Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে
অংকুর সাহার

লেখা

বই


ISSN 1563-8685




স্বপ্নের ফেরিওয়ালা — হারুকি মুরাকামি


ওয়ান কিউ এইট্টি-ফোর (1Q84); হারুকি মুরাকামি; ইংরেজি অনুবাদ— জে রুবিন এবং ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল; প্রথম প্রকাশ: ২৫শে অক্টোবর ২০১১; ক্‌নফ, পৃষ্ঠাঃ ৯৪৪

|| ১ ||

বিহারের মতিহারী শহরে জন্মেছিলেন কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) — তাঁর প্রকৃত নাম এরিক আর্থার ব্লেয়ার। ১৯৪৪ সালে তিনি তাঁর জীবনের অন্তিম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন — যে উপন্যাস কাউকেও ক্ষমা করবে না। উপন্যাসটি বিদ্রূপাত্মক, ভবিষ্যবাদী এবং এক আতঙ্কময় দুঃস্বপ্নরাজ্যের কাহিনী। উপন্যাসটির নাম "ইউরোপের শেষ মানুষ"। লেখক ইতিমধ্যে যক্ষায় আক্রান্ত হলেন এবং তার কারণে দেরি হলেও উপন্যাসটির রচনা সমাপ্ত হল ১৯৪৮ সালে। পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশকের কাছে পাঠানোর ঠিক আগে তিনি উপন্যাসের নাম বদল করে রাখলেন "১৯৮৪"। আজ ছয় দশক পেরিয়েও সাহিত্য রসিকদের বিতর্কের বিষয় এই নাম পরিবর্তন। একই সঙ্গে নামটি এবং সালটি পরিণত হয়েছে এক সাংস্কৃতিক প্রতিমায়।

জাপানি ভাষায় "উনিশশো চুরাশি" লিখতে গেলে লিখতে হবে — ১-৯-৮-৪ অর্থাৎ "ইচি-কিউ-হাচি-ইয়ন" অর্থাৎ ইংরেজির "কিউ" বর্ণটি এবং জাপানি ভাষায় "৯" সংখ্যাটি সমধ্বনিময় অর্থাৎ হোমোফোন — কানে শুনতে একই রকম। হারুকি মুরাকামি রহস্যময় লেখক — কারণে, অকারণে পাঠকের সঙ্গে রসিকতা করতে পছন্দ করেন। তাঁর সাম্প্রতিকতম উপন্যাসের পটভূমি ১৯৮৪ সালের জাপান - কিন্তু এ ছাড়া জর্জ অরওয়েলের ষাট বছর আগে রচিত গ্রন্থটির সঙ্গে বিষয়গত বা কাহিনীগত বিশেষ যোগাযোগ নেই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর লেখক জানিয়েছেন যে তাঁরা একই সালকে দুজনে দুদিক থেকে লিখেছেন — অরওয়েল কল্পনা করেছেন ভবিষ্যতের কথা, চল্লিশ বছর সামনে এগিয়ে; আর মুরাকামি কল্পনা করেছেন অতীতের কথা, পঁচিশ বছর পিছিয়ে। আর ইংল্যান্ড ও জাপান দুটো দেশের মিলও অনেক — 'তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে যায়, ঘনঘন বৃষ্টি পড়ে আর মানুষজন খুব অসুখী'।

|| ২ ||

১৯৬৮ সালে আমি যখন দশম শ্রেণীতে পড়ি — এশিয়া থেকে দ্বিতীয়বার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন জাপানের ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (১৮৯৯-১৯৭২); তাঁর একটি নভেলার বাংলা অনুবাদের ধারাবাহিক প্রকাশ ঘটল 'দেশ' পত্রিকায়, অনুবাদক খুব সম্ভবত কাজুও আজুমা (১৯৩১-২০১১)। জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কিছুদিন পরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটি কবিতায় "উড়ে না যাই" এর সঙ্গে অদৃষ্টপূর্ব মিল দিলেন "ওসামু দাজাই" — আরেকজন সমকালীন জাপানি কথাসাহিত্যিক (১৯০৯-১৯৪৮); পরের পঙ্‌ক্তিতে শক্তি সেই লেখকের একটি উপন্যাসের নামও অলৌকিক ভাবে বসিয়ে — "অস্তগামী সূর্য" — মেদিনীপুরের গ্রন্থাগারে পাওয়া আমার দ্বিতীয় জাপানি সাহিত্য পাঠ। তারপরে একে একে পড়ি রিউনোসুকে আকিতাগাওয়া (১৮৯২-১৯২৭), ইউকিও মিশিমা (১৯২৫-১৯৭০), কেন্‌জাবুরো ওয়ে (১৯৩৫-) এবং অন্যান্য লেখকের রচনা। আর তার সঙ্গে অবশ্যই হারুকি মুরাকামি, বর্তমানের জনপ্রিয়তম জাপানি লেখক।

মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালের ১২ই জানুয়ারি — মা-বাবা দুজনেই জাপানি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক-শিক্ষিকা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সামরিক-অসামরিক মিলে প্রায় চল্লিশ লক্ষ জাপানি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। যুদ্ধ সমাপ্তির পরবর্তী দশকে ইয়োরোপ-আমেরিকার মতন সেখানেও শিশু-জন্মের জোয়ার আসে। শিশু মুরাকামি সেই 'বেবি বুম'-এর সদস্য। তাঁর জন্ম কিয়োটো শহরে, শৈশব কেটেছে আশিয়া এবং কোবে অঞ্চলে। স্কুলের পড়া শেষ করে তিনি টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যশাস্ত্রের অধ্যয়নে যান — সেখানে ভাবী স্ত্রী য়োকোর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। কলেজে পড়ার সময় পার্ট-টাইম কাজ করতেন এক রেকর্ড ও ক্যাসেটের দোকানে। ক্রেতাদের পশ্চিমি ধ্রুপদী এবং আধুনিক সঙ্গীত শোনাতে গিয়ে তাঁর নিজের রুচির ওপরেও তার প্রভাব পড়ে; পশ্চিমি সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমি সাহিত্য — তিনি কাফকা, চেকভ এবং মার্কিন লেখক কার্ট ভনেগাট (১৯২২-২০০৭) দ্বারা বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত। কিন্তু তখনও পর্যন্ত তাঁর লেখক হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়নি; কলেজে পড়তে পড়তেই তাঁরা বিয়ে করলেন এবং স্বামী-স্ত্রী মিলে টোকিওর কোকুবুন্‌জি অঞ্চলে "পিটার ক্যাট" নামে একটি কফি হাউস এবং জ্যাজ বার খুললেন; জমে উঠলো ব্যবসা। ১৯৭৮ সালে তাঁর বয়েস যখন তিরিশ ছুঁই ছুঁই, তিনি এক সন্ধেয় দুটি জাপানি ক্লাবের বেসবল খেলা দেখতে গেলেন — স্টেডিয়ামে বসে এক মার্কিন খেলোয়াড়ের ব্যাটিং দেখতে দেখতে তাঁর মনে হ'ল, একটা উপন্যাস লিখবেন। রাত্রে বাড়ি ফিরে লিখতে শুরু করলেন — পরের বছর ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হ'ল প্রথম উপন্যাস — "বাতাসের গান শোনো" এবং একটি সাহিত্য পুরস্কারের জন্যে নির্বাচিত হ'ল। উৎসাহ পেয়ে তিনি একটি সিকোয়েন্সও লিখলেন "পিনবল, ১৯৭৩"। এইভাবে তাঁর লেখক জীবনের সূচনা।

সাহিত্য ও পশ্চিমি সঙ্গীত ছাড়া তাঁর আর একটি প্রিয় বিষয় — দূর পাল্লার দৌড়; ১৯৮২ সাল থেকে শুরু করে তিনি নিয়মিত দৌড়ান — পৃথিবীর বিভিন্ন শহরের ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছেন এবং গন্তব্যে পৌঁছেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি জাপানের একটি অতি-কঠিন দূরপাল্লার দৌড় — ১৫০ কিলোমটারের আলট্রা-ম্যারাথন সমাপ্ত করেন। ২০০৮ সালে তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ লিখেছেন — "যখন আমি দৌড়ানোর কথা বলি, তখন আমি কী বলি"।

প্রথম দিকের রচিত উপন্যাসগুলি তাঁর নিজের মতে "দুর্বল" এবং তিনি বিদেশি ভাষায় অনুবাদের অনুমতি দেন নি। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত "নরওয়ের অরণ্য" উপন্যাস তাঁকে কমবয়েসি জাপানি পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে। জন লেনন-এর একটি গানের কলি থেকে উপন্যাসটির নাম। ২০০০ সালে গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ করেন জে রুবিন। প্রধান চরিত্র তরু ওয়াতানাবের মধ্যে লেখকের নিজের জীবনের ছায়া পড়েছে। জাপানি জীবনের জটিলতার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত "দম দেওয়া পাখির জীবন বৃত্তান্ত" উপন্যাসে (জে রুবিনের ইংরেজি অনুবাদ ১৯৯৭)। এক অকিঞ্চিৎকর বেকার যুবক তরু ওকাদার বেড়াল হারিয়ে যায়, স্ত্রী কুমিকো একদিন রাতে আর বাড়ি ফেরেন না, তারপর অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করে — বিলীন হয়ে যায় বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখা। পরবর্তী গ্রন্থ, ২০০২ সালে প্রকাশিত "সমুদ্র সৈকতে কাফকা" (পিটার গেব্রিয়েলের ইংরেজি অনুবাদ, ২০০৫) জাপানি ভাষায় রচিত এক আধুনিক গ্রিক ট্র্যাজেডি। এখানে অসংখ্য হেঁয়ালি ও প্রশ্ন, যাদের কোনো জবাব নেই — আর রয়েছে জাদুবাস্তবতা, মানসিক বিচ্ছিন্নতা এবং জাপানি শিন্টো ধর্মবিশ্বাসের সাবলীল আনাগোনা। জাপানি পাঠকেরা গ্রন্থটির বিষয়ে আট হাজারেরও বেশি প্রশ্ন করেছেন লেখককে — তিনি জবাব দিয়েছেন প্রায় এক হাজার প্রশ্নের, যদিও অনেক প্রশ্নের জবাব হয় না। এই উপন্যাসের অনেকগুলি চরিত্রই বেড়াল — তারা গম্ভীর, চিন্তাশীল এবং অল্পেই রেগে যায়।

|| ৩ ||

মুরাকামির সাম্প্রতিকতম উপন্যাস "1Q84" তিন খণ্ডে প্রকাশ করেছেন জাপানি প্রকাশক শিনকোশা — প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের প্রকাশ ২৯মে ২০০৯ এবং তৃতীয় খণ্ড ১৬এপ্রিল ২০১০। গ্রন্থের বিষয়ে কোনো তথ্য পাঠকদের না জানানো সত্ত্বেও প্রচুর আগাম অর্ডার এসেছিল প্রকাশকের কাছে। তিন বছর লেগেছে বইটি লিখতে। ইংরেজিতে গ্রন্থটির প্রচুর চাহিদার জন্যে দুজন অনুবাদককে বিভিন্ন অংশের অনুবাদের ভার দেওয়া হয়। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ইংরেজি অনুবাদের প্রকাশ — মার্কিন প্রকাশক ক্‌নফ (Knopf) গ্রন্থটি প্রকাশ করেন অখণ্ড একখণ্ডে; ইংল্যান্ডে হার্ডিন সেকার প্রকাশ করেন দুখণ্ডে। দু দেশেই গ্রন্থটি বেস্টসেলার তালিকায় স্থান পেয়ে যায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে।

২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সংখ্যা "দ্য ন্যু ইয়র্কার" সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় মুরাকামির গল্প "মার্জার শহর" — পরে জানা যায় সেটি এই উপন্যাসের অংশবিশেষ। কয়েক হপ্তা পরে ন্যাশানাল পাবলিক রেডিওতে তাঁর একটি গল্পের পাঠ শুনি — "চেহারা দেখে সব ভুলে যেও না" — সেটি এই উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ। এইভাবে উপন্যাসটি হাতে পাবার আগেই তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। বইটি পড়ার ভীষণ ইচ্ছে, কিন্তু প্রায় হাজার পাতা পড়তে ব্যস্ত মানুষের যান্ত্রিক জীবনে কতদিন লাগবে সেই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে আমি কাগজের বই এর বদলে তার শ্রবণ পুস্তকটি সংগ্রহ করি — ৩৮টি অডিও কমপ্যাক্ট ডিস্কে ৪৭ ঘন্টার রেকর্ডিং; তার পর সাত সপ্তাহ ধরে আপিস যাওয়া আসার পথে বই পড়ার বদলে বই শোনা — কিন্তু পাতা উলটে সহজে দেখে নেবার উপায় নেই এর পরে কী ঘটবে।

১৯৮১ সালে মুরাকামি একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন — "এপ্রিলের সকালে শতকরা ১০০ ভাগ নিখুঁত মেয়েটিকে দেখে" — তিন-চার পাতার গল্প — ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত "হাতি অদৃশ্য" গল্পগ্রন্থে গল্পটি সংকলিত হয়েছে। সাড়ে তিন দশক পরে তিনি সিদ্ধান্ত করলেন গল্পটি আবার নতুন করে লিখবেন। ন্যু ইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, "Basically, it is the same story — a boy meets a girl. They have separated and are looking for each other. It's a simple story. I just made is long." হ্যাঁ, দৈর্ঘ্যে অবশ্যই বেড়েছে কাহিনী - প্রায় হাজার পৃষ্ঠার কাছাকাছি!

মেয়েটির নাম আওমামে, নামের অর্থ "সবুজ কড়াইশুঁটি", বয়েস তিরিশের কাছাকাছি, পেশায় মাংসপেশির ব্যায়াম প্রশিক্ষক; যখন কাহিনীর শুরু তখন তিনি টোকিওর একটি আকাশচুম্বি হাইওয়েতে ট্যাক্সির মধ্যে নিশ্চল ট্র্যাফিকে আটকা পড়ে আছেন। ট্যাক্সির রেডিওতে বাজছে চেক সঙ্গীতকার লিওস য়ানাচেক (১৮৫৪-১৯২৮) রচিত মহতী, জনপ্রিয় অর্কেষ্টা - 'সিনফোনিয়েট্টা' (Sinfonietta); সঙ্গীতটি এই উপন্যাসের কেন্দ্রে এক আবর্তন-বিন্দু — লেখক বার বার ফিরে আসেন তার কাছে। আওমামের গন্তব্য স্থানটিও গভীর রহস্যে ঘেরা — তিনি অবসর সময়ে মাঝে মাঝেই গোপনে নরহত্যা করেন, পুলিশের ভাষায় তিনি 'সিরিয়াল কিলার' — আজকে তাঁর গন্তব্য একটি হোটেল, সেই কর্মসূত্রে। পরে আমরা জানতে পারি যে কাজটি কল্যাণকর, তিনি কেবল হত্যা করেন নারী-নিপীড়নকারীদের। আওমামের জরুরি কাজে দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে ট্যাক্সিচালক তাঁকে জানান যে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে হাইওয়ে থেকে নিষ্ক্রমণ পথ রয়েছে এবং সেখান দিয়ে বেরিয়ে গোপন সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে অন্যপথে তাঁর পক্ষে গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব। যদিও তাঁর পরনে জুনকো সিমাডা স্যুট ও মিনিস্কার্ট এবং চার্লস জর্ডান হিল তোলা জুতো — অসুবিধে সত্ত্বেও আওমামে বেড়া পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যান। সেই পথে তাঁর ১৯৮৪ থেকে "1Q84" এর জগতে উত্তরণ ঘটে। সেখানে পালটে যায় পুলিশের ইউনিফর্ম এবং পিস্তলের মডেল; আরও পরে আকাশে দেখা যায় দুটো চাঁদ — দ্বিতীয়টি ছোট, অনুজ্জ্বল এবং শ্যাওলাধরা সবুজ।

ছেলেটির নাম তেংগো কাওয়ানা — গণিতের সফল শিক্ষক এবং অসফল কথাসাহিত্যিক। তিনি কয়েকটি গল্প লিখেছেন এবং চেষ্টা করছেন এক মহতী উপন্যাস লেখার। তেংগো এবং আওমামে একই স্কুলে পড়তেন ছেলেবেলায় — তার পর অনেক বছর দেখা না হলেও তাঁদের গভীরভাবে মনে আছে একে অন্যের কথা। প্রকাশক বন্ধু কোমাৎসুর কাছ থেকে প্রস্তাব আসে এক সতেরো বছরের কিশোরীর লেখা অপরিণত অথচ প্রতিশ্রুতিময় উপন্যাস "বায়বীয় গুটিপোকা" ("Air Chrysalis") এর পরিমার্জনা নামে পুনর্লিখনের কাজ অর্থাৎ ঘোস্টরাইটিং — কাজটি বেআইনি না হ'লেও পুরোপুরি প্রথম শ্রেণীর লেখকের কাজ নয়। লেখিকা এরিকো ফুকাদা ছদ্মনাম নিয়েছেন 'ফুকা-ইরি'। অরওয়েলের গল্পে যেমন ছিল "বিগ ব্রাদার", ফুকা-ইরির গল্পে উপস্থিত হয় 'লিটল পিপল' — তারা অন্ধ, মৃত ছাগলের মুখ থেকে বেরোয় ব্যাঙাচির মতন, আস্তে আস্তে আকারে বাড়ে এবং মনোনিবেশ সহকারে গুটিপোকা বানায়। ফুকা-ইরির সংস্পর্শে তেংগোরও প্রবেশ ঘটে 1Q84 এর জগতে।

|| ৪ ||

এই পর্যন্ত লিখে আমার মনে হয় কাহিনীর সারমর্ম দেওয়া অসম্ভব, নিরর্থক এবং হাস্যকর। ঘটনাগুলি জটিল, সংকেতময় এবং বহুস্তরে বিভক্ত। বহু বছর ধরে মুরাকামি একটি বিশাল, গভীর, জটিল, বিস্তৃত, জগত-পরিবেষ্টিত উপন্যাস লেখার কথা ভাবছিলেন — এটিই সেই গ্রন্থ। তাঁর প্রিয় উপন্যাস "কারামাজভ ভাইয়েরা" — তাঁর মতে বিশ্বসাহিত্যের 'শিল্পিত পরশপাথর' — পুরো বইটি চারবার পড়েছেন তিনি। আলোচ্য গ্রন্থে যখনই 'শুভ ও অশুভের প্রকৃতি ও দ্বন্দ্ব' বিষয়ের অবতারণা ঘটবে, তখনই পাঠকের মনে পড়বে ইভান কারামাজভের কথা।

"1Q84" উপন্যাসটি আদতে কী? গা ছমছমে ক্রাইম থ্রিলার? মর্মস্পর্শী প্রেমকাহিনী? অলৌকিক আষাঢ়ে গল্প? রগরগে মেলোড্রামা? খোলামেলা যৌনতার কাহিনী? কোনো প্রশ্নের উত্তরেই জোর করে না বলা যাবে না। অতিবাস্তব, পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব — কোনো ছাঁচেই তাকে ফেলা যাবে না, অথচ সাহিত্যতত্ত্বের সবগুলি পরিচ্ছেদকেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু আমার মতে সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে ধর্মবিষয়ক গোঁড়ামি এবং ধর্মভিত্তিক গুপ্তগোষ্ঠী বা 'কাল্ট' এর বিরোধিতা। কাহিনীর খলনায়ক একটি ধর্মীয় গুপ্তসংস্থা - 'সাকিগাকে' — তার নেতা হলেন ফুকা-ইরির পিতা। ধর্মের নামে অসহায় বালিকাদের ধর্ষণ করতেন তিনি, নিজের কন্যাও বাদ যায় নি এবং সেই ঘৃণ্য কর্মের ধর্মতাত্ত্বিক সংজ্ঞা দেওয়া হত। আওমামে হত্যা করেন সেই পাপাচারীকে, কিন্তু তার আগে ধর্ম, দর্শন, নৃতত্ত্ব ও মানব-মানসিকতার দীর্ঘ আলোচনা চলে তাঁদের মধ্যে।

মানুষ মুরাকামি রহস্য ভালবাসেন, লেখক মুরাকামি রহস্যে পারদর্শী। উপন্যাসটিতে চরিত্রগুলি তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যায় ঘরে, আপিসে, ট্রেন স্টেশানে, গাড়িতে, পথে, লিফট বেয়ে ওঠানামায়, কিন্তু পাঠককে সতর্ক থাকতে হয় সর্বদা — হঠাৎ ঘটে যেতে পারে কোনো অলৌকিক বা আধিভৌতিক ঘটনা। সাধারণ পরিস্থিতিকে অসাধারণ করে তোলার নৈপুণ্যই তাঁকে দিয়েছে মহত্ব ও জনপ্রিয়তা। সেই কারণে স্থানে স্থানে পুনরাবৃত্তিতে ক্লিষ্ট এবং অতিকথনে ক্লান্ত হলেও "1Q84" বিশ্ব সাহিত্যের এক চমকপ্রদ মাইল ফলক।



(পরবাস-৬৫, ডিসেম্বর ২০১৬)




এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: