ISSN 1563-8685




কোথাও জীবন আছে

।। ১১ ।।

হাফ্‌ ইয়ারলি পরীক্ষার পর গোটা একটা হপ্তাও ছুটি পাওয়া গেল না। তাতে যে শরণ্যাদের খুব একটা আপত্তি ছিল তা নয়, কিন্তু ইস্কুল খুলেই সিলেবাস শেষ করবার এমন ধুম পড়ে গেছে যে সকলেই কিছু বিমর্ষ। সত্যি, পরের বছর এই সময় আর ইস্কুল নেই। য়ুনিফর্ম পরতে হবে না, ক্লাসের পর ক্লাস ঠায় বসে থাকতে হবে না – আর, একে অপরের সঙ্গে প্রতিদিন দেখাও হবে না। কে কোথায় ছিটকে পড়বে, কে জানে! এই মুহূর্তে অবশ্য তাদের অত্যাশ্চর্য ইস্কুল এসব কথা মনে রাখতে দিচ্ছে না।

উপলা বিড়বিড় করতে করতে ক্লাসে ঢুকল, “মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের রঙীন ইস্কুলের বিষয়ে একখানা আর্টিকেল লিখে কাগজে ছাপিয়ে দেব।”

শরণ্যা খবরের কাগজ ওলটাচ্ছিল, এবারে মুখ তুলে বলল, “কেন, আবার কী হয়েছে?”

“হয়েছে মানে? হচ্ছে না-টা কখন শুনি!” উপলা সশব্দে চেয়ার টেনে বসে বলে।

“না, কিন্তু এখন কী হল?”

“আরে শালা!” উপলা উত্তেজিত হয়ে টেবিলে এক চাপড় মারল, “ওই হতচ্ছাড়া পি.টি. টিচার সরখেলকে যদি একহাত দেখে না নিয়েছি! লিটারখানেক পচা দুধের সর গেলাতে হয় মালটাকে — ”

মৃণালিনী এতক্ষণ জানলার ফাঁক দিয়ে গলে আসা তেঁতুল গাছের ডালটার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে প্রায় ন্যাড়া করে এনেছিল। ওদের কথা শুনে ছিট্‌কে পড়ে বলল, “কি বললি? পচা দুধের সর!”

“পারলে তার থেকেও খারাপ কিছু।”

“কি করেছে মালটা?”

“জানিস তো, আমার ফ্ল্যাট ফুট নিয়ে সমস্যা আছে? স্পোর্টস্‌ শু নয়তো কেড্‌স ছাড়া আর কিছু পরা বারণ। আমি নিজে হাতে লিখে প্রিন্সিপালকে জানিয়ে এসেছি যে ব্যালেরিনা জুতো পরে ব্যালে করা আমার দ্বারা হবে না, এদিকে গেট ঠেলে ঢুকতে না ঢুকতেই সরখেল আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে কিনা, ‘ইয়াস্‌ ইয়ো, হোয়াইট সো!’”

সবাই তাজ্জব মেরে গেল। তিলোত্তমা জিজ্ঞেস করল, “মানেটা কি?”

“মানে ‘ইয়েস, য়ু, হোয়াইট শু।’ সোজা বাংলায় আমাকে জিজ্ঞেস করছে সাদা জুতো পরে কেন এসেছি। ‘কেড্‌স’ শব্দটা ওনার অভিধানে নেই। মানুষ যদি ওরাং-ওটাং-এর ভাষায় কথা বলে, তাহলে তাকে নিয়ে কী করা উচিত?”

এই পর্যন্ত শুনেই সকলে হেসে অস্থির হয়ে উঠল। উপলা অবশ্য তার মধ্যেই হাত-পা নেড়ে বলে চলল, “এখানেই শেষ নয়! আমি যতই ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করি, কানেই তোলে না! শেষ অবধি ভাইস্‌-প্রিন্সি-র কাছে ধরে নিয়ে গেল। এদিকে সে তো আবার সবে মাসখানেক হল জয়েন করেছে, এই পাগলা-গারদের বিন্দু-বিসর্গও জানে না। সরখেলের কথার মানে উদ্ধার করতেই তার দিন কাবার হয়ে গেল।”

“তখন কী হল?”

“কী আবার হবে? শেষ অবধি ফাইল-পত্তর ঘেঁটে আমার চিঠি বার করে দুই মানিকজোড়কে দেখিয়ে শান্তি হল। অবশ্য আমিও ছাড়িনি আজকে। চাপা গলায় ভাইস-প্রিন্সিকে বললাম, ‘নিজে যে ঘোড়ার নালের প্রিন্টওয়ালা টাই ঝুলিয়ে এসেছেন, সেটা ড্রেস-কোডের মধ্যে পড়ে কিনা চেক করেছেন?’”

“কী বলছিইইইইস!” শরণ্যা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল।

“যাঃ, হতেই পারেনা,” তিলোত্তমা হাত নাড়ে।

“বিশ্বাস না হয় তাকে জিজ্ঞেস করে আয় গে যা!”

“এর পরেও তোকে আস্ত ছেড়ে দিল?” মৃণালিনী রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করে; ভাবখানা, যদি সত্যিই ছেড়ে দিয়ে থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে নিজেও এই ধরনের কিছু একটা শুনিয়ে আসবে।

“ছেড়ে দিল মানে? রীতিমতো কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘সরি ফর দ্য মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং বাবু, মাঝে মাঝে ওরকম হয়।’”

“এ কোন দেশের লোক রে ভাই!” তিলোত্তমার চোখ কপালে উঠে যায়।

“মঙ্গল গ্রহ। পোষাক দেখে তো তাই মনে হয়। কিন্তু সরখেল যা জব্দ হয়েছে! টুঁ শব্দটি করতে পারেনি।”

“সত্যি বাবা!” শরণ্যা বলে, “মাঝে মাঝে কিছু খেল দেখায় ওই সরখেল।”

“শুধু সরখেল?” মৃণালিনী ফিরিস্তি দেয়, “প্রিন্সি, ভাইস-প্রিন্সি, গেমটিচার হাঙর, পি.এস., তোদের হিস্ট্রির আর. দত্ত, আমাদের জিওগ্রাফির উন্মাদ চৌধুরী, বাংলার ন্যাকা মুখার্জি, ওদিকে রন্‌-পলের হিন্দির ড্রামাবাজ আগরওয়াল, কে নয় বল্‌ তো? একমাত্র এ.জি. ছাড়া সব কটা গন্‌ কেস!”

“যাই বল্‌ বাবা,” তিলোত্তমা হাসতে হাসতে বলে, “আমাদের স্কুল নিয়ে রন্‌ একটা কমিক নভেল লিখে ফেলতে পারে!”

“রনের কম্মো নয়,” উপলা তখনোও বিরক্ত, “বাবুয়া ভৌমিকের যাত্রার চিত্রনাট্য হতে পারে। আচ্ছা, এর আগে জীবনে কোনোদিন কোনো ইস্কুলে মর্নিং অ্যাসেম্ব্‌লির সময় মার্চ পাস্ট করাতে দেখেছিস?”

মৃণালিনী বলল, “এটা একেবারে সঠিক এক্স্যাম্প্‌ল। আমি আর নীরা তো কক্ষনো ‘লেফ্‌ট-রাইট’ বলি না; ‘ঘাস-বিচালি-ঘাস’ বলে চেঁচাই। একবার পি.এস. শুনে ফেলেছিল।”

“সে কী! কী বলল শুনে?”

“যা সব সময় বলে, ‘ওঃহো!’”

অনেকক্ষণ হাসাহাসির পর তিলোত্তমা জিজ্ঞেস করে, “কী রে, নীরা কই? জন্মদিন বলে ডুব মেরে দিল নাকি?”

মৃণালিনী উচ্ছে-খাওয়া মুখ করে বলল, “বলা যায়না, দেখলি হয়তো ক্লাস কেটে অত্রির সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছে। আজকাল তো আবার...”

উপলা, শরণ্যা আর তিলোত্তমা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাসল। তিলোত্তমা গলা-খাঁকারি দিয়ে বলল, “নীরার ব্যাপার তো বুঝলাম, কিন্তু তোমার কেস যে ভাঙছনা বস্‌?”

মৃণালিনী চোখ গোলগোল করে বলল, “যাশ্‌শালা, কী ভাঙব?”

“কী ভাঙবি?” উপলা মৃণালিনীর হাতে চিমটি কেটে বলে, “ন্যাকামি শিখলি কোত্থেকে রে, রবিঠাকুরের বউ?”

মৃণালিনী দাঁত খিঁচিয়ে কী সব বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা ঢাউস কেকের বাক্স হাতে গলদঘর্ম হয়ে নীরা ঢুকল। সবাই হই-হই করে ‘হ্যাপি-বার্থডে’ চেঁচিয়ে উঠল।

“থ্যাংক য়ু, থ্যাংক য়ু; বাপ্‌স,” নীরা ধপাস করে সীটে বসে পড়ে বলল, “চাপের চাপ, পঞ্চুর বাপ। অত্রি ইডিয়েটটা বাড়িতে না পেয়ে প্রেজেন্ট হাতে সটান স্কুলগেটে চলে এসেছে। ঠিক তখনই আবার গেমটিচার হাঙর আর মিস্টার পকোড়া ঢুকছিল।”

“পকোড়াটা আবার কে?”

“কেন, কমার্স সেকশানের অঙ্ক-টিচার পাকড়াশি! গোলাপি ছাড়া অন্য রঙের শার্ট পরে না। তবে ভাগ্যিস আজকে ছিল! দুজনে ফ্লার্ট করতে এমন ব্যস্ত ছিল, আমার দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। না হলে আমি আজ শিওর হাঙরের পেটে যেতাম।”

সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে আসল ব্যাপারের খোঁজ নিতে শুরু করল। মৃণালিনী গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, “কেকটা আবার কঞ্জুসী করে ছোট সাইজ আনিসনি তো?”

উপলা পাশ থেকে জুড়ে দেয়, “চকলেট তো? অন্য কোনো হাবিজাবি ফ্লেভার নয় তো?”

“আরে হ্যাঁ রে বাবা, খাঁটি ডার্ক চকলেট, অর্ডার দিয়ে বানানো। আর লিনী, বাজে বকবি না একদম, কত খেতে পারিস আমি দেখতে চাই শুধু।”

উপহার দেবার পালা শুরু হল। উপলা যথারীতি বই এনেছে। শরণ্যা এক বাক্স দামী ওয়াটার কালারের সেট দিল। লিনী দিল ড্রেস মেটিরিয়াল, তিলোত্তমা দিল পার্কার পেন। নীরা খুশি হয়ে বলল, “সব কটাই দারুণ হয়েছে রে। দাঁড়া, অত্রিরটা খুলি এবার।”

মৃণালিনী করুণ সুরে বলল, “তার আগে কেকটা যদি —”

“চুপ কর্‌ পেটুকদাস। খাওয়া, গৌরীশঙ্কর আর শিল্‌দা ছাড়া তোর জীবনে আর কিছুই নেই।”

উপহার খুলেই নীরা চোখ গোলগোল করে বলল, “আরিব্বাস!”

“কী, কী, দেখি?” সবাই মিলে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর কি! নীরা বইটা দেখাল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হঠাৎ নীরার জন্য’। ভিতরে লেখা, ‘অন্য এক নীরাকেঃ অত্রি।’

“বাব্বাঃ!” মৃণালিনী চোখ উলটে বলল, “সেদিনের ছোকরা রিকু সেন দেখি একেবারে পার্ফেক্ট প্রেমিক বনে গেছে! কালে কালে হল কি শালা!”

নীরার মুখে চওড়া হাসি ছিল এতক্ষণ। মৃণালিনীর কথা শুনে হঠাৎ ভুরু কুঁচকে বলল, “আসলে...”

তিলোত্তমা আর উপলা বইটার পাতা ওলটাচ্ছিল। নীরার কথায় মুখ তুলে বলল, “আসলে কী?”

“না... তেমন কিছু না। দেওয়ার সময় বলল, বইটা ওরই কেনা, কিন্তু বিশেষ করে এই বইটা কেনবার আইডিয়াটা অন্য একজন দিয়েছে।”

“কে দিয়েছে?” তিলোত্তমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

“আরে ওর কলেজের এক বন্ধু; তার নাম না করে তো অত্রি জল খায়না। আমাকে জন্মদিনে কি দেবে ভেবে পাচ্ছিল না, তখন এই বন্ধুই সাজেস্ট করেছিল আর কি।”

উপলা একটু মিয়ানো গলায় বলল, “ও...!”

খানিক পরে শরণ্যা বলে উঠল, “যাই হোক, অত্রিরটা নিঃসন্দেহে বেস্ট গিফ্‌ট।”

মৃণালিনী হাতে হাত ঘষে বলল, “ঠিক কথা! এবার তাহলে কেকের বাক্সটা খোলা যাক, আজ যখন অ্যাসেম্ব্‌লিও নেই —”

বলতে না বলতেই প্রায় মাটি ফুঁড়েই যেন পি.এস. এসে উদয় হয়ে বললেন, “গার্লস, সেট্‌ল ডাউন, সেট্‌ল ডাউন! ইটস্‌ অলরেডি সো লেট, ওঃহো!”

মৃণালিনী বিড়বিড় করল, “পঞ্চুর বাপ আবার এসে দেখা দিল জীবনে...”

*

বাংলার অনন্যা মুখার্জি মিহি গলায় ‘বনলতা সেন’ পড়াচ্ছিলেন। লাস্ট বেঞ্চে বসে ব্যাজার মুখে তাকিয়েছিল নীরা আর তিলোত্তমা। বাংলা ম্যামের কিছু ক্ষমতা আছে। সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ সব কবিতাগুলোকেও ইয়ার্কি বানিয়ে ছাড়েন। কথা বলার ভঙ্গিটাই এমন হাসির উদ্রেক করে, যে কাব্যরসের আর কিছুই উপভোগ করা যায় না। সেই সঙ্গে সমান তালে হাত-পা নেড়ে সত্যিই একখানা দৃশ্য তৈরি করেন মিস মুখার্জি।

মৃণালিনীর অবশ্য হেলদোল নেই। সোশিওলজি ক্লাস থেকে মুখ লাল করে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরেছিল। সে ক্লাসটা হয় কেমিস্ট্রি ল্যাবে। নীরা-উপলা-তিলোত্তমা অনেকটা দূরে বসার কারণে ব্যাপারটা ঠাওর করতে পারেনি। জিজ্ঞেস করাতে মৃণালিনী বলেছিল, “রনের সঙ্গে টেবিলের তলায় বসে হাসছিলাম। একটা নোট্‌সও লিখিনি।”

“সেকি রে,” নীরা হাঁ হয়ে বলল, “কেউ তো কিছু টের পেলাম না!”

“আরে কেমিস্ট্রি-ল্যাবের টেবিলগুলো কত উঁচু না? ওর তলায় ঢুকলে কেউ কিছু দেখতেও পাবে না, শুনতেও পাবে না।”

“কিন্তু হাসছিলি কেন?”

“হাসি পেল।”

বাংলা ক্লাসে ফিরে অবশ্য সেই হাসির আর লেশমাত্র নেই। ধ্যানমগ্ন হয়ে কবিতা পড়ছে মৃণালিনী। কী করে পড়ছে, কে জানে! বাংলা ম্যামের ‘চুল তা-আ-আ-আ-র কবেকা-আ-আ-আ-র অন্ধকা-আ-আ-আ-র বিদিশা-আ-আ-আ-র...’ শুনতে শুনতে মাথা ঝিমঝিম করছিল দুজনের। খানিক পর আর না পেরে তিলোত্তমা বলল, “বিশ্বাস কর, আর কোনোদিন কবিতাটা এনজয় করতে পারব না। কী সমস্ত ভাঁট বকে যাচ্ছে তখন থেকে!”

নীরা হাই চেপে বলল, “আরে তোরা তো তাও কবিতা ভালবাসিস। আমার কী টর্চার হচ্ছে ভাব একবার।”

“সেকি কথা! অত্রি না তোকে কবিতার বই দিল?”

“দিয়েছে বটে। কিন্তু সেটা তো ওই নামটার জন্য।”

“তোর মা নিশ্চয়ই ওই কবিতা পড়ে নাম দিয়েছিলেন।”

“রাম বলো। আমার বাড়িতে কারুর কবিতা পড়বার অভ্যেস নেই, এক রবিঠাকুর ছাড়া। আমার মায়ের নাম ইরাবতী তো, ওটার সঙ্গে মিলিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তা ‘নীরাবতী’ এত অ্যাবসার্ড শোনায়, তাই শুধু নীরা রেখেছে।”

“ঠিক বলছিস? আনন্দকাকু তো পাবলিশিং হাউজের এডিটার, উনি হয়তো —”

“সে তো ফিকশান আর পড়াশোনার বই। না রে, সুনীলের কবিতার সঙ্গে আমার নামের কোনো সম্পর্ক নেই।”

“যাঃ! তাহলে অত্রির অত সাধের গিফ্‌ট ফেল মেরে গেল?”

“না না, তা কেন। আমি ঠিকই পড়ে দেখব দু-একটা। তবে টেকনিকালি, গিফটের আইডিয়াটা তো ওর নয়। অত্রি নিজে গিফট দিলে সব সময় কাজের জিনিস দেয়। এবারে হঠাৎ বুদ্ধি বসে গেলে কী আর করবে।”

“আহা, এ বছর তো স্পেশাল, তাই রোম্যান্টিক হতে চেয়েছিল আর কী!”

“সেই,” নীরা খিকখিক করে হেসে বলল, “সকলের ধাতে কি সব সয় রে বাবা! রোম্যান্সের বদহজম হয়েছে মালটার। সে যাক, তোর খবর কী বল তো?”

“আমার?” তিলোত্তমা অবাক হয়ে বলে, “আমার কী খবর হতে যাবে?”

“এই এক হয়েছে,” নীরা বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলে, “আচ্ছা, তোকে যখন যাই জিজ্ঞেস করি, তুই পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যাস কেন বল দেখি? এই স্কুলে আসা অবধি জেনে আসছি তোর নাকি এক ঘ্যামা বয়ফ্রেন্ড আছে। কিন্তু তার সঙ্গে তোর কী কেস, কবে থেকে, কেমন মাল সে, এসব কথা ঘুণাক্ষরেও বলিসনা কেন? আমরা তো সব কিছু ডিসকাস করি।”

তিলোত্তমা হাসল, “বলতে যে চাই না তা নয়, বিশ্বাস কর। কিন্তু আমার পার্সোনাল লাইফে এত ক্যাচাল, তোদের সঙ্গেও সে সব নিয়ে বকতে আর ভাল্লাগে না। স্কুলে একটু হাঁপ ছাড়তে পাই। তোদের সঙ্গে সময় কাটালে অশান্তিগুলোর কথা মনে থাকে না।”

“কিসের অশান্তি তোর? শেয়ার করলেও তো হালকা হওয়া যায়।”

তিলোত্তমা খানিক চুপ করে থেকে বলল, “রাহুলের সাথে আর পোষাচ্ছে না।”

“কেন?”

“ভীষণ সেলফিশ রে ও। সব সময় খালি নিজের দিকটাই ভাবে। আমারও যে কোনো কোনো ব্যাপারে ওপিনিওন থাকতে পারে, সেটা ও গ্রাহ্যের মধ্যে আনে না।”

“তাই নাকি! তাহলে আছিস কেন ওর সঙ্গে?”

তিলোত্তমা কিছু না বলে হাত ওলটাল। নীরা অধৈর্যভাবে বলল, “কী আশ্চর্য! তোর মতো একটা মেয়ে এই ধরনের পাবলিকের সঙ্গে কেন থাকতে যাবে? মানে, আমি তোর চেহারার কথা বলছি না। বিশ্বসুন্দরী অনেকেই হয়, কিন্তু তুই লোক ভাল। যা-তা ছেলের সঙ্গে ঘুরে মরবি কেন? য়ু ডিজার্ভ ওয়ে বেটার।”

তিলোত্তমা নিঃশব্দে হেসে নীরার হাতের উপর আলতো চাপড় মারল, “এই কথাটা বলার জন্য থ্যাঙ্ক্‌স। কিন্তু তুই বুঝলেও, অন্য লোকে বোঝে না। সবাই এই চাঁদমুখে এসেই ঠেকে যায়, তার ওপারে দেখবার চেষ্টাও করে না।”

“বেশিরভাগটাই ওরকম মানছি। কিন্তু প্রত্যেকেই এমন হবে, তার কী মানে আছে? আজ অবধি একটা ভাল লোকের সঙ্গে দেখা হয়নি তোর?”

“না...” বলতে বলতে তিলোত্তমা অন্যমনস্ক হয়ে যায়, যেন হঠাৎ কী একটা মনে পড়ে গেছে। নীরা তার মুখের ভাব লক্ষ্য করল কিছুক্ষণ, তারপর জিতে যাওয়া গলায় বলল, “পুরো গুল্‌। ফিরিস্তি চাই এক্ষুণি। কে সে? কবে, কোথায়, কীভাবে দেখা হল?”

“আরে ধুর,” তিলোত্তমা হেসে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল ব্যাপারটাকে, “সেসব কিছু না। দূর থেকে তো সবাইকেই ভাল মনে হয়। চেনার পর ক্লজেট থেকে কঙ্কাল বেরোয় একটা একটা করে।”

“আরে লোকটা কে, সেটা তো বল্‌!”

“কাকুর বন্ধু। অনেক বড়; প্রায় বছর-দশেক। একবার আমাদের বাড়ি এসেছিল, তখন দু-চারটে কথা বলে মনে হয়েছিল, হয়তো অন্যরকম। কিন্তু সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আমার কাকু লোক ভাল নয়।”

“অ্যাঁ! কী যা-তা! ভাল নয় বলতে?”

“মানে... অনেস্ট নয়।”

“অ। কিন্তু তোর কাকুর সঙ্গে এর কী রিলেশান? এর ভাল লোক হতে আটকাচ্ছে কোথায়?”

“বার্ডস অফ আ ফেদার... শুনিসনি?”

“ধুর, ওসব আবার... আচ্ছা, নাম কী লোকটার?”

“ধৃতিমান।”

“আই বাস! চ্যাটার্জী?”

“হাঃ হাঃ! না, কী যেন... ও হ্যাঁ, রায়চৌধুরী।”

*

উপলার সঙ্গে শরণ্যাও হিন্দি নিয়েছে; তাদের ইংল্যান্ডের স্কুলে এই একটিমাত্র ভারতীয় ভাষা পড়ানো হত। একদিক দিয়ে বেশ সুবিধেই হয়েছে অবশ্য। ক্লাসে নিয়ম করে দুজনে লাস্ট বেঞ্চে বসে। তার কারণ দুটো। মিসেস আগরওয়াল নাটক করতে বাংলা ম্যামকেও টেক্কা দিয়ে যান। তাঁর পড়ানো আবার সাংঘাতিক বীর-রসাক্ত, তাই লাস্ট বেঞ্চে বসলে চিৎকারটা কানে একটু কম এসে লাগে। তার উপর যেহেতু ক্লাসে কথা বলা চলে না, সেহেতু ওরা বেঞ্চের তলায় একখানা খাতায় লিখে লিখে কথাবার্তা চালায়; ওই বিশেষ খাতাটার নামই দেওয়া হয়েছে ‘চ্যাটবুক’। আজ মিসেস আগরওয়াল জয়শঙ্কর প্রসাদের লেখা এক দেশাত্মবোধক কবিতা প্রচণ্ড ভাবাবেগের সঙ্গে পড়াচ্ছিলেন। ক্লাসের শেষে চ্যাটবুকে যা লেখা হল, তা এরকমঃ

শরণ্যাঃ কি মেলোড্রামাটিক দেখেছিস?

উপলাঃ ড্রামা-কুইন।

শরণ্যাঃ সত্যি কথা।

উপলাঃ যত্ত নৌটঙ্কি।

শরণ্যাঃ বাবুয়া ভৌমিকের যাত্রার হাইয়েস্ট পেয়েড অ্যাক্টর উনিই।

উপলাঃ গলার স্বরের উত্থান-পতন, দুটোই লক্ষ্য কর। যাত্রার জন্য তৈরি হয়েছিল।

শরণ্যাঃ ওনার বেবি পিংক রঙটা এত পছন্দ কেন কে জানে।

উপলাঃ চুলের ক্লিপ থেকে শুরু করে পায়ের নেলপালিশ অবধি সব পিংক! পিংকি কোথাকার!

শরণ্যাঃ যে রেটে টেবিল চাপড়াচ্ছে, ও টেবিল আর বেশিদিন নেই।

উপলাঃ এই, এই, কি বলছে শোন — ‘ধরম কা নাম লে লে কর জো হুয়া করতী বলি...’ এ তো পুরো বি.জে.পি. রে!

শরণ্যাঃ আগের দিন কি একটা গল্প পড়াচ্ছিল মনে আছে?

উপলাঃ বলিস না তো! হাড় জ্বলে গেছে শুনে। ফালতু প্রোডাকশানের সিনেমার মতো — তাও যদি স্ক্রিপ্টটা ভদ্রভাবে লেখার চেষ্টা করত!

শরণ্যাঃ যাঃ শালা, আবার হোমওয়ার্ক দেয় যে! ক্লাস টুয়েলভে এসেও এখন ‘মেরে জীবন কা লক্ষ্য’ নিয়ে রচনা লিখতে হবে?

উপলাঃ আরে জীবন হি নেহী হ্যায় তো লক্ষ্য কাহেকা! আগের হোমওয়ার্কটা করেছিস? ওই যে, রাজা মহাপদ্মনন্দের চরিত্র বিশ্লেষণ করে উত্তর লিখতে বলেছিল?

শরণ্যাঃ লিখেছি, উস্‌কা কোঈ চরিত্র হী নেহী থা; উও চরিত্রহীন থা।

উপলাঃ হেঃ হেঃ। ব্যাপক ক্ষিদে পেয়েছে মাইরি।

শরণ্যাঃ সে আর বলতে! লিনী এতক্ষণে কেক-টেক সব সাবড়ে দিল বোধহয়। আর বলা যায়না, আমার টিফিনটাও ব্যাগ হাতড়ে বার করে ফেলল হয়তো!

উপলাঃ কী এনেছিস আজকে?

শরণ্যাঃ কচুরি-আলুর দম।

উপলাঃ ফাটাফাটি! আমি ডালের পরটা-লঙ্কার আচার।

শরণ্যাঃ জমবে! অত্রি গিফ্‌টটা ব্যাপক দিয়েছে, না?

উপলাঃ হ্যাঁ, যদিও অন্যের আইডিয়া নিয়ে।

শরণ্যাঃ তাতে কী।

উপলাঃ ছেলে বোকা আছে খানিকটা।

শরণ্যাঃ কেন বল তো?

উপলাঃ গিফ্‌ট দেবার আইডিয়া কার সেটা জেনে নীরা কী করবে? চেপে গেলেই পারত।

শরণ্যাঃ তা বটে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এটাও বোঝা যায় যে ছেলেটা অনেস্ট। নিজেই নাম বলতে পারত, কিন্তু তা করেনি।

উপলাঃ সে অবশ্য ঠিক। হ্যাঁ রে, বুড়িটা আর কতক্ষণ বক্‌বক্‌ করবে? ক্ষিদেয় মারা যাচ্ছি তো! বেলও দেয় না জানোয়ারগুলো!

শরণ্যাঃ ওই দেখ, বলতে না বলতেই বেল পড়ল।

*

আজকে এ.জি. ‘আ স্ট্রীটকার নেম্‌ড ডিজায়ার’ পড়াচ্ছিলেন। নাটকের একেবারে শেষের দিকের সেই ভয়ংকর ধর্ষণের দৃশ্যটা পড়াতে পড়াতেই ঘন্টা পড়ে গেল। দৃশ্যতে এমনি কিছুই খোলসাভাবে দেখানো হয় না, কিন্তু চরিত্রগুলোর মানসিক চিত্রায়নটাই ঘটনাটাকে ভয়াবহ করে তোলে।

ব্যাগ গোছানোর সময় শরণ্যা খেয়াল করেছিল, তিলোত্তমার মুখ লাল, ব্যাগে বই ঢোকাতে গিয়ে হাত যেন সামান্য কাঁপছে। কি হয়েছে সেটা বোঝার আগেই মৃণালিনী এসে বলল, “বাপ্‌রে বাপ, কী লেখে রে মাইরি লোকটা! পুরো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। অবশ্য এ.জি. না পড়ালে এমনটা হত কিনা সন্দেহ।”

শরণ্যা মাথা নেড়ে বলল, “ঠিকই। কিন্তু নাটকটা ভীষণ ডার্ক। টেনেসী উইলিয়াম্‌স-এর আরও লেখা পড়েছি, সবকটাতেই রেপ, মার্ডার, উন্মাদনা — পৃথিবীতে এছাড়া আর টপিক নেই নাকি রে?”

“এগুলোই তো পৃথিবীর আসল সত্যি।”

তিলোত্তমা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন স্বরে যেন নিছক একটা মন্তব্য করল। কিন্তু শরণ্যার গা শিরশির করে উঠল। মাঝে মাঝে তিলোত্তমা এমন ভয় ধরিয়ে দেয় এক একটা কথা বলে!

আচমকাই করিডোরে তুমুল চিৎকার চেঁচামেচি শোনা গেল। এক দৌড়ে সবাই মিলে বাইরে গিয়ে দেখল, ছেলেদের কমার্স সেকশানে কোনো কারণে সাংঘাতিক ডামাডোল বেধেছে। তাদের ইস্কুলে কী এক অজ্ঞাত কারণে এই একটা মাত্র ছেলেদের সেকশান; বাকি সবকটা ক্লাসে সব কটা সেকশানে শুধুই মেয়ে। এরকম একটা গোলমেলে ব্যবস্থার কারণে মাঝে মাঝেই এইসব উঠতি বয়সের দামড়া ছেলেদের সঙ্গে টিচারদের ঝামেলা বেধে যায়। কিন্তু এই পর্যায়ে তো কখনও গড়ায় না বিষয়টা! কী করেছে ওরা?

ছেলেদের ঘরটার ঠিক পাশেই মেয়েদের কমার্স সেকশান। তারাও মাঝে মাঝে মাথা বাড়াচ্ছিল। তিলোত্তমা উপলার কাঁধে টোকা মেরে বলল, “ওদের একটাকে জিজ্ঞেস কর না। কমার্স সেকশানের তো একে অপরের সঙ্গে গলায় গলায়।”

উপলা কিছুক্ষণ তাক করে থেকে তারপর ডাকল, “তিয়াসা, এই তিয়াসা!”

তিয়াসা উপলাকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি ওদের ক্লাসে ঢুকে সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

সবাই হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়েছিল, এবার মৃণালিনী বলে উঠল, “এই, ব্যাপারটা কী রে তোদের? সবাই মিলে ষাঁড়ের মতো চেঁচামেচি লাগিয়েছে কেন?”

“কেলেঙ্কারি হয়েছে, জাস্ট কেলেঙ্কারি,” তিয়াসা ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ে কপালের ঘাম মুছল।

উপলা অধৈর্যভাবে হাত নেড়ে বলল, “আরে সেটাই তো জানতে চাইছি, হলটা কী?”

তিয়াসা কাঁদো-কাঁদোভাবে বলে, “ছেলেগুলো একেবারে হাতের বাইরে চলে গেছে। আমাদের পাওয়ারপয়েন্ট দেখানোর জন্য যে কম্পিউটার-প্রজেক্টার রাখা থাকে না? ওরা আজকে অফ্‌ পিরিয়ডে বসে ওই প্রজেক্টারে ব্লু ফিল্ম দেখছিল।”

ঘরে যেন বাজ পড়ল। সবাই খানিকক্ষণ থ' হয়ে তাকিয়ে রইল তিয়াসার দিকে। তারপর উপলা অতি কষ্টে উচ্চারণ করল, “য়ু কান্ট বী সিরিয়াস।”

“বলিস না,” তিয়াসা এবার সত্যিই কেঁদে ফেলল, “ওদের যা হবার তা তো হলই, সাথে সাথে আমাদেরও ডোবাল। আমাদের সেকশানের কতগুলো মেয়েও ওখানে ছিল।”

মৃণালিনী খবর শুনে বসে পড়েছিল, এবার চেয়ার থেকে উলটে পড়তে পড়তে কোনোমতে সামলে নিল। তিলোত্তমা আবার সেই গা-হিম-করা ঠান্ডা গলায় বলল, “দেখলি তো, যা বলছিলাম মিলল কিনা?”

এমন সময় দরজা ঠেলে এ.জি. ঢুকলেন। প্রথমেই তিয়াসার দিকে চোখ গেল তাঁর। তীক্ষ্ণভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “হুইচ সেকশান?”

তিয়াসার হাঁটু কাঁপছিল, কোনোমতে বলল, “সেকশান ডি... ম্যাম আই সোয়্যার আই ওয়াজন্ট ইনভল্‌ভড ইন দিস...”

এ.জি. একটু নরম হয়ে বললেন, “আই বিলীভ য়ু। কিন্তু তাতে কোনো লাভ নেই। ব্যাপারটা এখন হাতের বাইরে চলে গেছে। থার্ড ফ্লোরে যে কটা ক্লাস চলছিল, সবকটাকে ডীটেইন করে দেওয়া হয়েছে। ইন্‌ভেস্টিগেশান না হয়ে যাওয়া অবধি তোমাদের কোথাও যাওয়া হবে না। আই সাজেস্ট য়ু গো ব্যাক টু ইয়োর ক্লাস। সবাইকে নিজের নিজের ঘরে থাকবার ইন্‌স্ট্রাকশান দেওয়া হয়েছে।”

তিয়াসা চলে যেতে উপলা উৎকণ্ঠিতভাবে বলল, “ম্যাম, তার মানে আমাদেরও কি —”

এ.জি. একটু আশ্বস্ত-করা হাসি হেসে বললেন, “তোমাদের কিছু হবে না। লাস্ট পিরিয়ডে তো আমি ক্লাস নিচ্ছিলাম। আমি প্রিন্সিপাল ম্যামকে বলেও ছিলাম তোমাদের ছেড়ে দিতে, কিন্তু প্রোটোকল ইজ প্রোটোকল। শিরিন, কঙ্কনা, আর নীলাঞ্জনা ফর্চুনেটলি আগেই বেরিয়ে গেছে। আই অ্যাম সরি ফর দ্য ট্রাবল, কিন্তু কিছু করার নেই।”

তিলোত্তমা বলল, “না ম্যাম। উই আর সরি।”

“হোয়াই শুড য়ু বী? তোমরা তো কিছু করোনি,” এ.জি. নিঃশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলেন। উপলা বিড়বিড় করল, “আই কান্ট বিলীভ দিস ইজ হ্যাপেনিং।”

মৃণালিনী হেড ডাউন করে বসে ছিল, একটু পরে মাথা তুলে বলল, “নীরার আর্ট ক্লাস কোন ঘরে হচ্ছিল রে?”

শরণ্যা উত্তর দিল, “আজ তো ওর মডেল আঁকবার দিন। তার মানে সেকেন্ড ফ্লোর-এর আর্ট রুমেই ক্লাস হচ্ছে। এতক্ষণে শিওর বেরিয়ে গেছে।”

*

“অত্রি তুই না, ছাগল একটা,” নীরা হাঁটতে হাঁটতে বলে, “ওইভাবে স্কুলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ গিফ্‌ট দেয়? কবে যে তোর আক্কেল হবে, কে জানে!”

“কী করব বল্‌, প্রথম গিফ্‌টটা তো আমিই দিতে চাইছিলাম,” অত্রি হাসতে হাসতে বলে, “যাইহোক, খালি বকাবকিই করবি, নাকি গিফ্‌টটা কেমন লাগল সেটা বলবি?”

নীরার মুখে এতক্ষণে হাসি দেখা যায়।

“বেশ ভাল। কিন্তু তুই সব ক্রেডিট নিয়ে নিলে চলবে? আইডিয়াটা তো বাবা বন্ধুর কাছ থেকে ঝেঁপেছো।”

“অ্যাই, এটা কিন্তু ঠিক না নীরা,” অত্রি গাল ফুলিয়ে বলে, “বই দেবার প্ল্যানটা তো আমারই ছিল, নাকি! শুধু কী বই দিলে সিগ্‌নিফিক্যান্ট হবে সেটা – ”

“রুদ্র বলে দিয়েছে, কেমন?” নীরা মুচকি হাসল।

অত্রি ব্যাজার হয়ে বলল, “আসলে রুদ্র আবার সাহিত্য-ফাহিত্য বোঝে বেশি। আমি তো এসব কিছুই জানি না।”

“ওরে বাবা, এত মুখ ভ্যাটকাচ্ছিস কেন? ইয়ার্কি মারছিলাম তো! গিফ্‌ট খুব পছন্দ হয়েছে, মাইরি বলছি।”

অত্রি এবার হো-হো করে হেসে উঠল, “থাক, আর ‘মাইরি’ বলতে হবে না, তার চেয়ে বরং —”

“অ্যাই অত্রি!” কে যেন পিছু ডাকল। অত্রি ঘুরে তাকিয়েই একগাল বিস্মিত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

“দেখো কে! তুই এখানে কী করছিস?”

“তোর কাছেই তো আসছিলাম। আজ সবকটা ক্লাস ডুব মারলি, কী ব্যাপার, হ্যাঁ?”

ছেলেটাকে অপূর্ব সুন্দর দেখতে। যেমন ফর্সা, তেমনি টানা চোখ, টিকালো নাক, একমাথা বাদামী চুল ঘাড় অবধি নেমে এসেছে। একেবারে গ্রীক ভাস্কর্যের মতো মুখশ্রী। চেহারাটা অত্রি আর নীরার মতোই ছোটখাটো হলেও, দস্তুরমতো পেটানো গড়ন।

অত্রি বলল, “ভাল সময়ে এসেছিস। আমরাও বাড়ি ফিরছিলাম।”

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি,” ছেলেটা দুষ্টুমির হাসি হাসল, “এই তোর বার্থডে গার্ল তো?”

অত্রি হাসল, “নীরা, তোকে তো রুদ্ররূপের কথা আগেই বলেছি।”

“বলেছিস মানে?” নীরা ভুরু তুলে বলে, “বলে বলে একেবারে হেদিয়ে গিয়েছিস বল্‌! ভাই রুদ্র, তোমার সঙ্গে দেখা যখন হয়েই গেল তখন না জিজ্ঞেস করে পারছি না, তুমি কি অত্রিকে মাইনে-করা সভাকবি রেখেছ? মানে, দিনরাত তোমার গুণগানের ফোয়ারা ছোটায় তো, তাই জিজ্ঞেস করছি আর কি।”

রুদ্র হা-হা করে হেসে উঠল, “আরে, সে তো আমারও তোমার কাছে একই প্রশ্ন। অষ্টপ্রহর তোমার নাম-জপ শুনে শুনে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল। এই তো, তোমার জন্মদিনে কী গিফ্‌ট দেবে সেই চিন্তায় পাগলের মতো অবস্থা হয়েছিল ওর।”

“সেই জন্যেই বোধহয় শেষ অবধি তোমাকেই সাজেশান বাতলাতে হল,” নীরা মুখ টিপে হাসে।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল, “সেটা আবার অত্রি তোমাকে বলেও দিয়েছে? কী ট্যাক্টলেস রে তুই?”

অত্রি চওড়া হাসি নিয়ে ওদের বাক্যালাপ শুনছিল, এবারে দরাজভাবে বলল, “ট্যাক্টলেস-এর কী আছে? যা সত্যি সেটাই তো বলব।”

“ওঃ গড্‌,” রুদ্র শূন্যে দু-হাত ছুঁড়ে হতাশ ভঙ্গি করে বলল, “আই অ্যাম টেলিং য়ু অত্রি, তোর কোনোদিন কিছু হবে না।”

নীরা বলল, “যাই হোক, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে আমরা বরং হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি?”

“অফ কোর্স। ভালই হল, এই সুযোগে তোমার সঙ্গে আলাপটা সেরে নেওয়া গেল।”

*

প্রায় সন্ধে সাতটা নাগাদ ছাড়া পেল ওরা। বাইরে অনেকের বাবা-মা উদ্বিগ্নমুখে অপেক্ষা করছিলেন। শরণ্যার বাড়ি খুবই কাছে। বাঘাযতীনের অটো ধরে ফিরে যেতে পারবে। উপলাকে নিতে উৎপলকাকু এসেছিলেন; মৃণালিনী ওদের সঙ্গেই যাদবপুর অবধি চলে যেতে পারবে — সেখান থেকে অনেক বাস যায়। তিলোত্তমা ভেবেছিল শরণ্যার সঙ্গে অটোতে উঠে পড়বে। বাঘাযতীন পৌঁছে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু গেটের বাইরে পা রাখতেই থমকে গেল সে। রাস্তার ওপারে পার্ক করা গাড়িতে হেলান দিয়ে কাকান দাঁড়িয়ে আছে। এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। কাকানের সটান তার দিকেই চোখ পড়েছে। বাক্যব্যয় না করে এগিয়ে এল।

“তুমি এখানে কী করছ?”

কাকান অলসভাবে বলল, “বিলীভ মী, ভর সন্ধেবেলা ঘন্টাখানেক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। মেজদা-বৌদি কারুর সময় নেই তোকে পিক আপ করার, এদিকে স্কুল থেকে সমানে ফোন করে যাচ্ছে... অগত্যা আমাকেই আসতে হল। যতই হোক, বাড়ির সুন্দরী মেয়েদের তো সন্ধেবেলা অবধি একা একা বাইরে ফেলে রাখা যায় না!”

তিলোত্তমার গা গুলিয়ে উঠলেও, মুখে কিছুই প্রকাশ করল না; কাকান সেটাই চায়। সম্পূর্ণ শান্ত গলায় বলল, “তোমাকে যে এতক্ষণ নিজের রাজকার্যগুলো না করে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, তার জন্য আই পার্সোনালি অ্যাপলোজাইজ। কিন্তু এত কষ্ট করার কোনো দরকার ছিল না। আমি তোমার সঙ্গে যাব না।”

কাকান ভুরু তুলে বলল, “যাবি না মানে? বাড়ি ফিরবি না?”

“ফিরব। অটোতে-বাসে, যেমনভাবে হোক ঠিকই চলে যাব। তুমি তোমার মতো এগোও, আমি চললাম।”

কাকান ঝুঁকে পড়ে একেবারে তার মুখের সামনে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “ভয় পাচ্ছিস নাকি?”

তিলোত্তমা দু-পা পিছিয়ে গিয়ে একইভাবে বলল, “ভয় পাওয়ার কোনো কারণ আছে?”

“থাকতেই পারে,” কাকান হাতের নখ পরীক্ষা করার ভঙ্গি করে বলল, “না হলে গাড়িতে উঠবি নাই বা কেন? তোর হয়তো মনে হচ্ছে, আমি বাড়ির বদলে তোকে কোনো অন্ধকার গলির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে...”

“এতটা কাঁচা কাজ যদি সত্যিই করতে চাও তাহলে অবশ্য আমার কিছু বলার নেই। সে কারণে নয়। আমি তোমার সঙ্গে যাব না কারণ য়ু ডিসগাস্ট মী। সারাটা দিন অলরেডি আমার নানারকম হ্যারাসমেন্ট গেছে, এখন তোমার সঙ্গে আমি ডীল করতে পারছি না। সেইজন্য —”

আচমকা থেমে গেল তিলোত্তমা। পাশ থেকে ওটা কে আসছে? তার চোখ অনুসরণ করে কাকানও সেইদিকে তাকাল, আর পরক্ষণেই অস্ফুটে বলে উঠল, ‘শিট্‌... !’

“তোর টিকি ধরা-ছোঁওয়া যাচ্ছে না আজকাল,” বলতে বলতে ধৃতিমান এসে হাজির। কাকান অপ্রস্তুতের একশেষ। আমতা আমতা করে বলল, “তুই – তুই আবার এখানে কেন?”

ধৃতিমান এতক্ষণ হাসিমুখে ছিল, কাকানের কথায় ভুরু কুঁচকে গেল।

“কী ব্যাপার, আমাকে দেখে খুশি হোসনি মনে হচ্ছে?”

“না না, এরকম বলিস না,” কাকান ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে, “আমি জাস্ট অবাক হয়ে গেছি। এদিকে কী করতে এসেছিলি? কোনও কাজে?”

“তোর বাড়িতে গিয়ে দেখলাম তালা-মারা। ফোন করলাম, ধরলি না। তারপর তোর বৌদিকে ফোন করলাম, তিনি বললেন তুই মিঙ্কুর স্কুলে গেছিস। এদিকটায় তো আমার পিসির বাড়িও বটে, তাদের সঙ্গে একবার দেখা করতে এসে ভাবলাম, ফেরার পথে এই চত্বরটাও একবার ঘুরেই যাই। আমি যে কদ্দিন ধরে কন্‌ট্যাক্ট করবার চেষ্টা করছি, তার কোনো আইডিয়া আছে তোর?”

“আরে একটু বিজি ছিলাম, মাইন্ড করিসনা ভাই। তা কন্‌ট্যাক্ট করতে চাইছিলি কেন?”

“তার মানে?” ধৃতিমান অবাক, “‘লাইট রিডিং’ করবি বলে আমার কতগুলো বই নিয়ে রেখে দিয়েছিস, বেমালুম ভুলে গেলি? আচ্ছা ছেলে তো!”

“ওঃ — হো!” কাকান হেসে উঠল, “এই ব্যাপার! তা, যে কোনো একদিন এসে নিয়ে গেলেই তো পারতি! এর জন্য কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে নাকি?”

“অ্যাপয়েন্টমেন্ট না করে গেলে কী হয় সে তো দেখতেই পাচ্ছি। যা হোক, আজ কি বইগুলো ফেরত পাব? আমার তো রেফারেন্সিং করতে অসুবিধে হয়ে যাচ্ছে।”

কাকান একটু ইতস্ততঃ করল। বোঝাই যাচ্ছে বন্ধুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মোটেই ইচ্ছে নেই। তিলোত্তমা অবশ্য মহার্ঘ্য সময় নষ্ট করল না। কেমন করে যেন গোলমালের সময়গুলোতেই এই লোকটা এসে উদয় হচ্ছে। এই নিয়ে তিনবার হল। মানুষটা আসলে কেমন, তা জানবার সু্যোগ হয়ে ওঠেনি তিলোত্তমার। কিন্তু সে আসার ফলে যে অনেক ক্ষেত্রে উপকারই হয়েছে, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিলোত্তমা বলে উঠল, “কী এত ভাবছ, কাকান? গাড়ি আছে তো। চলো একসঙ্গে উঠে পড়ি।”

“না না, ভাববার কী আছে! ধৃতি, অসুবিধে নেই তো?”

“তোর না থাকলে আমারও নেই।”

অগত্যা সবাই গাড়িতে উঠে পড়ল। ধৃতিমান কাকানের পাশে বসল; তিলোত্তমা মনে মনে হাঁফ ছেড়ে পিছনের সীটে হাত-পা ছড়িয়ে চোখ বুজল। গাড়ি চলতেই ধৃতিমান বলে উঠল, “আচ্ছা, আপনাদের স্কুল এত দেরি করে ছুটি দেয় নাকি?”

তিলোত্তমা চোখ বুজেই বলল, “নাঃ।”

“তাহলে?”

এবারে কাকান হাসতে হাসতে বলল, “আরে সে এক যাচ্ছেতাই ব্যাপার! ফর হোয়াটেভার রীজন্‌স, ওদের পুরো স্কুলটায় একটামাত্র সেকশানে শুধু ছেলেরা পড়ে, টুয়েল্‌ভ ক্লাসের কমার্স সেকশানের ছেলে সব; বাকি সবকটাতে খালি মেয়ে। তো বয়েজ কমার্স সেকশান আর গার্লস কমার্স সেকশানের ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে বসে ক্লাসরুমের কম্পিউটারে পর্ন দেখছিল! ক্যান য়ু ইম্যাজিন?”

“হোয়াট!” ধৃতিমান খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থেকে তারপর পিছনে তাকিয়ে তিলোত্তমাকে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি এরকম হয়েছে?”

তিলোত্তমার বেশ অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল এ ব্যাপারে আলোচনা করতে। সে কোনো কথা না বলে ঘাড় নাড়ল শুধু।

“কিন্তু আপনাকে আটকে রেখেছিল কেন? আপনিও কি ওই সেকশানের?”

“না না, আমার হিউম্যানিটিজ সেকশান। ওই ফ্লোরে যে কটা ক্লাস চলছিল, তাদের সবাইকে আটকে দিয়েছিল। যারা আসল কালপ্রিট তারা তো এখনও ভিতরেই আছে; তাদের গার্জেন-কল না কী হয়েছে। তার উপর কারা যেন প্রেসকেও খবর দিয়েছে। মনে হল ‘স্টার আনন্দ-র’ কয়েকটা লোককে দেখলাম গেটের কাছে।”

“কী হ্যারাসমেন্ট!” ধৃতিমান তিক্ত গলায় বলে।

কাকান সমানে মুচকি-মুচকি হেসে যাচ্ছিল, এবার বলল, “যে যাই বলুক বস্‌, আই অ্যাপ্রিশিয়েট দেয়ার গাট্‌স। আমাদের সময় হলে এসব করার সাধ্য ছিল কারুর?”

কাকানের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে ধৃতিমান তিলোত্তমাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার হিউম্যানিটিজ বললেন। আপনারও কি ল পড়ার ইচ্ছে?”

“একেবারেই না।”

কাকান কথা কেড়ে নিয়ে বলে, “মিঙ্কুর আবার লিটারেচার-অন্ত প্রাণ। শেক্সপিয়ার-টিয়ার ছাড়া কথা বলে না।”

ধৃতিমান হেসে ফেলল, “ইংরেজি সাহিত্য মানেই শেক্সপিয়ার, এই কথাটা ইয়ার্কি হিসেবেও পুরোনো হয়ে গেছে, জানিস তো?”

“হবে। আমি কি সাহিত্য বুঝি নাকি।”

এমন সময় তিলোত্তমার স্কুলব্যাগ থেকে মোবাইলের বাজনা ভেসে এল। কাকান চমকে উঠে বলল, “সেকি রে মিঙ্কু? তুই স্কুলে ফোন নিয়ে যাস নাকি? অ্যালাও করে?”

“এমার্জেন্সির জন্য সঙ্গে রাখি,” তিলোত্তমা ব্যাগ হাতড়াতে থাকে।

কাকান বলল, “দেখছিস তো ধৃতি? আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো কী এক একখানা তৈরি হচ্ছে?”

ধৃতিমান কিছু না বলে হাসল। ফোনটা বার করেই একটু থমকে গেল তিলোত্তমা। অরিন্দমবাবু ফোন করেছেন। কাকানদের উপস্থিতিতে কি কথা বলা উচিত? কিন্তু যদি জরুরি কিছু হয়? সাত-পাঁচ ভেবে ফোনটা ধরেই ফেলল।

“হ্যালো?”

“অরিন্দম বলছি। তুমি কি ব্যস্ত?”

“না... আসলে নাও ইজ নট আ গুড টাইম। বাইরে আছি। কিছু প্রবলেম হয়েছে কী?”

“তেমন কিছু না; জাস্ট একটা কথা জানার ছিল।”

“কী কথা?”

“তুমি যে ব্যাপারটা জানো, সেটা কি কোনোভাবে তোমার বাড়ির লোকেরা টের পেয়েছেন?”

চকিতের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ আগের অশান্তির কথাটা মনে পড়ে গেল। তখন রাগের মাথায় একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছিল বটে। ... তার ফল কি তবে ইতিমধ্যেই ফলে গেল? বুক ঢিপ্‌ঢিপ করে উঠল তিলোত্তমার। কিন্তু এখানে তো সব কথা পরিষ্কার করে বলাও সম্ভব নয়!

“আসলে... সিচুয়েশানটা এমন হয়েছিল যে... ”

“হুঁ। প্রসঙ্গটা না উঠলেই বোধহয় ভাল হত।”

“এনিথিং সিরিয়াস?” তিলোত্তমার উৎকণ্ঠা বাড়তেই থাকে।

“সেরকম কিছু না,” অরিন্দমবাবু হাসলেন, “একটু ঝামেলা হবে হয়তো। আসলে তোমার বাবা আবার খোঁজখবর করিয়েছেন একচোট। তা, নিলেও অসুবিধে নেই। সময় তো হয়েই এল প্রায়। তবে তুমি আরেকটু ধৈর্য ধরে থাকো, কেমন? একটু মাথা ঠান্ডা করে, ভেবেচিন্তে চলার চেষ্টা করো। আমি জানি, প্রচুর প্রভোকেশান আসবে। কিন্তু এটাও ভাবো, অপেক্ষার দিন প্রায় শেষ। তীরে এসে যাতে তরী না ডোবে, দেখতে হবে তো?”

“... আমি খেয়াল রাখব। থ্যাঙ্ক য়ু।”

ওপার থেকে নিঃশ্বাস পড়ল, “কী জানো, তোমার এমন কিছু বয়স না। এই সময়টা পড়াশোনা, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে কাটানোর কথা। রক্তের সম্পর্কের লোকেরা যে সব সময় আত্মীয় হয় না, এ কথাটা তোমার এই মুহূর্তে উপলব্ধি না করলেও চলত। যাক, যার যেরকম ভাগ্য। দেখো, এবার হয়তো ভাল দিন আসবে। এখন রাখলাম, পরে কথা বলব।”

কাকান খুব মন দিয়ে তিলোত্তমার কথাগুলো শোনবার চেষ্টা করছিল। এবারে জিজ্ঞেস করল, “কার ফোন রে?”

তিলোত্তমা সংক্ষেপে বলল, “রাহুল।”

“ওঃ!” কাকান বাঁকা হাসি হেসে বলল, “কী বলে সে? গার্লফ্রেন্ডের চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না?”

তিলোত্তমা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায় কাকানের দিকে। বন্ধুর সামনে ইচ্ছে করে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইছে। অবশ্য এই সময়ে অন্য কিছু মাথাতেই আসছিল না। একটা বিশ্বাসযোগ্য জবাব দিতেই হয়, তাই বলল, “টি.ভি.তে নিউজটা অলরেডি দিয়ে দিয়েছে। দেখতে পেয়ে ফোন করেছিল।”

ধৃতিমান এতক্ষণ আত্মমগ্নভাবে বাইরে তাকিয়েছিল; মুখের ভাব দেখে মনে হল না তাদের কথোপকথনের কোনো অংশই কানে গেছে। এমন সময় হঠাৎ ‘সাইড কর, সাইড কর’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। কাকান হকচকিয়ে গিয়ে গাড়িটা দাঁড় করাতেই ‘দু-মিনিট’ বলে ফস্‌ করে নেমে গেল। কাকান আর তিলোত্তমা দুজনেই তাজ্জব হয়ে বসে রইল খানিকক্ষণ। ধৃতিমান অবশ্য একটু পরেই হাতে দুটো কেক-পেস্ট্রির বাক্স ঝুলিয়ে ফিরে এল। নির্বিকারভাবে সেগুলো গাড়ির ভিতর চালান করে দিয়ে গুছিয়ে বসে বলল, “হ্যাঁ, চল্‌।”

কাকান হাঁ হয়ে বলল, “এসব আবার কী?”

“দেখতেই তো পাচ্ছিস।”

“কী হবে?”

ধৃতিমান উত্তর না দিয়ে তিলোত্তমাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের কটার সময় ছুটি হয়?”

“সাড়ে তিনটে।”

“তার মানে অলমোস্ট চার ঘন্টা আটকে রেখেছিল। এর মধ্যে ওরা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কিছু করেছিল?”

তিলোত্তমা হতবাক হয়ে গেল। ওকে উত্তর দিতে না দেখে ধৃতিমান বলল, “করেনি তো? জানতাম। আজকালকার স্কুলগুলো সব একরকম হয়েছে। গাদা গাদা মাইনে নেবে, এদিকে কাজের কাজ করার বেলায় লবডঙ্কা। আমার ভাই যে স্কুলে যেত সেখানেও একই পরিস্থিতি ছিল।”

কাকান আমতা-আমতা করে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু বৌদি নিশ্চয়ই কিছু একটা —”

“আমি ওঁকে ফোন করেছিলাম, বললাম না? বৌদি তো বললেন কী এক কাজে ওঁদের দুজনকেই দুপুরবেলায় বেরিয়ে যেতে হয়েছে, ফিরতে ফিরতে রাত নটা বাজবে। ফ্রিজে যদি কিছু রাখাও থাকে, বাড়ি ফিরে সেসব বার করে গরম করবার হ্যাপা ওনার সইবে? এখনই তো সোয়া সাতটা বাজছে, এরপর আর জলখাবার খাওয়ার টাইম থাকে? আর তুই তো চা-টাও করতে পারিস না, তোকে এসব বলে লাভ নেই।”

কাকান হ্যা-হ্যা করে হেসে বলল, “সত্যি ভাই, আগের জন্মে বোধহয় পাঁচ ছেলে-মেয়ের মা ছিলি তুই। এতক্ষণ ধরে যা যা বললি না, পুরো মনে হল পাশের বাড়ির কাকিমা কথা বলছে।”

ধৃতিমান হাসল। তারপর তিলোত্তমাকে বলল, “আপনি চাইলে এখনই খেতে শুরু করতে পারেন কিন্তু। অনেকক্ষণ না খেয়ে আছেন।”

তিলোত্তমা বলল, “না, বাড়ি ফিরে একসঙ্গে খাব।”

বাকি রাস্তাটা জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। গলার কাছে দপ্‌দপ্‌ করতে থাকা ব্যথাটাকে সমানে গিলে ফেলতে চাইছিল সে। কোথাকার কে এক অচেনা-অজানা লোক, বারবার এসে এভাবে কেন দুর্বল করে দিচ্ছে তাকে!



(ক্রমশ)

(পরবাস-৭৬, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯)