• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গল্প
    Share
  • মন্দির প্রতিষ্ঠা : আর্যা ভট্টাচার্য



    এরা বামদেব সান্যালকে জোর করে পাগলাগারদে ভর্তি করে দিয়েছে। তিনি যে সম্পূর্ণ সুস্থ, এটা শুধুমাত্র এদের চক্রান্ত, তা হাজার বার বলা সত্ত্বেও কেউ বিশ্বাস করেনি। এমনকি ডাক্তাররা ও না। তিনি চিৎকার করে করে বলেছেন, ‘আমি পাগল না…আমি পাগল না’, কিন্তু কেউ তার কথায় কান দেয়নি। আর কোনো উপায় নেই। তাই তিনি পালাচ্ছেন। পাগলাগারদ থেকে বেরোবার জন্য ছুটছেন। ছুটছেন।… এই রে! এরা টের পেয়ে গেছে। ভীষণ শব্দে চারদিক থেকে পাগলা ঘন্টি বেজে উঠেছে। বামদেব ছুটেই চলেছেন, আর পাগলাঘণ্টি বেজেই চলেছে। কে বা কারা যেন ডাকছে। শেষে তাঁকে ধরতে না পেরে তাঁর জামাটাই টেনে ধরলো, আর সেটা ফরফর করে ছিঁড়ে দু-টুকরো হয়ে গেল। উঃ, কী গেরো! কিন্তু না, এই পাগলাগারদ থেকে তাকে বেরোতেই হবে। হবেই।

    “ও মেসো, গোঁ-গোঁ করছো কেন? উঠে পড়ো, উঠে পড়ো। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। চা বসালাম।”

    ঘন্টুর ধাক্কা আর চেঁচানিতে ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসলেন বামদেব সান্যাল।

    ওরে বাবা, এতো অন্ধকার হয়ে গেছে! ওঃ! পাগলা ঘন্টি নয়। তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন।

    তবে স্বপ্নটা তেমন ভুলও ছিল না। পাগলাঘণ্টির মতো বিকট শব্দ করে সমানে বেজে চলেছে বটে, তবে সেটা হাউসিং কম্‌প্লেক্সের নবনির্মিত মন্দিরের ঘন্টা। ট্রায়াল হচ্ছে ঘন্টার। কাল মন্দিরে প্রতিমা প্রতিষ্ঠার কথা। তারই রিহার্সাল।

    আজ কুড়ি বচ্ছর বামদেব এই হাউসিং-এ আছেন। গোটা বিশেক ফ্ল্যাট নিয়ে এই হাউসিং কম্‌প্লেক্সেটা। সুতপার পছন্দ অনুযায়ী কেনা। আর তার মূল কারণ হাউসিং এর মাঝখানে একটা চমৎকার বাগান। ভদ্র পরিবেশ। সুতপা প্রতিবেশীদের ব্যাপারে খুবই সচেতন। বলেছিল, “আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আর কতদিন দেখা হয়! বিপদে-আপদে প্রতিবেশীরাই তো আপন জন। আমরা তাদের ভালোমন্দে পাশে থাকব। তারাও থাকবে। কী বলো? প্রমোটারের কাছ থেকে একটু খবর নাও তো, মোটামুটি আর কারা ফ্ল্যাট কিনছে। তারপর দুজনে মিলে একটা ডিসিশনে আসা যাবে।”

    তা সেদিক থেকে প্রতিবেশীরা মোটের উপর ভালোই ছিল। তাদেরই মতো শিক্ষিত, ভদ্র। ভালোই কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু হা, হতোস্মি! ঘোষবাবু, ভটচাজ বাবু, সেন বাবু, ব্যানার্জি, আরও কে কে যেন--মড়কের যেন হিড়িক উঠেছিল।

    না, না, কোনো ছোঁয়াচে রোগটোগ নয়। সব কেস সেপারেট। তাদের অনেকের বাড়ির লোকই অন্যত্র চলে গেল। তা ছাড়াও আরও অনেকে, খোদায় মালুম কী কারণে, নিজের নিজের ফ্ল্যাট বেচে দিয়ে এদিকে সেদিকে চলে গেল। তা ফ্ল্যাট কি আর খালি পড়ে থাকে? সবই আবার রিসেল হতে লাগল। আর তার সিংহভাগ কিনল বাঙালি, অবাঙালি উঠতি ব্যবসাদারেরা। সে কিনুক। পয়সা তাদের। বামদেব বাবুর পিতৃপুরুষের তাতে কী!

    তবে বামদেব বাবুর পিতৃপুরুষের না হলেও বামদেব বাবু, ওসমান ভাই, মিস্টার মার্কাস, আরও যাঁরা প্রথম থেকে আছেন, এখন কালের নিয়মে 'বুড়োগুলো' নাম পেয়েছেন এবং মোটামুটি এলেবেলের দলে পড়েছেন তাঁদের যথেষ্টই অসুবিধা হতে লাগল। কমিটিতে তাঁদের মতামতের কোনো মূল্যই আর থাকল না। মেজরিটি বলে ওই নতুনরাই এখন মোটামুটি পরিচালনা কমিটির মাথা হয়ে উঠেছে। কী আর করা! কালের নিয়ম!

    আর সেই কালের নিয়মেই নাকি কে জানে, সেই থেকে শুরু হয়েছে যখন তখন মাতমাত রবে মাঝে মাঝেই মাইকে উদ্দাম গান আর বাগানে ভয়ংকর সব আলোর খেলার সাথে নাচ, খানাপিনা, আরও কত কী! যদিও তিনি প্রমাণ করতে পারবেন না, কারণ কমিটিভুক্ত না হওয়ায় তাঁদের ফিনান্স দেখার অধিকার নেই, কিন্তু বামদেব বাবুর গভীর সন্দেহ এসবই হয় কমিটির টাকায়। কিন্তু তাঁর মুখ খোলার উপায় নেই। সুতপার অন্তরটিপুনি দেওয়া আছে, “একদম ওইসব ছেলেছোকরাদের সঙ্গে লাগবে না। বুড়ো, বুড়োর মতো থাকো।” হায় ভগবান! ইউনিভার্সিটির ডাকসাইটে সংস্কৃতের প্রফেসর বামদেব সান্যাল, যার ভয়ে ছাত্রছাত্রীরা তটস্থ থাকত, আজ তার কী হাল!

    সে যাহোক একরকম চলছিল, ইতিমধ্যে দুটো পাম্পের একটা গেল খারাপ হয়ে।

    আর যাবে কোথায়! বলা নেই, কওয়া নেই কমিটির মেম্বাররা ঠিক করে ফেলল, ওই পাম্পঘর ভেঙে ওখানে মন্দির হবে। কোন ঠাকুরের? না, সে হবে কিছু একটা। পরে ঠিক করে নিলেই হবে। আগে তো পাম্পঘর ভাঙা হোক সোজাসাপটা সিদ্ধান্ত মেজরিটির। কিন্তু সুতপার হাজার অন্তরটিপুনিও এবার আর চিরকালের প্রতিবাদী বামদেব বাবুকে 'দাবায়ে রাখতে' পারল না। তিনি স্পষ্ট বললেন, “কিন্তু ভারতের মতো সেকুলার দেশে ওসমান ভাই, মার্কাস সাহেব এঁদের সুবিধা অসুবিধাও তো দেখতে হবে।”

    কিন্তু তাঁর কথা শেষ হবার আগেই ওসমান ভাই, মার্কাস সাহেব সব সিঁটিয়ে গিয়ে একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “না, না, কোনো অসুবিধা নেই। করেন করেন।” বামদেব বাবু বুঝলেন অন্দরমহলের অন্তরটিপুনি বোধহয় তাঁদের ওপরেও পড়েছে। কথা বলার আর কোনো মানে হয় না। অগত্যা মুখে চুপ করেই থাকতে হলো। কিন্তু মনে মনে মেজরিটির গুষ্ঠির তুষ্টি করতে লাগলেন। মনের ভেতরই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে গজগজ করতে লাগলেন, “আরে শালা, পাম্পরুম তো ভেঙে দিচ্ছিস, এরপর শিবরাত্রির সলতে ওই একমাত্র পাম্পটি বসে গেলে, (আর এতগুলো ফ্ল্যাটের জল তোলার চাপ সহ্য করতে করতে বসবেই) জল দেবে কি তোর বাপ? নাকি ভগবান? আর ধরো প্রার্থনায় গলে গিয়ে ভগবান অঝোর ধারায় আকাশ ভেঙে জল দিলেনই, তাহলেও গ্যারাজ আর নীচের বৃষ্টির নোংরা জমা-জলে নাইতে খেতে পারবি তো রে শুয়োর?”

    এই কথা ভাবার পরমুহূর্তে বামদেব বাবু শিউরে উঠলেন। ছ্যা, ছ্যা, ছ্যা! ছি ছি ছি, এ হে হে! তিনি বিখ্যাত পণ্ডিত অধ্যাপক শুদ্ধাচারী, নিত্য বেদপাঠী বামদেব সান্যাল, তিনি কিনা রেগে গিয়ে অপশব্দ প্রয়োগ করে ফেললেন! প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ নিঃশব্দে মনে মনেই বলে উঠলেন, “নারায়ণ! নারায়ণ!”

    নাঃ, কাল আবার মূর্তি প্রতিষ্ঠা আছে। কোমরটাও টনটন করছে। সাতপাঁচ ভেবে বামদেব বাবু ফ্ল্যাটে ফেরাই সমীচীন মনে করলেন।

    পরের দিন সকাল সকাল স্নানাদি করে সস্ত্রীক বামদেব বাবু নীচে নামলেন। বাগানের চারপাশ ঘিরে কিছু প্লাস্টিকের চেয়ার রাখা রয়েছে। বামদেব বাবু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন হাউসিং-এর বাসিন্দারা প্রায় বেশিরভাগই চলে এসেছে। ওই যে পুরুতও ঢুকলো। মোড়ের মাথার শনি মন্দিরে ইনিই পুজো করেন।

    এটি বিশেষ কোনো বিখ্যাত মন্দির নয় অবশ্য; আজকাল তাঁদের পাড়ার মতো মিশ্র অর্থনীতির প্রায় সব পাড়াতেই লোহার গেট বন্ধ একটি ছোট জায়গায় কালী, শনি এইসব দেবতার মূর্তি থাকে।

    বামদেব বাবুর মনে পড়ল তাঁর বন্ধু রিচার্ডের মেয়ে স্টেলা কানাডা থেকে বেড়াতে এসেছিল। ছিলও ক’দিন তাঁদের বাড়িতে। মোড়ের মন্দির দেখে সে তো হাঁ। অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “হু ইস দিস গড আঙ্কল? এন্ড হোয়াই ইস হি কেজড?”

    বামদেবের তো বাক্যি হরে গেছিল একেবারে। কোনোমতে আমতা-আমতা করে কথা ঘোরাতে পারলে বাঁচেন।

    তা সে যাইহোক, ওই মন্দিরের যে পুরুতটি প্রবেশ করলেন মাইকে ভুল মন্ত্র বলায় তিনি একেবারে সিদ্ধ হস্ত। আরে, জানিস না যখন আস্তে বল। নিজের মূর্খতা জাহির করে কী লাভ! কিন্তু না। অসাধারণ কনফিডেন্স লেভেল। দেখবার মতো।

    এখানেও তাই। কোনো প্রতিমাই নেই, অথচ তিনি কোশাকুশিতে একটি গাঁদা ফুল রেখে মাইক থাকা সত্ত্বেও তারস্বরে দুটি ভুল মন্ত্রের আধখানা আধখানা মিশিয়ে দেবতাবিহীন হারা উদ্দেশ্যে চেঁচাতে লাগলেন, “ত্র‍্যম্বকে যজামহি সুগন্ধি পুত্রং দেহি ভগবতী দেবী নমস্তুতে”। বামদেব বাবুর কর্ণ থেকে যেন রক্তপাত হতে লাগল।

    বেতালা, বেসুরো গান আর উচ্চকিত অর্থহীন ভুল মন্ত্রের আপদ কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হলেই বামদেব বাবুর কান থেকে যেন রক্তক্ষরণ হতে থাকে। তবে এই গর্ভযন্ত্রণা বেশিক্ষণ তাঁকে আর সহ্য করতে হলো না। চারিদিকে হৈচৈ রব উঠল, 'ঠাকুর এসেছে…ঠাকুর এসেছে'।

    তারপরেই দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য।

    একদিক থেকে কৃশানু, রকি, সুবীর রায় ইত্যাদিরা, বেশ বড়সড় মাথায় সাপ, পরনে বাঘছাল ডমরুধারী পাথরের এক শিবমূর্তি নিয়ে “জয়, জয় শিবশম্ভু, হর হর মহাদেব” বলে চেঁচাতে চেঁচাতে আসতে লাগল।

    আর অন্য দিক থেকে সোনু, ডক্টর বাজাজ, সুশীল ধাড়া, মিস্টার জয়সোওয়াল আরও কারা কারা যেন ইয়াব্বড় এক মহাবীরের মূর্তি নিয়ে “বোলো, বোলো, পবনপুত্র সঙ্কটমোচন হনুমান কী জয়” শব্দে বীর বিক্রমে এগিয়ে আসতে লাগল।

    মন্দিরের সামনে এসে দু’পক্ষই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্ত শ্মশানের স্তব্ধতা।

    তারপরেই শুরু হলো তুমুল কলরব। সবার উপরে সেই মুহূর্তে জয়সোওয়ালের গলা, “একী! শিউজি এনেছেন কেন? লাস্ট উইকে কোথা তো হয়ে গেলো, মন্দিরে হনুমানজি বসবেন।”

    “কীসের কথা মশাই?”

    জয়ন্ত ধর মাস সাতেকের ছেলেকে কোলে করেই লাফিয়ে উঠলেন। ছেলের মাও ফল কাটতে কাটতেই ঘটনার গতিবিধির উপর চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সূক্ষ্ম নজর রাখতে লাগলেন।

    “মিটিংএ আমরা পরিষ্কার বলে দিয়েছিলাম যে এই মন্দির মহাদেবের হবে।”

    “শাট আপ, ইউ রাস্কেল। নো ওয়ান কেয়ারস ফর ইয়োর ওপিনিয়ন।” হনুমান পক্ষের, টমাস কুক ট্র‍্যাভেলের সংগে সদ্য আমেরিকা বেড়িয়ে আসা সুদীপ্ত ঘোষাল হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন।

    পাশ থেকে কনভেন্ট এডুকেটেড বলে গর্বিত মিসেস লাভলী ধর ইতিমধ্যে ফল কাটা থামিয়ে ভুরু কুঁচকে ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ইংরেজি শুনেই বোধহয় খেপে গিয়ে তিনিও তাঁর অসম্ভব সরু গলায় সানাইয়ের পোঁ ধরলেন, “ইডিয়টস। হু আর ইউ টু ডিসাইড? দিস টেম্পল ইস ওনলি ফর মাহাবীরজিউ। এই মন্দিরে হনুমান বসবে৷ বসবে বসবে। ব্যাস।” প্রবল উত্তেজনায় নিদান হাঁকার টোনে কথা কটি শেষ করে, আবার তিনি ঘূর্ণায়মান চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, কিঞ্চিৎ হাঁপাতে লাগলেন।

    বামদেব বাবুর মনে হলো ঠিক যেন রঙ্গমঞ্চ। কুশীলবরা আসছে আর ডায়লগ ঝাড়ছে। তবে কোনো রিহার্সাল নেই। ইনপ্রম্পটু। অসাধারণ!

    শিব মূর্তি মাটিতে রেখে এবার ছুটে এল ডাম্বেল ভাঁজা মস্তান টাইপের সোনু সিনহা, “একদম চুপ। আর একটা কথা বললে দাঁত ভেঙে দেব। মেয়েছেলে বলে রেয়াত করব না। হুঁঃ, ইংরেজি মারতে আমরাও পারি। যত্তসব উজবুক।”

    আর যাবে কোথায়? জয়ন্ত ধরের চোখ মুখ একেবারে রাগে লাল হয়ে উঠল। কিন্তু রেগে গেলে বেচারা ভয়ংকরভাবে তোতলাতে থাকে। তাই বুক অবধি ঠোঁট ঝুলিয়ে বার কয়েক “ ইউ” “ইউ” বলার পরে আর ফারদার এগোতে না পেরে দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছেলের পায়ের জুতোই একপাটি খুলে নিয়ে সোনুর মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল।

    আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেই জুতো পড়বি তো পড়, একেবারে কোশাকুশির মধ্যে। খানিকটা গংগাজল ছিটকে পুরুতের কোঁচা গেল ভিজে।

    “সর্বনাশ! সর্বনাশ হয়ে গেল। আজ আর মন্দির প্রতিষ্ঠা হলোনিইইই, হলোনি।”--উত্তেজনার মাথায় পুরুতঠাকুরের মুখ থেকে তাঁর কষ্টে শেখা কলকাত্তিয়া ভাষা মুছে গিয়ে আদি, খাঁটি ও অকৃত্রিম নিজস্ব যশুরে ডায়লেক্ট বেরিয়ে এল।

    চারিদিকে সব একেবারে চুপচাপ। কিন্তু সেটা এক মুহূর্তের। তারপরেই তুমুল গোলযোগ সৃষ্টি হলো।

    আর ঠিক সেই মুহূর্তে গামছায় হাত মুছতে মুছতে মেইন ভোগ রাঁধিয়ে পাচক নন্টাই, অন্য সময় যে মিস্তিরির কাজ করে, জিজ্ঞেস করতে এল যে খিচুড়ি তো নেমে গেছে, লাবড়া আর আলুভাজাটা কি সে এখনই বসিয়ে দেবে? কিন্তু জিজ্ঞেস করবে কী! অবস্থাগতিক দেখে তার তো একেবার বাক্যি হরে গেছে। জিজ্ঞেস করার জন্য সেই যে মুখ হাঁ করেছিল, সে হাঁ তেমনই রয়ে গেছে। আর বন্ধ হয়নি।

    এদিকে তো শিব মহাবীর দু’পক্ষই তুমুল চিৎকার জুড়েছে। প্রতিপাদ্য বিষয় একটিই। যাই হয়ে যাক, দু’পক্ষেরই দলীয় ঠাকুরকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। দু’পক্ষেই তুমুল গালিগালাজ, খিস্তির বন্যা চলতে থাকল।

    বামদেব বাবু আর সহ্য করতে পারলেন না। গিন্নির ক্রমাগত পাঞ্জাবির পকেট ধরে টানাটানিতেও তিনি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। স্টুডেন্টরা কোনো কারণে হাঙ্গামা বাঁধালে তাদের সামলানোর জন্য যে গলায় স্ট্রিক্টলি এবং ফার্মলি কথা বলতেন, আজ আবার উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে সেই গলাটি বের করলেন।

    উচ্চ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, “চুপ। চুপ করুন আপনারা। মন্দিরটি যখন ছোট, দুটি বড়ো মূর্তির স্থান সঙ্কুলানের অনুপযুক্ত, সেক্ষেত্রে দুটি মূর্তিকেই যেখান থেকে আনা হয়েছে, সেখানেই ফেরত দিয়ে আসা হোক। আর এই মন্দিরে একটা নতুন জলের পাম্প বসানোর ব্যবস্থা করা হোক।”

    আর যাবে কোথায়! দু’পক্ষই যেন তাঁকে কামড়াতে ছুটে এল।

    এবং দু’পক্ষই বামদেব বাবুর মতের বিরোধিতা করে তুমুল হট্টগোল শুরু করে দিল। সবার উপরে শিবের দলের পানিগ্রাহীর চেরা বাঁশের মতো চিৎকারে ক্রমে কান পাতা দায় হয়ে উঠল।

    তা কার দায়, কার নয় তাতে পানিগ্রাহীর ভারি বয়েই গেছে। কাংস্যবিনিন্দিতকন্ঠে চারদিক প্রকম্পিত করে সে বলতে থাকল, “আর কোনো কথা নয়। কেউ কোনো পরামর্শ দেবে না। এখন শুধু কাজ। এই চলো সব, শিবঠাকুরকে মন্দিরে স্থাপিত করতে হবে। সবাই বলো, জোরসে বলো… জয় শিব শম্ভু! হর হর মহাদেব, ব্যোম ভোলে।” আর সঙ্গে সঙ্গে শিব পার্টি শিব মূর্তি মন্দিরে বসাতে রইরই করে ছুট লাগালো।

    “ক্যা দেখ রহে হো? যত উজবুকের দল। বসাও মহাবীরকে মন্দিরে।” পবন কেজরিওয়ালের দাঁত খিঁচুনি খেয়ে মহাবীর পার্টিও হইহই শব্দে হনুমানের মূর্তি মন্দিরে ঢোকাবার চেষ্টা করতে লাগল।

    অল্প জায়গায় দুই মূর্তির তুমুল ধাক্কধাক্কি শুরু হলো। ফলস্বরূপ দেখা গেল শিবের মাথার সাপের ফণা আধখানা হয়ে রায় বাবুর পায়ের ঠিক বুড়ো আঙুলটার উপর ছিটকে এসে ঠক করে পড়ল।

    আর শিবের ভয়ংকর ধাক্কায় হনুমানের হাতের ভেঙে যাওয়া গন্ধমাদনের টুকরোর ছোট এক পিস চিপস মাথায় লেগে সোমনাথ মিশ্রের পাঁচ বছরের মেয়ে সোনিয়া গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল। আর সেটা তো স্বাভাবিকও।

    কিন্তু 'ধর্ম'ক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে সমবেত যুযুৎসবরা এসব সামান্য ব্যাপারে মাথা ঘামান না। এখন লড়াই ধর্মসংস্থাপনের। তাই ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য তাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন। জয়সোওয়ালের “মূর্তি খণ্ডিৎ হো গয়া” বলে মৃদু আপত্তি পাঞ্চজন্যের তুমুল শব্দে ভেসে চলে গেল।

    প্রাণপণ চেষ্টায় দু’পক্ষই নিজ নিজ প্রতিমাকে, সামান্য ভেঙেচুরে গেলেও কোনাকুনি ভাবে ঠেসেঠুসে ওই মন্দিরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে লাগল। যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ।

    আনন্দে মহিলারা উলু দিতে লাগলেন। আর সে কী কান ফাটানো উলু! সুতপার আগ্রহে বামদেব বাবু স্ত্রীকে নিয়ে একদা সংঘর্ষ নামে একটি সিনেমা দেখতে গেছিলেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার এই ভয়ংকর উলুর কাছে সংঘর্ষ সিনেমার আশুতোষ রানার সেই বিখ্যাত রক্ত হিম করা উলুও ফেল করে গেল।

    আর সেই উলুর ধাক্কায়ই বোধহয়, এতক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে থাকা পুরুত মশাইও মহোৎসাহে যেন নাচতে লাগলেন। তিনি এই ঘন্টা বাজান, এই শাঁখ বাজান, আর তাঁর মুখনিঃসৃত ভুলভাল মিশ্র মন্ত্রের অনর্গল স্রোত তো আছেই। সে এক জবরদস্ত মূর্তি প্রতিষ্ঠা!

    বসে থেকে এসব অবৈদিক ক্রিয়াকলাপ বামদেব বাবুর পক্ষে দেখা আর সম্ভব হলো না। আস্তে আস্তে চুপচাপ কাউকে কিছু না বলে তিনি বাড়ির দিকে রওনা হলেন। ফ্ল্যাটে যাবার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতেও বামদেব বাবু রেহাই পেলেন না। জবরদস্তি পুরুতের পাঁচমিশালি 'মন্ত্র' তাঁর কান জ্বালিয়ে দিতে লাগল, যার মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গানের ধুয়োর মতো একটি শব্দই চলছে, 'ইহ গচ্ছ, ইহ গচ্ছ'। কে যে কোথায় যাবে কে জানে!



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)