Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines




পরবাসে সাবর্ণি চক্রবর্তী-র
লেখা

বই


ISSN 1563-8685




আবীরা

|| ১ ||

রের উত্তর-পূব কোণের অশথ গাছটায় কাকের বাসা। সেখানে কাক ডেকেছে একটু আগে। মায়া তা শুনেছে। কিন্তু আলসেমি করে ওঠেনি। যা শীত। গায়ের কাঁথাটা ভাল করে জড়িয়ে ভোররাতে শুয়ে থাকার আরামটা নিচ্ছিল মায়া। কিন্তু শুয়ে থাকলে চলবে না। উঠতে হবে। ঘরে চাল বাড়ন্ত। কিন্তু রোজগার না করতে পারলে হাঁড়ি চড়বে না।

মায়া উঠে পড়ল। বিছানা বলতে মেঝের ওপর ছেঁড়া মাদুর তার ওপর নোংরা, পাতলা একটা তোষক। জায়গায় জায়গায় কাপড় ছিঁড়ে তুলো বেরিয়ে গেছে। সময় করে একটু রিপু করে রাখার দরকার। তোষক মাদুর গুটিয়ে তুলে ঘরের এক কোণে রাখল মায়া। পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছে উত্তরা— ছোট তুলোর কম্বলটা দিয়ে নাক কান মুড়ি দিয়েছে। মায়া ওর গায়ে হাত দিয়ে দেখল। জ্বরটা এখনও যায় নি। থাক্‌— একটু ঘুমোক মেয়েটা। কাল ইস্কুল কামাই গেছে — আজও গিয়ে দরকার নেই। দু দিন কামাইতে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। মেয়েটার লেখাপড়ায় মাথা আছে— এ পর্যন্ত কখন কোন কেলাসে ফেল করে নি। বলে ইস্কুল পাশ করে আরও পড়বে— ডাক্তার হবে। সত্যিই কি হবে? মায়ার মেয়ে উত্তরা। ডাক্তার। গলায় ঝোলানো নল। হাসপাতালে ওর সামনে লম্বা লাইন— বাচ্চা কোলে মেয়েমানুষ, লুঙ্গি পরা পুরুষমানুষ। উত্তরা তাদের বুকে, পেটে, পিঠে নল ঠেকিয়ে দেখছে— তারপর কাগজে লিখছে ওষুধ। সেরকম কি হতে পারে? কি জানি।

পুকুর পাড়টা অন্ধকার— ভোরের আলো তো এখনও ভাল করে ফোটে নি। একটা ঝোপের ধারে মায়া সকালের বেগ সারে। একটু ভয় ভয় করছিল। আজকাল একটা উপদ্রব শুরু হয়েছে। কাঁচা বয়েসের বৌ-ঝিরা ঝোপের ধারে বসলে পুরুষ মানুষ হামলা করছে তাদের ওপর। অবশ্যি মায়ার অত কম বয়েস নয়। তবু— বলা তো যায় না। এই তো সেদিন— হারান দলুইয়ের বৌটা ঝোপের ধারে বসেছিল। পেছন থেকে দুটো লোক এসে মেয়েটার চোখ মুখ বেঁধে ফেলে ওকে বেইজ্জত করেছে। সকলের সন্দেহ ঐ সুরেনটার ওপর— নগেন লেট-এর বখা ছেলে। কিন্তু কারোর কিছু বলার তো সাহস নেই। নগেন পয়সাওয়ালা লোক— দোতলা পাকা বাড়ি, বাস আছে, লরী আছে। তার ওপর এখানকার পঞ্চায়েতের মাথা। হারান কি মারটাই না মারলে বৌটাকে। মেয়েটা পোকা মারার বিষ খেয়ে নিয়েছিল। তারপর এই যায় সেই যায় অবস্থা। ভাগ্যিস বমি হয়ে অনেকটা বিষ বেরিয়ে গিয়েছিল। তাতেও ডাক্তার, বদ্যি, হাসপাতালে ছোটাছুটি। হাসপাতাল বলতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শেষ পর্যন্ত সেখানেই ওর মুখে নল ঢুকিয়ে পেটের ভেতর ধুয়ে দিল— তবে ও বাঁচল। থানা থেকে পুলিসও এসেছিল। দারোগা বলে গিয়েছিল বৌ মরলে হারানের কোমরে দড়ি বেঁধে চালান দেবে। মেয়েটা ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শোয়া। এখন হারান ওকে রান্না করে খাওয়াচ্ছে।

ঘরের বাইরে একপাশে কয়েকটা বালতিতে জল রয়েছে। টিউকলের জল। নগেন লেট চেষ্টাচরিত্র করে গাঁয়ে একটা বসিয়েছে। কিন্তু ওর নিজের বাড়ির একেবারে সামনে। মা মেয়ে গিয়ে জল ভরে টেনে টেনে নিয়ে আসে। ওই জল রান্না, খাওয়া, বাসন ধোয়া। চানটা অবশ্য ওরা পুকুরেই সারে। মায়া উনুনের ছাই দিয়ে দাঁত মাজে। বালতির জল নিয়ে কুলকুচি করে মুখ ধোয়। একটু একটু আলো হতে শুরু করেছে। এবার বেরোতে হবে।

রবারের চটিজোড়া ঘরের দরজার বাইরে রাখা আছে। তার পাশে শুয়ে আছে সনাতন। কম্বলটা আগাগোড়া মুড়ি দিয়েছে। ঘরের ভেতরেই দর্মার দেয়াল দিয়ে আড়াল করা ছোট্ট একটু রান্নাঘর—ও রোজ সেখানে শোয়। আজ এখানে কেন শুয়েছে বোঝা গেল না। পাগল মানুষ— কখন কি করে তার তো ঠিক নেই। ওর কোমরে একটা বিরাট লম্বা নারকেল ছোবড়ার মোটা দড়ি বাঁধা— তার অন্য দিকটা উঠোনে একটা খোঁটার সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। সনাতনের কোমরের আর খোঁটার, দুটো গিঁটই খুব শক্ত। ও খুলতে পারে না। কিছুদিন আগে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করেছিল। রাস্তায় লোকজন দেখলে তাদের গালাগালি দিত— ইঁট পাটকেল ছুঁড়ে মারত। তখন থেকে এভাবে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা। আজ যেখানে শুয়েছে সেখানে বাস্তু নাগের বাসা। দেবতা আবার সনাতনের ওপর চটে না যায়। ঠাকুর তুমি রাগ কোর না— মায়া মনে মনে বলে। ওর তো মাথার কোন ঠিক নেই— তুমি ওর কোন দোষ নিও না।

পায়ে চটি গলিয়ে নিয়ে মায়া বারিয়ে পড়ে। মিশনে যেতে অনেকটা রাস্তা— একঘন্টার ওপর হাঁটতে হবে। ভোরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া— মাথায় কানে ছুঁচের মতো বেঁধে। মায়া দু-ফেরতা করা কাপড় গায়ে জড়িয়েছিল— এখন আঁচলটা দিয়ে মাথা কান ঢেকে নেয়। এখানে আর কে ওকে দেখছে— রাস্তায় তো লোক নেই এখন। আজ একটু চাল ডাল কেনার মত টাকা জোগাড় করতেই হবে। কষ্ট— বড় কষ্ট চলছে মায়ার। গত দু-তিন বছর ধরে। তার আগেও সংসারে টানাটানি ছিল, কিন্তু এত দু:খ তো ছিল না।

সারা বছর কিছু না কিছু রোজগার করত সনাতন। ক্ষেতে জন খাটত— রোজ হিসেবে টাকা পেত। বছরভর চাষ— বর্ষায় ধান, শীতকালে গম, আলু, নানারকম সব্জী। রাতে তাড়ি গিলে ঘরে ফিরত ঠিকই, কিন্তু সংসারে টাকা দিত— চাল, ডাল, আনাজ কিনে আনত। তারপর পড়ল কুগ্রহের নজর। প্রথমে মারা গেল সুনীল ওদের ছোট ছেলেটা। মাঠে ঘাটে খেলে বেড়াত— পায়ের পাতার খানিকটা চামড়া উঠে গিয়ে কেটে গিয়েছিল। পরের দিন জায়গাটা বিষিয়ে উঠল— সেই সঙ্গে জ্বর। জ্বরে ছেলে একেবারে অচেতন। মায়া বলেছিল হাসপাতালে নিয়ে যেতে। ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল সনাতন। পায়ে একটু কেটে গিয়ে জ্বর এসেছে, এমনিই ঠিক হয়ে যাবে। যে বর্গাদারের হয়ে জন খাটে সে সাত দিনের মজুরী বাকি রেখেছে— হাসপাতালে যাওয়া আসার ভ্যান রিকশার ভাড়াটা আসবে কোথা থেকে? জ্বর আরও বাড়লো— হিক্কা তুলতে তুলতে সে রাতেই শেষ হয়ে গেল ছেলে। আর তারপর থেকেই কিরকম গুম মেরে গেল সনাতন। আস্তে আস্তে জন খাটতে যাওয়া বন্ধ করে দিল। কারোর সঙ্গে কথা বলে না, লোক চিনতে পারে না। খালি খিদে পেলে মায়ার কাছে খাবার চায়। উদয় পাল মুদীর দোকান চালায়— আবার গয়না, ঘটি বাটি বাঁধা রেখে টাকা দেয়। ওর কাছে কানের দুল বাঁধা দিয়ে হাসপাতালের ডাক্তারবাবুকে এনে সনাতনকে দেখিয়েছিল মায়া। ডাক্তার বলেছিল মাথার শক্ত অসুখ হয়েছে— পাগলের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সে সব তো আর করা যায় নি। আর গয়না বাঁধা দেয়ার টাকা যেটুকু বেঁচেছিল তা সংসারে খরচ হয়ে গেল। সেই সোনা আর ছাড়ান হোল না।

মায়া— এই মায়া। পেছন থেকে মেয়েমানুষের গলার আওয়াজ।

মায়ার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে যায়। এখন একটু একটু রোদ উঠছে— ঠাণ্ডা ভাবটা কমছে। মায়া মাথার থেকে কাপড় সরিয়ে আবার বুকে পিঠে জড়িয়ে নেয়।

ডাকছে মঙ্গলা। মায়ার প্রতিবেশীই বলা চলে। মায়ার ঘরের থেকে চার পাঁচটা ঘর এগিয়ে ওর দোচালা ঘর। মায়া ওর দিকে ঘাড় ঘোরায়। মঙ্গলা একটু জোরে হেঁটে ওর পাশে চলে আসে। তারপর জিজ্ঞেস করে, মিশনে যাচ্ছিস?

মায়া একটু বিরক্ত হয়। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। উত্তর দেয় না। খালি একটু ঘাড় নাড়ে।

মঙ্গলাও মিশনে যাচ্ছে। ও মায়ার পাশে পাশে হাঁটতে থাকে— একগাদা কথা বলতে বলতে। প্রথমে সনাতনের খবর জিজ্ঞেস করে। ও একই রকম আছে শুনে জিভ দিয়ে চুক চুক করে আওয়াজ করে দু:খ দেখায়। তারপর বলে, তোর মেয়েটাকে লঙ্কা তুলতে পাঠাতে পারিস তো। কিছু টাকা আসবে ঘরে।

এখন শীতকাল— গাঁয়ের অনেক বৌ-ঝি লঙ্কা তোলার কাজে লেগে গেছে। এক কিলো লঙ্কা তুললে একটা করে এক টাকা। রোজগার মন্দ হয় না। কিন্তু মেয়েটা তো তাহলে ইস্কুল যেতে পারবে না। সেটাই উত্তর দিল মায়া— ওর ইস্কুল কামাই হবে যে।

মঙ্গলা ঠোঁট বাঁকায়। মায়ার মুখের সামনে হাত নেড়ে বলে এত লেখাপড়া শিখিয়ে কি মেয়েকে বিদ্যেধরী করবি? সেই তো বিয়ে দিয়ে সোয়ামির ঘরে পাঠাতে হবে। আর বেশি লেখাপড়া শেখালে তোর মেয়েকে কোন মরদ বিয়ে করতে আসবে? তখন কি করবি? তোর সোয়ামি পাগল, কোন রোজগার নেই— তোর হাঁড়ি চড়ে না— তোর মেয়েটা ডাগর হয়েছে— ওর কি উচিত নয় যা পারা যায় রোজগার করা?

মায়া রাগে কিন্তু মুখে কিছু বলে না। মঙ্গলা এসব কথা বলতেই পারে। ওর অবস্থা ভাল। বরটা বাস-মোটরের রাস্তার ওপর একটা খাবারের দোকানে রান্না করে— নগদানগদ টাকা পায়। ওর দুটো গরু— তার দুধ বেচেও টাকা রোজগার হয়। এই কদিন আগে ওর থেকে একথালা চাল ধার করেছে মায়া। এখনও শোধ দেওয়া হয় নি।

মঙ্গলা ওকে খোঁচায়— কিরে, চুপ করে রইলি যে।

এবার মায়া বলে, মেয়েটার জ্বর হয়েছে – শুয়ে আছে। জ্বর ছাড়ুক, তারপর পাঠাব।

মিশনের ভেতরে বাইরে সকালবেলাতেই লোকের ভীড়। সকালের আরতি শেষ হয়েছে— লোকজন সব এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়ছে। এরা বেশিরভাগ কলকাতা থেকে আসে। এখানে দু একদিন থাকে— ঠাকুরের অল্প বয়েসের থাকার জায়গা ভাল করে দেখে যায়। মায়া তিন মহিলাকে দেখতে পেল— মিশন থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। চেহারার মিল দেখে মন হয় তিন বোন। দুজন একটু ফর্সা— একজন বেশ কালো। মায়া সাধারণত: মহিলা দেখলেই এগোয়— শুধু পুরুষদের দল দেখলে তাদের কাছে ঘেঁষে না। মায়া চটপট ওদের দিকে এগিয়ে যায়। তিনজনকেই একসঙ্গে বলে, দিদি, ঠাকুরের থাকার জায়গা, শোবার জায়গা, সব ভাল করে দেখিয়ে দেব— আমাকে আপনাদের সঙ্গে নেবেন?

ওদের মধ্যে একজন— দেখে মনে হয় বড় বোন— একটু হেসে বলল, ঠিক আছে। তুমিই সব দেখাও আমাদের।

মঙ্গলাও এগিয়ে এসেছিল। মায়া ওদের কব্জা করেছে দেখে ওর মুখ কালো হয়ে গেল। মায়ার একটু চিন্তা হোল— মঙ্গলা চটলে ওর অসুবিধে হতে পারে। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। ওর টাকার দরকার— এক্ষুণি। মঙ্গলার তো আর তা নেই।

সব দেখিয়ে ফিরে আসার পর তিনজনই উচ্ছ্বসিত। খুব ভাল দেখিয়েছে— খুব ভাল লেগেছে আমাদের।

বড়বোন তার ব্যাগ খুলল। একটা একশ টাকার নোট বার করে বাড়িয়ে ধরল মায়ার দিকে। নোটটা হাতে নিয়ে ওদের দিকে বোকার মত তাকিয়েছিল মায়া। এর থেকে কত ফেরৎ দিতে হবে ওকে?

বড়বোন একটু হেসে বলল, ওটা তোমার। পুরোটাই রাখো। আর এক বোনও ঘাড় নাড়ল। কালো বোন একবার বলল, পঞ্চাশ, কিন্তু বাকি দুজন তাকে থামিয়ে দিল।

কালো বোনের ওপর একটু চটল মায়া। কালোর শরীরটাও কালো, মনটাও কালো। কিন্তু তিনজনেরই পা ছুঁল। তারপর বলল, দিদি, আমি বড্ড গরীব। ঘরে সোমত্ত মেয়ের গায়ের জামা জোটে না। এরপর আবার তোমরা যখন আসবে তখন কয়েকটা পুরনো বেলাউজ এনো আমার মেয়ের জন্যে।

বড়জন হেসে বলল, ঠিক আছে। আনব। তারপর মায়ার দিকে হাত নেড়ে ওরা মিশনের ভেতরে ঢুকে গেল।

ফেরার রাস্তা ধরল মায়া। আর তখনি দেখতে পেল— মঙ্গলাও একটা দল ধরে ফেলেছে। পুরুষ মহিলা মেশানো দল। মহিলাদের সঙ্গে বকবক করতে করতে তাদের সঙ্গে হাঁটছে। মায়া নিশ্চিন্ত হোল। ওর কাছ থেকে ধার করা চালও এক্ষুণি ফেরৎ চাইবে না।

