• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | প্রবন্ধ
    Share
  • শিক্ষা (২) : গান্ধর্বিকা ভট্টাচার্য
    পর্ব ১ | পর্ব ২



    আগের সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা এবং সেখানে কী কী পরিবর্তন আনা সম্ভব সে বিষয়ে লিখেছিলাম। সেখানে সফল মানুষ তথা সফল নাগরিক তৈরি করার পিছনে শিক্ষাব্যবস্থার অবদান, অধুনা বাঙালি সমাজের ভেতর অবধি ঢুকে পড়া তিনটে অসুখকে বাড়িয়ে তোলার পিছনে এখনকার শিক্ষাব্যবস্থা কী ভূমিকা পালন করছে, এসব দেখা হয়েছে। বিষয়টা গভীর এবং সামগ্রিক।

    এবারের পর্বে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের অর্থোপার্জনে সহায়ক হতে পারে সে বিষয়ে কিছু মতামত প্রকাশ করা হয়েছে।

    এদেশে, বা যে কোন দেশেই অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে মূল অন্তরায় দুটি। বলাই বাহুল্য, প্রথমটি হল চাকরির অভাব, যা নিয়ে আলোচনা করা এই সামান্য প্রবন্ধের আওতার বাইরে। অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে সে বিষয়ে হাত দেওয়া বাতুলতা মাত্র। তাছাড়া, কর্মসংস্থান এবং শিল্পের অগ্রগতি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতা ও শিল্পপতিদের উপর নির্ভরশীল। প্রবন্ধের তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজতে যাওয়াটা হয়তো খুব যুক্তিসঙ্গত হবে না।

    দ্বিতীয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা হয় না, কিন্তু মানুষের কর্মজীবনের সাফল্য এবং ব্যক্তিগত সুখের জন্য এটির দিকেও দৃষ্টিপাত করা অত্যন্ত জরুরি। এ হল মানুষের রুচিপছন্দ এবং মানসিকতা অনুযায়ী চাকরি না করে কিছু বেশি মাইনের বাছা চাকরির পিছনে অন্ধভাবে ছুটে যাওয়া। এর ফলে অবধারিত ভাবে এসে যায় পরীক্ষায় অসাফল্য, বা সফল হলেও পরবর্তীকালে সেই চাকরিতে অনীহা, মানসিক অবসাদ, এবং শুধুই 'দিন যাপনের প্রাণ ধারণের গ্লানি'। তাই চাকরির বাজার যতই খারাপ হোক, প্রত্যেক মানুষের পক্ষে নিজের অন্তত খানিকটা পছন্দসই জীবিকা নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। কথাটা বলা সহজ, কার্যায়িত করা তত সহজ নয়। তবু এই প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিই। আমাদের স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরা যখন ডাক্তারি/ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মোহাঞ্জন লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন আমাদেরই এক সহপাঠী প্রথমে একটি বাংলা ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, এবং পরবর্তীকালে নিজের রেস্টুরেন্ট খুলেছে। এই চাকরিহীনতার যুগেও সে অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারের থেকে আজ অনেক বেশি সফল – শুধুমাত্র (তার নিজের ভাষায়) সে তার নিজের পছন্দসই জীবিকা বেছে নিয়েছে বলে। আরো অনেক এরকম উদাহরণ আছে, কিন্তু এখানে উল্লেখ করে রচনাটিকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না।

    গালভরা উদাহরণ তো দেওয়া হল, কিন্তু মুশকিল হল, পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা ভারতবর্ষে মোটামুটি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ জীবিকা সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হয়। তার পরে আর জীবনের গতি ঘোরানোর খুব একটা সুযোগ পাওয়া যায় না। একজন তেরো-চোদ্দ বছরের ছেলে বা মেয়ে পারিপার্শ্বিকের চাপ এবং প্রত্যাশাকে অবজ্ঞা করে নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা বুঝে নিয়ে জীবিকা পছন্দ করে সেইমতো এগোতে থাকবে, এটা আশা করা কতটা ন্যায়সঙ্গত তা জানি না। তার উপর শোনা যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি শিক্ষার বেসরকারিকরণ হতে চলেছে। একটা সময় অবধি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলিতে অপেক্ষাকৃত কম বেতনে যথেষ্ট উচ্চমানের শিক্ষা দেওয়া হত (যদিও আজকাল সেই শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে)। শিক্ষার মান হয়তো বেসরকারি কলেজেও ভালোই থাকবে, বরং সুযোগ সুবিধা আরো বেশিই পাওয়া যাবে, কিন্তু সেই শিক্ষার দাম দেওয়ার ক্ষমতা সকলের থাকবে কি? অনেক কৃতী অথচ মধ্যবিত্ত/নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আর প্রথাগতভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে না। তাদের অন্যান্য উপায়ে শিক্ষিত করার কথা চিন্তা করার সময়ও এগিয়ে আসছে।

    এই চিন্তাভাবনায় ছাত্রছাত্রীদের সহায়ক হতে পারেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, চাকরিদাতারা, এবং ছেলেমেয়েদের অভিভাবক। ছাত্রছাত্রীদের সঠিক জীবিকা নির্বাচন, এবং উপার্জনের পথ অপেক্ষাকৃত মসৃণ করে দেওয়ার নেপথ্যে এই তিন স্তম্ভের কী ভূমিকা হতে পারে, এই প্রবন্ধে সে কথাই পৃথকভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে। পাঠ্যতালিকা এবং শিক্ষাপ্রণালী যেহেতু সব ছাত্রছাত্রীর জন্য সমান তাই প্রয়োজন ছাড়া তাদের আর্থিক পটভূমির কথা আলোচনা করা হয়নি। আর যেসব ছেলেমেয়েরা আর্থিক অভাবে স্কুলে ভর্তি হতেই পারছে না, বা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না, তাদের নিয়ে আলোচনা করা একটি ভিন্ন প্রবন্ধের বিষয়।

    প্রথমে আসা যাক ছেলেমেয়েদের অভিভাবকের কথায়। অভিভাবকরা উপরোক্ত তিন গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল, সমাজ নামক বিশাল জাঁতাকলের সামান্য অংশমাত্র। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই না আছে অর্থবল, না আছে ক্ষমতার প্রাচুর্য। সারাদিন খেটে যা রোজগার করেন তাই দিয়ে চেষ্টা করেন সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে, যাতে তারা একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারে, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। যাই হোক, যেহেতু সন্তানের প্রাথমিক দায়িত্বে তাঁরা আছেন, তাই বর্তমান আলোচনায় তাঁদের টেনে না এনে উপায় নেই।

    সন্তানকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে তৈরি করা বা তাকে শিরদাঁড়া সোজা করে বাঁচতে শেখানোর পিছনে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে আগের প্রবন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে। জীবিকা বাছাই করার ব্যাপারেও তাঁদেরই সন্তানের প্রধান সহায়ক হতে হবে। কথিত যে আইনস্টাইন বলেছেন, “Everyone is a genius. But if you judge a fish by its ability to climb a tree, it will live its whole life believing that it is stupid.” অর্থাৎ একজন মানুষের স্বাভাবিক প্রতিভা যেদিকে, সেই অনুযায়ী জীবিকা বাছাই করলে তবেই সে তার সম্পূর্ণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে পারবে। এ কথার যুক্তিকে স্বীকার করে নিয়ে অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, সন্তানের উপর নিজেদের পছন্দসই জীবিকা আরোপ না করে তাদের বোঝার চেষ্টা করুন। ধরুন তারা যদি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়, তাহলে প্রশ্ন করতে হবে যে তারা কি বিষয়টি ভালোবেসে চয়ন করেছে, নাকি শিক্ষক/শিক্ষিকা বা বন্ধুবান্ধবদের চাপে পড়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে? তারা কোন বিষয় নিয়ে পড়তে পছন্দ করে? কেন সেই বিষয়টি এত ভালো লাগে? সেই বিষয় বা তার সংলগ্ন কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে কী ধরনের পেশায় ঢুকতে পারা যাবে?

    কোন কোন অভিভাবকের হয়তো এরকম আলোচনা করার মতো ধৈর্য বা সময় নেই। সে ক্ষেত্রে 'কেরিয়ার কাউন্সিলরের' সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে কিশোর-কিশোরীদের জন্য যোগ্য এবং অভিজ্ঞ কেরিয়ার কাউন্সিলরের অত্যন্ত প্রয়োজন, যাঁদের কাছে তারা নির্ভয়ে এবং নিঃসংকোচে নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কথা জানাতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা করে তাদের রুচি এবং প্রবণতা অনুযায়ী জীবিকা বেছে দিলে সারা জীবন সেই জীবিকার ভার বহন করে বেড়ানো অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। অবশ্য মানুষ জীবনের সঙ্গে বদলে যায়, চোদ্দ বছর বয়সে যা ভালো লাগে চুয়াল্লিশে তা ভালো না-ই লাগতে পারে। কিন্তু এভাবে আলোচনা করে জীবিকা চয়ন করলে নিজের ভালো লাগার জীবিকার অন্তত কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে সেই জীবিকায় সাফল্যের সম্ভাবনাও অনেকটাই বেড়ে যাবে।

    সমস্যাটা আরো গভীর হয়ে যায় প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে। নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবের কারণে তাদের অভিভাবকদের পক্ষে হয়তো এত চিন্তাভাবনা করে তাদের জীবিকা চয়নে সাহায্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই সরকারি বেসরকারি নির্বিশেষে প্রত্যেকটি স্কুলে একজন কেরিয়ার কাউন্সিলর থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাঁরা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ জীবিকা সম্পর্কে পথনির্দেশ করতে পারেন। কম বেতনের স্কুলে এ ধরনের কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থারা এগিয়ে আসতে পারেন, এবং অপেক্ষাকৃত কম বেতনে অথবা বিনা বেতনে সপ্তাহে এক-দু'দিন কয়েক ঘন্টা বসতে পারেন।

    অভিভাবকদের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে। তা হল, ছোটবেলা থেকে সন্তানের সামনে কোন জীবিকাকে ছোট করে না দেখা, এবং সন্তানকেও কোন জীবিকাকেই ছোট করে না দেখতে শেখানো। ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বাইরেও অনেক পেশা আছে। জয়েন্টে পাশ না করতে পারলেই জীবন শেষ হয়ে যায় না। কিন্তু অধিকাংশ বাবা-মা সেইসব জীবিকার কথা সন্তানের সামনে উল্লেখ করেন না। উলটে, চিত্রনির্মাণ নিয়ে পড়তে চাইলে “তুই ভারি সত্যজিৎ রায় হবি” বা ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়তে চাইলে “শেষে তুই দর্জি হবি” ইত্যাদি শ্লেষাত্মক কথা বলে সন্তানের মনোবল ভেঙে দেন। পৃথিবীতে সবার পক্ষে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সম্ভব নয়। তার মানে এই নয় যে একজন শিক্ষার্থীর প্রতিভা নেই, বা সে অন্য কোন পেশায় সুনাম করতে পারবে না। বরং আজকাল যত অভিনবত্বপূর্ণ বিষয় খুঁজে বার করা হচ্ছে, আয়ের সম্ভাবনাও তত বেড়ে যাচ্ছে। ট্রেভর হূটন ইত্যাদি অনেকেই একাকীত্ব এবং অবসাদে জর্জরিত ব্যক্তিদের জড়িয়ে ধরা, তাদের সান্নিধ্য দেওয়াকেই পেশা করেছেন। এদিকে যার প্রতিভা আছে তার কাছেও আয়ের পথ খোলা। যাঁরা সন্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক বুদ্ধি দেখেছেন তাঁরা স্কুলের পাশাপাশি তাদের ছোটখাটো ব্যবসা করার জন্য উৎসাহিত করতে পারেন। সম্ভব হলে তার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু পুঁজিও তাদের দেওয়া যেতে পারে, অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াও শেখানো যেতে পারে। বাংলাদেশের মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে দরিদ্রতম গোষ্ঠীকেও ঋণ দিয়ে তাদের উন্নতিসাধনের ব্যবস্থা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের প্রকল্প, বিশেষত ছাত্রদের ক্ষেত্রে চালু করা যায় কি না, তা আরেকটি প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে।

    এক কথায় বলতে হলে, স্কুলে কে কার থেকে দু-এক নম্বর কম কি বেশি পেল, বা কার কি র‍্যাংক হল এইসব নিরর্থক বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে, অভিভাবকদের সন্তানকে তার প্রতিভা চিনে নিতে সাহায্য করতে হবে। শুধু তাই নয়, সন্তানের প্রবণতা অনুযায়ী বেছে নেওয়া পেশায় ঢুকতে গেলে কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, এন্ট্রান্স পরীক্ষা আছে কি না, থাকলে কোন বিষয়ের উপর জোর দিতে হবে, অসচ্ছল পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা আছে কি না – সম্ভব হলে এইসব ব্যাপারে প্রাথমিক তথ্য এনে দিলে তারা খুবই উপকৃত হবে। অবশ্য, এ দেশে নম্বরের খেলা থেকে বেরনো সহজ কথা নয়। স্কুলগুলি স্বয়ং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার বাতাবহ তৈরি না করে প্রতিযোগিতা এবং নম্বরের লড়াইকে প্রাধান্য দেয়। তাতে শিক্ষক/শিক্ষিকারই সুবিধা হয়। ক্লাসে যা পড়ানো হয় তার পরেও অনেক শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন থেকে যায়, বিষয়টি স্পষ্ট হয় না। সে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া (বিশেষত উঁচু ক্লাসে) অভিভাবকের পক্ষেও সম্ভব হয় না। শিক্ষক/শিক্ষিকাকে একথা বললে একচেটিয়া উত্তর – “ক্লাসে এতজন ছাত্রছাত্রী আছে সবাইকে আলাদা করে নজর দেওয়া সম্ভব নয়।” ভাবার্থ হল, স্কুল থেকে যা মাইনে পাই তাতে এর বেশি পারব না, আরো নম্বর পেতে গেলে মালকড়ি ফেলো, কোচিং-এ এসে ভর্তি হও। তার উপর যাঁরা প্রশ্নপত্র তৈরি করেন তাঁদের কোচিং-এ গেলে 'বাছাই প্রশ্ন/অংক'-এর সন্ধান পাওয়া যায়। এখানকার অধিকাংশ স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে বিষয় গুছিয়ে লিখলে তেমন নম্বর পায় না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সারা ছাত্রীজীবন নিজের ভাষায় উত্তর লিখে কম নম্বর পেয়ে তারপর বিলেতে স্নাতকোত্তর পর্বে পড়তে গিয়ে একইভাবে উত্তর লিখে প্রশংসা এবং ডিস্টিংশন পেয়েছি। আবার আমার অনেক বন্ধু এদেশে শেখানো উত্তর লিখে ভালো নম্বর পেয়েছে, কিন্তু পরবর্তীকালে বিদেশে সেভাবে উত্তর লেখায় নম্বর কমে গেছে। শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করে জানা গেছে তাঁরা চান, ছাত্রছাত্রী বই মুখস্থ না করে বিষয়টি বুঝে নিয়ে নিজের মতো করে উত্তর দিক। কারণ বিদেশে যে 'কোচিং' নেই। স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।

    হয়তো শিক্ষক শিক্ষিকারা নিজেরাও খানিকটা অসহায়, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষাব্যবস্থার জাঁতাকলে পিষে তাঁদেরও প্রাণ ওষ্ঠাগত হচ্ছে। আসলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ওলটপালট করে ফেলার সময় এসে গেছে, কিন্তু তার জন্যে যেরকম শিক্ষিত এবং উদারমনস্ক শিক্ষাবিদদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, তাঁদের কাউকে আলোচনার জন্য ডাকা হয় না। তাই সেই বস্তাপচা মনোভাবের কোন পরিবর্তন আসছে না, এবং শিক্ষাজগৎ ও বাস্তবজগতের ব্যবধান ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

    অভিভাবকদের কাছে অনুরোধ, নম্বরের প্রতিযোগিতার বাইরে বেরিয়ে এসে একবার ভাবুন। বলুন তো, ক্লাস সেভেনে অংকে কত পেয়েছিলেন তা দিয়ে আপনার জীবন কোনভাবে প্রভাবিত হয়েছে কি? সারা জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে স্কুলের পরীক্ষার নম্বর বা স্কুলের র‍্যাংক কি কোন মাহাত্ম্য রাখে? চাকরির জগতে প্রবেশ করে সবাইকেই সেই শূন্য থেকেই শুরু করতে হয়।

    কর্মজগতে প্রবেশ করার সময়ে শূন্য থেকে শুরু না করার একমাত্র কার্যকরী উপায় হল ছাত্রজীবন থেকেই ইন্টার্নশিপ করা। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, ইন্টার্নশিপ জোগাড় হবে কী করে এবং শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ করবে কখন? অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানের জন্য ইন্টার্নশিপ জোগাড় করার মতো যোগাযোগ বা চেনা পরিচয় রাখেন না, এবং প্রতিষ্ঠানগুলিও স্কুলের ছাত্র কাজ শেখার জন্য এসেছে শুনলে হেসে উড়িয়ে দেবে। তাছাড়া, সারাদিন স্কুল, হোমওয়ার্ক, কোচিং-এর চাপে বিধ্বস্ত শিক্ষার্থীদের উপর আবার ইন্টার্নশিপের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া শুধু অমানবিক নয়, দিনের শেষে কোন প্রতিষ্ঠান খোলাও থাকে না। গরম বা পুজোর ছুটিতেও (যার মেয়াদ আজকাল এমনিই কমে গেছে) ছাত্রছাত্রীদের কৈশোর মেরে দিয়ে তাদের অর্থোপার্জনের পথে ঠেলে দেওয়া কাজের কথা নয়। অবসর হল ছেলেমেয়েদের খেলাধুলো করার সময়, কল্পনাশক্তি বাড়ানোর সময়, দেশ-বিদেশের কথা জানা, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জীবনধারা, সেখানকার মানুষের চিন্তাধারা বোঝার, জানার সময়। তবেই না তারা সার্থক অর্থে বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠবে। কাজেই ইন্টার্নশিপ করতে হলে স্কুলের থেকেই সময় বের করতে হবে, এবং তার জন্য স্কুলগুলিকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। এই মুহূর্তে যদি একজন ছাত্র বা ছাত্রী তার অধ্যবসায় এবং পারিবারিক সাহায্যে একটা ইন্টার্নশিপ জোগাড় করতেও পারে তবে তা শুধুই ব্যতিক্রম হয়ে রয়ে যাবে। স্কুলের সহায়তা না পাওয়া গেলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার কোন পরিবর্তন ঘটবে না। অন্তত একটি স্কুলও যদি সাহস করে এই পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে হয়তো একটা বিপ্লব ঘটলেও ঘটতে পারে।

    স্কুলের আমন্ত্রণে বিভিন্ন অফিস, ব্যাংক, হাসপাতাল, কোর্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিধিরা এসে অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণি অবধি শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেন। তারপর উৎসাহী ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এক মাসের ইন্টার্নশিপ করতে পারে। এই এক মাসে যেহেতু তাদের ক্লাসের পড়া বাদ পড়ে যাবে তাই শিক্ষক/শিক্ষিকারা সেই সময়ের পড়া রেকর্ড করে তাদের পাঠিয়ে দিতে পারেন। পরীক্ষাতেও ইন্টার্নিশিপ সার্টিফিকেট দেখালে তিরিশ নম্বর (যা সাধারণত পাশে করার নম্বরের কাছাকাছি হয়) ছাড় দেওয়া যেতে পারে। বছরে দু'বার এ ধরনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। ছেলেমেয়েরা যদি নিজের শহরের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করতে যায়, তাহলে সেখানকার কোন স্কুলের হোস্টেলে স্বল্পমূল্যে তাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আবার বলছি, এই প্রবন্ধের মাধ্যমে কোন স্কুলকে এইসব প্রকল্প চালু করতে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি বিদ্বৎমণ্ডলী প্রবন্ধটি পড়েন, এবং এসব প্রস্তাবের সারবত্তা আছে মনে করে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যান, তাহলে হয়তো কোনদিন সঠিক মহলে বার্তা পৌঁছে যাবে। এটুকুই আশা।

    এছাড়াও স্কুল থেকে নানান ধরনের ব্যবহারিক জ্ঞান – যেমন চর্মশিল্প, বস্ত্রশিল্প, কাঠের কাজ, কৃষিকাজ, মাছের চাষ ইত্যাদি সম্পর্কে সেমিনার ও নিরাপদভাবে, পরিদর্শকের উপস্থিতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যাতে যেসব শিক্ষার্থীরা প্রথাগতভাবে কলেজে পড়তে অক্ষম হবে তারাও জীবিকা অর্জন করতে পারে। হয়তো শহরের চেয়ে শহরতলী বা গ্রামের স্কুলে এই শিক্ষার চাহিদা বেশি হবে। সেক্ষেত্রে এই ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক না করে চাহিদা অনুযায়ী ঐচ্ছিক বা অপশনাল করা যেতে পারে। বহু ছেলেমেয়ে আর্থিক কারণে স্কুলের পড়া ছেড়ে দিয়ে এইসব শিল্পকে জীবিকা করে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু প্রথাগতভাবে শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের তুলনায় তাদের আয় কতটুকু? তাই স্কুলের মাধ্যমে ব্যবহারিক বিদ্যা শিখিয়ে যদি ছেলেমেয়েদের একটা ডিগ্রি দেওয়া যায়, তবে হয়তো ভবিষ্যতে তাদের আয়ের পথ আরো প্রশস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

    আবার বিপদের সম্ভাবনা এখানেও কম নয়। হয়তো ছেলেমেয়েদের ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এখন বিভিন্ন স্কুলে তাদের দিয়ে 'প্রজেক্ট' করানো হয়। সেসব প্রজেক্ট বাচ্চাদের কম, তাদের অভিভাবকদের বেশি। ফলে যাদের অভিভাবকের উৎসাহ বা প্রবণতা আছে তাদের প্রজেক্ট অনেক বেশি ভালো হচ্ছে, আর যারা নিজেদের ক্ষমতায় কিছু দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে তারা পিছিয়ে পড়ছে। একজন বাচ্চা তার নিজের ক্ষমতায় কী করতে পারে, আর অভিভাবকের সহায়তায় কী করেছে তার মধ্যে তফাত করার মতো বুদ্ধি নিশ্চয়ই শিক্ষক/শিক্ষিকার আছে। তবুও তাঁরা অন্যের সাহায্য নিয়ে করা প্রজেক্ট বাতিল করার পরিবর্তে প্রশংসা করছেন। ফলে, বাকি বাচ্চাদের স্বকীয়তা আর মনোবল দুটোই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়া যায় না। স্কুল যদি এই ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায় তাহলে বাবা-মায়ের পরিবর্তে ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সৃজনমূলক চিন্তাভাবনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা হবে।

    সবশেষে আসি চাকরিদাতাদের কথায়। যে তিন গোষ্ঠীর কথা আলোচনা করা হয়েছে তাদের মধ্যে এঁরা সবচেয়ে ক্ষমতাবান, চাকরির বাজার এঁদের বদান্যতাতেই চলছে। কাজেই এঁদের দিক থেকে সবুজ সংকেত না পেলে এত আলোচনা পুরোটাই বৃথা। ইন্টার্নশিপের প্রথা যদি চালু হয়, তাহলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাথাদের মানসিকতায় একটু রদবদল আনতে হবে। প্রার্থী কোন স্কুল বা কলেজে পড়েছে, কত নম্বর পেয়েছে, তার থেকে সে যে ধরনের কাজের জন্য আবেদন করছে তার কাছাকাছি কোন অফিসে ইন্টার্নিশিপ করেছে কি না, করে থাকলে সেই সার্টিফিকেটে কী লেখা আছে, এসবের উপর বেশি জোর দিতে শুরু করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে যে ব্যক্তি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, কার্যক্ষেত্রে সে যে সমান দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবে তার কোন মানে নেই। তাই পরীক্ষার নম্বরের চেয়ে কর্মদক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়াই সমীচীন বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে চাকরিদাতারা স্কুলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলতে পারেন। নিজেরা এগিয়ে এসে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অফিসের কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করুন, তারা কাজ শেখার জন্য আবেদন জানালে প্রশ্রয় দিন। কর্মজগৎ সম্পর্কে তাদের একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করুন – কারণ একদিন এই ছাত্রছাত্রীরাই নিজেদের শ্রম আর অধ্যাবসায় দিয়ে আপনাদের জন্য মুনাফা এনে দেবে।

    ভারতের অর্থনীতি এই মুহূর্তে বহু পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। চাকরির বাজারেও সেই একই জটিল পরিস্থিতি। কোন সরল সমীকরণে এর সবটুকু সমাধান করে দেওয়া সম্ভব নয়। তবুও শিক্ষার অর্থকরী দিক, এবং ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ জীবনে জীবিকা চয়ন ও সাফল্য লাভের বিষয়ে যা প্রাসঙ্গিক মনে হল তা লিখলাম। এর বিরুদ্ধেও হয়তো অনেক কথা বলা যেতে পারে। কমেন্টে সে বিষয়ে লিখলে সাগ্রহে পড়ব। আলোচনা এগিয়ে চললে হয়তো একদিন কিছু সমস্যার সমাধানও পাওয়া যাবে।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)