• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • গ্রন্থ-সমালোচনা : ভবভূতি ভট্টাচার্য

    || কী লেখা! কী ছবি! পদার্থের ঊর্ধ্বে!! ||



     অপদার্থ--হিমানীশ গোস্বামী; প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস্, কলকাতা-১৩; প্রথম প্রকাশঃ ১৯৯৪; ISBN নেই





    সত্তর-আশির দশকে ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকা খুলে হিমানীশের অনবদ্য কার্টুন ও ছোট্ট ছোট্ট লেখা (‘হাসতে হাসতে’) পড়ে আনন্দসাগরে ডুবে যাননি এমন পাঠক ছিলেন নাকি? আর হ্যাঁ, ওঁর দাবাখেলার উপরে কলামটিও যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল।

    ***
    ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ….’ প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এ’গান কে ভুলতে পারে? গীতিকার ছিলেন কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী, হিমানীশের মাতামহ। বাবা পরিমল গোস্বামী ‘যুগান্তর’ কাগজের রাশভারি যুগ্ম-সম্পাদক; এবং হ্যাঁ, ফোটোগ্রাফির চর্চা ছাড়াও উনি কৌতুক-রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাই লেখার হাতটা হিমানীশ বাপের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন বলতে হবে। যদিও লেখার চাইতে রেখাতেই ওঁর বেশি প্রতিষ্ঠা পাবার কথা ছিল কারণ যুবক হিমানীশ এককালে লন্ডনে গিয়ে রীতিমত কার্টুন আঁকবার প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন।

    ***
    থাক্‌ এ’সব সবজান্তা বুকরিভিউয়ার মার্কা কথাবার্তা।

    এ’-সংকলনের ‘চাঁদা’ গল্পটা পড়লেন?

    কৌটো ঝাঁকিয়ে পথে পথে ঘোরা বৈপ্লবিক পার্টির এক যুবতী ‘মহান বিপ্লব’-এর জন্য লেখকের কাছে কিছু চান্দা চাইলেন। নানান ধানাইপানাইয়ের পরে বেকার লেখকের প্রতীতি হলো যে, টাকা তো পুঁজিবাদীদের যেমন চাই তেমনই সাম্যবাদীদেরও। বিপ্লব করতে। তবে, আপাতত দশটি পয়সা হলেই চলবে। ওটি দেশলাই-বাক্স কেনবার খরচ। কারণ, ওটি দিয়েই বিপ্লবী জনগণের মধ্যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঘটানো যাবে!

    এই মানের রাজনৈতিক স্যাটায়ার বেশি পড়তে পাওয়া যাবে না! শিবরামের ‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’ মনে পড়ছিল, বা আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের ‘ফুড কনফারেন্স’!
    দুঃখ হয়, আজকের পাঠক হিমানীশকে ভুলে গেছে।

    ***
    অধম বুক-রিভিউয়ারের আক্ষেপ, বেশি বেশি লিখে কোনো পুস্তকের উদরোন্মচন করে দিতে নেই, আবার প্রিয় লেখাগুলির সঙ্গে পাঠকের পরিচয় না করিয়ে দিলে তিনি রসাস্বাদনই বা করেন কী করে? তবু, ১৯৭০-৯০ দশকে লেখা এ’সংকলনের ‘ভোট দিন’, ‘বিবেকের তৃতীয় আক্রমণ’, ‘রিলে গণ-অনশনের শহিদ’ বা, ‘অপদার্থ’ গল্পগুলি উচ্চমার্গের ব্যঙ্গরচনা হিসেবে ঠাঁই করে নেবে পাঠকের মনে।

    তাছাড়াও দ্রব্যমূল্য থেকে ফ্যাশান থেকে প্রেম-ভালবাসার সমকালীন হদিশ খুঁজে পেতে ভবিষ্যৎ কোনো গবেষক এ’বইয়ের পাতা ওল্টাবেন (যেমন, মুখবন্ধে লেখা আছে ১৯৬০-এর দশকে শাড়ির দাম, বা সত্তরের দশকে কলকাতায় ট্যাক্সি ভাড়া)।

    ***
    ১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে জন্ম নিয়ে কলকাতার ‘প্রতিক্ষণ’ পাবলিকেশনস্‌ একটা আলোড়ন তুলে দিয়েছিল। এঁদের জীবনানন্দের বইগুলি ও আর্ট/সিনেমা সংক্রান্ত গ্রন্থমালা ছাত্রজীবনে গোগ্রাসে গিলতাম আমরা। এবং এঁদের মাসিক পত্রিকাটি! গ্রন্থ-নির্মাণ বিষয়টিকে একটা উচ্চ শিল্পের স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয়ব্রত ও স্বপ্না দেব। আজকে এই পুরাতন বইটি হাতে নিয়ে সে সব স্মৃতি মনে আসছে।

    চমৎকার প্রচ্ছদচিত্র বইখানির (কৃষ্ণেন্দু চাকী-কৃত), যদিও অনুযোগ থাকবে, প্রচ্ছদখানি স্বয়ং হিমানীশের আঁকা ছবি দিয়ে হলো না কেন? কারণ, লেখায়-না-রেখায়--কিসে উনি এগিয়ে ছিলেন--এটা আমাদের মনে ধন্ধ রেখে দেয়। অতি সরল কয়েকটি আঁকিবুকিতে কৌতুকচিত্র ফুটিয়ে তোলা... আরেকজনমাত্রের কথা মনে আসেঃ লীলা মজুমদারের লেখার এমনই অলংকরণ করতেন তৎপুত্র ডাঃ রঞ্জন মজুমদার!

    মাঝে মাঝে মন ভালো করে নিতে এমন বই হাতে তুলে নিতে হবে বৈকি?


    || যে বইয়ের কোনো রিভিউ লেখা যায় না ||



     Jungle Trees of Central India: A Field Guide for Tree-spotters--Pradip Krishen; Penguin Books, Gurugram Haryana, India; First published in 2013; ISBN 978-0-143-42074-3




    আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে একটা চমৎকার সিনেমা এসেছিল, ‘মেসি সাহেব’ (১৯৮৫)। হিন্দিতে। রঘুবীর যাদবের প্রথম অভিনয়, নায়িকা অরুন্ধতী রায়। হ্যাঁ, বুকার-খ্যাতা! আরও একজনের প্রথম ছবি ছিল সেটি। অরুন্ধতীর স্বামী পরিচালক প্রদীপ কৃষেণের। প্রদীপের দ্বিতীয় ছবিটিও ছিল অতি বিখ্যাত--ছাত্রদের হস্টেলজীবন নিয়ে।

    সাকুল্যে মাত্র তিনটি আইকনিক ছবি করে হেলায় সিনেমাজগত ছেড়ে মধ্যভারতের গাছপালা দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলেন প্রদীপ, আজ চুয়াত্তর বছর বয়সেও যাঁর সে দেখা শেষ হয়নি। (এখনও ঠিক্কর দুপুরে দিল্লি নগরীর গাছ দেখাতে উৎসাহীদের দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন যুবক প্রদীপ, ওঁর সাইটে ট্যুর-বুকিং করা যায়!!) ভাগ্যিস বেরিয়েছিলেন, নৈলে এ’ বইখানি হাতে নেওয়া হতো না, অপূর্ণতা থেকে যেত। কাগজ-কালি-রং-ছবি-লিখন… এ’সব দিয়ে তো একখানি বই তৈরি হয়। কিন্তু এ’সবের ঊর্ধ্বে উঠে একখানি বই যে কতটা ‘ভালো লাগা’ তৈরি করতে পারে এই জাঙ্গল ট্রি বইখানি হাতে তুলে না নিলে বোঝা যাবে না। বই যাঁরা ভালোবাসেন, ভালোবাসেন গাছপালা, সবুজ--এ’বই তাঁদের না পড়ে উপায় নেই।

    অনেক সৌভাগ্য থাকলে এমন একখানি বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা যায়।
    হ্যাঁ, আবার বলি, অনেক সৌভাগ্য থাকলে এমন একখানি বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা যায়।

    অনেকদিন পরে একখানি কেতাব এতটা মথিত করে দিয়ে গেল!

    ****
    শিরোনামে কেতাবটিকে ‘ট্রি স্পটার’-দের ক্ষেত্র-নির্দেশিকা বলা হয়েছে। ঐ ‘স্পটার’ শব্দটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অঞ্চলে ‘স্পট’ করে নিতে হবে এক একটি গাছকে। আয়তনে ‘মধ্য ভারত’ ফ্রান্সের চেয়েও বৃহত্তর। ঘোর জঙ্গলাকীর্ণ। সেখানে কোন্‌টি ‘কাশুল’, কোন্‌টি ‘পিপলি’, বা ‘গুরার’ সেটা চিনে নিতে বটানিস্টের ব্যুৎপত্তির চেয়েও বৃক্ষের প্রতি দরদটা আগে লাগে--আর, হাতের কাছে এমন একটা বই থাকলে তো কথাই নেই। না, প্রদীপ বটানিস্ট নন, অক্সফোর্ড থেকে পাশ করে এসে দিল্লির কলেজে ইতিহাস পড়িয়েছিলেন কিছুদিন। তবে, এ’বইয়ে যে যেভাবে গোড়া থেকেই ‘কি-ওয়ার্ড’, ‘ট্রি-ক্যাটালগ’ ইত্যাদি ইত্যাদি ভাগ ভাগ করে দিয়েছেন উনি, আমা-হেন গোলা লোকেরও রসগ্রহণে বাধা হয়নি।

    বহু বহু তথ্য তো এখনই জানলাম (এ’কলমচিও বটানিস্ট নহেন কিনা)।

    যেমন, জঙ্গলকে যে গোড়াতেই শালের জঙ্গল, সেগুনের জঙ্গল, পর্ণমোচী জঙ্গল, সাভানা, ঝোপঝাড়--এমন এমন ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায় তাই কি জানতুম? ছেলেবেলা ভূগোল বইয়ে একটু-আধটু পড়েছিলুম বটে। এবং এই এই প্রকার বিভাগ/উপবিভাগ কোনো পাঠককে বইটির রসাস্বাদনে সাহায্য করে। এ’ছাড়াও বৃক্ষবিভাগে ‘সরলপত্রী’ ও ‘যৌগিকপত্রী’ বিভাজন করে সুদীর্ঘ ও উপাদেয় আলোচনা করা হয়েছে। এ’ বইয়ের একেকটি পাতা খোলা একেকটি ধনভাণ্ডারের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া! সাধে কি আর প্রদীপের এ’গোত্রের প্রথম কেতাবটিকে (Trees of Delhi) ‘এক প্রকৃত রত্নভাণ্ডার’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন স্বয়ং খুশবন্ত সিং সাহেব!

    ***
    চারশ’ পৃষ্ঠাব্যাপী বইটির প্রতিটি পাতার হেডিঙে বড় বড় অক্ষরে গাছটির আঞ্চলিক নাম (পাশেই তার উচ্চারণ), থেকে শুরু করে তার বৈজ্ঞানিক নাম, গোত্র, সংক্ষিপ্ত-ও-বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া আছে। এবং তারপরেই দু’-তিনটি কোণ থেকে গাছটির বড়/ছোট ছবি, তার ফল-ও-ফুল, বাকল, ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেসবের রূপবদল ইত্যাদি ইত্যাদি… কী নেই? ভুরিভোজ একেবারে! এ’বই একবার হাতে নিলে সপ্তাহখানেকের খোরাক হয়ে যায় শুধু এর ছবিগুলির ক্যাপশন পড়তে। লেখক/ফটোগ্রাফার হিসেবে কেবল প্রদীপ কেন, কাদম্বরী মিশ্রের নেতৃত্বে পুরো প্রোডাকশান টিম--গোলক খাণ্ডুয়াল, অনিশা হেবলে ও ধীরাজ অরোরাও সমানভাবে ধন্যবাদার্হ এ’বইয়ের নির্মাণকার হিসেবে।

    ***
    অত অত তাত্ত্বিক বিভাজনের মধ্যে না গিয়েও কেবল ছবি দেখলে, শুধুই ছবি দেখতে থাকলে মনপ্রাণ ভরে যায়। পাক্কা দুই হাজার ছবি আছে এখানেঃ সবুজে সবুজ।
    যত কাঠফাটা গরমেই এ’বই পড়ুন না কেন সবুজ স্নিগ্ধতায় ভরে উঠবে ঘরটা, এবং সঙ্গে সঙ্গে মনটাও।

    তাই, এর গ্রন্থ-সমালোচনা লেখা যায় না।


    || বঙ্গীয় মাণিক্য ও ভূপ-বাহাদুরের কাহিনি ||



     বঙ্গের দেশীয় রাজ্য--রাজর্ষি বিশ্বাস; গাঙচিল, কলকাতা ৭০০১১১; ২০১১; ISBN 978-93-90621-29-3





    এ’ গ্রন্থের শিরোনামখানি দেখে মেলার লক্ষ বইয়ের মধ্যে থেকে এটিকে হাতে তুলে নেওয়া, কারণ ঠিক এই বিষয়ের উপরে জানবার আগ্রহ তো বরাবরই ছিল কিন্তু তেমন বই আগে নজরে আসেনি। এ’খানি যথেষ্ট পৃথুলা, পৌনে তিনশত পৃষ্ঠার। কাশ্মীর-গোয়ালিয়র-বরোদা-হায়দ্রাবাদ-মহীশুরের মতো সর্বোচ্চ একুশ তোপের দেশীয় রাজ্যের পাশাপাশি বঙ্গদেশের তেরো তোপের দুইটি রাজ্য কোচবিহার ও ত্রিপুরার উপরে যে এক নবীন গবেষক তাঁর ডক্টরেট পেপার পেশ করতে পারেন, এবং সেটি যে এই ‘আনপুটডাউনেবল’ মানের বই হয়ে উঠতে পারে-- এ’খানি না পড়লে প্রতীত হতো না, যদিও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরানরেশ বীরচন্দ্রমাণিক্যের সখ্যতা বা কোচবিহারের ভূমিপুত্র আব্বাসউদ্দীন সাহেবের গান--এসব তো বহু প্রচারিত।

    কোচবিহার কাপ/ট্রফি তো ভারতের ক্রীড়াজীবনের অঙ্গ!

    ***
    কোচবিহার ও ত্রিপুরা--অবিভক্ত বঙ্গভূমিতে দুইটি মাত্র দেশীয় রাজ্য ছিল যারা সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের অঙ্গীভূত না হয়েও নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছিল, প্রথম আলো উপন্যাসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যার একটির সম্বন্ধে লিখে গেছেন। এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যে দুটি রাজ্যেরই অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল, বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্রের বিলাতযাত্রার জন্যে ত্রিপুরানরেশের অর্থসাহায্য নিতে গুরুদেব যে স্বয়ং সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন--এ’সব লিখিত ইতিহাস।

    রবীন্দ্রনাথের সমবয়স্ক কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুর (১৮৬৩-১৯১১), যাঁর সঙ্গে কবির নিয়মিত পত্রাচার চলতো, ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী। ১৮৭৭-৭৮ দুই বৎসর উনি এই কলেজে আইন বিভাগে পঠনপাঠন করেছিলেন, যখন ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্রতনয়া সুনীতির সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় (যা নিয়ে যত কোঁদল)। বঙ্গজীবনের অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও এই দুই রাজ্য নিয়ে মূলধারার বাংলা সাহিত্যে/ইতিহাসে খুব বেশি যে লেখা হয়েছে তা নয়। অবশ্য, এই ‘পরবাস’ পত্রিকাতেই কোচবিহারের ভূমিপুত্র দেবায়ন চৌধুরীর বেশ কিছু উপাদেয় নিবন্ধ আমরা পড়েছি।

    ***
    সপ্তম শতাব্দীতে প্রখ্যাত চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবৃত্তান্তে প্রত্যন্ত পূর্বভারতের ‘কামরূপ’ রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, যে অঞ্চল কিনা ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলার কোচ রাজত্বের অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ্‌ খাঁ চৌধুরী আমানত উল্লাহ্‌ আহমেদ সাহেবের মতে প্রাগ্‌জ্যোতিষপুরও (বর্তমান গুয়াহাটি অঞ্চল) প্রাচীনকাল থেকে বাংলার প্রভাবাধীন ছিল। এত জাজ্বল্যমান প্রমাণসহ রাজর্ষিবাবু উপস্থাপন না করলে বঙ্গদেশের এ’হেন প্রোজ্জ্বল ইতিহাস আর কী করেই বা আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের কাছে জ্ঞাত হয়ে পড়ত?

    ***
    আটখানি সুসংবদ্ধ অধ্যায়ের মধ্যে তাঁর বক্তব্যকে চমৎকার উপস্থাপিত করেছেন লেখক, তার একেকখানি উপ-অধ্যায় পড়লে অভিভূত হতে হয়। প্রতিটি অধ্যায়ান্তে যে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যসূত্র দেওয়া রয়েছে তার মান দেখে শ্রদ্ধাবনত হই। যেমন, তৃতীয় অধ্যায়ে “রাজকাহিনি” লিখতে গিয়ে যুগপৎ কোচবিহার ও ত্রিপুরা রাজ্যের বিশ্বসিংহ-নরনারায়ণ থেকে বীরচন্দ্র-রাধাকিশোরমাণিক্যের যে আখ্যান লেখক লিখেছেন, অন্যথায় সেটা জানতে গোটা পাঁচেক বই তো পড়তে হতোই আমাদের। বাইশ বছর বয়সের অনামী কবি রবীন্দ্রনাথ প্রথম আর্থিক পুরস্কার পেলেন। ত্রিপুরানরেশ বীরচন্দ্রমাণিক্য (১৮৩৯-৯৬) একটি রৌপ্যথালিতে করে দশটি টাকা এবং একটি লাল গামছা ও মানপত্র পাঠালেন, যেটি দিতে ত্রিপুরা থেকে বারোদিনের পথ বেয়ে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এসে উপস্থিত হন জোড়াসাঁকোতে। এ’সব কেবল গল্প-উপন্যাসে লেখা না রয়ে থেকে মান্য ইতিহাসে যে ঠাঁই পেয়ে যাবে, সেটা আনন্দের কথা।

    ***
    ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলি নাকি কু-শাসনের পরাকাষ্ঠা ছিল-- সাহেব ইতিহাসবিদ্‌ ও ইংরেজি প্রেসের এ’হেন অপপ্রচারে মুখের মতো জবাব বরোদায় দিয়েছিলেন মহারাজ সয়াজীরাও গায়কোয়াড়। তাঁর প্রচ্ছন্ন মদত না পেলে আইসিএস-ত্যাগী অরবিন্দ ঘোষের স্বদেশী চিন্তার উন্মেষ হতো না। ওদিকে কোচবিহারনরেশ নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুর তাঁর মহিষী সুনীতিকে সঙ্গে নিয়ে কোচবিহারের যে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন তাতে রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় লিখলেন, ‘দেশীয় রাজ্যের ভুলত্রুটি-মন্দগতির মধ্যেও আমাদের সান্ত্বনার বিষয় এই যে তাহাতে যেটুকু লাভ আছে, তাহা বস্তুতই আমাদের নিজের লাভ। তাহা পরের স্কন্ধে চড়িবার লাভ নহে, তাহা নিজের পায়ে চলিবার লাভ।’

    সেকালে কোচবিহারের ‘সুনীতি একাদেমী’ (প্র. ১৮৮১) ও দার্জিলিঙে ‘মহারাণী গার্লস স্কুল’ (প্র. ১৯০৮) এই হার-হায়নেসের উদ্যোগেই হয়েছিল-- আজও রমরম করে চলছে।
    বৃহত্তর বঙ্গদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য দিককে এ’ বই যেভাবে তুলে ধরেছে, না পড়লে জ্ঞানের খামতি থেকে যেত আমাদের।


    || রাঁড়ি-বাড়ি-জুড়িগাড়ি….বলিহারি কলকেতা ||



     আরেকটা কলকাতা-- সুপ্রিয় চৌধুরী; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা-৯; প্রথম প্রকাশ ২০১৮; ISBN 978-93-88014-02-1





    ১৯২০-এর দশকে হেনরি মর্টন নামের এক যুবক লন্ডনের পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন, আর আবিষ্কার করতেন তাঁর চেনা শহরের মধ্যে অচেনা শহর লন্ডনকে! উনি তখন সদ্য মিশরের টুটানখামেনের মমির উপরে রিপোর্টিং করে এসে নাম কিনেছেন। আজকের ভ্রমণসাহিত্যের পাঠক অবশ্য ওঁকে মনে রেখেছে ক্লাসিক ইন সার্চ অব্‌ লন্ডন সিরিজের বইগুলির জন্য, ব্রিটিশ সোসাইটি ফেলোশিপ দিয়েছে ওঁকে। জানি না, আমাদের কলকেতার ভ্রামণিক সুপ্রিয়বাবু পরিচিত আছেন কিনা মর্টনসাহেবের লেখার সঙ্গে, কিন্তু ওঁর লেখায় যে তেমনই বাস! নৈলে, এই বইয়ে ময়দান-মোগলাই-মেলার অধ্যায়গুলি পড়তে পড়তে মর্টনের লেখা মনে পড়ে যাবে কেন?

    ****
    না, লন্ডনের মতো সহস্রাধিক বছরের পুরানো শহর হবার দরকার নেইকো, হোক্‌ না মাত্তর সওয়া তিনশ’ বছরের শহর, তা বলে কি কলকেতার ‘অন্য-ইতিহাস’, ‘অন্য-ভূগোল’ বা, ‘অন্য-সমাজচিত্র’ থাকতে নেই? এই ‘অন্য’ বা, ‘আরেক’ কলকাতাকে নিয়েই আজকের বইটি। এবং যথেষ্ট সুখপাঠ্য ও উৎসাহ উদ্রেককারী।

    যেমন ‘না-মানুষী কলকাতা’ অধ্যায়টিকে ধরা যাক্‌, যেটিকে বেস্ট বলতে মন চায়। ‘যে জীবন ফড়িঙের দয়েলের’
    তাদের সঙ্গেও তো প্রিয় শহর কলকাতার জীবনে জীবন যোগ করে নেওয়া আছে! কী পরম মমতায় সুপ্রিয় দেখেছেন কলকাতায় বসন্তবউরি পাখি, বা খঞ্জন বা লক্ষ্মীপেঁচা বা বেঁজি! ইনিই আবার কলকাতার মোগলাই খানার ঠেক বা অদ্ভুত সব পেশার মানুষ বা ঝি-স্পেশাল ট্রেন দেখেছেন জিজ্ঞাসু চোখ দিয়ে। কলকাতার পকেটমার বা গণিকারাও চোখ এড়ায়নি তাঁর।

    একটু পড়িঃ
    “…মোড় ঘুরেই এন আর এস মেডিক্যাল কলেজের প্রথম গেটটার দু’ধারে বসতো পশুপাখির হাট। আজকে মনে হবে গুল মারছি, বড় বড় মোটা জালের খাঁচায় ভরে অবাধে বিক্রি হতো ভালুকছানা, বাঁদর, চিতল হরিণের বাচ্চা…থেকে….কচ্ছপ”
    (‘কলকাতার হারিয়ে যাওয়া মেলা’)
    বা,
    “ভোরবেলা। কুয়াশাঘেরা ময়দান। কথা বলতে বলতে মেয়ো রোডের মোড় পার হচ্ছিল রোগা রোগা ছেলে দুটো। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে সস্তা জার্সি, বুট, নিক্যাপ। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মতো দামী বুট পরে মাঠে নামার স্বপ্ন…”
    (‘ময়দান-ই-কলকাতা’)

    সত্যি, এ’বইয়ের অধ্যায়গুলো পড়তে পড়তে বয়স কমে যায় অনেকটাই, কারণ ফুটবল থেকে আলুকাবলি, লক্কাপায়রা থেকে কাঁচের-বয়ামে-পোষা রঙিন মাছ--এমন অনেক স্মৃতিই ভিড় করে আসে মনে যা আজ আর আমার কলকাতায় নেই, বা প্রায়-নেই।

    প্রথম অধ্যায়টি কী তথ্যবহ! ‘কালো কলকাতা’ ! গোপাল পাঁঠা থেকে ভানু বোস থেকে ফাটাকেষ্টা থেকে হেমেন মণ্ডল! মীর মহম্মদ ওমর! একসঙ্গে এত এত জন কলকাত্তাইয়া মস্তানের গল্প আগে কোথাও পড়িনি।

    বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, শহর কলকাতা নিয়ে লেখাও হতে থাকবে ততদিন। এ’বইটি তার মধ্যে একখানি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)