ISSN 1563-8685





|| ১০ ||

রাহুলরা দিল্লী ছাড়ার দেড়মাস পরে ক্রান্তিচকে দাঁড় করানো শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ। পাথর সিমেন্টে গাঁথা হয়েছিল চারফুট বাই আড়াই-ফু্টের ফলক। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের অনেকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করছে — কেউ কেউ সফল ভাবে। তাদের নাম উৎকীর্ণ করে স্মৃতিস্তম্ভ। সেখানেই রোজ সকালে জড়ো হতো কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী। দিল্লীতে ছাত্র রাজনীতির এমন স্বর্ণযুগ আগে কখনো আসেনি।

কিন্তু ধ্বংসের বীজ বুকে নিয়ে জন্মেছিল আন্দোলন। জোর করে ক্লাস বন্ধ করে দেবার পরেও ইউনিভার্সিটির বাসগুলো চালানো হবে আশা করা যায় না। মাসখানেক ফুল ইস্টিমে চলার পর ক্রান্তিচকের জমায়েত একটু পাতলা হয়ে আসছিল। একদিন রাতে দিল্লী পুলিশের বুলডোজার এসে ভেঙে দিল শহীদ মিনার। সকালবেলা রাস্তা-ফাস্তা মেরামত হয়ে একেবারে সাফসুফ। একটুকরো সিমেন্ট কি পাথর নেই কোথাও।

শ্যামলীরা একদিন কলেজ থেকে দল বেঁধে গিয়ে দেখে এলো ক্রান্তিচক। কোথাও কিছু নেই। গাড়িঘোড়া চলছে যেমন চলে। কৃষ্ণা বলল—ইস্‌, আর কয়েকদিন আগে এলে সব দেখতে পেতাম! শ্যামলীর মনেও একটা আপসোস রয়ে যায়। কিরকম শহীদ মিনার ছিল কে জানে!

কফিহাউস আবার জমজমাট। একটা দুটো করে ক্লাস হচ্ছে। প্রফেসরদের ঘরের কাছাকাছি ঘুরঘুর করছে কিছু পড়ুয়া ছেলেমেয়ে। ছাত্রনেতারা ঘোষণা করেছে পরীক্ষা পিছিয়ে না দিলে আবার স্ট্রাইক।

এরকম নিরীহ, সর্বজনীন হিতাকাঙ্ক্ষী স্ট্রাইক হলে শ্যামলীর মত নির্দলীয়রাও খুশি।

মিরান্ডা হাউসে ফিরে এসে ঘাসের উপর টিফিন বাক্স খুলে পা গুটিয়ে বসেছে ছ-সাতজন মেয়ে। শরতের রোদ্দুরে অনেক রঙের শালোয়ার কামিজ, মিডি-স্কার্ট, ব্লাউজ ঝলমল করছিল। মাঝে মাঝে খালসা কি রামজসের উঠতি ছেলেরা মরিয়া হয়ে ঢুকে পড়ছিল এবং পাত্তা না পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

শ্যামলী ব্যাগ থেকে লাল হলুদ রঙের কার্ড বের করে নাম লিখতে থাকে।

—তোর বিয়ের কার্ড? একসঙ্গে জিগ্যেস করল অন্যরা।

—আবার কার? শ্যামলী বলতেই খাওয়া বন্ধ করে সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর।

কই দেখি কার্ড! এত তাড়াতাড়ি বিয়ে? বলিসনি তো আগে? পরীক্ষা দিবি তো? নাকি পড়াশোনাই ছেড়ে দিবি? শ্বশুরবাড়ি কোথায়?

—দাঁড়া, দাঁড়া। শ্যামলী হাত তুলে থামায় সবাইকে। একসঙ্গে এত প্রশ্ন করিস না। এরকম ঝপ করে ডেট ফিক্স হয়ে যাবে নিজেও ভাবিনি। পড়াশোনা যেমন চলছিল তেমনই চলবে। কিছু পাল্টাবে না। শুধু সিঁথিতে একটু সিঁদুর লাগাব, আর কি।

—হাই তুলতে তুলতে ক্লাস করবি! তোর দেখাদেখি আমরাও তুলব। বলে গায়ত্রী মুখে হাত চাপা দিয়ে হাই তুলে দেখায় কিভাবে নতুন বিয়ের পর হাই তোলার নিয়ম।

—যাঃ যাঃ। তোর বিয়ের পর তুই তুলিস হাই। আমি পরীক্ষার আগে বাপের বাড়িতেই থাকছি।

—দেবনাথ সমাদ্দার ঘরজামাই হবে নাকি? ঘাসের উপর পাঁচ ছ-টা মেয়ে বিভিন্ন রকম অঙ্গভঙ্গি করে হাই তুলতে থাকে। গেটের ফাঁক দিয়ে খালসার ছেলেরা হেলমেট হাতে সেই লাস্যময় দৃশ্য দেখে চমকে চমকে যায়।

*************

রাহুলের ডায়েরি থেকে:

“... তিন চারটে ছেলে ছিল। স্বাস্থ্যকর রেষারেষি। সবাই সবাইকে সমীহ করতাম। সবাই চেয়েছিলাম চিরবসন্ত। ফাল্গুন মাসের বিশেষ দিনে, সে, মানে পলাশ, আমাদের নজর কাড়ল। বনমালী আর আমি গঙ্গার ঘাটে বসে মনমানসের পুরনো খাতা থেকে একটা দুটো ঘটনা, ছিন্নবিচ্ছিন্ন শ্লোক ঘেঁটে ভাঙা ভূর্জপত্রগুলো অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখছিলাম। যাতে আত্মজীবনীর খণ্ডচরিত লেখার সময় কোনো সংশয় কিম্বা দু:খের শলাকা আমাদের বিদ্ধ না করে। দু:খের গান গদ্য কিছুই আমার ভালো লাগে না। তাদের আমি জীবন থেকে দূরে রাখতে চাই।

বনমালী অনেকদিন পরে বলল — কিছু শোনা। তখন পু্রনো লেখা থেকেই কিছু কিছু মনে পড়ছিল আমার। এমন সব দিনের কথা যখন ফুটবল, গরমের ছুটি, হাইস্কুলের ইউনিফর্ম, সরস্বতী পুজোর মন্ত্র এসবের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার কথা ঠিকঠাক বলা যেত। স্রোতের গলার উপরে গলা তুলে বলতে হয়।

হয়তো গোলাপে তার আড়ি
কাঁটাগাছে ফেঁসেছিল শাড়ি
বেবাক আমরা শুধু বলেছে বাচাল বনমালী—
এ মেয়ের মুখে হায়, কোন ভাগ্যবান দেবে কালি?

তখন হাওয়ায়
কয়েক হাজার দাঁড় বায়
বসন্তের টিয়া
বলে যায়—বিয়া, বিয়া, বিয়া—
হবে না কো আর

(শুধু একজন বাদে)
আমাদের গর্হিত সবার।
বনমালী সাঁতার না জেনেই খরস্রোতা নদীর জলে নেমে গেল। হর-কি-পৌড়ির ব্রিজের উপর আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে। বৃষ্টির পরে ভিজে বাদলা হাওয়া। সন্ধে হয়ে এল। জলস্রোতে ভাসতে ভাসতে আট-দশ জন বাদামী মানুষ গিয়ে ব্রিজের নিচের লোহার শিকল ধরে ফেলেছে। ঘড়াং করে শব্দ। ব্রিজের ওপারে গঙ্গার ধারের চওড়া বাঁধানো ঘাটের উপর গোমল, গোমূত্র, কুষ্ঠরোগীর গাঁদাফুল, পাঁচ-দশ পয়সা, ফেরারী আসামী আর বুড়োথুড়ো সাধুর ছিলিম। এত মানুষের এত সম্মিলিত আবর্জনা, বায়ু, পিত্ত, কফ, হাড়-মাস, ছাই সব নিয়েও গঙ্গা এখানে মোটামুটি পবিত্র। প্রতুল জলের ঐশ্বর্য। বর্ষার পর আরো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। সমস্ত ড্যাম ব্যারাজ খুলে রাখা আছে। তবু লাল দাগের কাছাকাছি জল। তারপর কুম্ভমেলার সময়ে কোটি কোটি লোক এসে কলেরার দাস্ত বমি সব সমেত তীর্থক্ষেত্রে উজাড় করে দেবে নিজেদের। তাই নিয়েও পবিত্র থাকে হরিদ্বার। গঙ্গার কলধ্বনি।

আমি জলের রেখার একটু উঁচুতে রেখেছি পা। শীত শীত করছে বলে নামিনি। একটা মোটা জামাও পরেছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি আগের দুদিন। গলিতে হাঁটু অবধি জল। গলা একটু ব্যথা করেছিল সকালে। সেই থেকে মনে ভয়। বনমালীর ঘাড়ে বসে অসুস্থ হতে চাই না।

লোহার শিকল ধরে গা ভাসিয়ে রেখেছে বনমালী। উল্টে পাল্টে যাচ্ছে। ঠিক ভারসাম্য নেই।

আরতি শুরু হবার আগে গা মুছে উঠল সবাই। আমরা ব্রিজের উপর দিয়ে ঝালমুড়ি, সাপবাজি আর বেলুনের হকারদের পাশে দেহাতি-সেহাতি লোকের মতো এর ওর বউয়ের পিছনে পিছনে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম রাস্তায়। শুনেছি এখানে মেলায় অনেক ষোলো, সতেরো, কুড়ি বছর বয়সী যুবতী, নতুন বা একটু পুরনো গ্রাম্য বউ-ঝি-রা হারিয়ে যায় ফি-বছর। কী হয় তাদের জানি না। অনেক সময় বরেরাই দূরের মেলায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসে বউদের। গয়নার, চুড়ির দোকানে ঢুকিয়ে দিলেই হলো। মেয়েমানুষী অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে কেটে পড়া। লোকগুলো ফিরে গিয়ে দু:খের গান গায়। নতুন সংসার পাতে। মেয়েরা কোনোদিন ফিরতে পারে না। কে নেবে ঘরে? মেলায় হারিয়ে যাওয়া নিরক্ষর যুবতীদের জন্য বেশ কষ্ট হয় মনে।

আবার মনে হয় জগতের এই নিয়ম। এর মধ্যেই একধরনের বহমান অর্থবহুলতা আছে। সমস্ত পাপ-তাপের উপর তো বরফের মতো ঠান্ডা জল পড়বে বলেই নেমে আসছে এত দূর থেকে। হারিয়ে-যাওয়া মেয়েদের কলঙ্ক, তাদের ঘরে না-ফিরতে-পারা, হয়তো বারমুখী হয়ে যাওয়া, এসবের মধ্যে যেন তীব্র আকর্ষণ বোধ করি। মনে হয় তাদের একজনকে খুঁজে পাব। হয়তো আমার হাফিজ, গালিব, ফিরদৌসির কিছু সে বুঝবে না। কিন্তু তার বোরখা বা ঘোমটার নিচে সুকুমার তরুণ মুখে স্পষ্ট দেহাতি উচ্চারণে আমি তার ছেলেবেলা, গ্রাম, রেলগাড়ি, স্বামী-শ্বশুরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনে ঠিক মুগ্ধ হব। পেট খুলে দেখাব দাগ। তার কলঙ্ক আর আমার মৃত্যুভয় পরস্পরের আশ্রয় হতে পারে...”

*************

রাহুলের ডায়েরি থেকে:

“... বনমালী গুরুর জন্য খেটেছে। আমাকেও খাটিয়েছে খুব। প্রথম প্রথম আমরা সকাল সকাল লস্যি খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম। পায়ে হেঁটে ঋষিকেশ, লছমনঝোলা। চিলার জঙ্গলে, কঙ্খলের গুলের আড্ডায় চষে বেড়াতাম দুজনে। পারার তৈরি শিবলিঙ্গের সামনে একবার সত্যিকারের ধ্যানস্থ একটি লোককে দেখলাম। সাধারণ কোর্তা-পাজামা পরা। কোনো ভড়ং নেই। মুখভর্তি দাড়ি, একটা কষ্টের ছাপ, যেন সদ্য ঘুম ভেঙেছে। কোনো সাধুকে এরকম দেখিনি। কতজনকে তো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল বনমালী। সব জাল। গেরুয়া পরা ভিখিরি। শুধু ধান্দা কী করে পাঁচটা টাকা করা যায়। বনমালী দোষ ধরে না। জিনিসপত্রের যা দাম। রাজর্ষি বিশ্বামিত্রও বখে যেতেন। একদিন বলেই দিল এক সাধককে--সারাদিন ধরে ভিক্ষে কর দেখি। তপ-টপ কর কখন? নাকি সেসব যা করার করা হয়ে গেছে? সন্ন্যাসী কাঁচুমাচু। আমতা আমতা করছে। বনমালী মনে দু:খ দিয়েছে ভেবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে একটা টাকাও দিয়ে এল।

ভিক্ষে করাও একটা নেশার মতো। একবার যাকে ধরে আর ছাড়ে না। আবার অনেক কুচক্রী ঠগও আছে। যাদের আসল ব্যবসা গোবেচারা গ্রামের লোকদের সর্বস্বান্ত করে ছেড়ে দেওয়া। গঙ্গার ঘাটে গৃহস্থদের ধরে ধরে হাত দেখে। বনমালী হরিদ্বারে নেমেই মেরঠ থেকে ছাপানো জ্যোতিষ ও কোকশাস্ত্রের গোটা তিনেক হিন্দী চটি বই, পুস্তিকা, একটা উপনিষদের হিন্দী অনুবাদ এসব কিনে ফেলেছে। ধর্মশালার ঘরে শুয়ে শুয়ে দুদিন পড়ল সব। নেড়ে চেড়ে দেখলাম আমিও। বনমালী স্মৃতিধর, বলল যা শিখেছি তাতেই ঠিকুজি লেখার ব্যবসা শুরু করা যায়। পৈতে তো আছেই। আমার অতটা ব্যূৎপত্তি হয়নি শুনে সে নিরাশ হলো।

একদিন কোনো এক মহাত্মাকে দেখে বনমালীর পছন্দ হলো। বড়োসড়ো চেহারা, বৃষস্কন্ধ, ঋজু শরীর। আজানুলম্বিত দুই বাহু। বিরাট কান। কালো কুচকুচে জটাজুট। একটা ত্রিশূল আর বাঘছাল পরিয়ে দিলেই মনে হবে পশুপতি মহাদেব। হর-কি-পৌড়ির কাছে রাস্তায় ইতস্তত বিচরণ করছিলেন। বনমালীই বলল— আয় দূর থেকে ফলো করি। আগে লোকটাকে বুঝি। তারপর কনট্যাক্ট করব।

মহাত্মার পিছু পিছু আমরা এঘাট-ওঘাট এ-গলি ও-গলি করে দক্ষিণের রামকৃষ্ণ মিশন এর পর স্লুইস গেট পার করে প্রায় শহরের বাইরে চলে এসেছি। এতক্ষণে সাধুবাবা আমাদের দেখতে পাননি হতেই পারে না। আমার মনে হলো মাঝে মাঝে চোরা চোখে পিছন দিকে চাইছেন। ভাবলাম বনমালীকে বলি — এবার কনট্যাক্ট করা উচিত, নইলে খারাপ দেখায়। কিন্তু সেকথা ভাবতে ভাবতেই রাস্তার ওধারে একটা হরিয়ানা স্টেট-এর সাদা বাস থেমেছে আর আমাদের মহাত্মা অকস্মাৎ সবাইকে পিছু ফেলে এক দৌড়ে গিয়ে অ্যাক্রোব্যাটের মতো তার পিছনে ছাতে ওঠার সিঁড়ি ধরে ঝুলে পড়লেন। সেখান থেকেও ঘুরে ঘুরে সেই চোরা দৃষ্টি। বনমালী বলল—ভড়কে গেছে লোকটা। সারাদিন খালিপেটে ঘুরে এরকম ঠকবার পর নিরাশ হয়ে ভাবলাম এরপর থেকে বুড়ো বয়স্ক লোকের পিছনে ছাড়া যাব না। বনমালীকে সেকথা বলতে সে বিরক্তির মুখ করে রইল।

এক দুই করে দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে দেখলাম কিছুই শিখছি না। যেরকম গুরু পাব ভেবেছিলাম সেরকম লোকেরা হয় আর নেই নয় আত্মগোপন করে আছে। আমার বা বনমালীর কর্ম নয় তাদের খুঁজে বের করা। কিন্তু দিনকাল ভালোই কাটছে। পেটের দাগটাও মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। তাই নিজের জন্য ততটা দুশ্চিন্তা ছিল না। এদিকে বনমালী কিরকম যেন উড়নচণ্ডী হয়ে গেল। প্রাত:কালে উঠে বেরিয়ে যায় কোথায়। আমি ঘুম থেকে উঠে একা একাই খেয়ে আসি। কখনো কখনো সেই দোকানেই দেখা হয়ে যায় তার সাথে। একদিন দেখলাম দূর থেকে আমাকে আসতে দেখেই চট করে পাশের গলিতে ঢুকে গেল। আমি লস্যি পরোটা নিয়ে অপেক্ষা করছি কিন্তু সে আর এল না। সারাদিনই পাত্তা পাওয়া গেল না তার। সন্ধেবেলা ধর্মশালার ম্যানেজার আগরওয়ালের সাথে বসে দাবা খেলছি এমন সময়ে সে উসকো-খুসকো চুল নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। দাবার ছক ছেড়ে তার পিছু পিছু গেলাম। ঘরে ঢুকে জলের গেলাস খুঁজছে। আমি বললাম — কোথায় ছিলি বলতো? সে বলল — বলার মতো কিছু নেই। আমি বললাম— একসাথে এসেছি, আলাদা আলাদা ঘুরছি কেন? সে বলল — এবার আলাদা আলাদা থাকব। এই বলে জলটল খেয়ে নিজের ব্যাগটা নিয়ে চেক-আউট করে বেরিয়ে গেল। কেউ কাউকে গুডবাই বললাম না। কেন সে রেগে আছে সেটা পর্যন্ত জানিয়ে গেল না। অনেক ভেবেও মনে করতে পারলাম না, আমার কোন্‌ ব্যবহার তার খারাপ লেগে থাকতে পারে। কোনোদিন কোনোকিছু নিয়ে মতবিরোধ তো হয়নি। হবার সম্ভাবনা দেখলে নিজেই চুপ করে গেছি। সন্ধে-রাত পর্যন্ত আমি আর আগরওয়াল দাবা খেললাম। সহজেই হেরে যাচ্ছি, যা কোনোদিন হয় না। মাথায় শুধু ঘুরছে বনমালীর কথা। কোনো সম্পর্কই অটুট হয় না। কিন্তু হঠাৎ বন্ধুত্ব ভেঙে দেবার একটা কারণ থাকা উচিত তো? পলাশ বিয়ে করবে বলে ছাড়ল। সেটা বুঝতে পারি। মেনে নিতে পারি। কিন্তু বনমালী?

অথচ জানি, কোনোদিন তাকে এ-প্রশ্ন করার সাহস হবে না আমার...”

**********

কলেজ থেকে ব্যাগ ঘোরাতে ঘোরাতে বাড়ি ফেরার পথে শ্যামলীর মন আবার খারাপ হয়ে যায়। বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর থেকেই মুড সুইং হচ্ছে। কখনো মনে হচ্ছে সমস্ত স্বাধীনতা শেষ হয়ে গেল। আবার কখনো একটা আজব ধুম। আজকে মনে হচ্ছে কলেজের দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। এবার এসে কি সত্যি-সত্যিই হাই তুলে দেবে? ঘড়ি ধরে তিনটে ক্লাস, শেষ করেই বাড়ি ছুটতে হবে বোধহয়। গিয়ে শাড়ি পরে বউ সেজে রান্নাবান্না। ভয় ভয় করতে থাকে শ্যামলীর। বাড়িতে ঢোকার আগে কি মনে হওয়াতে পাবলিক টেলিফোন থেকে ফোন করে দেবুদাকে। প্রথম প্রথম আপনি করেই বলত। সম্বোধন করত না। ইয়ে শুনুন। জিন্‌স পরলে আপনার কি আপত্তি হবে?

—আমি পরলে আপনি আপত্তি করবেন? দেবুদাও থুতনি চুলকে জবাব দিয়েছিল।

—না, না। প্রশ্নই ওঠে না। বলেছিল শ্যামলী। —আর আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন।

—ডিটো, ডিটো। বলে অমায়িক ভাবে হেসেছিল দেবুদা।

তারপর থেকে তুমি করেই বলে। বিয়ের পর বলতেই হত। তাড়াতাড়ি আপনি থেকে নেমে আসতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল শ্যামলী। কিন্তু কী বলে সম্বোধন করবে ভেবে পায়নি। তার বয়েসীরা সবাই দেবুদা বলে। বরকে দাদা বলা যায়? দেবুদাও এমন অদ্ভুত, ভেবেচিন্তে বলেছিল — শুধু দেবু না বলে দেবুদা বলাই বোধহয় ভালো, কি বলো? বয়েসের এতটা ফারাক। যাহ, বলে উড়িয়ে দিয়েছিল শ্যামলী। দেবু, দেবুদা কিছুই সে বলবে না। তেমন দরকার হলে পুরো নামটাই বলবে। মিস্টার দেবনাথ সমাদ্দার। ফোন তুলে তাই বলল।

—মি: দেবনাথ সমাদ্দার আছেন?

—স্পিকিং। শ্যামলী নাকি? দেবনাথ সমাদ্দার উৎসাহিত হয়ে ওঠে। অফিসে কখনো ফোন করে না শ্যামলী।

—হ্যাঁ। কেমন আছ?

—চমৎকার! বাঃ! হঠাৎ কী বলে?

—ইয়ে, এমনি। শ্যামলীর খুব রাগ হয় নিজের উপর। অফিসে হঠাৎ ফোন করার কী দরকার ছিল?

দেবনাথ সমাদ্দার গলা নামিয়ে জিগ্যেস করে—ক্লাস হলো না?

—না। কে জানে, পরে হলেও হতে পারে। আমার ভাল্লাগছিল না।

—বেরোবে কোথাও?

—ধ্যাৎ, তোমার অফিস। তুমি কাজ করো। আমি রাখছি।

—শোনো, রেখো না ফোন। একদিন কাজ কাটিয়ে দেওয়া যায়।

—না, না। ধ্যুৎ। ওসব কোরো না।

—একটু-আধটু সবাই করে। বসের বউ আছে। কোথায় আছ বলো তো?

—কিংস্‌ওয়ে ক্যাম্প-এর কাছে। পাবলিক বুথটায়।

—তুমি একটু হেঁটে কলেজের গেটের কাছে গিয়ে বসো। আমি তোমাকে পিক-আপ করে নিচ্ছি।

—যাহ্‌, এটা কী হচ্ছে?

—খুব খারাপ দেখাচ্ছে? আমার বয়েসে এসব মানায় না, তাই ভাবছ তো?

—অফ কোর্স তা ভাবছি না।

—তাহলে আর কী? চলো ব্ল্যাক-এ টিকিট কেটে সিনেমা দেখে আসি। ম্যায়নে পেয়ার কিয়া। ভালো গান আছে।

—লোকে কী বলবে বলো তো? মা যদি জানতে পারে?

—সবাই ভাববে তোমার পাল্লায় পড়ে দেবনাথ সমাদ্দার বখে গেল।

—ইজ দ্যাট ট্রু? শ্যামলী জানতে চায়।

দেবুদা হা হা করে হাসতে থাকে। —তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্কভাগী। আচ্ছা শ্যামলী কোনোদিন নিজেকে এরকম লাজুক, ভিতু ভাবিনি। তোমার সঙ্গে রাস্তায় বেরোলে এরকম ভয় করে কেন বলো তো?

শ্যামলী মাথা ঝাঁকিয়ে বলে — তুমি তো ভিতুই। তোমাকে আজ ক্রান্তিচকে সবার সামনে চুমু খাব। দেখো কীরকম ভয় পাবে তুমি।

—হোয়াট!!!

—সী ইউ। খুট করে ফোন রেখে দেয় শ্যামলী। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। এ আবার কি বলে ফেলল! কান থেকে ঘাড় পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।

আবার যেতে হবে কলেজে। গেটের সামনে অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে বাথরুমে গিয়ে একটু মেক-আপ। চুলটা ঠিকঠাক করে নেওয়া চাই। একটু আগে কিরকম অবসন্ন ছিল মন। ক্লান্ত, হতাশ লাগছিল। এখন মনে আবার সেই ধুম। সত্যি সত্যি চুমু খাব নাকি? ভাবছে শ্যামলী। ভাববে আমি পাগল। বেশ হয় কিন্তু। একটা ভিতু, একটা পাগল। কাজকর্ম নেই। সংসার পেতে বসে গেলাম। ধ্যুৎ।

**********

যেমন আচমকা গিয়েছিল বনমালী তেমনই বলা নেই কওয়া নেই হুট করে ফিরে এল আবার। বেশ কিছুদিন এদিক ওদিক খুঁজেছিল রাহুল। জলে হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে, অলিতে গলিতে। কোথাও পায়নি। মনে একটা বিশ্বাস হয়ে যাচ্ছিল—বনমালী হরিদ্বার ছেড়ে কেটে পড়েছে। হয় উত্তরে কেদার-বদ্রী করছে একা একা। কিম্বা দিল্লীতেই ফিরে গেছে। পকেটে হাত দিয়ে পয়সা গোনে রাহুল। আর কতদিনের খোরাক আছে দেখে নেয়। ম্যানেজার আগরওয়ালকে জিগ্যেস করে দিনে দুবার—কোনো ফোন-টোন এসেছিল কিনা।

একদিন মাঝরাতে বনমালী কখন এসে নিজের বিছানাটাই দখল করে শুয়ে পড়েছে। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। রাহুল চানটান করে ঘুম ভাঙালো তার। ব্রেকফাস্টে যাবি তো? খেতে খেতেই কথা বলা যাবে—ভেবেছিল সে। কোথায় ছিল, কী খেত কিছুই বলল না বনমালী। রাগটাগ কিছু নেই। তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই বলল—খাসনি তো কিছু? চ চ তাহলে।

—কোথায়? কোথায়?

নদীর ধারে ব্রিজের নিচে গাঁজাখোরদের আখড়ার কাছে দশ-বিশ জন প্রভাতবায়ু সেবন করার সাথে সাথেই ধর্মচর্চা করছে। বনমালী একটা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পরেছে। রাহুলকে বলল —জলধরের একটা পিণ্ডি দিয়ে যাই, কি বল? গঙ্গার এত কাছেই যখন আছি।

ঘাটের বাঁধানো সিঁড়ির উপর নামাবলী গায়ে এক পুরুত কোষাকুষি সাজিয়ে বসেছে। পিণ্ডি দেবার ব্যবসা। বনমালী দূর থেকে পা চালায়। তাড়াতাড়ি চ। অন্য কেউ ধরে ফেললে দেরি হয়ে যাবে।

রাহুলদের দেখে বুড়ো পুরুত দুটো আসন পেতে দেয়। দুজনেই পিণ্ডি দেব নাকি? রাহুল জানতে চায়।

—দুজনেই দাও। তাড়াতাড়ি কুশের আংটি বানাতে বানাতে পুরুত বলে—সস্তা হবে।

—দুজনে দিলে একজনের চেয়ে সস্তা?

বুড়ো কোনো জবাব দিচ্ছে না। বনমালী সাফসুফ জানতে চায়। —দুজনে দিলে সস্তা কেন?

—একজনের তিরিশ টাকা। দুজনে দিলে পঁয়তাল্লিশ। দ্বিতীয়টা পনেরো টাকায় হয়ে যাচ্ছে। সস্তা নয়?

বনমালী বলে—দিয়ে দে রাহুল। জলধরটা বেঁচে থাকলে তাকে পনেরো টাকা দিতিস না?

দুজনেই আসনে বসে পড়ে। বুড়ো তাড়াতাড়ি খড়কুটো জ্বেলে আগুন করে একটু। মাটির ছোট্ট ভাঁড়ে ভাত চাপিয়ে দেয়। তিরিশ টাকায় এলাহি কিছু হয় না। এরকমই ব্যবস্থা।

একটু দূরে ছোট্ট একটা কথকতার আসর বসেছে। সিঁড়ির উপর আসন পেতে বসেছেন সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। খোলা, ভিজে, কালো চুল। লম্বা গড়ন। গায়ের রঙ রীতিমতো ফরসা। কাছাকাছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে জন পনেরো পুরুষ ও নারী। রাহুল গলার আওয়াজ পায় মহিলার। তীক্ষ্ণ, ধারালো স্বর। একটু খনখনে। একটানা গল্পের মতো বলে চলেছেন মহিলা। উপনিষদের গল্প। জনক রাজার উপাখ্যান। “...যাজ্ঞবল্ক্য মুনি জনক রাজাকে বললেন—মনের মধ্যে এই পরমাত্মা বা ব্রহ্মকে উপলব্ধি করাই হলো প্রাণীর কর্তব্য। ...” রাহুল অন্য সময় হলে প্রশ্ন করত—কেন? কিন্তু জলধরের পিণ্ড তৈরি হয়ে গেছে। মন্ত্রপাঠ চলছে। রাহুল আর বনমালী হাতজোড় করে বিড় বিড় করে বলে যায়—ভরদ্বাজ গোত্রস্য প্রেতস্য জলধর-শর্মণঃ ... ইত্যাদি। কিছু কিছু মানে বোঝা যায়। জলধরের অভুক্ত আত্মাকে সিদ্ধ ভাতের আহারে পরিতুষ্ট করে দেবার চেষ্টা। রাহুল মনে মনে কত কী ভাবে। বনমালীর মাথায় যে ভূত চেপেছে সেটা যদি এইভাবে নেমে যায় তাহলে তবু ভালো। নইলে জলধর যদি সত্যি সত্যি গঙ্গার ঘোলা জল থেকে দগ্ধ গলিত মাথা তুলে ছপ ছপ করে হেঁটে আসে? ব্রেকফাস্ট খাব! মন্ত্রে যদি বল থাকে তাহলে তো হতেই পারে! হওয়াই উচিত! কীরকম হয় তাহলে রাহুল?

এই ভিজে নোংরা শাকান্ন খাবি তো খা জলধর! পুরুতের মুণ্ডু ভেঙে খা। বুড়ো পুরুত ঘোঁৎ ঘোঁৎ ফোঁৎ ফোঁৎ করে মন্ত্র আওড়াচ্ছে। ঘোলাটে ছানি-পড়া চোখ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। একে আর কার মুখে রুচবে? ওয়াক! তারপর থেকে সমস্ত পিণ্ডির ব্যাপারটা থেকেই মন উঠে যায় রাহুলের। সে দু-কান খাড়া করে শুধু কথক মহিলার কথকতা শুনে যায়। বেশ আকর্ষণ বোধ করে। তীক্ষ্ণ খনখনে গলা। টিনের করাতের মতো। এক এক সময় আড়চোখে চেয়ে মনে হয় তাদের দিকেও নজর রেখেছেন মহিলা। রাহুল ভাবে কোথায় উপনিষদ, কোথায় আমরা টাকার শ্রাদ্ধ করছি।

***********

পিণ্ডি দেওয়া শেষ হলে টাকা নিয়ে কোষাকুষি গুছিয়ে ফেলতে থাকে পুরুত। বনমালী আনপ্রেডিক্টেবল, অদ্ভুত। কখন কী ভাবছে কে জানে। একটু আগে মন দিয়ে মন্ত্র আওড়াচ্ছিল, এখন মনে হচ্ছে কী এক প্রশান্তিতে ডুবে আছে। যেন জলধর সত্যি প্রেতযোনি থেকে সকালের বাতাসে মুক্ত হয়ে গিয়ে বলল— থ্যাঙ্ক ইউ।

অনতিদূর থেকে সাধিকার গলা ভেসে আসছে —বানপ্রস্থে যাবার আগে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য নিজের দুই স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বড়োজনের নাম কাত্যায়নী। ছোটোজন মৈত্রেয়ী। যাজ্ঞবল্ক্য বললেন— ঘর বাড়ি, গরু ছাগল যা আছে তোমাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চাই। কার কোনটা বেশি প্রিয় জানাও।

বনমালী বিড়বিড় করে বলল— জলধরের তিনটে প্রিয় খাবার, পিণ্ডিতে দেওয়া হল না। কী কী বল তো?

রাহুল একটু ভেবে ফিসফিস করে বলে— আলুপোস্ত দিয়ে ভাত, কিমা-কালেজি আর রুটি। তৃতীয়টা বলতে পারে না। ভাববার চেষ্টা করে। কথকের গলা আসছে। নদীর হু হু হাওয়ার সাথে উড়ে। মনঃসংযোগ নষ্ট হয়ে যায় বার বার।

...তখন কাত্যায়নী এসে সেই সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ভাগ নিয়ে নিল। যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে বললেন— তুমি কী চাও? মৈত্রেয়ী বলল—ঘরবাড়ি পেলে কি আমি অমর হতে পারব? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন—না। মৈত্রেয়ী পুনরায় জিগ্যেস করল— গরু-ছাগল পেলে কি আমি অমর হতে পারি? যাজ্ঞবল্ক্য বললেন— না। তখন মৈত্রেয়ী বলল— যা নিয়ে আমি অমর হতে পারব না, তা দিয়ে আমি কী করব?...

এতটা বলে থেমেছেন কথক। দম নিচ্ছেন। একটা নাটকীয় বিরতি। রাহুলদের পুরুত ছোটো ছোটো পিণ্ডিগুলো শালপাতায় মুড়ে ফেলেছে। রাহুল চুপ করেই আছে। নদীর আওয়াজ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। বনমালী হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে গলা ছেড়ে হা হা করে হেসে উঠেছে!

রাহুলদের পুরুত একটু ভড়কে গেছে। রাহুল বুঝেছে ব্যাপারটা। পাশে বসা জমায়েতের লোকজন কিছুটা চমকে গিয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে এদিকে চেয়ে আছে। উজবুক না পাগল? সাধিকা মহিলার ভুরু কুঁচকে গেছে। কিছু বলতে গিয়ে চুপ। রাহুল অনুভব করল তার কানও লাল।

বনমালীই শুধু নির্বিকার। খুক খুক করে হেসে বলতে থাকে—ফোর স্কোয়ার কিংস। ভালো খাবারের পর দুটো। মনে নেই? লিভ লাইফ কিংসাইজ!

সত্যি মাথা বটে বনমালীর। কীরকম চিনে রেখেছে জলধরকে! যেন টাটকা একটা সিগারেট চেয়ে খেল সে এইমাত্র। —থ্যাঙ্ক ইউ, বলে।

অন্যদিকে ডোবায় বনমালী। আস্ত উজবুকের মতো পকেট থাবড়ে নিজেও সিগারেটের প্যাকেট বের করে সাধিকার ডান পায়ের কাছে বসা কোর্তা-পরা গুঁফো ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে চোখ নাচিয়ে বলে—মাচিস হ্যায়, গুরু?

**********

এ কদিন বনমালীর মাথায় একটা রগচটা মামদো ভর করে ছিল। উস্কোখুস্কো চুল। মরদের মেজাজ। কিছুদিন থেকে সেই ভাবটা কমেছে। জলধরের পিণ্ড দেবার পর একেবারে হালকা ফুরফুরে। যেন এতদিন পর জলধরের কাছ থেকে ধার করা সাত-সতেরো টাকার হিসেব সুদে আসলে চুকে-বুকে গেছে।

গঙ্গার ধার দিয়ে অনেক দূর হেঁটে গিয়ে একটা নির্জন ঘাট পাওয়া গেল। বনমালী তার অভিজ্ঞতার থলে খুলে এ-কদিনের সঞ্চয় এক এক করে নামায়। পুরিয়াভর্তি সবুজ ঘাসের গুঁড়ো। মাটির ছিলিম। তলায় ফুটো। রাহুলকে বলে— ছিলিমটা ভর তো!

—কোন দিক দিয়ে ভরব? দু-দিকেই তো ফুটো! রাহুল মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রেখে দুদিক থেকেই একটু একটু করে গুঁজে দেয় ঘাস। বনমালী হাসতে হাসতে দেখিয়ে দেয়। ছোট্ট একটা নুড়ি ফেলে ছোটো ফুটোটা বন্ধ করে দে। তারপর উল্টো দিক দিয়ে ভর। দেশলাই ছুঁইয়ে রুমালে জড়ানো ছিলিম নিচের দিক থেকে একবার টানতেই রাহুলের বুকটা তেপান্তরের মাঠের মতো খাঁ খাঁ হয়ে যায়। ঘাটের উপর চিৎপাত। একটু পরে মনে হয় গড়িয়ে জলে পড়ে যাবে। বাকিটা বনমালী একাই বসে বসে সেবন করে। মুচকি মুচকি হাসে।

শরীর ঝরঝরে হয়ে গেলে দুজনেই জামাকাপড় সব খুলে ন্যাংটো হয়ে নেমে যায় জলে। একটু পরে বনমালী হ্যা হ্যা করে হাসছে তো হাসছেই। রাহুল জানতে চায়। কী রে? কী রে? -–একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। বলে বনমালী। অতনুকে মনে আছে? কাশ্মীরি গেটের অতনু? তার একটা পাগলা কাকা ছিল। কিছু না পরে, এই আমাদের মতো জলে নেমে যেত। একদিন একটা কাঁকড়া এসে তার ছুন্তুনটা চেপে ধরেছে। গাঁক গাঁক করতে করতে তাই নিয়ে সে সোজা বাড়ি। সেখানে প্লাস দিয়ে কেটে কাঁকড়াটা ছাড়িয়ে দেবার পর অতনুর মা-র দিকে সবাই চাইতেই উনি কি বললেন বল তো? -–ও কাঁকড়া আমি রাঁধতে পারব না!

বলতে বলতেই হো হো করে হাসছে। দুজনেই। তারপর হঠাৎ একসঙ্গে মনে পড়েছে নিজেদের ছু্ন্তুনের কথা। তৎক্ষণাৎ বাবা রে বলে বিশাল ভয়ে শিকল-ফিকল ধরে পিছলোতে পিছলোতে দুজনেই ঘাটের উপর। বিকেলে খাওয়াদাওয়ার পর নেশা কেটে গেলে রাহুল বলল— বহতা নদীতে কাঁকড়া থাকে নাকি? অতনুর কাকা নিশ্চয়ই ডোবায় নেমেছিল।

বনমালী বলল— সমুদ্রে তো থাকে! নদী আর সমুদ্রের মধ্যে কতটুকু তফাৎ?

************

এইসব বিভ্রান্তিকর চিন্তাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। গলি দিয়ে এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে কাপড়ের দোকান থেকে এক বৈষ্ণবকে বেরিয়ে আসতে দেখে। হলুদ নামাবলী গায়ে। নতুন নতুন গন্ধ বেরোচ্ছে। দেখে বাঙালিই মনে হয়। বনমালী পাঙ্গা করার জন্য দুই আঙুল জড়ো করে দেখায় কেমন ফাসক্লাস! দারুণ মানিয়েছে! লোকটা হাসে। ভাঙা ভাঙা হিন্দীতে বলে— গলা কাট লিয়া। কিন্তু কাপড়টা ভালো। রাহুল হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখে। পাতলা সুতির কাপড়। উজ্জ্বল হলুদ-লাল রঙে ছোপানো। মানিয়েছে বেশ। নিজেরও লোভ হয়। জিগ্যেস করে—কত নিল দাদা? তিরিশ টাকা। নেচে নেচে বলে বৈষ্ণব। বেশ মেয়েলি হাবভাব তার। —দরদাম করে নামাতে হলো। আমাদের যদি বেচতে না পারে তো কাকে বেচবে? হরে কৃষ্ণ।

বনমালীও রাহুলকে উসকে দিয়ে বলে— টাকা আছে? কিনে ফ্যাল, কিনে ফ্যাল। রেখে কি হবে? হয় গাঁজায় নয় কলিজায় বেরিয়ে যাবে। আত্মার শান্তি হবে না। দুজনে তারপর দশ নম্বর দোকানে ঢুকে জিগ্যেস করে— কি কি আছে নামাবলীর। দেখাও দিকি।

উপনিষদের মন্ত্র নেই শুনে বনমালী বিলক্ষণ চোটপাটও শুরু করে দেয়। জুতোর ব্যবসাই করো হে তোমরা। শাস্ত্রজ্ঞান নেই সে আবার মানুষ? অর্ডার দেওয়া যাবে? এই আমার বন্ধুর জন্য। য়েনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্য়াম্‌। উচ্চারণ করতে গেলে দাঁত ভেঙে যাবে, লিখে দিচ্ছি না-হয়।

কেউ অর্ডার নিতে রাজি হয় না। শেষে রাহুলই হরে-কৃষ্ণ নামাবলী পছন্দ করে ফেলে একটা। ধুত্তোর, এই হরে-কৃষ্ণ দিয়ে কী হবে রাহুল? মজাটা কোথায়? রাহুল একটু লজ্জা পায়। বনমালীর জ্বালায় একটা ভালো জিনিস কেনার উপায় নেই। দূর থেকে কে মন্ত্র পড়বে? বুঝবে কটা লোক? বনমালীকে বোঝায় সে। শুধু রঙটাই দেখবে লোকে। কী এমন খারাপ? লম্বা আছি, মোটামুটি ফরসা। সাদা ধুতি বা পাজামার উপর পরলে ভালোই দেখাবে।

খানিকক্ষণ লড়ে ছেড়ে দেয় বনমালী। —হরে-কৃষ্ণর বদলে লিভাই'স লেখা থাকলে আলাদা কথা ছিল।

সেই নামাবলী জড়িয়ে সারা বিকেল হাঁটাহাঁটি করে রাহুল। মনে হয় যেন শনির বলয়ের মতো তাকে একটা শক্তি ঘিরে রেখেছে। কোনো পাপীর দৃষ্টি তা ভেদ করতে পারে না। পেটটা ভালো করে ঢেকে রাখে। নামগুলো থেকে যেন পুঞ্জ পুঞ্জ জ্যোতি বেরোচ্ছে। গালাগালি আর দেব না। মনে মনে বলে রাহুল। কতটা উপরে ওঠা যায় দেখা যাক।

বনমালী শুধু ফোর স্কোয়ার ঠুকতে ঠুকতে সাবধান করে দেয়। –-সবই ভালো। মেয়েলি হাবভাবটা না হয়ে যায় রাহুল। সেটা একটু দেখে।

********

রাহুলের ডায়েরি থেকে: “...বনমালী এসব কাণ্ড করার পর থেকেই ফোর স্কোয়ারের প্যাকেট দেখলে মনে হচ্ছে আমাদের এই কিংসাইজ জীবন পুড়ে ধুড়ে খাক হয়ে গেল। হরিদ্বারে এসে কোনো গুরুর দেখা পাইনি। কিন্তু বনমালী আর আমি পরস্পরের অবিমৃষ্যকারিতা আর বোকামি থেকেই শিখেছি অনেক কিছু।

সন্ধে রাতে ঘরে টিমটিমে বাতি জ্বালিয়ে বনমালী গাঁজা টানত। দেখে দেখে দারুণ দু:খ আর হতাশায় ভরে যেত মন। কিন্তু কোনো ইচ্ছে হতো না নেশা করার। প্রধান সমস্যা হলো এই যে দিল্লী থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেও শুধু চতুর্দিকে মৃত্যুভয় ছাড়া আর কিছু দেখছি না। মৈত্রেয়ীকে মনে হচ্ছে কলেজের কোনো ব্রাহ্মণের রুগ্ন মাঙ্গলিক মেয়ে। আমার মার খেয়ে মৃত্যুর ভয়। তারও চেয়ে গভীর কোনো ভয়ে সে বিবর্ণ হয়ে আছে। কেউ চাইছে বাস্তবিক অমরতা। কেউ চাইছে আরো দুটো সিগারেট। জলধর বেঁচে থাকলে বলতো—এ আবার একটা সিস্টেম। থুঃ!

বনমালীকে দিয়ে কথা বলানোর চেষ্টা বৃথা। কিছু আলোচনা করতে চাইলে বলবে— কাব্য লিখছিস না কেন? খাতা কই? আগে থেকেই জানি তার মৃত্যুভয় যত না, তার চেয়ে বেশি ভয় বেশিদিন বাঁচার। পুরনো দিল্লীতে বড়ো হওয়ার ফল। এক একটা দেয়াল নাদির শাহ-র আমল থেকে দাঁড়িয়ে আছে। জি. বি. রোডের দুদিকে প্রাচীন বেশ্যাপাড়া দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক বুড়িকে দেখিয়েছিল একবার। ফুটপাথে বিছানা পেতে টান টান হয়ে শুয়ে আছে। রোগা, কালো, ভয়ংকর ডাইনির মতো চেহারা। বনমালী সিরিয়াসলি বলেছিল— ওই যে দেখছিস? ওর নাম রানি। ও হলো অমর। আলাপ করবি তো চ।

ভীষণ ভয়ে আমি প্রায় দৌড়ে পালিয়েছিলাম। বনমালী তাতেই খুশি। নিজের ভয়-ভীতি সে এইভাবে ঢেকে-ঢুকে রাখে আর কী।

নিরাশই থাকি। কোনো সর্বাঙ্গীন সান্ত্বনা খুঁজে পাই না। সুখেনবাবু থাকলে কি বলতেন কে জানে। কিন্তু এখানে তো কেউ নেই, যে কিছু বলে...”

*********

আরো পাঁচ পনেরো দিন বাদে বৃষ্টিটা ধরে যায়। উত্তরাখণ্ডে কেদার-বদ্রীর পথ খুলে যাব যাব করছে। কিছুদিন খুলেই আবার বন্ধ হয়ে যাবে। তুষারের জন্য। বনমালী বলল— পয়সাকড়ি ফুড়ুৎ। লাস্ট চান্স নেব যদি কিছু ধার পাওয়া যায়। তাহলে একবার গঙ্গোত্রী ঘুরে আসা যায়। রাহুল অবাক হয়ে বলে— ধার দেবে কে? বনমালী মনঃক্ষুণ্ণ। —কেন? আগরওয়াল? আগরওয়াল দেখছে বনমালী দিবারাত্র গাঁজা খেয়ে পড়ে আছে। সে দেবে টাকা? রাহুল বলে— তার চেয়ে জ্যোতিষী ফলিয়ে যদি কিছু রোজগার করতে পারিস তো হয়।

সকালে উঠে দেখে আসে, গাঢ়ওয়াল মণ্ডলের কমলা বাসগুলো অন্ধকারেই সওয়ারি নিয়ে চলেছে। শীত শীত হাওয়া—মিটার গেজের রেললাইন ধরে হুশ হুশ করে চলে যায় ভোরবেলার গাড়ি। কুহক জ্যোৎস্নার মধ্যে ঋষিকেশের পথে হেঁটে চলেছে মহাপ্রস্থানের পথিক। রাহুলরা হি হি করতে করতে গঙ্গার তীর অবধি গিয়ে একটা ডুব দিয়ে আসে। আধো অন্ধকারে অনেক মেয়ে-পুরুষই আসে। আকাশে আধমোছা চাঁদ। জল-বাতাসের অপার্থিব স্পর্শেই তো তীর্থের মহিমা। বনমালী ঘাটের একটা অংশ দেখিয়ে ঠিক করে নেয় ওখানেই ব্যবসা শুরু করবে।

—তোর নামাবলীটা লাগবে রাহুল।

স্নান করতে করতেই ভোর হয়ে যায়। বাইরের গঙ্গা দিয়ে চন্দনকাঠের গুঁড়ি ভেসে যাচ্ছে, তার সুগন্ধ। জলের অনন্ত কলরব। এইসব থেকে পৃথিবীর প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে রাহুল। মনে মনে শপথের মতো বলে যদি আমি মরে যাই, প্রেত হয়ে অন্য প্রেতের সঙ্গে অভুক্ত, জলে-স্থলে বিলীন হয়ে যাই যদি, তাহলে এই হিম ঋতুর প্রতিটি অপরিহার্য দিন নিয়ে তুমি অমর হয়ে থেকো মৈত্রেয়ী। আমার খুব ভালো লাগবে।

রাহুলের মনে হয় দিল্লীতে তার ছক-কাটা রাজনৈতিক হত্যার অকুস্থল বাবার মতো শুধু ডাকছে। —আমি আছি। তুমি যখন ইচ্ছে হয় এসো। কোনো তাড়া নেই।

*************

আস্তে আস্তে রোদ উঠে পড়ে। বেশ বেলা হয়ে যায়। নিজের নিজের অগোছালো মন নিয়ে দুজনে ঠান্ডা অলিগলি অতিক্রম করে যায়। জিলিপি পরোটা ভাজা হচ্ছে। চায়ের ধোঁয়া, কাঠকয়লার ধোঁয়া এসে অধিকার করেছে রাজপথ। গবাক্ষ থেকে বন্ধ কপাট খুলে দিচ্ছে কে। রাহুল ভাবে— কিছু একটা হবে তো?

ধর্মশালায় ঢুকতেই আগরওয়াল অফিস থেকে ডাকে। —এদিকে একটু।

বনমালী বলে— তুই যা। আমি কথা বলে আসছি।

রাহুল সিঁড়ি দিয়ে টপাটপ উপরে উঠে দেখে লাল ডুরে শাড়ি পরে একটা মেয়ে বারান্দার ওদিকটায় ঘুর ঘুর করছে। সম্ভ্রম রাখবে বলে নামাবলীটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। চুল এখনো ভিজে খুলির সাথে লেপটে আছে। বুক দেখা যাচ্ছিল বোধহয়। পকেট থেকে চাবি বের করে তালায় ঢুকিয়ে ঘোরাতে যায়।

বারান্দার ওদিক থেকে কেউ এগিয়ে আসছে। তার পায়ের শব্দ। রাহুলের বুক গুড়গুড় করে। পেটের দাগ বরাবর যেন ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। চড়া গলায় হঠাৎ কে বলে ওঠে — ফ্যান্টাসটিক!

ভীষণ চমকে বাপ্‌রে বলে তিন পা পিছিয়ে যায় রাহুল। হাত থেকে চাবিটা ঝনাৎ করে পড়ে মেঝেয়। লাল শাড়ি পরে শ্যামলী কিম্বা শ্যামলীর ভূত। চুল খোলা, হাতে একটা কলম। সেটাকে ঠোঁটে ঠেকিয়ে রাহুলকে দেখছে। গল্পের ভূতেরই মতো। কথা বলছে — ফ্যানটাসটিক! নামাবলী যে! দেখি দেখি কি লেখা!

রাহুল সত্যি সন্দেহ করতে থাকে। মেয়েটা বেঁচে আছে তো? অনেকে মরে গিয়ে প্রিয় বন্ধুদের সাথে দেখা করতে আসে। নাকি রাহুলের চোখেরই ভুল। গাঁজা।

—হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। শ্যামলী বা শ্যমলীর রূপ ধরা সেইজন রসিয়ে রসিয়ে পড়ে। দারুণ, দারুণ!!

কথাবার্তা শুনে শ্যামলীই মনে হয়। তবু সাবধানের মার নেই। মাথাটা ঝিমিয়ে তো আছেই। সাত-পাঁচ ভেবে ভদ্রলোকের মতো একবার জিগ্যেস করেই নেয় রাহুল।

—হু আর ইউ? আপনি কে?

**************

(ক্রমশ)



(পরবাস-৭৪, ১১ জুন ২০১৯)