জোর কদমে হাঁটছিল মায়া। আজকের দিনটা ভারী ভাল। রোজই এরকম হতে পারে না? ভাগ্যিস ঐ দিদিমণিদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বেশিরভাগ লোকই তো এত দেয় না। কুড়ি, তিরিশ— জোর পঞ্চাশ। অনেকে আবার হাতে একটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে ছেড়ে দেয়— তখন মায়ার কান্না পেয়ে যায়। সনাতন যখন জন খাটত তখন মায়ার হাতে পঞ্চাশ একশো টাকা থাকত। রাতে ছেলে-মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে মায়াকে অনেক আদর করত সনাতন। ফিস ফিস করে দুজনের কথা হোত। ঘরের দেয়াল মেরামত করতে হবে, চালের ফুটিফাটা নতুন খড় দিয়ে ঢাকতে হবে। বই নেই বলে উত্তরাকে ইস্কুলে দিদিমণি বকেছে— বই কিনতে হবে। মাঝে মাঝে দুজনে মিলে ভগবানকে দোষ দিত। কত লোকের এত এত টাকা— আর ওদের কিছু নেই। আবার মায়া সনাতনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। বলত, ভেবো না। আমাদের এত কষ্ট থাকবে না— ভগবান মুখ তুলে চাইবে। তারপর কি যে সব হয়ে গেল।

আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছে নেয় মায়া। ঐ আঁচলেরই খুঁটে বাঁধা একশ টাকার নোটটা— মনটা আবার একটু খুসি হয়ে ওঠে। প্রায় মাস দুই আগে একসঙ্গে আড়াইশ টাকার মত রোজগার করে ফেলেছিল। দু দিনের কাজ পেয়েছিল গরমেন্টের একশ দিনের কাজে। ওই কাজের জন্যে পঞ্চায়েত থেকে একটা কার্ড দিয়েছে— শ্রীমতী মায়া হালদার, স্বামী শ্রী সনাতন হালদার। মাটি কেটে পুকুর তৈরীর কাজ। মেয়েদের সারাদিনে আড়ে পাশে লম্বায় ছেষট্টি ফুট মাটি কাটতে হবে— তবেই দিনের রোজগার হবে একশো তিরিশ টাকা। কোদালের কোপে কোপে মাটির চাঙড় উঠে আসে— সেই মাটি ঝোড়ায় করে নিয়ে গিয়ে একটা লাইনে ফেলে আসা। মাটি সেখানে উঁচু হয়ে উঠছে— সুন্দর বর্ষাকালের রাস্তা হবে। ঐ একই দলে ছিল ওদের গাঁয়ের নিত্যানন্দ। ওর বয়েস হয়েছে— টাক-পড়া মাথায় ঝড়তিপড়তি চুল, হপ্তাখানেকের না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ। সব সাদা। ও গজর গজর করছিল— মেয়েদের মোটে ছেষট্টি— পুরুষদের জন্যে তার দেড়া কাজ। মায়া কোন সাড়াশব্দ করেনি। পুরুষে তো মেয়েদের থেকে বেশি কাজ করতে পারবেই— এনিয়ে এত কথা বলার কি আছে?

দু-দিন পরে মায়ার ছুটি হয়ে গেল। আবার ঘুরে ওর পালা এলে ওর ডাক পড়বে। কদ্দিনে— সে কে জানে? ওর হাতে ধরিয়ে দিল একটা কাগজ। সমবায় সমিতিতে তোমার টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে এই কাগজ দেখাও— টাকা পেয়ে যাবে।

সমিতির সামনে ভীড়— ধাক্কাধাক্কি, গুঁতোগুতি। ক্যাশিয়ারবাবু গেছে সমবায় ব্যাঙ্কে— টাকা আনতে। ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকো এই ভীড়ের মধ্যে। এরই মধ্যে মায়া নিজের পেছনে কয়েকটা হাতের স্পর্শ পায়— কোন কোন হাত আবার চিমটি কাটার চেষ্টা করে। মায়া এপাশে ওপাশে সরে যায় ওই হাতগুলোকে এড়াবার জন্যে। তারপর সমিতির ঘরের ভেতর থেকে একজন বাবু বেরিয়ে এল। হেঁকে বলল, লাইন করো, লাইন করে দাঁড়াও সব। ব্যাটাছেলেরা, মেয়েরা আলাদা আলাদা লাইনে যাও। লাইন দিয়ে না দাঁড়ালে টাকা দেওয়া হবে না।

লম্বা লম্বা দুটো লাইন পড়ল সমিতির ঘরের সামনে। ক্যাশিয়ারবাবু এল আরও একঘন্টা পর। ভেতরে ঢুকে টাকা দেয়ার জানালার সামনে চেয়ারে বসল। তারপর তার জন্যে এল চা। ক্যাশিয়ারবাবু চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দেয়ার পর টাকা দেওয়া শুরু হোল।

একবার এলাইনের প্রথম লোক টাকা পায় তো পরের বারে পাশের লাইনের প্রথম জন। লাইন এগোয় কাছিমের মত। ক্যাশিয়ারবাবু একই লোকের টাকা আঙুলে থুতু লাগিয়ে তিনবার গোনে, তারপর দেয়। তবু নিশ্চিন্দি। গুঁতোগুতি তো আর নেই। ঘন্টা দুই দাঁড়াতে হোল। তারপর টাকা আঁচলে বেঁধে ঘরে ফিরল মায়া।


দিন দশেক পরে পঞ্চায়েতের পিওন ফটিক এল ওর ঘরে। উত্তরা ইস্কুলে গেছে। সনাতন মাঝে মাঝে মুখ নিচু করে নিজের কোমরের দড়ি চিবোচ্ছে। একটা সাদা-কালো বেড়াল ওর সামনে ওৎ পেতে দাঁড়ানো। সনাতন যখন মুখ তুলছে সেটার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে। বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলে এনে কিভাবে চষা ক্ষেতে রুইতে হয় তার কায়দা বোঝাচ্ছে। মায়া উনুনে ভাত চাপিয়েছিল— সস্তার মোটা লাল চালের ভাত। সেই সঙ্গে আজ একটু শাকভাজা করেছে— মেয়েটা ইস্কুল থেকে ফিরে এসে খাবে। ফটিক হঠাৎ কেন এসেছে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিল মায়া।

ফটিক চটপটে ছেলে। বি.কম পাশ করেছে। পঞ্চায়েতের বাবুরা হিসেবপত্র না মিললে মাঝে মাঝে ফটিককে ডেকে হিসেব দেখিয়ে নেয়। লম্বা সার দেওয়া সব টাকার অঙ্ক— ফটিক সেগুলোর ওপর দিয়ে আলতো করে ওপর থেকে নিচে একটা পেন্সিল টেনে নিয়ে যায়— লেখাগুলোর ওপর পেন্সিলের দাগ না লাগে। তারপর কোথায় পাঁচ এর জায়গায় আট লিখতে হবে তা দেখিয়ে দেয়। ও বুঝল মায়া ঘাবড়ে গেছে। বলল, মায়াদি, নগেনদা পাঠিয়েছে আমাকে।

তারপর আবার বলল, তোমার কাছে ষাট টাকা পাওনা আছে। নগেনদা সেই টাকা নিয়ে যেতে বলেছে।

বোকার মত হাঁ করে উনুনের সামনে উবু হয়ে বসেছিল মায়া। ফটিকের দিকে ঘুরে বসেছে— উনুন, ভাতের হাঁড়ি, সব ওর পেছনে। একটা পোড়া গন্ধে ওর হুঁশ ফিরে এল। ভাত উথলে উঠে ফ্যান উনুনে পড়েছে।

রান্নাটা সামলে নিল মায়া। এতক্ষণে ও একটু ধাতে এসেছে। একবার ওর মনে হোল ফটিককে বসতে বলা উচিত। আর সেই সঙ্গে একটু চা খাওয়ানো। কিন্তু বসতে দেবে কোথায়? আর চা যে খাওয়াবে, চা চিনি দুধ কিছুই তো নেই।

আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ফটিকের সামনে এসে দাঁড়াল মায়া। জিজ্ঞেস করল— কিসের টাকা, ভাই?

ফটিক বুঝে নেয়। মায়া একেবারেই আনাড়ি। ও ব্যাপারটাকে পরিষ্কার করে। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। মাটি কাটার টাকার গোটা অংশটা মজুরের পাওনা, কিন্তু খুচরোটা নগেন লেট-এর। ঐ খুচরোটা গাছের বীজের মত— পুঁতলে আবার গাছ হবে। মানে সেই মজুরের মাটি কাটার পালা আবার ঘুরে আসবে। কিন্তু পুঁততে হবে নগেনবাবুর বাড়িতে। বীজ না পুঁতলে গাছ হবে কোথা থেকে?

মায়া হাত উল্টে দেয়। অভাবের সংসার— সে টাকা তো কবে খরচা হয়ে গিয়েছে। এখন কোনমতে মায়ার সংসার চলছে। সামনে শীত। মেয়েটার জামা কেনার টাকা নেই— একটা ভাল কম্বল কেনার টাকা নেই। ও এখন নগেনকে টাকা দেবে কি করে?

একটু হাসল ফটিক। তাহলে বোধহয় মায়ার পালা আর এল না। তারপর ফিরে গেল।

মিশন থেকে গাঁয়ে যাবার রাস্তায় পাশে সব চাষের মাঠ। যে জমিতে সনাতন কাজ করত তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল মায়া। সব লোক লেগে গেছে কাজে। আলুর চাষ হচ্ছে— সবাই বলছে জোর ফলন হবে এবার। মাঠের লোকগুলোর খালি গা— ঘাম চকচক করছে ওদের পিঠ। রোদ একটু চড়া হয়েছে। মাথায় গামছা জড়িয়ে নিয়েছে অনেকে— কেউ কেউ মাথায় টোকা চাপিয়েছে। মায়ার চোখ জ্বালা করে উঠল। সবাই কাজ করছে— খালি সনাতন নেই ওদের মধ্যে। এই ক বছর আগেও তো ছিল। আজ নেই। আর কোন দিন থাকবেও না।

মায়ার নজরে এল— সামনে উদয় পালের মুদী দোকান। পালবাবু জিনিষপত্র ওজনে কম দেয়— দাঁড়িপাল্লা, বাটখারায় কারচুপি আছে। তবু গাঁয়ের লোক ওর দোকান থেকে কেনে। নইলে টাকা ধার দেয়া বন্ধ করে দেবে। কাপড়ের ওপর দিয়ে আঁচলে বাঁধা টাকাটার ওপর আঙুল বোলায় মায়া। চাল, ডাল কিনে তবে ঘরে যেতে হবে। আর হ্যাঁ, রুগ্ন মেয়েটার জন্যে সাবু।

|| ২ ||


ত্তরার যখন ঘুম ভাঙল তখন রোদ উঠে গেছে। ঘরের ভেতর অবশ্যি তেমন আলো ঢোকে না— একটু অন্ধকার অন্ধকার হয়ে থাকে। উত্তরার মাথা, গা, হাত, পায়ে ব্যথা। তার মানে জ্বরটা এখনও আছে। আজও ইস্কুল কামাই হবে।

একটু শীত বোধ করে উত্তরা। ঘরের ভেতর দড়িতে ঝোলানো দুটো গায়ের জামা— তার দিকে চোখ যায়। ইস্কুল না গিয়ে ঘরে ছিল বলে কাল মা দুটোই একসঙ্গে ধুয়ে দিয়েছে। শুকিয়েছে কিনা কে জানে। শীতকাল— জামা ঘরের ভেতর টাঙানো থাকে বলে শুকোতে দেরী হয়। কাল নিশ্চয়ই জ্বর ছাড়বে— ও ইস্কুল যাবে। তার মধ্যে জামাগুলো শুকোবে নিশ্চয়ই। ঘরের বাইরে দাওয়াতে রোদ এসে পড়ছে— ও বাইরে বেরিয়ে এল। শীতের সকালের রোদ— গায়ে লাগলে বড় আরাম। উত্তরা আবার ঘরে ঢোকে। নিজের বিছানাটা তুলে রাখে। খালি কম্বলটা নিয়ে বাইরে আসে। সেটা মুড়ি দিয়ে ঘরের দেয়ালে পিঠ দিয়ে আরাম করে বসে। এই রোদ গায়ে লাগালে জ্বরের বাবা পালিয়ে যাবে।

উত্তরার চিন্তাভাবনা এখন দুটো জগতে ঘোরাফেরা করে। একটা হচ্ছে ওর মা। মা তো ওর মা বটেই— সেই সঙ্গে ওর সখী। ওকে দেখতেও নাকি একেবারে ওর মার মত। সবাই বলে সোমত্ত বয়েসের মায়া। ওর সব সুখদু:খের গল্প ওর মার সঙ্গে। বাপটা পাগল-ছাগল মানুষ— তার সঙ্গে তো আর কথাবার্তা হয় না। মার ঘাড়ে পুরো সংসার। টাকা রোজগার করা, সবাইকে খাওয়ানো, ওর ইস্কুলের খরচা জোগানো। মাইনেটাই খালি লাগে না। বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, রবার— এ সবকিছুর খরচা তো আছে। রাতে উত্তরা ল্যাম্প জ্বেলে পড়া মুখস্থ করে— তার কেরোসিন তো মা মুখ বুজে জোগায়। ও মাকে রান্নাতে সাহায্য করতে যায়— মা আবার ওকে রান্নাঘর থেকে ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়। বলে— তোকে রাঁধতে হবে না। তুই লেখাপড়া করগে যা। মায়ের এত কষ্ট— কবে যে কমবে ভগবানই জানে।

উত্তরার আর একটা জগৎ হচ্ছে ওর ইস্কুল। সেখানে ঢুকলে দুনিয়ার একটা বড় দরজা খুলে যায়। তখন ওর মনে থাকে না যে ও দু:খীর ঘরের মেয়ে— ঘরে ফিরলে থালায় ভাত পড়বে কিনা তার ঠিক নেই। বিজ্ঞান আর অঙ্ক ওর মাথায় টকাটক ঢোকে। দুই দিদিমণি খুব তারিফ করে— ভাল ভাল নম্বর দেয়। আবার অসুবিধেও আচ্ছে। ইংরেজি, বাংলা— দুটোতেই ও বেশ কাঁচা। আগের কেলাসে এক নম্বরের জন্যে ইংরেজিতে ফেল করেছিল উত্তরা। হেড দিদিমণি এক নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে পরের কেলাসে তুলে দিয়েছে। সেটা ও আর মাকে বলেনি।

আর একটা চিন্তাও ওর মনে আসে। ও জানে যে ও এখন বড় হয়েছে। এই বড় হওয়াটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার— কত কিছু যে লুকিয়ে আছে এর ভেতর। মা ওকে অনেক কিছু বলেছে— বুঝিয়েছে। ইস্কুলের মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কত কথা বলে, হাসাহাসি করে। ওর কেলাসের পাপড়ির বিয়ে হয়ে গেছে। শাউড়িটা ভাল— বিয়ের পরেও ইস্কুলে আসতে দিয়েছে ওকে। ওর সোয়ামি ওকে যা সব করে— খুব হেসে হেসে সেসব গল্প করে ও। আর সব মেয়েরা মুখিয়ে থাকে সেসব কথা শোনার জন্যে। উত্তরাও শোনে— ঘরে এসে মাকে সব বলে। মা বোঝায়— তখন বোঝে মেয়ে।

ইস্কুলে আবার এক আপদ হয়েছে। যে মাস্টারমশাই খেলাধুলো শেখায় সে আজকাল কিরকম যেন করে। খেলা শেখাবার সময় নানা ছুতোয় উত্তরার শরীর ছোঁবার চেষ্টা করে। উত্তরা সরে যায়— মাস্টারকে সে সুযোগ দেয় না। ও মাঝে মাঝে ভাবে হেড দিদিমণিকে বলে দেবে কিনা। এখন পর্যন্ত সাহস করে বলে উঠতে পারেনি।

কম্বল আর শীতের রোদের মিঠে ওম — কখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না উত্তরা। হঠাৎ কিরকম একটা মনে হোল— ঘুমের ভাবটা কেটে গেল। চোখ খুলে তাকাল উত্তরা।

একটা মুখ, মাথায় জটপড়া চুল, সারা মুখে বড় বড় খোঁচা খোঁচা গোঁফদাড়ি— ওর মুখের একেবারে সামনে ঝুঁকে রয়েছে। সনাতনের কোমরের দড়ি যে এ জায়গা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে এখানে বসার সময় উত্তরার সেটা খেয়াল হয়নি। মুখে, গায়ে বিকট দুর্গন্ধ— উত্তরার গা গুলিয়ে উঠে বমির ভাব এল। মা নিশ্চয়ই পাগলকে অনেক দিন স্নান করিয়ে দেয়নি— চুল দাড়ি তো কাটেইনি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজের বিপদের গুরুত্বটা বুঝল উত্তরা। সবে ঘুম ভেঙেছে— গায়ের কাপড় সরে গিয়ে ও বেআব্রু হয়ে পড়েছে। দু হাতে সনাতন ওর দু কাঁধ চেপে ধরেছে— চোখের চাউনি তীব্র এবং ভয়ঙ্কর। পাগল দু চোখ দিয়ে ওকে গিলে খায়। বলে— বৌ, তোকে অনেককাল কাছে পাইনি।

উত্তরা শরীর দুমড়ে মুচড়ে ওর হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে। মাটিতে গড়ায়— দড়িটার আওতার বাইরে চলে যেতে পারলেই ও বেঁচে যাবে। দড়িটা এঁকেবেকে মাটিতে পড়ে ছিল— আস্তে আস্তে সোজা টানটান হয়ে আসে। এইবার একটা ঝটকা মেরে বেরিয়ে যেতে পারলে নিশ্চিন্ত। কিন্তু উত্তরা বুঝল এই জ্বর একদম কাহিল করে ফেলেছে— ও একেবারে হাঁপিয়ে পড়েছে। সনাতনকে ধাক্কা মারবার জোরটা ও পাচ্ছে না। পাগল ওর হাত ধরে আচ্ছে— মাটির ওপর দিয়ে ঘষটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের কাছে। উত্তরা চীৎকার করল। গলা, মুখ একেবারে শুকনো— ঘষা ঘষা ভাঙা একটা আওয়াজ বেরোল মুখ দিয়ে। ও সনাতনের হাত কামড়ে দিতে গেল— পারল না। দুর্গন্ধে বমি উঠে এল। বিকট মুখ করে হাসল পাগল। বলল, বৌ, খেলা করছিস আমার সঙ্গে?

তারপর উত্তরাকে দাওয়ার মেঝের ওপর চেপে ধরল।

|| ৩ ||


মায়ের কোলে মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছিল উত্তরা। মায়া ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। চোখ থেকে গালের ওপর দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছে, আঁচল দিয়ে গাল মুছে নিল মায়া। তারপর মেয়েকে বলল, যা মা, ঘরে গিয়ে শো। আমি তো এসে গেছি। আর কোন ভয় নেই।

উত্তরা মায়ের কোল থেকে মুখ তুলল। উঠে দাঁড়াল মায়া। আর তখনি উঠোনের দূরের কোণের থেকে পুরুষের গলা শোনা গেল, বৌ, খিদে পেয়েছে রে। ভাত দিবিনে?

মায়ার মুখের ভাব, চোখের চাউনি কঠিন হয়ে ওঠে। ঘরের এককোণে রয়েছে বঁটিটা— রান্নাঘরে পাগল শোয় বলে এটা এখানেই রাখা থাকে। ঘরে ঢুকে ঝট করে সেটা তুলে নেয় মায়া।

উত্তরা মায়ার পেছনেই ছিল। মায়ার হাত ধরে ফেলল। আর্তস্বরে বলে উঠল, মা—আ—আ, না—না।

মায়া দাঁতে দাঁত ঘষে। চেঁচিয়ে ওঠে, মর্‌, মর্‌— সব কটা মর্‌। তুই মর্‌— আর বাপটাকেও সঙ্গে নিয়ে যা। আমার হাড় জুড়োক।

উত্তরা ফোঁপায়। আর বলে — মা—মা।

দুজনে চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। এখন আবার মায়ার চোখে জল। হাতে ধরা বঁটি ছুঁড়ে ফেলে দেয় মায়া। মা মেয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে চেঁচিয়ে কাঁদে। তারপর মায়া আবার মেঝেয় বিছানা পাতে— তার ওপর মেয়েকে শুইয়ে গায়ে কম্বল চাপা দেয়। নিজে পাশে শুয়ে মেয়ের মাথায় গায়ে আদরের চাপড় দিতে দিতে ঘুম পাড়ায়। খানিক পরে উত্তরার চোখ বুজে আসে— শান্তির নি:শ্বাস পড়তে থাকে ধীরে ধীরে। তখন মায়া ওঠে— রান্না করতে যায়। উত্তরার জন্যে সাবু তৈরী করবে। ঘুম থেকে উঠে মেয়েটা খাবে।

|| ৪ ||


গেন লেট-এর বাড়িতে ধন্না দিয়ে পড়ল মায়া। হাতে কোন টাকাপয়সা নেই। খেতে পাচ্ছি না। মেয়েটা, ঘরের পাগলটা— সবাই না খেয়ে আছে। বাবুগো— মুখ তুলে চাও, একটু দয়া কর। মজুরী না হয় একটু কমসম করেই দিও— গরমেন্টের লাভ রেখো। কিন্তু মাটি কাটার কাজ দাও— অন্তত: তিনদিন। ভগবান দুহাত ভরে দেবে তোমাকে।

নগেনের বৌ কর্তাকে বলল, আহা মেয়েটা বড় দু:খী। দ্যাখো না ওকে কিছু কাজটাজ দিতে পার কিনা।

নগেন নিজের গিন্নীকে ভয় পায়— মোটামুটি তার কথা শোনে। তাছাড়া কম মজুরীর ইঙ্গিতটা ওর মাথায় ঢুকেছে। ও মায়াকে বলল, কাজ তো আসছেই খুব কম। ওপর মহল টাকাপয়সা ছাড়লে তবে না কাজ। তাছাড়া বাকি লোকজনদেরও তো কাজ দিতে হবে। তবুও— এত করে যখন বলছ— দেখি কি করা যায়।

হপ্তাখানেক পরে ডাক পেল মায়া। তবে তিনদিন নয়— দুদিনের মাটি কাটা।

মজুরীর টাকা নিয়ে ফিরে এসে মায়া ছোট্ট কাঠের হাতবাক্স খুলল। লন্ঠনের আলোয় সব টাকা গুনল। একবার— দুবার। দুদিনের পুকুর কাটার মজুরী দুশ— নগেনের পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দিয়ে। আরও কিছু দশ কুড়ি টাকার নোট— মিশনের ভক্তদের থেকে পাওয়া। গুনে গেঁথে সব মিলিয়ে হোল দুশ সাতাশি টাকা। মনে মনে একটা হিসেব করে মায়া। এতেই হয়ে যাবে মনে হয়।

পরের দিন হাটে গেল মায়া। একটু বেলা করে। দুপুরের রোদ যখন একদিকে হেলতে শুরু করেছে তখন। গাঁয়ের পাশের বড় মাঠটায় সপ্তাহে দুদিন হাট বসে— সোম আর শুক্রবার। আজ সোমবার মায়ার পক্ষে আসা সুবিধে। শুক্রবার দিন থেকে মিশনে ভক্তদের ভীড় বাড়ে— ওইদিন হাটে এলে কামাই-এর ক্ষতি।

কানুর মা মেছুনী কিছু ভাল, কিছু বাসি, নরম হয়ে যাওয়া মাছ নিয়ে বসেছিল। প্রকাণ্ড মোটা থলথলে শরীর, হাঁড়ির মত মুখ। নিজের মনে শাপ দিচ্ছিল— আঁটকুড়ির ব্যাটা সব— মর্, মর্। গলায় রক্ত উঠে মর্— হাত পা দাপিয়ে চোখ উল্টে মর্।

চাঁদু সরকার তোলাবাজ। এদিককার সব দোকানহাটের থেকে তোলা আদায় করে। একটু আগে ওর দলের দুটো ছেলে এসে কানুর মার থেকে পঞ্চাশ টাকা আদায় করে নিয়ে গেছে। এই শাপশাপান্তের লক্ষ্য ওই দুটো ছেলে।

মায়া ওর মাছের সামনে এসে দাঁড়াল। ও শাপ দিতে দিতে কাটা, গোটা সব মাছ আলাদা আলাদা গাদা করে রাখছিল— মুখ তুলল না। কানুর মার কাঁধে টোকা দিল মায়া। বাতিল হওয়া খানিকটা ছোট চিংড়ি গাদা করে এক পাশে রাখা আছে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে মায়া বলল, ও মাসী, ওই চিংড়ি আমাকে আধ কিলো দাও। দশ টাকার বেশি দেবো না কিন্তু।

দরাদরি করে ঠিক হোল ষোল টাকায়। কানুর মা ঐসব চিংড়ির মাথা পরিষ্কার করে দেবে না। মায়া বলল, দরকার নেই। ওভাবেই দাও।

হাটে আর কিছু কেনার নেই। ঘরে ফিরল মায়া। হাতে ধরা চিংড়ি মাছ— পুরনো খবরের কাগজের ছেঁড়া টুকরো দিয়ে মোড়া। কাগজের টুকরোটার ভেতর মাছ থাকায় সেটা ভিজে উঠেছে। তবুও কাগজের শব্দগুলো খানিকটা পড়া যায়— কাল জেলায় বন্ধের ডাক— তারপর জলে বেশি ভিজে অস্পষ্ট।

চিংড়ি মাছ রাঁধল মায়া। একটু গন্ধ গন্ধ লাগছিল— বেশি করে পেঁয়াজ আর লঙ্কাবাটা দিল। পেঁয়াজের আগুন দাম— তার ওপর উদয় পালের দাঁড়িপাল্লা আর বাটখারা। তবুও দরাজ হাতে পেঁয়াজ ঢালল। তারপর ঢাকাঢুকি দিয়ে ঘরের মধ্যেই রেখে দিল। রান্নাঘরে থাকলে পাগল খেয়ে ফেলবে।

সেদিনটা রাখল। তার পরের দিনটাও। উত্তরাকে বারণ করা আছে— ও ঐ খাবারে হাত দেবে না। তাছাড়া মায়া নিজের হাতে বেড়ে দেবে— একসঙ্গে খেতে বসবে তবে না মেয়ে খাবে। এই দুদিন সনাতনকে খুব কম খাইয়ে রাখল মায়া। দুবেলা একটা করে শুকনো রুটি।

পাগল চেঁচায়— রুটি শেষ করে মায়ার দিকে ছুটে আসতে চায়। কোমরের দড়িতে বাধা পেয়ে আটকে যায়। তখন বলে, বউ, খিদে মেটে না— আর একটু দে। আবার রেগে গিয়ে গাল দেয়, হারামজাদী খানকি— আমাকে খেতে দিচ্ছিস না— আমি তোর সোয়ামি নই?

উত্তরা সব দেখে— কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস পায় না। মা কিরকম একটা হয়ে আছে— যেন একটা অচেনা মেয়েমানুষ।

পরেরদিন পাগলকে ভোজ দিল মায়া। ঐ চিংড়ি মাছ— সবটা। আর তার সঙ্গে ভরপেট ভাত। পাগল খুব খুসী। সামনে পাতের খাবারটা দেখে আর বলে, আমার বৌটা কি ভাল, কি লক্ষ্মী।

পাগল খায়। মুখে মাখে— পাতের বাইরে ছড়ায়। মায়া এগিয়ে এসে বাইরে পড়ে যাওয়া চিংড়িমাছ আবার পাতে তুলে দেয়। কিছু ফেলা না যায়।

সনাতন দু হাত দিয়ে মুঠো করে পাতের খাবার মুখে তোলে। বিকট মুখভঙ্গি করে চিবোয়। গলায় আটকে গেলে বিষম খায়। কাশে— তারপর জল খায়। মায়া সামনে দাঁড়িয়ে দেখে। উত্তরা বয়সে এখন পনেরো। তার মানে ষোল বছরের কথা। এই মানুষটা গিয়েছিল মায়াদের গাঁয়ে। নতুন ধুতি পাঞ্জাবী পরে। মুখে চন্দন, মাথায় টোপর— সঙ্গে এক মিনিবাস ভর্তি বরযাত্রী। মায়ার বাবাও ক্ষেতে জন-খাটা কিষাণ। কিন্তু খরচা করেছিল তিরিশ হাজার। তার মধ্যে বিশ হাজার চড়া সুদে ধার। মায়াকে নিয়ে ফেরার পথে মিনিবাসের চাকা পাঞ্চার হয়েছিল। চাকা মেরামতির সময় সবাই রাস্তার পাশের দোকান থেকে সিঙাড়া কিনে খেয়েছিল— সেই সঙ্গে বড় সড় ভাঁড়ে চা। সনাতন নিজের হাতে খাইয়েছিল মায়াকে— আর এক বাস লোক মুখে আঙুল পুরে সিটি মেরেছিল। শউর-শাউড়ি তখন বেঁচে। ওরা গিয়ে শুল রান্নাঘরে। আর এঘরে হোল উত্তরার জন্মের শুরু। সে যে কি সুখ। কিন্তু সুখ বেশিদিন থাকে না। কোথায় চলে যায়। খালি মনের ভেতর দাগ কেটে রেখে যায়। সেই দাগের ওপর আবার জমে ধুলোবালি, মাটি। খালি মাঝে মাঝে সেই দাগের জায়গায় চিন্‌ চিন্‌ করে ওঠে— সেই দিনগুলোকে ঝাপসা ঝাপসা মনে করিয়ে দেয়।

খেয়েছে দুপুরে। ভেদবমি শুরু হোল শেষ বিকেল থেকে। প্রথম দিকে সনাতন দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসতে পারছিল। তারপর গড়াতে লাগল— কোমরের দড়ি যদ্দূর নিয়ে যায়। তারপর একজায়গায় শোয়া। উত্তরা মায়াকে বলল, মা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। নগেন মাসীমাকে খবর দিই?

সন্ধে হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর লন্ঠনের আলো— বাইরে অন্ধকার। আলোটা বাইরে নিয়ে এসে মায়া সনাতনকে দেখল। লোকটার সারা গায়ে নোংরা ক্লেদ লেগেছে। উঠোন, দাওয়া নোংরা করেছে লোকটা। মুখে বমি। ওর গাল বসে গেছে, চোখ গর্তে ঢুকেছে, মুখের কালো চামড়া ছাই-এর রঙ নিচ্ছে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় পাগল বলল, জল— জল দে।

উত্তরা মায়ার পেছনেই ছিল। মায়া পেছনদিকে ঘুরে ওর চোখে চোখ রাখে। উত্তরার মুখ শুকনো— চোখে ভয়। মায়া মেয়েকে বলে, তোমাকে কিছু করতে হবে না। ঘরে যাও, ল্যাম্পোটা জ্বেলে নিজের পড়া কর।

মায়ের ধমক খেয়ে উত্তরা ঘরে ঢুকে যায়, কিন্তু পড়ায় মন লাগাতে পারে না। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে এসে দরজায় দাঁড়ায়— সনাতনকে দেখে আবার ঘরে ঢুকে যায়।

রাত বাড়ে। সরু একফালি চাঁদ তেরচাভাবে নামতে নামতে পুকুরপাড়ের কলাগাছের সারির পেছনে হারিয়ে যায়। রাতের গাম্ভীর্য আরও গভীর হয় একটানা ঝিঁঝির ডাকে। মাঝে মাঝে ঘরের বাইরে পাগল গোঙায়। ভেসে আসে তক্ষকের ডাক, গর্ত থেকে বেরিয়ে ছুটে যাওয়া একটা ইঁদুরকে পায়ের থাবায় বন্দী করে পেঁচার উল্লাসের কর্কশ ডাক। ঘরের ভেতর দুই মেয়েমানুষ। লন্ঠনের আলো ঘরের দেয়ালে তাদের লম্বালম্বা ছায়া ফেলেছে। ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ে শীতরাতের একগুঁয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া। তাতে লন্ঠনের শিখা ছোটবড় হয়— এদিক ওদিক মাথা নাড়ে। দেয়ালের ছায়াদুটোও নড়াচাড়া করে— ভূতুড়ে সব চেহারা নেয়। রাতে ওদের খাওয়া নেই— রান্নাই নেই কোন। চোখে ঘুম নেই— ওরা ঘরের মেঝেতে ঠায় বসা। কিছু একটা হতে যাচ্ছে। সেটা না হওয়া পর্যন্ত ওদের রেহাই নেই— এভাবেই বসে থাকতে হবে।

মাঝরাত নাগাদ সনাতনের আর কোন সাড়া নেই। উত্তরা ফিসফিস করে ডাকল, মা।

মায়া ওর চোখের দিকে তাকায়। মেয়ে কি বলতে চায় তা বুঝে নেয়। উঠে দাঁড়িয়ে আলোটা হাতে তুলে নেয়। বলে, চল্‌, দেখি।

ওরা ঘরের বাইরে আসে। কিরকম একটা অদ্ভুতভাবে শরীরটা দুমড়ে বাঁকিয়ে মাটিতে পড়ে আছে সনাতন। মুখটা খোলা— দাঁতগুলো বিশ্রীভাবে বেরিয়ে পড়েছে। উত্তরা কান্না-কান্না মুখে মায়ার দিকে তাকায়। একটা শান্ত, ঠাণ্ডা নির্দেশ পায়, সকালবেলায় পাড়ায় খবর দিস।

সকালবেলা মায়ার ঘরের সামনে ভীড়। কিন্তু সনাতনের কাছে কেউই যায় না। সারা জায়গাটা বিশ্রী নোংরা— আর বিকট গন্ধ। মাছির ঝাঁক ভনভন করছে। নগেনের বৌ মায়াকে বলল, আরও আগে আমাদের খবর দাওনি কেন? লোকটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যেত।

নগেনও ঘাড় নাড়ল। ঠিক কথা— অনেক আগেই আমাদের ডাকা উচিত ছিল।

মায়া চোখে আঁচল চাপা দেয়— গুমরে গুমরে কাঁদে। বলে, রাতের বেলা, কি করব, কোথায় যাব— কিছুই ঠিক করতে পারিনি। ভোর হতেই তো দেখলাম— মানুষটা আর নড়ে না।

নগেনের বৌ নিজের অসন্তুষ্টি দেখাতে মুখ বাঁকায়। তারপর শাড়ির আঁচল বুকের ওপর ভাল করে টেনে দেয়। মহিলার চেহারা দিব্যি শাঁসে-জলে। আর অনেক পুরুষমানুষ জড়ো হয়েছে এখানে। তাদের অনেকের চাউনি ভাল নয়।

ডাক্তার তো ডাকতে হবে। উদয় পাল ভ্যানরিকশা আর লোক পাঠাল হাসপাতালে। ওর নাকের ভেতরে লম্বা লম্বা চুল। ডান হাতের তর্জনি আর বুড়ো আঙুল দিয়ে একটা চুল টানতে টানতে মায়াকে বলল, ভ্যানরিকশার হাসপাতালে যাওয়া আসার ভাড়া তিরিশ টাকা। টাকাপয়সা নিয়ে কোন কথা বলতে গেলেই উদয় পাল এভাবে নাকের চুল টানে।

এত সকালে ডাক্তার হাসপাতালে ছিল না। তাকে ডেকে আনতে হোল তার সরকারী বাড়ি থেকে। ডাক্তারের অল্প বয়েস, তিরিশের এপাশে ওপাশেই। ক-বছর গাঁয়ে চাকরি করলে উচ্চশিক্ষার জন্যে বিশেষ সুযোগ পাবে— সেই আশায় এখানে এসেছে। উঠোনের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক্তার নাক কোঁচকাল— উ:, কি দুর্গন্ধ। তারপর জুতোর ডগার ওপর ভর করে পা টিপে টিপে সনাতনের কাছে এসে নাড়িতে আঙুল ছোঁয়াল— গলায় ঝোলান নলটার দুটো দিক দুই কানে লাগিয়ে নলের মাথার চাক্তিটা একবার ওর বুকে ঠেকাল। তারপর ফিরে এসে উদয় পালের কাছে দাঁড়াল। বলল, মারা গেছে। অনেকক্ষণ আগে।

মায়া একটু চমকায়। এত টাকা দিতে হবে? ও দু হাত জোড় করে হাঁউমাউ করে কাঁদে। ডাক্তারকে বলে, বাবু, আপনি আমার মা বাপ। আমার তো সব্বোনাশ হয়ে গেল— এখন আপনি দয়া না করলে আমি মেয়েটাকে নিয়ে না খেয়ে মারা যাই।

তারপর আঁচলের খুঁট খুলে একটা অনেক পুরনো, ময়লা, একপাশে একটু ছেঁড়া একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে ডাক্তারের দিকে বাড়িয়ে ধরল। ডাক্তারের মুখ একটু ব্যাজার হোল। গাঁ-গঞ্জের ব্যাপার। টাকা তো ঠিকমত দেবেই না— তার ওপর পুরনো, পচা নোট। কিন্তু মুখে আর কিছু না বলে নোটটা নিয়ে নিল।

উদয় পালের দোকানে বসে ডাক্তার চা বিস্কুট খেল। সাথে রাখা ব্যাগ থেকে নিজের নাম ছাপানো কাগজ বার করে তাতে লিখল— তীব্র আন্ত্রিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। সেই কাগজ উদয় পালের হাতে দিল। উদয় পাল কাগজটা হাতে নিয়ে নাকের ডগায় চশমা লাগিয়ে লেখাটা পড়ল। তারপর ডাক্তারকে ভ্যানরিকশা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল।

কাগজটা মায়ার হাতে এল। সেটা নিয়ে ও ঘরে এল। যা টাকা হাতে আছে তা গুনল। দেড়শোর কাছাকাছি। মড়া পোড়াতে, ঘরদোর পরিষ্কার করতে সবই খরচা হয়ে যাবে।

|| ৫ ||


শীত পার হয়ে গরম, তারপর বর্ষা। বড় টানাটানির মধ্যে চলছে মায়ার। রোজগারপাতি বাড়ে না— এদিকে বাজারে সব জিনিষের আগুন দাম। কিছুদিন আগে সুরেন আসা যাওয়া শুরু করেছিল। খানিকক্ষণ এটা ওটা সেটা ভ্যাজর ভ্যাজর— আমল না দিয়ে চলে যাওয়া। সেদিন মায়া সবে ফিরেছে মিশন থেকে। মনমেজাজ ভাল নয়। সারা সকাল একটা দলের সঙ্গে ঘুরেছে— দিল মোটে দশ টাকা। উত্তরা গেছে ইস্কুলে। ঘরে মায়া একা। ও ঘরের সব কাজ সারছিল। হঠাৎ এসে হাজির সুরেন। তারপর যত আবোলতাবোল কথা। মায়া তাতে কান দিচ্ছিল না। ওর হাতে এক বালতি গোবর মাটি মেশানো জল— ও ঘরদোর সব নিকোচ্ছিল। ঘরের মানুষটা মারা যাবার পর থেকে এ সব আর করা হয়নি। সুরেন ওর পেছন পেছন ঘুরছিল। মায়ার কাপড় হাঁটুর কাছে তোলা, গায়ে মুখে ঘাম। কোমর ভাঁজ করে সামনে ঝুঁকে কাজ করছিল মায়া— কোমর আর পিঠের খানিকটা জায়গা থেকে কাপড় সরে গিয়ে সেখানটা খোলা। ওর পেছনে দাঁড়ানো সুরেনের কথা শুনতে পেল মায়া— বৌদি, তুমি একা একা থাক— তোমার কি কষ্ট।

নিজের অগোচরে মায়ার একটা সুখের অনুভূতি হয়। আজ কত বছর হয়ে গেল— ও পুরুষের ছোঁয়া পায়নি। সনাতনের অসুখ শুরু হবার আগে শেষ কবে ওদের শারীরিক মিলন হয়েছিল তা মায়ার এখন মনেই পড়ে না। শরীরের ভেতর থেকে উঠে আসা একটা ইচ্ছে মাথা চাড়া দিতে চায়— এক লহমার মধ্যে ওর মাথায় কয়েকটা চিন্তা খেলে যায়। ও কি সুরেনকে তার আশ মেটাতে দেবে? তাহলে সুরেন তো আবার আসতে থাকবে একই মতলব নিয়ে। মায়াও তো সুযোগ পাবে সুরেনের কাছ থেকে টাকা আদায় করবার— ওকে ভাল করে দুয়ে নেবার। রাত ফুরোলে রান্নার চাল কোথা থেকে আসবে সে চিন্তা আর করতে হবে না। কি করবে এখন মায়া? লাই দেবে কি ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠা ওর ভেতরে এই ইচ্ছেটাকে?

সুরেনের হাতের নাগাল থেকে সরে গেল মায়া। দু-হাতে গোবরজলের বালতি তুলে নিল। সুরেনের ওপর চেঁচাল, হতচ্ছাড়া আঁটকুড়ির ব্যাটা, বেরো আমার ঘর থেকে। নইলে এই গোবরজল তোর মাথায় ঢালব।

দৌড়ে উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল সুরেন। একবার গোবরজলের বালতি হাতে মায়ার দিকে তাকাল। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের বাড়ির দিকে চলে গেল।

আর আসেনি সুরেন। কিন্তু বাপকে কি বলেছে কে জানে? মায়া আর মাটি কাটার জন্যে ডাক পায় না। নগেনের বাড়ি গিয়ে দরবার করেছিল মায়া। দু হাতে ওর পা ছুঁয়ে সেই হাত কপালে ঠেকিয়েছিল। তারপর বলেছিল, বাবু, মাটি কাটার কাজ দাও। আমরা মা মেয়ে এক্কেবারে উপোষ করে আছি।

নগেন এক বড় জামবাটি ভর্তি মুড়ি গুড় দিয়ে খাচ্ছিল। সঙ্গে একটা বড় গেলাসে চা। চা শেষ হয়ে গেছে— গেলাসের কাচের ভেতর দিয়ে তলানিটুকু দেখা যাচ্ছে। একমুখ মুড়ি চিবোতে চিবোতে গুড়ের চাঙড়টায় একটা বড়সড় কামড় দিলে নগেন। তারপর ধীরে সুস্থে বাটির মুড়ি আর গুড় শেষ করল। দাঁতে আর মাড়িতে চিবোন মুড়ি আর গুড় আঠা হয়ে লেগে ছিল। ডান হাতের তর্জনি মুখের ভেতর ঢুকিয়ে সেই কাদা কাদা মুড়ি আর গুড় বার করে আনল নগেন। তারপর তর্জনি চুষে সেই কাদা খেয়ে নিয়ে খুব গম্ভীরভাবে বলল— এখন তো খাতাপত্রে তোমার নাম পাল্টাতে হবে। লিখতে হবে বেওয়া মায়া হালদার। কাগজ পাঠিয়েছি ওপর মহলে। নাম ঠিক হয়ে আসুক! তারপর দেখা যাবে।

একটু তাড়াতাড়ি কর না বাবু। ডাক্তারের লেখা ঐ কাগজ চেয়েছিলে— সে তো কবে তোমাকে দিয়েছি। এদিকে আমাদের তো হাঁড়ি চড়ছে না।

হবে হবে— খুব শান্ত মুখে বলে নগেন। সরকারী কাজ সময় লাগে। নাম ঠিক হয়ে এলেই তোমার পালা আসবে।

মায়া বাড়ির ভেতর গেল। গিন্নীমাকে ধরে যদি কিছু হয়। মহিলা স্নান করে নিজের সাজপাট করছিল। ঘরের লোহার আলমারির কপাটে একটা বড় আয়না লাগানো। তার সামনে দাঁড়িয়ে সিঁথিতে সিঁদুর দেবার পর কপালে একটা বড় করে সিঁদুরের টিপ পরছিল। মায়া ঘরে ঢুকতে সাহস পেল না। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলে ফেলল। গিন্নীমা বাবুকে একটু বলুক মায়াকে কাজ দিতে।

ঘরে পেল্লাই সাইজের খাট—মশারির ছত্রি লাগানো— মোটা গদি-তোষকের বিছানা। তার ওপর একটা লালপাড় গরদের শাড়ি পাট করে রাখা। মহিলা কপালে টিপ পরে এসে খাটের ওপর থেকে শাড়িটা তুলে নিল। মায়াকে বলল, দেখো বাছা, সরকারী কাজ পুরুষমানুষ জানবে ভাল। আমি মেয়েমানুষ— সেসবের কি কিছু জানি? এখন যাও। আজ একটু ব্যস্ত আছি। বাড়িতে পুজো— হাতে অনেক কাজ।

মহিলা মায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কপালের টিপের সিঁদুরের গুঁড়ো পড়ে নাকের ডগা লালচে, হাতে ধরা গরদের শাড়িটা। মহিলাকে প্রণাম করে মায়া ঘরে ফিরে এল। মাটি কাটার কাজ একটা আশ্বাস হয়ে ওর সামনে ঝুলে রইল।

সেদিন শেষরাত থেকে টানা বৃষ্টি। মায়া ঘর থেকে বেরোতে পারছিল না। মিশনে যাওয়ার দরকার— যদি দশ বিশ টাকা পাওয়া যায়। ঘরে একটাই ফুটিফাটা ছাতা— সেটা নিয়ে মেয়েটা ইস্কুল গেছে। ছাতাটা ওরই বেশি দরকার। ভিজলে পরে জ্বর আসতে পারে। আর তাহলেই তো ইস্কুল কামাই হবে। ইস্কুলের লাগোয়া মেয়েদের থাকার জায়গা তৈরীর জন্যে একটা চেষ্টা চরিত্র চলছে। কেলাসে ফেল হয় না— ইস্কুল কামাই করে না এরকম মেয়েরা হয়তো জায়গা পাবে সেখানে। চেষ্টা চালাচ্ছে ইস্কুলের হেড দিদিমণি। একটা দরখাস্তে অনেক মেয়েদের মা বাপের সই নিয়েছে সরকারের ঘরে পাঠাবে বলে। মায়াও টিপছাপ দিয়েছে তাতে। যদি সরকার ওখানে বিনে পয়সায় ওই ইস্কুলের মেয়েদের থাকতে খেতে দেয় তাহলে মায়া গিয়ে হেড দিদিমণির হাতে পায়ে ধরবে উত্তরাকে ওখানে জায়গা দেবার জন্যে।

একটু বেলা বাড়তে বিষ্টিটা ধরে গেল। দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল মায়া। কিন্তু তাড়াতাড়ি চলা যায় না। গাঁয়ের পথঘাট বিষ্টিতে কাদায় কাদা। পায়ের রবারের চপ্পল আটকে আটকে যেতে চায়— কাপড়ে কাদা ছিটে নোংরা হয়। তবুও জোরেই হাঁটল মায়া— যতটা পারে।

মিশনের কাছে পৌঁছে একটা দল ধরবার জন্যে ও এদিক-ওদিক তাকায়— কাদের কাছে যাবে ভাববার চেষ্টা করে। হঠাৎ ও একটু চমকে যায়— সেই তিন বোন নয়? হ্যাঁ, ওরাই তো। সঙ্গে একজন নতুন মহিলা। প্রায় দৌড়ে ওদের কাছে যায় মায়া। চটপট ওদের পা ছোঁয়। দিদি কেমন আছো? ভাল আছো তো?

ওরা হাসে। প্রশয়ের হাসি। বড়জন বলে— আমরা তো তোমাকেই খুঁজছিলাম। চলো আমাদের সঙ্গে।

তারপর চতুর্থ জনকে দেখিয়ে বলল— আমাদের বন্ধু। এই প্রথম এখানে এসেছে। সেজন্যে আবার সবকিছু ভাল করে দেখাও আমাদের।

মন দিয়ে আবার সব কিছু দেখায় মায়া। ফেরার পর এবারেও একশ টাকা জোটে ওর কপালে। বড়জন একটা প্ল্যাস্টিকের হাতে ঝোলান ব্যাগ মায়ার হাতে ধরিয়ে দেয়। মায়া অবাক হয়— বোকার মত তাকায় মহিলার দিকে।

মহিলা বুঝিয়ে দেয়— তোমার মেয়ের জন্যে জামা রয়েছে এর ভেতর। বাড়ি গিয়ে মেয়েকে পরিও।

মায়া খুশিতে টগবগ করে ওঠে। জামাগুলো বার করে হাতে নিয়ে দেখে। সেগুলো আবার ব্যাগের ভেতর রেখে ওদের চারজনকেই প্রণাম করে। বলে, দিদি, তোমরা আবার এসো কিন্তু।

ফেরার পথে শান্তিতে হাঁটছিল মায়া। মনে ভারী আনন্দ। আজকের দিনটা বড় ভাল।

আবার টিপ টিপ করে বিষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশ একেবারে ঘোলা। মেঘ ছিঁড়ে রোদ বেরোবে তা আর মনে হচ্ছে না। মাইকের আওয়াজে মায়ার নজর গেল সামনে— রাস্তার পাশে। সেখানে ছেলেদের কেলাবে ভাদুপূজো হচ্ছে। রং চং করা মাটির প্রতিমা— ত্রিপলের চালার নিচে পুজো পাচ্ছে। ছেলেরা সব গাড়ি-মোটরের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়। গাড়ি ঘোড়া দেখলেই হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিয়ে ছাপানো বিলবই থেকে রসিদ কেটে দেয়। এক এক পুজোয় এক এক রকম দর। ভাদুতে লরীর থেকে নেয় দশ আর ছোট গাড়ির থেকে পাঁচ। তবে সরকারী গাড়ি হলে পুরো ছাড়। ছেলেরা বাঁশের খোঁটায় মাইক লাগিয়েছে। খুব জোরে সিনেমার গান চলছে। গাঁয়ের কয়েকটা মেয়েও জুটেছে ওদের সঙ্গে— খুব হাসাহাসি আড্ডা হচ্ছে। কানুর মায়ের নাতনিটা উত্তরারই বয়েসী— মাথার ওপর দু-হাত তুলে তুড়ি দিয়ে দিয়ে গানের সঙ্গে নাচছে। দুটো ছেলে কাঠের বেঞ্চির ওপর হাত ঠুকে ঠুকে তাল দিচ্ছে। কালো রঙের মেয়েটা খুব সেজেছে। গালে, ঠোঁটে লাল রং— ডগডগে লাল শাড়ি। ওর গায়ের জামাও লাল। মেয়েটার জামা দেখে মায়ার মনে পড়ল— ও নিজেও আজ কয়েকটা জামা পেয়েছে। পুরনো— কিন্তু সুন্দর দেখতে। উত্তরার গায়ে হয়তো একটু ঢিলে হবে। তা হোক। কাজ ভালই চলে যাবে।

নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলল মায়া। ছেলেদের কেলাব পেছনে পড়েছে— গানের আওয়াজে আস্তে আস্তে কমে আসছে। ওর মাথায় এখন একটা ভাবনা— এই জামাগুলো কমাস আগে পাওয়া গেলে হয়তো আজ ঘরের মানুষটা ঘরেই থাকত।



(পরবাস-৬৭, জুন ২০১৭)