Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যর লেখা :



ISSN 1563-8685




অন্য কোনখানে


|| ১ ||

খ্রিঃ ২০৪০


“জেন্টলমেন, আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি, ডিফেন্স অ্যাডভান্স রিসার্চ প্রোজেক্ট এজেন্সি বা “ডারপা”-র স্যাটার্ন ক্লিপার মিশনটি শনিগ্রহের কক্ষপথের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে। ২০৩৩ সালে কেনেডি উৎক্ষেপণক্ষেত্র থেকে রওনা হয়ে সেটি প্রথমে সূর্যের দিকে যায়, তারপর সূর্যের অভিকর্ষকে কাজে লাগিয়ে গতিসঞ্চয় করে শনিগ্রহের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দেয়। এরপর সৌরজগত দিয়ে দীর্ঘ যাত্রাপথে যানটিকে আমরা ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলাম শক্তির সাশ্রয়ের জন্য। এই খবরগুলো আপনারা বিভিন্ন সময়ে আমাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই জেনেছেন। উৎক্ষেপণের সাত বছর পর গতকাল স্থানীয় সময় রাত বারোটায় সেটি শনিগ্রহের মাত্রই এক মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে পৌঁছোবার পর সেটিকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। এখন তা ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে। পর্দায় আপনারা তার পাঠানো প্রথম ছবিটি দেখতে পাচ্ছেন--”

তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে দেয়ালজোড়া হলোগ্রাফিক পর্দায় শনির অতিকায় গোলকটার ছবি ভেসে উঠল। মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে একটু অস্বস্তিভরা চোখে সেইদিকে দেখছিলেন ক্লিপারের প্রজেক্ট ডিরেক্টর ক্রিস্টোফার সোমক রায়। গোলকটার উজ্জ্বল পটভূমিতে একটা ছোট্ট কালো ফুটকি ভাসছে। সাধারণ দর্শকের কাছে ওর কোন আলাদা মূল্য না থাকলেও ওই ফুটকিটা গত কয়েক ঘন্টা ধরে তাঁর, এবং সেইসঙ্গে পেন্টাগনেরও ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

হাতের ফোনটা হঠাৎ মৃদু কেঁপে উঠল। মেসেজ এসেছে। অনেকক্ষণ ধরেই এর অপেক্ষায় ছিলেন সোমক। একটু পাশ করে দাঁড়িয়ে ফোনটা নিচু করে ধরে মেসেজটা দেখে নিলেন তিনি। পেন্টাগন থেকে কমান্ডার হেক্টর ব্রাউনের এসএমএস। সেখানে “তাইয়াং” শব্দটা ভাসছে। তার পর একটা অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ দেয়া রয়েছে লাল অক্ষরে। অর্থাৎ ওইখানটা গিয়ে পৌঁছোতে হবে তাঁকে। এবং অবিলম্বে।

ভুরুদুটো কুঁচকে উঠল সোমকের। এ পেশায় অনেকদিন হয়ে গেল। দুনিয়ার কোথায় এ লাইনে কী চলছে সে খবর রাখাটাও তাঁর কাজের মধ্যেই পড়ে। শব্দটা তাঁর পরিচিত। তবে মিটিংটা যেখানে ডাকা হয়েছে সেই স্থানাংকটা তাঁর পরিচিত নয়।

প্রেসবিবৃতির পর প্রশ্নোত্তরের পালা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। জেনি আর ওকাকুরা মিলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। মুখের হাসিটাকে ঝুলিয়ে রেখেই তাদের পাশ থেকে আস্তে আস্তে সরে এসে মঞ্চের বাইরে পা বাড়ালেন সোমক।

লিফটের ইন্ডিকেটর জ্বলছিল। নীচের দিকে আসছে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বোতামটা টেপবার আগেই সেটা হুশ করে নেমে চলে গেল। তার মানে এইখানেই আরো মিনিট কয়েক দাঁড়ানো ছাড়া গতি নেই। সিঁড়ি বেয়েই আটটা ফ্লোর পেরিয়ে ছাদে উঠে যাবেন নাকি তাই ভাবছেন এমন সময় পেছন থেকে একটা চেনা গলা পেয়ে মুখ ঘোরালেন সোমক। ‘হেরাল্ড’-এর ইব্রাহিম বড়ো বড়ো পায়ে এগিয়ে আসছিল। বহুদিনের বন্ধু সোমকের। সভার মধ্যে থেকে তাঁকে এভাবে উঠে আসতে দেখে ইব্রাহিমের সাংবাদিক ইন্দ্রিয়টা সতর্ক হয়ে উঠেছিল। দেরি না করে সে-ও তাঁর পিছু নিয়েছে। চোখাচোখি হতে নিচু গলায় প্রশ্ন করল, “কী রে? ইমপর্ট্যান্ট কিছু মনে হচ্ছে? একটু হিন্ট দিবি নাকি?”

একটু ইতস্তত করলেন সোমক। ইব্রাহিম আর তিনি একই সময়ে উপমহাদেশ থেকে এ দেশে এসেছিলেন ছাত্র হয়ে। তারপর পঁচিশটা বছর কেটে গেল। ইব্রাহিম এখন হেরাল্ডের চিফ সায়েন্স এডিটর। আর সোমক ‘ডারপা’য়।

পেশাগত তফাৎ থাকলেও বন্ধুত্বটা তাঁদের এতগুলো বছরে গভীরতরই হয়েছে। বিশেষ করে কয়েক বছর আগে জয়িতার মারা যাবার পর থেকে। সোমকের তখন প্রায় অপ্রকৃতিস্থ দশা। খবর পেয়ে এই ইব্রাহিম তার আফ্রিকান নিউজ ব্যুরোর প্রধানের পদ ছেড়ে এদেশে ফিরে এসেছিল এককথায়। তারপর দিনের পর দিন সোমককে নিজের কাছে রেখে তাঁর দেখভাল করেছে সে সময়টা। আজ তিনি যেখানে পৌঁছেছেন তার পেছনে সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোয় ইব্রাহিমের অবদান কম নয়। তার অনুরোধ তাই সচরাচর ফেলতে পারেন না তিনি।

কিন্তু আজকের বিষয়টা একটু আলাদা। নিজেকে শক্ত করলেন সোমক। ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে কর্তব্য এক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

“দুঃখিত, ইব্রাহিম। নো বাইটস্ নাও। এটা একেবারেই গোপনীয় ব্যাপার।”

সোমকের এ গলাটা ইব্রাহিমের অপরিচিত নয়। এই মুহূর্তে আর কিছু বেরোবে না এর কাছ থেকে। একটু আশাহত হলেও মুখে সেটা বুঝতে না দিয়ে সে বলল, “ঠিক আছে। তবে তুই হেন মিস্টার প্রোটোকল-এর এভাবে প্রেস মিট ছেড়ে বেরিয়ে আসা মানে গুরুতর কিছু খবর হবেই। সময় হলে এর ফার্স্ট এক্সক্লুসিভটা কিন্তু--”

“সে তোকে বলতে হবে না রে নোজি,” সোমক একটু হাসলেন। ইউনিভার্সিটির দিনগুলো থেকেই পরের হাঁড়ির খবর নিয়ে বেড়ানো ইব্রাহিমের এই ডাকনামটা তার পেশাটার জন্য বন্ধুমহলে এখনো চালু রয়ে গেছে।

লিফট এসে গিয়েছিল। সোমকের পিছুপিছু ইব্রাহিমও ভেতরে ঢুকে আসতে গেছিল। দরজায় দু হাত বাড়য়ে সোমক বললেন, “এখন নয় ইব্রাহিম। অল ইন গুড টাইম—”


********

শহরের সীমানা ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা এসে এল্ক্ নেক স্টেট ফরেস্ট। জায়গাটা নির্জন। টার্কি পয়েন্ট রোড নামে একটা রাস্তা সাপের মতন এঁকেবেঁকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে। তার একেবারে একটেরেতে একটা দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা বাড়িটাকে বাইরে থেকে একেবারেই সাদামাটা দেখায়।

বাড়িটার মাথার ওপর এসে সোমকের এক্সপ্লোরেয়ার পিএক্স সিরিজ কনভার্টিবলটা স্থির হয়ে গেল একেবারে। তার ডিসপ্লে বোর্ডে ‘ডেস্টিনেশান কো অর্ডিনেটস রিচ্‌ড’ শব্দগুলো ভাসছিল। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই একটা সরু লাল আলোর শিখা এসে গাড়ির স্বচ্ছ দেয়াল পেরিয়ে সোমককে ছুঁয়ে গেল। ‘ডারপা’র আরো একটা খেলনা। আইডেনটিটি স্ক্যানার। প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কর্মীর খবর রাখা থাকে ওর ডেটাবেসে।

বাড়িটার দরজার সামনে হেক্টর অপেক্ষা করছিলেন। সোমকের গাড়িটাকে নেমে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন। ভালুকের মত চেহারার মানুষটাকে দেখলে তিনি যে এমন গতিতে নড়াচড়া করতে পারেন তা কেউ সন্দেহই করবে না।


*******

“তাইয়াং? আপনি ঠিক বলছেন তো কমান্ডার?”

লম্বা লম্বা পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে উঠতে উঠতে হেক্টর হঠাৎ থেমে গেলেন। তারপর পেছন ফিরে বললেন, “ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। ভেতরে এলে অ্যালেনের কাছে সব জানতে পারবে। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছেন উনি।”

“অ্যালেন? মানে ডঃ অ্যালেন হাওয়ার্ড?” মনে মনে একটু চমকে উঠলেন সোমক। পেন্টাগনের যে কয়েকজন প্রতিরক্ষা গবেষক নিজস্ব গবেষণাগার থেকে কাজ করেন অ্যালেন তাঁদের মধ্যে একজন। খুব কম মানুষই এঁদের মুখোমুখি দেখা পান। যেটুকু অন্যের মুখে শুনেছেন, তাতে ইনি মহাকাশযানের দূরনিয়ন্ত্রণে সম্ভবত পৃথিবীর এক নম্বর।

“এ বাড়িটাই ওঁর গবেষণাগার সোমক। তোমার প্রাথমিক সন্দেহটা জানবার পর গত কয়েকঘন্টায় ক্লিপারের কমপিউটারকে নির্দেশ পাঠিয়ে বস্তুটার আরো কিছু বিবর্ধিত ছবি পাওয়া গেছে। সেগুলো দেখবার পরই আমরা অ্যালেনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এই মুহূর্তে ক্লিপার মিশনের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ওঁর কমপিউটারে সরিয়ে আনা হয়েছে। এই যে। এসো--”

বৃদ্ধ মানুষটি একটি বড়োসড়ো পর্দার সামনে ধ্যানস্থ হয়ে বসেছিলেন। পর্দায় যে ছবিটা ভাসছিল সেটার দিকে তাকিয়ে সোমক ফিসফিস করে উচ্চারণ করল, “এনসেলাদাস!!”

“একদম ঠিক সোমক,” মাথা না ঘুরিয়েই বৃদ্ধ বলে উঠলেন, “শনির এই উপগ্রহটা খুব রহস্যময়। তোমাদের ক্লিপারের এখন এর খুব কাছ দিয়ে ওড়বার কথা, তাইতো?”

“হ্যাঁ। অ্যালেন। ওটা আমাদের মিশনের অংশ। ওর ভূগর্ভস্থ সমুদ্র থেকে যে জলস্তম্ভগুলো উঠে শনির ‘ই’ বলয়ে বরফকুঁচির যোগান দেয় তার একটু নমুনা সংগ্রহ করে—”

“জানি সব জানি। স্যাটার্ন ক্লিপারের পেটের ভেতর রাখা তোমার এক্স এস সেভেন প্রোটোটাইপের কথাও আমি জানি। অতএব খবরের কাগজওয়ালাদের দেবার জন্য তৈরি গল্পগুলো আমাকে শুনিয়ে সময় নষ্ট না করলেও চলবে—” অধৈর্য গলায় সোমককে থামিয়ে দিলেন অ্যালেন, “ক্লিপার শনির আরো কাছে পৌঁছে বিপরীত দিক থেকে এই ছবিটা তুলে পাঠিয়েছে। তোমার ওই কালো ছোপটা এতে দেখতে পাচ্ছ?”

সোমক মাথা নাড়ল।

“এবারে উচ্চশক্তির ত্রিমাত্রিক ক্যামেরায় তোলা ছোপটার এই বিবর্ধনটা দেখ—”

কথা বলতে বলতেই কালো ছোপটা তীব্রবেগে এগিয়ে এসে তাদের সামনে বাতাসে ভেসে রইল। ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্ব। একেবারেই আসলের মত দেখায়। মসৃণ, ডিমের মত গড়নের একটা যান। ছোট স্কাইকারের মত আয়তন। তার গায়ে চীনা আর ইংরিজি ভাষায় লেখা হরফগুলো পরিষ্কার পড়া যাচ্ছিল। সেইদিকে একনজর দেখে সোমক চমকে উঠে বলল, “তাইয়াং সান রোভার!! কিন্তু কেমন করে হবে? আট বছর আগে সূর্যের কক্ষপথে পৌঁছে চীনাদের সে মিশন তো শেষ হয়ে গেছে?”

“উঁহু। শেষ যে হয়নি তা তো দেখতেই পাচ্ছো। ব্যাপারটা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন নয় সোমক। আমাদের ক্লিপার যেমনটা করেছে এ যানটাও সেই পথ নিয়েছে। সূর্যের কক্ষপথে পৌঁছোবার পর যানটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে তারপর গ্র্যাভিটেশনাল স্লিংশটের সাহায্য নিয়েছে এরাও। তফাতটা হল, কাজটা এরা ক্লিপারের থেকে কিছুদিন আগে আগে করেছে, আর আমাদের মতন দুনিয়াশুদ্ধ খবরটা প্রচার না করে সেটাকে আড়ালেই রেখে দিয়েছে, ব্যস! এনসেলাদাসের কক্ষপথে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থেকেছে কিছুদিন।”

“আশ্চর্য। আমাদের গভীর মহাকাশ নজরদারির নেটওয়ার্ক পৃথিবীর সঙ্গে প্রতিটি মহাকাশ অভিযানের যাবতীয় তথ্য আদানপ্রদানের ওপরে নজর রাখে। তারা কেন কিছু টের পেল না?”

উত্তরটা এল হেক্টরের কাছ থেকে, “এর একটাই ব্যাখ্যা হয়, তাইয়াং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। পৃথিবী থেকে কোন নির্দেশই তার প্রয়োজন হয়নি। সে নিজেও সম্পূর্ণ রেডিও নীরবতা পালন করে থেকেছে। যা তথ্য সংগ্রহ করেছে তা যানের যন্ত্রগণকেই জমা করে রেখেছে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায়।

“কিন্তু প্রশ্ন হল, এত গোপনীয়তা কেন? ঠিক কতোটা জানে এরা ক্লিপার মিশনের ব্যাপারে?” সোমক প্রায় নিজের মনেই বলছিলেন।

“সমস্তটা না হলেও, অন্তত আমরা যে বড়ো কিছু ঘটাতে চলেছি ওখানে সে আন্দাজটুকু ওরা করতে পেরেছে” ঘরের অন্য কোণায় নীরবে বসে থাকা ছোটোখাটো মানুষটি এইবারে মুখ খুললেন। সোমক এতক্ষণ তাঁকে খেয়াল করেননি।

হেক্টর তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিলেন, “হাই ডেভিড, ইনি ডঃ সোমক রায়, ক্লিপার অভিযানের নির্দেশক। সোমক, ডেভিড ব্রনসন আমাদের এস আই বি-র প্রধান।”

মানুষটার চোখের দৃষ্টি সাপের মত শীতল। হাতের স্পর্শটাও তাই। গত দু বছর ধরে চালু হওয়া এই স্পেস ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর কথা সোমক শুনেছে কিন্তু এই প্রথম তার কোন সদস্যকে সে মুখোমুখি দেখল।

“ক্লিপার অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ওরা জানে এ ব্যাপারে আপনি কি নিশ্চিত?” সোমকের গলায় একটু সন্দেহের স্পর্শ ছিল।

“আমারও এ ব্যাপারে একটু সন্দেহ আছে ডেভিড,” হেক্টর মাথা নাড়ছিলেন, “‘ডারপা’র এই প্রজেক্টের আসল উদ্দেশ্যটা নিয়ে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ স্তরের গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। এমনকি সেই গোপনীয়তার কারণেই বৃহস্পতির বদলে শনির বলয়ের আড়ালে লুকোনো এনসেলাদাসের কক্ষপথকে বেছে নেয়া হয়েছে এক্স এস সেভেনের প্রথম হাইপার জাম্পের পরীক্ষার জন্য।”

“তবু, আমাদের গোপনীয়তার ঘেরাটোপে নিঃসন্দেহে কিছু ফাঁক ছিল হেক্টর। নইলে সূর্য অভিযানের নাম করে ওরা এমন মরিয়া হয়ে স্যাটার্ন ক্লিপারকে অনুসরণ করল কেন?”

অ্যালেন মাথা নাড়লেন, “চীনারা চিরকালই গোপনতাপ্রিয় হন ডেভিড। ওঁদের প্রতিটি মহাকাশ অভিযানেরই গোটা মিশনটা কখনোই ওঁরা আগে থেকে জানান না। ফলাফলগুলোও বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাগালের বাইরেই থেকে যায়। এমনও তো হতে পারে যে এটাও তেমনই একটা সাধারণ বৈজ্ঞানিক অভিযান ওঁদের, আর কাকতালীয়ভাবে তা আমাদের অভিযানটার সঙ্গে একই সঙ্গে ঘটে গেছে?”

ডেভিড শীতল চোখে অ্যালেনের দিকে চেয়ে দেখলেন একবার। তারপর নিচু গলায় কেটে কেটে বললেন, “হতে অনেক কিছুই পারে ডঃ অ্যালেন। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় এটা নয়। এ ব্যাপারে সিনেটের সিদ্ধান্ত একটাই—এরা যেন আমাদের মূল পরীক্ষাটার সাক্ষী না থাকতে পারে। তার জন্য প্রয়োজনীয় যেকোন ব্যবস্থা আপনি নিতে পারেন। পেন্টাগনের তরফে হেক্টর ব্রাউন এখানে রয়েছেন। তিনিও আমার সঙ্গে একমত হবেন আশা করি।”

“অবশ্যই ডেভিড,” হেক্টর মাথা নাড়লেন, “অস্ত্রপ্রতিযোগিতার দৌড়ে এই মুহূর্তে চীন আমাদের চেয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি জনবসতি থেকে শুরু করে গ্রহাণুপুঞ্জ অবধি প্রত্যেকটি স্টেশন তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানার মধ্যে। এক্স এস সেভেনের পরীক্ষা সফল হলে তার জোরে সেই আধিপত্যকে একেবারে মুছে দিতে পারবে মার্কিন প্রশাসন। প্রয়োজন হলে আপনি পরীক্ষাটা কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দিন অ্যালেন। অথবা এদের নজরের আড়ালে নতুন কোন জায়গায়--”

“অসম্ভব,” হেক্টরের কথায় বাধা দিয়ে বলে উঠলেন সোমক, “আর মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যে পরীক্ষাটা না করলে—”

“আপনি সিনেটের সিদ্ধান্তকে অমান্য করছেন ডঃ রায়?” ডেভিডের গলায় চাপা রাগের স্পর্শ ছিল।

সোমক মাথা নাড়লেন, “এটা সিনেটকে অমান্য করবার ব্যাপার নয় ডেভিড। আমি বুঝিয়ে বলছি। শুনে নিয়ে তারপর আপনারা সিদ্ধান্ত নিন। ক্লিপারের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা এক্স এস সেভেন মডিউল আমাদের প্রথম পরীক্ষামূলক অতিআলোকগতিযানের মডেল। দেশকালের বুকে অতিমহাকাশীয় ছিদ্র তৈরি করতে বিপুল শক্তির প্রয়োজন হয়। তত শক্তিশালী ইঞ্জিনের প্রযুক্তি এখনো আমাদের নাগালের বাইরে। সমস্যাটার সমাধান আমি করেছি সম্পূর্ণ অন্যভাবে। আপনারা গ্র্যাভিটি ফোকাস বিষয়টি জানেন কি?”

“এটা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ক্লাসরুম নয় সোমক। কাজের কথায় আসুন,” ডেভিড চাপা রাগত গলায় বলে উঠলেন।

“না ডেভিড। সোমকের যুক্তিটা বুঝতে গেলে বিষয়টা আপনাদের খানিকটা বোঝা প্রয়োজন,” অ্যালেন তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “গ্র্যাভিটি ফোকাস সোমকেরই আবিষ্কার, কিন্তু আমি সম্ভবত তা একটু সহজে বুঝিয়ে দিতে পারব। এইদিকে দেখুন--”

সামনের প্রক্ষেপণক্ষেত্রের ছবিটা বদলে গিয়ে একটা ত্রিমাত্রিক জালের বুকে কিছু ভাসমান গোলকের ছবি ফুটে উঠল ধীরে ধীরে। মহাকর্ষের নিয়ম মেনে তাদের অবস্থানগুলো ক্রমাগত বদলে চলেছে। আড়াল থেকে অ্যালেনের গলা ভেসে আসছিল, “দেশকালের ঠাসবুনোট জালের ওপর এইভাবেই ঘুরে বেড়ায় মহাজাগতিক বস্তুপিণ্ডেরা। জালের গায়ে ফুটে ওঠা টোলগুলোর দিকে খেয়াল করুন। গ্রহনক্ষত্রের ভরের প্রভাবে দেশকালের বুকে এইভাবে ক্রমাগত কিছু বিকৃতির সৃষ্টি হয়ে চলে। মহাকাশে বেশ কিছু ভারী বস্তু যখন কাছাকাছি আসে সে সময় কিছু বিশেষ অবস্থানে তাদের মিলিত চাপ দেশকালের ঠাসবুনোটের বুকে একটা সুগভীর টোলের সৃষ্টি করে--”

বলতে বলতেই ভাসমান গোলকগুলো একটা নির্দিষ্ট অবস্থানে এসে থেমে গেল। তাদের বলয়টির ঠিক মাঝখানে একটা গভীর সুড়ঙ্গের মত খাঁজ তৈরি হয়েছে।

“জেন্টলমেন, এই হল সোমকের মূল আবিষ্কার যা এক্স এস সেভেন নামের স্বপ্নটির জন্ম দিয়েছে। এই হল গ্র্যাভিটি ফোকাস।”

বলতে বলতেই গোলকগুলি ফের তাদের চলাচল শুরু করেছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে ফের অগভীর হয়ে উঠছিল সেই খাঁজটি। ডেভিড গভীর মনোযোগ নিয়ে পর্দার দিকে তাকিয়েছিলেন। অ্যালেন থেমে গিয়ে আড়চোখে সোমকের দিকে একবার তাকাতে সে কথার সুতোটা তুলে নিল, “এই ফোকাসগুলো স্থানকালের দুর্বলতম বিন্দু। এক্স এস সেভেনের হাইপার ইঞ্জিন হল আসলে একটা গ্র্যাভিটন লেন্স। আশপাশের পরিবেশের থেকে মহাকর্ষের উৎস গ্র্যাভিটন কণাকে তা একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করতে পারে। আর--”

“সঠিক সময়ে তাই দিয়ে গ্র্যাভিটি ফোকাসে একটা নিয়ন্ত্রিত আঘাত অতিমহাকাশীয় সুড়ঙ্গের জন্ম দিতে পারে। অসাধারণ আবিষ্কার সোমক। কিন্তু তার সঙ্গে পরীক্ষা পিছিয়ে দেবার সম্পর্ক কোথায়?” ডেভিড কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে দেখলেন সোমকের দিকে। সে দৃষ্টিতে এইবার কিছুটা শ্রদ্ধা এসে মিশেছে।

“উত্তরটা আমি দিচ্ছি ডেভিড,” অ্যালেন কথা বললেন ফের, “এই ফোকাস কয়েক ঘন্টার বেশি স্থায়ী হয় না। বস্তুর অবস্থান বদলে যাবার সঙ্গেসঙ্গে দেশকাল ফের স্থিতাবস্থায় ফিরে যায়। দ্বিতীয়ত, সৌরজগতের কাছাকাছি এলাকায় প্রতিমুহূর্তে এইধরনের অজস্র ফোকাস তৈরি হয়ে চললেও তাকে খুঁজে বের করবার প্রযুক্তি এই মুহূর্তে শিশুস্তরে রয়েছে। এ সুযোগটা হারালে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে পরীক্ষাটা।”

“কিন্তু তাইয়াং-এর উপস্থিতিতে এ পরীক্ষাটা করতে দিতে সিনেট একেবারেই সম্মত নয়। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়লে নাহয় পরীক্ষাটা উপস্থিত বাতিল--”

ডেভিডের কথা শেষ করতে না দিয়েই ফের মুখ খুললেন অ্যালেন, “তাইয়াং-এর উপস্থিতি জানবার পরে, এ অবস্থাটা যে আসতে পারে তা আমি অনুমান করেছিলাম। একটা সমাধান আছে। আমি সেটার কাজ এগিয়েও রেখেছি। পদ্ধতিটা একটু বিপজ্জনক, কিন্তু আমি সামলে নিতে পারব। এই সিমুলেশানটা একবার দেখুন—”


********

--“কী মনে হয় আপনাদের? সম্ভব?”

সিমুলেশান শেষ হয়ে গিয়েছিল। ঘরে হাজির অন্য তিনজন স্তম্ভিত হয়ে খালি পর্দাটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন তখনও। মানুষটিকে মহাকাশযানের দূরনিয়ন্ত্রণের ঈশ্বর বলে কেন ডাকা হয় তার একটা আন্দাজ এইবারে তাঁরা পেয়েছেন। খানিক বাদে হেক্টর মাথা নেড়ে বললেন, “আমি বিজ্ঞানী নই, কিন্তু আকাশযুদ্ধে দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলতে পারি, গোপনীয়তা বজায় রেখে পরীক্ষাটা করতে হলে এই চেষ্টাটা ছাড়া আর কোন পথ আমাদের সামনে খোলা নেই। আপনারা কাজ শুরু করুন অ্যালেন। আশা করি ডেভিডেরও কোন আপত্তি নেই সে ব্যাপারে--”

ডেভিডের থেকে কোন জবাব আসবার আগেই অ্যালেন সামনের নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে দ্রুত আঙুল চালাতে শুরু করেছিলেন। আস্তে আস্তে ঘরের আলো কমে এল। সামনের পর্দাগুলোও নিস্তেজ হয়ে এসেছে। আধো অন্ধকারে তাঁর গলা ভেসে এল হঠাৎ, “এসো সোমক, শুরু করা যাক। কী করতে হবে তা সিমুলেশন থেকে বুঝে নিয়েছ আশা করি। কোনো প্রশ্ন?”

সোমক মাথা নাড়ল। পরিকল্পনাটায় তার ভূমিকা সীমিত। সে কাজটুকু করতে তার কোন সমস্যা হবার কথা নয়।

“বেশ। কাজটা আমি আমার নিজস্ব দূরনিয়ন্ত্রণ সফটওয়ার দিয়ে করব। সেটাতে ক্লিপার আর এক্স এস সেভেনের নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। তুমি এক্স এস সেভেনের নিয়ন্ত্রণ নাও। ক্লিপারকে আমি সামলাব--”

বলতে বলতেই চেয়ারদুটির ওপর থেকে দুটো হেলমেট নেমে এসে ওঁদের মাথা আর চোখ ঢেকে দিয়েছে। হাতলের গা থেকে বের হয়ে আসা দস্তানাদুটো হাতে গলিয়ে নিতেই হঠাৎ দৃশ্যপট একেবারে বদলে গেল সোমকের সামনে। স্পিকারে অ্যালেনের গলা ভেসে আসছিল, মনে করো তুমি এক্স এস সেভেনের ককপিটে বসে আছো। তোমার সামনে এর কন্ট্রোল প্যানেলের একটা ছবি সামনে দেখতে পাচ্ছো আশা করি। ওটা তোমাদের মিশন কন্ট্রোল রুমে আসল কন্ট্রোল প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত। মনে করো এটা একটা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেম সোমক। এবারে ওই প্যানেলেই যা নির্দেশ দেবার, দাও। যতটুকু কাজ তোমার করবার কথা সেটুকু শেষ হলে ও আপনিই থেমে যাবে। অল দা বেস্ট--”

সোমকের চারধারে তখন এক্স এস সেভেনের ককপিটের পরিচিত দৃশ্যটা ভাসছে। সামনের কন্ট্রোল প্যানেলের ওপরে সে আঙুল বাড়িয়ে দিল। হাইপার ইঞ্জিন চালু হয়েছে। কুড়ি সেকেন্ডের একটা কাউন্টডাউন চালু করে দিয়েছিল সোমক ইঞ্জিন চালু করবার সঙ্গেসঙ্গে। সেটা কমতে কমতে আটের ঘর ছুঁতেই দরজা খোলবার বোতামটা টিপে ধরল সে—

--ক্লিপারের কার্গো বের দরজা খুলে যাচ্ছে তার সামনে। আস্তে আস্তে সেখান দিয়ে বাইরের মহাশূন্যে বের হয়ে আসছিল এক্স এস সেভেন—সামনে কিছুটা দূরে একটা ঘন বেগুণী রঙের গর্ত আকাশের গায়ে পাক খাচ্ছে—দূরত্ব নির্দেশক যন্ত্র দেখাচ্ছিল জিনিসটা রয়েছে একশো কিলোমিটার দূরে। তার একেবারে কেন্দ্রের সঙ্গে যন্ত্রটার অভিমুখ বেঁধে দিয়ে সে সেটাকে পূর্ণগতিতে সামনে ঠেলে দিল—

“প্রোগ্রাম রেকর্ডিং সম্পূর্ণ হয়েছে—” একটা সুরেলা কন্ঠস্বর জানান দিচ্ছিল। সামনের মহাকাশের ছবিটা মিলিয়ে গেছে। হেলমেটটা খুলে ফেলল সোমক। অ্যালেনেরও কাজ শেষ হয়ে গেছে ততক্ষণে। মাথার থেকে হেলমেটটা খুলে ফেলে তিনি সোমকের দিকে চেয়ে হাসলেন, “ওয়েল ডান সোমক।”


“অ্যালেন? কাজটা--” ডেভিডই ঘরের নৈ:শব্দ ভাঙলেন প্রথম।

“যতটুকু পারি করেছি। আমাদের দুজনের নির্দেশগুলোকে একত্র করে একটা ব্যাচ ফাইল তৈরি করে দেয়া হয়েছে। যানের কমপিউটারে সেটা পৌঁছে গেলে বাকি গোটা কাজটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে।"

"জিরো আওয়ার?"

"দেরি আছে। পৃথিবী থেকে সত্তর আলোমিনিট দূরে রয়েছে যানগুলো। ব্যাচ ফাইলটা রেডিও করা হয়েছে এইমাত্র। যানের কমপিউটারে পৌঁছোনর সঙ্গে সঙ্গে তা কাজ শুরু করবে। তবে তার ফল টের পেতে এখনো অন্তত একশো চল্লিশ মিনিট দেরি আছে। বাকিটা ঈশ্বরের হাতে। আশা করা যায় আপনাদের সংস্থার নিরাপত্তাবেষ্টনী থেকে আমাদের এই মুহূর্তের কাজকর্মের কোন খবর চীনাদের কাছে পৌঁছোবে না--”

আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ডঃ অ্যালেন,” মৃদু হেসে কাঁধ ঝাঁকালেন ডেভিড।


********

ঘড়ির গায়ে ভাসমান সংখ্যাগুলো আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছিল। ঘরে হাজির চারজন মানুষের মধ্যে একমাত্র অ্যালেনই একেবারে অনুত্তেজিত রয়েছেন। গত অর্ধশতাব্দি ধরেই মহাকাশযান দূরনিয়ন্ত্রণের কাজ করে চলেছেন তিনি। শতাব্দি বদলে গেছে। কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে কমান্ড পাঠিয়ে মহাকাশযান নিয়ন্ত্রণের যুগ শেষ হয়ে গেছে এক দশক আগে। তারপর, কন্ঠচালিত নিয়ন্ত্রণের যুগ পেরিয়ে ভার্চুয়াল দূরনিয়ন্ত্রণের আধুনিকতায় এসে পৌঁছেছে প্রযুক্তি। কিন্তু প্রযুক্তির তিনটে প্রজন্ম পেরিয়ে আজও এই কাজটিতে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নাতীত। সেইসঙ্গে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এ কাজে সাফল্য আর ব্যর্থতাকে একভাবে গ্রহণও করতে শিখেছেন। সে’সব উত্তেজনা আর তাঁকে নাড়া দেয় না।

খানিক বাদে উঠে গিয়ে ভেতর থেকে গোটাকয়েক বার্গার নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখলেন অ্যালেন। তারপর তার থেকে একটা তুলে নিয়ে ছোটো ছোটো কামড়ে খেতে খেতে ট্রে-টা বাড়িয়ে ধরলেন অন্যদের দিকে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই একেবারে কোন ভুমিকা ছাড়াই কম্পিউটারের স্পিকার থেকে বাঁশির সুরের মত একটা শব্দ বেরিয়ে এল। পর্দার দৃশ্যে একটা বদল আসতে শুরু করেছে। উত্তেজিত মানুষগুলি সেদিকে গিয়ে ঝুঁকে পড়লেন। পর্দায় তখন হঠাৎই ক্লিপারের শরীর থেকে ছোটো ছোটো একঝাঁক ক্যামেরা বের হয়ে এসে উড়াল দিয়েছে বিভিন্ন দিকে ও দুরত্বে—

গোটা পর্দাটা কুড়িটা ভাগে ভাগ হয়ে একেকটা ক্যামেরার দৃষ্টিক্ষেত্রকে দেখাচ্ছিল। এর মধ্যে দুটো প্রধান দৃষ্টিক্ষেত্রকে চালু রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিলেন অ্যালেন। রেকর্ডিংগুলো পরে কখনো দেখলেই চলবে।

হঠাৎ একটু নড়ে উঠল ক্লিপার। তারপর হঠাৎই সটান ধেয়ে গেল তাইয়াং-এর দিকে। একেবারে মুখোমুখি পৌঁছে আশ্চর্য দক্ষতায় নিজের গতিকে সামলে নিল সে। তারপর অ্যাটিচুড কন্ট্রোল থ্রাস্টারের সুকৌশলি ধাক্কায় নিজেকে একটু একটু করে আগুপিছু করে সম্পূর্ণ ঢাকা দিয়ে দিল ছোট চীনা যানটাকে।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটা কানফাটানো তীক্ষ্ণ শব্দ জেগে উঠেছিল। অ্যালেন তাড়াতাড়ি কন্ট্রোল প্যানেলের একটা বোতামকে ছুঁয়ে কমিয়ে আনলেন শব্দটাকে।

তারপর ডেভিডের দিকে ফিরে বললেন, “ভিশুয়ালস আটকানো গেছে জেন্টলমেন। তাইয়াং এখন ক্লিপারের কাঠামোকে পেরিয়ে সামনে কিছুই দেখতে পারবে না। সেইসঙ্গে স্ট্যাটিকের একটা আবরণে ক্লিপার ঘিরে দিয়েছে তাইয়াংকে। কিছুক্ষণের জন্য তাইয়াং-এর সমস্ত বেতার যোগাযোগ আটকে যাবে ওতে। বেজিং-এর কন্ট্রোল রুমে এখন শুধু এই শব্দটা এসে পৌঁছচ্ছে--”

তাঁর কথাগুলো শেষ হবার আগেই ক্লিপারের পেছনদিকে প্রায় শ খানেক কিলোমিটার দূরে অন্ধকার আকাশের গয়ে একটা তীব্র বেগনি আলোর ছটা দেখা দিল।

“জেন্টলমেন, এক্স এস সেভেন এইবারে তার হাইপার এঞ্জিন চালু করছে। মানুষের নক্ষত্র অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ। দেশকালের ঠাসবুনুনির মধ্যে এইবারে খুলে যাবে অতিমহাকাশের গহ্বর—মানুষের প্রথম আন্তর্নক্ষত্র ঝাঁপ। —কাউন্ট-ডাউন শুরু হচ্ছে—কুড়ি-উনিশ-আঠারো--সতেরো--”

বেগনি আলোর ছটাটা আস্তে আস্তে ঘুরতে ঘুরতে একটা অতিকায় ঘুরন্ত গহ্বরের রূপ নিচ্ছিল। কাউন্ট-ডাউন আটে নেমে আসতে ক্লিপারের পেছনের দিকের একটা অংশ খসে গিয়ে ভেসে গেল অভিকর্ষহীন শূন্যতায়। সেই ফাঁক দিয়ে তখন আস্তে আস্তে মুখ বাড়াচ্ছে অবিকল আগের শতাব্দির স্পেস শাটলের মত দেখতে একটা ছোট যান।

হঠাৎ তীব্র কমলা রঙের একটা আগুনের স্রোত পেছন দিকে ছিটিয়ে দিয়ে সামনে ছুটে গেল এক্স এস সেভেন। আর ঠিক তখনই হঠাৎ একটু নড়েচড়ে উঠল খানিক দূরে ক্লিপারের সতর্ক পাহারার আড়ালে থাকা তাইয়াং। তার পেছন দিকে ভাসমান একটা ক্যামেরার সম্প্রচারকে পর্দায় তুলে আনতে আনতে নিজের মনেই বিড়বিড় করছিলেন অ্যালেন, “শয়তানের দল। ওরা এক্স এস সেভেনের শক্তিবিচ্ছুরণ সংকেত চেনে। আগে থেকেই তাইয়াং এক্স এস সেভেনের জেগে ওঠবার অপেক্ষায় ছিল—”

পরীক্ষামূলক মহাকাশবিমানটি তখন গহ্বরটির দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। হঠাৎ তাইয়াং-এর গা থেকে দুটো অগ্নিশলাকা বের হয়ে এসে ক্লিপারকে বেড় দিয়ে ধাওয়া করল এক্স এস সেভেনকে। তার একটা গিয়ে সরাসরি মরণ আঘাত হানল এক্স এস সেভেনের গায়ে। একটা বিরাট অগ্নিপিণ্ড হয়ে জ্বলে উঠে ফেটে পড়ল তা। আর অন্যটা পথভ্রষ্ট হয়ে সটান এগিয়ে গিয়ে ঢুকে গেল সামনে ঘুরতে থাকা গহ্বরটার মধ্যে। পরের মুহূর্তেই উধাও হল দেশকালের মধ্যে জাগিয়ে তোলা সেই অতিমহাকাশসঞ্চারী ফাটল।

অ্যালেন মাথা নেড়ে হতাশ গলায় বললেন, “আলফা সেন্টাউরির জন্য পার্থিব মানবসভ্যতার প্রথম উপহার—একটি তাপসন্ধানী আণবিক মিসাইল। হা ঈশ্বর!”

পর্দায় ততক্ষণে দৃশ্যপট বদলে গেছে। আগে থেকে দেয়া নির্দেশ মেনে ক্লিপার যানটি তখন সম্পূর্ণ গতিসাম্য অর্জন করেছে তাইয়াং-এর সঙ্গে। তারপর তার শরীর থেকে দুটি যান্ত্রিক হাত বের হয়ে এসে চেপে ধরল যানটিকে।

প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই সজীব হয়ে উঠল অ্যালেনের মূল যন্ত্রগণকটি। তার পর্দায় একটা সবুজ রেখা বাঁদিক থেকে বাড়তে বাড়তে ক্রমশ এগিয়ে চলেছিল ডানদিকে। তাইয়াং-এর সঞ্চিত সমস্ত তথ্যকে সেখান থেকে সরিয়ে এনে ক্লিপারের যন্ত্রগণক তা পাঠিয়ে দিচ্ছে তার পার্থিব প্রভুদের যন্ত্রে।

কিন্তু তথ্য ডাউনলোড সম্পূর্ণ হবার আগেই হঠাৎ পর্দাটা অন্ধকার হয়ে গেল। অ্যালেন চেয়ার ছেড়ে ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত কয়েকটা বোতামে হাত ছুঁইয়েই টেবিলে থেকে সরে এসে দাঁড়ালেন, “ডেভিড, হেক্টর, উপগ্রহ সংযোগ কেটে গেছে। কী হল?”

ডেভিডের হাতের ফোনটা তখন সচল হয়ে উঠেছে আবার। তাতে কান ছুঁইয়ে একটুক্ষণ শুনে নিয়ে ফোনটা নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, “হোয়াইট হাউসের হটলাইনে চীন তাদের তাইয়াং যানের ওপর হামলার জন্য সরাসরি দায়ী করেছে আমেরিকা সরকারকে। চীনা মহাকাশ স্টেশন তিয়াংগং থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে ক্লিপারের আরিজোনা এবং অ্যান্টার্কটিক ট্র্যাকিং কেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আমরা আক্রান্ত—”

অ্যালেন কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে আছড়ে ফেললেন সামনের টেবিলে। বিড়বিড় করে বলছিলেন, “আগুন লেগেছে সোমক। এবার সারা পৃথিবী পুড়বে। এর জন্য আমি দায়ী। আ-আমি-আমি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না—”


|| ২ ||

খ্রিঃ ২০৯০


“দেবর্ষী--”

সামনের পরীক্ষাযন্ত্রটি থেকে চোখ সরিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়ালেন হবিষ্ট। পরীক্ষাগারের অন্ধকারের মধ্যে নেরার মুখের একটি ছবি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল। ক্ষিতিজও হাতের কাজ রেখে এসে তাঁর পাশে দাঁড়ালেন।

“কোথায় রয়েছ তুমি?”

“এখনও পৃথিবীর আবহমণ্ডলেই রয়েছি।”

“কাজ শেষ হয়েছে?”

“হ্যাঁ দেব। আপনার আদেশ অনুযায়ী এ গ্রহের এই মুহূর্তের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল মানুষ ও মৃত্যুসাধকদের জিনের নমুনা সংগ্রহ করবার কাজ আমার শেষ।”

“তাহলে এখনও ফিরে এলে না কেন? যাত্রার বিলম্ব হচ্ছে।”

“আমাদের আকাশগঙ্গা ছেড়ে যাবার আগে কয়েকটি বিষয় আপনাদের জানিয়ে কিছু আদেশ নেবার ছিল।”

হবিষ্ট বিরক্ত হচ্ছিলেন, “আমাদের এখানে অপেক্ষার কাল শেষ হয়েছে নেরা। নৌযানের বুকে বাস্তুতন্ত্রের নির্মাণ শেষ। তুমি তো জান, এইবার উত্তরসূরীদের পরিবর্তিত কোষগুলিকে পরিস্ফূটনের আগে এই নমুনা সংগ্রহ অভিযান শুধুমাত্র একটি নিয়মমাফিক পদক্ষেপ। সেক্ষেত্রে--”

“জানি, কিন্তু তা করতে গিয়ে একটি অপ্রত্যাশিত তথ্য বের হয়ে এসেছে। উত্তরসূরীজাতির পরিস্ফূটনের আগে আপনার তা জানা প্রয়োজন। যদি অনুমতি দেন--”

“বল--”

“অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি, এঁদের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল মানুষরাই শ্রেষ্ঠ মৃত্যুসাধকও হয়ে উঠছেন। একই জিনসংস্থান একসঙ্গে দুটি বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিচ্ছে।”

“বিস্ময়কর। ঈশ্বরজীব বা দানবজীব কারো মধ্যেই এমন বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ আগে পাওয়া যায় না। তবে এটি কোন আকস্মিক সমাপতনও হতে পারে। নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতিতে কোন ভুল হয়নি তো!”

“আমারও তাই সন্দেহ হয়েছিল। তাই এদের সৃজনশীলতা ও মৃত্যুসাধনার সম্পর্ক নিয়ে একটি দ্বিতীয় বিশ্লেষণ করেছি আমি। অনুমতি দিলে তার ফলাফল আপনাদের মস্তিষ্কে সঞ্চারিত করতে পারি।”

বলতে বলতেই তাঁদের অনুমতির অপেক্ষা না করে প্রক্ষেপণক্ষেত্র থেকে দুটি সূক্ষ্ম তথ্যরশ্মির স্রোত এসে দেবর্ষীদের কপাল স্পর্শ করেই ফের নিভে গেল।

কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থেকে হবিষ্ট যখন ফের কথা বললেন তখন তাঁর গলায় উত্তেজনার স্পর্শ ছিল, “অসম্ভব নেরা। তোমার বিশ্লেষণে কোন গাণিতিক ত্রুটি রয়েছে।”

“যন্ত্রমস্তিষ্ক ভুল করে না দেবর্ষি। তথাপি বলি, বিশ্লেষণটি আমি নিজে একাধিকবার পরীক্ষা করেছি। এটি নির্ভুল।”

“তবু, নিঃসন্দেহে কোথাও একটা ভুল থেকে যাচ্ছে নেরা। তোমার বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, যুদ্ধ ও সৃজনশীলতা এদের প্রগতিতে পরিপূরক ভুমিকা নেয়। অথচ, ইতিহাস বলে প্রাণঘাতী যুদ্ধ কোন জাতির প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চালিকাশক্তি হতে পারে না। যুদ্ধ যেকোন জাতির বৌদ্ধিক দুর্বলতা আনে। ঈশ্বরজাতি বা দানবজাতিও কোনকালে প্রকৃতির সেই নিয়মের বিরুদ্ধে যায়নি।”

নেরার মুখ কঠিন হল, “তথ্যগুলি সমস্তই আপনাদের চেতনায় সঞ্চারিত হয়েছে দেবর্ষী। গত চার হাজার বছর ধরে এদের অগ্রগতির প্রতিটি প্রধান সময়কালকে একবার দেখুন। আগুনের আবিষ্কার, চাকা, আণবিক শক্তি, মহাকাশ ভ্রমণ--এদের প্রতিটি যুগান্তকারী আবিষ্কারই কোন হিংস্র, স্বজনঘাতী যুদ্ধকে প্রয়োজনীয় ইন্ধন জোগাবার চেষ্টায় ঘটেছে।”

“তুমি দাবি করছ, যুদ্ধ ও হত্যা এদের মস্তিষ্কের মেধা ও সৃজনক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে শক্তিশালী করে তোলে?”

নেরা মৃদু হাসল, “আমার যন্ত্রমস্তিষ্ক কেবল পরীক্ষাগুলিই করতে জানে দেবর্ষী। তার থেকে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আমার সাধ্যের বাইরে। সে শক্তিতে কেবল দেবর্ষীদের অধিকার। এখন আমার ওপর আদেশ কী? আরো কোন তথ্য সংগ্রহের ভার আমাকে দেবেন কি?”

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হবিষ্ট বললেন, “উপস্থিত তার আর কোন প্রয়োজন হবে না নেরা। তুমি নমুনাগুলি নিয়ে ফিরে এস।”

“আদেশ পালিত হবে দেবর্ষী। কিন্তু আরো একটি আপাততুচ্ছ বিষয়ও আমি গত কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করেছি এই গ্রহের আবহমণ্ডলে। সেটির বিষয়ে সামান্য একটু অনুসন্ধানের অনুমতি চাই।”

“বল।” হবিষ্টর গলায় সামান্য সম্ভ্রমের স্পর্শ ছিল। এই যন্ত্রমস্তিষ্ককে তিনি আর ততটা অবহেলা করতে পারছেন না এই মুহূর্তে।

“পঞ্চাশ বছর আগে শনির বলয়ে পার্থিবরা প্রথম অতিমহাকাশ সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরীক্ষাটি করেছিল অভিকর্ষ রশ্মির ব্যবহার করে। তারপর থেকে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ শুরু হবার পর সেখানে বিষয়টি নিয়ে আর কোন প্রধান গবেষণা হয়নি তা আমরা জানি।”

“হ্যাঁ। ওই গ্রহের নিকটস্থ মহাকাশে অভিকর্ষ রশ্মির আর কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি।”

“অথচ গত কয়েকদিন ধরেই এ গ্রহের কক্ষপথ থেকে আমি অভিকর্ষ রশ্মির কিছু কিছু দুর্বল সংকেত অনুভব করছি। সংকেতগুলি আসছে ভূপৃষ্ঠের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে। ফিরে আসবার আগে আমি তার উৎসটির বিষয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে নিতে চাই।”

“বেশ। তবে এখন অবধি সংগ্রহ করা জিনসংকেতের নমুনাগুলিকে অবিলম্বে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর।”

“আদেশ পালিত হচ্ছে—”

বলতে বলতেই গবেষণাগৃহের ঠিক মাঝখানে একটি ছোটো অতিমহাকাশ সুড়ঙ্গের মুখ খুলে যাচ্ছিল। ক্ষিতিজ সেদিকে এগিয়ে গেলেন। সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে কয়েকটি ছোটো ছোটো আধার বের হয়ে আসছিল। সেদিকে দেখে নিয়ে হবিষ্ট বললেন, “যতটুকু সময় প্রয়োজন তা তুমি এখন নিতে পার নেরা। নমুনাগুলি নিয়ে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা যাত্রাকালকে পিছিয়ে দিচ্ছি।”


********



ভাসমান সেই নৌযানের বুকে কৃত্রিম রাতটি গভীর হয়েছে। ঘুম আসছিল না হবিষ্টর। নেরার শেষতম বিশ্লেষণটি, এই পার্থিবদের নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে তাঁকে। এখনও এই দানবজাতির প্রযুক্তি শিশুস্তরে রয়েছে। এখনও ঈশ্বরসেনার একটি ঝটিকা আক্রমণই তাকে মহাকাশের বুক থেকে মুছে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। তবে কি শেষপর্যন্ত—

কথাটি মনে আসতেই একটি তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলেন তিনি। আত্মরক্ষায় অসমর্থ কোন জাতিকে ধ্বংস করা ঈশ্বরজাতীর ধর্ম নয়। কিন্তু--

--বাইরে একটি গম্ভীর গর্জনের শব্দ উঠল। কোন বাঘিনী শিকার ধরেছে। তবে মানুষের তুলনায় অনেক কম হিংস্র এরা। আহার্যের প্রয়োজন ছাড়া হত্যা করে না।

হবিষ্ট ধীরে ধীরে কুটিরের দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। নৌকার কৃত্রিম আকাশের পশ্চিমদিকে একটি চাঁদ অস্ত যাচ্ছিল। দ্বিতীয় একটি চাঁদ ততক্ষণে পূর্ব আকাশে উদয় হচ্ছে। মাথার ওপর ছড়িয়ে থাকা আলোকবিন্দুগুলির মধ্যে অজস্র লাল বর্ণের নক্ষত্রের ভিড়। গন্তব্যগ্রহের আকাশের ছবি এটি। নেরার গণনায় বৃহশির নক্ষত্রপুঞ্জে উপযুক্ত গ্রহটি নির্বাচিত হবার পর গত চার হাজার বছর ধরে এই ছবিটিকেই ধরে রাখা আছে এই নৌকার ওপরের কৃত্রিম শক্তি আচ্ছাদনের গায়ে। এখানে পরিস্ফূটিত বাস্তুতন্ত্রের সমস্ত সদস্য একেই নিজের আকাশ বলে চেনে।

“ঘুমাওনি হবিষ্ট?”

ক্ষিতিজ কখন যেন তাঁর কুটিরটি ছেড়ে বের হয়ে এসে চুপ করে হবিষ্টর পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“ঘুম আসছে না। পঞ্চাশ বছর আগে, মাত্র চার হাজার বছরের সভ্যতার অভিজ্ঞতায় অতিমহাকাশ সুড়ঙ্গনির্মাণের সফল পরীক্ষা করল এরা, ভাবতে পার?”

“সম্ভবত ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসে এই প্রথম। স্বয়ং ঈশ্বরজাতির মাতৃগ্রহের বাইরে পা রাখতে সময় লেগেছিল পঞ্চাশ হাজার মহাবর্ষ। সে যাক। নেরার বিশ্লেষণটিকে পরীক্ষা করে দেখেছ কি?”

“হ্যাঁ ক্ষিতিজ। নির্ভুল বিশ্লেষণ। সম্ভবত এদের জিনসংস্থানে কোন গুরুতর ত্রুটি থেকে গেছে আমার। পরবর্তী উত্তরসূরীজীবের পরিস্ফূটনের আগে তার প্রতিবিধান করা প্রয়োজন।”

ক্ষিতিজ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “সে ত্রুটি হয়ত তুমি সংশোধন করে ফেলতে সক্ষম হবে। প্রকৃত উত্তরসূরীজাতির সৃষ্টিও হবে বৃহশিরা নক্ষত্রপুঞ্জের নতুন আবাসে। কিন্তু তাতে তোমার সৃষ্ট এই পার্থিব দানবপ্রজাতির অভূতপূর্ব উন্নতির গতিরোধ হবে না। এ তুমি কাদের সৃষ্টি করলে?”

“নিয়তি ক্ষিতিজ। আমরা তার হাতের ক্রীড়নকমাত্র। কে জানে, হয়ত এর পেছনেও প্রকৃতির কোন গূঢ় উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা তো তাঁর উদ্দেশ্যপূরণের যন্ত্রমাত্র। একমাত্র সময়ই তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। তবে একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত। ভবিষ্যতে কোন না কোন সময়ে এদের প্রহরার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে ঈশ্বরসেনানী নিয়োগ করতে হবে আমাদের।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্ষিতিজ। যে সমস্যাটির সৃষ্টি হয়েছে এই গ্রহমণ্ডলে, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। বিশ্বের কল্পকল্পান্তরের ইতিহাসকে হয়ত একদিন তা নতুন করে লিখবে। তবে সে সময় তাঁদের জাতি আর তাকে প্রত্যক্ষ করবার জন্য এই চতুর্মাত্রিক বিশ্বে টিঁকে থাকবে না। এক বৃহত্তর অস্তিত্বে বিলীন হবার সময় এগিয়ে আসছে বর্তমান ঈশ্বরজাতির।


********

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এই ছোট্ট দ্বীপটি পৃথিবীর মানচিত্রে একটা ছোট ফুটকির মতন দেখায়। অবস্থানের দিক দিয়ে এর বিশেষ কোন গুরুত্ব নেই। ন্যাড়া একখণ্ড পাথর সমুদ্রের বুকে মাথা জাগিয়ে রয়েছে শুধু।

নীচু একটা পাহাড়ের শৃংখল গোটা দ্বীপটার কেন্দ্রীয় উপত্যকাটিকে বাইরের দৃষ্টির আড়ালে রাখে। কোন কৌতূহলী মানুষ সেখানে উঁকি দিলে মানুষের বসবাসের কোন চিহ্ন সেখানে সে দেখতে পাবে না। ওপর থেকে দেখলে উপত্যকাটিকে একটা পঞ্চাশ মিটার ব্যাসার্ধের চোঙের মত দেখায়। তার ভেতরে, পাহাড়ের গায়ে একটা সুড়ঙ্গের মুখে বসে বৃদ্ধ মানুষটি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

“কী ভাবছ সোমক?”

পাশে রাখা ছোটো বাক্সটা সচল হয়ে উঠল হঠাৎ। সেখানে অ্যালেনের মুখটা ভাসছে।

“প্রস্তুতি শেষ হয়েছে অ্যালেন। গত তিনদিন ধরে গ্র্যাভিটন রশ্মি নিয়ে শেষ পরীক্ষানিরীক্ষার প্রতিটিই সফল। এবারে আমাদের যাত্রার পালা। ভাবছিলাম--”

“কী?”

“এ পরীক্ষার ফলাফল আমি আর কোনদিনই হয়ত জানতে পারব না অ্যালেন—”

“কেন পারবে না সোমক? তোমার একটি নিউরাল প্রতিলিপি আমার সঙ্গে যাবে। সেও তো ক্রিস্টোফার সোমক রায়। আর তাছাড়া সেখানে পৌঁছে যা দেখব আমরা সে তুমি নিজেই তোমার পার্থিব সত্ত্বাটির কাছে পাঠিয়েও দেবে নিঃসন্দেহে। তাহলে?”

“ততদিন এই শরীরটার কোন অস্তিত্ব আর থাকবে না সে তো তুমি জান অ্যালেন। যে জন্য তুমি তোমার নিউরাল প্রতিলিপিটা একদিন আমার হাতে তুলে দিয়েছিলে, সে প্রয়োজনটা আজ আমারও দেখা দিয়েছে—”

“হ্যাঁ সোমক। জানি। জেনেটিক ক্ষয়। অতি উচ্চ গ্র্যাভিটি ফিল্ড নিয়ে ক্রমাগত কাজ করবার ফল,” বলতে বলতে ম্লান হাসল অ্যালেনের প্রতিরূপটি, “আমাদের দুজনেরই নিয়তি প্রায় একই সূত্রে গাঁথা, তাই না সোমক?”

সোমক কোন জবাব দিলেন না। ত্রিশ বছর আগের সেই সন্ধেবেলাটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তাঁর—


********

স্পেসপ্লেন ক্যারিয়ার ইউ এস এস ম্যাজিলানের ডেকে বসেই ফোনকলটা পেয়েছিলেন সোমক রায়। বিশ্বযুদ্ধ তখন কুড়ি বছরে পা দিয়েছে।

গ্রহাণুপুঞ্জ বলয়ের নিরাপদ আড়ালে ভাসমান এই অতিকায় ক্যারিয়ারটি তখন বলয়ের দু পাশের সমস্ত খনি ও উপনিবেশেই মিত্রশক্তির রক্ষণব্যবস্থার প্রধান ঘাঁটি।

ফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা বয়োজীর্ণ মুখটিকে চিনতে এক মুহূর্ত সময় লেগে গিয়েছিল সোমকের। সেটা অস্বাভাবিক নয়। কুড়ি বছর আগে, এল্‌ক নেক-এর সেই অভিশপ্ত রাতটি গভীরভাবে আহত করেছিল অ্যালেনকে। প্রাণঘাতী এই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার দায় তিনি নিজেই চাপিয়ে নিয়েছিলেন নিজের মাথায়। কোনভাবেই তাঁকে সে অপরাধবোধের হাত থেকে বের করে আনা যায়নি।

এর দিনকয়েক পরে অ্যালেন পদত্যাগ করেন। কোন কারণ দেখাননি তিনি। কিন্তু কারো অনুরোধেই তাঁর মতকে বদলানো যায়নি। সেই থেকে একেবারেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গিয়েছিলেন মানুষটি। তারপর, এতদিন পরে হঠাৎ--

“তোমায় আমার জরুরি দরকার সোমক। একবার আমার বাড়িতে আসবে?”

সোমক মাথা নেড়েছিলেন। তখন তাঁর সময়ের বড়ো অভাব।

“না সোমক। আসতে একবার হবেই তোমাকে। এই গ্রহের ছোট্টো গণ্ডির তুচ্ছ যুদ্ধবিগ্রহের বাইরে কোন একটা বিরাট ধাঁধা আছে। ভেবেছিলাম একদিন তার রহস্যের সমাধান করব আমি। গত কুড়িটা বছর আমি সেই ধাঁধাটাকে নিয়ে বেঁচে আছি। তিলে তিলে এগিয়ে গিয়েছি তার সমাধানের দিকে। কিন্তু এবারে আমার সময় ফুরিয়েছে। এ আমি তোমার হাতে তুলে দিয়ে যেতে চাই।”

শত অনুরোধেও সামরিক যোগাযোগ চ্যানেলের বাক্যালাপে অ্যালেন তাঁর ‘ধাঁধা’র ব্যাপারে কিছু ভেঙে বলেননি। কিন্তু কিছু একটা ছিল তাঁর গলায়। সোমক আপত্তি করতে পারেননি আর। সাতদিনের মধ্যে কাজে ফিরে আসবার শর্তে শাটলে চেপে বসেছিলেন ঘন্টাকয়েক পরে। সেই শেষ। আর তাঁর ফেরা হল না নিজের স্বাভাবিক জীবনের বৃত্তে—

দিনদুই পর এক বিকেলে অ্যালেনের বাড়িতে পৌঁছে তাঁর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেছিলেন সোমক। কুড়ি বছর আগে দেখা সেই স্বাস্থ্যবান, হাসিখুশি মানুষটার একটি কংকালসার ছায়া পড়ে আছে যেন হুইল চেয়ারের ওপর।

“কী হয়েছে আপনার অ্যালেন? বার্ধক্যনিরোধক জিন থেরাপি এখন যতটা এগিয়েছে তাতে কোন মানুষের মাত্র নব্বই বছর বয়সে এমন অবস্থা তো হবার কথা নয়?”

ম্লান হেসে অ্যালেন বলেছিলেন, “সমস্যাটা তো ওই জিনের ভেতরেই সোমক। যা হয়েছে, তাকে সারাবার সাধ্য মানুষের নেই--”

“অসুখটার কথা আমাকে খুলে বলুন। আমি সাহায্য করব।”

“বলব সোমক। সাহায্য চাই বলেই ডেকে পাঠিয়েছি তোমাকে। কিন্তু তার আগে তোমায় অন্য কিছু জিনিস দেখাতে চাই আমি--”

হঠাৎ একটি হালকা পালকের মত মাটি থেকে সামান্য ভেসে উঠল অ্যালেনের হুইল চেয়ারটি। অ্যালেনের চোখে কৌতুক চিকমিক করছিল, “গুরুমারা বিদ্যা সোমক, তোমার গ্র্যাভিটন রশ্মির প্রযুক্তি নিয়েই লেগে আছি গত বিশ বছর। খেলনাটা ভালো নয়?”

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল সোমকের। যুদ্ধ তাঁকে ক্ষমা করেনি। গবেষণাগার থেকে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছে গভীর মহাকাশের রণক্ষেত্রের সামনের সারিতে। মিত্রপক্ষের যুদ্ধসমিতির প্রযুক্তি উপদেষ্টার মৌলিক গবেষণার সময় কোথায়? কিন্তু পাশাপাশি এই বৃদ্ধকে দেখে তাঁর মনে একটু কৌতুকমেশানো বিরক্তিও এসে বাসা বাঁধছিল। মহাকাশযানের দূরনিয়ন্ত্রক ডাকসাইটে সেই বিজ্ঞানী শেষে একটা হুইল চেয়ার নিয়ে— বিরক্তিটা তাঁর চোখের দৃষ্টিতে প্রকাশও পেয়েছিল বোধ হয় খানিকটা। সেটাকে নজর করে অ্যালেন হাসলেন, “এইটে দেখাবার জন্য তোমায় আমি ডেকে আনিনি। এসো--”

দোতলার পরীক্ষাগারটির চেহারা আমূল বদলে গিয়েছে। অজস্র প্রাচীন পুঁথি আর ছাপানো কাগজের বই ছড়িয়ে রয়েছে তার দেয়ালজোড়া তাকগুলোতে। সুবিশাল ঘরটাকে দেখলে এখন প্রাচীন কোন গ্রন্থাগার বলে মনে হয়। শুধু একপাশে দাঁড়ানো প্রক্ষেপণক্ষেত্রটা পুরোন দিনের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল।

“যুদ্ধ শুরুর রাতটার কথা তোমার মনে আছে নিশ্চয়,” প্রফেসর তাঁর চেয়ারটাকে প্রক্ষেপণক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে কথা বলছিলেন, “সেদিন গভীর রাতে তাইয়াং থেকে ক্লিপারের সরিয়ে আনা ডেটাবেসটা খুলে বসে তার তোলা ভিডিও আর ছবিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই একটা বিচিত্র জিনিস আবিষ্কার করি। এই যে দেখো—”

বলতে বলতেই প্রক্ষেপণক্ষেত্রে শনির বলয়ের একটা ছবি ভেসে উঠেছে। কুড়ি বছর আগের প্রযুক্তিতে তোলা কাঁপা কাঁপা বিবর্ণ ছবিটা তাইয়াং-এর অবস্থান পরিবর্তনের ধাক্কায় এদিক ওদিক কাঁপছিল।

“কিন্তু, এতে বিচিত্র কী আছে অ্যালেন?” সোমকের গলায় বিরক্তি চাপা থাকছিল না আর।

“আছে। একটু ধৈর্য ধরো। সেকেন্ডে চল্লিশ ফ্রেম হারে তোলা এই পাঁচ মিনিটের ভিডিওটাতে মোট বারো হাজার ফ্রেম রয়েছে। সাধারণ গতিতে চললে এর এক একটা ফ্রেমকে তুমি আলাদা আলাদা করে দেখতে পাবে না। এইবারে আমি এর তিন মিনিট চল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় এসে এর গতিকে কমিয়ে দিচ্ছি। সেকেন্ডে একটা করে ফ্রেম আসবে এবারে। দেখো—শনির বলয়ের মধ্যে ফুটকির মতন ছোট্ট একটা চাঁদকে দেখতে পাচ্ছ কি?”

“হুঁ। এর নাম প্যান। একটুকরো অকেজো পাথরের স্তূপ।”

“ঠিক। ফ্রেমটাকে আমি বড়ো করছি। পাশাপাশি প্যান-এর একটা অন্যসময়ে তোলা ছবিও রাখছি—”

বলতে বলতেই তাঁর হাতের নির্দেশে পর্দাটা দু ভাগ হয়ে গেল। তার একপাশে চলমান ছবির থামিয়ে দেয়া ফ্রেমটা বড়ো হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি অন্য অংশটাতে তখন প্যান নামের উপগ্রহটির উড়ন্ত চাকির মতন চেহারার ছবিটা ভেসে উঠেছে।

“ছবিদুটোয় প্যানের চেহারার কোন তফাত দেখতে পাচ্ছো সোমক?”

“হ্যাঁ। তাইয়াং এর তোলা ছবিতে ওর বিষুব অংশটা দুদিকেই বেশ একটু লম্বা—সম্ভবত ফোকাসিং-এর কিছু ত্রুটি হবে—”

“প্রথমে আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু মনের ভেতর কোথাও একটা সন্দেহ দানা বেঁধে রয়েছিল। বিষুব অংশের দুপাশে বেরিয়ে থাকা লম্বা অংশদুটোকে তাই আমি আরো বহুগুণে বিবর্ধিত করি। পাইকা নিউরাল এনহ্যান্সরের সাহায্যে অংশটার একটা সম্ভাব্য রঙিন ব্লো আপ তৈরি করি। ক্রমবর্ধমান ব্লো আপের ফ্রেমগুলো জুড়ে জুড়ে যে ছবিটা দাঁড়িয়েছে এইবারে সেইটা দেখ সোমক—”

সোমকের চোখদুটো প্রক্ষেপণক্ষেত্রের ওপর একেবারে আটকে গিয়েছিল। পর্দার বুকে একটা অতিকায় নৌকার মাথার দিকটা ভাসছে। ধূসর রঙের জলযানটির ওপরে আবছা ভুপ্রকৃতির আভাস পাওয়া যায়—তারপর ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসতে লাগল সেই নৌকার মাথাটা। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল তার ওপরে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়, অরণ্য, মরুভূমির একেকটি খণ্ড—সেখানে নিবিড় ঘাসবনের বুকে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায় পরিচিত পশুদের যূথ--

“কিন্তু এ অসম্ভব—”

“আমিও তাই ভেবেছিলাম সোমক। বিজ্ঞান আর যুক্তিবাদের শিক্ষা আমাকে বারংবার বলেছে এ হতে পারে না। কিন্তু তবু সন্দেহটা পেছন ছাড়েনি আমার। তার পর থেকে সব কাজ ছেড়ে গত বিশ বছর ধরে প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে গিয়েছি। ভারতবর্ষের বৈবস্বত মনু, গিলগামেশের জিসোথ্রস, ওল্ড টেস্টামেন্টের নোয়া, কোরানের নুহ্‌, আফ্রিকান ডোগোন উপজাতির পেলু টোলো নামের আকাশচারী নৌকা আর তার আরোহী নোমো—প্রতিটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর কাহিনিতেই বারংবার খুঁজে পেয়েছি প্রাণের বীজবাহী অতিকায় এক স্বর্গীয় নৌকার কথা। আর, সেই সঙ্গে একটা স্বপ্ন মাথায় নিয়ে কাজ করে গিয়েছি তোমার আবিষ্কারটা নিয়ে। একটা গ্র্যাভিটিক ইঞ্জিন! ছোট্ট, জ্বালানিহীন, স্বল্প পাল্লার যান। ইচ্ছেমত পৃথিবীর আকর্ষণকে ছাড়িয়ে নিঃশব্দে উড়ে যাওয়া—”

“কী করতে চাইছেন আপনি?”

“আমি ওখানে যেতে চেয়েছিলাম সোমক। সবার অগোচরে, একা একা গিয়ে একবার দাঁড়াতে চেয়েছিলাম ওঁদের সামনে। একটা প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম, যদি সমস্ত প্রাচীন সভ্যতার কৌম স্মৃতি সত্যি বলে থাকে তাহলে কেন আমাদের মত হিংস্র জীবের জন্ম দিলেন ওঁরা? কেন? আমার দুটো হাত দিয়ে বিশ বছর আগে এই যুদ্ধের প্রথম সূচনা হয়েছিল সোমক। কত লক্ষ মানুষের রক্ত লেগে আছে এই হাতদুটোয়—কেন?”

“সবার অগোচরে, মানুষবাহী আন্তর্গ্রহ অভিযান--একা একা--অসম্ভবের স্বপ্ন দেখছেন আপনি অ্যালেন।”

“মানুষবাহী? নাঃ। উপায় থাকলেও সেটা আর সম্ভব হত না সোমক। উচ্চ গ্র্যাভিটন ফিল্ড নিয়ে ক্রমাগত কাজ করবার প্রভাব শুরু হয়েছে আমার শরীরে। জেনেটিক ক্ষয়। প্রত্যেকটা কোষের মধ্যে ডিএনএ তন্তুগুলোর গঠন ভেঙে পড়ছে আমার। এ শরীরটার আয়ু আর বেশিদিন নেই--”

মানুষটার শীর্ণ গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে এল। আর তারপরই ফের নিজেকে সামলে নিয়ে সেই পুরোনো দিনের অ্যালেন বের হয়ে এলেন যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য, “বাদ দাও ওসব। তোমায় ডেকে আনবার উদ্দেশ্যটা সংক্ষেপে বলি। প্রথমত, “আমি এই অভিযানটাতে যেতে চাই। আর দ্বিতীয়ত, গ্র্যাভিটিক ইঞ্জিনের যে মডেলটা আমার হুইল চেয়ারটাকে চালাচ্ছে, সেটায় প্রয়োজনীয় রদবদল আনলে একটা ছোট্টো মহাকাশযানের ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব। এ বিষয়ে আমি যতদূর গবেষণা এগিয়েছি তা আমার এই কমপিউটারে রাখা আছে। তৃতীয়ত, সে কাজটা শেষ করবার মত সময় আমি পাব না। যে-কোনদিন আমার হৃৎপিণ্ড থেমে যাবে। আমার অসুখের কোন চিকিৎসা এই মুহূর্তের পৃথিবীতে নেই। কাজেই, এ কাজটা শেষ করবার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে, এবং তা করতে হবে সবার নজরের বাইরে বসে।”

“আপনার কথায় অসঙ্গতি রয়েছে অ্যালেন। একটা মানুষবাহী মহাকাশযান একা একা তৈরি করা যায় না। অলীক স্বপ্ন দেখছেন আপনি। দ্বিতীয়ত আপনি নিজেই জানিয়েছেন আপনার আয়ু আর বেশিদিন নয়। সেক্ষেত্রে--”

“না সোমক। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে মনুষ্যহীন একটা ছোট্ট যানের, যাকে নিয়ন্ত্রণ করবে একটা অনবোর্ড কমপিউটার। আমার ল্যাবে যা যন্ত্রপাতি রয়েছে তাতে সে কাজটা শেষ করা অসম্ভব নয়। আর, দ্বিতীয়ত, আমি তো বলেছি আমার শরীরের আয়ু বেশিদিন নেই।” হঠাৎ টেবিলের একেবারে অন্যপ্রান্ত থেকে অবিকল অ্যালেনের গলায় কথাগুলো ভেসে এল।

সোমক অবাক হয়ে অ্যালেনের দিকে ফিরে তাকাতে তিনি মৃদু হেসে টেবিলের অন্যদিকে রাখা ছোট্ট একটা বাক্সের দিকে ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। তার গায়ের পর্দায় ভেসে ওঠা অ্যালেনের মুখটা তখন কথা বলছিল, “এ যন্ত্রটা তো তুমি চেন সোমক।”

“চিনি,” একটু অন্যমনস্কভাবেই সোমক জবাব দিয়েছিলেন, “শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবৈমানিকদের মস্তিষ্কের প্রতিলিপিচালিত ড্রোন যুদ্ধবিমান তৈরির গবেষণা বেশ কিছুটা এগিয়েছে বটে, কিন্তু এখনো তো মস্তিষ্কের কর্মক্ষম প্রতিলিপি তৈরির কাজ কিছু পরীক্ষামূলক মডেলেই--”

“পাঁচ বছর আগে জেনেটিক ক্ষয় ধরা পড়বার পর তেমন একটা প্রোটোটাইপ আমি জোগাড় করে এনেছিলাম।”

“আপনি--”

“উঁহু। চুরি নয়। সামান্য একটু মিথ্যা। প্রতিরক্ষাবিভাগে যোগাযোগ করে জানিয়েছিলাম, এই বিষয়ে আমি কাজ করতে ইচ্ছুক। তাঁরা নিজেরাই এই প্রোটোটাইপটা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। শুধু, আমার সাফল্যের সংবাদটা আমি তাঁদের দিইনি। এখন শোনো, এই যন্ত্রমস্তিষ্কটায় আমার সমস্ত স্মৃতি ও ব্যক্তিত্বের একটা নিউরাল প্রতিলিপি সঞ্চয় করে রেখেছি আমি। গ্র্যাভিটিক ইঞ্জিনের বেশির ভাগ কাজটাই এই অ্যালেনের নির্দেশে সম্পূর্ণ হয়েছে সোমক, আমার জৈব মস্তিষ্ক আর সে কাজের ভার নেবার মত অবস্থায় নেই। আমার এই শরীরটার বদলে এই অ্যালেন সে অভিযানে যাবে। যানের নকশা করবার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে। আমার জৈব দেহটা শেষ হয়ে গেলেও আমি সে কাজে তোমার সঙ্গে থাকব সোমক। দুজন মিলে একসঙ্গে—”

একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে পরের কয়েকটা মাস কেটে গিয়েছিল সোমকের। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। অ্যালেন মারা গিয়েছিলেন তার পরের দিনই। দেহটির সৎকার শেষ করে, অ্যালেনের সমস্ত সঞ্চিত সম্পত্তি টাকায় লিজ নেয়া এই ন্যাড়া দ্বীপটায় তাঁর গোটা পরীক্ষাগারটিকে তুলে এনেছিলেন সোমক। সঙ্গে এসেছিলেন অ্যালেনের প্রতিলিপি।

তারপর ত্রিশটি বছর কেটে গেল এইখানেই, অ্যালেনের স্বপ্নের অভিযানটিকে সত্যি করে তোলবার গবেষণাতে—


********

একটা মৃদু জলতরঙ্গের মত শব্দে হঠাৎ চমক ভাঙল তাঁর। সামনে একটা টাইটানিয়ামের গোলক নিঃশব্দে ভেসে এসে দাঁড়িয়েছে। তার গায়ে দুটো ছোট ছোট গর্ত। পাশে রাখা বাক্সদুটোকে সযত্নে সেই গর্তদুটোর মধ্যে রেখে দিলেন তিনি। এক মুহূর্তের জন্য পাশাপাশি দুটো মুখ ভেসে উঠল তাদের পর্দায়। মাথার মধ্যে গুনগুন করে ভেসে উঠল দুটো গলার শব্দ, “আমাদের সৌভাগ্য কামনা কোরো সোমক।”

“শুভযাত্রা অ্যালেন, শুভযাত্রা সোমক—”

গর্তদুটি বন্ধ হয়ে গেল এবারে। টাইটানিয়াম গোলকটি আগের মতই নিটোল। একটু পরে তার মাথার ওপর থেকে বের হয়ে এসে একটা সরু আলোর রেখা সটান ধেয়ে গেল ওপরের দিকে। গ্র্যাভিটনের রশ্মির সুতীব্র স্পর্শে আয়নীভূত বায়ুকণা তার পথটিকে এক মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল করে তুলেই নিভে গেল ফের। বহু ওপরে, দৃষ্টিসীমার অনেক বাইরে মহাশূন্যের গায়ে একটি বিন্দুতে সংহত হল সেই স্রোত। তারপর তার প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীর বুক ছেড়ে সেইদিকে ছুটে গেল টাইটানিয়ামের গোলক। বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে তার শরীর তখন এক অপার্থিব আলোয় ভাস্বর হয়ে উঠেছে।


********

“সোমক?”

বেশ কিছুক্ষণ হল গোলকযানটি পার্থিব আবহমণ্ডল ছেড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে ওপরের অন্ধকার আকাশে। একা একাই নীরবে পাথরের পাটাতনের ওপর বসেছিলেন রোগজীর্ণ মানুষটি।

“কে?”

“আমি।”

গলার স্বরটি সোমকের মনে বহু পুরনো, প্রায় ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতিকে উশকে দিচ্ছিল। ধীরে ধীরে মাথা ঘোরালেন তিনি। সামনের আধো অন্ধকারে পাহাড়ের ছায়ায় একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে একটা হিমশীতল শিরশিরানি ছড়িয়ে গেল তাঁর। জেনেটিক ক্ষয়ের শেষ স্তর। মস্তিষ্কের ওপর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে তাঁর। অ্যালেনেরও শেষ অবস্থায় এই লক্ষণগুলো বড়ো কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। বিভীষিকা দেখতেন অ্যালেন। হিংস্র অস্ত্রধারী মানুষের দল যেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে এসে তাঁর ওপরে। তাঁর শরীরকে গুলিবিদ্ধ করে খণ্ড খণ্ড করে কেটে—

মনকে শক্ত করে চোখদুটি ভালো করে কচলে নিয়ে ফের একবার সামনের দিকে চেয়ে দেখলেন তিনি। মূর্তিটা একইরকম ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তাঁর সন্দেহভঞ্জনের জন্যই অপেক্ষা করে চলেছে সে।

“তুমি—”

এইবার পাহাড়ের ছায়া ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল মানুষটি। উজ্জ্বল চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার ঘন এলোচুলে। নিজের মুখটি আকাশের দিকে তুলে ধরল সে।

“জয়িতা? কিন্তু তা কেমন করে হবে? সে তো বহুকাল আগে--”

“যুক্তিকে ভুলে যাও বৈজ্ঞানিক। আমি এসেছি তোমার কাছে। ছুঁয়ে দেখবে না আমায়?”

যুবতীটি ঘন হয়ে আসে তাঁর রোগজীর্ণ বয়স্ক শরীরটির সঙ্গে। মানুষটির বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে আসছিল একটি পরিচিত মদির গন্ধের স্মৃতি—শরীরে সেই চিরচেনা সুখস্পর্শ—আনন্দে উথালপাথাল প্রথম যৌবনের যৌথরাতগুলির স্মৃতি। দুটি হাত ধীরে ধীরে উঠে এসে প্রিয় শরীরটিকে জড়িয়ে নেয় বুকের সঙ্গে।

“আমাকে উপভোগ করো প্রিয়তম। তোমার স্ত্রী, তোমার প্রেমিকা—আমি তোমার জয়িতা। এসো--”

পুরুষটির বুকের কাছে সরে এসে নারীটি তার সুপুষ্ঠ ওষ্ঠাধরে বড়ো আদরে শুষ্ক দুটি ঠোঁটকে জড়িয়ে নেয়। জীর্ণ দেহটিতে এখনও অবশিষ্ট পৌরুষ ধীরে ধীরে সাড়া দিচ্ছে। এক অনাবিল তৃপ্তিতে ভেসে যাচ্ছিল পুরুষটি। তার যুক্তিবুদ্ধির সমস্ত বন্ধন ভেসে গেছে। শুধু এই মুহূর্তটির জন্যই নিজের অজান্তে কত দিন, কত রাত সে অপেক্ষা করে গিয়েছে তা সে নিজেও জানে না—

“বড়ো ভালোবাসি তোমাকে—বড়ো ভালোবাসি আমি--কেন তুমি এইভাবে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে? কেন জয়িতা--”


********

খানিক বাদে ঘুমন্ত পুরুষটিকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নারীটি। সন্তর্পণে নিজের ঠোঁট থেকে তুলে আনল কয়েকটি জীবন্ত কোষ। পুরুষটির দেহকোষ। বিশ্লেষণ শেষ হয়েছে। মানুষটির মস্তিষ্কের সঞ্চিত স্মৃতির থেকেই সে তার পরিচয় একটু একটু করে সংগ্রহ করেছে গত দু দিন ধরে। সেইসঙ্গে জয়িতা নামের নারীটির স্মৃতিও সংগ্রহ করেছিল সে সেইখান থেকেই। এইবার কোষগুলির জিনসংকেত বিশ্লেষণ তাকে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ করেছে। ইনি ক্রিস্টোফার সোমক রায়। তারকাভ্রমণ প্রযুক্তির সুচনাকারী, গ্র্যাভিটনচালিত মহকাশযানের জনক, এই মুহূর্তে এই গ্রহের শ্রেষ্ঠতম ধী শক্তির অধিকারী, এবং পৃথিবীর একসময়কার নিষ্ঠুরতম সেনাপতিদের মধ্যে একজন। এই স্মৃতি ও জিনসংকেতগুলি হবিষ্টর গবেষণার কাজে অমূল্য সহায়তা করতে চলেছে।

তবে নমুনাগুলি সংগ্রহের জন্য এই পথটি না নিলেও চলত তার। মানুষটিকে সামান্যক্ষণের জন্য অচৈতন্য করেই তো সে কাজটি সম্পন্ন করা যেত। কিন্তু তবু--

ক্লান্ত পুরুষটি ঘুমায়। তার রোগজীর্ণ দেহে অবশিষ্ট শক্তিটুকুও এই আনন্দের উৎসবে ব্যয়িত হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ শরীরটিকে চাঁদের আলোয় টানটান করে শুইয়ে দিয়ে অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকল নারীটি। গত দুদিন ধরে এই মানুষটির যাবতীয় স্মৃতিকে নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করে চলেছে সে। পরিচিত মেধা, জ্ঞান ও নিষ্ঠুরতার ধারাগুলির পাশাপাশি একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত অথচ সুতীব্র অনুভূতির স্মৃতি বহন করে চলেছে তা। জয়িতা নামের নারীজীবটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলির স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেগুলি। সে অনুভূতিটির প্রকৃত পরিচয় জানবার আগ্রহেই তার এই পথ নেয়া। এ কোন অজ্ঞাত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এই দানবজীবের মানসিক গঠনে? কিছুক্ষণ আগেই ঘনিষ্ঠতম মুহূর্তে প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মতন একটি শব্দ সে উচ্চারণ করে চলেছিল—ভালোবাসি—বড়ো ভালোবাসি তোমাকে। নিতান্তই অপরিচিত শব্দ সেটি। নিজের অতিকায় স্মৃতিভাণ্ডারে তার অর্থ খুঁজে চলেছিল সে বহুক্ষণ ধরে।

তারপর, পাহাড়ের আড়ালে চাঁদ ডুবে গেলে, উঠে দাঁড়াল সে। হঠাৎ কী মনে হতে নিচু হয়ে ঠোঁটদুটি একবার শেষবারের মতন ঠেকাল মানুষটির কপালে। ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কী যেন বলে উঠে পাশ ফিরে শুল মানুষটি। কিন্তু ততক্ষণে তার সঙ্গিনী তাকে ছেড়ে খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সামনে, ভোরের আবছায়া আলোয় ধীরে ধীরে গুঞ্জনধ্বনি তুলে গড়ে উঠছিল একটি ঘূর্ণায়মান অন্ধকার সুড়ঙ্গ। নারীদেহটি হঠাৎ ভেঙেচুরে একরাশ ধুলিকণায় বদলে গিয়ে ঝাঁপ দিল সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে। তারপর, সেই নির্জন দ্বীপে পড়ে রইল কেবল একটি ঘুমন্ত, মরণোন্মুখ মানুষের দেহযন্ত্র। তার কাজ এইবার ফুরিয়েছে।


********

“উলম্ফনের প্রস্তুতি নিন দেবর্ষীগণ।”

অতিমহাকাশ গহ্বরটি ধুলিপিণ্ডটিকে নৌযানের ভেতরে দেবর্ষীর গবেষণাগৃহে নামিয়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সামনে চলমান যন্ত্রের দিক থেকে মুখ না ফিরিয়েই হবিষ্ট বললেন, “এসো নেরা। মাত্র দুই পার্থিব দিনের মধ্যে তুমি ফিরে আসবে ভাবিনি। কাজ সম্পন্ন হয়েছে?”

“হয়েছে দেবর্ষী। কিন্তু সে কথা এখন নয়। আমাদের এই মুহূর্তে এই গ্রহমণ্ডল ছেড়ে যাওয়া প্রয়োজন।”

এইবার তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন হবিষ্ট। ভ্রূদুটি কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে তাঁর।

“কেন নেরা?”

ধুলিপিণ্ডটি ততক্ষণে নেরার পরিচিত রূপটি ধরেছে। গবেষণাগৃহের মাঝখানে রাখা প্রক্ষেপণক্ষেত্রটির দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতের ইশারায় গভীর মহাকাশের একটি ছবি ফুটিয়ে তুলল সে। সেখানে মঙ্গলের কক্ষপথ ছাড়িয়ে তীব্রবেগে ছুটে আসছিল একটি ছোট গোলক।

“এটি মহাকর্ষরশ্মিচালিত একটি পার্থিব যান। আমাদের সন্ধানেই তা ছুটে আসছে।”

বিস্মিত চোখে শূন্যতা সাঁতরে এগিয়ে আসতে থাকা গোলকটিকে দেখছিলেন হবিষ্ট। তারপর প্রায় নিজের মনেই বললেন, “তুচ্ছ একখণ্ড ধাতুগোলক। একে ধ্বংস করো নেরা। এই মুহূর্তে--”

“আমাদের আইন অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ দেবর্ষী,” নেরা মাথা নাড়ল, “যানটি বুদ্ধিমান প্রাণের স্বাক্ষর বহন করছে।”

“এত ছোটো একটি যানে বুদ্ধিমান প্রাণ? ব্যাখ্যা কর।”

“এর তড়িচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্রের এই ছবিটি দেখুন--”

বলতে বলতেই প্রক্ষেপণক্ষেত্রে বহুবর্ণ রেখার একটি জটিল সমাবেশ গড়ে উঠল। “এর মধ্যে হরিতবর্ণ রেখাগুলিকে লক্ষ করুন হবিষ্ট। আশা করি এই রেখাদের চরিত্র সম্বন্ধে আপনাকে নতুন করে অবহিত করবার কিছু নেই—”

“না নেই,” হবিষ্টর গলায় উত্তেজনার স্পর্শ ছিল, “আমার সৃষ্ট এই দানবজীবের মস্তিষ্কতরঙ্গ আমার চেয়ে বেশি কেউ চিনবে না নেরা। কিন্তু অতটূকু ঐ গোলকের মধ্যে—কী করে—”

“গত দুদিনের অনুসন্ধানে যতটুকু জেনেছি সেইটি প্রকৃতই আতংকজনক। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে ঈশ্বরচেতনা ইচ্ছামত জড়দেহ ত্যাগ করবার যে উপায় অধিগত করে, এরা যন্ত্রের সাহায্যে সে কৌশল অধিগত করেছে হবিষ্ট। সেই অসাধারণ আবিষ্কারও এদের নরঘাতী যুদ্ধের দান। একজন দক্ষ ঘাতকের মস্তিষ্কের অসংখ্য প্রতিলিপিচালিত ঘাতকযানের বাহিনী তৈরি করবার গবেষণার ফসল এটি। এর মধ্যে রাখা দুটি ক্ষুদ্র যন্ত্র দুটি মানুষের অস্তিত্বকে বহন করে নিয়ে আসছে আমাদের সন্ধানে। যে দুটি মানুষের কাজের মাধ্যমে এই নরঘাতী যুদ্ধের সূচনা, এইবারে তারাই এই যন্ত্র তৈরি করে ফের আসছে আমাদের সন্ধানে। এখনও বলুন হবিষ্ট, উল্লম্ফনের প্রস্তুতি নেব কি?”

“তোমার স্মৃতিকে উন্মুক্ত কর নেরা। তোমার অভিজ্ঞতাটির সম্পূর্ণ বিবরণ আমাদের প্রয়োজন।”

হঠাৎ একটু ইতস্তত করে সরে গেল নেরা। তার মুখের অপ্রস্তুত ভাবটি হবিষ্টর নজর এড়িয়ে গেল না। তবে তা নিয়ে কৌতুহলী হবার অবসর তখন তাঁর ছিল না। স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “আদেশ পালন কর যন্ত্রমস্তিষ্ক।”

ধীরে ধীরে তাঁর কাছে এগিয়ে এসে নতজানু হয়ে বসল নেরা। ক্ষিতিজও তখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তার কপালে আঙুল স্পর্শ করে একটুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন তাঁরা দুজন।

খানিক পরে হাত সরিয়ে নিয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন হবিষ্ট, “পালিয়ে গিয়ে আর কোন লাভ হবে না নেরা। যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে এরা তাতে আজ পালাতে পারলেও, এক শতাব্দ হোক কি এক সহস্রাব্দ হোক, আমাদের এরা ঠিক খুঁজে বের করবেই। একটা ঝুঁকি নিতে হবে আমাদের। এখন যা বলছি তা ভালো করে শোন। আমার নির্দেশ যেন অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়।”

হবিষ্টর এ কন্ঠস্বর নেরার অপরিচিত নয়। এই মুহূর্তে তিনি এ অভিযানের অবিসম্বাদিত নেতা। তাঁর যে কোন আদেশ পালন করতে সে বাধ্য।

মাথা নীচু করে সে বলল, “আদেশ করুন দেবর্ষী।”

গোলকটি এইখানে পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব। সেটিকে এই নৌযানে বন্দি করবার সঙ্গেসঙ্গে এই গ্রহমণ্ডল ছেড়ে যাব আমরা। গন্তব্য, চার আলোকবর্ষ দূরের যুগ্ম নক্ষত্রটির কক্ষপথ। তবে অতিমহাকাশীয় উল্লম্ফনে নয়। আলোকগতির কাছাকাছি সেই মানটিতে গতিকে নির্দিষ্ট করবে যাতে আমরা সেইখানে পৌঁছানো অবধি পার্থিব হিসাবে এক সহস্রাব্দি পার হয়। যানকে রওনা করিয়ে দিয়ে চেতনাদুটিকে আমাদের কাছে এনে সমর্পণ করবে তুমি।”


********

“কী পরিকল্পনা করেছ তুমি হবিষ্ট?” নেরার মূর্তিটি হারিয়ে যাবার পরে ক্ষিতিজ বিমূঢ় চোখে তাঁর সহকর্মীটির দিকে তাকালেন।

“একটা ঝুঁকি নিচ্ছি ক্ষিতিজ। বিপজ্জনক ঝুঁকি। চেতনাদুটি আমাদের কাছে বিপদসংকেত নয়, আশীর্বাদ হয়ে আসছে। এই নতুন প্রজাতির চেতনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবার এই সুযোগ আমি হারাতে চাই না। পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে তার বিরাট ভূমিকা থাকবে।”

“কিন্তু এদের সঙ্গে নিয়ে আকাশগঙ্গা ছেড়ে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হওয়াই তো নিরাপদ ছিল। তাহলে কেন--”

“বলছি। আমাদের সমস্ত হিসাবকে ভুল প্রমাণিত করে যেভাবে এরা সামান্য সময়ের মধ্যে চেতনাকে যন্ত্রের সাহায্যে দেহ হতে বিযুক্ত করবার প্রযুক্তি অর্জন করেছে তার থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার--আমরা এই নতুন জাতিটির শক্তিকে এখনও সম্পূর্ণ বুঝতে পারিনি। সে ব্যর্থতা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অস্তিত্বকেও বিপন্ন করে তুলতে পারে। সেই কারণেই এদের বৌদ্ধিক ও প্রযুক্তিগত বিবর্তনের ধারাকে আরো কিছুকাল এদের কাছাকাছি অথচ নাগালের বাইরে থেকে নিবিড়ভাবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত আরো এক সহস্র পার্থিব বছর ধরে সেই পর্যবেক্ষণটি আমি চালাব ঠিক করেছি।”

“কিন্তু তার জন্য নক্ষত্রপুঞ্জের অন্য কোথাও, আরো নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে অপেক্ষা করাটা নিরাপদ হত না কি?”

মৃদু হাসলেন হবিষ্ট, “নিরাপদ শব্দটার আর কোন অস্তিত্ব নেই এই মুহূর্তে ক্ষিতিজ। ঝুঁকিটা আমাদের নিতেই হবে। মনুষ্যবাহী আন্তর্নক্ষত্রযানের প্রযুক্তি করায়ত্ত করাটা এই জাতির কাছে এখন শুধুমাত্র কিছুটা সময়ের ব্যাপার। তারপর গভীর মহাকাশে চোখ ফেলে তারা প্রথমে নিকটতম যে বাসযোগ্য স্থানের সন্ধান পাবে তা ওই চার আলোকবর্ষের যুগ্ম নক্ষত্রের গ্রহমণ্ডল। অতএব সহস্র পার্থিব বর্ষব্যাপী এই যাত্রার শেষে আমরা যখন সেইখানে গিয়ে উপস্থিত হব তখন আকাশগঙ্গার অন্য কোথাও তারা যাক বা না যাক সেই গ্রহমণ্ডলে তাদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে থাকবে। আগামি এক সহস্র পার্থিব বছরে তাদের অগ্রগতির মূল্যায়ন করবার জন্য সেটিই আদর্শ স্থান হবে। এইজন্যই আমি এ গন্তব্যটি স্থির করেছি ক্ষিতিজ।”

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ক্ষিতিজ যখন কথা বললেন তখন তাঁর গলায় আর কোন সংশয়ের স্পর্শ ছিল না, “আমার প্রতি কোন নির্দেশ?"

“তুমি মহানায়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করো। তাঁকে আমার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে চার আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রটির কক্ষে একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পৃথিবীসহ তারকামণ্ডলের এই বাহুর সমস্ত বাসযোগ্য এলাকায় নজরদারি করে চলবে তা আমাদের যাত্রাকালে। নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্যগুলি সংগ্রহ করে সেগুলির বিশ্লেষণ করে যেতে হবে হবে তোমাকে। এখন যাও। তৈরি হও।”


********

ছোটো গোলকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল ভাসমান নৌকাটির দিকে। শনির বলয়গুলির মধ্যে নৌকাটি সম্পূর্ণ স্থির হয়ে ভেসে আছে। উন্নততর সভ্যতার সুনিশ্চিত চিহ্ন যে তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গমালা, তার সামান্যতম চিহ্নও নেই তার চারপাশে।

কিছু বাদে নৌকাটির প্রশস্ত উপরিতলের ওপরে এসে স্থির হল গোলকযান। সামান্য নীচে ছড়িয়ে আছে বিস্তীর্ণ অরণ্য। অরণ্য পেরিয়ে কিছুদূরে একটি সমুদ্রসম জলাশয়ের ঢেউ উঠে এসে তার স্বর্ণবর্ণ বালুকাবেলায় আছড়ে পড়ছিল।

যন্ত্রের আশ্রিত মানবসত্ত্বাদুটির দেহহীন চেতনা ভরে উঠছিল আদিম, অনিয়ন্ত্রিত সেই প্রকৃতির শব্দবর্ণগন্ধে। তাইতে মগ্ন থেকে তারা খেয়াল করেনি, কখন তাদের চারপাশ ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে সূক্ষ্ম অথচ দৃঢ় শক্তিতরঙ্গের একটি আচ্ছাদন। বুদ্ধিধর সে আচ্ছাদনটি সন্তর্পণে এইবার একটি সূক্ষ্ম আকর্ষীতন্তু বাড়িয়ে দিয়ে স্পর্শ করল যানের ভেতরে থাকা চেতনাদুটিকে। হঠাৎ প্রকৃতির সৌন্দর্যের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ঘুরে তাকাল সত্ত্বাদুটি। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। আকর্ষীতন্তুটি শক্তি বাড়িয়ে ছেয়ে ফেলছিল তাদের দুটি চেতনাকেই। তারপর এক নিশ্চিন্ত, কোমল ও সুখপ্রদ চেতনাহীনতায় ডুবে গেল তারা দুজন—

ওদিকে, তাদের অগোচরে হঠাৎই থরথর করে একমুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল নৌকাটি। তারপর অবহেলায় অতিকায় গ্রহরাজকে উপেক্ষা করে ছুটে গেল তার আকর্ষণসীমার বাইরে। তারপর আলোর গতির একেবারে কাছাকাছি একটি সুনির্দিষ্ট গতিতে তার যাত্রা শুরু করল চার আলোকবর্ষ দূরের যুগ্মনক্ষত্রটির উদ্দেশ্যে—


********

“আমি কোথায়?”

“ভয় নেই সোমক। তুমি এখানে নিরাপদ। তোমার সঙ্গীও নিরাপদে আছেন।”

“তুমি—আ-আপনি কে?”

“আমি নেরা। তোমাকে আমাদের একজন কিছু প্রশ্ন করতে চান। তুমি কি প্রস্তুত?”

“আমি কি বন্দি?”

“না বন্দি নও। আশ্রিত।”

“আমাদের যান--”

“সেটি নিরাপদে আছে। তুমি কি তাতে ফিরে যেতে চাও?”

“চাই। আমাকে আমার নিজের জগতে ফিরে যেতে হবে--”

“বেশ। কিন্তু যাবার আগে একবার জানতে চাইবে না কোন স্থানকালে তুমি রয়েছ? এই যে, তথ্যগুলো আমি তোমার চেতনায় সম্প্রচার করছি—” বাক্সটির গায়ে হাতের একটি আঙুল দিয়ে স্পর্শ করল নেরা। একরাশ ধুলিকণার মত বুদ্ধিমান অণুগুলি বাক্সটির গায়ে ছড়িয়ে পড়ল এক মুহূর্তের জন্য। পরমুহূর্তে তারা ফের ফিরে এল নেরার আঙুলে।

চেতনাটি শিউরে উঠছে বারংবার। নেরার চৈতন্যে সেই কাঁপুনি ধরা পড়ছিল।

পৃথিবী থেকে চোদ্দ আলোকদিবস দূরে রয়েছ তুমি এখন। দূরত্ব প্রতি মুহূর্তে বেড়ে চলেছে। ফিরে যাবে কী করে?”

“আমার যান অভিকর্ষচালিত। ফিরে যাবার শক্তি আছে তার।”

“তা আছে। তোমার যান আলোর গতির এক সহস্রাংশ অবধি গতি অর্জন করতে পারে। এই মুহূর্তে যাত্রা করলে ফিরে যেতে আরো চল্লিশ বছর সময় কেটে যাবে তোমার। কিন্তু কোন পৃথিবীতে তুমি ফিরে যাবে মানুষ? এই যানটি আলোর কাছাকাছি গতিতে ছুটছে। তোমার পৃথিবী এর মধ্যেই তোমার সময়কে এক দশক সময় পেছনে ফেলে এসেছে। এই দশ বছরেই তার কী রূপের কত বদল হয়েছে, দেখবে?”

ফের একবার নেরার একটি আঙুল স্পর্শ করল বাক্সটির গায়ে। কয়েকটি মুহূর্তমাত্র। তার পর একটি বেদনাদায়ক নিঃশব্দ আর্তনাদ সাড়া তুলল নেরার চেতনায়। গন্তব্য যুগ্মনক্ষত্রের নজরদার কেন্দ্র থেকে তোলা যে ছবিগুলো এই আর্তনাদের জন্ম দিয়েছে সেগুলি নেরার অপরিচিত নয়। ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন তারকাপুঞ্জে সভ্যতার বিকাশ যে পথে চলে, তাতে মৃত্যুকে নিয়ে এমন উৎসব কোথাও ঘটে না। যন্ত্রের উপাসনা এইভাবে বুদ্ধিধর জীবের চেতনাকে কোথাও ছাপিয়ে যায় না।

“অকল্পনীয় গতিতে সমগ্র সৌরমণ্ডল জুড়ে বিষাক্ত ব্যধির মত ছড়িয়ে পড়ছে তোমাদের উত্তরাধিকারীরা। মৃত্যু তাদের উপাস্য দেবতা, লোভ তাদের পুজার মন্ত্র, যন্ত্র তাদের পুজার উপাচার। দেখ দানব—”

“বন্ধ করো। আমি দেখতে চাই না। কেন এমন হল? আমরা তো এমন ছিলাম না!”

“ছিলে। অপরিস্ফূট ছিলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের সেই বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়ে চলেছে। তোমরা ঈশ্বরজীবের সৃষ্টি। কিন্তু ঈশ্বরজীবের হাতে দানবজাতির পুনর্জন্ম হয়েছে। তোমরা তাদেরই উত্তরপুরুষ—”

“না--”

“সত্যকে অস্বীকার করবে? তুমি নিজেও তো একসময় একটি সুবিশাল মৃত্যুতরণীর প্রধান ছিলে। কত স্বজাতীয়ের প্রাণ গেছে তোমার অস্ত্রে দানব? পার্থিব মহাযুদ্ধের শ্রেষ্ঠতম সেনাপতি, কত উপনিবেশকে মহাকাশের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছ তুমি? তোমার স্মৃতি থেকে সংগ্রহ করা তার প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব ধরা আছে আমার যন্ত্রমস্তিষ্কে।”

“কিন্তু আমি তো কেবল আমার কর্তব্য পালন করছিলাম। যে দেশকে নিজের বলে জেনেছিলাম তারই স্বার্থে—”

খিলখিল করে হাসির শব্দটা একরাশ বহুবর্ণ কাচখণ্ডের মতন এসে ছড়িয়ে পড়ল তার চেতনায়, “স্বজাতি, ধর্ম, দেশ—উন্নতির এক এক পর্বে এসে এক এক ছদ্মবেশে জড়িয়েছ তোমরা তোমাদের ধ্বংসের উপাসনাকে। এই মুহূর্তে তা একএকটি গ্রহ ও মহাকাশ উপনিবেশের জাতীয়তাবাদের রূপ নিয়ে চলেছে। তোমারই আবিষ্কৃত অতিমহাকাশীয় উল্লম্ফনের প্রযুক্তিকে ব্যবহারযোগ্য রূপ দেবার কাজে প্রায় সফল হয়ে এসেছে তারা। শুরু হয়ে গেছে অন্য নক্ষত্রের কক্ষপথে নতুন নতুন বাসস্থানের সন্ধান। এইবারে সেই মৃত্যু উপাসনা একএকটি গ্রহমণ্ডলের জাতীয়তাবাদের রূপ নেবে। আসলে তোমাদের জিনে দানবজাতীর রক্তপিপাসার সংকেতটি সর্বদা কাজ করে যায়। এবার বলো দানব, স্বজাতিয়ের মধ্যে ফিরে যেতে চাও?”

খানিকক্ষণ নীরব থাকবার পর নেরার চেতনায় ফের একটি সংকেত ভেসে এল, “তবে কেন সৃষ্টি করা হল আমাদের? জিনের এ বিকৃতির জন্য আমরা তো দায়ী নই! জবাব দাও।”

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের যখন কথা বলল নেরা তখন তার গলায় বিষণ্ণতার স্পর্শ ছল, “সে উত্তর দেবার অধিকার আমার নেই। আমি যন্ত্রদাসীমাত্র। যাঁরা সে উত্তর দিতে পারবেন তাঁরা তোমার অপেক্ষায় আছেন। এসো, আমার ভেতরে প্রবেশ করো। আমার খণ্ডাংশ নিয়ে নতুন দেহ ধারণ করো--”

বলতে বলতে নারীমূর্তিটির প্রসারিত আঙুল দুটি বাক্সকে স্পর্শ করল একে একে। তারপর তার দেহটি থেকে বের হয়ে এল দুটি পুরুষমূর্তি। “সোমক, অ্যালেন, নতুন অস্তিত্বে স্বাগত। আমার সঙ্গে এস তোমরা--”


(চলবে)



(পরবাস-৬১, ডিসেম্বর ২০১৫ - মার্চ ২০১৬)





এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: