Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines




পরবাসে
শবনম দত্ত-এর

লেখা


ISSN 1563-8685




ছবিপ্রেম

ছোটবেলায় সব বাঙালি শিশুরই বোধহয় আঁকার ক্লাস বলে একটা কেস থাকে। আমারও ছিল। একজন আর্ট কলেজের সিনিয়র স্টুডেন্ট সপ্তাহে একবার করে আঁকা শেখাতে আসতেন, ছবি-দিদিমনি (সত্যিই ওনার নাম ছিল ছবি)। তা আমাকে ছবি আঁকা শেখাতে গিয়ে ছবি দিদিমনির প্রায় ছবি হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছিল। শেষটায় মা একদিন বলল, “ভাই ছবি, ওর দ্বারা ছবি জিনিষটা হবে বলে মনে হচ্ছে না। তোমায় আর কষ্ট করতে হবে না ভাই।” আমি, না ছবি দিদিমনি, কে বেশি স্বস্তি পেয়েছিল সে বলা কঠিন।

স্কুলের ক্লাস টপকাতে টপকাতে যামিনী রায়, রবি বর্মা নামগুলো কানে এসেছিল। তাঁদের আঁকা কয়েকটা ছবিও দেখেছিলাম। ভালো কি মন্দ, কিচ্ছু মনে হয়নি। এরপর ম্যাগাজিনের পাতায় দেখলাম পাবলো পিকাসো বলে কারোর আঁকা কিছু ছবি। কিছু মার্কিংবিহীন লুডোর ছক্কা এবং তার মাঝে মাঝে আরও কিছু জিওমেট্রিক শেপ। এগুলো আদৌ ছবি কিনা, ছবি হলেও কিসের ছবি, পাশের বাড়ির আট বছরের বাবুর ছবির থেকে এগুলো কিসে আলাদা এসব কূট প্রশ্ন নিয়ে মিনিট পাঁচেক ভাববার পরে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছিলাম ছবি জিনিষটা থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

তা বছর তিনেক আগে প্যারিস গিয়েছিলাম, বুঝলেন। ইউরোস্টার থেকে নেমেই স্টশনের ভীড়ভাট্টা, চ্যাঁচামেচি শুনে, একটা বেশ অ্যাট হোম ফিলিং হোল। তৃতীয় দিনে লুভ্যর (লুভ) যাবার প্ল্যান, উদ্দেশ্য গ্লাস পিরামিডের সামনে যথোপযুক্ত পোজ মেরে ছবি তোলা আর বিশ্ববিখ্যাত করিডরগুলোতে একটু হেঁটে আসা। তা টিকিট কেটে নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম তখন প্রায় এগারোটা। প্রথম দিকের ঘরগুলোতে কেমন জানি পুরোনো পুরোনো সোনালি রংয়ের ছবি। নাথিং ইন্টারেস্টিং। প্রথম যে বড় ঘরটায় ঢুকলাম, সেখানে ডান দিকের দেওয়ালে একটা ম্যাডোনা অ্যান্ড চাইল্ডের ছবি। আর সেখানেই দাঁড়াতে হল। না ম্যাডোনার গেজ কি মায়া হইচই চাউনি নয়। আমার নজর কেড়েছিল ম্যাডোনার মাথার ভেলটা। ঠিক যেন সত্যিকারের। হাওয়া দিলেই উড়ে যাবে। খুঁজে দেখলাম আর্টিস্টের নাম বোত্তিচিল্লি। বাধ্য হয়ে এদিক ওদিক চোখ চালালাম, যদি ওনার আরো পেন্টিং থাকে! তা পেয়েও গেলাম। আরেকটা ম্যাডোনা অ্যান্ড চাইল্ড। তাদের সাথে আবার কজন ফেয়ারিও আছে। ম্যাডোনার স্কিনের টেক্সচার আর ক্রাইস্ট শিশুর স্কিনের টেক্সচারই বলে দেয় কে মা আর কে সন্তান। আবার ফেয়ারিদের স্কিন কেমন যেন আবছায়া। দেখলেই বোঝা যায় এনারা ধুলোর পৃথিবীর বাসিন্দা নন। এরপরে নজর গেল ম্যাডোনার জামার দিকে। জামার ভাঁজ দেখে মনে মনে যখন ভাবছি এগুলো কি সিল্কের কাপড়ের টুকরো কোনভাবে আঠা দিয়ে আটকানো, বাঁ হাতে টান পড়ল। সাথে ফিসফিস, “মাম্মা কি করছ? জলদি চল। মোনালিসা দেখতে হবে তো? আমার টিচার বলেছেন...।” অগত্যা মিউজিয়ামের ম্যাপ খুলে মোনালিসার কাছে পৌঁছানোর শর্টের্স্ট রুট বার করতে হল।

মোনালিসার দিকে যেতে যেতে দুদিকের দেওয়ালে কত যে মণিমানিক্য। কিন্তু পোলাপান এক হাতে বাবাকে আরেক হাতে আমায় টানছে। গোল বাঁধল একটা পোর্ট্রেটের সামনে এসে। প্রৌঢ়ত্বের প্রায় শেষ সীমানায় পৌঁছে যাওয়া একজন মানুষের মুখ। তেমন কোন বিশিষ্টতা নেই মুখটায়। কিন্তু চোখদুটো আমার দাঁড় করিয়ে দিল। এ চোখ সদ্য যুবকের স্বপ্নদেখা চোখ নয়। এ চোখ দারা, পুত্র, কন্যা পরিবেষ্টিত দায়িত্বশীল পিতার মায়াঘেরা চোখও নয়। এ চোখ সত্যদ্রষ্টার চোখ। এই দৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে মনটা আপনা থেকে নত হয়ে আসে। পাশের দেওয়ালে নেমপ্লেটে দেখি তিনতোরেত্তা লেখা। স-অ-অ-ব মনে পড়ে গেল। সেই যে? টিনটোরেটোর যীশু? সেইখানেই তো প্রথম এনার কথা জেনেছিলাম। ইনি তো লেট রেনেসাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে একজন। ফেলুদা তো এনার আঁকা ছবি উদ্ধার করতেই হংকং গেছিল! কেমন একটু শিউরে উঠলাম।

পরক্ষণেই ঘরের মধ্যে প্রবল ঠেলাঠেলি শুরু হল। টের পেলাম কোন এক গাইডেড ট্যুর পার্টি এ-ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আর তারই ফলে দরিয়ায় ঢেউ উঠেছে। আর একটা জিনিষ মালুম দিল। এইখানেই সেই চিররহস্যময়ীর বাস আর তাই এই ঘরে এমন নবমীর সন্ধ্যার ভীড়। কোনক্রমে ভীড়ের সাথে পা মিলিয়ে এগিয়ে দেখি বুলেটপ্রুফ কাচের ওদিকে উনি থাকেন। পুরো এই পারে আমি আর ওই পারে তুমি কেস। তারই মধ্যে প্রতি ন্যানো সেকেন্ড ফ্ল্যাশের ঝলকানি, সেলফি স্টিকের গুঁতোগুঁতি। মোনালিসার সাথে ছবি তোলার জন্য মানুষ যেন পাগল হয়ে উঠেছে। তা আমরাও তাঁকে দেখলাম। কারোর বগলের তলা দিয়ে (মশাই এই ছ-ফুটিয়াদের দেশে বগলের তলা দিয়ে দেখার মধ্যে কোনোই অসম্মান নেই), কারোর ব্যাগের পাশ দিয়ে। যেন টুকিটুকি খেলা। আমার সাধ না মিটিলো, আশা না পুরিলো, কেবলই গুঁতো যে খাই মা দশা। হতাশ হয়ে ভীড় থেকে বেরিয়ে আশেপাশে কি আছে খুঁজতে গেলাম।

একটু এগোতেই চোখে কেমন ধাঁধাঁ লেগে গেল; লাল, নীল, সবুজ সব রংগুলো আছড়ে পড়ল আমার উপরে। ডানদিকের দেওয়ালে একটা ছবি, সেখানে কোন এক সুনিপুণ শিল্পী এই মৌলিক রংগুলোকে অবহেলায় পোষ মানিয়ে পাশাপাশি বাস করতে দিয়েছেন। আর রংগুলো তাদের নিজস্বতা ধরে রেখেও একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। আর কিছু বোঝার আগেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “টিটিয়ান”। জানি না, আগে কোথাও ওনার নাম শুনেছিলাম কিনা, বা ওনার কথা পড়েছিলাম কিনা, নাকি এ আমার পূর্বজন্মের স্মৃতি। কাছে গিয়ে দেখি সত্যিই শিল্পীর নাম টিটিয়ান। আমি কথা হারিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম বেশ কয়েক মুহূর্ত। তারপর জেগে উঠে দেখি ছবিটা হল 'সাপার অ্যাট এম্মাউস'।

ততক্ষণে আমি বেশ বুঝে গেছি যে দিনটা আমার জীবনে কাটানো হাজার হাজার দিনের চেয়ে একদম আলাদা একটা দিন হতে যাচ্ছে। চেতনার উপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে। একটু পরে আরো একটা ম্যাডোনা অ্যান্ড চাইল্ডের পেন্টিং দেখতে পেলাম। কিন্তু এই ছবিটা বেশ একটু আলাদা। ক্রাইস্ট শিশু একটা ছোট্ট ল্যাম্বকে ধরে রেখেছে, আর ভার্জিন মেরী, ক্রাইস্ট শিশুকে দু হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। এ তো প্রত্যেক মা আর সন্তানের গল্প। প্রত্যেক সন্তানই একটা সময় মায়ের আঁচল ছাড়িয়ে এই বিশাল দুনিয়াটায় বেরিয়ে পড়তে চায় আর প্রত্যেক মায়েরই মনে হয় বাছা আমার এখনো বড্ডই ছোট, আরো কটা দিন যাক না। জানি এ ছবি ঈশ্বরপুত্র আর তাঁর মায়ের ছবি, কিন্তু আমি মেরীর আকুতিভরা চোখে আর সন্তানকে আগলে রাখতে বাড়ানো হাতেই এ ছবির ঐশ্বরিকতা খুঁজে পেয়েছিলাম। এই ছবির আরো একটা জিনিষ মুগ্ধ করেছিল আমায়। ডিটেলিং। গাছের প্রতিটা পাতা থেকে শুরু করে দূর পাহাড়ের প্রতিটা খাঁজে খোঁচড় কি অদ্ভুত নিখুঁত। এই ছবিটা ছিল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড উইথ সেন্ট অ্যান। এ ছবি নিয়ে এমন করে কথা বলা হয়ত ধৃষ্টতা, কিন্তু আমার যে না বলে উপায় নেই? এ যে আমার জেগে ওঠার গল্পও বটে।

আরো অনেকগুলো ছবি পেরিয়ে একটা যুদ্ধের সামনে পৌঁছানো গেল, সেন্ট মাইকেল স্লেয়িং দ্য ডেভিল। ছবিটায় অ্যাঞ্জেলের হাতে উদ্যত জ্যাভেলিন, মুখের রেখায় মনোসংযোগ, স্কার্ফও উড়ছে। প্রকৃতিও যেন অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য। আকাশে ঘনিয়ে এসেছে ধূসর মেঘ। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হচ্ছে অ্যাঞ্জেল জ্যাভেলিন বুঝি এক্ষুনি বসিয়ে দেবে ডেভিলের বুকে। সমস্ত ছবিটা থেকে যুদ্ধের উত্তেজনা ঠিকরে বেরোচ্ছে। শিল্পীর নাম দেখলাম রাফায়েল। তখন তো জানতাম না বাকি জীবনটা পাঁচশ বছর আগে মরে যাওয়া এই লোকটার প্রেমে হাবুডুবু খেতে হবে!

সেদিন বাকি দিনটা ধরে আরো অনেক ছবি দেখেছিলাম। রেনেসাঁ, বারোক, ইম্প্রেশনিস্ট পিরিয়ডের। তখন অবশ্য এগুলোর নামও জানতাম না, এদের বৈশিষ্ট্য জানা তো দূর কি বাত! বিকেল পাঁচটা নাগাদ পোলাপান বিদ্রোহ করে উঠল। আর সে হাঁটবে না, কিছুতেই না। কাজেই সব ব্যাগট্যাগ আমাকে দিয়ে তার পিতৃদেব তাকে কোলে নিতে বাধ্য হলেন। তারপর এক্সিট খুঁজে সোজা গ্লাস পিরামিডের পাশের খোলা চত্বরে এসে পড়া গেল। সেখানে দেখি পুরো মেলা বসে গেছে। অস্তসূর্যের আলোয় কেরোসিন মেসো মাসি আর স্প্যানিশ কলেজ স্টুডেন্টদের মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে বসে প্রথমবার মনে হল, ছবি নিয়ে একটু গুগল করতে হবে।





(পরবাস-৬৮, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭)



(প্রবন্ধে ব্যবহৃত ছবিগুলি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া)