• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫৯ | এপ্রিল ২০১৫ | গল্প
    Share
  • বিষমবাহু : শ্রাবণী দাশগুপ্ত


    হৈমন্তীকে কি যেন ঝাপটাচ্ছে। সে ভাবুক গোছের নয়, তবু রক্তের ঢেউয়ে কুচিকুচি ফেনা গহীনে, তটেও, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ।

    পরিচয়পত্র এক

    নাম– হৈমন্তী বাগচি
    বয়স– অনুমেয়
    শিক্ষা– বি এসসি দ্বিতীয়বর্ষ পর্যন্ত
    সামাজিক স্থিতি–বিবাহিত (৩২বছর)
    কর্ম/পেশা– স্থায়ী গৃহিণী; মহিলা ক্লাবের সদস্য
    নেশা– দূরদর্শন-ধারাবাহিক, রন্ধন ও স্বাস্থ্যচর্চা
    পরিবারের সদস্যসংখ্যা– চার (আপাতত দুই)।

    পরিচয়পত্র দুই

    নাম– শৈবাল বাগচি
    বয়স– তেষট্টি
    শিক্ষা– ইঞ্জিনিয়ারিং আই আই টি (রিটায়ার্ড)
    সামাজিক স্থিতি– বিবাহিত (৩২বছর)
    কর্ম/পেশা– নিজস্ব
    নেশা– সংবাদপত্র, স্পোর্টস চ্যানেল, ফ্যাশন চ্যানেল,
    পরিবারের সদস্যসংখ্যা– চার (আপাতত দুই)।

    পরিচয়পত্র তিন

    নাম– অর্ফিয়ুস
    বয়স– সম্ভাব্য ত্রিশ
    শিক্ষা– চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্ট
    সামাজিক স্থিতি– বিবাহিত
    কর্ম/পেশা– এম এন সি (অধুনা সঙ্গীতকার)
    নেশা– সঙ্গীতরচনা ও সুরসংযোজন
    পরিবারের সদস্যসংখ্যা– আপাতত দুই।

    ঘরের মধ্যে পাহাড় ফাটার বা বন্যার শব্দটব্দ না হওয়াই স্বাভাবিক কেন না ওরকম হয়না আদতে। যেটা হবার এমনিতেই হয় তিল প্রমাণ না রেখে। গোবেচারা সন্ধেবেলায় এসব উল্টোপালটা দোল খাওয়া ভাবনা, তাই আগেই ভাবনার ঘরে একটা বড়সড় তালা লাগিয়ে দেওয়াটা বরং প্রিয় বিচক্ষণতা। শীত শেষের এতোল বেতোল হাওয়া জানালা দিয়ে ঢুকছে বারবার এবং ঢুকেই পড়ছে, আর কী বিশ্রী চারদিক ধুলোয় ধুলো! টেবিলের কাচ টিভির স্ক্রিন সোফার হাতল পিঠ মুছে মুছে শেষ হয় না তো কী করা যাবে? বাতিক বাতিক, ওসিডি, মনোরোগী! বলুক গে, যা মনে হয় বলুক। চলছে তো ওভাবে, থেমে তো আর নেই কিছু।

    সঞ্চালিকা প্রায় সঙ-এর মতো সাজগোজ করে (নাকি সাজতেই হয়!) কথা বলে কেন এত; হলো বা মানায়, হলোই বা সুন্দরী। বুকের মধ্যিখানে যে বিশাল ধাতু-পাথরের প্রবল আদিবাসী লকেটটা, ওরকমটা তো-হিমাচল প্রদেশ থেকে এনেছে নির্ঘাত। কী উদ্ভট প্রশ্ন রে!

    —হাই অর্ফিয়ুস! নামটা বদলে ছদ্মনাম কেন?

    তা বেশ করেছে, কিন্তু কেন বদলালো দেখা যাক ব্যাপারটা! নাম আবার কি? লোকের নাম থাকে কেন? না, যেটা ডাকলে জন্তু-জানোয়ার পাখিটাখি মনে হবে না, আর অন্যের খানিকটা সঙ্গে পৃথক করে বোঝানো যাবে, এই।

    —দেখুন সন-চালিকা, আসলে আমার নামটা কমন আর, এই একটু সেকেলেও বলা যায়।

    তাতে কী? হুম, কি নাম? এলসিডি-র সাইজটা অতি বড় এনেছিল শঙ্খ, অথচ স্লিম স্লিক রুমানী, ছবি দুর্ধর্ষ। শৈবালের কেনা পুরোনো স্বাস্থ্যবান টিভি খোদ শয্যাকক্ষে আপ্যায়িত। ডিশ এ্যান্টেনা, হ্যানত্যান, দেখে কে? উপদ্রবের পুরোটা আয়োজন করে দিয়ে স্কলারশিপে তিন বছরের নামে ভাগল বা! ফিরেও কি তুই আর এই গ্যাঞ্জাম শহরটায় - অত ভরসা নেই। অতএব হাতে রইল পুরোনো পেনসিলটা। এখন আবার কম্প্যুটার শেখো, নেট চ্যাট করো - হাওয়াই নির্দেশ। জবরদস্তি না? কী দরকার একটা আদ্যন্ত যন্ত্রমানব হয়ে! বেশ তো, যথা পূরবে তথা পরে; না কি যেন ওইরকম কিছু একটা। সমসকৃত-টিত আসে না কোনো কালে।

    কালো কালো সিরিয়াস তেলবেণী মাথায় বিজ্ঞান অর্থে বিশেষ জ্ঞান - নিউটনের সূত্র, মাইকেল ফ্যারাডে। অঙ্কে লেটার। তবু এদিকে সাত সকালেই সুন সুন সুন দিদি তেরে লিয়ে এক - পিঠোপিঠিগুলোর কী লম্ফঝম্প। শৈবালের মা ক্ষেপে গিয়েছিলেন এই বৌ-ই চাই, করে। ছোটখাট গুড়িয়া, জ্বাল দেওয়া ঘন দুধ রঙ, তেমন বাড়ন্ত গড়ন না, কিছু না। মন দিয়ে বি এসসি পড়ছিল তখন। মাও তো তেমনি; হাতে যেন হীরের টুকরোটা! খুব কথা, ওরা না কি পরে পড়াবে। সব হলো! বৌ হলো, বাকি সব গেল। কেলেকুষ্টি শেওলা রঙের হেই উঁচু একটা পাহাড়তলিতে এতগুলো দিন গড়াতে গড়াতে; মানিয়েছে কিনা তাও সেই ভগাই জানে। সারাদিন বইমুখো, জার্নাল-ম্যাগাজিন-সংবাদপত্র আর বাকি সবেতেই হচ্ছে, হবে। এযাবত শুক্তিটা যতদিন কাছে ছিল বেশক গুজুর গুজুর চলতো। আজকাল সেও তো...বড্ড কাজের চাপ যাচ্ছে মা; একফোঁট্টা সময় খালি নেই। হায় রে মা! আগে কত বয়ফ্রেন্ড-টেন্ডের গল্প শোনাতিস, এখন তারা গেল কোথা! বিয়েটা পবিত্র এবং অবশ্য করণীয়, সেটাও তো মানতে হয়। সময় নেই কী কোনো একটা কথা সোনা মা!

    সেই প্রায় প্রাচীনকালে কম্পাসাঙ্কিত মুখ, সোনা রং, চাঁদকপালে লাল মিনেকারি, আবার তাতে বড়সড় দুটি ভ্রমর আর ভেজা ভেজা কাচ, ছোটমতো গোলাপি মাখোমাখো উলটোনো-যুগল প্রায় সব সময়তেই টৈটম্বুর।

    —আহা ছেলেমানুষ রে, ওকে বকিস না বুলু –

    কে যেন বলতেন দিদিশাশুড়ি না বড় পিসশাশুড়ি মনে পড়ছে না এখন। শুক্তি রে, তুই কি বুড়ো হলে পরে ছেলেমানুষ হবি মা? সেই তখন ফোঁপাতে ফোঁপাতেই প্রথম প্রথম কত্তগুলো মাস।

    —আ-রে তুমি এত ভয় পাও কেন? ঘামছ এই ঠাণ্ডাতে, খারাপ লাগছে? এই দিকে এসো কথা বলি।

    —আচ্ছা ঘাম হবে না, হাতপা ঠাণ্ডা হবে না, যদি পাহাড়ের কাছে কেউ একাবোকা দাঁড়িয়ে থাকে?

    সন-চালিকা গুছিয়ে চালাচ্ছে।

    —আচ্ছা অর্ফিয়ুস তুমি কি কলেজে থাকতেও গান গাইতে এরকম?

    হাসিটা বেশ মিঠেকড়া রোদ্দুর যে রে, হালকা ওম। বাঃ, খেয়াল হয়নি তো এই দুটিতে আবার কখন?

    —অর্ফিয়ুস, এরা দুজন আজ ভাগ্যবান দর্শক, তোমার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেল। -হাই অর্ফিয়ুস! আমি সায়র! –আমি তিয়াসি! ভাবতেই পারি নি এতটা লাকি হব। প্লিজ একবার তোমার হাতটা দাও, একটু ছুঁয়ে...! মা গো, কী আদিখ্যেতা! ন্যাকা বটে মেয়েটা। নেভিব্লু ঝিলমিল স্যাটিন ফ্রকটা যেন হাঁটুতে শেষ, পা-ঢাকা পোশাক ভালো ছিল না? উদোম পাদুটো কায়দায় ঘুরিয়ে, বুকটুক সতেজ টানটান। ছেলেটার থুতনির কাছে এই এতটুকু, ওটাকে দাড়ি বলে! তবে আপত্তির কিছু না, ভালো ফিগার তো দেখানোরই, সিলিন্ডার হলে আলাদা। (তবে তাই কি প্রথম থেকে ছিল নাকি?) যেমন অকল এদের, এই মেয়েগুলো বোঝে না যে লজ্জা পাচ্ছে নোতুন গায়ক। গাইবে কী, ভারি লাজুক তো! মুখের চেহারা ভালো দেখাচ্ছে না তেমন। আসলে, পাকাপোক্ত সেলেব/টেলেব হয়ে ওঠেনি বুঝি এপর্যন্ত। না কি, আবার এটা তার ভান? ভান হয়তো নয়, মাথা নিচু করেই বসে আছে। গিটারটায় টুংটুং, টিংটিং; তার সাজাচ্ছে কোন গানের? ...আ-রে ঘোমটাটা সরাবে তো, দেখিনা দেখি, কোথায় আবার সেফটি পিন লাগিয়ে রেখেছ, ওহ ফুটে গেল! (বাবা গো, পর্বত রাগ করছে! গর্জন, না এরকম আওয়াজ, এমনই?) ভ্যাঁ-টা জোরে হলো না শুধু, বাকি কাজল-টাজল গলে দুধের সরের ওপরে কালো কালো ধারাবৃষ্টি। ...খেয়েছে, এটা কী হলো আবার? জিসকি বিবি নাটী উসকা ভী বড়া--! পাঁজাকোলা হয়ে তখন দুই খড়খড়ে শক্ত লোমঅলা হাতের ভাঁজে, এমা! গোলাপি পপিন্স ফাঁক হয়ে সরে দুসারি জুঁই ফুল, তখন তার ওপরে আস্তে করে ঝুঁকে আসছে বড়সড় কালো মেঘটা। সত্যি চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সর্বাণী আর কণিকা হিং হিং করছিল; তুই কী লাকি, কী লাকি তুই, টল ডার্ক হ্যান্ডসম আবার দারুণ গোঁফটা। ...এই তুই নাকে খোঁচা খাস না?...এই বলনা, খুব রোম্যান্টিক, নারে?...এই তোকে আই লভ ইয়ু...? ধ্যাত, কী যে! রো-ম্যা-ন- ঈঈ, হেহে, যা ভাগ! ...অর্ফিয়ুস, তোমার এই অসাধারণ গলা প্লাস মেধার সমন্বয়; সত্যি, কি বলব! বাড়ি থেকে উৎসাহ পেয়েছ গান গাওয়াতে? ...মূলত পড়াশোনাই, গানটা প্যাস্টাইম ছিল, প্রফেশন হিসেবে ভাবি নি। ক্যান্টিনে করিডোরে চুটিয়ে গীটার--ব্যাপক প্যারডি। এত বকবক কথা না বলে গান শোনালেই তো পারে। কী সব কথা ওর গানগুলোর, আহা। বাউল থেকে একটু/আধটু টুকলি আছে অবশ্য সুরে, ওতে তেমন দোষ নেই। ঠাকমা সন্ধেয় কীর্তন গাইত যে কানে বসে গেছে। ...শোন হাসি, গা ত; ভগবান তোর গলায় বড্ড সুর দিছিল, শিখাইলনা বাপকাকায়। বেচারি বুড়ির দুচোখই অন্ধ, নাতজামাইএর মুখখানা মরণ পর্যবন্ত অদেখাই। ছবছরের বনবাস অবাংলায়, হনিমুন ভী। কম্ম সারা, পরপর দুবছরেই হম দো হমারে দো কমপ্লিট। নইলে বয়স বেড়ে বেড়ে যাবে যে! সারাদিন কারখানা সেরে, সন্ধেয় দুধের টিন ওষুধ, ফিরে সংবাদপত্র নামের নেশায় আত্মসমর্পণ ও দেশের সমস্ত বাচাল খবর সংগ্রহ করতে করতে বিছানায় কাত হয়ে, এবারে এদিকে এসো না, অতক্ষণ কী করছো? ওরে বাবা দাঁড়াও হিসি হল; ঈস আবার তুইও দুধ তুললি কেন--এই একটু ধরবে গো? ততক্ষণে ওপাশেও গররর নাসিকা সংলাপ। ...অর্ফিয়ুস, ওই ছবির পরিচালকের সঙ্গে তোমার পরিচয় কি ভাবে? এইরকম করে হাসে কেন অর্ফিয়ুস? ও কেন চুরি করে, কী যেন তারপর; লুকোতে গিয়ে হাসি/হেসে পালায়! ঈস, হাসিটা বুকের মধ্যে ক্ষীর। ...পরিচালক আমার ছোট্টবেলার ক্লাসমেট, পরে অবশ্য ও সরে অন্য লাইনে। অহো কী গায় গো! মুখ ব্যাঁকানো নেই, মুণ্ডু ঝাঁকানো নেই, গায়ে কাঁটা। হ্যাঁগো লিপ দিচ্ছ নাতো? কী করে এমন পারে! সেই যে কবে কলেজের নবীনবরণে স্বনামধন্য শিল্পীমানুষ, তখন তো তিনি তত যুবকও নন; ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস--অডিটোরিয়াম তোলপাড়। একটা অটোগ্রাফের জন্যে শুধু সব্বাই জবা অনুপমা বাবলি; প্লিজ প্লিজ। দুতিনটে বছর পরে আরো একবার। ...যাবে নাকি, গান শুনতে যাবে? অফিসের কালচারাল স্বর্ণজয়ন্তী বলে দুএকজন বিখ্যাতকেও ডাকা হচ্ছে। তাই? (এত ভালোবাসি এত ভালোবাসি!) তক্ষুণি হ্যাঁ হ্যাঁ এবং হ্যাঁ! বেণীটা লম্বা ঢিলে ঢিলে করে বেঁধে, নোতুন সরু জরিপাড় ঘন জামরং চান্দেরি, হীল শু। তখন থেকেই অবশ্য একটু রোলার-টাইপ; সামনে গোল, পেছনে গোল, ভারী ভারী, গিন্নিমত। তাতেই তো--কি দেখাচ্ছে তোমার বৌকে শৈবাল! তোমার মেয়ে বলেই চালিয়ে দেওয়া যায়, হরণ করব? হা-হা-হা-হা। হুঁহুঁ, আর কিছু নয়? পাশের সীটে বসে আড়চোখে কোঁচকানো ভ্রূ, ফিসফিস। ...বেশি হাসবে না বুঝেছ?...এত বড় গলা ব্লাউজ কেন?...পিঠটা ঢাকা দিয়ে নাও তো! (কান্না পেয়ে গেছে যে! নিজের ভালো না লাগে, ভালো না বাসো, শুনতে দাওনা কেন একটু?) যাবার বেলায়/পিছু থেকে ডাক দিয়ে/কেন বলো কাঁদালে আমায়। একটিবার যাব গো, যাই না গো প্লিজ, শুধু একটা অটোগ্রাফ। না না, কথা না, ছোঁব না, হাসবও না কিচ্ছু না, শুদ্দু অটোগ্রাফটা। এই যে মেয়েটা, তিয়াসি না কী যেন নাম, সত্যি লাকি, সত্যি। ইস, আবার কেন বিরতি দিল--কে রে বাবা এখন আবার? ওবাবা, কি হল আজ এত আগে ফিরলে? শরীর ঠিক তো! ...হুম, সব ঠিক। কফি বানাও তো কড়া করে। আরে এসব কি আজেবাজে দেখছ এখন, কাজ নেই? এটা সেই মুখ্যু ছোকরা না, কেরিয়ার টেরিয়ার বরবাদ--চেহারার চটক খালি। ন-না, গান, গানও। ...হুঁহুঁ, গান! বাজে ক্রেজ। দাও তো ছাড়ো, নিউজটা চালাও। লিবিয়াতে রেভোল্যুশন ডেমোক্রেসি, গদ্দাফির কি সব ঘটছে আর তুমি একটা কী চ্যানেলে! হোক না, তাই হোক, যত্তসব, ডেমোক্রেসি না হাতির মাথা। ভাল্লাগে না আর; সবেতে ব্যাগড়া! কফির সঙ্গে আর কি কিছু লাগবে? পাঁপড় সেঁকা? চিঁড়ে মাইক্রো করে, কটা কাজু দিয়ে? যা হোক বেডরুমের টিভিটাতেই--ছিল বলে তাই। অর্ফিয়ুস বলল নাতো আসল নামটা। ...হাসি শুনছ, কাল নীল বলে একটি ছেলে বোম্বে থেকে আসবে, শুক্তি পাঠিয়েছে; ওর কলীগ বুঝলে, লাঞ্চ খাবে এখানে। জানি তো আগেই, যা দেখছে দেখুক না বাপু, মেয়ে মাকে জানিয়েছে হপ্তাখানেক আগেই। ভাও নিইনা তাই নইলে, উঁহু, সব ভাঙছি না এক্ষুনি। অর্ফিয়ুস দাঁড়িয়ে গাইবে! লম্বা খুব, একটু রোগাই, জিন্সটা চাপা বলে আরও। চুল সামান্য অগোছালো, গীটারটা গলায়। কী অ-অসাধারণ এই গানটা ধরেছে নোতুন এ্যালবাম থেকে। তিয়াসি, এই তিয়াসি, ওখানে তুই কেন? ...প্লিজ অর্ফিয়ুস, একটু নাচি তোমার গানের সাথে, নাচব? আবার হাসছ? একে কি রোমান্স বলে, এটাকেই? এত বছর ধরে তো কই! দুহাতের সব লোম খাড়া হয়ে, আরও যে কি হচ্ছে জানি না যাও। বুকের বন্ধ খাঁচাটার মধ্যে ঝোড়ো হাওয়া। শনশন কুচিকুচি রুপোলি সোনালি গুঁড়ো। মেরি ভীগি ভীগি সী...চোখটায় কি যে পড়ল, অস্পষ্ট লাগছে! আহা, আমি কি দুঃখি বেচারি নাকি? মোট্টেওনা। সব তো পেয়েছিলাম, পেয়েছি তো। এইতো এত কত কিছু। অর্ফিয়ুস, কোনটা আসল তুমি সেটা জানো কি? বুঝতে পারো, নিজে? বড় এক্সিক্যুটিভ, নদী কাঁপিয়ে উপলখণ্ড ঝাঁকিয়ে দেওয়া গায়ক, না কি আসলি রোমান্স, বুকের মধ্যেকার রূপকথার স্বপ্নটাই? ওব্বাবা, কবিতা হয়ে গেল নাকি এটা, বটে! ধ্যাত, এত ভাবতে যাবে কেন তুমি শুধুমুদু, ভেবো না প্লিজ, গাও। এমন ছায়াছায়া মুখটা, বড্ড আরাম। চোখ ফেরাতে পারছি নাগো, তাই বুঁজেই রাখি। প্লিজ আমায় দেখো না (পাবেও না) কিন্তু, শোনো আমি কিন্তু হই...। আচ্ছা পরে হবে এখন। এমন গান আরো গাও তো, যেটা কষ্টে ফাটা ফাটা। তোমার সঙ্গে যদি কফিহাউস বা ক্যান্টিন, রাজী হবে তুমি? আসলে ওটাই জীবনে হয়নি, ককখনো হয়নি। কারণ তো সব্বাই জানে, জানত। তুমি জেনে আর...বাদ দাও। গান থামিয়ে দিলে? ...অর্ফিয়ুস, তুমি যে সবে বিয়ে করেছ আমরা জানি, আরও কিছু বলো। কে প্রপোজ করেছিল আগে? (লজ্জা পাচ্ছ বুঝি, আহারে!) ...তেমন কিছু না। ফাংশানে ওর বান্ধবী অটোগ্রাফ আর ফোন নাম্বার নিয়েছিল, তিন/চার দিন পরে আমার মোবাইলে আমারই একটা গান অচেনা মেয়ের ফ্যান্টাস্টিক সুরেলা গলায়; ব্যস, এভাবেই। তবে পাবলিকলি গায় না, গাইলে পারত--বলেওছি। ...ওয়াও, দা-রু-ণ! লং লিভ ইয়োর লভ এন্ড লভ ফর মিউজিক; কিন্তু আজ আমাদের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে অর্ফিয়ুস। দুটো ছোট্ট প্রশ্ন করব তুমি যাবার আগে, তোমার আসল নামটা আর তোমার গার্লফ্রেন্ড টার্নড টু অর্ধাঙ্গিনীর! আবার অমনি হাসি? ...শেষ গানটা আগে হয়ে যাক না, একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাই? কিছু পলাশের নেশা/ কিছু বা চাঁপায় মেশা; জালটা ছড়িয়ে ভাসছে হাওয়ায়, দুলছে ঘরের সিলিং ছুঁয়ে শির শির শির। ঈঈস, ড্রইংরুমের ল্যান্ড ফোনটায় এসটিডি রিং কী জোরে। উঠে ধরবেও না নাকি, জাপানে রাজতন্ত্র না ব্রিটেনে স্বৈরতন্ত্র দেখা হয়ে গেল বুঝি? অর্ফিয়ুস প্লিজ, শুধু ফোনটা একটিবার, একটু জাস্ট, দায়িত্ব যে। গনগন করে এনডি টিভি--লিবিয়া উচ্ছ্বসিত, ইস্তেহার আন্দোলন বিপ্লব গণতন্ত্রের জয়। ...হ্যাঁরে কি করছিস রে তোরা দেবাদেবী, ফোন ধরিস না কেন? নাগো ও মেজদি এইতো, কিছু না আমি আসলে ওঘরে; তোমার ভাই তো এখানেই টিভি দেখছিল, ভাবলাম উঠে ধরবে--এসে দেখছি ঘুমিয়েই-হি হি! ...ঘুমিয়ে পড়বে না? যা পরিশ্রম করে এই বয়সেও। সত্যিই তো হ্যাঁ মেজদি বলো তোমরা কবে; তাই তো, ভালো আছে শাঁখ ঝিনুক দুটোতেই--হ্যাঁ হ্যাঁ শুনছি গো! আর একটুখন থেকো কিন্তু, আসছি সত্যি! একী, ওরা যে আর কেউ নেই! চলে গেছে। ভালো ভালো বিজ্ঞাপন চলছে তো চলছেই। খাঁটি তেল তাওয়া সিমেন্ট হেলথ ড্রিংকস মোবাইল ফর্সার ক্রিম বগলের দুর্গন্ধের। পরের ধারাবাহিকের--আগে যা ঘটেছে। কবে আসবে আবার, কত দিনে? পাঁচটা রুটি করে নিতে কতক্ষণ, খানিক পরে হলেই বা! সকালের চিকেন স্টু মাইক্রোতে তিন মিনিট। ইদানিং শুক্তির ঘরটা নীইট এ্যান্ড ক্লিন। মেয়ে-মায়ে চুড়ি পায়জামা পরে দেওয়ালে ঝুলছে, বছর চারেক আগে হ্যাভলক বীচে। এটা কেতরে গেল কি করে! গোদরেজের চাবিটা এইতো এখানে। মেয়েটা একটা পাগলি, কিচ্ছুটি খেয়াল থাকেনা। খোলার সময় আলমারিটায় ঘটাং হলো কেন! ঠিকমত হ্যান্ডেলই করেনা যে। গ্রীন লেগিংটা ট্রাই করে একবার...উফ বাপ রে, এঁটে বসছে কোমরে, গ্রে-কুর্তিটা ম্যাচিং। এমা, সামনেটা এত্ত বাজে দেখাচ্ছে জঘন্য বেঢপ, কোমরের কাছটায় তুলোর ব্যাগ না মাখন ফ্যাক্টরি। ছি ছি--মেয়ে তো পাতলা, মেয়ে তো স্লিম। কানের পাশের রাস্তাটায় পুরোনো পিচ সরে গিয়ে কদিনেই ছায়াপথ। হি হি, টিঙটিঙ মত দুবেণী কেমন? ঘন দুধের সরেও মাছি এসে বসেছে ছোটছোট, চশমা প্রোগ্রেসিভ হলেও চশমাই না হল, না থাকলে আঁধার। হুম, কি এল, কি গেল? অর্ফিয়ুস আর একটিবার ফিরে...বলো না কবে? এ কেমন আনচান। ...হলো তোমার টিভি শেষ? রাতের খাওয়া দাওয়া বাদ? ওকি না, রেডি তো সব, দিচ্ছি দিচ্ছি দিচ্ছি দিচ্ছি...যাচ্ছি। ফোলে না কেন আজ রুটি--টেবিলে রাখা প্লেট--স্টুও তো রেডি, এসো। ...আরেঃ এটা আবার কি ব্যাপার, মাথার পোকা বাড়ল? না নোতুন করে কোথাও আবার? কী সব বলে যে যাচ্ছেতাই, না না এমনিই শুধু শুধু ইচ্ছে, ট্রাই; তুমি খাও না খাও। ...পারোও, বয়েস টয়েস ভুলে গেছ দেখছি, দেখেছ আয়নায় মুগুরের মত ঠ্যাং দুটো নাচিয়ে? দেখো উঠে। হাহাহা, কাল কিন্তু খবর্দার আবার এসব এক্সপেরিমেন্ট--উঠলাম, আর একটু দেখে নিই গদ্দাফি। মেজদি কিন্তু ফোন করেছিলো ও ও। ঈঈস এত বাজে লাগছে রুটিটা আজকে, চামড়া। কোত্থেকে আনল তেতো আটাগুলো, কিন্তু কালও তো এটা দিয়েই; কে জানে বিস্বাদ লাগছে এত! ঠাণ্ডাটা দপদপিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। পরিপাটি বারান্দা চুপচাপ। এই বাইপাস ঘুম পাচ্ছে বুঝি? ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে রাত কাটাচ্ছো! খুচরো খুচরো রাতবাতি শপিং মলে সারারাত। এই নেড়ি কুকুর, তোরাও আদর করিস, হিংসে, রোমান্স সব? এ প্লাস বি হোল কিউবের ফরম্যুলা ঠিকঠাক মনে আছে। কি করে? শঙ্খটার কত দেরিতে কথা শুরু। নাঃ, রাত হচ্ছে যে বড্ড, দেখি ঘরে। ...কি হলো, শোবে না নাকি? (ঈস, ধমকি!) গিরগিরগির এসি ঘট করে থামল, টেম্পারেচার তেইশ। নিজের কম্বলটা টানতেই, ও মাগো সাঁড়াশিপ্যাঁচে এঁটে ধরেছে শক্ত ভারী পদযুগল। ...কিগো খুকি রাগ করেছ নাকি মুগুর বললাম? ওমা কেন? ঠিকই তো মুগুরই তো, বিচ্ছিরি কত বেঢপ। ...করো নি? বাচ্চাই রয়েছো এখনও...তাহলে এবারে এসো তো। এনার্জি কত কমে গেছে মানুষটার। হি হি বুড়োবাবুর ইচ্ছে আঠের আনা! বাথরুম থেকে ফিরে শুতে না শুতেই অগাধ অতলে। কপালে সমান্তরাল ভাঁজ, নাকের পাশে, মাথার সামনেটা খালি, কোলেস্টরল শুগারও ধরেছে। কেমন নরম নরম লাগে একটা, বুকের মধ্যেটায় দুঃখু দুঃখু। লেগিং-টেগিং, কুর্তি-ব্রা, সব নীচে মাটিতে, থাক এখন, হবে পরে। রোজকার নরম নাইটিটায় ঢুকে আঃ, আরাম। হ্যাঙারে ঝুলছে হাল্কা সবুজ ফিনফিন ছোটছোট ফুলেল সুপারনেট কোটা, পরশু মৃন্ময়ীর বিবাহবার্ষিকীতে পরা হয়েছে। রোদ খাওয়াতে হবে। আয়নার ওপরে বাইরের আলোর ইঙ্গিত। ঘুমন্ত ভারী হাতটা বুকের ওপর চেপে আছে। সাবধানে না নামালে ঘুম ছুটে যেতে পারে। ভাঁজ করা সুপারনেটটা খুলে নিয়ে দুহাতে মুখের সামনে ঝুলিয়ে পাতলা ব্যবধানের পিছনে কেমন বেশ লুকোচুরি! চশমাটাও খাটের সাইড টেবলে। এক পাশে আঁধারের ঝাপসা ছায়া, ওপাশের আয়না ঝকঝক। সত্যি বলো তো আয়না মুছে যাচ্ছে মুছে গেছে কিনা! ওই যে সেই মেয়েটা, ডবল চিন নেই, মুগুর পা নেই। শোনো না একবার অর্ফিয়ুস--ওই তাকাও দ্যাখো, আয়নার ওপাশে ওধারে, পাচ্ছো? বলো, এবারে বলো তো আমি, আমায়! কোন ফ্ল্যাটে মিউজিক চলছে রে বাপু এত রাতে! কে শোনে? যেতে যেতে পথে হল দেরি...ওইটে না? পাশে বসে, কানের কাছে ফিসফিস একটিবার, ঠিক তো?



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)