ISSN 1563-8685




বিষাদ, ক্ষুব্ধতা ও সমর সেন



(১৯১৬ - ১৯৮৭)

মার সুদীর্ঘ জীবনের বাঁকে বাঁকে এমনভাবে তিনি জড়িয়ে আছেন যে সমর সেনের শতবার্ষিকীতে অতীতের দিকে তাকালে মন অনিবার্য বিষাদে আক্রান্ত হয়। তাঁর বহিরাঙ্গিক জীবনে নাটকীয়তা সযত্নে বর্জিত হলেও জীবনে নাটকীয়তা কম ছিল না। পিতামহ ছিলেন স্বনামধন্য দীনেশচন্দ্র সেন, বারো বছর বয়সে মায়ের অকালমৃত্যু, পনের বছর বয়সে অধ্যাপক পিতার দ্বিতীয় বিবাহ, সতেরো বছর বয়সেই আন্তর্বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা শ্রীহর্ষে প্রথম ছাপা কবিতা, পরের বছরে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে পরিচয় আর তার পরের বছরেই 'কবিতা' পত্রিকায় বুদ্ধদেব, প্রেমেন্দ্রের সঙ্গে সম্পাদকীয় পদ প্রাপ্তি। খোদ রবীন্দ্রনাথ প্রথম সংখ্যায় তাঁর কবিতা পড়েই চিঠিতে লিখছেন — 'এঁর লেখা ট্যাঁকসই হবে বলেই বোধ হচ্ছে'। ১৯৩৬-এ লন্ডনে TLS-এ এডোয়ার্ড টমসন আধুনিক ভারতীয় কবিতা নিয়ে বলতে গিয়ে সমর সেনের দুটি কবিতার অনুবাদ ও প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এই সব নাটকীয় অগ্রসরণ নিয়েও বি. এ. অনার্স ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম, পদক ও স্কলারশিপ লাভ। ১৯৩৭-এই বেরুল 'কয়েকটি কবিতা' যা উৎসর্গ করা হল ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফফর আহমেদকে। বাড়িতে অবস্থান ছিল বঙ্কিম মুখার্জি, রাধারমণ মিত্র, মাঝে মাঝে মুজফফর আহমেদ এবং আরও কোনো কোনো বামপন্থী ব্যক্তিত্বের। অথচ সমরবাবু কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হলেন না, কোনো দিনও পার্টির নানা ভগ্নতাতেও তাঁকে সদস্য হিসেবে পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৩৭-এ নির্বাচনী প্রচারে বঙ্কিমবাবুর সঙ্গে আসানসোল যান। ১৯৩৮-এ এম. এ. ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। এ বছরই কামাক্ষীপ্রসাদ, বুদ্ধদেব, প্রতিভা প্রভৃতির সঙ্গে রবীন্দ্র সন্দর্শনে শান্তিনিকেতন যাত্রা। সে-বছর নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সম্মেলনের ৩য় অধিবেশনে পড়েন In Defence of the Decadents--যা নিয়ে বিতর্ক চলে বহুকাল। 'গ্রহণ' বেরুল ১৯৪০-এ, উৎসর্গ করা হল বুদ্ধদেব, রাধারমণ ও বিষ্ণু দে কে। একজন অ্যান্টি ও দুজন প্রো-কমিউনিস্ট। আবু সয়ীদ 'আধুনিক বাঙলা কবিতা'র ভূমিকায় লিখেছেন — 'সমর সেনের তো রীতিমত একটি স্কুল গড়ে উঠেছে।' কবিতাপ্রিয় স্বদেশবাসী, বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী আলোচকরা কেউই তাঁর হাজিরাকে অস্বীকার করতে পারেন নি। 'নানাকথা' (১৯৪২), 'খোলা চিঠি' (১৯৪৩), 'তিনপুরুষ' (১৯৪৪) বেরুল, স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাব এডিটর পদে চাকরি (১৯৪৯) তার আগে বিজ্ঞাপন অফিসে দিন সাতেক (১৯৪৪), দিল্লীর অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে কাজ (১৯৪৪), কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে চাকরি (১৯৪০), দিল্লীর কমার্শিয়াল কলেজে চাকরি (১৯৪০), বিয়ে (১৯৪১) — গোড়া থেকেই একটা অস্থিরতা অব্যাহত। এবার বড়ো লাফ--অনুবাদকের চাকরি নিয়ে মস্কো যাত্রা (১৯৫৭), দেশে ফেরা, বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ (১৯৬১), হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড-এ যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগদান (১৯৬২), তারপর 'নাউ' পত্রিকার সম্পাদক (১৯৬৪) পদ ত্যাগ ক'রে ফ্রন্টিয়ার সাপ্তাহিক-এ সম্পাদনার দায়িত্ব (১৯৬৮) — পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয়ই এই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের নাটকীয় অস্থিরতার বিস্তর আভাস পেয়ে গেছেন, তাঁর পরিচিতবর্গের লেখা পড়লে এই বুদ্ধিজীবীর সত্ত্বা যে-কোনো পাঠককে, বিস্মিত, ব্যথিত করবেই। একই সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর ভূমিকার জন্য আনন্দিত একথা না বললেও অন্যায় হবে।

'সমর সেন-এর প্রায় কৃতিত্ব এইখানে যে তিনি তাঁর এই লেখাটির অনেক দূর পর্যন্ত একটি সেয়ানা চাল রাখতে পেরেছেন যাতে তাঁর একটু বখে যাওয়া একটু দায়িত্বজ্ঞানহীন, একটু 'ডিলাটান্ট' ব্যক্তিত্ব বেশ ধরা পড়ে' .... 'বাবুবৃত্তান্ত' গ্রন্থ সমালোচনা, দেবেশ রায়, পরিচয়, নভেম্বর, ১৯৭৯।
দেবেশ রায়ের এই মন্তব্যর কয়েকটি অংশ একটু খেয়াল করার মতো। 'বাবু বৃত্তান্ত' এর কৃতিত্বকে তিনি 'প্রায়' বলেন, যা সি. পি. আই উদারধর্মিতার উদাহরণ। এই আত্মজৈবনিক বইটিতে কোথায় 'সেয়ানা চাল' তা বোঝাতে অন্ততঃ একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া দরকার ছিল। দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তিত্ব — যতদূর জানি একমাত্র নিজ পরিবারের প্রতি, আর কিছু? জরুরী অবস্থায় ইন্দিরা রাজকে সমর্থন, প্রাক তৃণমূল রাজত্বে বামফ্রন্টকে তথা সি. পি. এম.-কে সমর্থন, মার্কসবাদী সংস্কৃতিতত্ত্ব প্রসঙ্গে নানা অমার্কসীয় কথাবার্তা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি প্রসঙ্গে যে-পাত্রে রাখা যায় তার আকার নেওয়া প্রভৃতিতে যে 'সেয়ানা চাল' আমরা পাই তা সমরবাবুর ছিল বলে জানা যায় না। 'বখে যাওয়া'র উল্লেখ সমর সেনের কবিতায় আছে ঠিকই, কিন্তু 'বখে যাওয়া' বলতে যা বোঝায় তা সমর সেনের জীবন বৃত্তান্ত পড়লে, তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিকথা পড়লে ধারণা হয় না। সব ছিল হুল্লোড়, নির্বিষ মজা। 'ডিলাটান্ট' কথার অর্থ চারুকলার প্রতি ভাষা ভাষা অনুরাগ, পল্লবগ্রাহিতা। সমরবাবুর বাবুবৃত্তান্ত পড়লে, তাঁর ২/৪টি রিভিউ পড়লে এই পল্লবগ্রাহিতার পরিচয় পাওয়া যায় না, তবে তাঁর নিজস্ব মতামত (যা বিশদ ব্যাখ্যা ছাড়া) অবশ্যই ধরা পড়ে। সমর সেন বুদ্ধদেব বসুকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন (২৪/৫/৪১) 'আমাদের বখাটে generation-এর শ্রেষ্ঠ কবি এলিয়ট' কিংবা Recent Bengali Poetry প্রবন্ধে বলেন — '...most of the moderns are indebted to English poets (১ম বিশ্বযুদ্ধোত্তর) .... Eliot is perhaps the most important of them ....' এলিয়ট, সমর, দেবেশ এরা কেউই বখাটে, বখে যাওয়া নন, বখে যাওয়ার পরিচয় হাংরি, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবিদের কারো কারো মধ্যে অবশ্য পাওয়া যায়। 'পল্লবগ্রাহিতা' প্রসঙ্গে বলা যায়, বক্তব্য বিশদকরণে সমরবাবু পরাঙ্মুখ ছিলেন। স্মরণ রাখা দরকার বি. এ. ও এম. এ. দুটিতেই তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। এই কৃতিত্ব বাঘা বাঘা শিক্ষকরা কোনো পল্লবগ্রাহিকে দিত কি? আমার মনে হয় না। আসলে আদর্শগত ভিন্ন লেখকের প্রতি এ এক 'সেয়ানা চাল'।

সি. পি. আই. ক্যাম্পের আর এক বিখ্যাত লেখক অসীম রায়, যিনি বলেন —

'সমর সেন তাঁর গদ্য কবিতায় এক নবীন সম্ভার এনেছিলেন কিন্তু তার পরিসর বড্ড ছোট্ট। আর তাঁর স্মার্ট ব্রিলিয়ান্ট ব্যক্তিত্ব বোধহয় দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যকর্মের পরিপন্থী।' (জীবন-মৃত্যু, ২য় পর্ব, এবং জলার্ক, জুলাই-ডিসেম্বর ২০০৭-২০০৮)
সমর সেনের কবিতা পড়লে দেখা যাবে তাঁর কবিতার পরিসর, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ মিলিয়ে মোটেই বড্ড ছোট্ট নয়। সমর সেনের স্বল্পস্থায়ী স্বেচ্ছাসিদ্ধান্ত নেওয়া কাব্যজীবন দীর্ঘস্থায়ী কি না এ বিষয়ে সবাই একমত নন, এতদিন পরও নয়।


এবার আসা যাক আমার কথার দ্বিতীয় পর্বে। ১৯৫৪তে সিগনেট থেকে বেরলো 'সমর সেনের কবিতা' যখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৮। এর পর বাজি ধরে দু'-একটি খুচরো কবিতা লিখলেও কবিতার ব্যাপারটা আর ছিল না। ৩৮ বছর লেখক জীবন এমন কিছু নয়, কিন্তু সমরবাবু কবিতা লেখাই ছেড়ে দিলেন, তারপর থেকেই কবিতা সম্পর্কে তাঁর একটা উদাসীনতা। সুধীন্দ্রনাথও একসময় কবিতা ছেড়েছিলেন কিন্তু সমর সেনের এই কবিতাকে ছুটি দেওয়া চিরতরে বিস্ময়কর ব্যাপার। যে দেশে মৃত্যু এসে কলম ছিনিয়ে না নিলে কোনো কবিই কবিতা লেখা ছাড়ে না, রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রয়াণের ঘন্টা দুয়েক আগেও কবিতা রচনা করেছিলেন, সেখানে সমর সেনের এই নৈঃশব্দ্য রীতিমত নাটকীয় বলেই মনে হয়। সমর সেনের কবিতা বইটির শেষ কবিতা — 'জন্মদিনে'র প্রায় শেষে একটি পঙ্‌ক্তি আছে, স্বীকারোক্তির ঢং-এ। তার আগে বলে নেন সমুদ্রের গান আর শোনেন না, সাঁওতাল পরগণার লাল মাটি এবং আড্ডার মৌতাত, বালিগঞ্জী লপেটা চাল, ক্লাইভ স্ট্রিটের হীরক প্রলাপ সব ভুলে গেছেন। আর তারপরই সেই মারাত্মক স্বীকারোক্তি — 'রোমান্টিক ব্যাধি আর রূপান্তরিত হয় না কবিতায়'। যাঁরা কবিতা লেখেন, যাঁরা কবিতায় মশগুল থাকতে ভালোবাসেন তাঁরা জানেন রোমান্টিক ব্যাধি না থাকলে কবিতা সজীব হয়ে ওঠে না, গ্যেটে বলেছিলেন একটু ঘুরিয়ে — কবিতার সতেজতা থাকে তরুণ বয়সেই। নব্য রোমান্টিক ইংরেজি কবিতার ঐতিহ্য সম্পর্কে যাঁদের পরিচয় আছে তাঁরা সবাই জানেন রোমান্টিকতার কয়েকটি লক্ষণ হল — সুদূরাভিসার, আত্মপ্রকাশের ব্যাকুলতা, অনন্তের বোধ, কখনও অতীন্দ্রিয় অনুভবের নিবিড় স্পর্শ, হৃদয়ানুভবের আত্মমগ্নতা। প্রবল আকাঙ্খা ও বিষাদবোধ ইত্যাদি।

১৯৩৪-৩৭-৪০ এই দুই পর্বের কবিতায় আমরা দেখব একাকীত্বের তীব্রতা। বারে বারে সাঁওতাল পরগণার গন্ধমাতাল প্রকৃতি, আর শহর জীবনে চলাফেরায় আছে ক্লান্তি, ধূসরতা, অন্ধকার।

কয়েকটি উদাহরণ দিই —

ক)
হলুদ রঙের চাঁদ রক্তে ম্লান হল,
তাই আজ পৃথিবীতে স্তব্ধতা এল,
বৃষ্টির আগে শব্দহীন গাছে যে কোমল, সবুজ স্তব্ধতা আসে।

খ)
দূরে পশ্চিমে
বিপুল আসন্ন মেঘে অন্ধকার স্তব্ধ নদী।

গ)
নিঃসঙ্গ বট
যেন পূর্বপুরুষের স্তব্ধ প্রেত

ঘ)
উদভ্রান্ত প্রাণ খোঁজে তিব্বতী স্তব্ধতা

ঙ)
বর্ষার সিক্ত পশুর মতো স্তব্ধ বসে
বক্রদেহ নায়কের দল

চ)
দুনিয়াদারীর দুর্দিন, বাজার অন্ধকার
পথে জমকালো স্তব্ধতা।

সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিকই ধরেছেন এ স্তব্ধতাবোধ বাংলা কবিতায় স্বভাবতই নতুন। আমি শুধু একটি কথা যোগ করতে চাই। এই স্তব্ধতা নানাপ্রকারের। প্রথম চারটি উদাহরণে স্তব্ধতা পরিবর্তমানতার গতিস্রোতে থমকে যাওয়া, শেষেরটা সম্ভবতঃ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্তব্ধতার ইঙ্গিত। ঝড়ের কথা আছে অনেক জায়গায়, স্তব্ধতা তার পূর্বাভাস। সমরবাবুর প্রথম পর্যায়ের অনেক কবিতায় ধূসরতার কথা আছে। যেমন —

ক)
ধূসর সন্ধ্যায় বাইরে আসি
বাতাসে ফুলের গন্ধ

খ)
অন্ধকার ধূসর, সাপের মতো মসৃণ

গ)
রাত্রে ধূসর সমুদ্র থেকে হাহাকার আসে

ঘ)
তোমার ধূসর জীবন হতে এস

ঙ)
ভুলে যাওয়ার হাওয়া এল ধূসর পথ বেয়ে

চ)
পাহাড়ের ধূসর স্তব্ধতায় শান্ত আমি

ছ)
হে শহর হে ধূসর শহর!

এই সব উদাহরণে পাহাড়ের ধূসর স্তব্ধতা যদি ইমপ্রেশনিস্টিক হয় অন্যত্র মেটাফরিকাল। জীবনানন্দের সঙ্গে শুধু এইটুকু মিল যে এই দুই কবিই ধূসরতা-উত্তীর্ণ হতে চান, কেউ প্রেমে, কেউ নতুন পৃথিবীর, ইস্পাত দিনের স্বপ্নে। আর আছে বারংবার অন্ধকারের কথা —

ক)
বিশাল অন্ধকারে শুধু একটি তারা কাঁপে

খ)
ঘনায়মান অন্ধকারে

গ)
অন্ধকারের মতো সুন্দর,

ঘ)
অন্ধকার ধূসর, সাপের মতো মসৃণ

ঙ)
পথে নিঃশব্দ অন্ধকার উঠেছে ঘন হয়ে

চ)
মাঝে মাঝে আগুন জ্বলছে
অন্ধকার আকাশের বনে

ছ)
আমার দিনের জীবনে তোমার সেই দুঃস্বপ্ন
এনেছে পারহীন অন্ধকার।

জ)
স্মৃতির দিগন্তে নেমে এল গভীর অন্ধকার

ঝ)
হিংস্র পশুর মতো অন্ধকার এল

ঞ)
এই অন্ধকার আমাকে কি ক'রে ছোঁবে?
আমার অন্ধকারে আমি
নির্জন দ্বীপের মতো সুদূর, নিঃশব্দ

ট)
গহন অন্ধকারে দীপ্ত সূর্য যখন
হানা দেয় ক্লান্ত রাত্রিকে

ঠ)
অন্ধকারের স্তব্ধতা .....
অন্ধকারের দীঘিতে সে শব্দ পাথরের মতো

ড)
এখানে অসহ্য, নিবিড় অন্ধকারে

ঢ)
অন্ধকারের নিঃশব্দ নদীতে যখন ভাটা এল

ন)
অন্ধকারের ভারে আকাশ যখন নিঃশব্দ?

পাঠক, লক্ষ করবেন অন্ধকারের ব্যাপকতা এই কবির কবিতায়। তাদের চোখে না পড়ে পারে না। স্তব্ধতা, ধূসরতা, অন্ধকার, ক্লান্তি সব কটিই বৈপরীত্যে স্থাপিত। অন্ধকার কখনও দৃষ্টিগ্রাহ্য, কখনও বোধোদ্রেককারী, কখনও তা জঙ্গম, কখনও তা অসহ্য, কখনও তা ব্যক্তিক, অন্যত্র বৈশ্বিক। সমর সেনের ইমেজ ব্যবহারের নতুনত্ব সমসাময়িক বাংলা কবিতার প্রেক্ষিতে চোখে পড়ার মতো। আমার বার বার মনে পড়ছে ১৯৩৮-এ লেখা ও পড়া In defence of the Decadents প্রবন্ধটির কথা। ওই প্রবন্ধটি যেন প্রথম পর্যায়ের কবিতার মাধ্যমে তাত্ত্বিকতাকে justify করার চেষ্টা। সমরবাবু পূর্বোক্ত প্রবন্ধে বলেছিলেন — Consciousness of decay is certainly a power. এটাও লক্ষণীয় অন্ধকারে মাটির পৃথিবীতে আসে সবুজপ্রাণ, অন্ধকার সাপের মতো দংশন উদ্যত হলেও বাতাসে ফুলের গন্ধ, মনের সমুদ্রে অন্তহীন ঢেউ, সূর্যাস্ত অশান্ত, একটা ঝড় নেমে আসে বিশাল গভীর অন্ধকারে, প্রভাতের রক্তিম আশা কম্পমান, শীগগিরই সবুজ উদ্দাম বসন্ত নামবে — এক উত্তরণের, অতিক্রান্তির বিশ্ব, যদিও ব্যক্তিজীবনে কামনার তীব্রতা, অচরিতার্থতার জ্বালা, হতাশা, মধ্যবিত্ত ব্যক্তিজীবনে, এক নৈরাশ্য। প্রেমহীনতার বোধ তীব্র, ইস্পাতের মতো আকাশ, ইস্পাতের কঠিন পথ, আর হিংস্র পশুর মতো বাসনার প্রহার। মরুভূমির উপমান বারে বারে — শূন্য মরুভূমি জ্বলে, সময়ের শূন্য মরুভূমি জ্বলে, বণিক সভ্যতার শূন্য মরুভূমি যেন তা যুগের দ্যোতক, এলিয়ট, যতীন্দ্র সেনগুপ্ত, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে ও অন্যান্যদের কাব্য ভাবনায়।

এ পর্যায়ে আমরা পাব বারংবার ঊর্বশীর কথা, লেডা, জুপিটার, পাণ্ডু, অগ্নিবর্ণ — চকিত উদ্ভাস, অবশ্য বিষ্ণু দের মতো ব্যাপক নয়। হলুদ রঙ, সাপের প্রসঙ্গ এই পর্যায়ে সমর সেনের কবিতায় ভর করে আসে। ব্যক্তিগত উদ্বেগ, ব্যক্তিগত উচ্চারণ এ সময় বড়ো বেশী, গণ উচ্চারণ পরবর্তী কোনো পর্যায়ে চোখে পড়বে।

১৯৩৭ থেকে ১৯৪০-এও 'ভদ্রমহিলা দেখার তীব্র ব্যাকুলতা', নারী ধর্ষণ, লিবিডো লিপ্ত চঞ্চল চিদাকাশ এড়াতে পারেন না। কিন্তু বিশ্বাসের ভূমিতে, অধীত উপলব্ধিতে— বিশ্বাস জন্মায়— বিপ্লবের জন্ম, জটিল অন্ধকার জীর্ণ চূর্ণ ভস্ম হবার কথা, পৃথিবীতে আকাশগঙ্গা নামার কথা। এ যেন ব্যক্তিগত আচ্ছন্নতা, সীমাবদ্ধতা পার হয়ে, বণিকের পিঙ্গল প্রহার অতিক্রম করে অনিবার্য বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রতি বিশ্বাস। ঘরে বসা নিষ্ফল দিন কাটানো বুদ্ধিজীবীর ভবিতব্য মুক্তিহীন, জয়াশাহীন ভবিষ্যৎ শুধু লিবিডোর অভিশাপ, কার্নিভাল, ঝড়কে বরণ করতে না পারার ব্যর্থতা। প্রেমে অবিশ্বাস বোধকরি বোধের স্থায়ী দুর্ভাবনা যা বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রে নেই। মধ্যবিত্ত জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বোঝেন বর্তমান মুক্তকচ্ছ ভবিষ্যৎ হোঁচটে ভরা, আত্মদংশনের এমন তীব্রতা তাঁর সমসাময়িকদের কারো মধ্যে আর নেই। আত্মম্ভরী গান, পলায়নজীবী মধ্যবিত্ত জীবন, স্বার্থপর আত্মচর্চা, সবার উপরে আমিই সত্য, বারে বারে কবি তাঁর সমশ্রেণীর জীবনে দৃষ্টি দেন। বিষ্ণু দে বলেছিলেন — কামনার টানে সংহত গ্লেসিয়ারের কথা, সমর বলেন — চারধারে অদৃশ্য ধ্বংসের গ্লেসিয়ারের কথা।

ধুর্জটিপ্রসাদ সমর সেনের কবিতায় লক্ষ করেছিলেন newness of their mood and content, তবে ইউরোপে তা ইতিপূর্বেই এসেছিল। নাগরিক আবহকে সমরবাবু বারংবার ধূসর মনে করেন যেখানে 'অন্ধকার ঝুলছে শূকরের চামড়ার মতো', এবং 'সন্ধ্যা নামল শীতের শকুনের মতো।' Animal imageries আসে বারংবার। 'ঘন মেঘ জমে আছে / শীতের অজগরের মতো' অথবা 'বিষাক্ত সাপের মতো আমার রক্তে / তোমাকে পাবার বাসনা' অথবা এপ্রিলের বসন্ত 'উজ্জ্বল ক্ষুধিত জাগুয়ার যেন'। অথবা 'নিঃসঙ্গ পশুর মতো রাত্রি আসে' বা 'রাত্রে চাঁদের আলোয় শূন্য মরুভূমি জ্বলে / বাঘের চোখের মতো'। এই পশুর আবহ মাঝে মাঝে জীবনানন্দকে মনে করিয়ে দেয়। ২য় কাব্যগ্রন্থ 'গ্রহণ' (১৯৪০) স্পষ্টত রাহুগ্রস্ত দেশকাল পটের ছবি। আর এখানে আসে রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে বিস্তর ব্যবহার। রবীন্দ্র পঙ্‌ক্তি বা প্রসঙ্গকে ভিন্নার্থে ব্যবহারে বিষ্ণু দে-ও কম যান না। সমর সেনের ইতিহাস সচেতনতার কথা অনেকেই বলেছেন--কখনও তা স্পষ্ট, প্রত্যক্ষ, কখনও ইঙ্গিতগর্ভ। যেমন —

ক)
আকাশ গঙ্গা আবার পৃথিবীতে নামবে

খ)
নবাবী আমল শুধু সুর্যাস্তের সোনা

গ)
বয়ঃসন্ধির সময় / মহাত্মাজীর আন্দোলন শুরু হল / লবণ আইন ভাঙে, দলে দলে জেলে যায় / মাঝে মাঝে বিপ্লবী বোমা ফাটে / হাতে হাতকড়া, নানাবিধ রদ্দা, চরম শাস্তি / বন্ধ সংবাদপত্র, রাস্তায় নিষিদ্ধ পোস্টার / জার্মানরা বুঝি বা বঙ্গোপসাগরে এল।

ঘ)
ভারতের ভাগ্যাকাশে / অন্ধকার স্তরে স্তরে জানি না কী ঝড় ঘনায়।

ঙ)
রক্ত আশ্বিনে রুষ বিপ্লবের পর / মধ্য ইউরোপে / জারজ সন্তানকে সঙ্গোপনে রসদ জোগায় / মাতা তার, দাঁতচাপা বৃদ্ধা গণিকা / পশ্চিমী গণতন্ত্র নাম

চ)
বিধ্বস্ত মাটিতে আনে ট্রাক্টরের দিন / জোসেফ স্টালিন।

চল্লিশের তরঙ্গক্ষুব্ধ আবহে এরকম প্রসঙ্গায়ন খুব স্বাভাবিক। সমর সেন, একসময়, কবিতায় বলেছিলেন — 'প্রেম ও পলিটিক্সের বিচিত্র গতি / হৃদয় বিষাদে ভরায়।' তাঁর কবিতা এটা সেটা পড়তে পড়তে বোঝা যায় ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম সম্পর্কে তাঁর মধ্যে একটা বিবমিষা, বিদ্রুপ, আকুতি, নৈরাশ্য এ সবই আছে। জীবনানন্দ অন্ততঃ কবিতায়, বিষ্ণু দেও কবিতায় প্রেমে আশ্রয় খুঁজেছিলেন, বিষ্ণু দের এলিয়টপ্রীতি ও পাশ্চাত্যপ্রীতি সমন্বিত হয়েছিল রবীন্দ্রপ্রীতির সঙ্গে। পলিটিকস নিয়ে সময়ের বিষাদ সম্ভবতঃ ভারতীয় বামপন্থী বন্ধু ও পরিচিত জনের কার্যকলাপে; এদিক থেকে আবার বিষ্ণু দের সঙ্গে তাঁর মিল আছে। তবে বিষ্ণু দে সাবধানী কবি, কখনো ঝুঁকেছেন, কখনো দূরে সরেছেন, সমরের মতো নব্যবলশেভিক বন্ধুদের প্রতি তির্যক মন্তব্য করেন নি। 'শুধু জানি, শূন্য এ দেশ' — সমরের এ উপলব্ধি দেশকে ঘোরাফেরায় জেনে বুঝে লক্ষ না করার ফল। সমর সেন ও বিষ্ণু দে দুজনেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সখাদের নিয়েই কাটিয়েছেন। বাঙালি শুধুই মীরজাফরী অতীত, মেকলের বিষবৃক্ষের ফল — তা তো সত্য নয়। সরল, বিশ্বাসযোগ্য, দেশদরদী, আত্মত্যাগী বাঙালিও তো বিরলদৃষ্ট ছিল না। সেই সন্ধানে এমনকি নিরাপদ অনুসন্ধানে তৎপর হলেই নিজেকে আর 'বৃন্তচ্যুত ব্যষ্টির বিচ্ছিন্ন সত্তা' মনে হত না। সমর সেন বলেন — 'বজ্র বাজে মধ্য আকাশে / বসন্ত আসন্ন' এবং 'এ করাল সংক্রান্তি নিঃসন্দেহে পার হব'। সেই তিনিই বলেন — 'অস্পষ্ট কানাকানি শুনি / এসেছি অন্ধকার থেকে, যাত্রা শেষ হবে অন্ধকারে।' 'খোলা চিঠি', 'বসন্ত' প্রভৃতি কবিতায় তেড়েফুঁড়ে আশাবাদের কথা বলেছেন, এমনকি ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা কিংবা জনযুদ্ধ নীতির কথা বলেছেন কিন্তু মন মেঘাবৃত হয়ে যায়। 'ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ / আমাদের চেতনায় পড়ে' — কবিতাকে বিদায় দেবার পর যে সাংবাদিক সমর সেনকে আমরা নাউ (Now) বা ফ্রন্টিয়ারে পাই তার মধ্যে মেঘাবৃত চেতনার অবিচলত্ব চোখে পড়ে না, তাঁর ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতিস্বীকার, আদর্শের জন্য ভালো চাকরি ত্যাগ, সেকেন্ড ক্লাস ট্রামে যাতায়াত, বিজ্ঞাপনের জন্য ক্ষমতাশালী বন্ধুদের দ্বারস্থ না হওয়া প্রভৃতিতে তা মেলে না। যদি রোমান্টিক ব্যাধি আর লালিত না হওয়ার জন্য দীর্ঘশ্বাস উচ্চারিত হয়, তাহলে বামপন্থী পত্রিকা করে দেশের একাংশের চৈতন্যোদয়ের চেষ্টা সেটাও কি আর এক রোমান্টিকতা নয়! হয়তো নিজেকে, নিজের সত্তাকে টিঁকিয়ে রাখার এ আর এক ভিন্নতা। 'ঘুণধরা আমাদের হাড় / শ্রেণী ব্যাগে তবু কিছু / আশা আছে বাঁচবার' এবং দেশের শ্রমজীবী শ্রেণীর সঙ্গে দোস্তি 'পরমাগতি' বলে মানেন যদি তাহলে আবার হতাশার ব্যাখ্যা মেলে না। আসলে দোলাচলতা, আশা ও নিরাশার দ্বন্দ্ব সমরবাবুকে চিরকালই জ্বালিয়েছে। হতাশার মাত্রা তীব্র হলেই, সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার দেশী-বিদেশী দৃষ্টান্তে বীতশ্রদ্ধ হয়েই সরে গেলেন কবিতা রচনার জগৎ থেকে, আত্মহনন-ইচ্ছু আশ্চর্য ক্ষমতাবান মানুষের মতো। 'আমরা ক্রমশঃ ডুবি স্বখাত সলিলে' — এই ছিল 'জন্মদিনে' কবিতার পঙ্‌ক্তি — নাউ ও ফ্রন্টিয়ারের সম্পাদকের নির্ভীক পথচলা একেবারে বিপরীত আচরণের স্মারক। ভাগ্যিস তিনি স্বখাত সলিলে ডুবে যান নি, এটাই আমাদের সান্ত্বনা।

ক)
জেনেছি জনগণ বর্বর / আত্মচিন্তাই পরমচর্চা

খ)
তথাপি বামপন্থী পত্রিকায় / আসন্ন বিপ্লবের গান অবশ্য উচিত

গ)
আজকাল ঘরে ঘরে সমাজধার্মিক অনেক, / মুখে সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার বুলি / মনে রোমান্টিক বুলবুলের অবিরত গান

ঘ)
কিন্তু আগামী কাল আসুক ঘর-ফিরতি মজুরের গান / ...... শতাব্দীর যন্ত্রণার পর / নতুন দিন আসুক সভ্যতার পরম চিত্তশুদ্ধিতে।

ঙ)
লেনিন, স্ট্যালিন, জুখভ্‌ ও গোর্কি / তাদের আমরা চিনি। / কিন্তু বুঝি না তাকে, / দুধ ও তামাকে সমান আগ্রহ যার / দুনৌকোর যাত্রী এই বাঙালী কবিকে / বুঝি না নিজেকে।

এইরকম উদাহরণ আরও আছে কবিতা সংকলনটিতে। এ তীব্র সমালোচনা আমি ও আমরা দু পক্ষের প্রতিই প্রযোজ্য। স্বভাবতই এই শাণিত সমালোচনা দুনৌকোর যাত্রী বাঙালি কবিদের পছন্দ হবার নয়। কবি নিজেও আসন্ন বসন্তের আগমনের ব্যাপারে বিশ্বাসী, কিন্তু সে বিশ্বাসকে ধরে রাখতে পারেন না, সঙ্গদোষে। তিনি বলেছেন — 'আমার মানস পৃথিবীতে / বিরোধের বীজ পুঁতি' কিংবা 'বিপরীত মতামতে ধাঁধাঁ লাগে।' কোনো কিছু গোপন করেননি, নিজের সম্পর্কে, স্বশ্রেণীর বাঙালি বামপন্থী বন্ধু বান্ধবদের সম্পর্কেও। এই বিরোধ বা বৈপরীত্য সহ্য করতে করতে একসময় কবিতা লেখাই ছেড়ে দেবার ভাবনা। এমনটাই মনে হয়। সাংবাদিক জীবন নবজন্মের সূচনা আনে, নবজন্মের একটা বিরল নিরীক্ষা চালান। সমর সেন সেজন্যই একাংশের কাছে বন্দ্যনীয়, যদিও বাংলা কবিতা কলরোলে উল্লাসের দামামা বাজানোর মধ্যে তিনি পাত্তা পাননা। যাবতীয় ছদ্মবামপন্থী বুদ্ধিজীবিতার গায়ে জ্বালা ধরানোর অনেক মশলা আছে যে তাঁর কবিতায়, স্বীকারোক্তিতে।



(পরবাস-৬৫, ডিসেম্বর ২০১৬)




এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: