Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে
অরিজিৎ চক্রবর্তী-র

লেখা


ISSN 1563-8685




অনন্ত আশ্রম : কবিতার এতটা সাহস...


অনন্ত আশ্রম; বিভাস রায়চৌধুরী; প্রথম প্রকাশ: ২০১৫; সিগনেট প্রেস, কলকাতা; পৃষ্ঠাঃ ??; ISBN:`

জকের বাংলা কবিতার আবহ জুড়ে এত বিচিত্র উচ্চাবচতা আর এত পরস্পরভিন্ন উচ্চারণের সমাবেশ যে, পাঠক কোনো একক মহীরুহের সন্ধান করেন না আর। চেতনার বিপুল বিস্তার কিংবা বলা ভালো, বিস্ফোরণের এই পর্যায়ে সম্ভবত তার প্রয়োজনও নেই। বরং আলো-আঁধার তৈরি হওয়া প্রত্যয়-অপ্রত্যয়, স্বভাব-প্রসাধন, ইতি-নেতির দ্বিবাচনিকতা থেকে পাঠক আজ খুঁজে পেতে চান বহু স্বরূপ সঙ্গতির সূত্র। উচ্চারণের আশ্চর্য কৌণিকতা ও বিপ্রতীপতার সহাবস্থান থেকে কিভাবে গড়ে উঠেছে পাঠকৃতি আর কিভাবেই বা স্বতন্ত্র ব্যক্তি-স্বরের টানা ও পোড়েন কখনো অন্বয়ের সম্ভাবনা আর কখনো বা অনন্বয়ের যন্ত্রণা ও কূটাভাসকে ঐ পাঠকৃতির অনেকান্তিকতার পক্ষে মানানসই করে তুলেছে — এটা নিবিষ্ট ভাবে অনুশীলন করাই আজকের পাঠকের দায়।

সময় ও পরিসর ভাবনার বিচিত্র অভিব্যক্তির মধ্যে কোনো একক কবি কিভাবে নিজস্ব নির্মিত - নৈপুণ্যকে প্রতিষ্ঠিত করছেন, কিভাবেই বা নতুন সময়বোধ ও নান্দনিক চেতনাকে আপন সৃষ্টির উৎস করে তুলছেন আর কিভাবে মেলাচ্ছেন সামাজিক বীক্ষণকে — এইটাই তাঁর সার্থকতার কষ্টিপাথর। আর সেই সঙ্গে রয়েছে জাগতিক তথ্য থেকে কবিতার সত্যে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নৈর্ব্যক্তিক উপলব্ধিতে পৌঁছনোর জরুরি পরীক্ষা সমাপনের দায়ও। তত্ত্বগত দৃষ্টিকোণ মুহুর্মুহুঃ পালটে যাচ্ছে! যদিও, এলিয়টের একটি পুরনো ও পরিচিত মন্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক; "The progress of an artist is a continual self-sacrifice, a continual extinction of personality"। বস্তুত নিজের ফেলে-আসা পথরেখাকে নিজেই যদি মুছে নেওয়া না যায়, বর্জনীয়েরা শৃঙ্খলিত করবে গতিকে, ঝাপসা হয়ে আসবে গন্তব্য। তাই অভিজ্ঞতার পোড়া মাটি দিয়ে নিজের গভীর ভাস্কর্য গড়ে তোলার প্রাক্‌শর্ত হলো, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে এগোনো।

বাংলা কবিতা তাই থেমে নেই, রূপ থেকে রূপান্তরে নিয়ত নির্ণীয়মান তার প্রতিমা। এই সমবায়ী পাঠকৃতির অন্যতম স্থপতি কবি বিভাস রায়চৌধুরী, একক পথে তাঁর যাত্রা, নিজেকে জানার জন্যে, ভাঙতে ভাঙতে এগোনোর জন্যে। 'নষ্ট প্রজন্মের ভাসান' এই যাত্রার সূচনাবিন্দু। যাত্রার বিস্তার চলেছে আজো। 'নষ্ট প্রজন্মের ভাসান', 'উদ্বাস্তু শিবিরের পাখি', 'শিমুলভাষা পলাশভাষা', 'জীবনানন্দের মেয়ে', 'চণ্ডালিকাগাছ', 'যখন ব্রিজ পেরোচ্ছে বনগাঁ লোকাল', 'পরজন্মের জন্য স্বীকারোক্তি', 'সমস্ত দুঃখীকে আজ', 'অনন্ত আশ্রম', 'বীজঠান সংগ্রহ' কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকৃতপক্ষে তাঁর নিজেকে জানার পরিক্রমা।

আমার আলোচনার বিষয় কবি বিভাস রায়চৌধুরীর লেখা "অনন্ত আশ্রম" (২০১৫, সিগনেট প্রেস) কাব্যগ্রন্থটি। Self-reflexiveness বা আত্ম-প্রতিফলন — যা ভাষার প্রত্যক্ষ প্রদর্শন ঘটিয়ে কবি নিজেই একটি বিশেষ ভাষা অর্থাৎ মেটাফিকশন বা মেটাপোয়েট্রি-র ভেতর পাঠককে প্রবেশ করান। জীবন-জগৎ-মানবিক সম্পর্ক স্মৃতিপীড়া-বিষাদ-বহমান মুহূর্তসমবায়; সমস্ত কিছু নিয়ে কবি আসলে একটি অভিন্ন পাঠকৃতি গড়ে তুলেছেন। আপাত-ভিন্ন কবিতাগুলি ভাবনার কেন্দ্রীয় আকল্পকে পুষ্ট করছে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকসম্পাত করে উদ্‌ভাবিত করছে শুধু। আর কবির মগ্নস্বর, আত্মমুখী উচ্চারণ জুড়ে কথোপকথনের পরা-সন্দর্ভ ফুটে উঠেছে কেবল। অদৃশ্য ও অমোঘ এক পাঠক-শ্রোতার উপস্থিতি অনুভব করা যায় বারবার। কখনো উচ্চারণে জেগে ওঠে স্বীকারোক্তির আদল, কখনো বা দহনময় অভিমান, কখনো বিষণ্ণ ঔদাসীন্য। এদের সবচেয়ে বড় জোর এখানেই যে, নির্মেদ কথনভঙ্গিতে এবং অন্তর্বৃত নাট্যপ্রবণতায় বা নিরাসক্ত সাংবাদিক বিবৃতিতে প্রচলিত কাব্যকলার মিথ্যা সংক্রামিত হয় না কখনো। নিজস্ব পরাপাঠই বিভাস উন্মোচিত করে গেছেন কবিতার পরে কবিতায়। অপরিচয়ের মিথ্যাকে কৃৎকৌশলের কুয়াশা দিয়ে আচ্ছন্ন করতে হয় না তাঁকে; পরিচিত জীবনের পরিধি থেকেই তিনি ক্রমাগত কবিতার নির্যাস নিঙড়ে নিয়েছেন। "অনন্ত আশ্রম" কাব্যগ্রন্থটি "অনন্ত" আর "আশ্রম" এই দুই বিভাজনে উদ্ভাসিত। আর "অনন্ত" নামক প্রবেশক কবিতাটিতে আমরা দেখি বহ্নিমান সময়ের অভিজ্ঞতা কবিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর তাৎপর্য-অন্বেষণ ব্যক্তির খণ্ডিত অবস্থানকে পেরিয়ে সামূহিক ভাবনায় যুক্ত হতে পেরেছে। কবি লিখেছেন:

পচনের পরে
অবশিষ্ট আলোটুকু যত অতিরিক্ত,
                    তত তুমি মোহময়...

গন্ধের মতন নষ্ট

স্বাদ উচ্চাকাঙ্খাহীন

অনন্ত শিকারে যাই... শরীর পানীয়...

                    হে অনুচ্চারিত মদ!
তোমার গলিতে মৃত সফল জিরাফ?

কবিতা বস্তুত এক অনিদ্রাসম্পদ
মহানাগরিক ক্লেদ যখন প্রগলভ কোলাহল দিয়ে কবিতার জগৎকে আচ্ছন্ন করে, সেসময় প্রাকৃত জীবনের নির্মিতির প্রকাশ করে তোলেন বিভাস। সেইসঙ্গে চিনিয়ে দেন কবিসত্তাকেও। পচনের পরে অবশিষ্ট আলো খুঁজে পান কবি। এ যেন পচনের ভেতর শক্তির বিজ্ঞান। রোমান্টিক বিষাদবোধ আর আহত কৌতুক ছড়ানো সফল জিরাফের কাহিনী। পরের লাইনেই "কবিতা বস্তুত এক অনিদ্রাসম্পদ" প্রগাঢ়ভাবে গ্রথিত এই সিদ্ধান্ত অনিবার্য। সোজা কথায় কবিতার থাপ্পড়! সমস্ত রাত জাগার পর সকালবেলার শিশির দিয়ে ক্লান্তি ধুইয়ে দেবার অনুভূতি যে নিবিড় ভালোবাসার — সেটা না বললেও চলে। বোঝা যায়, আসলে উদাসীনতার প্রশ্নে তাঁর আক্ষেপ। আদপে এক স্থায়ী উদাসীনতাই তিনি অর্জন করতে চান। আমার ধারণা, এই নির্লিপ্ত মনোবাসনা, উদাসীন মানসিকতার পেছনে কাজ করে অন্য রকমের একটা জীবনবোধ। এই জীবনবোধের ছাপ গড়ে তোলে তাঁর মানসিক গঠন, যার ছোঁয়া লেগে থাকে তাঁর কবিতায়। তাই "সমস্ত গুঁড়িয়ে দেওয়ার / পর / নিঃস্বই জীবিত.../ আকাশ অনেক বড় কান্না/ শরীর পেরিয়ে এক মাঠে/ আচমকা দেখা দিত।" (ভিক্ষু) দেখবার চোখও কলমের জোর, ভাষাকে আজ্ঞাবহের মতো কাজ করিয়ে নেওয়া বিভাস-এর কবিতায় লক্ষ্য করার মতো, "আকাশ অনেক বড় কান্না" এই শব্দমালায় চিত্রলতার দর্শন যেন কবির আত্মবিদারক শ্লেষ। ধ্যানের স্থিতধী। একটা আনন্দ। আসলে কবিতা বাস্তবের অবিকল অনুকৃতি নয়। জীবন মৃত্যু সৃষ্টি অস্তিত্বের সব রহস্য দুর্জ্ঞেয়। পাঠক তা অনুভব করবেন হয়তো।

লক্ষণীয় যে, প্রার্থিত শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছনোর আর্তি ব্যক্ত হতে থাকে নিসর্গ-রূপকে, নাগরিক ভণিতায় নয়। তাই লোকশ্রুতির ভাঁড়ার থেকে উঠে আসে যৌথ সাংস্কৃতিক সম্পদের বার্তা থেকে পাওয়া উপলব্ধি : "কবিতায় পা ফেলে পা ফেলে / বিদায় জগৎ? / মানুষ বোঝে না কিছু / নদীকে জড়িয়ে কাঁদে নদীটির স্রোত..." — (চমৎকার বিষ) বোঝা যায় কবি চলা এবং সময় এ দুয়ের ক্রমমুক্তির ইতিহাস এবং তাৎপর্যময় অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। বহুর মধ্যে মিশে তিনি একাই চলেছেন, এই বিচ্ছিন্নতা এই যন্ত্রণাবোধ অনেকেরই হতে পারে কিন্তু অভিজ্ঞতাটা ব্যক্তিগত।

"সন্ধ্যার নদীতে চাঁদ ঘন হয়... / যেন বুনো হাঁস... / একার চেয়েও একা পড়ে থাকে কবিতা-বিশ্বাস" — (কোপাই নদীর পাশে) মনে হতে পারে কবির চলা শেষ। না। তিনি আবার বৃত্তের প্রথম থেকে চলা শুরু করেন। রাধাকৃষ্ণের ভাবসম্মিলনে যেমন লীলা শেষ হয় না, আবার পূর্বরাগ আসে, তেমনি কবিতা-বিশ্বাস নিয়ে চলারও শেষ নেই। কবির এই দর্শন চিন্তা কবিতার মধ্যে ভিন্নতর প্রসারণ এনেছে। কবিতা ব্যক্তিগত থেকে বিশ্বগত হয়েছে। তাই কবির "চোখের ভেতরে জবুথবু / বসে আছে এক অন্ধ / প্রাচীন আত্মার মতো" এই নির্মাণের মধ্যে আমরা চমৎকৃত লক্ষ করি বিভাস কীভাবে ভয় থেকে ভয়হীনতায় উত্তীর্ণ হচ্ছেন। কীভাবে তিনি কোনও অপ্রত্যাশিত ইমেজ ব্যবহার করে বলছেন, "কুড়োনো হয়নি ঝরা পাতা! / চোখের ভেতরে দুঃখ আর / অন্ধ এক কবিতার খাতা..." (দর্শন) এখানেই আর একটি দিক তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয় — যেটি হচ্ছে সঙ্গীত। ফরাসি সিম্বলিস্ট কবিগণ, বিশেষত মালার্মে, কবিতার মধ্যে সঙ্গীতের অনুরণনের এক বিশেষ ভূমিকা আবিষ্কার করেছিলেন। Dashes as a musical device — জীবনানন্দের dash সম্পর্কে যা মনে হয় সেরকম বহু অদৃশ্য dash-এর মাধ্যমে সিম্বলিস্ট কবিতার সঙ্গীত আভাসিত। আসলে এই কবিতাটি সবদিক থেকেই মালার্মের কাব্যতত্ত্বের পরিপন্থী। এখানে কবি তাঁর জীবন এবং সাহিত্যের যাপনকে বিবৃত করেছেন। কোন্‌ উৎস থেকে বিবর্তিত হয়ে তিনি এসেছেন, তার নিরিখ এখানে স্পষ্ট। কবিকে তাই উচ্চারণ করতে হয়, 'যখন একলা লাগে, / শুঁয়োপোকাটির কাছে যাই / বলি, "উঠে এসো আমার পাতাটি খাও..." (সত্তা)। শুঁয়োপোকার সঙ্গে প্রজাপতি উড়ে বেড়ায় আমাদের ভাবনায়। বিভাস খুঁজে পান একাকীত্বের সফল রূপ। বিষণ্ণতা জীবনের সঙ্গেই লগ্ন হয়ে থাকে। যেমন, "মায়ের বাড়িতে থাকে বাবার মলিন ছবি / ভাঙা টালি, লাউলতা, ঝড়... / মাঝে মাঝে যাই" (মা আসবে না)। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের মায়ের কাছে যাই। খুঁজে পাই আশ্রয়ের বালকেন্দুবোধনিকেতন। অকপটেই কবি বলে ফেলেন, "আমার কবিতা-পোড়া দিনগুলি নাও — / শুধু / মা, তুমি আমার বাড়ি থাকো বাকিটা জীবন ... / সমস্ত মৃত্যুর থাকে জন্মটির কাছে দেনা। দুঃখ এক চিরসম্মোহন" (মা আসবে না)। এই আশ্চর্য অনুভব আর আজকের গতিময় জীবনের পাশে ফেলে রাখা, পৃথিবীর সমস্ত মা-এর ছবি খুঁজে পাই এক পরম ভাবনার দৃশ্যকল্পে। মনে হয় কবি নিজের কবিধর্মকে খুঁজে পান দুঃখের চিরসম্মোহনের দর্শনে।

"অনন্ত আশ্রম" - পরিক্রমায় আমরা যত এগোই মনে হয় জীবন ও জগতের দ্বিবাচনিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার মহত্তর লক্ষ্যে উত্তরণ-আকাঙ্খী কবি বহু স্বরসঙ্গতির পথ ও পাথেয় খুঁজে চলেছেন অবিরত। আপাত-সময় ও প্রকৃত-সময়ের দ্বিবাচনিক ঐক্য সন্ধান করেছেন তিনি। 'অনন্ত' ধারাবাহিকতার শেষ কবিতায় কবি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিলেন এমন চমৎকার একটি নিবিড় উচ্চারণ — "এমন জন্মাব, যাতে গাছেদের আঘাত না লাগে / আকাশে পাখির ডানা স্বাভাবিক থাকে, এমন জন্মাব" (দাউ) এরপরে কোথাও আর সংশয় থাকে কী কোনো? আসলে, পাঠক আজ সেই পাঠকৃতির সূত্রধার কবি যার আদি-বয়নের প্রস্তাবক মাত্র। "এমন জন্মাব আমি, কোনও জন্মদিন নেই যার ... / মৃত্যুর মতোই আমি এমন জন্মাব বারবার!" (দাউ) এইটাই আসলে আত্মবিদারক একবাচনিকতা অর্থাৎ শেষ সত্য নয়। শুধু অন্ধকারের ভিতর আরো অন্ধকার দেখে ফুরিয়ে যায় না কবির পরিক্রমা। কবির জীবনে নামে "আমার জীবনে নামে / সন্ধ্যার সন্ন্যাসী ... / জোনাকির মৃদু লেখাপড়া ..." (সন্ধ্যার সন্ন্যাসী) বলার দরকার পড়ে না, ভূমার এরকম উদাত্ত শান্তিগাথায় বিভাস তৃপ্ত থাকতে পারেন না বলেই তিনি তাঁর চিরাচরিত প্রস্থানভূমির সারাংশ পাঠকের কাছে দাখিল করেন।

"আশ্রম" এই প্রবেশক কবিতাটি সহজেই মনকে ছুঁয়ে যায়।

সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে।

সে যেন দুঃখিত।

সেতু ভেঙে পড়ে... আমি
উদাসীন বলে প্রচারিত।

অনেক আকাশ পাই...
সহজ আনন্দ যেন ধান...

কী এক রহস্য! দেখি
সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে... আর
             জড়িয়ে-পড়ার নাম স্নান

রবীন্দ্রনাথ 'আধুনিক কাব্য' প্রবন্ধে যে 'নিরাসক্ত মন' কে সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন মনে করেন শিল্পের ক্ষেত্রে, এ কবিতায় সেই নিরাসক্ত মন চারপাশের ঘটনাকে 'ব্যক্তিগত আসক্তভাবে না দেখে বিশ্বকে নির্বিকার তদগতভাবে' দেখে। জীবন যে নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে, এ কবিতায় সেই নিরাসক্ত চিত্তের একটি সমগ্রদৃষ্টি ক্যামেরার মতো প্যান করে কবি বিভাস সম্পর্কের যে আবহমান বীক্ষণ — প্রেম, দুঃখ, আনন্দের মন্তাজ উন্মোচন করেছেন তা "সম্পর্ক" শব্দটির যথার্থ প্রয়োগ। হয়তো এই সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরেই কবিকে বলতে হয় "যত কথা বলে ভালোবাসা, / তার বেশি কথা বলে ঘৃণা" (শিকার)। বিভাস আবহমানের মানবভাগ্য, সাধারণের জীবনকে এভাবেই দেখেন। "নৈশভোজ" কবিতাটিতে কবি প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ বিশ্বাসের এক অবাকদর্শনকে চিরকালীন ভাবে গড়ে তোলেন। খুঁজে পাই যৌনতার নার্সিসাস, প্রেমের প্রত্নটোটেম। বিভাসের এই কবিতা বহুবাচক দ্বি-স্বরিকতাকে মান্য করে হয়তো। কেননা ভাষার টানাপোড়েনে জীবনের আর জননের লীয়মান নির্জনতা প্রকট হয়। "প্রত্যক্ষ বিশ্বাস এই — / চুম্বনের বুনো নাম / লণ্ঠন হতে পারে ... / পরোক্ষ বিশ্বাসে দেখি, / দু'ঠোঁটে আলোর পোকা নৈশভোজ সারে" (নৈশভোজ)। আত্মজৈবনিক উপাদান গ্রথিত এই বাচনভঙ্গি যে নতুন ভাবনার পরম্পরা তৈরি করতে চাইছে, সে ইঙ্গিত আমরা পেয়ে যাই। তবু দৃশ্যের মহিমা থেকে সরে এসে দেখি, "তুমিও যতটা মাটি ... আমিও ততটা যেন ধান ..." (তুমিও যতটা মাটি) যেন জীবনের দেওয়া-নেওয়া, চাওয়া-পাওয়ার কথা কবি বলে গেলেন। আমরা সাময়িকভাবে লিবিডো-চিহ্ন অনুভব করলেও কবি আরও এক গভীর অনুভূতির ভরকেন্দ্রে পাঠককে বসিয়ে দিলেন।

বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা, বলা বাহুল্য, অপ্রাকৃত - রহস্যময় -ব্যাখ্যার অতীত কবিতা। তাঁর ভাবনায় ঈশ্বর যেমন বিমূর্ত, তেমনি আকাশও বিমূর্ত। অতএব শিল্পও বিমূর্ত হবে। এই বিমূর্ততা আকাশের শূন্যতার মতোই সত্য কিন্তু বিমূর্ত। এই বিমূর্ততা রবীন্দ্রসংগীত-প্রিয় কবির সংগীত-শরীরের মতো বিমূর্ত কিংবা জীবনানন্দ কথিত, 'অনুভূতিদেশ থেকে আলো' পাওয়ার মতো। এ আলো একই সঙ্গে মূর্ত ও বিমূর্ত। কেননা, সৃজনের মধ্যে কখনো কখনো এমন ধ্বনি পাওয়া যায়, এমন এক রঙ উদ্ভাসিত হয়, এমন গন্ধ উঠে আসে, এমন মানবিক কিংবা অমানবিক দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে — অথবা অসম্ভব এক যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়া যায়। সুতরাং, 'অনন্ত আশ্রম' কবিতায় কবিকেই বলতেই হয় — "গাছের একাই ভাল, নদীর ভেতরে ছায়া পড়ে ... / অনন্ত আশ্রম এক... শ্রমিক-মৌমাছি উড়ে আসে..." কীসের জন্য উড়ে আসে শ্রমিক মৌমাছি? প্রতিদিনের সমস্ত ঘটনার ঊর্ধ্বে যেখানে অন্তরের পিপাসা জন্ম নেয় — সেই মোমগ্রন্থির আশ্চর্য আত্মপ্রকাশের টানে, স্পন্দনের প্রজ্ঞালব্ধ অতীন্দ্রিয়জ আয়োজনে 'অনন্ত আশ্রম' এক খুঁজে নেন কবি।

আলঙ্কারিকগণ যাকে বাচ্যার্থ বলেছেন তা এসেছে অদ্ভুত অভিধা, তাৎপর্য এবং লক্ষণা থেকে। ব্যঞ্জনা হচ্ছে এই বাচ্যার্থ অতিক্রমী একটি অর্থ। কবিরা শব্দার্থের এই ব্যঞ্জনা ঘটিয়ে রসনিষ্পত্তি করেন। তবে শব্দ ও অর্থ যথার্থভাবে সংযুক্ত না হলে যেমন আহ্লাদ সৃষ্টি হয় না, তেমনি ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ না হলে ভাষা শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত হয় না। এজরা পাউন্ডের মতে কবিতা হচ্ছে 'গভীরতম ভাষা'। বিভাস সেই ভাষায় ব্যাপকতর এক দর্শনবোধের জাগরণ ঘটিয়েছেন অবলীলায়। তাই ব্যক্তিগত স্মৃতি কিংবা সত্তার সঞ্চিত নির্যাসে 'অনন্ত আশ্রম'-এর অলিন্দে আমি একজন 'আশ্রমিক' হয়ে উঠি অদ্ভুত ভাবে। কারণ, কবিতারও কিছু চোরাটান আছে, টানের অধিক।



(পরবাস-৬৫, ডিসেম্বর ২০১৬)




এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: