• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৪ | এপ্রিল ২০২৪ | গল্প
    Share
  • নার্সিসাস : গোপা দত্তভৌমিক



    শহর এখন সহ্য করতে পারি না, অথচ কলকাতাতেই বড়ো হয়েছি। পার্কসার্কাসে আমাদের বিশাল ফ্ল্যাট। পড়েছি নামজাদা কনভেন্টে। হবে না কেন, আমার বাবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, নিজের ফার্ম। বাবার একমাত্র সন্তান আমি। নামেও ‘ডল’, দেখতেও সবাই বলে ডলপুতুলের মতো সুন্দর। বাবার ধবধবে গায়ের রঙ আর ধারালো নাক মুখ পেয়েছি আমি, মার নরম গড়ন আর রেশম কোমল চুল। ছোটোবেলা থেকেই নিজেকে আয়নায় দেখে দেখে আশ মিটত না। গাল দুটোতে কেমন লাল আভা, ঠোঁট দুটো পাতলা দুটো কমলা কোয়ার মতো। চুল আর চোখের পিঙ্গল আভাও ভালো মানায় আমার ফর্শা গায়ের রঙে। কপালটা অর্ধেক চাঁদের মতো, কান যেন নিখুঁত দুটি ঝিনুক, কাটা কাটা নাক, গলার গড়ন লম্বা ফুলদানির ছাঁচে। নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতাম, অন্যরা তো হবেই। মার স্কুলের বান্ধবী দিদিমনিরা বলত, ‘তিথি, তোর মেয়েটাকে বিউটি কম্পিটিশনে পাঠালে প্রাইজ নিয়ে আসবে।’ গর্বে মার পা মাটিতে পড়ত না। যদিও তেরো চোদ্দ বছরে পৌঁছতেই বোঝা গেল বিউটি পেজান্টে যাওয়া হবে না আমার। কারণ আমার হাইট। মা তেমন লম্বা নয় ফলে আমিও পাঁচফুট এক ইঞ্চি হয়ে থেকে গেলাম। এই জন্য মার ওপর রাগ আমার গোড়া থেকে। যা-তা বলতাম, ‘বেঁটে বক্কেশ্বর! তোমার জন্য আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হল।’ মা অপরাধীর মতো চুপ করে থাকত।

    মুগ্ধ দৃষ্টির অবশ্য অভাব হয়নি। পথে ছেলেরা পিছু নিত, চিঠি গুঁজে দিত হাতে। মোবাইলে টেক্সটের বন্যা। আমার হাতের তালু দুটো গোলাপি — শুধু একটু হাত ছোঁয়ার জন্য হিমেশ বলে একটা মারোয়াড়ি ছেলে কী কাকুতি মিনতি যে করত। মোটা থলথলে বলে ওকে পাত্তা দিইনি কখনো। বেজায় বড়োলোক আর তেমনি নাছোড়বান্দা। কোথা থেকে আমার জন্মদিন কবে জেনে বিরাট একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে সকালে আমাদের বাড়ি চলে এল হিমেশ। ফুলের তোড়াটা দেবার সময় আঙুল ছুঁয়ে দিল কায়দা করে। কার্ডে লিখেও দিয়েছিল, আমার হাতের পাতাদুটো নাকি লিলিফুলের মতো।

    সত্যিকথা বলবো? রূপের প্রশংসা শুনতে শুনতে এমন অবস্থা হয়েছিল আমার যে রোজ নতুন কোনো প্রশংসা না শুনলে মন খারাপ হত। তবে রোজই কেউ না কেউ কিছু বলতোই। ছেলেদের কথা বাদ দিচ্ছি, ক্লাসের মেয়েরাও যেন আমার প্রেমে পড়তে চাইত। আমার ভালো নাম সুতনুকা — তনুকা বলেই স্কুলে চিনত সবাই। যে কোনো ফাংশনে চিফ গেস্টের হাতে ফুলের বোকে তুলে দেবার জন্য টীচাররা আমাকে ডাকতেন। অভিনয়, নাচ কোনোটাই তেমন আসে না আমার — তবু প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের ফাংশনে নাটকে নায়িকার পার্ট আমার বাঁধা ছিল। আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল সবসময় সকলের নজর প্রথম আমার ওপর পড়বে। তাই বলে পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম মনে করবেন না। ভালোই রেজাল্ট করতাম প্রতি বছর। একটাই মুশকিল ছিল সব টিউটরই পড়াতে এসে আমার প্রেমে পড়ে যেত। বুড়ো বুড়ো মাস্টারমশাই রেখেও কোনো লাভ হত না। ফলে বাবা শেষে মহিলা টিউটর ছাড়া রাখত না। তাদের মধ্যেও দুজনের আবার লেসবিয়ান ঝোঁক ছিল। পড়াতে পড়াতে আমার হাত নিয়ে খেলা করত কেউ কেউ। মঞ্জুলা মিস্‌ বলে একজন বলে ফেলেছিল, ‘ডল, তোমাকে কি ভগবান মাখন দিয়ে গড়েছেন?’

    এইভাবে বড়ো হচ্ছিলাম, নিজের ঘরে আয়নায় নিজেকে নানাভাবে দেখার নেশা পেয়ে বসেছিল আমাকে। কী ঘন চুল মাথায় — ঢেউ খেলানো সেই পিঙ্গল চুলের রাশি কোনোমতে একটা ক্লিপে আটকে রাখতাম। মাখন মসৃণ ত্বকে যেন কেউ গোলাপের আভা এনে দিয়েছে। রোমে রোমে স্বর্ণাভা পিঙ্গল চোখের মণিতে বিদেশি রহস্য। কৈশোর থেকেই মেয়েদের যে স্বাভাবিক শারীরিক সৌন্দর্য — তার ঢল নেমেছিল শরীরে। নিজেকে দেখে নিজেই তারিফ করতাম। বিদেশি সিনেমার নায়িকাদের কথা মনে হত। হ্যাঁ জানি আপনাদের ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে, নার্সিসাস কমপ্লেক্সের কথা ঘুর ঘুর করছে মাথায়। দেখুন, আমার মতো চেহারা হলে আপনাদেরও নার্সিসাস কমপ্লেক্স হত। তিন আয়নার বিশাল ড্রেসিং টেবিল কিনে দিয়েছিল বাবা তার আদরের সুন্দরী মেয়ের জন্য। সেই টেবিল উপচে পড়ত রকমারি প্রসাধনের জিনিশে। এছাড়া আমার একটা কারুকাজ করা ফ্রেমে বাঁধানো হাতআয়না ছিল। দরজা বন্ধ করে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতাম। তারপর আলমারি খুলে ইচ্ছেমতো কোনো পোশাক বেছে পরতাম। স্কুলের সাদামাটা ইউনিফর্মেও আমার রূপ চাপা পড়ত না।

    সত্যি বলতে কি আমার পাশে আমার মাকে দেখলে বিশ্বাস হত না মহিলা আমার মা। নিতান্ত ময়লা গায়ের রং, চোখ দুটো যেন ড্যাবাড্যাবা — নরম গড়ন ছাড়া আর কোনো প্লাস পয়েন্ট ছিল না ওর চেহারায়। সাজগোজের দিকেও মন ছিল না। শাড়ি ব্লাউজ ম্যাচ করত না বেশিরভাগ সময়। পড়াশোনায় অবশ্য ভালো ছিল। স্কুলে অঙ্কের টীচার। সারাক্ষণ চাকরি, সংসার আর খাতা দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে নিজের দিকে আর কখন মন দেবে! চেহারায় স্বভাবে আমি বাবার মেয়ে। নামী জমিদার বাড়ির ছেলে আমার বাবা, আভিজাত্য তার চেহারায়, হাবভাবে। যেমন ফর্শা, তেমনি সুপুরুষ। কী করে যে মার মতো নেহাৎ সাধারণ চেহারার মেয়েকে আমার ঠাকুর্দা-ঠাকুমা বাবার জন্য পছন্দ করেছিল ভেবে পাই না। মাও মনে হয় এই দুর্লভ সৌভাগ্যে মরমে মরে থাকত, তাই বাবার আর আমার যত্নে কোথাও একটুও ত্রুটি থাকতে দিত না। আমাদের প্রতিটি জামাকাপড় রুমাল পর্যন্ত নিজে হাতে ইস্তিরি করে রাখত। ডাইনিং টেবিলে রোজ নানারকম সুখাদ্যের চমক থাকত। আমার ব্যাপারে কোনো বেখেয়াল হলে বাবা মাকে প্রচণ্ড বকুনি দিত, চড়চাপড়ও বাদ যেত না। আমি বুঝে গিয়েছিলাম এ বাড়ির সবচেয়ে দামি মানুষ আমি, আমার সেবাযত্নের জন্যই মা আছে। তাই কোনো ব্যাপারে তার খামতি দেখলে বাবার কাছে নালিশ করতে কসুর করতাম না। বাবা যখন মার দিকে তেড়ে যেত বেশ মজা লাগত আমার। কেমন ভীতু জন্তুর মতো তাকাত মা। মার খেয়ে চোখের জল মুছত, কখনো পালটা কিছু বলত না। এক্কেবারে স্লেভ মেন্টালিটি।

    নিজের বন্ধুবান্ধবদের কাছে, তাদের পরিবারে, পার্টিতে সুন্দরী মেয়েকে হাজির করাতে বেশ উৎসাহ ছিল বাবার। মাকে পাত্তাই দিত না সেসব জায়গায়। প্রিয়াংশু আঙ্কল আসত প্রতি শনিবার সন্ধেবেলা। হুইস্কি আর এটা সেটা ভাজাভুজি খেতে খেতে বাবা আর প্রিয়াংশু দাবা খেলত। প্রিয়াংশুই বলছি — কারণ গোড়া থেকেই ও আমার লাভার। বয়সে বাবার থেকে অনেক ছোটো প্রিয়াংশু তবে আমার থেকে নিশ্চয়ই বছর বিশেকের বড়ো হবে। ওর চুলে দু একটা রূপোলি ঝিলিকে আরো হ্যান্ডসাম দেখায়। ওরও নিজের ফার্ম বাবার মতো। প্রথম প্রিয়াংশুকে দেখি আমি তখন ক্লাস নাইনে। সঙ্গে সঙ্গেই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। চোখে চোখে কথা হত তখন আমাদের, কারণ আমি জানতাম না বাবা কীভাবে নেবে ব্যাপারটা। কোনো রাজবাড়িতে আমার বিয়ে হলে বোধহয় বাবা খুশি হয়। মাঝে মাঝে শনিবার সন্ধেবেলা মা খাবারের ট্রে আমার হাতে ধরিয়ে দিত। ট্রে সেন্টারটেবিলে রাখতে রাখতে গিয়ে আঙুল ছুঁয়ে দিতাম প্রিয়াংশুর। রাতে ওকে মোবাইলে ফোন করতাম। ফিশ ফিশ করে আলাপ চলত — কী রোমাঞ্চকর গলার স্বর ওর, কার্ট কোবেনের মতো। হ্যাঁ একসঙ্গে সিনেমাও দেখেছি। আমিই আবদার ধরতাম, ‘সিনেমায় চলো’ বলে। তবে হলের অন্ধকারে নয়, চুমো নিজেই খেয়েছি ওর গাড়িতে বসে। টকটকে রং, ছফুট লম্বা, কপাল থেকে ওলটানো ঘন চুল, খাড়া নাক — টেনিস খেলোয়াড়ের মতো শরীর। প্রিয়াংশুর ধারেকাছেও আসতে পারবে না আমার কলেজের কোনো সহপাঠী। চোখেই পড়ত না আমার ওদেরকে। প্রিয়াংশু ওর বাড়িতে একাই থাকে। ওর বাবা মা অবসরজীবন কাটান শান্তিনিকেতনে। মাঝে মাঝে কলকাতায় আসেন। অনেকবার নিজের বাড়িতে প্রিয়াংশু আমাদের নেমন্তন্ন করে খাইয়েছে। সামনে এক টুকরো লনওয়ালা সল্টলেকের ঐ দোতলা বাড়িটা নিয়ে মনে মনে স্বপ্ন দেখেছি অনেক। দুজন পুরোনো চাকর ভারি ফিটফাট রাখে বাড়িটা। ডাইনিং টেবিলটা মস্ত গোল — তার মাঝখানে খাবারের বাটিগুলো রাখার জন্য একটা ছোটো গোল কাটা। হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাটিগুলো নিজের দিকে আনা যায়। কথা বলতে বলতে প্রিয়াংশু চিকেন, মাটন বা চিংড়ির বৌলগুলো আমাদের দিকে এগিয়ে এগিয়ে দেয়। কখনো নিজেই সার্ভ করে। বারান্দায় বেতের ডেকচেয়ার, পাশে টিপয়ে স্তূপাকার বই। প্রিয়াংশু বই পড়তে খুব ভালোবাসে। স্টাডিরুমটা দেখার মতো। দেয়ালে গণেশ পাইনের ওরিজিন্যাল পেন্টিং। ড্রইংরুমের কোণে কটেজ পিয়ানোটা সবচেয়ে টানত আমায়। পিয়ানো শেখার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের। প্রিয়াংশু ভালো বাজাত। আমি আবদার ধরতাম ‘আমাকে শিখিয়ে দাও।’ হ্যাঁ, ওর সঙ্গে শুতেও চেয়েছিলাম আমি। এড়িয়ে যেত ও, কেন বুঝিনি। একদিন ফোনে বলল, ‘তুমি অনেক ছোটো ডল, আমরা বন্ধুই থাকি। কেমন?’ বুঝলাম ও বাবাকে ভয় পাচ্ছে। বাবা মাঝেমাঝে ওকে বলত, ‘বিয়ে করছো না কেন এখনো? বয়স তো একদম ভাঁটিয়ে গেল। বলো তো পাত্রী খুঁজি।’ হেসে পাশ কাটাত প্রিয়াংশু। আমি তো জানতাম কেন বিয়ে করছে না। যে ডলের প্রেমে পড়েছে তার অন্য মেয়ে কীকরে পছন্দ হবে। আছে কারুর আমার মতো এমন দুধে আলতা রং, মাখন মাখন হাত পা, নিখুঁত মুখ চোখ, ঢেউখেলানো এক ঢাল চুল?

    চলছিল এইভাবে। কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম ইংরিজি অনার্স নিয়ে। বাড়ির গাড়ির ড্রাইভার আমাকে কলেজে নিয়ে যেত, অপেক্ষা করত, আবার ফিরিয়ে আনত। বাবা তার সুন্দরী মেয়ের গায়ে ট্রাম বাসের উটকো লোকদের ছোঁয়া লাগতে দেবে নাকি? অন্য গাড়িটা বাবা নিজে ড্রাইভ করে অফিস যেত। মা? মা তো চিরকাল ট্রাম বাসেই স্কুলে যাতায়াত করে।

    কেন যে আমি সেদিন তাড়াতাড়ি কলেজ থেকে ফিরে এলাম। কী সব ইউনিয়নের গোলমাল, ঝান্ডাবাজি চলছে পোর্টিকোর সামনে। ক্লাস বন্ধ। আমি শোফার সাধনকে বলললাম গাড়ি বাড়ির দিকে ঘোরাতে। আমার তেমন একটা বন্ধুটন্ধু নেই। সবাই তো সুন্দর বলে আমায় হিংসে করে। ক্লাসের যতো খেঁদি পেঁচির দল। ভাবলাম বাড়ি ফিরে একটা মুভি দেখে কাটাব দুপুরটা। কী করে জানব মা স্কুলে যায়নি। আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে প্রিয়াংশুর গাড়ি দাঁড় করানো দেখেই ধক্‌ করে উঠল বুকের ভেতরটা। তবে কি বাবার শরীর খারাপ হল হঠাৎ? বাবার গাড়ি তো নেই। ফ্ল্যাটের দরজার তিনটে চাবি — আমাদের তিনজনের কাছে থাকে। কী মনে করে বেল না বাজিয়ে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে ঢুকলাম। বাবা-মার বেডরুমের দরজা বন্ধ। এগিয়ে যেতেই কানে এল প্রিয়াংশু আর মায়ের গাঢ় গলার আওয়াজ। প্রিয়াংশু কী করছে মায়ের সঙ্গে বন্ধ ঘরে? কান পাতলাম আমি।

    ‘তুমি আমার জন্য জীবনটা নষ্ট করছো প্রিয়ান্‌!’

    ‘তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবো এবার তিথি। আমার আর সহ্য হচ্ছে না।’

    ‘প্রিয়ান্‌! আমি একটা সাধারণ মেয়ে। কেন আমাকে ভালোবাসলে তুমি? কেন বাসলে?’

    ‘তিথি! আমার সোনা! এ বাড়িতে তোমার ওপর এই অত্যাচার আর দেখতে পারি না আমি। কী করে মেনে নাও তুমি! তোমার মতো একটা সুন্দর ভালো মেয়েকে ওরা যে শেষ করে দিচ্ছে।’

    ‘প্রিয়ান্‌! ওরা আমারই স্বামী, মেয়ে!’

    ‘চুপ করো তিথি! চুপ করো! ওরা দুজনেই চূড়ান্ত স্বার্থপর, অত্যাচারী। তোমার মেয়ে? ডলকে আমার সাইকিয়াট্রিক পেশেন্ট মনে হয়।’

    ‘বোলো না! বোলো না! ও আমার মেয়ে! আমার সামনে বোলো না ও কথা।’

    ‘তোমাকে বাড়ির ঝিয়ের মতো ট্রিট করে তাও বলবে তোমার মেয়ে! হ্যাঁ ওর সঙ্গে বাধ্য হয়ে প্রেমের অভিনয় করতে হয় আমায়। না হলে প্রতুলদাকে বলে আমার এ বাড়ি আসা বন্ধ করে দেবে। ডার্টি বিচ্‌। জানো, কী ভালগার ভাবে আমাকে সিডিউস করতে চেষ্টা করে ডল?’

    ‘থাক্‌, থাক্‌, প্রিয়ান্‌। ওসব কথা থাক।’

    ‘তিথি, তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না আমি। তোমার মতো কারুকে দেখিনি আমি।’

    ‘আমিও তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। তোমার জন্যই বেঁচে আছি। না হলে কী আছে আমার জীবনে বলো?’

    ‘ঠিক বলছো তিথি! ঠিক বলছো?’

    ‘কিন্তু তুমি এমনভাবে আমার কাছে আসো, ঠিক জেনে যাবে, প্রতুল আর ডল। আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে ওরা।’

    ‘দিক! ভালো হবে। তুমি আমার কাছে চলে আসবে। আমরা বিয়ে করবো তিথি। ওই ব্রুট্‌ প্রতুল চৌধুরীকে ডিভোর্স দেবে তুমি। সেলফিশ মেয়েটার হাত থেকেও বাঁচবে।’


    আর সহ্য করতে পারিনি আমি। মাথায় আগুন জ্বলে যাচ্ছিল। আমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে প্রিয়াংশু! আমি ডার্টি বিচ? হতেই পারে না। শয়তানী তিথি প্রিয়াংশুকে হাত করে নিয়েছে। দুম্‌ দুম্‌ করে দরজায় ঘা মারছিলাম। ‘দরজা খোলো। খোলো বলছি। না হলে পুলিশ ডাকবো।’ একটু পরে ওরা দরজা খুলে দিল। দুজনকে দেখেই যা বোঝার বুঝে গেছি। এই জন্যই প্রিয়াংশু আমাকে ‘বন্ধু’ বলে থামিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। মার গলা টিপে ধরেছিলাম আমি। ‘শেষ করে ফেলবো তোকে!’ প্রিয়াংশু আমাকে প্রাণপণে ছাড়াবার চেষ্টা করছিল। মার চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। প্রিয়াংশু এক ঝটকায় মাকে সরিয়ে নিল — আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে পেতলের বড়ো ফুলদানিটা টেবিল থেকে তুলে মার মাথায় ঘা মারলাম। মা ধড়াম করে পড়ে গেল মেঝেতে। মাথা ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে গলগল করে। দেখে আনন্দে হা হা করে হেসে উঠলাম। প্রিয়াংশু মার ওপর ঝুঁকে আর্ত গলায় ডাকছিল, ‘তিথি! তিথি! চোখ খোলো!’ আমি ওর হাত ধরে টানছিলাম, ‘তুমি ওকে ছোঁবে না! তুমি আমার! তুমি শুধু আমাকে ভালোবাসবে।’ প্রিয়াংশু আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল, ‘তুমি পাগল ডল! তুমি একটা পাগল! আই হেট ইউ।’ আমাকে হেট করে প্রিয়াংশু? সত্যি যেন পাগল হয়ে গেলাম। চিৎকার করতে করতে ফ্ল্যাট থেকে ল্যান্ডিং পর্যন্ত চলে এসে দরজায় মাথা ঠুকছিলাম, গড়াচ্ছিলাম ল্যান্ডিংয়ে। অন্য সব ফ্ল্যাটের দরজা খুলে সবাই বেরিয়ে আসছে। তারপর আর খুব একটা কিছু মনে নেই। কারা যেন জাপটে ধরে আমাকে গাড়িতে তুলছে বাবার উদ্‌ভ্রান্ত গলা — ‘ডলি ... ডল ...।’ কে যেন ইঞ্জেকশন দিচ্ছে আমায়। তারপর একটা ছোটো চুপচাপ ঘর — শাদা বিছানার চাদর, শাদা জানালার পর্দা, আমাকে একটা কিম্ভূত সবুজ গাউন পরিয়ে রেখেছে।

    প্রিয়াংশু অবশ্য এল পরে — শাদা অ্যাপ্রন পরা, গলায় স্টেথো। আরে! ডাক্তার সেজে আমাকে দেখতে এসেছে আমার লাভার। কী সুইট। আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে চুমো খেতে যাচ্ছি — কী আশ্চর্য! প্রিয়াংশু যেন ভয় পেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। একটু পরে একজন মোটা মহিলা এল, তারও স্টেথো গলায়।

    ‘আপনি কেন? প্রিয়াংশুকে পাঠিয়ে দিন।’

    ‘প্রিয়াংশু বলে কেউ নেই এখানে। তুমি ভুল করছো। আমি নার্স, তোমার প্রেশার মাপবো।’

    ‘কী বলছেন! প্রিয়াংশু একটু আগেই এসেছিল এই ঘরে!’

    ‘না, উনি ডক্টর মিত্র। তোমাকে দেখতে এসেছিলেন। তুমি ভুল করছো।’

    বারবার ‘ভুল করছো’, ‘ভুল করছো’ শুনে মাথা গরম হয়ে গেল আমার। ওই মুটকি নার্সকে দিলাম এক ধাক্কা। ছিটকে গেল ঘরের কোণে। তার চিৎকার শুনে দুতিনজন গুন্ডা গোছের লোক দৌড়ে এল। তারা আমাকে জাপটে ধরে হাত পা বেঁধে দিতে লাগল দড়ি দিয়ে। ভাবা যায়! আমার নরম তুলতুলে হাত পায়ে ঐরকম বিশ্রী দড়ি! থুতু ছেটাতে লাগলাম, চিৎকার করতে লাগলাম প্রাণপণ। সবাই মিলে চেপে ধরল আমায় — ইঞ্জেকশন দিচ্ছে বুঝতে পারছি। বাবা আসত আমাকে দেখতে। কী চেহারা হয়েছে বাবার, অমন ফর্সা রং যেন কালি মেড়ে দিয়েছে কেউ। বাবা এলে খুব কাঁদতাম আমি, ‘প্রিয়াংশুকে এনে দাও’ বলে। আর ঠিকই আসত প্রিয়াংশু, কখনো ডাক্তার, কখনো ক্লীনার, কখনো খাবারের ট্রে হাতে বেয়ারা হয়ে। আমি আনন্দে অস্থির হয়ে আদর করতে যেতাম আর ভয়ে পালিয়ে যেত ও। কেন যে ভয় পায় আমায়! কেঁদে ফেলতাম আমি। এরা বলে আমি বদ্ধ পাগল হয়ে গেছি। শেষপর্যন্ত শহরের বাইরে গ্রামে এই অ্যাসাইলামে এনেছে আমায়। এখানে সব চুপচাপ, জানালা দিয়ে নীচে একটা বড়ো ঘাট বাঁধানো পুকুর দেখা যায়, সামনে বাগানে অনেক ফুল। আয়া বিকেলে আমাকে হাঁটতে নিয়ে যায়। হুইল চেয়ারে কয়েকজন ঘোরে। কেউ কেউ হাঁটে আমার মতো।

    এখানে আমার আয়না আছে ঘরে। সাজবার জিনিসও আছে। আমি ইচ্ছেমতো সাজি, চুল বাঁধি, খুলি, আবার বাঁধি, চোখে আই লাইনার আই শ্যাডো দিই, ব্লাশার লাগাই, লিপস্টিক লাগাই, পারফিউম স্প্রে করি। নিজেকে দেখে আশ মেটে না, এমন সুন্দর চেহারা আমার — প্রিয়াংশু কি ভালো না বেসে পারে! কী আছে তিথির! আমার মায়ের! কালো, বিচ্ছিরি। সেই যে ফুলদানি দিয়ে ঘা মেরেছিলাম নিশ্চয়ই মরে গেছে তিথি। জানতেও ইচ্ছে করে না। ‘মরুক্‌, মরুক্‌’, মনে মনে ভাবি। অনেকক্ষণ সাজার পর আমার আয়া আরতি জোর করে আমার মুখ ধুয়ে দেয় — নাকি পেত্নীর মতো লাগছে আমাকে। পেত্নীর মতো? শুনলেও হাসি পায়। অন্ধ নাকি এরা?

    সারাদিন জানালায় বসে কাটে। দুপুরে প্রিয়াংশু পুকুরে স্নান করতে আসে। গ্রামের ছেলে সেজে আসে। পরনে হাফপ্যান্ট, হাতে লাল গামছা। সত্যি! আমার জন্য কতো কষ্ট করছে আমার প্রেমিক। এই রকম এঁদো পুকুরে স্নান করেছে নাকি ও কোনোদিন? ওর বাড়িতে মার্বেল বাঁধানো বিশাল বাথরুম — কী সব ফিটিংস। র‍্যাকে ভাঁজ করা নরম সব টার্কিশ তোয়ালে। দামি দামি লিকুইড সোপ, লোশন। শুধু আমার জন্য এই গ্রামে চলে আসে রোজ। পুকুরে ডুব দিয়ে সাঁতার কেটে স্নান করে। আরতি বলে ও প্রিয়াংশু নয়, এই অ্যাসাইলামের নাইট ওয়াচম্যান মনোজ। ওর বাড়ি নাকি বিহারে। আমাকে বোকা পেয়েছে কি না ... ভুলভাল বোঝাতে আসে। আমি জানালা থেকে হাত নাড়ি। প্রিয়াংশু তাকায় না, আমি হাত নাড়তেই থাকি।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)