Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines





পরবাসে
কুমকুম চট্টোপাধ্যায়ের

লেখা
বই


ISSN 1563-8685




ধ্রুপদ ও বিষ্ণুপুর

(সঙ্গীতের "জয়যাত্রা": মোগল ভারতে আঞ্চলিকতা-মুক্ত দরবারি রুচিবোধ)

কুমকুম চট্টোপাধ্যায়

মূল ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ
শম্পা ভট্টাচার্য




(বিষ্ণুপুরের মন্দিরে টেরাকোটার অলংকরণে নাচ-গান)

হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক স্বতন্ত্র শৈলী হল বিষ্ণুপুর ঘরানা। ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে, সম্ভবত তার আগেই, এই ঘরানার উৎস হিসেবে বিষ্ণুপুর স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। ১৬-১৭ শতক ও তার পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ভক্তিধারা, রাজস্থানের পূজা-অর্চনার রীতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল, এবং মুঘল দরবারি সংস্কৃতির মধ্যে যে নিবিড় সংযোগ গড়ে ওঠে তারই উদাহরণ হচ্ছে বিষ্ণুপুর ঘরানার বিকাশ। উপরন্তু, এই সংযোগের পিছনে অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যাপারের তুলনায় সঙ্গীতের ভূমিকা ছিল দু’টি কারণে গুরুত্বপূর্ণঃ এক) সঙ্গীতের জন্যে ভারতীয় উপমহাদেশের এক বিশাল অংশে মুঘল সাম্রাজ্য ও শাসন কিছুটা স্বীকৃতি পেয়েছিল, এবং দুই) সঙ্গীত দিয়েছিল ভারতের নানা জায়গার এলিটসমাজকে তাদের অভিজাত-সংস্কৃতি জাহির করার এক উপযুক্ত মাধ্যম। ১৬-শতকের শেষ ও ১৭-শতকের প্রথম থেকে বিষ্ণুপুরের রাজারা সচেতনভাবে ধ্রুপদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন যাতে রাজ্যের গণসংস্কৃতি প্রধানত উত্তর ভারতের দরবারি/অভিজাত কালচারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এইভাবে মল্লরাজাদের আনুকূল্যে ওখানকার গণসংস্কৃতি হয়ে দাঁড়াল মুঘল ও রাজপুত দরবারি ভাব ও রুচির এক মিশেল, যা আবার ব্রজের বৈষ্ণব ভক্তিবাদ থেকে উদ্ভূত প্রচলিত ধারার সঙ্গে যুক্ত। বাংলা সমেত মুঘল সাম্রাজ্যের নানা জায়গার স্থানীয় নেতারা রাজপুত ও মুঘলদের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা ও অংশিদারির সম্পর্ক বেশ ভালোভাবে লক্ষ করতেন। রাজপুত এলিটদের মধ্যে বৈষ্ণবধারার গভীর সম্পর্ক ও বৈষ্ণব ভক্তিধারা ঘিরে যে সাঙ্গীতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল তার সঙ্গে নিবিড় সংযোগের কারণে ধ্রুপদের আকর্ষণ স্থানীয় রাজাদের কাছে আরো বেড়ে যায়। তাদের মধ্যে বিষ্ণুপুরের রাজারাও ছিলেন।

সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সংগীত ইত্যাদি শিল্পকলায় এবং বিশেষ করে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের প্রথমভাগের কারুশিল্পের কিছু আঙ্গিকের উপর অবধারিতভাবে 'হিন্দু' বা 'মুসলিম' তকমা লাগানোর বিপদ সম্বন্ধে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এইরকম লেবেল লাগানোর কারণ ১৯-শতকের শেষ ও ২০-শতকের সংস্কৃতির রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ--পণ্ডিতরাও এর প্রভাব থেকে অনেক সময় সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেননি। পরবর্তী কালের ইতিহাসে এইরকম মেরুকরণের যুক্তি যদিও বা কিছু থাকে তো মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের প্রথমদিকের শিল্পকলার ক্ষেত্রে তার অবকাশ নেই বললেই চলে। ফলে এর প্রয়োগ খুবই সাবধানে করা উচিত, বস্তুত তা সম্পূর্ণ পরিহার করাই শ্রেয়। এ-সত্ত্বেও প্রায়ই ধ্রুপদ সঙ্গীতকে হিন্দু (বিশেষত বৈষ্ণব মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত) ধর্মীয় সঙ্গীত হিসেবে দেখানো হয়। [১] এর ভিতরে 'সত্যি' কিছুটা থাকলেও এতে ধ্রুপদের কুলুজিতে ১৬ - ১৭, এমনকী ১৮-শতক পর্যন্ত জোরালো রকমের দরবারি সম্পর্কের সাক্ষ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়।[২] বস্তুত, ধ্রুপদ কন্ঠ-সংগীতের উৎস-সন্ধানে সেই সময়ের বৈষ্ণব সমাজ, এবং হিন্দু ও মুসলমান, দুই ধর্মের শাসকের দরবারে গেলেই হবে না, 'হিন্দু'/'মুসলিম' তকমার বাইরে গিয়ে দেখতে হবে কী ধরনের এক সাধারণ (common) নন্দনবীক্ষায় ধর্ম-নির্বিশেষে তখনকার এলিটদের গান-বাজনা ও অন্য শিল্পকলার চর্চা ছিল। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের ইতিহাসের চর্চায় সঙ্গীতের উল্লেখ প্রায় নেই-ই, যেটুকু রয়েছে তা রাজাদের বৈষ্ণব ধর্মচর্চার অনুষঙ্গে। ধ্রুপদের বিকাশ ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন আঞ্চলিক আঙ্গিকে তার প্রসারের ইতিহাস খুব কমই চর্চিত।[৩] বিশেষ একটি ধর্ম-সম্প্রদায় এবং উত্তরভারতীয় এলিট ও দরবারি সংস্কৃতির অনুষঙ্গের দরুন এক বিশেষ সঙ্গীত ঘরানা কীভাবে এক ছোটো রাজ্যে প্রচলিত হতে পারে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ্যে ধ্রুপদের উদ্‌ভব, আমার মতে, তার এক আদি ও প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যদিও এই সময়ে এর সমর্থনে বিশদ তথ্য পেশ করা মুশকিল।[৪]

বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতজ্ঞদের (বেশিরভাগ ২০-শতকের[৫] ) স্মৃতিকথা ও জীবনীতে ধ্রুপদের ইতিহাসের পরোক্ষ পরিচয় যা পাওয়া যায় সেই অনুযায়ী মল্লরাজাদের দরবারে ১৮-শতকে বাহাদুর খানের আগমনের সঙ্গে ধ্রুপদ ঘরানার সূত্রপাত। কথিত আছে বাহাদুর খান হচ্ছেন প্রবাদ-প্রতিম মিঞা তানসেন-এর প্রত্যক্ষ বংশধর। কিন্তু ১৬-শতকের শেষ দিকে মল্লরাজারা যে উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন



(বিষ্ণুপুরের শ্যামরায় মন্দির, স্থাপিতঃ ১৬৪৩)

তার পিছনের দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক কারণগুলো অনুসন্ধান করলে এটা পরিষ্কার যে মল্লরাজ্যে ধ্রপদের সূচনা ও বিশেষ করে তার বিবর্তনকে বুঝতে আরো বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের প্রয়োজন আছে। মল্লভূমে রাজাদের প্রশ্রয়ে কয়েক শতাব্দী ধরে ধ্রুপদের অব্যাহত আকর্ষণকে দেখতে হবে অন্য শিল্পকলার পরিপ্রেক্ষিতে--যেমন সুন্দর নবরত্ন টেরাকোটা মন্দির স্থাপনা, মৌলিক বাংলা সাহিত্যসৃষ্টি--সঙ্গে তার ও সংস্কৃত শাস্ত্রীয় সাহিত্যের অনুবাদের বিশাল প্রোগ্রাম, বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির নকল ও অলংকরণের কাজ, এবং আরো নানা কারুশিল্প, যেমন সূক্ষ্ম রেশমের শাড়ির উৎপাদন (বিখ্যাত বিষ্ণুপুরের বালুচরী শাড়ি) ও শাঁখের কাজ ইত্যাদি।

সবথেকে সাধারণ ও জনপ্রিয় বৈষ্ণব আরাধনা গান হল সংকীর্তন, যাতে সবাই একজোট হয়ে শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি ও নামগান করে। এই দলবদ্ধ কীর্তনসঙ্গীতকে সাধারণত বলা হয় ‘নাম-সংকীর্তন’। বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে বাংলায় এর প্রচলন। শ্রীচৈতন্য নিজেও অনেক ভক্তের বাড়ি কীর্তন গেয়েছেন ও নবদ্বীপের নগর-সংকীর্তনের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন।[৬] চৈতন্যদেবের উড়িষ্যা যাওয়ার আগেকার কীর্তন-সমাবেশগুলি তখনকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতির ব্যতিক্রমী কিছু মৌলিক প্রকরণের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। কীর্তনের দলে মেয়েদের ও নীচুজাতের লোকেদের উপস্থিতি নবদ্বীপের গোঁড়া ব্রাহ্মণরা সুনজরে দেখেননি। শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে কীর্তন-দলের ক্রমাগত বৃদ্ধি ব্যাহত করার জন্যে নগরের ব্রাহ্মণ নেতাদের অনুরোধে কাজী-সাহেব শ্রীচৈতন্যকে কীর্তনসমাবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এক বিখ্যাত নগরসংকীর্তনে শ্রীচৈতন্য এই আদেশ অবশ্য সরাসরিভাবে অমান্য করেন। চৈতন্যের দলের উপর এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছিল। প্রায়-সমকালীন বৈষ্ণব সাহিত্যে জানা যায় শ্রীচৈতন্যের নীচুজাতের অনুগামীরা নগরসংকীর্তনের সময় উচ্চবর্গীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্যে হিংসা ও সম্পত্তি ভাঙচুরের আশ্রয় নিয়েছিল। নীচু জাতের ও শ্রেণির লোকেদের সমবেত প্রতিরোধের ক্ষমতার এই নিদর্শন নিশ্চয়ই সংস্কৃতি-ধর্ম-রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারক উচ্চবর্গের এলিটদের আশংকা শুধু নয়, ভয়েরও কারণ হয়েছিল। দ্বিতীয়তঃ চৈতন্যও তাঁর জীবনের এই পর্বে দেখালেন যে নগরের প্রশাসন ও ক্ষমতাস্তম্ভকে পরীক্ষা করতে তিনি ভয় পান না। এটা সুবিদিত যে কাজীও এই সময়ে শ্রীচৈতন্য ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে জারি করা বিধি-নিষেধ ফিরিয়ে নেন। শ্রীহিতেশরঞ্জন সান্যাল দেখিয়েছেন যে সহজিয়া-বৌদ্ধ প্রভৃতি কয়েকটি ধর্মগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে এরকম দলবদ্ধ গানের ধারা এর আগেও বাংলায় হয়তো প্রচলিত ছিল--সেখানে বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণী নির্বিশেষে সবাই যোগ দিতে পারতেন। কিন্তু এগুলির সঙ্গে চৈতন্য-আন্দোলনের প্রথমদিকের নগর-সংকীর্তনের বিরাট তফাৎ এই যে সংকীর্তন হত একদম প্রকাশ্যে, কোনোরকম আড়াল বা লুকোচুরির তোয়াক্কা না-করে। লিঙ্গ, বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে এই সমবেত-গানের মাধ্যমেই ব্রাহ্মণ্য সমাজ ও সংস্কৃতির শ্রেণিবিভাগের প্রচলিত ধারাকে অস্বীকার করা হল।

শ্রীচৈতন্যের অনুগামীদের মধ্যে নাম-সংকীর্তন সবথেকে জনপ্রিয় হলেও বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে জানা যায় চৈতন্যের সময়ে এবং তার বেশ কিছু আগে থেকেই পদাবলী কীর্তনের ধারাও প্রচলিত ছিল। পদাবলী কীর্তনের উপজীব্য হল ছোটো ছোটো কাব্য বা পদাবলীতে শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর সঙ্গিনী রাধার লীলা-বর্ণনা। সাধারণত পদাবলী কীর্তনের শ্রোতারা হতেন সঙ্গীতের সমঝদার, সংখ্যায় বেশি নয়; তাঁরা কিন্তু নিখাদ শ্রোতাই--গায়নে অংশ নিতেন না।[৭] বাংলা তথা সমগ্র পূর্ব-ভারতে, এমনকী তার বাইরেও জয়দেবের গীতগোবিন্দ ছিল পদাবলী কীর্তনের এক প্রধান উপাদান। ১৫-শতকের শেষে ও ১৬-শতকে ব্রজধামে বৈষ্ণবধারার বিকাশ, চৈতন্য-প্রভাবিত বৈষ্ণব-আন্দোলনের বাংলা ও পূর্বভারতীয় শাখার সঙ্গে ব্রজধামের বৈষ্ণবধারার সংযোগ, এবং সেই সময়ে বৈষ্ণবদের মধ্যেও দরবারি অনুষঙ্গ-পুষ্ট কতকগুলি সঙ্গীতধারার উপস্থিতি--এই সবকিছুর মিলিত প্রভাবেই ধ্রুপদ সঙ্গীত বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ্য সমেত ভারতের অন্যান্য জায়গাতেও প্রচলিত হয়।

১৫-শতকের শেষ ও ১৬-শতকের গোড়ার দিকে শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি হিসেবে ব্রজধামের 'পুনরাবিষ্কার' হয় এবং সেখানে বিভিন্ন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস শুরু করেন। এক একটা মন্দিরের আরাধনা-গানের বৈশিষ্ট্য দিয়েই সেই মন্দির বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে থাকে। এই প্রসঙ্গে বল্লভাচার্য-সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখযোগ্য, কারণ ওঁরা পূজা-অর্চনায় আরাধনা-গানের বিশেষ মর্যাদা দিতেন; তার উপরে সুরদাস, কুম্ভনদাস প্রমুখ গায়ক-কবি এই সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। হরিদাসী-সম্প্রদায়ের স্বামী হরিদাস বৃন্দাবনের বাঁকে-বিহারী মন্দিরে ধ্রুপদ গান গেয়ে বিশেষ প্রশংসা ও খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ধ্রুপদ ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদের সংযোগ এই গায়কীকে রাজস্থানের বিভিন্ন বৈষ্ণব কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দিল। স্থানীয় রাজন্যবর্গ দিলেন সাদর পৃষ্ঠপোষকতা। ক্রমশ মেবার রাজ্যের নাথদ্বারা বল্লভাচার্য সম্প্রদায় ও ধ্রুপদের মুখ্য ও সুপরিচিত কেন্দ্রে পরিণত হল।

ঐতিহাসিকরা ও সঙ্গীত-বিশেষজ্ঞরা এ-ব্যাপারে একমত যে ১৫-শতকের শেষ ও ১৬-শতকের প্রথমে মধ্যদেশে, বিশেষত গোয়ালিয়রে ধ্রুপদের ঐতিহাসিক উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। লক্ষণীয়, যে ঠিক এইসময়েই 'পুনরাবিষ্কারের' নামে ব্রজে এসে বিভিন্ন বৈষ্ণব সম্প্রদায় মিলিত হচ্ছে। গোয়ালিয়রের রাজপুত রাজা মান সিং তোমর (রাজত্বঃ ১৪৮৬ - ১৫১৭)-কে সাধারণত যে কন্ঠ-সঙ্গীতের ধারাটি পরে ধ্রুপদ বা ধ্রুবপদ নামে চিহ্নিত হয়েছে তার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাপ্ত সাক্ষ্য অনুযায়ী তাঁরই উৎসাহে কয়েকজন দক্ষ সঙ্গীতজ্ঞের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর দরবারে, নায়ক বাক্‌শু ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এঁরাই ধ্রপদ আঙ্গিকের গায়কী গড়ে তুলেছিলেন। রাজা মান সিং তোমরের মৃত্যুর পরে রাজনৈতিক আলোড়নের জন্যে দরবারের সঙ্গীতজ্ঞদের অনেকে গোয়ালিয়র থেকে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়লেন। খেয়াল করার মতো ব্যাপার হল যে এই গায়কেরা সাধারণত স্থান পেলেন মধ্যদেশের ও অন্য জায়গায় বিভিন্ন রাজন্যের দরবারি সভাতেই। প্রাক্‌-আধুনিক যুগের শাসক ও অভিজাত শ্রেণী নজর-কাড়া ধরনে শিল্প-সঙ্গীত-বিদ্যাচর্চাকে পোষণ করতেন। সঙ্গীত-শিল্পীরা যে এঁদের আনুকূল্য খুঁজবেন সেটা যেমন একদিক দিয়ে স্বাভাবিক, তেমনই হয়তো এটাও বলা যায় যে গোয়ালিয়রের ধ্রুপদের আকর্ষণের জন্যই বিভিন্ন দরবারে ছিল তাঁদের সাদর অভ্যর্থনা। রাজা মান সিং-এর মৃত্যুর পর তাঁর দরবারের বিখ্যাত ধ্রুপদীয়া নায়ক বাকশু মান সিং-এর ছেলে (ও তাঁর রাজত্বের উত্তরাধিকারী) বিক্রমজিতের দরবারে কিছুদিন ছিলেন। তার পরে তিনি কালিঞ্জরের রাজা কিরাতের সভা-গায়ক হলেন। শেষ পর্যন্ত নায়ক বাকশু গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহের আশ্রয়ে সঙ্গীত-কলাবিদ হিসেবে স্থান পান। ১৬-শতকে সঙ্গীতের, বিশেষ করে ধ্রুপদের উৎসাহদাতা ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বাহাদুর শাহের স্থান খুবই উঁচুতে। এঁর উদ্দেশ্যেই রচিত 'বাহাদুরী টোড়ি' রাগের জনক হিসেবে নায়ক বাকশু গণ্য হন। আবার 'কানাড়া' ও 'কল্যাণ' রাগের কিছু নান্দনিক পরিবর্তন করে 'নায়কী কানাড়া' ও 'নায়কী কল্যাণ' রাগেও নায়ক বাকশু তাঁর সৃজন-ক্ষমতার স্বাক্ষর রাখেন।[৮]

মধ্যদেশের অন্য যে-সব রাজসভা ধ্রুপদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল তার মধ্যে রেওয়া একটি। হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রবাদ-প্রতিম ব্যক্তিত্ব তানসেনের নাম গোয়ালিয়র এবং রেওয়া, এই দুইয়ের সঙ্গেই জড়িত। মনে করা হয় যে তানসেনের জন্ম এবং প্রাথমিক সঙ্গীতশিক্ষা হয় গোয়ালিয়রে। মুঘল দরবারে যাওয়ার আগে তিনি রেওয়ার রাজা রামচন্দ্র বাঘেলার সভাগায়ক ছিলেন। সুলতান বায়াজিদ--যিনি মালওয়ার বাজ বাহাদুর নামে বেশি পরিচিত (এবং শেষ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের সৈন্যদের কাছে পরাজিত হন)--এবং জৌনপুরের সুলতান শারকি, দুজনেই ছিলেন নামকরা সঙ্গীতরসিক। সঠিক বলা শক্ত বাজ বাহাদুর বা জৌনপুরের সুলতান যে-গানের ভক্ত ছিলেন সেগুলোকে ধ্রুপদ বলা যায় কি না। কিন্তু শের শাহর ভ্রাতুষ্পুত্র আদিল শাহ সুর কেবলমাত্র সঙ্গীতের সমঝদারই ছিলেন না, তিনি নিজেও এক নামকরা গায়ক ছিলেন। সম্ভবত ১৫-শতকের শেষ ও ১৬-শতকের প্রথমদিকে ধ্রুপদের যে গায়কী গড়ে উঠছিল সে-ব্যাপারে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী গোয়ালিয়রের সঙ্গে আদিল শাহ সুর-এর নাম যুক্ত। তানসেন ও বাজ বাহাদুর, এই দুজনেই নাকি তাঁর কাছ থেকে সঙ্গীতের তালিম পেয়েছিলেন।[৯]

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে বৃন্দাবন মথুরা যখন সারা উত্তরভারতের বৈষ্ণবদের মুখ্য কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে ঠিক তখনই মধ্যদেশের (উদাঃ গোয়ালিয়র, আগ্রা, ব্রজ-অঞ্চল ইত্যাদি) ও তার বাইরেও অনেক রাজসভায় ধ্রুপদ কন্ঠসঙ্গীতের আকর্ষণ ও কদর বাড়ছে। অন্তত এ-ব্যাপারে বিশেষ সন্দেহ নেই যে এই অঞ্চলটিতেই ধ্রুপদের জন্ম ও বৃদ্ধি। বাজ বাহাদুর, বৈজু বাওরা, মিঞা তানসেন প্রভৃতি কিংবদন্তী-সুলভ গায়কদের নিয়ে যে বিশাল কাহিনিমালা পাওয়া যায়, সেগুলিও গোয়ালিয়র, চান্দেরী, মাণ্ডু ইত্যাদি মধ্যদেশের নগরগুলিকেই কেন্দ্র করেই রচিত। ধ্রুপদ-বন্দিশে স্থানীয় 'ব্রজভাষা'র অব্যাহত প্রচলন মধ্যদেশের সঙ্গে ১৫/১৬-শতকের ধ্রুপদের ভিত্তিমূলক সম্পর্কের জোরালো সাক্ষ্য দেয়। আরও বেশি লক্ষণীয় কীভাবে গোয়ালিয়র-আগ্রা-ব্রজ অঞ্চলের রাজসভা থেকে ধ্রুপদ এই সময়ে এবং তার পরেও অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সুলতান-পর্বের শেষ ও মুঘল যুগের প্রথমদিকের অস্থির সময়কালে ধ্রুপদের সঙ্গে দরবারি সংস্কৃতি ও রুচির মিশেল দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। আকবরের আমলে মুঘলরা তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছিল সারা-ভারত জুড়ে। মনে হয় সম্রাট আকবরের সময় থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের দরবারে মর্যাদাপূর্ণ স্থান পাবার ফলে ধ্রুপদের আঙ্গিকে অবধারিতভাবে দরবারি ও তার মাধ্যমে অভিজাত শ্রেণির ভাব ও রুচির প্রভাব আরো জোরালো হয়। আকবরের রাজত্বের সপ্তম বছরে যখন তানসেন তাঁর সভায় যোগ দেন তখনই তিনি বেশ নামকরা ধ্রপদীয়া। রেওয়ার রাজসভা থেকে মুঘল দরবারে তানসেনের আগমনকে ঘিরে অনেক মৌখিক কাহিনি ও কিংবদন্তীর জন্ম হয়েছে। বিজয়ী রাজা যেমন পরাজিত রাজাকে হুকুম দিতেন তার ঐশ্বর্য সম্পদ পাঠিয়ে দিতে, অনেকটা সেই ঢং-এ নাকি আকবর রেওয়ার রাজা রামচন্দ্র বাঘেলাকে বলেছিলেন তানসেনকে আকবরের দরবারে পাঠিয়ে দিতে। তার পরের সাতাশ বছর ধরে তানসেন ছিলেন আকবরের দরবারের অন্যতম রত্নবিশেষ--সবচেয়ে আদৃত গায়ক ও সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর নামের সঙ্গে হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের অনেক রাগের নাম যুক্ত। সমসাময়িক ঐতিহাসিক ও কাহিনিকারেরা--আবুল ফজ্‌ল থেকে বদাউনি প্রভৃতি অনেকেই তানসেনের কথা লিখেছেন। আবুল ফজ্‌ল লিখেছেন তানসেনের দরবারে আগমন এবং তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারেও--এটা পরিষ্কার যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভাসদ ছিলেন বলেই তানসেন এমন উল্লেখ পেয়েছেন। তানসেন কিন্তু আকবর-সভার একমাত্র গায়ক ছিলেন না--আবুল ফজ্‌ল গায়কদের একটা তালিকা দিয়েছেন--কিন্তু নিঃসন্দেহে তানসেন ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত। আরও বড়ো কথা, তানসেন ছিলেন মুঘল দরবারের সঙ্গে ব্রজ-মন্দিরের বিকাশমান ভক্তিমূলক গায়কীর মধ্যেকার এক যোগসূত্র বিশেষ। কথিত আছে, স্বামী হরিদাসের সঙ্গে তানসেনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল--কিছু কাহিনি অনুযায়ী তানসেন হরিদাসকে সঙ্গীতের ব্যাপারে পরামর্শদাতা বলে মানতেন। বল্লভাচার্য-সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িত বৈষ্ণব উপাখ্যানগুলিতে বৃন্দাবন-মথুরার মন্দিরের ধ্রুপদ-সঙ্গীতের সঙ্গে মুঘল দরবারের (বিশেষ করে আগ্রার, যা বৃন্দাবন-মথুরার বেশ কাছেই) উচ্চ-অভিজাত শ্রেণির সংযোগ স্থাপনের সূত্রে তানসেনের ভূমিকা বারবার এসেছে। আকবরের পরে জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানও ধ্রুপদকে পোষণ করেছেন। বিশেষ করে শাহজাহান তো রীতিমতো পরিকল্পনা করে নায়ক বাকশুর নামে যত বন্দিশ আছে সব সঙ্কলন করান--এই বিশাল গীতমালা 'সহস্রধারা' বা 'হাজার ধ্রুপদ' নামে পরিচিত। আউরঙ্গজেব নাকি তাঁর সভায় ও সম্ভবত তাঁর রাজ্যেও সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করেছিলেন, তবে এই প্রচলিত ধারণাকে শুধরে নেয়া প্রয়োজন বলে ক্যাথারিন ব্রাউন তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণায় আমাদের সতর্ক করেছেন। ১৭-শতকের শেষের দিকে মুঘল সভাসদ ও তার পরিচিতদের মধ্যে ধ্রুপদের উৎপত্তি ও অনুশীলনের উপর রচনা-সংকলন জাতীয় কিছু বই পাওয়া যেত। ১৭-র শেষ ও ১৮-শতকের গোড়ায় খেয়াল গায়কীর কাছে ধ্রুপদ জনপ্রিয়তা ও সম্ভবত গানের জগতে তার মুখ্য স্থানটি হারাচ্ছিল। তবুও, ১৭ থেকে ১৮-শতক ধরে দেশের নানা অঞ্চলের অভিজাত শ্রেণী ও স্থানীয় দলপতিদের কাছে ধ্রুপদের অব্যাহত কদরের দ্বারা এটাই বোঝা যায় যে ওই সময়ে সারা মুঘল সাম্রাজ্য জুড়েই আঞ্চলিকতার বেড়া অতিক্রম করে এক সাধারণ, সর্ব-ভারতীয় অভিজাত/দরবারি সংস্কৃতি ও রুচি গড়ে উঠেছিল। উত্তর বিহারের দ্বারভাঙ্গা/ত্রিহুত এবং বেতিয়ার (বিহারেরই) রাজসভাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধ্রুপদ ঘরানার কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই জায়গার কলাকারদের বিবরণ থেকে অনুমান হয় যে ১৮-শতকে এই ধ্রুপদ ঘরানাগুলির আবির্ভাব হয়েছিল। মনে হয় সেটাই ঠিক। আসলে, ১৮-শতকে যখন মুঘল কেন্দ্রগুলি শত্রুর আক্রমণ, অর্থাভাব ও মসনদের উত্তরাধিকারের লড়াইতে ধুঁকছে, তখন কবি, শিল্পী ও গায়কদের সঙ্গে সঙ্গে অভিজাতশ্রেণির লোকেরাও দলে দলে নিরাপত্তা ও জীবিকার খোঁজে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলেন। পূর্বভারতের মুর্শিদাবাদ ও পাটনায় 'কলম' গড়ে উঠেছিল এই ১৮-শতকেই। অবশ্য ১৮-শতকের আগে বেতিয়া ও দ্বারভাঙ্গা ঘরানার কোনো অস্তিত্ব একেবারেই ছিল না এটা প্রমাণ করতে আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ ও একাগ্র গবেষণার দরকার। এর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার জন্যে যে-সব ঐতিহাসিক কারণে (বিশেষ করে দরবারি অনুষঙ্গ) ধ্রুপদের প্রসার হয়েছে বলে আমরা এ-পর্যন্ত আলোচনা করেছি শুধু সেটাই যথেষ্ট নয়। বৃন্দাবন-মথুরার মন্দিরের গায়কী, না দরবারি অনুষঙ্গ (তা সে মান সিং তোমর, গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ, অথবা মুঘল দরবার যারই হোক না কেন)--এদের মধ্যে কোন্‌টা আঞ্চলিক ধ্রুপদ ঘরানার উপর প্রথম বা বেশি প্রভাব ফেলেছে সেটা নিরুপণ করা এখন অসম্ভব, হয়তো তার প্রয়োজনও খুব একটা নেই। মন্দির-কেন্দ্রিক ও দরবার-কেন্দ্রিক, এই দুটি ধারাই পরিপূরক হিসেবে পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে এবং সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ধ্রুপদের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নতুন দিল্লীর জাতীয় সংগ্রহালয়ে রক্ষিত একটি ছবিতে দেখা যায় সম্রাট



(আকবর, তানসেন, স্বামী হরিদাস)


আকবরের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন মিঞা তানসেন ও ব্রজধামের ভক্ত-কবি স্বামী হরিদাস। এই ছবিটি আঁকানো হয়েছিল রাজপুতানার কিষনগড় রাজ্যে, রাজা সবন্ত সিং-এর আমলে। রাজা ছিলেন আউরঙ্গজেবের আমলের এক বড় মনসবদার, সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক, ও নিজেও বিখ্যাত সঙ্গীত-বিশেষজ্ঞ। Delvoye এই ছবিটির আলোচনা প্রসঙ্গে এর ঐতিহাসিক সত্যতা সম্বন্ধে জোরালো সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এ-ব্যাপারে কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসা যায় না; যদিও আমার ব্যক্তিগত মতে কোনো এক বিশেষ সময়ে এই তিন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের একত্র হবার সম্ভাবনাকে সন্দেহ করবার কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু আকবর, তানসেন, ও স্বামী হরিদাসের জীবৎকালের বহু যুগ পরে আঁকা এই ছবি থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে কী চোখে এক রাজপুত রাজা এক বিশেষ ধরনের সঙ্গীতকে তার নিজস্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখেছিলেন। ছবির বিষয় থেকে পরিষ্কার যে তিনি ধ্রুপদকে দেখেছিলেন বৃন্দাবন-মথুরার বৈষ্ণব ভক্তিধারা ও আকবরের মুঘল দরবারের সঙ্গে একত্রে। মিঞা তানসেন এ-দুয়ের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করেছেন।

একদিকে বৈষ্ণবীয় ভক্তি ও অন্যদিকে দরবারি ভাব, এই দুই ধারাতেই আর্দ্র হয়ে ধ্রুপদ এল বাংলা দেশে ১৬-শতকের শেষ পাদে, বৃন্দাবনী বৈষ্ণবদের হাত ধরে। বৃন্দাবনের গোস্বামীরা তিনজন বৈষ্ণব নেতাকে (শ্রীনিবাস, নরোত্তমদাস, ও শ্যামানন্দ) খেতুরির মহা-সম্মেলনে পাঠিয়েছিলেন--উদ্দেশ্য ছিল যে তাঁরা বিভিন্ন গৌড়ীয় বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ের জন্যে একটিই সাধারণ ঈশ্বরতত্ত্বের কাঠামো বা মঞ্চ (platform) তৈরি করবেন। শোনা যায় শ্যামানন্দ সহজাত গায়ক ছিলেন এবং বৃন্দাবনে ধ্রুপদের তালিমও নিয়েছিলেন। তিনি এই সম্মেলনে বাংলার বৈষ্ণবসমাজে এক নতুন ধরনের ভক্তি-সঙ্গীতের (ধ্রুপদ-গায়কীর) প্রবর্তন করলেন। বাংলায় বৃন্দাবনী বৈষ্ণবধারার কেন্দ্র হিসেবে বিষ্ণুপুরের উত্থানের জন্যে এটা অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে স্থানীয় মল্লরাজাদের আনুকূল্যে ধ্রুপদও এখানে শক্ত শিকড় গড়তে পেরেছিল। সমসাময়িক সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে অন্তত ১৭-শতক ধরে বিষ্ণুপুরের সম্পর্কযুক্ত বৈষ্ণবরা বৃন্দাবনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন ও সেখানে সঙ্গীতের তালিম নিতেন। পরে যা 'বিষ্ণুপুর ঘরানা' অভিধা পায়, তার সঙ্গীতবিদ্‌দের জীবনী ও স্মৃতিকথা থেকে ধারণা হয় যে বিষ্ণুপুরের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (বা মার্গ সঙ্গীত) মল্লরাজদের দরবারের সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৮-শতকে যখন দরবারে ধ্রুপদের রমরমা ছিল তখন নিশ্চয়ই এটা সত্যি। এর আগের যুগে মল্ল রাজধানীতে যে-সব রাধা-কৃষ্ণর মন্দির ছিল সেখানেই প্রধানত ধ্রুপদ গাওয়া হত। মল্লরাজ্যের স্থানীয় ধ্রুপদ গানের ঐতিহ্য বৈষ্ণব-কাহিনি নির্ভর পদাবলী রচনার ধারাকে আরও পুষ্ট করে। ১৬-শতকের শেষ থেকে পরবর্তী দু'শো বছর ধরে বিষ্ণুপুরে বহু বৈষ্ণব গান/কবিতা রচিত হয়েছিল। মল্লরাজারা নিজেরাই কিছু লিখেছিলেন আর বাকিগুলি লিখেছিলেন বৈষ্ণব পদকর্তারা ও অন্যান্যরা। দেখা যায় এই কবিতা বা গানের চরণগুলিতে ব্রজবুলি ও বাংলাভাষা দুইই ব্যবহার করা হয়েছে। বেশিরভাগ গানেরই বিষয় কৃষ্ণের স্তুতি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৮-শতকের প্রথম থেকে বিষ্ণুপুরের ধ্রপদ গায়কী মন্দিরের তুলনায় দরবারের দিকেই বেশি ঝুঁকেছিল। বৈষ্ণব ভাব বজায় থাকলেও বিষ্ণুপুরী ধ্রুপদে সমসাময়িক মল্লরাজাদের স্তুতিও লক্ষ করা যায়।

খোদ মিঞা তানসেনের প্রত্যক্ষ বংশধর, বিখ্যাত গায়ক বাহাদুর খানের দিল্লী থেকে মল্লরাজ্যে আসা স্থানীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে একটা দিক্‌চিহ্নের মতো, এর ফলে বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদ দরবারের দিকে মোড় নেয়। গত প্রায় দু'পুরুষ ধরে বিষ্ণুপুর ঘরানার ব্যাখ্যাতারা সাধারণত নিজেদের পূর্বপুরুষ ও সঙ্গীত শিক্ষকরা সাক্ষাৎ বাহাদুর খানের কাছে তালিম পেয়েছেন বলে দাবী করে এসেছেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিষ্ণুপুর শাখায় রাখা গানের সংকলনে মুঘল ওমরাহ (যথা বৈরাম খান, টোডরমল) থেকে জাহাঙ্গীর আদি সম্রাটদের প্রশংসা আছে। এর থেকে ওই গানগুলিতে মুঘল দরবারের প্রেক্ষিতটি পরিষ্কার বোঝা যায়। ১৮-শতকের শুরুতে মল্লরাজ্যের সঙ্গে দিল্লীর সঙ্গীতের সম্পর্ক ক্রমশ জোরালো হওয়ার ফলে হয়তো এরকম বাণী বিষ্ণুপুরী ধ্রুপদে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল। মুঘল বাদশা-ওমরাহদের প্রশস্তিমূলক কিছু কিছু গান ১৮-শতকের আগেও বিষ্ণুপুর ও বৈষ্ণবদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছিল--এমনটা অনুমান করার কারণও কিন্তু আছে। বৈষ্ণব ভক্তি-সংস্কৃতির সঙ্গে বিষ্ণুপুর, রাজস্থানের রাজন্যসমাজ ও মুঘল দরবারের পারস্পরিক সংযোগের কারণেই হয়তো মুঘল বাদশা-ওমরাহদের প্রশস্তি-গান মল্লরাজ্যের গায়কদের মধ্যে প্রচারিত হয়েছিল। বিষ্ণুপুর ঘরানার ব্যাখ্যাকাররা সাধারণত বলে থাকেন যে এই ঘরানার উদ্‌ভব মল্লরাজাদের দরবারে, মন্দিরে নয়--অন্যদিকে পণ্ডিতরা ধ্রুপদের ইতিহাস চর্চা করে জানান যে ধ্রুপদ হল 'ধর্মীয়' সঙ্গীত, মন্দিরের সঙ্গীত, এবং 'হিন্দু সঙ্গীত'। কিন্তু, ধ্রুপদের আদিপর্বের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে দরবারি এলিট সংস্কৃতি ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদ, এ-দুয়ের সঙ্গেই ধ্রুপদ সংযুক্ত ছিল।



সূত্রনির্দেশ :

[১]নিদর্শন হিসেবে দ্রঃ S. Thielemann, The Darbhanga Tradition: Dhrupad in the School of Pandit Vidur Mallik, Varanasi, Indica, 1997, Anne Marie Gaston, Krishna's Musicians. Musicians and Music-Making in the Temples of Nathdvara, New Delhi, Manohar, 1997

[২]ধ্রুপদে বৈষ্ণবীয় এবং দরবারি প্রসঙ্গের উপর বিশদ আলোচনা করেছেন: Francoise 'Nalini' Delvoye, Ritwik Sanyal and Richard Widdess, Dhrupad. Tradition and Performance in Indian Music, Aldershott, Ashgate Publishing Limited. 1988, Catherine Butler Brown, "Did Aurangzeb Ban Music? Questions for the Historiography of His Reign", Modern Asian Studies, 41, 1, 2007, pp. 77-120 ইত্যাদি।

[৩]এর ব্যতিক্রম: Sanyal and Widdess, Dhrupad

[৪] আমি এখানে 'যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি পুরাকীর্তি ভবনে' (বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া জেলা, পশ্চিম বঙ্গ) সংরক্ষিত তথ্য জোগাড় ইত্যাদি নানা অসুবিধার কথা উল্লেখ করতে চাই। এখানে এই অঞ্চলের ধ্রুপদের ইতিহাস-সংক্রান্ত অনেক দলিল আছে। দ্রঃ মানিকলাল সিংহ, পশ্চিম রাঢ় তথা বাঁকুড়া সংস্কৃতি, এবং চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত, ভারতের শিল্প সংস্কৃতির পটভূমিকায় বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা। এই বই দু'টিতে এইসব দলিল সম্বন্ধে কিছু আলোচনা আছে।)

[৫]উদাহরণঃ রমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিতীয় দিল্লী বিষ্ণুপুর

[৬]Sukumar Ray, Music of Eastern India, Calcutta, Firma K. L. Mukhopadhyay, 1973, pp. 26-46, হিতেশরঞ্জন সান্যাল ও অশোক ভট্টাচার্য (সম্পা.), চৈতন্যদেব, ইতিহাস ও অবদান, সারস্বত লাইব্রেরি, কলকাতা, তারিখ নেই, পৃঃ ৩৯৯-৪১৬।

[৭]সান্যাল, বাংলার কীর্তন

[৮]রাজ্যেশ্বর মিত্র, উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত, ওরিয়েন্ট লংম্যান, নিউ দিল্লী, ১৯৭০, পৃঃ ৮৮-৮৯

[৯]তদেব; পৃঃ ৫৪


কুমকুম চট্টোপাধ্যায় (১৯৫৮-২০১২), দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের বিশিষ্ট গবেষক। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনাকালীন ক্যান্সারে মৃত্যুর ফলে Dhrupad and Bishnupur সমেত আরো কয়েকটি গবেষণাপত্র অপ্রকাশিত থেকে যায়।





(পরবাস-৬৫, ডিসেম্বর ২০১৬)


অলংকরণঃ বিষ্ণুপুরের মন্দির (পরবাস-২২)



এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: