• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | প্রবন্ধ
    Share
  • উৎপাদন ও ভারী শিল্প কর্মজগতে মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের বর্তমান অবস্থান ও আগামীর লক্ষ্য : স্বস্তিকা চ্যাটার্জী দাস



    ভারতে উৎপাদন ও প্রযুক্তিনির্ভর ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে/ব্যবসায়, ন্যূনসংখ্যক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশেষ করে উচ্চ ও শীর্ষস্থানীয় পদে লিঙ্গ সাম্যতার যে নিরাশাব্যঞ্জক অবস্থা, তার কারণ এবং উন্নতিসাধনের সম্ভাব্য পথ, এই বিষয়গুলি নিয়ে বর্তমান প্রবন্ধে পরিসংখ্যান ও তথ্য ভিত্তিক পর্যালোচনা করা হয়েছে।

    তেইশে জুন আন্তর্জাতিক মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের দিন বলে চিহ্নিত এবং আজকাল দেশ-বিদেশের বড় কোম্পানিগুলোতে বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে পালনও করা হয়ে থাকে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্ত এই উপলক্ষ্যে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না থেকে, ভারতের প্রযুক্তি শিক্ষায় ও পেশায় মহিলাদের যোগদান বিষয়ে এবং সাম্যতার লক্ষ্যে আরো গভীর পর্যালোচনা ও আন্তরিক ভাবে প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

    যদিও এটা লক্ষণীয় যে ভারতে প্রযুক্তি শিক্ষায় ও শিল্পে, মহিলাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে ক্রমবর্ধমান, কিন্তু সেই তুলনায় ভারী শিল্প নির্ভর প্রতিষ্ঠানে বা ব্যবসায়, উচ্চ এবং শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন মহিলা সংখ্যা অত্যন্ত নিরাশাব্যঞ্জক। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে এই তরুণী ইঞ্জিনিয়াররা পেশাগত পথে কীভাবে, কোন গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছেন?

    কর্মসংস্থানের নিরিখে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন ও প্রযুক্তি নির্ভর ভারী শিল্পের অবদান সবচেয়ে বেশি এবং ভারতীয় "জিডিপি"তে অবদান প্রায় ২০%। কিন্তু এই সেক্টরে নিযুক্ত কর্মীদের ভিতর মহিলার সংখ্যা অত্যন্ত শোচনীয় ভাবে কম - মোটে ৩% (মূল/কোর ইঞ্জিনিয়ারিং) থেকে ১২% (অন্যান্য প্রযুক্তি) কাছাকাছি। আর শীর্ষস্থানীয় ও নির্বাহিক (এক্সিকিউটিভ) পদে আসীন মহিলা প্রায় হাতে গোনা যায় – “জেনেরাল ইলেকট্রিক (জি ই)” ও “অবতার”-এর ২০২১-এর একটি রিসার্চ রিপোর্ট অনুযায়ী ৯% এক্সিকিউটিভ পদে মহিলারা আসীন, এবং এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াও অন্যান্য বিভাগও (যেমন হিউমান রিসোর্সেস, ফিন্যান্স ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত।

    আজ এটা বহুলভাবে প্রমাণিত, যেসব প্রতিষ্ঠান আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিতে বিশ্বাসী ও কর্মী নির্বাচনে লিঙ্গ এবং অন্যান্য বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দেয় সেইসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উন্নতিও বেশিরভাগ সময়ে ঊর্ধ্বগামী। তাই যে ব্যবসায় এত বিশাল কর্মসংস্থান হয়, সেখানে মহিলা কর্মী নিয়োগ ও উচ্চপদে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন জায়গায় মহিলাদের অবস্থান, দেশের সর্বাঙ্গীণ অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যে বিশেষভাবে প্রয়োজন।

    তবে, শুরুতেই আশার কথা হলো, আমাদের সমাজে মেয়েদের প্রতি প্রকট বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও, "অল ইন্ডিয়া সার্ভে অব হায়ার এডুকেশন"-এর রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে বিজ্ঞান বিভাগে মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। আজ সারা পৃথিবীর মধ্যে, ভারতে সবচেয়ে বেশি মহিলা "স্টেম (সাইন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিক্স)" স্নাতক (প্রায় ৪০%), এটা অবশ্যই গর্বের কথা। কিন্তু চিন্তার এবং অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো এর মধ্যে মাত্র ১৪% কে আমরা পাই কর্মজগতে! এই ১৪%-এর ভিতরে যদি শুধু প্রযুক্তি (ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি)-নির্ভর উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) ও ভারী শিল্পে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব দেখি, তাহলে এই সেক্টরে লিঙ্গসাম্য এক সুদূর কল্পনা!

    এবার দেখা যাক প্রযুক্তি বিদ্যায় স্নাতক স্তরের পরিসংখ্যান। "সোসাইটি অফ উওম্যান ইঞ্জিনিয়ার্স" প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে "অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন" অনুমোদিত কলেজগুলোয় ৬,৫৮,১৯১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০.২% মেয়ে তালিকাভুক্ত। ২০১২-২০১৩ সালে ছিল ৩৩.৭%, এবং তারপর থেকে মোটামুটি ২৭ থেকে ৩০% ভিতরেই মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছে।

    এবার দেখা যাক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিভিন্ন শাখায় মেয়েদের তালিকাভুক্তির পরিসংখ্যান ও প্রবণতা। কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক (মিনিস্ট্রি অফ হিউমান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট) কর্তৃক ২০২০ সালে প্রকাশিত ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিভিন্ন শাখায় ভর্তির পরিসংখ্যানের তথ্য জানাচ্ছে, মেকানিক্যাল, সিভিল, মেটালারজি, কেমিকাল, ইলেকট্রিকাল - এইসব শাখায় মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা নিতান্তই কম - যথাক্রমে ৫.৯%, ২২.৫%, ২২.৭%, ২৩.২%, ২৭.৩%। বিশেষত, সবচেয়ে বেশি অসঙ্গতি লক্ষণীয় মেকানিক্যাল শাখায় - সাকুল্যে এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী এই বিষয়ে নিয়ে ভর্তি হলেও, মেয়েদের সংখ্যা একেবারে সর্বনিম্ন। কিন্তু অন্যদিকে, আর্কিটেকচার - ৫২.৫%, ইলেকট্রনিক্স - ৪১.৭%, ইনফরমেশন টেকনোলজি - ৩৯.২%, কম্পিউটার সায়েন্স - ৩৮.১%; এইসব শাখায় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছাত্রী সংখ্যা।

    এই পরিপ্রেক্ষিতে, আমি নিজে ইঞ্জিনিয়ার এবং গত ছত্রিশ বছর ভারী শিল্প ব্যবসায় নিয়োজিত অনেকগুলি কোম্পানিতে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তরগুলি সাজিয়েছি।

    প্রশ্ন ১ - সামগ্রিক ভাবে স্নাতক স্তরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় লিঙ্গসাম্যতা বেশ আশাব্যঞ্জক হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু বিভাগে মেয়েরা পড়তে উৎসাহী নয় কেন?

    প্রশ্ন ২ - যে অনুপাতে মেয়েরা প্রযুক্তি নিয়ে স্নাতক হচ্ছে, সেই অনুযায়ী প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের কর্মজগতে তাদের যোগদান এই একুশ শতাব্দীতেও এরকম হতাশাজনক কেন?

    ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন ও প্রযুক্তিনির্ভর ভারী শিল্পে প্রধানত মেকানিক্যাল, সিভিল, মেটালারজি, কেমিকাল, ইলেকট্রিকাল শাখার স্নাতকদের নিয়োগ করা হয়। কিন্তু এই বিভাগগুলিতে মেয়েরা পড়তে আসার ও কর্মজগতে যোগদানের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্থ হওয়ার কারণগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেই "মুরগি আর ডিম" অবস্থা!

    • পরিবার, চেনাজানা ও দেশে, "রোল মডেল" হিসেবে কর্মজগতে সফল উচ্চপদস্থ মহিলা ইঞ্জিনিয়ার-এর অভাব

    • এই বিভাগগুলিতে ছেলেদের সংখ্যার প্রাধান্য অনেক বেশি হওয়ার কারণে, খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে মেয়েদের সন্দেহ

    • সমাজে বহু বছরের গেঁথে যাওয়া কিছু বাঁধাধরা চিন্তাধারার কারণে, মেয়ে হিসেবে দক্ষতা অর্জনের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের অভাব

    • এই সেক্টরে মেয়েদের নিয়োগ করার ব্যাপারে বৈষম্য ও সেইহেতু এই সেকটরে যোগ দিতে অনুৎসাহ

    প্রায় গত দুই দশক ধরে আমরা দেখছি, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে কম্পিউটার সাইন্স বা ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে পড়াশুনো ও চাকরি জীবনের লক্ষ্য। বহুসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী যারা স্নাতক হয়েছে প্রযুক্তি বিদ্যার অন্য শাখায়, তারাও চাকরি করছে "আই-টি" কোম্পানিগুলোতে। এর প্রধান কারণ অবশ্যই আমাদের দেশে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলে "আই-টি সেক্টর" বিশেষভাবে উপকৃত হওয়ার জন্যে বর্ধিত চাকরির সুযোগ, বেশি বেতন, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি যা কর্মজীবনে খুব দ্রুত-লব্ধ উন্নতি ও উন্নত মানের জীবনের স্বপ্ন দেখায়। তুলনামূলকভাবে অন্যান্য প্রযুক্তি শাখায় চাকরির সুযোগ, বেতন সেরকম বাড়েনি।

    এবার আমরা যদি আলোচনা সীমাবদ্ধ করি মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে, তাহলে উপরোক্ত (লিঙ্গ নির্বিশেষে) কারণ-সহ আরো কিছু কারণে মহিলাদের প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) ও ভারী শিল্পে যোগদান এত সীমিত।

    • যদিও আমাদের দেশে মহিলা কর্মীদের সুবিধার্থে অনেক আইন বা নীতি খাতায়-কলমে আছে, কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এগুলো বাস্তবে প্রয়োগ হয় না। এই সেক্টরের বেশির ভাগ কোম্পানিগুলোতে (কিছু বহুজাতিক বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া), আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ও উদার কর্মী-বান্ধব নীতির প্রয়োগের একান্তই অভাব লক্ষ্য করা যায়।

    • বহুলাংশ মানুষের (এই সেক্টরের বাইরে এবং প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের) মধ্যে একটা ধারণা আছে যে এই সেক্টরে উন্নতি করতে গেলে "কনস্ট্রাকশন সাইট"/ "ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট"-এ অনেকদিনের কাজ করার অভিজ্ঞতা অবশ্য প্রয়োজন। আর যেহেতু এই সব প্লান্ট বা সাইট বেশিরভাগ সময়েই কোনো শহর থেকে দূরবর্তী জায়গায় অবস্থিত এবং সেখানে ন্যূনসংখ্যক মহিলা কর্মী ও তাঁদের জন্যে অপ্রতুল পরিকাঠামোর সমস্যা (যেমন আলাদা টয়লেট) সর্বজনবিদিত, তরুণী ইঞ্জিনিয়াররা আগে থেকেই আশঙ্কিত হয়ে এই শিল্পে চাকরি নিতে পিছিয়ে যান। বেশিরভাগ সময়ে তাঁদের পরিবারের দিক থেকেও বাধা আসে।

    কিছু কিছু বিভাগের কাজে যেমন এটা সঠিক, কিন্তু আরো অনেক অন্যান্য বিভাগ আছে যেখানে নিয়োজিত প্রযুক্তিবিদদের এই ধরনের অভিজ্ঞতা যদি প্রয়োজনও হয়, সেটা নেহাতই স্বল্প মেয়াদি।

    • যেসব তরুণী ইঞ্জিনিয়ার প্রাথমিক বাধাগুলি পার করে এই সেক্টরে চাকরিতে আসেন, দেখা গেছে বেশিরভাগ সময়ে তাঁদের পদোন্নতি, সমসাময়িক ও সম-দক্ষতা সম্পন্ন পুরুষ প্রযুক্তিবিদদের তুলনায় অনেক হ্রাস গতির। অচেতন পক্ষপাত (আনকনশাস বায়াস) ও কিছু বাঁধাধরা ( স্টেরিওটাইপড) ধারণার জন্যে, তাঁরা ধারাবাহিক ভাবে প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। এই জাতীয় কর্মক্ষেত্রে মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের বহুল প্রচলিত অভিযোগ হলো ‘এক জন পুরুষ ইঞ্জিনিয়ার-এর সমান পদ ও বেতন পেতে গেলে একটি মহিলা ইঞ্জিনিয়ারকে সেই পুরুষের দ্বিগুণ কর্মদক্ষতা প্রমাণ করতে হয়।’

    • নতুন চাকরিতে ঢুকে বেশিরভাগ সময়ে নিজের দক্ষতা, মতামত, চিন্তাভাবনা পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে সংশয়ে ভোগেন। এর কারণ সংখ্যালঘুত্ব আর মেয়েদের ব্যবহার, স্বভাব ইত্যাদি নিয়ে সাধারণ সমাজে কিছু বাঁধাধরা (স্টেরিওটাইপড) ধারণা (যেমন শান্ত, কম কথা বলা, নিরীহ...ভালো মেয়ের লক্ষণ!!) তাঁদের ভিতরে নিজেদের গুটিয়ে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। এই কারণে শিক্ষা, বুদ্ধি, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও, কর্মকর্তা (বা কর্ত্রী)-দের নজরের বাইরে থেকে যায় তারা।

    • দেখা যায় এই সময়ে বেশ কিছু মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ভারী/উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে হয় স্নাতকোত্তর পড়াশুনো করে শিক্ষাজগতে বা হয়তো নিজের স্নাতক স্তরের মৌলিক বিষয় ছেড়ে, কম্পিউটার/আইটি কোম্পানিতে যোগ দিচ্ছে।

    • যেসব মহিলা ইঞ্জিনিয়াদের উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং), ভারী শিল্পের নির্মাণ (কনস্ট্রাকশন) প্রকল্পগুলিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাঁরা কম-বেশি সবাই কর্মরত শ্রমিকদের পরিচালনায় সোজাসুজি বা প্রচ্ছন্নভাবে বাধা অনুভব করেছেন। এর কারণ অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মহিলা, পুরুষের অবস্থান ও ভূমিকা সমন্ধে প্রচলিত পশ্চাদমুখী কিছু ধারণা।

    • কর্মজীবনের উঠতি ও মধ্য সময়ে, অন্যান্য মহিলা চাকুরিজীবীদের মতো, এই সেক্টরের মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদেরও সবচেয়ে কঠিন টানাপোড়েনের ভিতর দিয়ে পার করতে হয় - কর্মজগৎ আর ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রেখে, চাকরিতে স্থির উন্নতি বজায় রাখা অনেক সময়েই সম্ভব হয় না। এখনো আমাদের সমাজে মহিলাদের উপরই বর্তায় সংসারের বেশিরভাগ দায়িত্ব এবং মহিলারা নিজেরাও সেই চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস থেকে বেরোতে না পেরে তাঁরাও নিজেদের "সুপার উওম্যান" বানানোর লক্ষ্যে সব দিক "একা-হাতে" সামলাতে গিয়ে, কর্মজীবনের অকালেই শরীর-মনকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত করে ফেলে। কর্মস্থলে নতুন "চ্যালেঞ্জিং" পদ নিতে সংশয়ে ভোগেন ও নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে স্ব-সীমিত ধারণার বশবর্তী হয়ে কর্মজীবনে পিছিয়ে যান।

    এবার এগিয়ে যাওয়ার পথ নির্দেশিকা কি হতে পারে সেই আলোচনায় আসি।

    কীভাবে সমাজ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রগুলির এবং অবশ্যই মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের (নিজস্ব ব্যক্তিগত) যৌথ প্রচেষ্টায় এই সমস্যাগুলোকে খানিকটা হলেও সমাধান করার চেষ্টা করা যেতে পারে, যা এই উৎপাদন ও প্রযুক্তি নির্ভর ভারী শিল্প সেক্টরে লিঙ্গ সাম্যের উন্নতি এবং ফলে ভারতের সর্বাঙ্গিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে বহুলাংশে সাহায্য করবে।

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

    • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (বিশেষ করে মূল শাখাগুলি) বিষয় নিয়ে পড়াশুনো ও ভবিষ্যৎ-- এই বিষয়ে হাই স্কুল থেকেই মেয়েদের ও তাদের অভিভাবকদের (প্রয়োজনে) সচেতনতা বাড়ানোর জন্যে কর্মসূচি চালু করা।

    • প্রযুক্তিবিদ্যা সম্বন্ধে আগ্রহ তৈরি করার জন্যে স্কুলে ছোট ছোট প্রজেক্ট করার ব্যবস্থা করা যায়। মাঝে মাঝে কোনো বড় ভারী শিল্পের উৎপাদন কেন্দ্র, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গবেষণাগার ইত্যাদি জায়গায় শিক্ষার্থীদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসলে, তাদের এই বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হবে। বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে মেয়েরা যেন কোনোরকম সামাজিক বাধার কারণে এই সব কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে না নেয়।

    • প্রযুক্তিবিদ্যার মূল শাখায় (কোর ইঞ্জিনিয়ারিং) ভর্তি হওয়ার জন্যে মেয়েদের উৎসাহিত করার জন্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বিশেষভাবে কর্মসূচি শুরু করতে পারে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল মেয়েদের ভিতর।

    • প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময়ে পরামর্শ দেওয়ার যে অধিবেশন (কাউন্সেলিং সেশন) হয় সেগুলি যাতে কোনো ভাবে পক্ষপাত (লিঙ্গ) দুষ্ট না হয় তা বিশেষভাবে খেয়াল রাখা।

    • প্রযুক্তিবিদ্যার মূল শাখার শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগের সময়ে লিঙ্গসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা। শিক্ষার্থীরা এই সাম্যের সাথে নবীন বয়স থেকেই অভ্যস্ত হতে পারলে নিজেদের ভিতরের অসচেতন পক্ষপাত অনেকাংশে দূরীভূত হয়।

    • প্রতিষ্ঠানের আধিকারিক, বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষিকা/শিক্ষকদের বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে ছাত্রীরা যাতে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবহারের সম্মুখীন না হয়।

    • শিক্ষার্থীদের জন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংস্থার অংশীদারি খুবই জরুরি। আর সেইসময় যদি উচ্চপদস্থ মহিলা ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে তাদের আলাপ-আলোচনার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তাঁরা ছাত্রীদের সামনে বাস্তব উদাহরণ হিসেবে এই সেক্টরের কর্মজগতে যোগ দেওয়ার ব্যাপার উৎসাহী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সাহায্য করতে পারেন। ছাত্রদেরও সামগ্রিক প্রকাশ ও সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করবে এই ধরনের উন্মুক্ত আলাপ-আলোচনা।

    • স্নাতক স্তরের শেষ বর্ষে, যখন বিভিন্ন কোম্পানি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় গিয়ে কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের কর্মসূচির (ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ) ব্যবস্থা নেয়, তখন কোনরকম লিঙ্গবৈষম্য যেন না ঘটে সে ব্যাপারে দু-পক্ষের অধিকারিকদেরই বিশেষ ভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

    শিল্প সংস্থা / কোম্পানি

    • বেশি সংখ্যক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের জন্যে প্রয়োজনীয় ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোম্পানিতে সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিভাগে (যেখানে ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন) লিঙ্গ সমতা বজায় থাকে।

    • মহিলা কর্মীদের সুবিধার্থে যে সমস্ত আইন বা নীতি আছে ও আধুনিক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদার কর্মী-বান্ধব নীতির যথোপযুক্ত প্রয়োগ। এই বিষয়ে একটা উদাহরণ দিচ্ছি-- যেমন "মেটার্নিটি বেনিফিট আইন" অনুযায়ী যে সমস্ত সংস্থায় পঞ্চাশের বেশি মহিলা কর্মী আছে, সেখানে কর্মক্ষেত্রের ভিতরে বা ধারেকাছে কোম্পানিকে নিজের খরচে কর্মীদের শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে "ডে-কেয়ার/ক্রেশ"-এর ব্যবস্থা করতে হবে। বাস্তবে দেখা যায়, কিছু বড় বহুজাতিক সংস্থা ছাড়া এই ব্যবস্থা প্রায় কোন ভারতীয় সংস্থায় নেই। এই ব্যবস্থা কিন্তু একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে মহিলা কর্মীদের কোম্পানির প্রতি আনুগত্য ও অবদানের উন্নতি সাধনে।

    • শিল্প সংস্থা / কোম্পানিগুলোতে দরকার পক্ষপাত ও বৈষম্য ব্যতীত, মিত্রতার সংস্কৃতির প্রচার এবং স্বীকৃতি।

    • প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ছাড়াও, মহিলাদের জন্যে বিশেষ ভাবে পরিকল্পিত, নেতৃত্ব দান ও পরিচালনা করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা।

    • কোম্পানির বিভিন্ন বিভাগ/ব্যবসায়/দেশে কর্মরতা মহিলাদের ভিতর প্রকাশ্য যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনার ম্যানেজমেন্ট অনুমোদিত সম্মেলন ব্যবস্থা।

    • কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের সুষ্ঠু ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করার জন্যে কোম্পানিগুলোতে নমনীয় (ফ্লেক্সিবল) কাজের সিস্টেম, কর্মী-বান্ধব নীতি ও সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি খুবই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

    • যে সমস্ত মহিলা ইঞ্জিনিয়ার সাংসারিক দায়িত্ব বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে কর্মজগৎ থেকে ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে নিয়ে এসে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে, (দরকারে) নমনীয় কাজের পদ্ধতির মাধ্যমে, সফল কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, সেই কোম্পানি ও এই সেক্টরের সামগ্রিক উন্নতি বই ক্ষতি হবে না।

    • ঊর্ধ্বতন মহিলা কর্মীরা যাতে তাঁদের অনুজ সহকর্মীদের কর্মজীবনে (কেরিয়ার) পরামর্শদাতার ভূমিকা পালনের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন, তার জন্যে কোম্পানিতে বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থা ও বাতাবরণ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।

    সরকার ও রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক মন্ত্রণালয়

    • ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলিতে লিঙ্গ সমতার উন্নতির জন্যে পর্যাপ্ত নীতি নির্ধারণ ও তার যথার্থ প্রয়োগের ব্যবস্থার লক্ষ্যে সরকারি তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান।

    • পাবলিক সেক্টর কোম্পানিগুলির বিভিন্ন বিভাগে মূল কার্যসম্পাদন সূচকে (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর), লিঙ্গ সমতা যাতে নিশ্চিতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, সে ব্যাপারে সরকারের প্রাসঙ্গিক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দৃষ্টি রাখা জরুরি।

    • পরিবর্তনশীল সমাজ ও জীবনযাত্রা অনুযায়ী মহিলাকেন্দ্রিক আইন/নীতিগুলির পুনর্মূল্যায়ন ও প্রয়োজনে পরিবর্তন বা নতুন নীতি প্রণয়ন, মহিলাদের উৎসাহিত করবে আত্মবিশ্বাসের সাথে কর্মজগতে যোগ দিতে।

    মহিলা ইঞ্জিনিয়ারের নিজস্ব প্রচেষ্টা

    • প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য থাকবে কর্ম দক্ষতা অর্জন করা। তার জন্যে যা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দরকার সেটা নির্দ্বিধায় ম্যানেজার বা ঊর্ধ্বতন সহকর্মীর কাছে প্রকাশ করে অর্জনের উপায় করতে হবে।

    • সাহস করে এগিয়ে গিয়ে নতুন, কঠিন বা অজানা কাজের দায়িত্ব নিতে হবে। নেতৃত্ব দেওয়া ও পরিচালনা করার সুযোগ পেলে, সাহসের সাথে দায়িত্ব নিতে হবে।

    • নিজের মতামত আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রকাশ ও প্রয়োজনে নিজের অবদানকে লক্ষণীয় করে ম্যানেজমেন্টের দৃষ্টিগোচর করানো, কর্মজগতে উন্নতির জন্যে খুবই দরকারি।

    • এই ধরণের সেক্টরে, প্রায় বেশিরভাগ কাজই দলগত ভাবে করতে হয় এবং বিভিন্ন বিভাগের সহযোগীতা প্রয়োজন হয়। তাই, মৈত্রী ও সখ্যতার সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মহিলা ইঞ্জিনিয়াররা অনেক সময়ে সংখ্যালঘু হওয়ায় বা সামাজিক কিছু বাঁধাধরা ধারণার কারণে, পুরুষ সহকর্মীদের সাথে সহজ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলায় দ্বিধা বোধ করে। এই দ্বিধা কাটানো একান্ত জরুরি।

    • নিজের কাজের বাইরে, কোম্পানির অন্যান্য যেসব উদ্যোগ, অধিবেশন বা অনুষ্ঠান হয়, সে সবে অংশগ্রহণ ও পরিচালনা করলে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের/ জায়গার সহকর্মী, কর্ণধারদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে যা অনেক সময় ভবিষ্যত উন্নতির পথে সাহায্যে আসে।

    • আজকাল বহু কোম্পানিতে "মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম" বেশ প্রচলিত ও জনপ্রিয়। এই ধরনের ব্যবস্থায় কোনো ঊর্ধ্বতন বা উচ্চপদস্থ সহকর্মীর সান্নিধ্যে এসে, তাঁকে পরামর্শদাতা হিসেবে পাওয়া যায়। মহিলা কর্মীদের পক্ষে এই ধরনের ব্যবস্থা বিশেষ ভাবে সাহায্য করে তাদের পেশাজগতের বিভিন্ন সমস্যা, চড়াই-উৎরাই মোকাবিলা করতে।

    আশার কথা যে এই সেক্টরের বেশিরভাগ সরকারি, বেসরকারি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, লিঙ্গ সমতা ও বৈচিত্র আনার লক্ষ্যে বিশেষ প্রচেষ্টা করছে যার ফলে কিছু (অতি স্বল্প হলেও) যোগ্য মহিলা প্রযুক্তিবিদ তাদের প্রাপ্য পদোন্নতি পেয়ে সেই প্রবাদতুল্য "গ্লাস সিলিং" ভেঙে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ/ কর্ণধার পদে আসীন হতে সক্ষম হয়েছেন।

    লক্ষ্য হোক - কর্মজগতে (আলোচ্য সেক্টরে) লিঙ্গ সমতা আনার জন্যে মহিলাদের ক্ষমতায়ন, উৎসাহ দান ও উন্নতি।

    আশা রাখব, আগামীদিনে আরো অনেক মেয়েরা "কোর ইঞ্জিনিয়ারিং" পড়তে উৎসাহিত হবে, কর্মজগতে যোগ দেবে ও তাদের অবদান পাবে প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)