• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • সদানন্দের (অ)বৈজ্ঞানিক চিন্তা : পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

    ৯ জানুয়ারি ৩২০২

    আমার নাম সদানন্দ। আমার বেড়ালের বয়স চব্বিশ; তার নাম সহিষ্ণু। বেড়াল নিয়ে বেড়ালে খুব সমস্যা হয়। আমি সমোসা খেতে চাইলে বেড়ালও চায়। বেড়ালকে সমোসা খাওয়াতে নেই। ওতে তেল থাকে; ওর লোম উঠে যাবে। তার চেয়ে ওকে অনুলোম-বিলোম শেখানো যায়; যোগ-অভ্যাস করানো যায়। শুধু যোগ নয়, সঙ্গে বিয়োগও। অঙ্ক অনুশীলন করা উচিত। অঙ্ক না-জানলে কিছুই হয় না। আমি একবার একটা নাটক করেছিলাম। তৃতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে আমার প্রবেশ। আমি ঢুকে পড়ি প্রথম অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে। হয়ত অঙ্ক না-জানারই ফল। সেবার নাটক ভেস্তে যায়। নাটক শেষে ওরা আমায় আটক করে রাখে। কী করবো, আমারই তো দোষ! এখন আমার এসব কথা মনে পড়লেও, মাঝখানে একেবারে ভুলে গেছ্‌লাম। নাটকের চার-পাঁচদিন পর আমি তরুণ সংঘ ক্লাবে প্রাইজ চাইতে যাই। ওরা আমাকে এই বেড়ালটা প্রাইজ দেয়। বলল যে, বেড়ালটা এক-দেড়মাস বাদে উড়বে। তা চব্বিশ বছর হয়ে গেল বেড়াল আর উড়লো না। না, না, চব্বিশ নয়; চব্বিশ আমার; বেড়ালের চার। আমি তরুণ সংঘের ছেলেদের বললাম, আর কিছু নেই? শুধু বেড়াল? ওরা বলল, বাকি সব ডাক-মারফৎ পাঠানো হচ্ছে। তিন বছর পর একটা ছেঁড়াখোঁড়া ডায়েরি আসে ডাকে। অতো পুরনো ডায়েরি দেখে আমার মন খারাপ হয়। শুধু পুরনো নয়, একেবারে ব্যবহার-করা জিনিস। প্রথম আটটা পাতায় শ্রাদ্ধের হিসেব লেখা। শুধু তাই নয়, ডায়েরিটা গোড়া থেকেই ভুল। এখন ২০২৩ সাল; আর ওতে লেখা ৩২০২; ভেতরের দিনক্ষণগুলোও যা মনেহয় ৩২০২ এর হিসেবে। জানুয়ারি মাস শেষ হয়েছে সাঁয়ত্রিশ তারিখে। ছাপার এমন ভুল? আমি তরুণ সংঘে গিয়ে বলি। ওরা বলে, আমরা পাঠাইনি; অন্য কেউ পাঠিয়েছে। আমি দেখলাম ডায়েরিটা কাকে দিই! কোথায় ফেলি! রেখেই দিই নিজের কাছে। এবং কিছু লিখি। ৩২০২ সাল আর বেশি দূরে নয়। মাত্র তো এগারশো উনাশিটা পুজোর ব্যবধান। মাথার মধ্যে আগেই নানা বৈজ্ঞানিক কথা ঘুরছিল; বেশি ভাবতে হলো না।

    [ কিন্তু ভাবছি, জানুয়ারির শেষ দিনে যদি আমার কিছু লেখার থাকে, যদি রচনা করার থাকে কিছু, প্ররোচনা কিছু লেখার, তাহলে সেটা কোথায় লিখবো, একত্রিশে না সাঁয়ত্রিশে? আমার স্থির বিশ্বাস সামনের ছেঁড়া পাতাগুলোকেই, নষ্ট না হয় এই ভেবে, শেষে এনে সাঁটানো হয়েছে। যদিও তাদের তারিখগুলো পড়া যাচ্ছে না, শুধু জানুয়ারি নামটার অংশ-বিশেষ মৌমাছি-কামড়ানো একতৃতীয়াংশ চোখের মতন উঁকি মারছে। তবু, জানুয়ারির শেষদিনটি নিয়ে ধন্দেই আছি আমি। হ্যাঁ, এই শেষদিনটিকে আমার কর্কট সংক্রান্তি বলে মনেহচ্ছে; কাঁকড়াবিছের মতোই বিঁধছে সেটা। ]


    ১০ জানুয়ারি ৩২০২

    বোঝাই যাচ্ছে এটাও ডায়েরির ভুল তারিখ। আগের দিনেরটাও তাই। ক্যালেন্ডার দেখে তারিখটা যে ঠিক করবো তার উপায় আমার নেই। আমার ঘরের ক্যালেন্ডারটিও ধোয়া তুলসী পাতা নয়। সে নিজেই তো ২০১০ সালের। তাই ওসব ঝামেলায় গেলাম না। আমি একটা নতুন এককের কথা বলতে চলেছি। আলো আর বছর– এই হচ্ছে গিয়ে দুটো রাশি। এই দুইয়ের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে দূরত্বের কোনো সম্পর্কই নেই; আপাদমস্তক দেখলেও না; কিন্তু এ-দেখাই তো চরম দেখা নয়; এর অন্য চার্ম আছে যা চর্ম-চোখে বোঝা যায় না। আলো আর বছর মিলে একটা একক তৈরি হয়; যার নাম আলোকবর্ষ; যা দিয়ে তারাদের দূরত্ব মাপা যায়। আমার বন্ধু অলোক– তার মুখেও আমার মতোই দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, সে আমার চেয়েও বেশি ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরে, খাদ্যাখাদ্যের বাছবিচার নেই, তার অবশ্য আমার মতো বেড়াল নেই; বিল্লির সঙ্গে থাকার বদলে সে নিরিবিল্লিতেই থাকতে পছন্দ করে; সেই অলোক আমার কথা অর্ধেকটা শুনেই বলল, এটা খুবই সামান্য ব্যাপার; অথচ আমাদের মাস্টার মশায় বললেন, না হে, এটা সব লোকের বোঝার জন্য নয়। এ হলো অলোকসামান্য ব্যাপার! অলোক না-মানলেও এটা লোকমান্য বিষয়; লোকে মেনেই নেয়। যাইহোক, আমার কথাটা হচ্ছে এই যে, আলো থেকে যদি অমন একটা নামকরা একক দাঁড়াতে পারে তাহলে অন্ধকার দিয়েই বা ইউনিট হবে না কেন? অন্ধকারদের ইউনিটি কি কম! তা ফিজিক্স হয়ত আমায় বলবে যে, আলো বেমক্কা ছুটতে পারে তাই তো এককটা সহজে তৈরি হতে পেরেছে। আলোর মতন আর কেউই বা ছুটতে পারে! আমি উত্তর দেবো, আলো ছুটতে পারে, আর অন্ধকার কি দাঁড়িয়ে থাকে? হ্যাঁ, ফিজিক্স মহোদয় হয়ত সেটাই ভাবে; এই ভাবনারই উদয় হয় তার মধ্যে। আমার তার প্রতি উত্তর, আচ্ছা তুমি অ-নে-ক দূরে গিয়ে একটা মহাশক্তিশালী আলো জ্বেলে সঙ্গে-সঙ্গে নিভিয়ে দিয়ে দ্যাখো তো অন্ধকার আলোর মতোই বেগে তোমার ওপর হামলে পড়ে কিনা! আলোর বেগ আর অন্ধকারের বেগ আসলে সমান। এ-কথায় ওকে নিরুত্তর হতেই হবে। আমি যুক্তির দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে আমার আসল প্রস্তাবটা এবার জানাবো, সুদে-আসলেই জানাতে হবে; আলোকবর্ষ যেমন একক অন্ধকারবর্ষ নামেও তেমনি একটা একক হওয়া উচিত। হলে বেশ শক্তিশালী এককই হবে। দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও এককটা যেমনকার তেমনি থাকবে; এমনকী শতক ও সহস্র-র ঘরেও ওর কোনো ক্ষতি হবে না; বেশ টেকসই সে। হ্যাঁ, আলোকবর্ষ একা-একাই একক হবে, তার একাকীত্বে ভুগবে সে, এটা ঠিক না। তবে আলোকবর্ষ দিয়ে যেমন দূরদূরান্ত মাপা যায় অন্ধকারবর্ষ হবে তার উল্টো। ও দিয়ে শুধু নৈকট্য মাপা যাবে। ছাদে শুয়ে-শুয়ে অন্ধকারবর্ষ মেপে বোঝা যাবে তারগুলো আমাদের আত্মীয়তার ঠিক কতোটা কাছে নেমে এলো!


    ১৩ জানুয়ারি ৩২০২

    দু-দিন আগে আমাকে একটা সংবর্ধনা দেওয়া হয় গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে। হয়ত আমার ভাবনার গুরুত্ব তারা বুঝতে পারছে। আমার গলায় মালা; মাথায় মুকুট। আমার নিজেকে গর্বিত লাগছিল। আমার সংবর্ধনা প্রাপ্তিতে আমার বন্ধু অলোকের অবশ্য খুবই অস্বস্তি হয়েছে। সে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছে, মালাটা ছিল জুতোর; আর মুকুটটা একটা আধভাঙা হাঁড়ি। তাই যদি হয়ও, তবু সম্মানের সঙ্গে যে যা দেয় নিতে হয়। আমি ইচ্ছে করেই ওসব খুঁটিনাটি দেখিনি; খুঁটিতে ঠেস দিয়ে ব্যাপারটা চোখ বুজে উপভোগ করাই উচিত মনে হয়েছে আমার। চোখ বুজে হলেও বুঝেশুনেই উপভোগ করেছি। উপভোগ এবং আত্মপ্রসাদ দুটোই লাভ করেছি। অলোক এটাকে বলেছে, নির্মম সংবর্ধনা। বলুক; অলোক একটা সামান্য মানুষ। ‘সামান্য’ শব্দটি কখনো ওর নামের কাছ ঘেঁষবে না; গা ঘষাঘষি করবে না ওর সঙ্গে; তাহলে তো ও অলোকসামান্য হয়ে যেতো; অ-লোকসামান্য, মানে সাধারণ লোকের চেয়ে আলাদা। কিন্তু ওটি আর হবে না। ও একটা অবোধ।

    যাইহোক, ক-দিন এসব ঝামেলায় লেখাই হয়নি। আজও ওই বিজ্ঞান নিয়েই। আমি যেখানে রাতে শুই সেটা একটা মন্দির। অবশ্য আলো পাখা সবই আছে। জোনাকির মতনই তার আলো ও পাখা আছে! কাল লাইটের ফিউজ উড়ে যায়। সন্ধ্যে থেকে গোটা রাতই আলো জ্বলেনি। কাল টিকটিকি দুটির উপোস গেছে। আমি ভাবছি, ওদের কেন প্যাভলভ ক্রিয়া হবে না? পোষা কুকুরকে রোজ একটা সময়ে খাবার দেওয়া অভ্যেস করে হঠাৎ কোনোদিন ওইসময়ে না-দিলে ওর শুধু-শুধু লালা ঝরতে থাকবে। এরই নাম অভ্যেসের প্রতিবর্ত ক্রিয়া। তা টিকটিকিদেরও তো সন্ধ্যে থেকেই পোকা ধরে খাওয়া অভ্যেস! তাহলে কাল আলো না-জ্বলার জন্যে, এবং পোকা না-আসার কারণে ওদেরও খামোখা লালা ঝরেছে! আমি মানুষ হয়েও আমার কিন্তু অভ্যেসের প্রতিবর্ত ক্রিয়া নেই। ঘড়ির কাঁটা ধরে কে আর আমাকে খেতে ডাকবে? তা অমন কণ্টকিত অভ্যেস না-থাকাই ভালো। টিকটিকিদের দুর্দশা দেখে– দূর থেকেই দেখে, জংলি উদ্বাস্তু উপোসী গিরগিটিটা হয়ত খুব হেসেছে। আমার মতো ওরও অভ্যাসের প্রতিবর্ত ক্রিয়া নেই কিনা! ওরও খাওয়া-দাওয়ার সময়ের মা-বাপ নেই। ইলেকট্রিক আলোর কাছেই আসতে চায় না ওরা। আলোর নাগালে এলেই দিব্যি গালে পোকা রেখে আরাম-সে খেতে পারতো। তা আর হচ্ছে কই! তাতে অবশ্য ওদেরই ক্ষতি। এই ঘরেই একটি বাস্তুতন্ত্র আছে। হ্যাঁ, সবার বাস্তুভিটের মধ্যেই এমন বাস্তুতন্ত্র থাকে; সেটা গিরগিটিদের উদ্বাস্তুতন্ত্রের চেয়ে ঢের ভালো। এই ইকোসিস্টেম এমনই যেখানে মাথার ওপর ছাদ– তারপর আলো পাখা কতো কিছু! একেবারে প্যারাডাইজ। এরকম ইকোসিস্টেম আর একটিও নেই; এর সঙ্গে প্যারালাল আর থাকতেই পারে না কিছু। এখানে টিকটিকিরাই সবচেয়ে উঁচু স্তরের খাদক। কোনো তন্ত্রমন্ত্র না-জেনেই তারা এই বাস্তুতন্ত্রের চুড়োয় উঠতে পেরেছে। আমার একবার মনে হয়েছিল, কেন, সাপ এসে টিকটিকিকে খেয়ে নিতে পারে না? তাহলে টিকটিকি কী করে সর্বোচ্চ খাদক? তারপর মনে হলো, ঘরে যদি সাপ ঢোকে তাহলে গৃহকর্তাই তো সেই সাপ তাড়াবে! অনেক সাপের বিষ থাকলেও, এমনকী কারো-কারো একটু বেশি থাকলেও, হ্যাঁ, বিষের উনিশ-বিশ হলেও, এখানে অন্তত তারা সর্বোচ্চ খাদক হতে পারবে না; এবং টিকটিকিরও ক্ষতি কিছুই করতে হবে না; টিকটিকির গায়ে সামান্যও ক্ষত তৈরি করতে পারবে না সাপ; সাপের সে-সুযোগই তো নেই। তার আগেই তার দুর্যোগ চলে আসবে লাঠির ঘায়ের মারফৎ। তবে একটাই যা সমস্যা টিকটিকির পক্ষে। এই ইকোসিস্টেমকে অন্‌-অফ করা যায়। চালু এবং বন্ধ করা যায়। হ্যাঁ, এখানেই সেটা চালুনির মতো ছিদ্রযুক্ত। মানুষের হাতের নাগালেই রয়েছে তার সুইচ; অফ করে দেওয়া মাত্রই ভেস্তে যায় এই ইকোসিস্টেম!


    ১৪ জানুয়ারি ৩২০২

    আমার মনে হলো, কালকের বলা ইকোসিস্টেমটি নির্মাণের অনেকটা কৃতিত্বই টমাস আলভা এডিশনের। ইলেকট্রিক বাল্ব আবিষ্কারেরই ফল সেটি। তার আগে সেটা ছিল একবেলার বাস্তুতন্ত্র। তাও টিমটিম করে চলতো। দিনেরবেলা পোকাদের টিম আসে না, আদৌ দল বেঁধে আসে না পোকারা, হয়ত দু-একটা আসে একা-একা; আলো না-পেলে আসতে তাদের খুব গড়িমসি; গড়পড়তা তাদের কিছুজনকে পাওয়া যেতো মাত্র। এমনি করে হয়ত লালাবাতিই জ্বলে যেতো ইকোসিস্টেমটার; অশনি-সংকেত দেখা যেতে আর বেশি দেরি ছিল না; খুব তাড়াতাড়ির মধ্যেই শনির দশা ধরতো সেখানে। ভাগ্যিস ইলেকট্রিক বাল্ব এলো; লালাবাতি জ্বলার আগেই এলো। বাস্তুতন্ত্রটি নতুন জীবন পেলো; বইয়ের মতনই তার একটা নতুন এডিশন হলো।


    ১৫ জানুয়ারি ৩২০২

    অলোক আমাকে মনে করিয়ে দিলো গত শ্রাবণ মাসের ঘটনা। আমি যে-মন্দিরে থাকি সেখানে ও একদিন এসেছে কিছু গালগল্প করতে। এক গাল মুড়িও নিয়ে এসেছে। আমার পেটে তখন জ্বলছে ক্ষুধানল। মানে, গলার কাছ থেকে পেট পর্যন্ত যে-নলটা রয়েছে সেটা সেই দণ্ডেই কিছু না কিছু খাবার চাইছে। অলোক ভাগ্যিস মুড়ি আনলো! ওকেই তখন ভগবান মানতে ইচ্ছে করছে।

    সেদিন শিবলিঙ্গে সবাই জল ঢালছে। ঘড়া-ভর্তি জল পুকুর থেকে ওঠাচ্ছে আর ঢালছে। ঘোড়ার মতনই যেন সবার শক্তি এসে গেছে শরীরে। একেবারে হর্স-পাওয়ার! মন্দিরে জলতরঙ্গ বইছে। হ্যাঁ, মন্দির জলবৎ তরল হয়ে উঠেছে। আমরা দুটিতে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি বাইরে। এমন সময় অলোকটা কী করে যেন একজনের কলস ছুঁয়ে ফেললো। একে তো বদ্ধ খ্যাপা, কাপড়-চোপড়ের ঠিক নেই; তার ওপর মুড়ি-খাওয়া- হাত। বেদম মার খেলো। মা-র খেয়ে ও প্রায় দশ-বারো দিন একেবারে উগ্রচণ্ডের মতো পাগলই রয়ে গেল। আমার মাথাটাও কেমন ভোম্বল দাসের মতন হয়ে গেল; বুদ্ধি খুললো না, এমনকী দুর্বুদ্ধিও নয়; আর ওকে বাঁচাবার চক্করে আমার ডান হাতটা গেল ভেঙে। পরে ঘটনাটার কথা আমি অন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অনেক ভেবেছি। কী ভেবেছি সেটাই লিখছি। শিবলিঙ্গে যে অতো জল সেদিন ঢালা হলো, সেটা শেষ অব্দি গেলো কোথায়! নিশ্চয় বাষ্প হয়ে উবে গেছে। সেটা ঘনীভূত হয়ে মেঘ হয়ে এসেছে; আবির্ভূতই হয়েছে বলা যায়। মেঘ থেকে আবার বৃষ্টি। অলোক তো সেই ঘটনার পরে তার আশ্রয় পোড়ো বাড়িতেও ফেরেনি; বাইরে বাইরেই ঘুরেছে; এবং বৃষ্টিতেও ভিজেছে প্রচুর। শিবলিঙ্গ থেকে ওঠা জলীয় বাষ্প হাওয়ায় উড়ে দূরে গিয়েও মেঘ তৈরি করতে পারে; আবার এখানেও করতে পারে; কে বলতে পারে! তার মানে হলো এই, অলোক যে সেদিন শিবলিঙ্গ থেকে ওঠা এবং রিসাইক্লিং-হওয়া দৈব বৃষ্টিতে ভেজেনি এ-কথা কেউ বলতে পারে না। তার মানে কলস ছুঁয়ে ফেলায় সেদিন ওর কিচ্ছু দোষ হয়নি।

    আমার এই ব্যাখ্যা শুনে সেদিনের উগ্র পাগল অলোক আজ হি-হি করে হেসেছে; আর আমাকে বলেছে আমি একটা সেয়ানা পাগল!


    ১৬ জানুয়ারি ৩২০২

    অনেক দিন আগে, একদিন আমি সারাদিন মাঠে শুয়ে। কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীর-টরির খারাপ হতে পারে, তবে জ্ঞান টনটনে। আমার বেড়াল সহিষ্ণু আমার গা ঘেঁষে গোল হয়ে শুয়ে আছে; গোলমাল করেনি, গলযোগ তো নয়ই। জলযোগও হয়নি বেচারার, উপোস করেই শুয়ে আছে আমার মতন। শুয়ে-শুয়েই কেটে গেছে একটা গোটা রাত আর তারপরে আধখানা দিন। অলোক এসেছে দু-বার; উঠতে বলেছে; উঠিনি; সে জলের বোতল আর মুড়ি রেখে চলে গেছে। আমি ভাবছি, আমি আর সহিষ্ণু আরো কয়েকদিন যদি এভাবে পড়ে থাকি, এবং মরে যাই, ছোটো অণুজীব– ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস এরা সব জেগে উঠবে। আমাদের মৃত কোষের জটিল বস্তুগুলি ওরা ভেঙে সরল করে কিছুটা নিজেরা খাবে; বাকি প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের ঋণ শোধ করবে।

    আজ ভাবছি, জ্যান্ত দশায়– জীবজন্তুরা যখন দশাসই চেহারা নিয়ে শুধু শুয়ে থাকে, বিয়োজকরা তখন কাজ করে না কেন? মৃত কোষ ওরা চিনতে পারে কী করে! আমাকে আর আমার বেড়ালকে দু-দিনেও তারা অ্যাটাক করলো না, আটক করেও রাখতে চাইলো না আমাদের। কিন্তু বেড়ালটা যদি ছাইগাদায় মরে পড়ে থাকতো ওদের ইনটেলিজেন্স ঠিক খবর পেয়ে যেতো। অমন বড়ো-বড়ো ঘটনা, যেখানে জীবন এবং মৃত্যুর মতন সাংঘাতিক সব প্রসঙ্গ জড়িয়ে আছে, সেখানে তাদের একটুও জড়তা নেই, আদৌ জড়বস্তুর মতো বসে থাকে না তার বেলায়; জড়ীভূত হয়ে থাকে না; বরং নিষ্প্রাণ শরীরকে পঞ্চভূতে মিলিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়। একটা শরীরকে পাঁচটা ভূতে ছড়িয়ে দেবে তারা। পাঁচ ভূত মানে জল স্থল ইত্যাদি মিলিয়ে পাঁচটা জায়গা। এই ভূতের বিজ্ঞান কারোরই অজানা নয়। এমনকী ক্লাসের ছেলেরাও এই ভৌতবিজ্ঞান জানে। ক্ষুদ্রতম মেধা দিয়েই বিয়োজকরা জীবন থেকে মৃত্যুকে ঠিক বেছে নিতে পারে। আজ মনে হচ্ছে, আমাদের শুয়ে থাকা আর মরে পড়ে থাকার মধ্যে ওরা অপেক্ষা করে বসেছিল ঠিক, কয়েকটা আণুবীক্ষণিক শকুনের মতো!


    ১৭ জানুয়ারি ৩২০২

    নশ্বর বলতে বোঝায় যা ভেঙে ক্ষয়ে লুপ্ত হয়ে যায় একদিন-না-একদিন। কিন্তু আমি ভেবে দেখলাম নশ্বর আসলে শুধু কোনো জিনিসের চেহারাটা। বারেবারে সেটাই নস্যাৎ হয়ে যায়। নস্যির মতোই উড়ে যায় দেহটা একদিন না একদিন। একটা নলকূপ খারাপ হয়ে পড়ে থাকতে থাকতে পঁচিশ-ত্রিশ বছর পরে হয়ত বিলুপ্তই হয়ে গেল। তার লোহার কলকব্জা ক্ষয়ে গেল। ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাওয়া মানে সত্যিই শেষ হওয়া নয়। পরমাণুদের ইচ্ছে বদল হওয়া। লোহার পরমাণুরা হয়ত অন্য কারোর পরমাণুর সঙ্গে ঘর বাঁধতে গেল। তখন অন্য একটা পদার্থ তৈরী হলো। তার মধ্যে লোহা আছে কিন্তু দেখতে শুনতে অন্যরকম। মোটকথা লোহার কিছুই ক্ষতি হলো না। মাঝখান থেকে বেচারা নলকূপ তার চেহারাটা হারালো। শরীরটা আর মস্তিষ্কটা হারিয়ে ফেলা নিয়ে মানুষেরও যতো ভয়। কিন্তু কোনো মানুষই নিঃশেষ হয়ে আজ অব্দি মরেনি। হ্যাঁ, শেষ নিঃশ্বাসই ত্যাগ করেছে শুধু। বাকি তার সবই যেমন ছিল তেমনই আছে। শুধু মানুষ কেন, আজ অব্দি জীব-জড় কারোরই কিছুই হারায়নি। হারাবার আছেই বা কী! পুঁজি বেশি নেই কারোরই; না জীবের, না জড়ের। থাকার মধ্যে কিছু মৌলিক পদার্থ; তাও ধার করা। মরে যাওয়া নামে একটা খুব সাধারণ পদ্ধতির মাধ্যমে একসময়ের জীবিতদের সেই ধার শোধ করে দিতে হয়। কিন্তু ঋণীদের স্বভাবই হলো পালিয়ে বেড়ানো। হরিণীর মতোই তারা ক্ষিপ্রগতি। মরার হাত থেকে বাঁচতে তারা বাঁচার ভেতর লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ধরা না পড়ে উপায় নেই। এমনকী ধড়াচুড়ো পরে ছদ্মবেশ ধরে থাকলেও! তখন মৌলগুলি ফিরিয়ে দিতে হয়। হ্যাঁ, মৌলিক অধিকারগুলি সবই কেড়ে নেয় সময়। কিন্তু মৌলদের পরিবর্তন কিছু নেই। অনাদি অনন্তকাল ধরে তারা যেমন ছিল তেমনই আছে। সেই হিসেবে এই পৃথিবীটাই হলো আসল অমরলোক। সুতরাং দু-চোখ ভরে এর নিসর্গ উপভোগ করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল এরকম তিনটে জায়গা হয় না। শুধু মর্ত্যই হয়। পৃথিবীই শেষ কথা। অলোক বলল, মর্ত্যের মধ্যে নিসর্গ আর হাসপাতাল– এই দুই লোকেই মানুষ বেশি ঘোরাফেরা করে। শুধু এগুলিতেই তাদের গতায়াত। গতানুগতিক হলেও এবং গুঁতোগুঁতি করে হলেও এই এই স্থানগুলিতেই তারা বেশি বেশি যায়। তার মধ্যে, পৃথিবীই যে অমরলোক, এই কথাটা দেখলাম অলোককে খুব ভাবালো; আশ্বস্ত করলো তাকে। তবে সে স্বীকার করে নিলো যে তারপরও কালের করালগ্রাসকে সে খুবই ভয় পায়। হ্যাঁ, করলাসেদ্ধ খাওয়ার মতোই একই ভয় তার। করলাকে এমনকী ভাত দিয়ে মেখে খাওয়ালেও ভয় কমে না। করলার গ্রাস আর করালগ্রাসের মধ্যে কোনো তফাৎ দেখতে পায় না সে। এ-নিয়ে আমাদের মধ্যে আরো অনেক আলোচনা চললো। আমরা একবাক্যে স্বীকার করে নিলাম যে কালের হুমুক সবাইকেই তামিল করতে হয়। হুকুম তামিলের পুরস্কার হিসেবে সময় সবাইকেই, সবকিছুকেই দেয়, একটি করে নাড়ু; অর্থাৎ নতুন জীবন। প্রতিবার এর স্বাদগন্ধ আলাদা; আগের সঙ্গে কোনো মিল নেই। জীব কিংবা জড়ও আলাদা কিছু নয়। জীবের দেহ থেকেই জড় তৈরি হচ্ছে অথবা জড়দেহের উপাদানগুলি থেকে জীব। এরা পরস্পর পরস্পরকে উৎপাদন করছে। তবে কালের সেই কড়া হুকুম তামিল করার সঙ্গে সঙ্গেই যে এই নতুন জন্মের নাড়ুটিকে চেখে দেখা যাবে তার কিছু নিশ্চয়তা নেই; তামিলনাড়ু যে একসঙ্গেই আসবে তার কিছু ঠিক নেই। এজন্য অনেক অপেক্ষা করতে হয়। অলোকের সঙ্গে আলোচনা করে আমি খুব তৃপ্তি পাই। আমাদের দু-জনকেই খাওয়া নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকতে হয়। অলোক আমার চেয়েও বেশি অনিশচয়তায় ভোগে। অলোক সম্বন্ধে এর আগে ১৩ জানুয়ারি আমি রেগেমেগে যাই লিখে থাকি না কেন, যতোই ওকে অবোধ-টবোধ বলি না কেন, অলোক শুধু চিন্তাগ্রস্তই নয়, সে চিন্তাশীলও।


    ১৯ জানুয়ারি ৩২০২

    আজ দু-দিন ধরে অলোককে নিয়ে ব্যস্ত; ব্যতিব্যস্তই বলা যায়; হ্যাঁ, ওর আবার সেই উগ্র দশা শুরু হয়েছে। আমারও একটা দশা প্রায়ই চলে, মাথাটা কেমন ঘোলাটে-মতন হয়ে যায়। কিন্তু ওর মতন উগ্রচণ্ড হই না কখনো। ওই অবস্থার মধ্যেও হঠাৎ একবার শান্ত হয়ে অলোক আমার সঙ্গে গপ্পো করতে লাগলো। মানুষের মরে যাওয়া আর বেঁচে থাকার মধ্যে ব্যবধানের একটা অদ্ভুত ব্যাখ্যা দিলো অলোক। ভুতুড়েই বলা যায়। একজন লোক ধরো মারা যাচ্ছে। মারা যাওয়া মানে কী? ধরা যাক, গোধূলির আকাশে সার বেঁধে উড়ে যাচ্ছে একদল বালিহাঁসের বাঁকা রেখা। লোকটা হাঁসগুলি দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। হাঁসেদের বক্ররেখাটাও একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। এবার লোকটা মারাই গেল। তার মানে হলো, সে একসময় দেখলো, সময় স্থির হয়ে গেল। হাঁসেদের রেখাটা হঠাৎ একটা জায়গায় এসে ঝুলেই রয়েই গেল। আর তার নড়াচড়া নেই। অথচ যারা বেঁচে আছে ওর আশেপাশে তারা যথারীতি দেখতে পাচ্ছে হাঁসেদের রেখাটা আবছা হতে হতে দূর-আকাশে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ব্যস এইটুকুই মাত্র তফাৎ বাঁচা এবং মরার।


    ২০ জানুয়ারি ৩২০২

    অলোকের কাল সন্ধ্যার কথা ভালো বুঝতে পারিনি। কোথায় যেন বাধো-বাধো ঠেকেছে। বেশি ভাবতে গিয়ে মাথাটা আবার ভোম্বলদাস হয়ে গেল; এবং তখনকার কথা আর কিছু মনে নাই। সাধে কি লোকে আমাকে পাগল বলে! তবে আমার মাথা অলোকের চেয়ে সাফ; পোশাকাশাকও কিছুটা পরিষ্কার; সাফসুতরো থাকার ব্যাপারে কোনো সাফাই দেওয়া উচিত নয় বলেই আমি মনেকরি। কিন্তু খ্যাপা কি আর একরকম! নাকি চৌষট্টি রকম পাগল হয়। আমি তার মধ্যে একরকম। যাইহোক মাঝরাতে উঠে অলোকের কথাটা আমি আরো ভাবতে থাকি। তখন মাথা কাজ করছে। হ্যাঁ, পাগলামির কাছে একেবারে মাথা নত করা ঠিক নয়; জোরজবরদস্তি করেই পাগলামির থেকে ‘আমি’-কে আলাদা করে নিতে হয়। অলোকের প্রসঙ্গটা তখনও ওপরে-ওপরে ভাসছে, তবু ওর মতনই একটা দৃষ্টান্ত মনে এসে গেছে; দৃষ্টান্ত দেওয়ার মতন দৃষ্টি খুলেছে আমার। সেটাই বলছি। ধরো, একজন কেউ ধীরে-ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে; তার চোখ ঢুলুঢুলু; দূর থেকে তার কানে ভেসে আসছে ধীর লয়ের একটা গানের তরঙ্গ। লোকটা গানের প্রতিটি কথা শুনতে পাচ্ছে। ধীর লয়ের গান তার হৃদযন্ত্রের অলিন্দ হয়ে নিলয়ে ঢুলে যাচ্ছে, রক্ত-সংবহনের মতনই; ওর রক্তকেই বাহন করে গানটা ভেতরে ঢুকছে। তারপর লোকটা চোখ বুজলো, বুঝেশুনেই মারা গেল লোকটা; মারা যাওয়ার ঠিক আগে গানটার শেষ শব্দটা শুনতে পেলো; ওখানেই থেমে গেল গানটা, থম্‌ মেরে থেকে গেল। কিন্তু যারা বেঁচে আছে, তারা শুনতে পেলো, গানের তরঙ্গ আদৌ দাঁড়িয়ে নেই; ঠিক প্রবাহিত হচ্ছে; এমনকী গানের পরের কথাগুলোও তারা যথারীতি শুনতে পাচ্ছে। লোকটা যদি মৃত্যুর মধ্যে সোচ্চার হয়, তাহলে সে হয়ত দাবি করতে পারে, তার শোনা কথাটার পরেই গানটা শেষ; হ্যাঁ, ‘সোনা’ শব্দটার পরেই গান সমাপ্ত; আর কিছু থাকতেই পারে না; কিন্তু আসলে কি তাই! তারপরও ত আরো কত কথা ঝিলিক দিয়ে গেল! এই হলো মৃত্যু। অন্ধকার ঘরের কোণায় বসেই এর দূরত্ব মাপা যায়। ভাবছি, অন্ধকারবর্ষ এককটাকে কাজে লাগালে কেমন হয়?


    ২১ জানুয়ারি ৩২০২

    অলোক যেমন মরার কথা ওইভাবে ভেবেছে, এবং বলেছে, আমি তেমনি অন্য একটা ব্যাপার ভেবেছি। নেতাজি সুভাষের জুতোর তলায় কিংবা শিবরাম চক্কত্তির স্যান্ডেলে যে-সব ধুলোবালি লেগেছিল সেগুলো কি আজও আছে? হয়ত তারা যেখানে থাকতেন বা যেখানে-যেখানে গেছেন ঠিক সেখানেই পড়ে নেই, হয়ত বায়ু-তাড়িত হয়ে, বা বায়ুর দ্বারা বিতাড়িত হয়েই হোক, সে-সব দূরে কোথাও উড়ে গেছে, কিন্তু তা বলে তো আর উবে যায়নি! উবে গেলেই বা যাবে কোথায়! যাওয়ার উপায় নেই। ভর এবং শক্তির মোট যে পরিমাণ একই। তাদের অন্য কোনো পরিণাম নেই; হয় ভর শক্তি হবে নয় শক্তি হবে ভর, ব্যস এইটুকুনি মাত্র! তাদের দু-জনকে পরস্পরের ওপর নির্ভর করতেই হয়, নিজেদের ভরণপোষণের জন্যই করতে হয়; হ্যাঁ, নির্ভয় হয়েই নির্ভর করা যায়। বস্তুকে নির্ভার হতে গেলে অতো ভয় করলে চলে না। ভরের বদলে তো সে শক্তি পাবেই। তা নেতাজি বা শিব্রামের সেই পায়ের ধুলোর পরমাণু কি ইতিমধ্যেই ভেঙে শক্তি হয়ে গেছে! সেই শক্তিই বা কোথায় গেছে! আলো কিংবা তাপ কিংবা আরো কিছু রূপে নিশ্চয় আছে। হয়ত আমার বেড়ালের গরম গায়েই সেই শক্তি এসে লুকিয়ে আছে! নাঃ, আর ভাবতে পারছি না; গায়ে কাঁটা দিচ্ছে!


    ২৪ জানুয়ারি ৩২০২

    অলোক আমার কথা শুনে গত দু-দিন আগে নেতাজির অন্তর্ধান এবং শিবরামের প্রয়াণের সময়টা জানতে চেয়েছিল। ছেঁড়াখোঁড়া বইয়ে অনেক খুঁজেপেতে আজ আমি ওকে বললাম, কোনোটারই একশো বছর হয়নি। বিশেষ করে শিবরামের ব্যাপারটা তো এই সেদিন! তখন অলোক বলল, তাহলে হয়ত ওই দুই মহাপুরুষের পায়ের ধুলোকণা এখনো ভাঙেনি। হয়ত এমন হতে পারে, ওই ধুলোই হাওয়ায় উড়ে-উড়ে এসে আমাদের চোখে ঢুকেছে আর আমাদের চোখের জল বেরিয়ে এসেছে। দেখলাম, অলোক সত্যি-সত্যি চোখের জল ফেলছে। অলোকের সেই দশাটা আবার আসতে চলেছে।


    ২৫ জানুয়ারি ৩২০২

    অলোকের ডেরায় গেছি, দেখি সে নেই। ডেরার বাইরে গেলেই সে ডোরাকাটা জামাটা পরে যায়; সেটা নেই। বালিশে মাথার গর্ত। আমি সেই বালিশে মাথা রেখে আরাম-সে শুয়ে পড়ি। শুয়ে শুয়ে অলোকের গন্ধ পাই ওতে। যেন আগাপাশতলা অলোকই শুয়ে আছে। আমি ভাবি, এই যে মূলত গন্ধ-নির্ভর একটা পূর্ণ মানুষের নিঃসন্দেহ অবয়ব, এই দেহে দেহগঠনকারী সমস্ত উপাদানগুলি আছে? অলোক যা যা নিয়ে সশরীরে বাইরে গেছে, এই বালিশে, ঘরে, চাদরে যেন সেগুলোই আরেকটা করে হুবুহ রয়ে গেছে। অলোক ফিরে এসে ডোরাকাটা জামা ছেড়ে পোকায় কাটা গেঞ্জি পরে, বসে বসে আমার কথা শুনলো, কিন্তু না বুঝতে পেরে খাপ্পা হয়ে গেল। সে ভেবেছে, আমি বুঝি বলছি কার্বন হাইড্রোজেন নাইট্রোজেন এরা শুধু এক জায়গাতেই থাকে; একটি দুটি দেহেই তাদের আশ্রয়, ওই হাতে-গোনা কয়েকটা দেহই তাদের আশ্রম, তাদের তপোবন; কিন্তু আমি তা বলিনি। অলোককে বোঝাই; বোঝা নামাবার চেষ্টা করি তার ঘাড় থেকে। ওঝার মতোই না-বোঝার ভূত তাড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করি! ঘরের মেঝেতে ধরো একটা প্রকান্ড মাছ নামানো ছিল। মাছটা কিছুক্ষণ আগেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর তুমি এসে ঢুকেছো ঘরে; গন্ধ পেয়েছো মাছের; ঠিক জায়গাতেই পেয়েছো; সেই মেঝের ওপর; তার ফলে, না-দেখতে পেয়েও তুমি অনুপস্থিত মাছটাকে প্রায় বুঝেই ফেললে; হয়ত সামান্য ত্রুটি হলো বুঝতে; এখন, ঘরে রইলো একটা মাছ যাকে চোখ বন্ধ করে দেখা যায়, আর ঘরের বাইরে সেই একই মাছ যাকে খোলা চোখে দেখা যায়; কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই, শরীর তৈরি করতে যা যা লাগে, তা তো লাগবেই! তফাৎ হলো, এই মাছটা যেমন ওই মাছটির প্রতিলিপি, তেমনি, তার উপাদানগুলিও ঘরের মধ্যে আসল নয়, প্রতিলিপি! যেমন, কার্বনের প্রতিলিপি কার্বন; হাইড্রোজেনের হাইড্রোজেন, এমনি সব। কিন্তু তারা মূলের মুখাপেক্ষী; মুলোর মাথায় শাকের মতোই তারা পরনির্ভর; মুলোটি পচে নষ্ট হলেই শাকগুলিকে মুষড়ে পড়তে হয়; শাকাচ্ছন্নের বদলে শোকাচ্ছন্ন হতে হয় অচিরেই। আজই যদি বাইরে-যাওয়া অলোক আর না ফেরে, অলোকের দেহের প্রতিলিপি উপাদানগুলি কিছুক্ষণ, কিছুদিন মূলের আশায় বসে থাকবে। সবকিছুসহ মূলগুলিকে ফিরে না পেলে, তাদের সঙ্গে মোলাকাত না হলে, প্রতিলিপিগুলি অচিরেই বালিশ থেকে, চাদর থেকে, ঘর থেকে চিরতরে বিদায় নেবে; এবং এই ভাবের ঘর থেকে চুরি হয়ে যাবে, আমার সঙ্গে চুপচাপ সময়-কাটানো অনুপস্থিত অলোকের এই সত্তাটি, অস্তিত্বটি!


    ২৭ জানুয়ারি ৩২০২

    সকাল

    অলোককে কাল বললাম, যদিও বত্রিশশো দুই সাল মাত্র এগারোশো উনিশটা পুজোর ব্যবধান তবু বত্রিশশো দুই সাল অব্দি আমরা থাকবো না। অলোক আমার কথাটা পত্রপাঠ নাকচ করে দিল। কচু কাটার মতোই কথাটাকে কেটে ফেলল অলোক। এবং আমাকে ধরিয়ে দিলো যে, ‘আমরা থাকবো না’ নয়। সবই থাকবে আমাদের। বলতে হবে, ‘বত্রিশশো দুই সালে আমরা জন্মাবো না’! এ তো আমাদের সেদিনের সেই আলোচনারই অংশ! সেই আলোচনায় সেদিন আমরা দু-জনই খুব সুখ পেয়েছি; ধনীই হয়েছি বলা যায়; তারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে অলোকের কথায়। আমি রাতভর এই কথা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। ‘তখন আমরা থাকবো না’ আর ‘তখন আমরা জন্মাবোই না’ কথা দুটি কি এক? আমি কথা দুটিকে মেলানোর চেষ্টা করছি অন্ধকার জলের কাছে বসে। মিল খুঁজছি তাদের মধ্যে। মাঝেমাঝে যেন ঝিলমিল করে উঠছে সেই মিল! তারপর বেবাক মিলিয়ে যাচ্ছে; না মিলিয়েই চলে যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ আমি দেখতে পাই, অলোক প্রত্যক্ষভাবে একটা কাটা ঘুড়ি নিয়ে ছুটতে ছুটতে আমার দিকে আসছে। যেন আমার অধরা মিলটাকেই ধরে নিয়ে আসছে। ধরাধামে তার মতো বন্ধু আমার নেই। কিন্তু অলোককে আমি যদ্দূর চিনি তাতে মনেহয়, সে যেমন ঘড়ি ধরে চলতে ভালোবাসে না, সময় বুঝে আদৌ চলে না অলোক, তেমনি ঘুড়ি ধরে ছুটতেও তার অনীহা। সুতরাং আমি যা দেখছি তা মিথ্যে না-হলেও অলোক কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে আসেনি। এই যে পরোক্ষ উপায়ে একটা শরীর, একটা ঘুড়ি গঠিত হয়েছে, এখানেও কি দেহ তৈরি-করা মৌলগুলি উপস্থিত আছে? না নেই? আমি আজকাল খুব মৌলবাদী হয়ে উঠেছি কিনা তাও এইবেলা ভেবে দেখলাম। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই অলোকের ডেরায় গেলাম। অলোককে বললাম, ‘আমরা থাকবো না’ মানে হলো আমাদের কিছুই থাকবে না। শুনে মনে হচ্ছে আমরা যেন শ্বাশত প্রবহমান জীবনকে অস্বীকার করছি। অলোক বলল, জীবন শুধু শাশ্বত নয়, আটশত কিংবা হাজারও হতে পারে; জীবনের মূল্য খুবই বেশি। আমি বললাম, তবু মূর্খ দৈত্যের মতন একটা অহংকারী ভাব মাঝেমাঝে এসে যায়! মনেহয় যেন একটি জীবন একা আমার; আমারই; আমি কিছুর অংশ নই; আমার সঙ্গেই আমার জীবনের উত্তেজনা সমাপ্ত হয়ে যাবে। আমি নেই অথচ আমার জীবন আমাকে ছাড়াই চলছে এটা আমি তখন ভাবতে পারি না। আমি বিহীন আমার বেঁচে থাকার চেয়ে আমার মরাই ভালো! বলা মাত্রই আমার কেমন যেন কান্না এসে গেল। খুব কাঁদতে লাগলাম। অলোক আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বলল, তোমার মনে আছে রাসায়নিকে ডোবানো সেই পাখি? মনে ছিল আমার। মাস্টার মশায়ের বাড়িতে দেখেছিলাম অপরূপ একটি পাখি ফর্মালিনে সংরক্ষণ করা। অলোক হঠাৎই বলেছিল পাখির ডাকের মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে গেছে পাখি! শুনে আমি কেঁপে উঠেছিলাম। অলোক বলল, তেমনই, আমি একজনের কান্নার ছবি আঁকতে চাইছি! মানুষ নয়, শুধু কান্না! অলোকের হাতে টুকরো অঙ্গার ধরা; মেঝের ওপর ছবি আঁকবে বলে! অলোকের চোখ-মুখ দেখেই মনে হচ্ছে অলোকের খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার চেয়েও অনেক, অনেক গুণ বেশি কষ্ট!

    সন্ধ্যা হব-হব

    বিকেলের পরে আবার অলোক এলো আমার ঘরে। আমি অলোককে কাগজি পাতার চা খাওয়ালাম। চিনি-ফিনি নেই। অনেকদিন চিনি দেখতে পাই না। শুধু জল, আর কাগজি পাতা। তবু অলোক চা খেয়ে খুশি হলো। ওর আনন্দ দেখে আমারও আনন্দ হলো খুব। চা খেয়ে অলোক বলল, মানুষের চোখের জল কি প্রাকৃতিক? অলোকের কথা আমি বুঝতে পারলাম না। অলোক বলল, আলোকবর্ষ দূরের তারকাখচিত অনন্তেও তিন গজে এক ফুট হয়। সূর্যের সাত ঘোড়ায়-টানা রথ এসব গল্পকথা হলেও, ঘোড়ার ব্যাপারটা কাল্পনিক হলেও গজের হিসেবটি মোটেও কল্পনা নয়। বরং পরিকল্পনা করেই মানুষ গজের অঙ্ক কষেছে। সূর্যের ঘোড়ার কাহিনিটি উড়িয়ে দেওয়া গেলেও, হ্যাঁ, পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতন ওড়ানো গেলেও, হাতিকে উড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব; গজকে তো নয়ই। অলোক আরো বলল, আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রখচিত অনন্তেও তিন গজে একফুট হয়। এটা আশ্চর্য ব্যাপার, কিন্তু এটাকে প্রাকৃতিক আইন বলা যায় না। মানুষের জিনিস ব্রহ্মাণ্ড গ্রহণ করেছে। ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও মানুষ না-থাকলেও, কিছুই না থাকলেও এই হিসেবে মিথ্যে হয়ে যায় না। আমার মনেহলো, অলোক যেন এমন একটা গোধূলির কথা বলতে চাইছে যেখানে সূর্য নেই; বলতে চাইছে, এমন একটা অপার্থিব অনন্ত বিষণ্ণতার কথা যা মানুষের চেয়ে বহুদূর এগিয়ে, আলোকবর্ষ দূরে; অথবা কাছেই, একেবারে অন্ধকারবর্ষ-কাছে!

    রাত

    নিজের ডেরায় ফিরে আসতে আসতে, আস্তে আস্তে, ভাবছি, অলোক কতকাল পড়ছে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা ছেঁড়াখোড়া বই! অতো কঠিন বইটাকে উপন্যাসের মতোই পড়েছে অলোক, খুব সামান্য আলোয়, অথবা আবছা অন্ধকারেই, চোখ সরু করে, সামনের দিকে ঝুঁকে; হ্যাঁ, ঝুঁকি নিয়েই, অন্ধ হয়ে যাবার ভয় ভুলে গিয়ে। কতদিন আমি নিজেই ভেবেছি বইটা একটা সাধারণ বই ছাড়া আর কিছু নয়; পাতি উপন্যাস ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না; উপন্যাসপাতি ছাড়া আর কিছু বলাই যায় না ওটিকে। কিন্তু আমার এই ভুল বোঝার মধ্যেই, অলোক নিজের মনে যে কতো কিছু প্রতিষ্ঠা করেছে, কতো কিছুর শিলান্যাস করেছে তার আর ঠিক নেই। আমরা দু-জনই যদি এরকমভাবে ভাবতে থাকি, ভাবতেই থাকি, এবং ভাবতেই থাকি, এবং পরস্পরের প্রতি এরকমই অনুরক্ত থাকি, এরকমই ঠান্ডা রক্তের অনুগত হয়ে থাকি, বিসংবাদের আঁচ না-লাগে, বিসংবাদকে যদি আঁচানো যায়, কুলকুচি করে ফেলে দেওয়া যায়, তবে মনেহয় আমাদের আলোচনা অনন্ত কাল চলবে।


    ২৮ জানুয়ারি ৩২০২

    কালকে ওর ঘরে বসেই আমি অলোককে পানকৌড়ির কথা বললাম। বললাম, ওরা জল ভালোবাসে। ওদের আহার-বিহার সবই জলে। হাঁসের মতোই স্বভাব ওদের অনেকটা। কিন্তু হাঁসের বেলায় ডাঙা আর জল দুটোই প্রিয়। বীণাপাণির কাছে হাঁসকে থাকতেই হবে। কিন্তু বিনা পানিতে পানকৌড়ির থাকার উপায় নেই। জলই তার জীবন। অলোক বলল, কেন এমন? আমি বললাম, কারণ এটাই তাদের প্রবণতা। অলোক বলল, প্রবণতা কোথায় থাকে? আমি বললাম, তার ভ্রূকুটিকুটিল ক্রোমোজোমে; আরো জটিল তার ডিএনএ-তে। অলোক বলল, তাদের গিঁট খুলে খুলে গেলে পানকৌড়ির প্রবণতাটিকে চাক্ষুষ দেখতে পাবো? আমি বললাম, আছে ওখানেই। তবু সব খুলে ফেললেও, চাক্ষুষ নেই! অলোক বলল, কান্নার কাহিনিও কি এমনই? তাই আমি ব্যবছিন্ন কান্নার ছবি আঁকতে পারি না? অলোক শান্ত হয়ে গেল। তারপর আবার কালকের সেই অমীমাংসিত কথাটা উঠে এলো। ‘আমি নেই আমারও জীবনও থাকবে না’ এই অবুঝ অহংকারী ভাবটি নিয়ে কথা হলো। আমরা দু-জনই স্বীকার করে নিলাম, জীবন একটাই; সেটা সবার একসঙ্গে; কারো একার নয়; তাবৎ জীবের; তাবৎ জড়ের। আমরা নানা সত্তায় নানা শর্তে মাঝেমাঝে গড়ে উঠছি এবং আবার ভাঙছি। যেকোনো একটা অস্তিত্বের মায়ায় ভিজছি আর পরে গলে যাচ্ছি। তাই যখন কারো জীবন থাকে না তখন তার কাছে শুধু যা নেই তা হলো, জড়ের বেলায় তার চেহারা, আর জীবের বেলায় চেহারা ও সত্তা। বাকি সবই আছে যা থাকার ছিল, থাকে থাকে সাজানো ছিল যা! পরে সে আবার জন্মাবে। জন্মাতে তাকে হবেই। হয় জীব হয়ে, নয় জড় হয়ে!


    ৩০ জানুয়ারি ৩২০২

    কারোকে না-পেয়ে অলোককেই আমার এবং ওর আপাতত প্রথম একমাসের ভাবনাগুলো একসঙ্গে পড়তে দিয়েছিলাম (তাও তো রোজ লিখতে পারি না)। আজ পড়ে সে ডায়েরি ফেরৎ দিলো। খুশি হয়েছে বলেই মনে হলো। দু-জনে মিলে ঠিক করলাম এগুলো কোথাও প্রকাশ করতে হবে। মাস্টার মশায়ের কাছে আমার ভাবনা-টাবনার কথা কিছু না-বলে কায়দা করে জেনে নিলাম ‘নেচার’ নামে একটা বিশ্ববিখ্যাত পত্রিকা আছে। তার ঠিকানা পাই কোথায়? অলোক তর্ক করলো, ‘নেচার’ কোনো পত্রিকা হতেই পারে না। নেচারের চেয়ে সিগ্‌নেচার নামটাই কি বেশি যুক্তিযুক্ত নয়? তাহলেই তো সেটা হাতের মুঠোয় থাকতো। অন্তত আঙুলে তো থাকতোই। নিজের স্বাক্ষর তো নিজের আঙুলেই থাকে; যেমন ইচ্ছে করা যায়। এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে না, উপেক্ষা করে না তাকে কেউ; বরং অপেক্ষা করে বসে থাকে তার আশায়। সুতরাং ‘নেচার’ নামের কোনো পত্রিকার কথা মানতেই সে রাজি নয়; হ্যাঁ, একেবারেই নাচার সে; নেচার হলো প্রকৃতি; তার ঠিকানা বরং ওর কাছে আছে। প্রকৃতি সম্পর্কে খুবই প্রত্যয় দেখা গেল অলোকের; প্রকৃতি ও প্রত্যয় উভয়েই দেখা গেল অলোকের কথার ব্যাকরণে। এই বলে সে আমার ডায়েরির পৃষ্ঠা জেরক্স করিয়ে গাছে-গাছে টাঙিয়ে দিলো। সে ভিক্ষে করে; তবু যখের ধনের মতো নয়টি টাকা আগলে রাখতে পেরেছিল।


    ৩৭ জানুয়ারি ৩২০২

    অকালের বৃষ্টি সব ভিজিয়ে দিলো। গাছের গায়ে লাগানো জেরক্স কপিগুলোও ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে গেল। কপিরা ছিঁড়লেও না-হয় কথা ছিল; সাদা কাগজ হোক কিংবা কিছু লেখা কাগজ, পড়ে ফেলার চেয়ে, পড়ে ফেলে দেওয়ার চেয়ে, সরাসরি ছিঁড়ে ফেলাই তাদের উচিত মনে হয়। বাঁদরদের ধর্মই ওই; হ্যাঁ, এ-ব্যাপারে খুবই ধার্মিক তারা। কিন্তু বৃষ্টির তো সে-দায় নেই। একেবারে বিদায় নেওয়ার পরে, শীতকালে তার ফিরে আসার দরকারই ছিল না কোনো। আর জেরক্স করানোর মতো টাকাও অলোকের কাছে নেই।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)