না। আর আশ্চর্য ব্যাপার — হারা যদিও বইটই খোলে না, কিন্তু ইশকুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসার সময় যেটুকু হাত লাগায় তাতেই বইগুলো ছিঁড়ে যায়। হারার তখন মায়ের জন্যে দু:খ লাগে। চেষ্টাচরিত্র করে ছেলেকে কর্পোরেশনের ইশকুলে পড়াচ্ছে — ভাবছে ছেলে পড়াশোনা করে জজ ম্যাজিষ্টর হবে। বেচারি কাজ করে খালের ওপারে বড় বাড়িগুলোর তিনটে ফেলাটে — ঝাড়ু পোঁছা — বর্তন সাফা — কত আর রোজগার করে? খালের ওপারে যাওয়া আসা করার ঝক্কিও আছে। পাকা পুলটা একটু দূরে — অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। কাছাকাছি একটা বাঁশের সাঁকো রয়েছে — পায়ের তলায় দুটো বাঁশ, আর হাত দিয়ে ধরবার জন্যে পাশের দিকে আর একটা বাঁশ। পা টিপে টিপে পার হতে হয় — বিশেষ করে বর্ষাকালে। তবে সময় বাঁচানোর জন্যে বেশিরভাগ লোক ঐ বাঁশের ওপর দিয়েই খাল পার হয় — হারার মা-ও তাই করে। হারা একদিন সুলোচনাকে জিগ্যেস করেছিল, মা, তুমি যে ওই বাঁশের ওপর দিয়ে খাল পার হও — কোনদিন যদি পড়ে যাও তাহলে কি হবে? আর বলেই ভয় পেয়েছিল — এই রে, মা বুঝি লাগিয়ে দিল এক চড়। কিন্তু সুলোচনা ওকে মারে নি। বরং গাল টিপে আদর করে দিয়ে বলেছিল, কি আর হবে? আমি মরে যাব, আর তুই তাহলে খেতে পাবি না।

বেলা বাড়ছে, ছেঁড়া ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে একটু একটু রোদ আসতে শুরু করেছে। হারা টিউকলে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে জল খেয়ে নিল। এর ভেতর চট করে বাথরুমটাও ঘুরে এসেছে। শোকের হাঙ্গামার বাড়ি, এর পর গাদা গাদা লোকের ঝামেলা লাগবে। বাথরুম খালি পাওয়া মুশকিল হবে, এমনকি লাইনেও দাঁড়াতে হতে পারে। আর তাহলে কতক্ষণ বেগ চেপে রাখতে হবে তার ঠিক নেই। যাক্‌, ওর আর ওসব ঝামেলা নেই — ওর এখন যা দরকার তা হচ্ছে গরম গরম সবে-ভাজা ফুলকো লুচি আর ভালরকম দুধ চিনি দেয়া ধোঁয়া-ওঠা গরম চা। তবে মনে হচ্ছে খাবার শীগগিরই আসবে, বাড়ির ভেতর থেকে লুচিভাজার গন্ধ আসছে। হাতঘড়িটা চোখের কাছে এনে হারা সময় দেখল। সাতটা পঁয়তিরিশ। আটটার ভেতর নাস্তা চলে আসবে মনে হয়।

হারা আবার ঘড়িটার দিকে আদরের চোখে তাকাল। দামী ঘড়ি, দম দিতে হয় না। তার ওপর আর দিন তারিখ দেখায়, নিজে থেকেই তারিখ বদলে যায়। ঘড়িটা ওর বড় পেয়ারের, চান আর রাতে শোয়ার সময়টুকু ছাড়া সব সময় ওটা হাতে পরে থাকে। তবে এরকম দামী ঘড়ি নিজে কিনবে সে পয়সা হারার নেই। ওটা ওকে দিয়েছিল ওর শাউড়ি — লক্ষ্মীমণি দেবী। নামে লক্ষ্মী, স্বভাবেও শাউড়িটা বড় লক্ষ্মী। বড় ভালবাসে হারাকে। হারার তো মনে হয় নিজের ছেলে গৌরাঙ্গ — অর্থাৎ গৌরা, তার চাইতেও বেশি। শাউড়ি পরিষ্কার বলে, আমার দুই ছেলে। গৌরা যেমন, হারাও তেমন। এই যে হারা বৌ বাতাসীকে নিয়ে শাউড়ির ঘাড়ে থাকে, সে তো শাউড়ি এত ভালবাসে বলেই। গৌরা আর তার বৌ মালতী তো খুব চায় হারা তার বৌকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাক, যে চুলোয় ইচ্ছে চলে যাক। সেটা হয় না শাউড়ি আছে বলে। এই ঘরভাড়া শাউড়ি দেয়, এতগুলো পেটও চলে শাউড়ির রোজগারের টাকায়। রোজগার অবশ্য লক্ষ্মীমণি খুব ভালই করে। খালের ওপারে অনেকগুলো ফেলাটে রান্না করে — মোটা মোটা টাকা নেয়। ঐ ফেলাটগুলোতে সব কমবয়েসী সোয়ামি ইস্তিরি থাকে, দুজনেই চাকরি করে। মেয়েগুলো সব লেখাপড়া অনেক শিখেছে, হুড় হুড় করে ইংরেজি বলে, কিন্তু রান্নায় ডডনং। যেদিন শরীর খারাপের বাহানা করে লক্ষ্মীমণি কাজে ডুব দেয় সেদিন সোয়ামিটাকে নিয়ে দোকানে খেতে যায়। মাসের শেষে হাতে বেশি টাকা না থাকলে রোলের দোকানের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোল খায়। আগে আগে মাংসের রোল খেত। কিন্তু এই কিছুদিন আগেই হৈ হৈ রৈ রৈ হ’ল — ভাগাড় থেকে পচা কুকুর বেড়ালের মাংস চালান হয়ে আসছে — সেই মাংস কুচো করে রোল, বিরিয়ানি, কাবাব, এসবে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাই এখন ডিম রোল খায়।

তবে কামাই করলেও লক্ষ্মীমণির মাইনে কেউ কাটে না। মাইনে কাটলে যদি গোসা করে সে বাড়ির কাজ ছেড়ে দেয় তাহলে তো সে বাড়ির চাকরি করা যুবতী গিন্নির মাথায় হাত পড়বে। মাসে হাজার পঁচিশ শাউড়ির রোজগার। সে কত টাকা তা হারার মাথায় ঢোকে না। ও নিজে টোটো চালিয়ে যা রোজগার করে তা সবই ওর পকেট থেকে বেরিয়ে যায়। বিড়িটা, সিগারেটটা খাওয়া আছে — ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে একটু আধটু তাসের জুয়োখেলা আছে। হারার তাসের কপাল ভাল নয় — প্রায় দিনই বেশ কিছু টাকা হেরে যায়। তবে সবচেয়ে বেশি টাকা উড়ে যায় বেবির সঙ্গে পীরিত করতে গিয়ে। বেবিটা ধড়িবাজ ঘোড়েল মেয়েমানুষ, পুরুষমানুষের পকেট থেকে কি করে টাকা খসাতে হয় সে কায়দা খুব ভালরকম জানে। ওর নিজের বৌটা, বাতাসী, রোগা-পটকা - দুবলা। দুটো বাড়িতে কাজ করে তাতেই ঘরে ফিরে হ্যা হ্যা করে হাঁপায়। রাতে ঘুমোয় মড়ার মত। তখন হারা গায়ে হাত দিলে বিরক্ত হয়, হারাকে কোনরকমে ঝটপট কাজ সেরে নিতে হয়। ওর শরীরটা একেবারে শুকনো — হাড় আর চামড়া ছাড়া কিছু নেই। আর বেবি একেবারে একটা রসে ভরা টুসটুসে পাকা মালদার ল্যাংড়া আম — ওর বিছানায় শুতে গেলে টাকা ভালরকম তো লাগবেই।

এ বড়িতে থাকা নিয়ে গৌরা কখনো হারাকে মুখ ফুটে কিছু বলে নি, যদিও হাবেভাবে অনেকবারই বুঝিয়েছে, কটকট চোখ করে তাকিয়েছে। কিন্তু মালতী মেয়েমানুষ — একদিন হারাকে মনের কথা বলে ফেলেছিল। গরমকাল, দুপুর বারোটার ওপর টোটোর খেপ দেয়া শক্ত — গরম হাওয়া নাক কান দিয়ে ভেতরে ঢুকে জানটা একেবারে শুকিয়ে দেয়। ঘরে ফিরে এসে ইলেকটিরিক পাখা পুরোদমে খুলে দিয়ে হারা বিছানায় শুয়েছিল। শাউড়ি সকালে রান্না করে রেখে গেছে। সকালের কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে বেলা দুটো হবে — তখন সব খাবার গরম করে খেতে দেবে। বাতাসী কাজ থেকে এখনও ফেরেনি। ওর ঘরে না থাকাই ভাল, থাকলেই এটা ওটা সেটা নিয়ে খ্যাটখ্যাট করে। হারা নিশ্চিন্ত মনে একটা ছোটখাট ঘুম দেবার তোড়জোড় করছিল। মালতী তার এক বছরের ছেলেকে ঘরের বাইরের বারান্দার পাশের নর্দমায় হিসি করিয়ে তাকে কোলে নিয়ে ফিরে আসছিল। হারার ঘরের ভেতর দিয়েই ওদের ঘরে যেতে হয়। বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা হারাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। গলায় একটু বিষ ঢেলে বলল, দেখো হারাধন, তোমাকে একটা কথা বলি, এই যে শউরবাড়িতে থেকে আমাদের অন্ন খাচ্ছ সেটা কি ভাল হচ্ছে? পুরুষমানুষ, বৌকে নিয়ে নিজের বাড়িতে থাকবে, সেটাই তো উচিত।

মালতী একটু থামল। বাঁ হাতে তার বাচ্চাকে কোলে ধরে রেখে ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে ছেলের হিসি করার ছোট্ট যন্তরটি ধরে খুব জোরে ঝাড়া দিল। যেটুকু হিসি ভেতরে আটকে আছে তা বেরিয়ে যাবে। হারা বিছানায় উঠে বসেছিল — বাচ্চাটার হিসির কয়েক ফোঁটা পড়ল ওর বিছানায়, আর এক ফোঁটা ছিটকে এসে পড়ল ওর ঠোঁটে। তাড়াতাড়ি করে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে ফেলল হারা। ততক্ষণে মালতী আবার বলতে শুরু করেছে, টোটো কিনেছ, তা চালাবে, খেটে রোজগার করবে, নিজের রোজগারে বৌকে খাওয়াবে। চোখের চামড়া থাকলে তো বাপু কোন পুরুষমানুষ এমন করে শউরবাড়ির ভিটে কামড়ে পড়ে থাকতে পারে না।

হারা বুঝতে পারছিল না মালতীর কথার কোন জবাব দেয়া উচিত কিনা। আর জবাব দিতে হলে কি বলবে তাও ভেবে পাচ্ছিল না। তাছাড়া মেয়েমানুষের সঙ্গে কথা বাড়ালে বিপদ আছে। মালতী চেঁচামেচি চিৎকার করে একতরফা ঝগড়া শুরু করে দিতে পারে। চারপাশের ঘর থেকেও লোকজন ছুটে আসবে, তারাও চিমটি কাটার মত করে নানা কথা বলবে। বিশেষ করে সব মেয়েমানুষেরা। আর যদি মালতী মিথ্যে করে চেঁচিয়ে বলে হারা ওর গায়ে খারাপ মতলবে হাত দিয়েছে তাহলে তো ওই সব লোকজন হারাকে ধরে চোরের মার লাগাবে। বাড়িতে এখন ও আর মালতী ছাড়া কেউ নেই, মালতীর কথাই বিশ্বাস করবে সবাই। তারপরে থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি — বাপরে বাপ, জব্বর ঝামেলায় ফাঁসবে হারা।

হারাকে কিছু বলতে হল না, লক্ষ্মীমণির গলার আওয়াজ এল ঘরের দরজার কাছ থেকে — হ্যাঁ, হারাধন আর বাতাসী থাকবে, এ বাড়িতেই থাকবে। তোমরা থাকতে পারলে ওরাই বা থাকবে না কেন? ওদের কে খাওয়ায়, তোমরা না আমি? তোমাদেরও তো আমিই খাওয়াই — নিজেদের পয়সায় তো খাও না তোমরা।

মালতী একেবারে চুপ — ভাবতে পারেনি শাউড়িটা আজ এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসবে। লক্ষ্মীমণির সঙ্গে তকরার করার সাহস ওর নেই। আর একথা তো মিথ্যে নয় যে গৌরা আর মালতীর কাছ থেকেও লক্ষ্মীমণি খাওয়ার টাকা নেয় না। আর কথাটি না বলে মালতী ছেলে কোলে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।

লক্ষ্মীমণি ঘরে ঢুকে এল। হারা চুপ করে নিজের বিছানায় বসে ছিল — ওর মাথায় গালে হাত বুলিয়ে আদর করে দিল। বলল, তুমি বাবা ওসব কথা কানে নিও না। আমি যতদিন আছি তুমি আর বাতাসীও এখানেই আছ।

হারা যখন ছোট ছিল লক্ষ্মীমণি ওকে তুই করে কথা বলত। যবে থেকে হারা জামাই হয়েছে তখন থেকে তুমি বলে।

লক্ষ্মীমণি চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। সকালে খাবার বানিয়ে রেখে গেছে, এখন তা গরম করে হারাকে খেতে দেবে। আগে শাউড়ি বুড়ি কেরোসিনে রান্না করত, গত দুই বছর ধরে রান্না হচ্ছে গ্যাসে। বুড়িটা রাঁধে দারুণ, ওকে কি আর সবাই মিছিমিছি এত টাকা মাইনে দেয়? হারা বিছানা ছেড়ে উঠল। ঘরের বাইরে লম্বা টানা বারান্দা, সেখানে বড় বড় কয়েকটা বালতিতে জল রয়েছে। এ বাড়িতে একমাত্র মালতী কোন টাকা রোজগার করে না, সেজন্যে টিউকল থেকে বালতি ভরে জল নিয়ে আসাটা ওর দায়িত্ব। কাজটা পরিশ্রমের, সেজন্যে এ কাজ করতে মালতী যথেষ্ট গজগজ করে। বাড়িতে দু দুটো জোয়ান বয়েসের পুরুষ আছে, আর একটা যুবতী মেয়েও রয়েছে। তাতেও কেন এই জল তোলার কাজ মালতীর ঘাড়েই চাপবে? কিন্তু মালতীর স্বাস্থ্যটি দিব্যি গায়ে গতরে। সেজন্যে লক্ষ্মীমণি এই কাজটা ওকেই দিয়ে রেখেছে।

বালতির ভরা জলে একটা পেলাস্টিক মগ ডোবানো রয়েছে। মগে করে জল নিল হারা, বারান্দার পাশে গিয়ে হাত, মুখ, ঠোঁট সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলল। মালতীর বাচ্চার হিসির জন্যে একটু ঘেন্না ঘেন্না লাগছিল। সাবান দিয়ে সব ধুয়ে ফেলে তবে ঘেন্নার ভাবটা গেল। এইবার আয়েস করে খেতে বসতে পারবে।

তবে মালতী শাউড়ির ধমক খাওয়ার পরে হারাকে আর কোনদিন কিছু বলেনি। সেটা ছিল বোশেখ মাসের কথা। জষ্টি মাসে জামাইষষ্ঠী। হারাকে আদর করে খাওয়াল লক্ষ্মীমণি। ডাল, বেগুনভাজা, এঁচোড়ের ডালনা, কুচোচিংড়ি দিয়ে লাউ, পাবদা মাছের ঝাল, মুর্গীর কালিয়া — শেষ পাতে চাটনি, দই, মিষ্টি। তার ওপরে খাস মালদার ল্যাংড়া আম। অত কি হারা খেতে পারে? হাঁসফাস করছিল, কিন্তু শাউড়ি ছাড়ে নি। পাশে বসে মাথায় পাখার হাওয়া করেছে আর বলেছে — আর একটু খাও বাবা, এই আমটুকু খেয়ে নাও। তা উপরোধে মানুষ ঢেঁকি গেলে, হারাও শাউড়ির দেয়া আম খেয়ে ফেলেছিল। তার পরে হাত মুখ ধোয়া এক কঠিন ব্যাপার — এত খেয়েছে, সহজে কি আসন ছেড়ে ওঠা যায়? লক্ষ্মীমণিই জল আর সাবান নিয়ে এল, খাওয়ার থালাতেই হাত মুখ ধুয়ে নিল হারা। মুখ হাত মোছার জন্যে গামছার দরকার পড়েনি, শাউড়ি আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছিল। এক পাশে একটা ছোট লাল বাক্স রাখা ছিল। সেটা খুলে শাউড়ি বার করল এই ঘড়িটা, পরিয়ে দিল হারার বাঁ হাতে। গড় হয়ে শাউড়িকে পেন্নাম করেছিল হারা। বলেছিল, তুমি সত্যিই আমার আরেক মা।

সত্যি কথা, — লক্ষ্মীমণি বলেছিল, তোকে পেটে না ধরলেও আমি তোর মা।

হারা একটু মজা পেয়েছিল — বেশি ভালবেসে অনেক বছর পরে আবার তুই বলে ফেলেছে লক্ষ্মীমণি।



(ক্রমশ)



(পরবাস-৭২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮)