কবির সৃজন-বিশ্ব

উদয় নারায়ণ সিংহ


(রামধারী সিং দিনকর)

শৈশবসংগীতে কবি এক বালকের কথা লিখেছিলেন যাকে মুমূর্ষু পিতার কাছে দেখা গেল গভীর রাতে যখন সারা পৃথিবী নীরব নিশ্চুপ—যে দেখছে বীর বাবার হৃদয়ে ছুরিকা বিঁধানো—বিবর্ণ মুখে রোষের অনল, যিনি সন্তানকে একটা পাল্টা রক্তপাতের প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞায় বাঁধছেন। প্রতিহিংসার ভাবনা নিয়ে বালক ক্ষত্রকুলপ্রভুর কাছে শপথ নিয়ে বেরিয়ে আসে পিতার হত্যাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে, কিন্তু হায়—যে মালতীবালার প্রেমে প’ড়ে ভালোবাসার নরম অনুভূতিগুলি তার বুক থেকে প্রতিশোধের জ্বালা দেয় মুছে, দেখা যায় তারই পিতা হলেন সেই অজানিত শত্রু যাকে বীরবালক খুঁজে বেড়িয়েছে সারা পৃথিবীতে। তার পরের হাহাকারের গল্প সবাই আঁচ করতে পারবে। অথচ সেই অশোক বালক তখন ভূমির 'পরে বসে "আপন ভাবনা-ভরে" দুঃখ ও বিষাদের কথা ভুলে যাবে, সেটাই শিশুর ধর্ম। সেই শৈশবকে আমরা বোধ হয় বিসর্জন দিতে চলেছি অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে, যার ফলে আজ সন্ত্রাসের পথে শিশু-কিশোরেরাও হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছে। এটাই সম্ভবত আজকের সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকট অথচ এই 'ভাবনা' বা 'দুর্ভাবনা' নিয়ে আমরা কেউ বিচলিত নই।

মনে হয় এ-যেন কোনো মনগড়া পুরাণ-কাহিনী পড়ছি যেখানে ভস্মাসুর শিবের আশীর্বাদ পেয়ে প্রথমেই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দিতে চাইছে 'বসন্ত'-কে, কেননা এ সেই সময় যখন পৃথিবী সেজে ওঠে অপরূপ সাজে; বিসর্জন দিতে চাইছে বর্ষা-কে কারণ এ-এক এমন ঋতু যখন প্রচুর নতুন প্রাণ নবীন সম্ভাবনার বীজ-বপন করা হয়—কারণ যা কিছু শিব ও সুন্দর, ও তারই বিরোধী। অসুরের মনে হয়েছে ঋতুর এই বিবিধতা—এ-সবই ঈশ্বরের ষড়যন্ত্র, জগৎ জুড়ে যদি একটি ঋতুই থাকে তো ক্ষতি কি? এত শত প্রাণীরই বা কোন উপযোগিতা? কেউ হাঁটে, কেউ সাঁতরায়, কেউ ওড়ে, কেউ বুকে হাঁটে—কী দরকার এত রকমের? এক সুর, এক গান, এক তান, এক কথা, একই পরিধান—না-জানি কত সুন্দর হবে সেই পৃথিবী? অত আলো, এমন রঙের বিবিধতাই বা কেন? সবাই যদি হয় লাল, নয় সবুজ অথবা গেরুয়া পতাকার তলায় এসে দাঁড়ায়, তাতে কী ক্ষতি? যে কেউ এই একরূপতার বিরোধী, তাকে নির্মমভাবে দমন করতে হবে। প্রতিটি সংঘর্ষে, প্রতি রণে, প্রত্যেক বিশ্বযুদ্ধে এইটেই করতে চেয়েছে ভস্মাসুর, অথচ সে গল্প কেউ বলে না। এমন গল্পের পৃথিবীতে হানাহানি হবে একটা বিশাল প্রদর্শ-ক্রীড়া যা দেখবে সবাই আর যা নিয়ে মেতে উঠবে, অসিযুদ্ধ থেকে ষাঁড়ের লড়াই অথবা আজকের চর্ম-গোলকের খেলা তার কাছে ফিকে হয়ে যাবে।

ভাবছি—কি-করে আটকানো যায় এই অসুরদের যারা আমাদের বিচিত্রতার বৈভব ও বহু-বর্ণতার বিরোধী; তাদের হাত থেকে স্বপ্নবাচী শৈশবকে আর অতিচঞ্চল কৈশোরকে কিভাবে রক্ষা করা যায়? যে ঝুলিতে ঠাকুরমারা কোনো এক যুগে গল্প-গাছা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন অথবা কথক ঠাকুরেরা বেছে-ছেনে বহু-বিচিত্র কাহিনী গেঁথে-গড়ে শোনাতে পারতেন, সেই ঝুলি এখন মলিন ও পরিত্যক্ত; আজকের বয়স্করা গল্প গড়া ও গল্প বলার শিল্প ভুলে গেছেন, শুধু চোখ রাখছেন পর্দায় কোথায় নতুন আঘাত, নতুন হানাহানি কিংবা শরীরী অত্যাচারের সত্য-ঘটনা ঘটছে; কথক ঠাকুরেরাও বোধ করি দূর-সঞ্চারের কাছে নতুন জিলিপির প্যাঁচ হাজার এপিসোডে লিখবেন বলে দাসখত সই করে দিয়েছেন। আর কমলাকান্ত থেকে রবিঠাকুর হয়ে সুনীল-শীর্ষেন্দুতে এসে ছোটদের মত করে ছোটদের জন্য গল্প বলা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। ভূতেরা যে-যার ডালে ফিরে গিয়ে চলদ্ভাষে লম্বা লম্বা বিশ্রম্ভালাপে ব্যস্ত, ডিটেকটিভেরা অন্যত্র রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত, আর অভিযাত্রীরা প্রতীক্ষা করছেন কবে আবার এল-টি-সি পাওয়া যাবে। এ এক অসহনীয় অবস্থা—যার থেকে হাত ছাড়াতে গিয়ে কিছুদিন আগে লিখেছিলাম কারিগরেরই জন্য চোদ্দটা ভুতের গল্প নিয়ে নতুন বই—ভূতচতুর্দশী। এত সাড়া পাওয়া যাবে বুঝিনি, তাই এখন ভাবছি এবার আরো লেখার পালা—এর আগে শুধু মাত্র ছড়ার বই 'খাম-খেয়ালি' লিখেই ক্ষান্ত হয়েছিলাম; অথচ এবার মনে হচ্ছে আবার গল্পদাদুর আসর জমানোর পালা। কিন্তু তারও আগে মানে হয়েছে খোলসা করা দরকার—কিভাবে পড়া যায় সংস্কৃতিকে? অতএব এই পাঠের অবতারণা।

আরেকটা অভাব আমাকে খুবই ভাবিয়েছে—যা-কিছু করছি তার মধ্যে নিষ্ঠা ও ভালোবাসার অভাব। প্রবন্ধ লিখছি, গবেষণা করছি অথচ নতুন কোনো কথা বলার মত উত্তেজনার অনুভূতি আমার ভেতরে নেই, নারী-পুরুষের সম্বন্ধের জটিলতা নিয়ে গল্প ফেঁদেছি কিন্তু তাতে যৌনতার স্বরই মুখ্য—এমন লেখা, আলোচনা ও অনুষ্ঠান আমরা হার-হামেশাই দেখছি। মনে এই গবেষণার সাতবাসি রূপ ও কথানকের আবিলতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মন ছটফট করতে থাকে। শেষ বয়সে এসে কবি যে কথা সোচ্চারে বলে গেছেন তা বারবার অনুরণিত হতে থাকে—যেখানে রয়েছে শুধু 'ভালবাসা'র প্রতিশ্রুতি: 'আজ দিনান্তের অন্ধকারে/ এ জন্মের যত ভাবনা যত বেদনা/ নিবিড় চেতনায় সম্মিলিত হয়ে/ সন্ধ্যাবেলার একলা তারার মতো/ জীবনের শেষবাণীতে হোক উদ্ভাসিত—/ ''ভালোবাসি'''।

ইদানীং কয়েক বছর আগে ২০১৩-সালে নতুন করে ভালোবাসার পাঠ নিলাম আমার সেই সময়কার সদ্য শেষ করা অনুবাদ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ 'অন্য গীতাঞ্জলি' (‘The Other Gitanjali’) নামের ইংরেজি গ্রন্থটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দক্ষিণ-পশ্চিম পিরানে পর্বতের উঁচু পাহাড়ে ঘেরা একটি ছোটো দেশ 'এ্যান্ডোরা'-য়, যার ঠিক আগেই বেলজিয়ামে আমরা ল্যুভেন শহরে ভালোবাসা নিয়ে একটা পাবলিক ডিবেট-এ যোগ দেবো যেখানে আলোচ্য বিষয় হল ভালোবাসা—মির্চা এলিয়াদ ও মৈত্রেয়ী দেবীর অন্তর্সম্বন্ধের পরিণাম-স্বরূপ রুমানিয়ান ও বাংলায় যে-দুটি অসাধারণ উপন্যাস লেখা হয়েছে, যার পশ্চাদপটে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, এই বিষয়ে মুখোমুখি আলোচনায় যাতে অন্য আলোচক ও-দেশের বিখ্যাত অধ্যাপক সোরিন অলেক্সন্দ্রিস্কিউ। ইউরোপালিযা উত্সবের সেবারের ভারত-কেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের প্রধান বিষয় হল ‘ভালোবাসা’ যাকে প্রাচ্যে ও পশ্চিমে কিভাবে দেখা হয়। এ-নিয়েও পরে অবশ্যই একটা বড় লেখার পরিকল্পনা রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের সৃজন-বিশ্বের নির্মাণের ইতিহাসে যাঁরা অপরিহার্য ছিলেন, কালের বিস্মৃতির অভ্যাসে তাঁদের অনেকের নামই আজ অনুচ্চারিত। পঞ্জিকার চিত্রগুপ্ত যে বিলুপ্তির খেরোর খাতায় এঁদের অনেকের নাম তুলে ফেলেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। সেখান থেকে তাঁদের বেছে এনে কবি-জীবনীর পাতায় স্থান ক'রে দেওয়ার জন্য আমাদের নিঃসন্দেহে নতুন ক'রে প্রশান্ত পালেদের খুঁজে বের করতে হবে। আবার অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দায়ী ছিলেন—যাঁরা হয়ত খ্যাতি, প্রতিপত্তি, পদ-মর্যাদা বা পুরস্কারের তোয়াক্কা না করেই এবং সরাসরি কবির বা তাঁর সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানের (শান্তিনিকেতন) সংস্পর্শে না এসেও শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, আদর্শ, কৃতিত্ব এবং পথ-নির্দেশের উপর অগাধ আস্থা রেখে এগিয়ে এসেছেন ওঁর লেখা, সুর, আঁকা, বলা, গড়া আর করার প্রচারের অভিনব সব উদাহরণ গড়ে তুলতে।

কেউ হয়ত সুরের জাদুকর, যাঁকে রবীন্দ্র-সঙ্গীতের মূর্ছনা ও তার সমৃদ্ধ শব্দ-সামর্থ্য কোথাও স্পর্শ করে গেছে—আর তিনি নিজেকে যুক্ত করেছেন বিভাষায় সেই সব গানকে ও কথাকে রূপ-দান করতে। অথবা সেই সুরকে ভিত্তি করে নতুন নতুন সিম্ফনি গড়ে তুলতে বা নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। অনেকে সেই সব গল্প-কথা বেছে নিয়ে তাদের—কবির ভাষায় বলতে গেলে 'সিনেমা-নাট্যে'র নিজস্ব ভাষায় অনুসৃজন করেছেন। নিজেরা বিশ্ব-বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের আলোয় প্রতিফলিত হয়ে কিছুটা খ্যাতি পাবেন, সেই কথা মাথায় না রেখেও অনেকে রবীন্দ্র-অনুবাদে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যোগ দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই হয়ত অন্য ভাষায় রচনাশীল ও প্রতিষ্ঠিত কবি—যাঁদের কোনও প্রয়োজন ছিল না কবিকে সে সব ভাষার পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। হিন্দীসাহিত্য জগতে রামধারী সিংহ 'দিনকর', তেলুগুর 'চলম'-এর মত কবি বা ফরাসির আন্দ্রে জীইদ এঁরা এই দলে পড়েন। জ্ঞানপীঠ পুরস্কার-বিজয়ী দত্তাত্রেয় রামচন্দ্র বেন্দ্রে (১৮৯৬ - ১৯৮১)—যাঁকে কন্নড় ভাষার একালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও আধুনিক কন্নড় কবিতার জনক মনে করা হয়, বাংলা শিখেছিলেন শুধু কবিগুরুকে মূল পাঠে পড়তে-জানতে। এ কি কম আশ্চর্যের কথা? তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতামালা—'সাধনা' ছিল এক আবিষ্কারের মতই। তবে রবীন্দ্রনাথের রচনা-সম্ভারের গুণগত উত্কর্ষের তুলনায় সমতুল খ্যাতি কি হয়েছে—বা আজকের বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার পাঠক কি ওঁর কৃতি পড়তে পাচ্ছে—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। কবি নিজে অবশ্য অবহিত ছিলেন যে এই খ্যাতির উপরে রয়েছে প্রলেপ মাত্র—আধুনিক মত্ততার ইঞ্চিদুই পলিমাটি; তাই লিখছেন 'পুনশ্চ'-তে :

এখন আমার কথা শোনো।
         আমার এ খ্যাতি
     আধুনিক মত্ততার ইঞ্চিদুই পলিমাটি –পরে
         হঠাৎ - গজিয়ে- ওঠা।
         স্টুপিড জানে না—
     মূল এর বেশি দূর নয়;
       ফল এর কোনোখানে নেই,
         কেবলই পাতার ঘটা।
তবে কবি হয়ত জানতেন—আজকের প্রজন্মের কবি-সমালোচক, যাঁরা সহজেই মূল-পাঠ বা তার সময়-স্থান সীমার কথা না জেনেই সহজেই ঘোষণা করতে পারেন—গিরিশ কার্নাডের মত—যে রবীন্দ্র-নাটক আদৌ মঞ্চন-যোগ্য নাট্য-কৃতি নয়—তাঁদেরকে বলতেই হবে: “আমি জানি তুমি কতখানি বড়ো।/ এ ফাঁকা খ্যাতির চোরা মেকি পয়সায়/ বিকাব কি বন্ধুত্ব তোমার।”

খ্যাতি ও তার অর্জনের লোভের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের তির্যক মন্তব্যের কথা এঁরা জানতেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে কবি ‘ভারতী’-র আশ্বিন ১২৮৮ সংখ্যায় লিখেছিলেন (যা পরে বিবিধ প্রসঙ্গ, পৃ ২৯২-এর অন্তর্ভুক্ত হয়): “কবিরা… অসাধারণ বুদ্ধিমান। তাঁহারা বুঝেন, কিন্তু এত বিদ্যুৎ-বেগে যুক্তির রাস্তা অতিক্রম করিয়া আসেন যে, রাস্তা মনে থাকে না, কেবল বুঝেন মাত্র। কাজেই অনেক সমালোচককে রাস্তা বাহির করিবার জন্য জাহাজ পাঠাইতে হয়। … দ্রুতগামী কবি সহসা এমন একটা দূর ভবিষ্যতের রাজ্যে গিয়া উপস্থিত হন যে, বর্ত্তমান কাল তাঁহার ভাবভঙ্গী বুঝিতে পারে না। …কাজেই সে হঠাৎ মনে করে কবিটা বুঝি পথ হারাইয়া কোন অজায়গায় গিয়া উপস্থিত হইল; কবিরা মহা দার্শনিক। কেবল দার্শনিকদের ন্যায় তাঁহারা ইচ্ছা করিলে নির্ব্বোধ হইতে পারেন না। কিয়ৎ-পরিমানে নির্ব্বোধ না হইলে এ সংসারে বুদ্ধিমান বলিয়া খ্যাতি হয় না।” অগ্রজ কবির কথা-মত 'কিয়ৎ-পরিমানে নির্ব্বোধ' হতে এঁদের আপত্তি ছিল না—শব্দে খাপ খাবে না পুরোপুরি, কোথাও ছন্দেরও হয়ত কিছুটা গরমিল থেকে যাবে, কোথাও বাংলার সঙ্গে সংস্কৃতিগত প্রভেদে অনুকৃতিতে আসবে নানান সমস্যা—তবু হার মানার কিছু নেই।

ক’বছর আগে গিরীশের কথায় রবীন্দ্র-নাটকের কথা উঠেছে বলে বলতে চাই—নাটকের নানান প্রয়োগে রবীন্দ্রনাথের ৬৪টি নাটক না-হলেও বেশ কটিকে কলাপ্রেমী দর্শকদের সামনে নতুন আঙ্গিকে মেলে ধরেছেন। কিছু কাল আগে সতীশ আলেকরের মত বিখ্যাত মারাঠী নাট্য-ব্যক্তিত্ব যখন ২০০৮-এ 'ফাল্গুনী' বা ‘The Cycle of Spring’-এর মারাঠী নাট্য-রূপ 'চৈত্রা' মঞ্চস্থ করেন, অথবা ২০০৬-এ মুম্বাই-এর বিখ্যাত নেহেরু থিয়েটার ফেস্টিভালে যখন হাবিব তানভির রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস 'রাজর্ষি' ও নাটক 'বিসর্জন'-কে নিয়ে নতুন প্রযোজনা নিয়ে এলেন 'রাজ-রক্ত' নামে। রাজা, ডাকঘর, রক্তকরবী আর মুক্তধারার হিন্দী অনুবাদ সাহিত্য আকাদেমি কর্তৃপক্ষ ১৯৬৬ সালেই ছেপে বের করেছিলেন—যার ফলে এই নাটকগুলির মঞ্চ-রূপ সহজ হয়েছিল। এ ছাড়াও, কলাক্ষেত্রের সত্তর-ঊর্ধ বরিষ্ঠ অধ্যাপক ও রুক্মিণী দেবীর ছাত্র এ জনার্দন যখন 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যের ভরতনাট্যম উপস্থাপনায় বজ্রসেন ও উত্তীয়ের ভূমিকায় মঞ্চে নামেন অথবা শর্মিলা রায় পোমোর পরিচালনায় যখন ইউনেস্কোর মঞ্চে স্পেনিয় অভিনেতা জেভিয়ার মেস্ত্রেস এমিলিও এবং বেহালা বাদক গ্যাব্রিয়েল লনের সঙ্গে রাজস্থানের কত্থক নর্তকী শর্মিলা শর্মা কবির নৃত্যনাট্যের প্রযোজনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন কিংবা আমেরিকার সেন্ট লুইসের কুচিপুড়ি শিক্ষক প্রসন্ন কস্তুরী যখন 'চিত্ত যেথা ভয় শূন্যে'-র কন্নড় রূপ 'য়েল্লি মন কলুকিরাডো' দিয়ে রবীন্দ্র-গীত ও নৃত্যের অর্ঘ্য সাজিয়ে ১৫-টি দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন অথবা দেশের প্রথম সারির নাট্য-পরিচালক রতন থিয়াম যখন ইম্ফলে 'রাজা'-র মণিপুরী ভাষার নাট্যরূপ 'শকুদাবা শকনইবা'-র অসাধারণ প্রযোজনা দিয়ে নাট্য-উত্সবের সুচনা করেন--তখন মনে হয় পারফর্মিং আর্টসের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিল্পী বলে অপপ্রচারের যত প্রচেষ্টাই হোক না কেন, ওঁর গান-নাটক-নৃত্য তো বহুদিন ধরেই ভারতের কোনায় কোনায় হয়ে এসেছে – বিস্মৃতি-পরায়ণ জাতি বলে আমরাই কোনো খবর রাখি না। আজ নয়, ১৯৬৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী থেকেই রবীন্দ্রনাথের 'বিসর্জন'-এর টি এমবি নেদুনগাডির অনুবাদে মালয়ালম রূপ 'বলিদানম'-এর যে কথাকলি মঞ্চায়নের কথা আমরা ফিলিপ জার্রিল্লির বই 'The Kathakali Complex: Performance & Structure' থেকে জানতে পারি সেই সব ঘটনার কথা আজ বিতর্কের মুহূর্তে আরো বেশি করে মনে পড়ে। সেই ঐতিহ্য মেনে আজও কেরালার প্রখ্যাত নাট্য-ব্যক্তিত্ব কাভালাম নারায়ণ পানিক্কার-এর রূপান্তরে 'চণ্ডালিকা' কিংবা ত্রিচুরের 'রঙ্গচেতনা' গোষ্ঠির প্রযোজনায় কে ভি গণেশের 'রক্থকরবী' বা কাদাম্বাজ্জিপুরমের নাট্যশাস্ত্র দলের নারিপত্ত রাজুর নির্দেশনায় 'বিসর্জন'-এর মঞ্চ-রূপ পালাক্কাডের জাতীয় নাট্যোত্সবের দর্শকদের মোহিত করে—যার খবর আমরা জানতে পারি না।

কিভাবে রবীন্দ্রনাথের রচনা—গান, নাটক ও নৃত্য-শিল্প-কর্ম কোনো-না-কোনো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সংগ্রামীদেরকেও সর্বত্র অনুপ্রাণিত করেছে, ঘরের কাছে তার উদাহরণ হল মহিলাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৬-দিনের গুয়াহাটিতে রবিজীত গগৈ-এর অনুবাদে ও নির্দেশনায় জির্সং থিয়েটারের 'ইতি মৃণালিনী'-র নাট্য প্রয়োগ। তবে আমরা আগেও দেখেছি টরন্টোর অভিনেতা-নির্দেশক ঈশ্বর মূলজির 'রক্ত-করবী'-র প্রযোজনা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণ-বিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে কিভাবে একজন শ্বেতাঙ্গ নির্দেশকের মঞ্চন-কৃতি রূপে ইউনিভার্সিটি থিয়েটার-এর প্রায় ৩০০০ দর্শকদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, 'ডাকঘর'-এর প্রায় শতাধিক ভাষায় অনুবাদ ও প্রযোজনার উদাহরণ হিসেবে আমরা পাচ্ছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্যারিসের পতনের আগের রাতে জুন ১৯৪০-এ রেডিও ফ্রান্স থেকে 'ডাকঘর'-এর সম্প্রসারণ—কি ছিল ওই নাটকে যেজন্য ওয়ারশ-র ঘেটোর অনাথালয়ের শিশুদের নিয়ে Janusz Korczak একটা অসাধারণ প্রযোজনা করেছিলেন প্রায় একই সময়ে, যার কিছুদিন পরেই ১৯৪২-এ ওঁকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়?

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে—১৯২১-এ যখন রবীন্দ্রনাথ প্রথম বার জার্মানি-তে যান প্রথম বিশ্ব-যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানির উপর শান্তির ও স্বস্তির প্রলেপের মতই, তখন থেকেই ও-দেশে ওঁর জনপ্রিয়তার শুরু যা থামানোর জন্য পরে নাত্সী শাসক সম্প্রদায়কে বিশেষ ফরমান জারি করতে হয়েছিল। তাতে কিছুদিন অনুবাদের ধারা বন্ধ ছিল বটে—তবে রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভক্ত অনুবাদিকা হেলেন-মেয়ের ফ্রাঙ্ক তাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করেন—যদিও আরনসনের মত ওঁর পক্ষে ভারতে আসা কিছুতেই সম্ভব হয় নি বিদেশী শাসকের বিরোধিতার ফলে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ এলো বলে বলতে হয় আলেক্স আরনসনের কথা—গত বছর যাঁর শতবার্ষিকী গেল, যিনি গুরুদেবের আমন্ত্রণে ও ব্যবস্থাপনায় ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো ছাড়াও সারা পৃথিবীতে কবির ভ্রমণের পর দেশ-বিদেশের কাগজে যে খবর, বর্ণনা ও আলোচনা ছাপা হয়েছিল তার বিস্রস্ত ও স্তূপাকৃতি জমা কাগজকে সুষ্ঠু ভাবে গুছিয়ে শ্রেণীবদ্ধ করে পরবর্তী কালের রবীন্দ্র গবেষকদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ ছেড়ে গেছেন। একজন জার্মান ইহুদী হিসেবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা ছাড়া ওঁর মত বুদ্ধিজীবির আর কোনো উপায় ছিল না—তবে সেযুগে তাঁর পক্ষে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে ঢোকাটাও সহজ ছিলনা। দার্শনিক উইট্টগেনস্টাইন, ল্যাটিন আমেরিকার পাবলো নেরুদার মত কবি, বা মরিশাসের ফরাসী কবি লেওভিল ল'ম অথবা ঔপন্যাসিক রবার্ট এডওয়ার্ড হার্টের মতন না-জানি কত সহস্র লেখক-কবি রয়েছেন সারা পৃথিবীতে যাঁদের উপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল অসীম। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আরনসন স্মরণ করেন নিজের জীবন-স্মৃতিতে ওঁর সঙ্গে কবির প্রথম সাক্ষাতের কথা (যা বন্ধুবর মার্টিন কাম্পচেনের একটি লেখা থেকে উদ্ধৃত করে দিলাম): “I recall how deeply impressed I was by his voice, his physical appearance, the utter simplicity of his arguments which were less literary than human. I listened without interrupting him. I was, naturally, much too intimidated to contradict or to argue. That first interview lasted half an hour. By the time I left his room, darkness had fallen. I was as if intoxicated by the warmth of his voice, the shape of his hands, the sensuous perfection of his face.”

আজকে রবীন্দ্রনাথের চলে যাওয়ার সাত দশকেরও বেশি পর বেশ কয়েকটি মহাদেশে ওঁর সৃষ্টি-কর্মের নানান দিক নিয়ে বলতে গিয়ে অথবা ওঁর আঁকা ছবির বিশ্ব-ব্যাপী প্রদর্শনীর আয়োজন করতে গিয়ে এখনও যত উত্সাহী পাঠক, দর্শক, শ্রোতা ও বুদ্ধিজীবীকে পেয়েছি—তাতে মনে হয়েছে কোথাও সব দেশের সর্বকালের মানুষকে ছুঁয়ে যাওয়ার জাদু ওঁর প্রতিটি শিল্প-কর্ম সাহিত্য ও রচনায় হয়ত ছিল; তা-না হলে 'তাসের দেশ'-এর ওয়াটার-ব্যালের মতন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জেলের বন্দিদের প্রযোজনায় 'বাল্মীকি প্রতিভা' বা মূক-বধির শিশুদের 'ডাকঘর'—এমন সব 'পাগলামো' আজও কেন আমাদের প্রাণকে স্পর্শ করে?


এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas:



©Parabaas 1997 - 2018. All rights reserved.