• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গল্প
    Share
  • সাফাই অভিযান : দেবাশিস দাস



    সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম চারদিকে হইহই কাণ্ড চলছে। পাশের বাড়ির দেবুদা নাকি দোতলার বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পেছনের বাগানে এক চোরকে ধরাশায়ী করেছে। আমি তো শুনেই একছুট্টে অকুস্থলে। চেঁচামেচি, হল্লাগুল্লার পর লোকজন জড়ো হয়ে চোরকে যখন উত্তমমধ্যম দেবার জন্য উদ্যত, তখন দেখা গেল লোকটা চোর নয়। ওই বাগানের দারোয়ানের ভাই। গতকাল দেশ থেকে এসেছে। অভ্যেসবশত প্রাতঃকৃত্য করার জন্য বাগানের এদিকের পাঁচিলের পাশে আগাছার মধ্যে জায়গা খুঁজছিল। ভোর বেলার অস্পষ্ট আলোতে দেবুদা তাকে চোর ভেবেছে এবং নিজের দোতলার ঝুল-বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে ‘ক্যাচ কট কট’ করেছে। দেবুদা ফার্স্ট ডিভিশনের ক্রিকেট খেলোয়াড়। আগের দিন একটা হাফ সেঞ্চুরি করে বেশ উৎফুল্ল ছিল। সেই না থিতোনো উত্তেজনার বশেই বারান্দা থেকে লাফ দিয়েছিল সে। চোর তো ছাড়া পেয়ে কোষ্ঠকঠিন মুখ নিয়ে তার নিজের প্রকোষ্ঠে, থুড়ি ঝুপড়িতে ঢুকে গেছে, আর দেবুদা পা-মচকিয়ে বিছানায়। সিজনের বাকি ম্যাচগুলোয় অনিশ্চিত। জনতাও খুব আশাহত। রবিবারের সকালের এরকম একটা হাতের সুখ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে কারই বা ভালো লাগে। তাছাড়া ছুটির দিনের সকালের ঘুমটাও চোখছাড়া ততক্ষণে।

    আমি আশাহত হয়ে বাড়ি ফিরে শুনলাম নন্দুমাসি বলছে, চোর নাকি সত্যিই এসেছিল কাল রাতে। টাইগার, মানে এবাড়ির কুকুর, ঘুমোচ্ছিল। চোর নাকি আর কিছু না পেয়ে ছাদের জলের ট্যাঙ্কির লোহার ঢাকনা, টাইগারের খাবারের থালা-বাটি নিয়ে চম্পট দিয়েছে। নন্দুমাসি আর কাউকে না পেয়ে টাইগারকেই বলল--জার্মান শেফার্ড ডগ’ হল শিকারি কুকুর, তাদের বংশধর হয়ে তুই ভোঁস ভোঁস করে ঘুমুবি? আর চোর সব সাফ করে দেবে?

    টাইগার যারপরনাই লজ্জিত হয়ে সামনের থাবায় মুখ লুকালো। আবার ঘুমিয়ে পড়ল কিনা বোঝা গেল না।

    কাজের মেয়েটি বলল, বাড়ির কুকুর নাকি নিজের প্রভুর অভ্যাসই পায়। ‘প্রভু’ মানে মাসির কলেজে পড়া বড়ছেলে লালুদা--তখন সবে বিছানায় ‘ভোরবেলা এত চেঁচামেচি কিসের, একটু ঘুমোতে দেবে না এরা’ বলে চোখ মেলেছে। ঘড়ির কাঁটা অবশ্য ন’-এর ঘর পেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। কাজের-মেয়ের মাণিক্যের মত বাক্যটা লালুদা শুনে ফেলেছে কিনা কে জানে, তাড়াতাড়ি বাসন মাজতে সে কলতলায় চলে গেল।

    স্কুল পর পর চার দিন বন্ধ থাকাতে নন্দুমাসির বাড়ি এসেছি গতকাল। আমাদের বাড়ি থেকে বেশি দূর নয় বলে প্রায়ই আসি। এপাড়াতেও আমার বন্ধুবান্ধব প্রচুর। নন্দুমাসি আমার খুব প্রিয় কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন। তার ফর্সা, গোলগাল, স্নেহময়ী চেহারার মধ্যে যে একজন কড়া ধাতের মানুষ লুকিয়ে আছে আপাতদৃষ্টিতে তা একদম বোঝা যায় না। ভালো নাম মাসির একটা আছে নিশ্চয়ই, তবে ‘নন্দু’ নামে সে এত পরিচিত যে সেই ভাল নাম হয়ত তার নিজেরই আর মনে নেই। নন্দুমাসি এক একটা জিনিস নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে এবং সেটা সম্পন্ন করে ছাড়ে। এই যেমন আজকাল ক্ষেপেছে বাড়ি ঘর ও চারপাশের পরিচ্ছন্নতা বা সাফাই নিয়ে। আমি কাল আসতেই বলল-- ভেকু, তুই একদিন আগে আসলে একটা বিরাট কাজ করে এপাড়ার ইতিহাসে নাম লেখাতে পারতিস। পাড়ার ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে আমরা সামনের ছোট মাঠটা সাফ করলাম। এরপর থেকে বাচ্চারা খেলবে। কেউ এখানে আর ময়লা ফেলবে না।

    ‘ভেকু’ নামটা আমারই। ভেকের সঙ্গে আমার চেহারার কোন মিল পেয়ে নামটা রাখা হয়েছিল কিনা জানা নেই। তবে নিকটআত্মীয় মহলে এই নামটাই চলে। যাই হোক, জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সত্যি ময়লা ফেলার মাঠটা বেশ পরিষ্কার লাগছে। একটু আফসোস যে হোল না তা নয়। ইতিহাসে নাম তুলতে না পারার জন্য নয়, মাসি কাজ করার পর সবাইকে ভালোমন্দ খাওয়ায়। একটা ভালো খ্যাঁটন ফসকে গেল সেই জন্য।

    সাফাই নিয়ে নন্দুমাসি এখন এতটাই জড়িয়ে পড়েছে যে ‘সাফাই’ কথাটা দৈনন্দিন কথপোকথনের মধ্যেও ব্যবহার করে ফেলছে। এই যেমন ‘চোরটা বেশি মালপত্র সাফ করতে পারেনি’। ‘দেবু চোরকে সাফ করতে পারল না’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

    --হল্লাগুল্লার মধ্যে দারওয়ানের ভাইটার কিন্তু আজ পেট সাফ হল না নন্দু। সেটাও ভাবো। মেসো এতক্ষণ চুপ ছিল, আর থাকতে না পেরে ফুট কাটল।

    মাসি কটমট করে তাকিয়ে মেসোকে বিদ্ধ করল।

    সকাল আরও কিছুটা বাড়তেই পাশের বাড়ির আনন্দদা বৈঠকখানায় ঢুকল। ব্যাকব্রাশ করা চুল, ধবধবে গায়ের রং, বেশ গর্বিত ভঙ্গি। সাদা দাঁতের পাটি বিকশিত। চোখেমুখে তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে বলল--শুনলাম ভেকু এসেছে? কোথায় সে? আজকে দেখিয়ে দেব ক্যারাম খেলা কাকে বলে? ওকে নীলে গেম দেব।

    এ তো খোলা চ্যালেঞ্জ! আনন্দদা কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। পাড়ার ক্যারাম চ্যাম্পিয়ন। এ-বাড়িতে নতুন ম্যাচ বোর্ড আসার পর প্রতি রবিবার সকালে এখানে খেলা হয়। সবাইকে হারিয়ে বেশ মজা পায় সে। তবে বলতে নেই আমি ক্যারামটা ভালোই খেলি। বোধ হয় নন্দুমাসি কখনও সেটা আনন্দদাকে বলেছিল। তাই আমাকে হারিয়ে তুরীয় আনন্দ পেতে এসেছে আজ। এরকম এক আলেকজান্ডারসুলভ লোকের কাছে আমি অন্তত ‘পুরু’ হয়ে বীরের মত সম্মান আশা করি। কিন্তু ও সারাক্ষণ নিজের বারফাট্টাই করে আর অন্যদের তাচ্ছিল্য করে। এবাড়িতে কিছুদিন আগে ম্যাচ বোর্ড কেনার পর থেকেই ও অপেক্ষায় আছে কবে আমি আসব আর ও আমাকে সবার সামনে ওর ভাষায় ‘জবাই’ করবে।

    নন্দুমাসিও আমাকে বলে রেখেছে আজ আনন্দকে হারাতেই হবে ভেকু। ওর মনের সব অহংকার সাফ করে দেব।

    বাইরের রকে ক্যারাম বোর্ড পাততে পাততে হঠাৎ চিৎকার শুনলাম ‘বাবা কচ, বাবা কচ।’ ওপাশে জমে উঠেছে দাবা। মেসো আর লালুদা খেলছে। ভুলু পাশে বসে চিৎকার করছে। কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে ‘কচ’ ‘কচ’ ব্যাপারটা আমার মনের মধ্যে ‘খচ’ ‘খচ’ করতে লাগল। নন্দুমাসি এসে ব্যাপারটা জলের মত পরিষ্কার করে দিল। লালুর একটা বদভ্যাস হল, উত্তেজনায় ও আঙ্গুল চোষে। এখন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ মুখের ভেতরে থাকাতে ওর জিভের চলন সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাই এই উচ্চারণ বিভ্রাট। ও বলতে চেয়েছে ‘বাবা গজ, তোমার গজ সামলাও।’ বললাম--মাসি ভুলুর এই বদ-অভ্যাসটাও কিন্তু সাফ করতে হবে।

    --ঠিক বলেছিস। না হলে আঙ্গুলটাই সাফ করে দেব ওর হাত থেকে।

    ভুলু একটু শিউরে উঠল মনে হল। আমি বেশ মজা পেলাম আর আমার মনের ভয় ভয় ভাবটাও অনেকটা সাফ হয়ে গেল। আজ ক্যারামে একটা লড়াই দিতেই হবে।

    ক্যারাম খেলতে গিয়ে দেখলাম সেই সকালে চোর ধরা থেকে শুরু করে আজ সবই উদ্ভট কাণ্ড হচ্ছে। আমার সব ঘুঁটি সঠিকভাবে পকেটে ঢুকে যাচ্ছে। আনন্দদা আমার সঙ্গে একেবারেই এঁটে উঠতে পারছে না। আনন্দদা চ্যাম্পিয়ন, তার এই অবস্থা? অনেক লড়েও সুবিধা করতে না পেরে চ্যাম্পিয়ন চ্যালেঞ্জ হেরে নিরানন্দ মুখ নিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে বাড়ি ফিরল। মাসির ভাষায় ‘সব আহঙ্কার সাফ হল’।

    দুপুরে খেতে বসার আগে হঠাৎ ভুলু প্রায় ডুকরে উঠল---মা আমাদের নতুন ক্যারামটা এরকম হল কি করে?

    এবারে আসল ব্যাপারটা বোঝা গেল। রাতে ইঁদুর মাসির ঘরে ঢুকে ঘর নোংরা করে। ঘর সাফ রাখতে গেলে ইঁদুর আটকাতে হবে। গতরাতে ইঁদুর আটকানোর জন্য হাতের সামনে কিছু না পেয়ে নতুন ক্যারামবোর্ডটা বাইরের গ্রিলের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল নন্দুমাসি। সেটা করেই যত ক্ষতি হয়েছে।

    লাভও হয়েছে বলা যায়। নিখুঁতভাবে ইঁদুরটা তার কাজ সম্পন্ন করেছে দাঁত দিয়ে কেটে কেটে ক্যারামবোর্ডের মেঝের দিকে থাকা পকেটদুটো একটু একটু বড় করে। এত সূক্ষ্ম কাজ যে খুব কাছ থেকে মনোযোগ সহকারে না দেখলে ব্যাপারটা বোঝার উপায় নেই। ইঁদুর আটকানো যায়নি বটে, তবে আমার জেতাও আটকানো যায়নি। খেলার সময় বড় হওয়া পকেটদুটো আমার সামনের দিকে থাকাতে সব ঘুঁটি পটাপট পকেটে ফেলছিলাম। আর বেসের পকেট দুটো একই থাকলেও আমি বেসে স্ট্রং হওয়াতে সেখানকার ঘুঁটি পকেটে ফেলতে অসুবিধা হয়নি। আনন্দদার সামনের পকেটদুটো স্বাভাবিক আকার থাকার জন্য ও এই বিশেষ সুবিধা পায়নি। হেরে আনন্দদার অহং সাফ হয়ে গেছে।

    আমি ইঁদুরের বদান্যতায় চ্যালেঞ্জ জিতে হিরো। নন্দুমাসি বলল--ভুলু কাঁদিস না। ক্যারাম আর একটা আসবে। কিন্তু ইঁদুরের কথা কাউকে বলবি না। আজ ভেকুর আনন্দ-সাফাই সেলিব্রেট করা দরকার। নতুন সিনেমা লেগেছে পাড়ার হলে, চল সবাই দেখে আসি।

    সবাই বলতে নন্দুমাসি আমি ও ভুলু। লালুদা এখন আর মায়ের সঙ্গে সিনেমায় যায় না। মেসো তো সিনেমা দেখেই না। ভুলুর ফাইভের পরীক্ষা শেষ আর আমি যদিও মাধ্যমিকের প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থী তবে আমার টেস্ট পরীক্ষার দেরি আছে। তাছাড়া আমি তো বেড়াতেই এসেছি।

    বিকেলে যথাসময়ে আমরা পাড়ার হল ‘ছায়ারূপ’-এ উপস্থিত হলাম নন্দুমাসির সঙ্গে। হলে বেশ ভিড়। মাসি বলল--দেখ ভেকু সিনেমা হলেও যেখানে-সেখানে বাজে কাগজ ফেলে বা অন্য কিছু ফেলে নোংরা করবি না। গান্ধীজী বলেছেন--পরিচ্ছন্নতাই ভগবানের পূজা।

    --কিন্তু মাসি এত নোংরা এই পাড়ার হল, সকলে মিলে পরিষ্কার করলেও এখন কিছু করা যাবে না। আমি কোনরকমে বললাম।

    --যা বলছি কর, নোংরা ডাস্টবিনে ফেলবি। মাসির কড়া নির্দেশ।

    --এখানে তো কোন ডাস্টবিন নেই মাসি। যেটা আছে সেটা রাস্তার ওপাশে কর্পোরেশনের ভ্যাট। সেটা তো অনেক দূরে, আর সেটাও উপচে পড়ছে। রবিবার বলে আজ সাফাই হয়নি। আমি সাফাই গাইলাম।

    --এখানে ডাস্টবিন নেই? বলিস কি? সিনেমা হলে আজ থেকেই সাফাই অভিযান শুরু করব। একবার বাবলাকে ডাক। নন্দুমাসি কাজ পেয়ে খুশি মনে হল।

    বাবলা হলো এখানকার টর্চম্যান। টর্চ দেখিয়ে টিকিট নাম্বার দেখে সিটে দর্শকদের বসায়। মাসির কয়েকটা বাড়ি পরে থাকে। আমি তাকে ভালোই চিনি। আগের শো এখনো ভাঙেনি। কাজেই হলে এখন তার কাজ না থাকাতে সে টিকিট কাউন্টারে কোন একটা কাজ করছিল।

    তাকে ডেকে আনতে মাসি রাগত স্বরে বলল--বাবলা এক্ষুনি একটা ঝুড়ি বা কিছুর ব্যবস্থা কর। লোককে বল যেখানে সেখানে নোংরা ফেলা চলবে না। লোকজন যেন ওই ঝুড়িতেই নোংরা ফেলে।

    এসব আশ্চর্য কথা বাবলা কস্মিনকালেও শোনেনি। কোনরকমে বলল--মাসিমা ক-কে শুনবে আ-আমার কথা? আর ঝু-ঝুড়িই বা এখন পাব কোথায়? লোকজন এন্তার খা-খাচ্ছে। ঝালমুড়ির ঠোঙ্গা, বা-বাদামের খোলা সব তারা যেখানে সেখানে ফে-ফেলছে। আঁতকে উঠে কথা আটকে যেতে লাগল বাবলার।

    --তুমি এখনই একটা ঝুড়ি নিয়ে এসো। বেতের হলেই ভালো। না হলে যে অন্য কিছুও চলবে, কাল আমি একটা ঝুড়ি দিয়ে দেব তোমাদের। কিন্তু এখন তো কোন একটা ব্যবস্থা করো। যাও শিগগিরই, না হলে আমি হল মালিককে বলব আমার কথা শোনা হয়নি।

    মাসি যে কি বলে? হল-মালিক কোথায় যে তাকে বলবে। তিনি কি রোজ হলে এসে বসে থাকবেন?-- মনে মনে হাসলাম আমি।

    --ঠিক আছে ম-মাসি, দেখছি ক-কোথায় কি পাওয়া যায়? থতমত খেয়ে বাবলা উধাও হল।

    হলের বন্ধ দরজার ওপারে সিনেমা চলছে, বই প্রায় শেষের দিকে পৌঁছেছে বলে বেশ উচ্চস্বরে ড্রামা চলছে। প্রজেক্টর আর ফ্যানের আওয়াজ ছাপিয়ে কলাকুশলীদের ডায়লগ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। হল উপছে বাইরেও বেরিয়ে পড়ছে কিছু কিছু।

    বন্ধ দরজার বাইরে দর্শকদের ভিড় জমেছে পরের শোয়ের জন্য। লোকজন গল্প করতে করতে বাইরে লাগানো সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্যের ছবিগুলো দেখছে। আমিও তাই দেখছিলাম, হঠাৎ উচ্চগ্রামে মাসির গলা পাওয়া গেল।

    --শুনছেন, আপনাদের হাতে ঠোঙা, খাবারের অংশ যেখানে-সেখানে ফেলবেন না। আমি বলেছি কিছু একটা নিয়ে আসতে, তাতে ফেলবেন। একটু ধৈর্য ধরে হাতেই রাখুন এখন। আমরা আমাদের নিজেদের জায়গা একটু পরিষ্কার রাখতে চাই।

    --কি বললেন? কোথায় রাখব ঠোঙা, শসার কুচি, বাদামের খোলা? সব কি পকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে যাব?

    --কেউ এখানে ফেলবেন না। ওই তো বাবলা এসে গেছে ওর হাতে যেটা আছে সেটার মধ্যে ফেলবেন।

    বাবলা আসতে দেখা গেল ওর হাতে ছোট্ট একটা পিচবোর্ডের বাক্স।--মাসি, ঝু-ঝুড়ি পেলাম না।

    --ঝুড়ি ঝুড়ি মিছে কথা বলো না। খোঁজোইনি ঠিকমত।

    --সত্যি বলছি মাসি।

    --ঠিক আছে আজ তাহলে দয়া করে আপনারা এই বাক্সতেই ময়লা ফেলুন। যদিও একটু ছোট হয়ে গেল। তবু শুরু তো করা যাক। প্রথমেই মাসি কি একটা বাক্সে ফেলে একটু মক্সো করে সবাইকে দেখিয়ে দিল যেন।

    দু-একজন লোকও মাসির দেখাদেখি বাক্সে ময়লা ফেলল।

    একটা বাচ্চা আইসক্রিমের কাপ এক কোণে ফেলতেই মাসি তার মাকে ধমক দিল। --বাচ্চাকে শেখাবেন, কোথায় কি ফেলতে হবে। এরাই দেশের ভবিষ্যৎ।

    ইতিমধ্যে ছোট বাক্স ভরে উপছে পড়তে লাগল ময়লাপত্র।

    --এই যে ম্যাডাম, আর তো ফেলা যাচ্ছে না। উপছে বাইরে পড়ছে, এবারে কি করব?

    আরেকজন বলল--মাসিমাকে দিয়ে দিন। উনি বাড়ি নিয়ে যাবেন। পুরনো ময়লা কাগজ বিক্রি করলে কিছু পয়সাও আসতে পারে।

    --কে বলল কথাটা?

    কেউ উত্তর দিল না।

    --নিজেরা না শিখলে কেউ শেখাতে পারবে না। অশিক্ষিত থেকে যাবেন সারাজীবন--মাসির আওয়াজ বেশ জোরালো।

    --কি বললেন? সবাইকে অশিক্ষিত বললেন? মহিলা বলে কিছু বলছি না অন্য কেউ হলে…। ভিড়ের মধ্যে থেকে কারো গলা শোনা গেল।

    --কি করবেন কি আপনি?… দেখা যাবে কি করতে পারেন। বাবলা, কালকে আমি একটা বড় ঝুড়ি এনে দেব এখানে রাখার জন্য।

    এদিকে ওই বাচ্চার মায়ের সঙ্গে আরও দু-এক জন মহিলাও এগিয়ে এল নন্দুমাসির দিকে রণং দেহি মূর্তিতে। বচসা দিয়ে শুরু হয়ে প্রায় হাতাহাতির জোগাড়। আমি প্রমাদ গণলাম। মাসিকে কোনোরকমে টেনে ভিড় থেকে বার করার চেষ্টা করছি। আর বোধহয় সামলাতে পারব না। এমন সময় হলের দরজাটা খুলে গেল। শো শেষ হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলাম পর্দায় টাইটেল দেখাচ্ছে আর লোকজন বের হতে শুরু করেছে।

    এই সুযোগ, মাসির হাত ধরে টেনে এক কোণে নিয়ে গিয়ে বললাম--সরে এসো মাসি, লোকজন বের হচ্ছে। অন্যান্যরাও সরে গেল লোকজনকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য।

    ভালোই ভিড় ছিল এই শো-তে, ছুটির দিন বলে।

    ভিড়ের মধ্যেই দূর থেকে দেখলাম কারো পা লেগে ওই পিচবোর্ডের বাক্সটা কাত হয়ে গেছে আর ভেতরের ময়লা কাগজপত্র বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের পায়ে পায়ে তা আরো ছড়াচ্ছে।

    মাসিকে অন্যপাশে নিয়ে গেলাম যাতে এ দৃশ্য দেখতে না পায়, দেখলে আবার কি করবে কে জানে। বেশ কিছুক্ষণ পরে ভেতরের ভিড়টা পাতলা হয়ে এলো। দেখলাম বাইরে অপেক্ষমান ভিড়টা ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। কারো যেন তর সইছে না। সবাই আগে যেতে চায়। ধাক্কাধাক্কিতে ঝগড়াও লাগল একবার।

    নন্দুমাসি ডিসিপ্লিন চায়। সবাইকে বোঝাতে চাইছিল, টিকিটে সিট নম্বর অনুযায়ী সবাই বসবে। আগে গেলে আগে বসবে সেরকম ব্যাপার নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

    আমি আর ভুলো লাইনে দাঁড়িয়ে খোলা দরজা দিয়ে দেখলাম ভেতরের স্ক্রিনে এডভার্টাইজমেন্ট দেখানো শুরু হয়ে গেছে। হল অন্ধকার।

    এরও খানিকক্ষণ পরে আমরা হলে ঢুকলাম। স্ক্রিনের আলো ছাড়া কোন আলো নেই। কোথা থেকে টর্চম্যান এসে গেল। --মাসিমা টিকিট দেখান। কোন সিট দেখি? দেখলাম বাবলা। নিজের জায়গায় বাবলা এখন আত্মবিশ্বাসী। কোন কথা আটকে যাচ্ছে না ওর।

    ততক্ষণে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে, গ্রামের রাস্তায় নায়িকা কলসি কাঁখে বাড়ির পথে। দূর থেকে গ্রামের কয়েকজন বদ ছেলে তাকে দেখছে। আমি মনোযোগ দিয়ে হলের প্যাসেজে দাঁড়িয়ে দেখছি সেই দৃশ্য।

    ইতিমধ্যে হলের মধ্যে আরো কয়েকজন দর্শক বাবলাকে তাদের দিকে ডাকছে, সিট দেখিয়ে দেবার জন্য। এমন সময় বাবলার চিৎকার শোনা গেল--মাসিমা এটা কি দিলেন?

    --কেন সিনেমার টিকিট।

    --এটা কিরকম টিকিট?

    --তোমাকে দিলাম তো। কাউন্টার থেকেই তো কাটলাম।

    --আরে এ তো টিকিটই নয়।

    --টিকিটই তো। হাতে রেখেছিলাম। দুমড়ে গেছে বোধহয়। ভালো করে দেখো।

    --না না, এটা তো একটা বাদামের ঠোঙা। একটা না খাওয়া বাদামও আছে দেখছি। তাছাড়া এই ঠোঙাটা বাক্সে ফেলেননি কেন?

    --বাদামের ঠোঙা এখানে আসবে কি করে? সেটা তো তোমার ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দিলাম। নন্দুমাসির সোজাসাপ্টা জবাব।

    এদিকে পেছনে বেশ ভিড় হয়ে গেছে। সবাই যার যার টিকিট দেখিয়ে তাড়াতাড়ি নির্ধারিত সিটে বসতে চায়।

    পিছন থেকে একজন মাসিকে চিনতে পেরে বলল--সে কি আপনি নিজেই ফেলেননি নিজের ঠোঙা? এরই মধ্যে গণ্ডগোল দেখে হলের ম্যানেজার এসে গেছেন---ম্যাডাম আপনারা একটু বাইরে আসুন। বাকিদের সিনেমা দেখতে দিন। তারপর টিকিট দেখিয়ে আবার ঢুকবেন।

    মাসি হাত ধরে টেনে আমাকে আর ভুলুকে বাইরে নিয়ে এলো। আমার টাইমিংটা সত্যিই খারাপ। সবে নায়কের আবির্ভাব হয়েছে নায়িকাকে বাঁচাতে। এই সময় বেরিয়ে যেতে হচ্ছে। কথায় বার্তায় বোঝা গেল মাসি উত্তেজনার বসে ঠোঙা ভেবে সিনেমার টিকিটটা ময়লা ফেলার বাক্সে ফেলে দিয়েছে আর টিকিট ভেবে ঠোঙাটা যত্ন করে হাতে করে রেখেছে।

    নন্দুমাসি তবু একটুও না দমে নিজেই বলল--এত কথার কি আছে? নোংরা ফেলার বাক্সতে যদি ভুল করে টিকিট ফেলে দিয়ে থাকি তবে ওখানে গিয়ে দেখা যাক, টিকিট ঠিক পাওয়া যাবে। বাক্সের খোঁজ পড়ল।

    --কোথায় সেই বাক্সটা? ওই কোণেই তো ছিল।

    কাছে গিয়ে দেখা গেল বাক্স একদিকে থেঁতলে পড়ে আছে। আর সমস্ত নোংরা মানুষের পায়ে পায়ে সিনেমা হলের সামনেটায় ছড়িয়ে আছে।

    সাফাই অভিযানের কি করুণ অবস্থা। মাসির নিজেরই সিনেমা দেখা হবে না মনে হচ্ছে। নাছোড়বান্দা ম্যানেজার বলল--দেখান, কোথায় আপনার টিকিট? নিজেই বার করুন আর যতক্ষণ পর্যন্ত না টিকিট দেখাচ্ছেন, ততক্ষণ হলে ঢুকবেন না। বলিহারি যাই আপনার, টিকিট কাটলেন না অথচ বাদামের ঠোঙা নিয়ে বাচ্চা-শুদ্ধ হলে ঢুকে গেলেন?

    আমাকেও বাচ্চা বলছে? ‘এই আমি বাচ্চা না’ প্রাণপণে বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বের হলো না। লোকজন আমাদের দেখছে। বেশ লজ্জাই করছে।

    --এখানে সিন ক্রিয়েট করবেন না। সোজা বাড়ি যান। এরপরে সিনেমা হলে এলে আর এসব সাফাই-ঝামেলা করবেন না। কঠিন স্বরে বলল ম্যানেজার।

    সিন ক্রিয়েট করছি? সিন তো ভেতরে হচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি কই? মনে মনে বললাম। কি কুক্ষণেই না মাসি সাফাই অভিযান শুরু করেছিল। এখন নিজেরাই সিনেমা হল থেকে সাফাই হয়ে যাচ্ছি।

    --এলেবাবা এ-তো কলাধাক্কা। ভুলুও উত্তেজিত।

    --কলা কোথায় পেলি রে? আমি বোঝার চেষ্টা করলাম ভুলুর দিকে তাকিয়ে। দেখলাম উত্তেজনায় ওর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ মুখে চলে গেছে। বুঝলাম কী বলতে চাইছে।

    দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এতক্ষণে বোধহয় নায়কের সঙ্গে বদ ছেলেগুলোর ফাইট শুরু হয়ে গেছে। ধুপধাপ আওয়াজ আসছে ভেতর থেকে। দরজা অনেকক্ষণ বন্ধ হয়ে গেছে। কপালটাই খারাপ। বেজার মুখে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছি। এত আগে বাড়ি গেলে হয়ত মেসোর কাছে অঙ্ক নিয়ে বসতে হবে। মেসো আবার অঙ্কের টিচার। সন্ধ্যে হলেই তাকে অঙ্কে পায়। তার সঙ্গে যদি আমায় পায় তো কথাই নেই। চোখমুখ দেখে মনে হল মাসি বেশ অপমানিত। মাসির সঙ্গে সিনামাতে এলে সাধারণত এখানকার বিখ্যাত ‘সোনালি কেবিন’ থেকে মোগলাই পরোটা খেয়ে বাড়ি ফেরা হয়। আজ তারও কোন চান্স নেই। ভাবলাম এর চেয়ে আনন্দদা জিতলেই বোধ হয় ভাল হত আজ।

    --কানাই বাবু, এদিকে কি হয়েছে? চেঁচামেচি কেন? ঢোলা কোট-প্যান্টুলুন পরা, নেয়াপাতি ভুঁড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক থপর থপর পা ফেলে এগিয়ে এলেন।

    --আরে স্যার, আপনি আবার বের হলেন কেন, সিনেমা দেখুন না। কানাইবাবু মানে ম্যানেজার প্রায় হাত কচলাতে কচলাতে, গলায় মধু ঢেলে বলল। তার গলার একটু আগের কাঠিন্য মুহূর্তে দূর হয়েছে।

    --না না আমি তো আজ আপনাদের কাজকর্ম দেখতেই এসেছিলাম, সিনেমা দেখতে নয়।

    --জানি স্যার। আপনি হলেন হল মালিক। আপনাকে তো রিপোর্ট করতেই হবে। দেখুন না, এই ভদ্রমহিলার টিকিট নেই, কিন্তু হলে ঢুকে পড়েছিলেন বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। যাকগে, আপনি স্যার সিনেমা দেখুন আমি ম্যানেজ করে নেব।

    বারবার বাচ্চাদের মধ্যে আমাকে ফেলাতে বেশ মর্মাহত হলাম। কিছু বলতে পারলাম না যদিও। যতবারই বাচ্চা কথাটা উঠছে, ততবারই লোকজন আমাকে জরিপ করে নিচ্ছে। আর আমি লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছি।

    নন্দুমাসি ম্যানেজারের এই কথায় আরো অপমানিত বোধ করল। বলল--টিকিট? টিকিট তো ছিলই। এখন পাচ্ছি না।

    --পাবেন কি করে? যা করলেন আজ। এবার বাড়ি ফিরুন। কানাইবাবু আবার কঠিন গলায় একটু প্রতিশোধস্পৃহা দেখালেন যেন।

    --আচ্ছা কানাইবাবু, ইনিই তো সেই মহিলা, যিনি সবাইকে এক জায়গায় ময়লা ফেলতে বলছিলেন? এনাদের টিকিট কি হল’? হল মালিক যেন এতক্ষণে মাসিকে চিনতে পারলেন।

    --উনি বলছেন টিকিটটা ঠোঙা ভেবে নোংরা ফেলার বাক্সে ফেলে দিয়েছেন।

    --তাই নাকি? ম্যাডাম আমি খুবই দুঃখিত। কাল থেকে ময়লা ফেলার ঝুড়ি এখানে থাকবে, আমি কথা দিচ্ছি। সবাই যাতে ঠিক জায়গায় নোংরা ফেলে, সেটাও এরাই দেখবে। আপনি আজকে যেটা করলেন সেটা আমাদের সকলেরই চোখ খুলে দেবে আশা করি। আমি অন্তত আপনার শুরু করা কাজ সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করব। ভদ্রলোককে সত্যি লজ্জিত মনে হল।

    --ব্যাস। তাহলেই আমার প্রচেষ্টা সার্থক হবে। আমি শুধু এটুকুই চাই। চল রে ভেকু।

    আমার উপলচন্দ্র নামটা কি ভুলেই গেল সবাই? এই ভিড়ের মাঝখানে ওই নামটা না নিলেই নয়? দুঃখিত মনে আমরা বাড়ির পথে হাঁটা দেব দেব করছি, ঠিক তখনই শুনলাম হল মালিক বলছেন -- কানাইবাবু, আমি দেখেছি ইনি টিকিট কেটেছিলেন। আমি তখন টিকিট কাউন্টারে আপনাদের কাজ দেখছিলাম। যাই হোক, ভেতরে তো টিকিট ছাড়া সিট নাম্বার পাওয়া যাবে না। তাছাড়া এখন অন্ধকারে খালি সিট খুঁজতে গেলে অন্য দর্শকদের খুবই অসুবিধা হবে। আমি দেখেছি ওপরে ব্যালকনিতে এখনও কয়েকটা সিট খালি আছে। ওনাদের ওখানে নিয়ে গিয়ে বসান। ম্যাডাম, দয়া করে কানাইবাবুর সঙ্গে যান। আবার বলছি আমি খুব দুঃখিত।

    --না, না আপনি দুঃখিত হবেন কেন, দোষ তো আমারই। খারাপ লাগছিল এই বাচ্চারা সিনেমাটা দেখতে পেল না বলে। নন্দুমাসিকে এই প্রথম লজ্জা পেতে দেখলাম।

    বাচ্চা কথাটা কিন্তু এবারে আর গায়ে মাখলাম না। কারণ ঘটনাটার মোড় ঘুরছে মনে হচ্ছে।

    --তা কেন? আজই আপনারা সিনেমা দেখে বাড়ি যাবেন। আশা করি অসুবিধে হবে না। আর আজ যেটুকু দেখতে পেলেন না, যে কোনদিন এসে সেটুকু দেখে নেবেন। কানাইবাবু, ওনাদেরকে ব্যালকনির রাস্তা দেখিয়ে দিন। হল মালিক যেন কল্পতরু হলেন।

    সেদিন ‘সোনালি কেবিনে’ মোগলাই পরোটা ছাড়াও কবিরাজি কাটলেট আর গ্র্যান্ড মালাই-চমচমও জুটেছিল কপালে।

    ফেরার পথে নন্দুমাসির মুখে বিজয়িনীর হাসি।–দেখলি তো ভেকু, সাফাই অভিযানের মত ভালো কাজের ফল সব সময়েই ভালো হয়।

    পরের দিন কথামত মাসি একটা বড় ময়লা ফেলার ঝুড়ি কিনে বাবলার হাত দিয়ে সিনেমা হলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। পরে দেখেছিলাম সিনেমা হলে ময়লা ফেলার ঝুড়ির ওপরে দেওয়ালে লেখা হয়েছিল-- ‘শ্রীমতী নন্দিনী দেবীর সৌজন্যে’।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)