দুটো বা তিনটে জিনিস নয়, এ' এক সময়ের দলিল, বাসবী চক্রবর্তী; পরবাস-৭১"






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines








পরবাসে বাসবী চক্রবর্তীর লেখা



ISSN 1563-8685




দুটো বা তিনটে জিনিস নয়, এ' এক সময়ের দলিল


দুটো বা তিনটে জিনিস যা আমি তার বিষয়ে জানি জঁ-লুক গোদার; ভাষ্য ও ভাষান্তর: সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০১৮; ধানসিড়ি - কলকাতা; পৃষ্ঠাঃ ৭৮; ISBN: 978-93-86612-45-8

লচ্চিত্রের বোধ ও ভাবনা তাঁর অর্ন্তগত রক্তের ভেতরে যে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল, সেই অনুভবের হীরকদ্যুতির প্রতিফলন তাঁর বিভিন্ন মন্তব্যে। ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রের ভাষ্যকার টম মিলনে'কে এক আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন - "সিনেমার মধ্যে দিয়ে যা দেখি, তাছাড়া জীবনের কিছুই আমি জানি না।" আরও পরে, ১৯৮০'তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেছেন - "আমি হচ্ছি এমন মানুষ যার প্রকৃত দেশ হচ্ছে ভাষা আর যার বসবাস হচ্ছে চলচ্চিত্রে।" বিশিষ্ট চলচ্চিত্র-সমালোচক ক্রিস পেটিট (২০০৮) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন - "He has always been an assiduous curator, understanding the need - of making a spectacle of himself." বা স্মরণ করা যেতে পারে জিওফ্রে ন'ইয়েল স্মিথের বক্তব্য - বিগত ৫০ বছরের চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে 'তিনি' হলেন একজন যথার্থ গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈপ্লবিক মানসিকতার চলচ্চিত্র-নির্মাতা। যাকে নিয়ে এত কথার অবতারণা - কে তিনি? হ্যাঁ, তিনি হলেন ফরাসী-সুইস চিত্রপরিচালক, চিত্রসমালোচক ও চিত্রনাট্যকার জঁ-লুক গোদার - ১৯৬০'র ফরাসী নবতরঙ্গের চলচ্চিত্র আন্দোলনের একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। মূলস্রোতের ফরাসী চলচ্চিত্রের তথাকথিত 'tradition of quality'-র একজন কট্টর সমালোচক ছিলেন গোদার। তাই চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই তিনি খুঁজতে চেয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব পথ। যারা গোদারের ছবির দর্শক ও তাঁর গুণমুগ্ধ - তারা নিশ্চিতভাবেই জানেন যে তৎকালীন ফরাসী ও হলিউডের গতানুগতিক চলচ্চিত্রকে বারবার প্রতিস্পর্ধা জানিয়েছে গোদারের ছবি। গোদার তাঁর নিজের ও সমকালীন চলচ্চিত্রকারদের মৌলিক প্রয়াসকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন - "We barged into the cinema like cavemen into the Versailles of Louis XV." (১৯৬৪)। তাঁর এই উক্তি যথার্থ। বাণিজ্যিক কাহিনী-ভিত্তিক সিনেমার প্রচলিত কাঠামোকে অগ্রাহ্য করে গোদার রচনা করেছেন এক অন্যরকম চলচ্চিত্র-ভাষা। নিভে-আসা প্রদীপের সলতেকে পুনর্স্থাপন করার মতো গোদার সম্পর্কে এযাবৎ গড়ে তোলা ভাবনা-চিন্তা গতি পায় যখন হাতে পাই 'Deux ou trous choses que je sais d'elle' (Two or three things I know about her) বা 'দুটো বা তিনটে জিনিস যা আমি তার বিষয়ে জানি' - এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য - বাংলা ভাষায় যা অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। পূর্বে প্রকাশিত এই চিত্রনাট্য ধানসিড়ি প্রকাশনা থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে।


জঁ-লুক গোদার
গোদারের চলচ্চিত্র ভাষা ও নির্মাণের সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা নিশ্চিতভাবেই আলোচ্য চলচ্চিত্র একাধিকবার দেখেছেন, হয়তো তর্কেও মেতেছেন। তবে যারা এই ছবি দেখেন নি, তারাও এই ছবির বিষয়, নির্মাণ ও গোদারীয় বিখ্যাত 'জাম্প-কাট' এর পরোক্ষ দর্শক হয়ে উঠতে পারেন আলোচ্য চিত্রনাট্য পাঠে। পড়তে পড়তে অনেক সময়েই 'ছবি-লেখা'র কথা মনে পড়ে। ১৯৬৬ সালে লিখিত এই চিত্রনাট্য সেলুলয়েডে রূপান্তরিত হয় এক বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬৭-তে। শহরতলীতে পতিতাবৃত্তি নিয়ে ক্যাথারিন ভিমেনেট-এর একটি লেখা (Le Nouvel observateur-এ প্রকাশিত) থেকে গোদার এই ছবি নির্মাণের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তবে একটি নয়,একই সময়ে তিনি দু'দুটি ছবি তৈরি করেছিলেন - "Made in U.S.A." এবং "Two or three things"। শোনা যায়, তিনি একটি ছবির শ্যুটিং করতেন সকালে, তো অন্যটির বিকালে। একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন বিষয়ের ওপরে দুটি ছবি তৈরির বিষয়ে গোদারকে কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল (যেমন অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে)। উত্তরও দিয়েছেন স্বভাবসুলভ বৌদ্ধিক দীপ্তি নিয়ে - "কেন আমি একই সময়ে দুটি ছবি করতে রাজি হলাম? আমি মনে করি এ আমার অহংকার! আমার প্রতিস্পর্ধা! মনে হচ্ছে যেন আমি একজন সুরকার - যে একই সময়ে দুটি অর্কেষ্ট্রা নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু রচনা করছে স্বতন্ত্র সুর!" একই সময়ে নির্মিত হলেও দুটি ছবি ধারণ করে আছে স্বতন্ত্র বিষয় ও নির্মাণ।

আমাদের মনে পড়তে পারে, গোদার-নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রের কথা - "A bout de souffle" (Breathless, 1959)। এই ছবির প্রযোজক ছিলেন তাঁর একদা অন্তরঙ্গ বন্ধু ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো (যিনি গোদারকে বৈপ্লবিক আন্দোলনের 'Ursula Andrews' বলে সম্বোধন করতেন)। উল্লেখ্য যে 'Breathless'-এর শ্যুটিং হয়েছিল কোনও চিত্রনাট্য ছাড়াই। আসলে যখনই সম্ভব হয়েছে, গোদার চিত্রনাট্য রচনার বিষয়টি এড়িয়ে চলেছেন। গোদার বিশ্বাস করতেন - 'চলচ্চিত্র কোনও বিমূর্ত ধারণাকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করে না, বরং তুলে আনে একসঙ্গে অনেকগুলো মুহূর্তকে।' গোদারীয় চলচ্চিত্র-ভাবনার যে মৌলিকত্ব - তার বিচ্ছুরণ বাঙ্ময় হয়ে ওঠে 'দুটো বা তিনটে জিনিস যা আমি তার বিষয়ে জানি' এই ছবিতেও। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র জুলিয়েত জ্যাঁনসন পারি শহরের এক অভিজাত আবাসনের বাসিন্দা। স্বামী ও দু'সন্তান নিয়ে আপাত-সুখী এই নারীর জীবিকা হচ্ছে আংশিক-সময়ের গণিকা-বৃত্তি। জুলিয়েত তার দিন শুরু করে ক্রন্দনরত সন্তানকে (সোলাজঁ) জেরার নামে এক ভদ্রলোকের জিম্মায় রাখার মধ্যে দিয়ে। শ্রীযুক্ত জেরারের পেশা হচ্ছে জুলিয়েতের মতো যেসব মহিলা এই ধরনের পেশায় যুক্ত - তাদের সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা (এইভাবে এক লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলেছেন ভদ্রলোক)। জুলিয়েত আর দশটা মহিলাদের মতো গৃহকর্ম, শপিং, বাচ্চার দেখাশোনা ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকলেও - তার অতিরিক্ত দায়িত্ব হচ্ছে গণিকা হিসেবে তার নির্দিষ্ট খদ্দেরদের মনোরঞ্জন করা। নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যে সে বিউটি পার্লারে যায়। কফিশপেও সময় কাটায়। আমাদের সামনে এই ছবি জুলিয়েতের দিনযাপনের একটি ২৪ ঘন্টার দলিল হাজির করে। কোনও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা কাহিনীকে ঘিরে আবর্তিত হয়নি এই ছবি। তাহলে কোথায় এই চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব? অনন্যতা? প্রকৃত প্রস্তাবে, গোদার অন্যান্য ছবির মতো এই চলচ্চিত্রেও ধরতে চেয়েছেন সমাজ, সময়, রাজনীতি ও দর্শনকে (তিনি নিজেও ছিলেন মার্ক্সীয় ও অস্তিবাদী দর্শনের একজন মনোযোগী পাঠক)। ফলে তাঁর ছবিতে যেমন প্রতিবিম্বিত হয়েছে নগ্ন বাস্তবতা এবং তার পাশাপাশি আধুনিক মানুষের সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন। সমালোচকেরা তাঁর ছবিকে বলেছেন, "No doubt, realist film, but a kind of documentary." বাস্তবতার রূঢ় প্রকাশ তাঁর ছবিকে 'ডকুমেন্টারি' করে তুলেছে কিনা, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকতে পারে! তবে আলোচ্য ছবির নিরিখে বলা যায়, দ্য গলের পরিকাঠামোগত উন্নয়নমূলক নীতির সূত্রে পারি-র দ্রুত রূপান্তর ঘটছিল - বিশাল বিশাল আবাসন প্রকল্প শহরের আকাশরেখা ঢেকে দিচ্ছিল, এই প্রেক্ষিতেই শুরু হয় ছবি। আর শুরু থেকেই গোদার স্বয়ং কথকের ভূমিকায় - এক তৈরি-করা চাপা কন্ঠস্বরে ধারাভাষ্য দিয়ে যান সারা ছবি জুড়ে - যেমন - "প্রকৃত প্রস্তাবে প্রায় ৮০ লক্ষ অধিবাসীর আশা-আকাঙ্খার খোঁজ না রেখেই একচেটিয়া পুঁজি সক্ষম হবে অর্থনীতি সংগঠন ও পরিচালনা করতে।" কিংবা, "আমি শহর আর তার বাসিন্দাদের পরীক্ষা করি, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে অনুপুঙ্খে দেখি, যেমনভাবে কোনো জীববিজ্ঞানী ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর আর্ন্তসম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেন বিবর্তনের স্তরে স্তরে।" পারি শহরের দ্রুত পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পরিচিত হই নানা চরিত্রের সঙ্গে-- জুলিয়েত ও রবের জ্যাঁনসন এবং তাদের দুই সন্তান, রজার, মারিয়ান, ক্রিস্তফ, জন বোগাস। চমৎকার একটি চিত্রনাট্যের মোড়কে বিভিন্ন চরিত্ররা স্থিত হলেও পাঠকের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে - এখানে চরিত্রগুলি নির্দিষ্ট কাঠামো ছেড়ে ক্যামেরা লক্ষ করে জীবন সম্পর্কে, নিজেদের সম্পর্কে অক্লেশে কথা বলতে থাকেন। বিভিন্ন চরিত্রের স্বগতোক্তি বা সংলাপ শুনে মনে হতে পারে সেগুলো যেন অর্থহীন বা সংযোগবিহীন। আসলে সেগুলো অর্থহীন নয়, বরং অর্থবহ এই কারণে যে চলচ্চিত্রে তা প্রযুক্ত হয়েছে আমাদের মনে করিয়ে দিতে - আমরা শব্দের এমন এক আবহে থাকি, যেখানে শব্দ বা তার অর্থের প্রতি আমাদের তেমন মনোযোগ নেই।

পূর্বেই উল্লেখিত, আলোচ্য চিত্রনাট্য লেখা হয়েছিল ফ্রান্সের এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের প্রেক্ষিতে - যখন নগরায়নের উদ্যত থাবা গ্রাস করছে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলগুলোকে - গড়ে উঠছে সুপার মার্কেট, সালোঁ, আকর্ষণীয় বস্তুসম্ভারে সেজে উঠেছে বিপণিগুলি - বিজ্ঞাপন-শোভিত ঝাঁ-চকচকে হোর্ডিং ঢেকে ফেলছে শহরের মুখ। ফলে এই ক্রমবর্ধমান 'urban sprawl'-এর প্রভাব শহরবাসীর জীবনে যে প্রভাব ফেলবে - তার সম্পর্কে অনেক আগেই নগর সমাজতাত্ত্বিকেরা ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। আর, সে প্রভাব যে মানুষ-মানুষীর সম্পর্ক, জীবন-যাপন, মূল্যবোধ ও ভাবনা-চিন্তায় ছায়া বিস্তার করবে - তা তো অনুমান করাই যায়। ফলে আমরা এই ছবিতে দেখি - জুলিয়েত জ্যাঁনসন - পারি'র এক অভিজাত বহুতলের বাসিন্দা হয়েও আরও সচ্ছল জীবন-যাপনের লোভে বেছে নিয়েছে আংশিক-সময়ের গণিকাবৃত্তি। মনে পড়ে যায়, ১৯৯০-এর দশকে নির্মিত এক হিন্দী ছবির কথা - 'আস্থা' (পরিচালক : বাসু ভট্টাচার্য), ছবির নায়িকার স্বামীর পেশা অধ্যাপনা। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখী গৃহবধূ ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়ে দেহ-ব্যবসায়। প্রাথমিকভাবে তীব্র অন্তর্দহনে যন্ত্রণা পেলেও, পরে এই নারী অতি-সচ্ছল জীবন যাপনের লোভে এই পেশা ছেড়ে বেরোতে পারে না - কারণ তখন তাকে হাতছানি দিচ্ছে শহরের ঝাঁ-চকচকে বিপণিগুলি এবং তাঁর আকাঙ্খিত মূল্যবান ভোগ্যদ্রব্য। সময়টা ছিল বিশ্বায়নের সূচনাকাল অর্থাৎ 'কনজিউমার সোসাইটি' বা 'ভোক্তা সমাজ' অস্তিত্বময় হয়ে উঠছে আমাদের যাপনে। ১৯৬৫ সালের ফ্রান্স আর ১৯৯০ সালের ভারতীয় সমাজ আমাদের উপহার দেয় প্রায় একই ধরনের চিত্র! গোদারের ভাষায় তা 'আজকের পারি শহরে বাস করতে হলে - একজন নারীকে তার সামাজিক মর্যাদা যাই হোক না কেন - যে কোনও ভাবেই নিজেকে গণিকাবৃত্তিতে নিয়োজিত করতে হয়।' --কেন? বেঁচে থাকার জন্যে! গোদার শ্লেষ নিয়ে বলেছেন, তা হল 'স্বাভাবিক জীবন' কিংবা 'মনের গণিকাবৃত্তি'। আলোচ্য চিত্রনাট্যেও স্থান পেয়েছে এমনই এক 'স্বাভাবিক জীবনের' ধারাভাষ্য (যেখানে কথক অদৃশ্য) ... "বাচ্চাদের নিয়ে তারা আধুনিক একটা ফ্ল্যাটে উঠে গেল। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, বাড়িভাড়া অত্যন্ত চড়া। দু'বছর কাটল, তৃতীয় বাচ্চা। সংসার-খরচা কুলোয় না। এবার স্বামী নিজেই বউকে শরীর বেচতে পাঠাল রাস্তায়।" তবে শুধু সিনেমা নয়, বাস্তব-সমাজেও এমন দৃষ্টান্ত মেলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে - যখন দেশজুড়ে বইছে গ্লাসনস্ত-এর হাওয়া, সেই সময়ে শোনা যায় যে কলেজ-অধ্যাপিকা সাংসারিক প্রয়োজনের তাড়নায় বেছে নিয়েছেন আংশিক-সময়ের গণিকা-বৃত্তি। চরম মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত সংসারে যে আর্থিক সংকট তৈরি করেছিল, তার জন্যেই হয়তো তাকে এমন ধরনের পেশা নির্বাচন করতে হয়েছে। কোথাও ভোক্তা সমাজের চরম চাহিদায়, আবার কোথাও অর্থনৈতিক অনটনের কারণে 'নারী'ই হয়ে উঠেছে 'vulnerable'! উল্লেখ্য যে ১৯৬৭-এ গোদার যখন এ ছবি বানান, তখন পশ্চিমী দেশে দ্বিতীয় তরঙ্গের নারী আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছিল। র‍্যাডিকাল গোষ্ঠী বেশ জনপ্রিয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের গতানুগতিক ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে এই গোষ্ঠীগুলি নারীদের নতুন দিশা দেখাচ্ছিল। নিজের শরীর ও যৌনতার ওপর নারীর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবারের ক্ষেত্রে পুরুষের মতোই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা - এই বিষয়গুলির ওপরে গুরুত্ব দিচ্ছিল নারী আন্দোলনের দ্বিতীয় তরঙ্গ-উদ্ভুত ভাবনা-চিন্তা। এ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র জুলিয়েত জ্যাঁনসনকে যেন সেই স্বাধীন নারীদেরই প্রতিনিধি ভাবা যেতে পারে!

আলোচ্য ছবি ও চিত্রনাট্যের দর্শক ও পাঠক উভয়েই প্রায়শই পরিচিত হন বিবিধ ধরনের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ... রঙীন, ঝলমলে সুদৃশ্য বিজ্ঞাপন - যা বেশিরভাগই মার্কিনী বা আমেরিকা-অনুপ্রাণিত। গোদার মনে করতেন যে আধুনিক পৃথিবীতে বিজ্ঞাপনের আধিপত্যকে মানতেই হবে, কারণ বিজ্ঞাপন-শাসিত এই পৃথিবীতে সব কিছুই নির্ধারিত হয় এর দ্বারা। আসলে যে ভোক্তা সমাজকে গোদার হাজির করেছেন এই ছবিতে - তারই সাক্ষ্য বহন করে আধুনিক বিপণিতে সজ্জিত অজস্র ভোগ্যপণ্যের ইতস্তত ছড়ানো বিজ্ঞাপন। কিংবা বলা যায়, প্রকৃত প্রস্তাবে, এগুলি হচ্ছে বদ্রিয়ার (Jean Bandrillard) কথিত 'চিহ্ন' (Signs)। এই চিহ্নায়নই রচনা করে 'Simulation'. ফলে ভোক্তা সমাজে আমাদের প্রলোভন চালিত করে এইসব চিহ্নগুলিকেই আর্থিক বিনিময়ে ক্রয় করতে। বাস্তবতা-তাড়িত আমাদের এই প্রলোভন আমাদের পৌঁছে দেয় এক 'অতি-বাস্তবতা'র (hyper-reality) জগতে। এ এক অদ্ভুত মনোভঙ্গি বা মানসিক প্রবণতা - যা জারিত হয় পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর নির্ভরতায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে - 'দুটো বা তিনটে জিনিস যা আমি তার বিষয়ে জানি' - এই শিরোনামে 'তার' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? চিত্রনাট্যের শুরুতেই অদৃশ্য কথকের চলমান ধারাভাষ্যে আমরা পরিচিত হই দু'জন নারীর সঙ্গে - একজন, এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র - জুলিয়েত জ্যাঁনসন এবং অন্যজন, মারিনা ভ্লাদি - অভিনেত্রী; যিনি জুলিয়েতের চরিত্র রূপায়িত করেছেন। এই দু'জন 'তার' ছাড়া তৃতীয় 'তার' হল 'পারি শহর' - যা ১৯৬০-এর মধ্যবর্তী পর্যায়ে দ্য গলের নীতি-অনুসারে আধুনিকায়নের পথে পা রেখেছে। শহরের উপকণ্ঠে তৈরি হচ্ছে বিশাল আবাসন অঞ্চল আর তার নির্মাণ কাজের দরুণ নানা কর্কশ আওয়াজে ভরে আছে চতুর্দিক। উল্লেখ্য যে, চলচ্চিত্র-সমালোচক লিসা থ্যাচারের (২০১৩) মতে, ১৯৬৭ সালে নির্মিত এ ছবির প্রেক্ষাপট ফরাসী সরকারের নতুন শিল্পায়ন প্রকল্প হলেও - প্রকৃত প্রস্তাবে, এ ছবি একটি রাজনৈতিক ছবি - যেখানে পুনরাবৃত্ত হয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা - যা রিচার্ড নিক্সনের ভিয়েতনাম-নীতিরই ফলশ্রুতি। অন্যদিকে, সমালোচক পল ব্রেনার (২০১১) মন্তব্য করেছেন - "আমরা কোনও না কোনও ভাবে এই বিপুল ভোগ্যবস্তুর সমাবেশে গোদার-কথিত 'তার' অর্থাৎ পারি শহরের অংশ হয়ে উঠেছি।" ব্রেনার এই চলচ্চিত্রকে সরাসরি রাজনৈতিক ছবি না বললেও, তার আলোচনায় দেখিয়েছেন ভিয়েতনামের প্রতি আমেরিকার সহিংসনীতি কিভাবে আমেরিকার বিষয়ে গোদারের মনে ঘৃণা ও বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। হয়তো তারই প্রকাশ 'কথক' হিসেবে সারা ছবি জুড়ে স্বয়ং গোদারের চাপা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর! এছাড়াও চিত্রনাট্যে উপস্থাপন করা হয়েছে - জুলিয়েতের স্বামী রবার্ট জ্যাঁনসন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্যে শর্ট ওয়েভ রেডিও'র প্রচার শোনার এবং জুলিয়েতের ছেলে ক্রিস্তফের উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের সংযুক্তিকরণের বিষয় ঘিরে স্বপ্ন দেখা! এ ছবির দর্শকেরা - এর অর্ন্তনিহিত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনার আবর্ত পেরিয়ে নিশ্চিতভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছেন গোদারীয় আশ্চর্য নির্মাণশৈলীতে। চলচ্চিত্রের মধ্যে মন্তাজের যে ভূমিকা থাকে - তার দিকে গোদার বারবার আমাদের দৃষ্টি ও শ্রবণ আকর্ষণ করেছেন (চিত্রনাট্যের প্রসঙ্গ মনে রেখে)। ধারাভাষ্যকার রূপে তাঁর ঐ চাপা, ফিসফিসে কণ্ঠস্বর ও বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে দর্শক ও পাঠকের সঙ্গে তাঁর এক নৈকট্য গড়ে তোলে, যাকে লিসা থ্যাচার বলেছেন - 'connection with silence and then the subsequent whisper are things of terrible beauty'. কতো আগেই তো গোদার 'Alphaville' (১৯৬৫)-এ তাঁর নিজের সম্পর্কে আগাম ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছেন - "You will suffer something worse then death. You wil become a legend." আজ - ৮৮ বছর বয়সী এই জীবন্ত কিংবদন্তীকে স্মরণ করার সুযোগ পাওয়া গেল সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় অনূদিত চিত্রনাট্যটির আলোচনা সূত্রে।

এবার আসা যাক, অনূদিত বইটির প্রসঙ্গে। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের পাঠকেরা তাঁর ভাষার সৌন্দর্য সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তবে যেহেতু এটি অনুবাদ, তাই তাঁর নিজস্ব ভাষা-ব্যবহারের স্বাধীনতা তেমন নেই। অনুবাদ বিষয়ে বলা হয় যে তা একই সঙ্গে সুন্দর ও বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে না। অনূদিত চিত্রনাট্য পাঠে, বলতে দ্বিধা নেই যে, ভাষার সৌন্দর্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। পুত্র ক্রিস্তফের কৌতূহল ও প্রশ্নের জবাবে যখন জুলিয়েত বলে ওঠে: 'যখন আমি স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম তখন আমার মনে হত যেন আমাকে বিরাট গহ্বরে শুষে নেওয়া হচ্ছে, অথবা যেন একটা বিরাট গর্ত আমাকে গিলে ফেলছে ... এখন আমি যখন স্বপ্নে থাকি আমার মনে হয়, আমি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছি লক্ষ লক্ষ টুকরোয় ... কিংবা ... "ভাষা হল সেই বাড়ি যেখানে মানুষ থাকে।" এইরকম স্বাদু ও স্বচ্ছন্দ অনুবাদ পাঠক-প্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ, বলাই বাহুল্য। চমৎকার অনুবাদ-গ্রন্থের মুখবন্ধটিও - "অনন্ত সন্দর্ভবীথি"। এই চলচ্চিত্র কেন আজকের সমাজেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, তার যুক্তিকে মননশীলভাবে উপস্থাপন করেছেন শ্রীমুখোপাধ্যায়। তাঁর ভাষায় - "গোদার যেন ক্রোধে আকুল হয়ে নথি পেশ করতে চান এবং দেখাতে পারেন যে সৃজনশীলতার বদলে উৎপাদনশীলতা কী করে এক মুখোশ-সভ্যতার পাসওয়ার্ড হয়ে ওঠে এবং জীবন কিভাবে কমিক-ষ্ট্রিপের মায়াহরিণীদের উলঙ্গ কঙ্কাল হিসেবে পরিবেশন করে! ... এই ছবিটি পুরোপুরি মৃত সমাজের জ্যান্ত দলিল।"

আগেই বলা হয়েছে - অনূদিত চিত্রনাট্যটি ১৯৭০-এর দশকে প্রকাশিত। ২০১৮-তে তা প্রকাশ পেল বই আকারে। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব - তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় জঁ-লুক গোদারের চিত্রনাট্য অনুবাদ করেন। তাঁর কৃতিত্বের ভাঁড়ারে লুকোনো আরও কতগুলি মূল্যবান অনুবাদ - গোদারের 'ম্যাস্কুলাঁ ফেমিনাঁ', 'পিয়েরো ল্যো ফু', বার্গম্যানের 'সাইলেন্স', ককতোর 'অরফি' ও ক্রুফো'র 'ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ'। উল্লেখ্য যে, ভবিষ্যতে তিনি যে চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ বা চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক হয়ে উঠবেন তার ইঙ্গিত নিশ্চিতভাবেই নিহিত ছিল প্রায় চারদশক আগে অনূদিত এইসব কাজের পরিসরে। ভাবতে অবাক লাগে - অধুনা-প্রবীণ এই মানুষটি তরুণ বয়সেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন গোদার-সহ বরেণ্য চলচ্চিত্রকারদের চিত্রনাট্য অনুবাদ-কর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ। তার এই প্রচেষ্টাই আমাকে/আমাদের মনের নাগালে পৌঁছে দিল আলোচ্য চিত্রনাট্য-পাঠের সুযোগ। দর্শক হয়ে চলচ্চিত্রের রসাস্বাদন করার অভিজ্ঞতা আরও বেশি প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে মাতৃভাষায় তার চিত্রনাট্য-পাঠে।

তবে এই অনুবাদ-কাজের ক্ষেত্রে কয়েকটি অভিযোগ আছে। ফরাসী না ইংরাজি - কোন ভাষা থেকে চিত্রনাট্যটি অনূদিত - তার কোনও উল্লেখ নেই বইতে। কয়েকটি ক্ষেত্রে ভাষা-ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল অনুবাদকের - যেমন, হালকা ধরনের গণিকা (মানে?), পুরুষ্টু রমণী (অর্থ), বক্ষবন্ধনী (অধুনা অর্ন্তবাস ব্যবহৃত হয়)। তবে এ'সব ভুল-ত্রুটি ধোঁয়ার মতো উড়ে যায়, সামগ্রিক চিত্রনাট্যটি পাঠ করলে। ধানসিড়ি প্রকাশনকে ধন্যবাদ এই অনুবাদ-গ্রন্থ পাঠক-সমীপে হাজির করার জন্যে। নয়নশোভন প্রচ্ছদ (অভিনেত্রী মারিনা ভ্লাদি-র সেই বিখ্যাত ভঙ্গি)-সহ বইটির সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রশংসনীয়। তবে ধানসিড়ি প্রকাশন অধুনা যে সব উৎকৃষ্ট মানের কাজের নিদর্শন রাখছে, সেখানে আলোচ্য বইতে এত মুদ্রণ প্রমাদ কখনোই কাঙ্খিত নয়।

ভবিষ্যতে এই ধরনের অনুবাদ-কাজ বই-আকারে আরও প্রকাশিত হোক - এই প্রত্যাশা রইল।



(পরবাস-৭১, ৩০ জুন ২০১৮)